শাওয়াল-১৪৩২   ||   সেপ্টেম্বর-২০১১

বাইতুল্লাহর ছায়ায়-১৬

মাওলানা আবু তাহের মেসবাহ

 

(পূর্ব প্রকাশিতের পর) 

হাজী ছাহেবান, যারা বিমানে সফর করেন, বিমানের টয়লেট ব্যবহারের অভিজ্ঞতা তাদের অনেকের থাকে না। ফলে অল্পতেই টয়লেট ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে। এটা স্বাভাবিক; তাই বিমান -কর্তৃপক্ষেরই উচিত হজ্বফ্লাইট- গুলোতে টয়লেট পরিচ্ছন্ন রাখার বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া। 

এবার তো আমাদের অবস্থা হলো আরো শোচনীয়। কারণ জরুরি পরিস্থিতিতে মাঝখানে নাগপুর বিমানবন্দরে পাঁচঘণ্টা থামতে হয়েছিলো। জ্বালানী ছাড়া উড়াল সম্ভব নয়, তাই জ্বালানী নেয়া হয়েছে, কিন্তু  টয়লেট পরিষ্কার করা হয়নি। হয়ত বিষয়টি জ্বালানী গ্রহণের মত জরুরি নয়। কারণ এ ছাড়াও তো উড়াল দেয়া সম্ভব। কিন্তু যাদেরকে উদরে পুরে এবং যাদের পয়সা হজম করে বিমানের এই উড়াল, মধ্য আকাশে তাদের কী শোচনীয় দশা হতে পারে, তা বোধ হয় ভেবে দেখা কর্তব্য ছিলো। 

একবার টয়লেটের দরজা পর্যন্ত  গিয়ে ফিরে এলাম। ভিতরে যাওয়া সম্ভব হলো না, নাকে রুমাল চেপেও না।

পাঠক হয়ত ভাবছেন, হজ্বের সফরনামায় এ আলোচনা কেন? কারণ এখানেও আমি পেয়েছি মনে রাখার মত একটি শিক্ষা।

আমাদের কাফেলার একসঙ্গী হয়ত  আমার ফিরে আসা দেখে অবস্থা বুঝলেন। তিনি উঠে গিয়ে সামনের দুটি টয়লেট যতটা সম্ভব পরিষ্কার করলেন, ফলে তা কিছুটা ব্যবহারের উপযোগী হলো এবং আমার মত অনেকের কষ্ট লাঘব হলো। এ দুর্গন্ধ দূর করে তিনি কেমন সুবাসিত হলেন তা তো জানেন আল্লাহ; আমি শুধু দুআ করলাম, হে আলাহ, তোমার এই বান্দার হজ্ব তুমি কবুল করো। সেই সঙ্গে নিজের প্রতি ধিক্কার এলো যে, তিনি যা পেরেছেন, আমি কেন পারিনি? আসলে বড় হতে সবাই পারে না। তবে কৃতজ্ঞ হতে সবাই পারে, পারা উচিত।

তখন আমার মনে পড়লো হযরত মাদানী রহ.-এর জীবনের সেই অবিস্মরণীয় ঘটনা। তিনি  রেলে সফর করছেন তাঁর পাশেই ছিলেন এক হিন্দু ভদ্রলোক। তিনি টয়লেটে গেলেন, কিন্তু দরজা খুলেই নাক কুঁচকে ফিরে এলেন এবং নিজের জায়গায় বসে অস্বস্তি ভোগ করতে লাগলেন। হযরত মাদানী রহ. কাউকে কিছু না বলে, এমনকি সঙ্গের খাদেমকেও কিছু বুঝতে না দিয়ে টয়লেটে গেলেন এবং কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে হিন্দু ভদ্রলোককে বললেন, অব আপ যা সেকতে হ্যাঁয়

হিন্দু ভদ্রলোক কিছুটা অবাক হয়ে টয়লেটে গেলেন এবং দেখলেন, টয়লেট পরিষ্কার! প্রয়োজন সেরে ফিরে এসে ভদ্রলোক বললেন, মাওলানা, এটা কী করেছেন! আপনি ইনসান, না ফিরেশতা!

পরে তিনি হযরত মাদানী রহ.-এর পরিচয় পেয়ে তাঁর পা ছুঁয়ে বললেন, আপ তো সাচমুচ কে দেওতা হ্যাঁয়!

