গবেষণামূলক উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মারকাযুদ্ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা-এর মুখপত্র

মাসিক আলকাউসার

নভেম্বর ২০১২, যিলহজ্ব ১৪৩৩

হজ্বে আছে ইবরাহীমী আনুগত্যের প্রশিক্ষণ

মাওলানা সায়্যিদ সুলাইমান নদভী রাহ. তার সীরাতুন্নবী গ্রন্থে লিখেছেন, ইসলাম মানেই হচ্ছে নিজের জযবা ও খাহেশকে মহান আল্লাহর সামনে কুরবানি করা। অর্থাৎ সমর্পণ করা। আর ইসলামের এই অর্থটির পূর্ণ বাস্তবায়ন হযতর ইবরাহীম আ.-এর প্রতিটি আমলের মধ্যে পাওয়া যায়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, (তরজমা) (স্মরণ করুন ঐ সময়ের কথা) যখন ইবরাহীমকে তার প্রভু বললেন, ইবরাহীম আত্মসমর্পণ কর, সে বললো, সমস্ত জগতের প্রতিপালকের সামনে আমি আত্মসমর্পণ করলাম।-বাকারা : ১৩১

আরও ইরশাদ করেন যখন তারা দুইজনে আত্মসমর্পণ করল এবং তাকে উপুড় করে শোয়ালো-সাফফাত ১০৩ (সীরাতুন্নবী সা., ৫ : ২২৮-২২৯)

হজ্বের প্রতিটি আমলই সেই আনুগত্য ও সমর্পণের সাক্ষ বহন করে। তাই আপনি  দেখবেন হজ্বের প্রতিটি আমল আর স্থানই  কোনো না কোনো আত্মসমার্পণ ও ত্যাগের হৃদয়স্পর্শী ইতিহাসকে বক্ষে ধারণ করে আছে। দুনিয়া ও আখেরাতে এই সমর্পণ ও আনুগত্যের সুফল বর্ণনা করছে ইতিহাস।

যেহেতেু মিল্লাতে ইবরাহীমীর মূলকথাই হল আনুগত্য ও ত্যাগ যা ইসলামের মূল চেতনা সে জন্য আল্লাহ তাআলা এ চেতনার প্রতি তাঁর বান্দাদেরকে উৎসাহিত করেছেন, (তরজমা) মিল্লাতে ইবরাহীম থেকে বুদ্ধিহীন লোক ছাড়া আর কেউই মুখ ফেরাতে পারে না।-বাকারা ১৩০

তাই হজ্ব একজন হাজীকে এই ত্যাগের চেতনাই উপহার দিয়ে যায়। অর্থাৎ তোমার সবকিছুই তুমি আল্লাহর সামনে সোপর্দ ও ত্যাগ করতে প্রস্ত্তত হয়ে যাও। যেভাবে হযরত ইবরাহীম আ. প্রিয়তমা স্ত্রী ও আদরের দুলালকে জীবন যাপনের নূন্যতম এক ঢোক পানির মত বেঁচে থাকার প্রাথমিক অবলম্বন ছাড়াই মরু প্রান্তে রেখে যাওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তুমিও সেভাবে আল্লাহর নির্দেশের সামনে আত্মসমর্পণ কর। ইহাই হজ্বের আনুগত্যের শিক্ষা। আর এই শিক্ষা যখন আমার মধ্যে আসবে তখনতো আমার ও আমার মহান মালিকের মাঝে কোনো দূরত্ব থাকবে না। আমি তখন তার প্রকৃত গোলাম হওয়ার সুবাদে পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারব। আনুগত্যের এই স্তরে পৌঁছলে তাকে বলা হয়, (তরজমা) সে আখেরাতে নেককার বলে গণ্য হবে।-বাকারা ১৩০

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্য অনেক আমলের সুফল হিসেবে গুনাহ মাফের সুসংবাদ দিয়েছেন, আর সদ্যভূমিষ্ঠ বাচ্চার সাথে নিষ্পাপ হওয়ার ব্যাপারে তুলনা দিয়েছেন হজ্বের ক্ষেত্রে। কারণ বান্দা যখন হজ্বের সময় নিজের সব ইচ্ছা ও আগ্রহ তার মালিকের সামনে উৎসর্গ করার ফলে তারতো আর কিছুই রইল না। ফলে সে তার ইচ্ছাকে কোথায় প্রয়োগ করবে? ছোট বাচ্চার সব কিছুই বাবা-মার ইচ্ছায় হয়, তাই তার বিরুদ্ধে তাদের কোনো অভিযোগও থাকে না। হাজী সাহেবও সেই সমর্পণের চেতনার বরকতে অভিযোগ থেকে মুক্ত এক নিষ্পাপ শিশুর রূপ ধারণ করেন। তার প্রতিটি কাজ আল্লাহর ইচ্ছায় সমর্পিত হয়।

