মে-জুন ২০১৭ . মে-জুন ২০১৭

চলতি সংখ্যা . বর্ষ: ১৩ . সংখ্যা: ০৫

সকল প্রশ্ন-উত্তর »

আপনি যা জানতে চেয়েছেন

  • ৪০৬৮ . সালেম আহমাদ . গাজীপুর
    প্রশ্ন:

    কিছুদিন আগে আমি গ্রামের বাড়িতে যাই। সেখানে দুপুরের খাবার খাচ্ছিলাম। কয়েক লোকমা খেয়েছি মাত্র; ছোট ভাই জানাল, একটু আগে একটি মুরগি এ তরকারিতে মুখ দিয়ে কয়েকটি ছোট মাছ খেয়েছে। একটু খাওয়ার পরই সেটিকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এ কথা শুনে আমি আর সে তরকারি খাইনি। এখন জানার বিষয় হল, সে তরকারি না খাওয়া ঠিক হয়েছে কি না? আর যে মুরগি সর্বত্র ঘুরাফেরা করে তা কোনো তরকারিতে মুখ দিলে তা খাওয়ার হুকুম কী?

    উত্তর:

    যে মুরগি এমন জায়গায় ঘুরাফেরা করে যেখানে নাপাকিতে মুখ দেওয়ার সুযোগ নেই যেমন আবদ্ধ বাসা-বাড়িতেসেটি কোনো খাবারে মুখ দিলে ঐ খাবার খাওয়া যাবে। তবে যে মুরগি বাইরে ঘুরাফেরা করে এবং নাপাকিতে মুখ দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে তার ঠোঁটে বা মুখে বাহ্যত কোনো নাপাকি না থাকলেও সতর্কতামূলক বিধান হলতার মুখ দেওয়া খাবার খাওয়া মাকরূহ আর যদি ঠোঁটে নাপাকি লেগে থাকতে দেখা যায় তাহলে যাতে মুখ দিবে তা নাপাক হয়ে যাবে। প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে যে মুরগি মুখ দিয়েছে তা বাইরে ছাড়া মুরগি হলে ঐ তরকারি না খেয়ে আপনি ঠিকই করেছেন।

    -মাবসূত, সারাখসী ১/৪৭-৪৮; শরহুল মুনইয়া ১৬৮; হাশিয়াতুত তহতাবী আলাল মারাকী ১৮-১৯
  • ৪০৬৯ . হাবীবুর হরমান . নরসিংদী
    প্রশ্ন:

     ১. কয়েকদিন আগে এক মসজিদে জুমার নামায পড়ার সময় নামাযের আগে ইমাম সাহেব বললেন, কারো টাখনুর নিচে কাপড় থাকলে উঠিয়ে নিন। হুযুরের কাছে জানতে চাই, টাখনুর নিচে কাপড় থাকা অবস্থায় নামায পড়লে কি নামাযের কোনো সমস্যা হয়?

    ২. কুরআন শরীফের অল্প কয়েকটি সূরা আমার মুখস্ত আছে। তাহাজ্জুদ নামাযে যদি কেরাত লম্বা করার উদ্দেশ্যে একই সূরা এক রাকাতে বারবার পড়ি তাহলে কি কোনো সমস্যা আছে?

    উত্তর:

    ১. টাখনুর নিচে কাপড় পরা শরীয়তে নিষিদ্ধ। হাদীস শরীফে এসেছেরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

    مَا أَسْفَلَ مِنَ الكَعْبَيْنِ مِنَ الإِزَارِ فَفِي النَّارِ  .

    টাখনুর নিচের যে অংশ লুঙ্গী (ইত্যাদি) দ্বারা ঢাকা থাকবে তা জাহান্নামে যাবে। (সহীহ বুখারীহাদীস ৫৭৮৭)

    আর নামাযের মধ্যে টাখনুর নিচে কাপড় থাকলে নামায  মাকরূহ হবে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিততিনি বলেন,

    مَنْ أَسْبَلَ إِزَارَهُ فِي صَلَاتِهِ خُيَلَاءَ فَلَيْسَ مِنَ اللَّهِ فِي حِلٍّ وَلَا حَرَامٍ.