নিজে না পারলেও নিজের চোখে এমন ঘটনা দেখতে পাওয়াও সৌভাগ্যের বিষয়।

নামাজের সময় প্রায় পার হয়ে যাচ্ছে। সঙ্গে মাটির টুকরো ছিলো। আমি এবং ইমাম ছাহেব তায়াম্মুম করলাম। আরো কয়েকজন করলো আমাদের থেকে মাটির টুকরো নিয়ে। অনেকে নিষেধ অমান্য করে অজু করলো, ফলে নোংরা টয়লেট আরো সয়লাব হলো।

আমার মনে হয়, এভাবে নিষেধ অমান্য করা ঠিক না, তায়াম্মুম করাই সঙ্গত।

আমাদের বিমান বাংলাদেশ, তার যাত্রীসেবা যতই নড়বড়ে হোক এবং বসার আসন যতই হাঁটুভাঙ্গা হোক, গত রমযানে দেখলাম, কাঁচা মাটির ইট রেখেছে এবং অযু না করার কোমল অনুরোধ জানিয়ে তায়াম্মুমের জন্য মাটি এগিয়ে দিচ্ছে। এমনকি যারা দাঁড়িয়ে নামায পড়তে চায়, খোলা সুশৃঙ্খল -ভাবে তাদের সাহায্যও করছে। আমাকে এবং ভাই পারভেযকে তো ভিতরে নিয়ে জায়ানামাযও বিছিয়ে দিলো। সুশীল সমাজ যাকে বলে ধর্মীয় দুর্বলতা, কিছু পরিমাণে এখনো তা আছে আমাদের দেশে; যা নেই তা মূলত আমাদেরই দোষে নেই।

আমরা কেবলার দিকেই যাচ্ছিলাম। আমাদের সামনে সামান্য খালি জায়গা ছিলো। সেখানে দাঁড়িয়ে আমি ও ইমাম ছাহেব খুবই সংক্ষেপে যোহরের দুরাকাত কছর আদায় করে নিলাম। আরো দুএকজন পড়তে চাইলো, কিন্তু বাধা এসে গেলো। এই বাধাটা না দিলেও চলে। হুড়োহুড়ি করা যেমন ঠিক নয়,  তেমনি বাধা দেয়াও ঠিক নয়, বরং যারা দাঁড়িয়ে পড়তে চায় শৃঙ্খলা রক্ষা করে তাদের সাহায্য করা উচিত। বিমান বাংলাদেশে যেমন দেখেছি, কোন সমস্যা তো হয়নি। সউদীয়া আগা-গোড়া বাণিজ্যিক বিমান সংস্থা, ঠিক আছে, কিন্তু  সউদী হুকুমতকে তো মনে রাখতে হবে, কোন পরিচয়ে তারা আজ আমাদের সবার শ্রদ্ধার পাত্র!

আছরের সময় একই ভাবে আছর আদায় করলাম। একজন হাজী ছাহেব আমাদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে গেলেন। আলাহর ইচ্ছায় তিনজনের জামাত হয়ে গেলো। তিনি বিমানের আসনে বসে নামায পড়ার মাসআলা জিজ্ঞাসা করলেন।

আমি বললাম, বিমানের সমস্ত যাত্রী যদি এভাবে নামাযের জন্য উঠে দাঁড়ায় তাহলে তো বড় বিশৃঙ্খলা হয়, সংশ্লিষ্টদের মতে যা ঝুঁকিপূর্ণ। সুতরাং সাধারণভাবে নিজ নিজ আসনে বসে কিবলামুখী হয়ে ইশারায় রুকু-সিজদা করে পড়ে নেয়াই উচিত। খুব সহজে যদি সম্ভব হয় তাহলেই শুধু দাঁড়িয়ে পড়ার চিন্তা করা যায়।

তিনি বললেন, অনেকের মতে এভাবে নাকি নামায ছহী হবে না! আমি বললাম, যাদের এমন মনে হয় তারা পরে নামায দুহরে নিতে পারেন। তবে এ নিয়ে পরস্পর বিতর্ক করা উচিত নয়।

আলোচনা হচ্ছে, নামায দাঁড়িয়ে পড়া নিয়ে; বিমানে কিন্তু ছিলো অন্যরকম অবস্থা। যোহরের ওয়াক্ত পার হওয়ার পর জানা গেলো, অনেকেরই নামায কাযা হয়ে গেছে। তারা বিমানবন্দরে নেমে যোহর-আছর একসঙ্গে কাযা পড়বেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন।

ইমাম ছাহেবকে বললাম, তুমি তো প্রতিবছর হজ্বপ্রশিক্ষণ দাও, অনেকেই দেন; এটা খুব ভালো। পূর্ণাঙ্গ ও নিবিড় প্রশিক্ষণ ছাড়া সঠিকভাবে হজ্ব আদায় করা প্রায় অসম্ভবই। তবে হজ্বের সফরে নামায সম্পর্কে এই যে উদাসীনতা এ বিষয়ে তোমার প্রশিক্ষণে খুব ভালোভাবে সতর্ক করার চেষ্টা করো।