আল্লাহর একটি কুদরতি নিয়ম হল, (তরজমা) প্রত্যেক সংকটের পরই সস্তি ও আরাম আছে।-আলাম নাশরাহ ৫

এখানেও তার ব্যাত্যয় ঘটেনি। হযরত ইবরাহীম আ. ও হাজেরার এই ত্যাগ ও আত্মসমর্পণের ফলে আল্লাহ তাআলা পানিশূণ্য মরুভূমিতে যমযমের ন্যায় এক কূপ চালু করেছেন, যা মুমিনের ঈমানকে আজও সজীব করছে। হাজার বছর ধরে যা মানুষের গলাকেই কেবল সিক্ত করেনি বরং ঈমানের ভূমিকেও সিঞ্চন করে চলছে।

পবিত্র মক্কা নগরীর একটি আলোচিত পাহাড়ের নাম জাবালে নূর। এই পাহাড়টি যেন মুমিন নর-নারীকে আরও কিছু শিক্ষাবিতরণের জন্য দাঁড়িয়ে আছে। আমরা অনেকে এই পাহাড়টি দেখতে যাই কিন্তু সেখান থেকে ঈমানের খোরাক থেকে বঞ্চিত হয়ে ফিরে আসি। আমাদের জীবন থেকে খোদা-তলবী আশংকাজনকহারে হ্রাস পেয়েছে। ফলে নির্জনতা অবলম্বন করে আত্মিক উৎকর্ষ সাধন কেবল বিশেষ শ্রেণীর সূফি-সাধকের আমল বলে মনে করি। অথচ তা সকল মুমিনের আমল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত উকবা বিন আমের রা.কে বলেন, জিহবাকে সংযত রাখ, ঘরেই আবস্থান কর এবং নিজ গুনাহের  জন্য কাঁদতে থাক (তিরমিযী)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই পাহাড়ের গুহায় বসে খোদা-তলবীর মহৎ কাজটা করতেন। যা দিয়ে তাঁর নবুওয়তী জীবনের সূচনা হয়।

পবিত্র কুরাআন মাজিদে আল্লাহ তাআলার দুইটি ঘোষণা আছে যার বাস্তবতার প্রকৃত উপলব্ধি হজ্বের মধ্যেই হওয়া সম্ভব : * সকল বস্ত্ত তিনিই সৃষ্টি করেছেন ফলে তার গোলামী কর (৬ : ১০২)

* সকল বস্ত্তই তার (২৭ : ৯১)। এই দুই আয়াত ছাড়াও পবিত্র কুরআনে আরও অসংখ্য আয়াত আছে যা দ্বারা স্পষ্ট বোঝা যায় যে, দেখা-অদেখা, দৃশ্যমান-অদৃশ্যমান সকল বস্ত্তরই কর্তৃত্ব আল্লাহর হাতে। ফলে যে যে পরিমাণ আত্মসমর্পণ করে তার তত সৌভাগ্য খুলে যায়। সমর্পণের হক অনেকে সময় ঘরের আরাম ও আড়ম্বরপূর্ণ জীবনে বসে আদায় হয় না। হজ্বে গিয়ে দুনিয়ার সব বন্ধন থেকে নিজেকে দূরে রেখে ফকীরের বেশে ইবরাহীম আলাইহিস সালামের অনুসরণের মাধ্যমে তার কিছু অনুশীলন হয়। হাজী সাহেবদের কুরবানী সেই আত্মসমর্পনের একটি প্রতীক ও মশক।

যেহেতেু ইবরাহীম আ. একাজে সফলতার শীর্ষচূড়ায় পৌঁছে ছিলেন তাই আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন প্রসঙ্গে তার কাথার উল্লেখ করেছেন যেমন : আমার নামায, কুরবানী, জীবন-মরণ সবই আমার মালিকের জন্য যিনি সমস্ত জগতের প্রতিপালক (৬ : ১৬২)

আল্লাহ তাআলার কাছে ইবরাহীম আ.-এর আত্মসমর্পণ ত্যাগ ও ত্যাগের এই ভাষা অনেক পছন্দ হয়েছিল । এ কারণেই তিনি কুরআনে তা উল্লেখ করে আমাদেরকে এমন একটি ত্যাগী জীবনের প্রতি উৎসাহিত করেছেন, যাতে আমরা ভাগ্যবান হতে পারি। আর হজ্ব হতে পারে এমন একটি জীবন গঠনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণালয়। অসুন আমরা ইবরাহীমী রঙে রঙিন হয়ে খোদার ভাগ্যবান গোলামদের কাতারে শামিল হই।