    যে ব্যক্তি নামাযে অহঙ্কারবশতঃ নিজ কাপড় (পায়ের গিরার নিচে) ঝুলিয়ে রাখেআল্লাহ তার জন্য জান্নাত হালাল করবেন না এবং জাহান্নামও হারাম করবেন না। (সুনানে আবু দাউদহাদীস ৬৩৭)

    অতএব নামায ও নামাযের বাইরে সর্বাবস্থায় যেন পুরুষের কাপড় টাখনু গিরার উপরে থাকে সে ব্যাপারে যতœবান হওয়া অবশ্য-কর্তব্য। -ইমদাদুল আহকাম ৪/৩৩৬

     

     

    উত্তর : ২. নফল নামাযে এক রাকাতে কয়েকটি সূরাও পড়া যায়। তাই আপনার যে কয়টি সূরা মুখস্থ আছে সেগুলো দু রাকাতে মিলিয়ে পড়ে নিতে পারেন। এছাড়া নফল নামাযে একই রাকাতে একই সূরা বারবার পড়ারও সুযোগ আছে। তবে ফরয নামাযে ইচ্ছাকৃত এমনটি করা অনুত্তম। -ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১০৭;হাশিয়াতুত তহতাবী আলাল মারাকী পৃ. ১৯৩

  • ৪০৭০ . খাইরুদ্দিন . গোলাপগঞ্জ, সিলেট
    প্রশ্ন:

    আমরা রমযান মাসে খতম তারাবীহ পড়ে থাকি। তখন আমরা সবাই মিলে টাকা উঠিয়ে রমযানের শেষে হাফেয সাহেবকে কিছু হাদিয়া দিয়ে থাকি। এটা কি জায়েয আছে? জানালে খুশি হব।

     

    উত্তর:

    খতম তারাবীর জন্য হাফেয সাহেবদেরকে হাদিয়ার নামে বিনিময় দেওয়া ও তাদের জন্য তা গ্রহণ করা ঠিক নয়। কেননা এটি মূলত কুরআন মাজীদের তিলাওয়াত ও খতমেরই বিনিময়যা নাজায়েয। হাদীস শরীফে এসেছেআবদুর রহমান ইবনে শিবল রা. বলেনরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনতোমরা কুরআন পড়। তবে এর বিনিময়ে কোনো কিছু ভোগ করো না। (মুসনাদে আহমাদহাদীস ১৫৫৩৫) আরেক বর্ণনায় আছেআবদুল্লাহ ইবনে মাকিল রা. থেকে বর্ণিততিনি এক রমযানে লোকদের নিয়ে তারাবীহ পড়লেন। এরপর ঈদের দিন উবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদ তাঁর কাছে এক জোড়া কাপড় এবং পাঁচশ দিরহাম পাঠালেন। তখন তিনি কাপড় জোড়া ও দিরহামগুলো এ বলে ফেরত পাঠালেন যেআমরা কুরআনের বিনিময় গ্রহণ করি না। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহহাদীস ৭৭৩৯)

    -আলমুহীতুল বুরহানী ১১/৩৪৪; মাজমুআতু রাসাইলি ইবনি আবিদীন ১/১৬৭; ফাতাওয়া খালীলিয়া পৃ. ১২২; ইমদাদুল ফাতাওয়া ১/৩১৫-৩২২
  • ৪০৭১ . মীম হাসান . কলাবাগান, ঢাকা
    প্রশ্ন:

    গত দুই মাস আগে আমার এক আন্টি মারা যান। জানাযা হয় আন্টির বাসা থেকে ৫/৭ মিনিটের দূরত্বে এক মসজিদে। আন্টির বান্ধবীরাসহ অন্যান্য অনেক মহিলা আন্টির জানাযায় শরীক হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে। তখন উপস্থিত এক মুরুব্বীকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি প্রথমে জানতে চান ওখানে মহিলাদের নামাযের আলাদা ব্যবস্থা আছে কি না? মহিলাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা আছে একথা তাঁকে জানানো হলে তিনি বলেন, তাহলে মহিলারা জানাযায় যেতে পারবে। তখন মহিলারা জানাযায় শরীক হয়। মহিলাদের অধিকাংশই ছিল বেপর্দা।

    আমার তখন ঐ মুরুব্বীর কথায় একটু সন্দেহ হয় কিন্তু নিশ্চিত না হওয়ায় কিছু বলা থেকে বিরত থাকি। হুযুরের কাছে জানতে চাই মহিলাদের জন্য জানাযায় শরীক হওয়ার ব্যাপারে শরীয়তের বিধান কী?

    উত্তর:

    মহিলাদের জন্য জানাযার নামাযে বের হওয়া জায়েয নয়। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবা তাবেয়ীন থেকে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা আছে। তাবেয়ী যার ইবনে আব্দুল্লাহ রাহ. বলেন-

    كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتَّبِعُ جِنَازَةً، فَإِذَا بَامْرَأَةٍ عَجُوزٍ تَتَّبِعُهَا، فَغَضِبَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَتَّى عُرِفَ الْغَضَبُ فِي وَجْهِهِ، فَأَمَرَ بِهَا فَرُدَّتْ، ثُمَّ وُضِعَ السَّرِيرَ، فَلَمْ يُكَبِّرْ عَلَيْهَا حَتَّى قَالُوا: وَالَّذِي بَعَثَكَ بِالْحَقِّ لَقَدْ تَوَارَتْ بِأَخْصَاصِ الْمَدِينَةِ قَالَ: ثُمَّ كَبَّرَ عَلَيْهَا

    রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানাযার সাথে ছিলেন। হঠাৎ দেখলেন একজন বৃদ্ধ মহিলাও জানাযার সাথে সাথে আসছে। এটা দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক্রোধান্বিত হলেন এবং তার মুখম-লে ক্রোধের ছাপ ফুটে উঠল। তখন তার নির্দেশে ঐ বৃদ্ধাকে ফিরিয়ে দেয়া হল। এরপর খাটিয়া রাখা হল কিন্তু তিনি জানাযা শুরু করলেন না। যখন লোকেরা বলল,  ঐ সত্তার শপথ যিনি আপনাকে হক (সত্য)সহ প্রেরণ করেছেন ঐ মহিলা শহরের বাড়িঘরের আড়াল হয়ে গেছেতখন তিনি জানাযার তাকবীর বললেন। (মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক হাদীস ৬২৯০)

    উম্মে আতিয়্যা রা.-এর বর্ণনায় এসেছেতিনি বলেন-

    وَنَهَانَا أَن نَخْرُجَ فِي جَنَازَةٍ

    রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে জানাযায় বের হতে নিষেধ করেছেন। (আলমুজামুল কাবীর তবারানী ২৫/৪৫)

    আমর ইবনে কায়স রাহ. বলেন,

    كُنَّا فِي جِنَازَةٍ وَفِيهَا أَبُو أُمَامَةَ فَرَأَى نِسْوَةً فِي الْجِنَازَةِ فَطَرَدهُنَّ .

    আমরা এক জানাযায় উপস্থিত ছিলাম। আবু উমামাও সেখানে ছিলেন। তিনি দেখলেন জানাযায় কিছু মহিলাও এসেছে। তখন তিনি তাদের সরিয়ে দিলেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ১১৪০৮)

    মুহাম্মাদ ইবনুল মুনতাশির রাহ. বলেন,

    كَانَ مَسْرُوقٌ لاَ يُصَلِّي عَلَى جِنَازَةٍ مَعَهَا امْرَأَةٌ.