আরো বললাম, আমার খুব ইচ্ছা, হজ্বসম্পর্কে অভিজ্ঞ কোন একজন আলিম যেন মাদরাসাতুল হুজ্জাজ নামে হজ্ববিষয়ক একটি স্থায়ী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। আল্লাহ কাকে তাওফীক দেবেন জানি না, তবে তিনি অবশ্যই অনেক বড় ভাগ্যবান। ঐ মাদরাসায় দীর্ঘমেয়াদী ও স্বল্পমেয়াদী উভয় প্রকার প্রশিক্ষণ চলবে এবং সেজন্য প্রয়োজনীয় নেছাব ও কিতাব তৈরী করতে হবে। কয়েকজন উদ্যোগী ও উদ্যমী আলিমকে নিয়ে এজন্য একটি মশওয়ারা-মজলিসও করা যায়, বরং করা দরকার, যাতে কাজটি ব্যাপক, পূর্ণাঙ্গ এবং অধিক থেকে অধিক ফলপ্রসূ হয়।

ইমাম ছাহেবকে বললাম, হজ্ববিষয়ক একটি মাদরাসা কিন্তু  সময়ের দাবী এবং এটা হতে পারে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে দ্বীনী সংযোগের একটি কার্যকর মাধ্যম। এ পর্যন্ত আল্লাহর যত বান্দা তোমার সঙ্গে হজ্ব করেছে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেখো, আমার বিশ্বাস অনেকেই আন্তরিকভাবে এতে সাড়া দেবে।

ঘুম ঘুম লাগছে। তাই ভাবলাম, পুরো বিমানটা একবার ঘুরে আসি। কাফেলার সঙ্গীদের খোঁজ নেয়া হবে, অন্যদের অবস্থাও দেখা যাবে। এমাথা থেকে ওমাথা প্রায় দেখা যায় না। ভাবতে অবাক লাগে, এত শত যাত্রী নিয়ে কী স্বচ্ছন্দ গতিতে উড়ে চলেছে বিমান! স্ক্রিনে দেখাচ্ছে, ছত্রিশ হাজার ফুট উচ্চতা এবং গতি নয়শ কিলোমিটার।

প্রথম শ্রেণী থেকে বের হয়ে কয়েক কাতার সামনে গিয়ে দেখি, শিকদার সাহেব বেশ স্বস্তিদায়ক নিদ্রায় নিদ্রিত। হুমায়ুন কবীর সাহেব বললেন, শিকদার সাহেব নামায পড়েছেন। এটাই আশ্চর্য! দুর্বলরা হয় সবল, আর সবলেরা হয়ে পড়ে দুর্বল।

কয়েকজন হাজী ছাহেবের আত্মনিমগ্নতা দেখে খুব ভালো লাগলো। বোঝা যায়, তারা এখন ভাবের রাজ্যে বিচরণ করছেন। হয়ত তাদের অন্তরে চলছে আশা ও আশঙ্কার আনাগোনা। হায়, যদি আমাদের সবার অবস্থা এমন হতো!

ইহরামের লিবাসে যদিও সবাই একাকার, তবু একজন বৃদ্ধকে দেখে বুঝতে অসুবিধা হলো না, তিনি বড় আলিম। হয়ত কোন মাদরাসার শায়খুল হাদীছ। হাতে সচল তাসবীহ, অবনত মস্তক। বুকের দিকে ইহরামের বস্ত্র সিক্ত, হয়ত টপ টপ চোখের পানিতে। হাঁ, এই যে একফোঁটা পড়লো! মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম। বড় ঈর্ষণীয় দৃশ্য। ইচ্ছে হলো, কাছে গিয়ে পরিচয় করি। থাক; কারো আত্মনিমগ্নতায় ব্যাঘাত ঘটাতে নেই।

আমাদের যুবক সফরসঙ্গী কামরুল ইসলামকে দেখলাম সামনের দিক থেকে আসছেন ইহরামের কাপড়ে মাথা ঢেকে!! আমাকে দেখে করুন হেসে বললেন, আর বলেন না হুজুর! বুদ্ধি করে দোতালায় গেলাম, এখন দেখি স্রেফ নির্বুদ্ধিতা! এমন ঠান্ডা যে...