    মাসরূক রাহ. ঐ জানাযা পড়তেন নাযে জানাযায় কোনো মহিলা উপস্থিত আছে। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা-১১৪০৩)

    শাবি রাহ.-কে জিজ্ঞাসা করা হলমহিলারা কি জানাযার নামায পড়বেউত্তরে তিনি বললেন,

    لَا تُصَلِّي عَلَيْهَا طَوَاهِرَ وَلَا حَائِضًا

    নামহিলা জানাযার নামায পড়বে নাচাই সে পবিত্র হোক কিংবা ঋতুমতি। (মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক ৬২৯৭)

    নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপরোল্লেখিত হাদীস এবং সাহাবা-তাবেয়ীনের আছারগুলো থেকে এক থা স্পষ্ট যেমহিলাদের জন্য জানাযার উদ্দেশ্যে বের হওয়া জায়েয নয়।

    সুতরাং প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে মহিলাদের জন্য জানাযায় অংশগ্রহণ করা ঠিক হয়নি। অবশ্য মহিলারা ঘরে থেকেই মৃতের জন্য ঈসালে সাওয়াব ও মাগফিরাতের দুআ করতে পারে।

     

    প্রকাশ থাকে যেদ্বীনী বিষয়ে না জেনে মন্তব্য করা ঠিক নয়। প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে লোকটির না জেনে মাসআলা বলা অন্যায় হয়েছে।

    -হালবাতুল মুজাল্লী ২/৬০৭; শরহুল মুনয়া পৃ. ৫৯৪; আদ্দুররুল মুখতার ২/২৩২
  • ৪০৭২ . সফিউল্লাহ . চৌদ্দগ্রাম, কুমিল্লা
    প্রশ্ন:

    কোনো মুসলমানকে দাফন করার জন্য কোন তরীকায় কীভাবে কতুটুকু কবর খনন করবে? কবর খননের সুন্নত তরীকা কী, জানালে উপকৃত হব।

    উত্তর:

    যেসব জায়গার মাটি শক্ত ও মজবুত সেসব জায়গায় লাহদ (বোগলী) কবর খনন করা সুন্নত। সেটা হল-স্বাভাবিকভাবে চার কোণা করে মাটি খোড়ার পর নীচে পশ্চিম (কিবলার) দিক দিয়ে একটি গর্ত করবে এবং পশ্চিম দিকের ঐ গর্তের মধ্যে লাশ রাখবে।

    আর যেসব জায়গার মাটি নরমলাহদ কবর করলে মাটি ভেঙ্গে পড়ার আশঙ্কা আছেসেসব জায়গায় সিন্দুক কবর করবে। অর্থাৎ স্বাভাবিকভাবে চার কোণা করে মাটি খোড়ার পর নীচের দিকে গিয়ে মাঝ বরাবর একটি গর্ত করবে এবং সেখানে লাশ রাখবে।

    আর কবরের গভীরতা সর্বনিম্ন নাভি পর্যন্ত থেকে সর্বোচ্চ একজন মধ্যম গড়নের ব্যক্তি দুহাত উপরে তুলে দাঁড়ালে যতটুকু লম্বা হয় ততটুকুর মধ্যে রাখবে। তবে উপরের পরিমাণের মধ্যে যে এলাকায় যেটা প্রচলন সে এলাকায় সে পরিমাণই গভীর করা উচিত।

    আর কবরের দের্ঘ্য হবে মৃতের দৈর্ঘ্য সমান এবং প্রস্থ হবে দৈর্ঘ্যরে অর্ধেক বা তারচেয়ে কিছুটা কম।

    -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৯৬৬; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস ১১৭৮৩, ১১৭৮৪, ১২১৭৭ হালবাতুল মুজাল্লী ২/৬২২; আলবাহরুর রায়েক ২/১৯৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১৬৬; রদ্দুল মুহতার ২/২৩৪

কুরআন মজীদ ও সহীহ হাদীসের আলোকে মাহে রমযান