আসলেই ঠান্ডায় বেচারা যাকে বলে জবর জব্দ। গলা এমন বসেছে যে, ফ্যাস ফ্যাস করে কী বলছেন প্রায় বোঝা যায় না। কী দিবিব উচ্ছল যুবকটি ছিলেন বিমানে ওঠার আগে!

পানির জাহাযে দোতালা হয় সেখবর তো হাদীছের কিতাবেই পেয়েছি। সেই যে আল্লাহর পেয়ারা হাবীব উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়েছেন, নীচের লোকেরা পানি আনতে উপরে যেতো, আর উপরের লোকেরা বিরক্ত হতো। তাতে নীচের লোকেরা ভাবলো, পানি তো আমাদের কাছে রয়েছে; একটু ফুটো করে নিলেই হয়! ওদের বিরক্তি সইবার কী দরকার! ...

এখন তো পানির জাহায শুধু দ্বিতলবিশিষ্ট নয়, বহুতলবিশিষ্ট। তবে বিমানেও দোতালা হয়, এই প্রথম জানলাম! দেখার ইচ্ছা হলো, ভাই কামরুল ইসলাম সিঁড়ি দেখিয়ে দিলেন। সত্যি বেশ ঠান্ডা! অনেকেই ইহরামের কাপড়ে কান-মাথা ঢেকে বসে আছেন!!

নীচে নেমে ঘুরে ঘুরে নিজের আসনে ফিরে এলাম। ইমাম ছাহেব বললেন, কোথায় তুমি! নীচে দেখো, বিমান সাগর পাড়ি দিচ্ছে!

মেঘের ফাঁকে সাগরের পানি দেখা যায়, কিন্তু ঢেউ বোঝা যায় না।  খুব ছোট একটি নৌযান দেখা গেলো। হয়ত বিশাল কোন জাহায। কে জানে, হয়ত কোন দেশের হাজীদের জাহায! এপথেই তো যায় বিভিন্ন দেশের সাফীনাতুল হুজ্জাজ, প্রথমে ইয়ামানের আদন, তারপর হিজাযের জিদ্দা!

আমার বড় ইচ্ছে, অন্তত একবার পানির জাহাযে হজ্ব করি। অতীতে সাগর-পথে যারা হজ্ব করেছেন তাদের সফরনামা আমাকে খুব প্রলুদ্ধ করে। দিনের পর দিন চারদিকে অথৈ সমুদ্র, শুধুই নীল জলরাশি! তীরের কোন নিশানা নেই! মাটির স্পর্শ পাওয়ার জন্য সবার মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। তারপর যখন আরব-ভূমির সীমানা দেখা যায়; আদনবন্দরে জাহায ভেড়ে তখন হাজীদের অন্তরে আনন্দের ঢেউ বয়ে যায়। ... এসব বিবরণ পড়ি আর মুগ্ধ হই। নিজে একবার সেই অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা অর্জনের ইচ্ছে জাগে। পানির জাহাযে হজ্বের সফর, আমার মনে হয়, হজ্বের শিক্ষালাভের জন্য এবং হৃদয় ও আত্মার পরিশুদ্ধি অর্জনের জন্য অনেক বেশী অনুকূল; অন্তত হজ্বের সফরনামাগুলো থেকে তাই মনে হয়। যারা পানি ও উড়ো উভয় জাহাযে হজ্ব করেছেন তারাও একথা লিখেছেন।

লালবাগ মাদরাসার বিশিষ্ট উস্তায মরহুম মাওলানা আলী আছগর ছাহেব পানির জাহাযে হজ্ব করেছেন ১৩৯৭ হিজরীতে। আমি ও ইমাম ছাহেব তখন পটিয়ার ছাত্র। আমরা চট্টগ্রামবন্দরে গিয়েছিলাম তাঁকে ইস্তিকবাল করতে। তাঁর কল্পনায়ও ছিলো না, আমাদের দেখতে পাবেন। এত খুশী হয়েছিলেন যে, প্রথমে কিছুক্ষণ বাকরুদ্ধ ছিলেন, তারপর, তোমরা আইছ! বলে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। তিনি খুব অসুস্থ ছিলেন, পানি এসে পা ফুলে গেছে, হাঁটতে খুব কষ্ট। অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, তবু তাদের চোখে-মুখে কী খুশির ঝিলিক! দেখেই বোঝা যায়, অনেক প্রাপ্তিতে পরিপূর্ণ হয়ে আল্লাহর ঘর থেকে ফিরেছেন। এমনটা হাওয়াই জাহাযের হাজী ছাহেবানদের মধ্যে সাধারণভাবে আমি দেখিনি।

মরহূম মাওলানা আলী আছগর ছাহেব প্রায় বলতেন, ঐ হজ্বে যে স্বাদ ও শান্তি পেয়েছি তা আর কখনো পাইনি।

এখন তো সাগর-পথের সফরও অনেক আরামদায়ক। একদেড়শ বছর আগে ছিলো কয়লার ইঞ্জিনের জাহায, আর দেড়-দুশ বছর আগে ছিলো পালতোলা জাহায। সেই সব সফরের বিপদ-দুর্যোগ ও কষ্ট-ক্লেশের কথা এখনকার মানুষ কল্পনা করতেও ভয় পাবে। সম্ভবত উর্দু ডাইজেস্টে তিনশবছর আগের একটি হজ্বের সফরনামা পড়েছি পালতোলা জাহাযের। পড়েছি, আর জারজার কেঁদেছি। শাব্দিক অর্থেই যাকে বলে জান হাতে করে সফর করা। কল্পকাহিনীর সিন্দাবাদের সফরও যেন এর সামনে তুচ্ছ। এমনও নাকি হয়েছে, যদ্দুর মনে পড়ে, দূর থেকে আদনবন্দর দেখা যাচ্ছে, কিন্তু  হঠাৎ জোর বাতাস প্রবাহিত হলো, সাগরে ঝড় উঠলো, আর জাহায উল্টো দিকে যেতে যেতে এমন হলো যে, হিন্দুস্তানী বন্দর দেখা যায়! এদিকে হাজীদের অবস্থা লবে জান!

সেই সব সফরের হাজী হতেন অন্যরকম হাজী, ফিরেশতা হাজী! হজ্বের বাকি জীবন তার মুখে আর মিথ্যে আসতো না, কখনো তাকবীরে উলা ফওত হতো না। মসজিদে যেতেন আওয়ালে, বের হতেন আখেরে। তার সাক্ষিতে বিচারকের আস্থা ছিলো,  মানুষ তার কাছে আমানত রেখে নিশ্চিন্ত হতো, কারণ তিনি হজ্ব করে এসেছেন! কিন্তু এখন!

তাকিয়ে ছিলাম নীচে নীল সমুদ্রে, কিন্তু ডুবে ছিলাম দূর অতীতের সমুদ্রে। ইমাম ছাহেবের সুবহানাল্লাহ ধক্ষনিতে সম্বিত ফিরে পেলাম। সত্যি সুবহানাল্লাহ! সাগরের তীর দেখা যাচ্ছে। ধীরে ধীরে বিমান সাগর পার হয়ে মরুভূমির সীমায় প্রবেশ করছে। জল ও স্থলের মিলনরেখা আকাশ থেকে এত সুন্দর দেখলাম, এমন অভিভূত হলাম যে, সত্যি সুবহানাল্লাহ ছাড়া আর কিছু বলার নেই। যদি এর ছবি তুলে রাখা যেতো!

জলের সাগর শেষ হয়ে যেন শুরু হলো বালুর সাগর। বায়ুপ্রবাহে তাতে সৃষ্টি হয়েছে ঢেউয়ের পর ঢেউ। মাঝে মাঝে যেন কোন্ শিল্পীর হাতে অাঁকা আল্পনা! এমন সৌন্দর্য কারো কল্পনায়ও আসতে পারে না। বালু-সাগরের মাঝখানে ওটা কী! সম্ভবত মরুদ্যান! দুএকজন মানুষ এবং কিছু উট নড়াচড়া করছে লিলিপুট আকারে। সুবহানালাহ! কার সৃষ্টি জলের সাগর, বালুর সাগর? সাগরের বুকে সবুজ দ্বীপ, আর মরুভূমিতে ছায়াঘেরা মরুদ্যান? বালুর সাগরে এমন ঢেউ, এমন সুন্দর আল্পনা! কে তিনি এই কুশলী শিল্পী?

বেশ কিছু দূর বালুর রঙ ছিলো হলুদ; তারপর শুরু হলো লাল, তারপর আবার স্বাভাবিক বালু। মাঝে মাঝে লম্বা একটা রেখা চলে গেছে দূর দিগন্ত পর্যন্ত। কী সেটা, বোঝা গেলো না।

এই বালু-সাগরেও মাঝে মাঝে দেখা যায় কিছু বাড়ীঘর, আবার দেখা যায় পর্বতশ্রেণী। ছোট-বড় অসংখ্য চূড়া। পাহাড়ের কোলঘেঁষে চলে গেছে দীর্ঘ পথ, কখনো দুই পাহাড়ের মধ্য দিয়ে। গাড়ী নয়, যেন চলছে কিছু পিঁপড়ে! আমাদের বিমানও, মাটির দিকে তাকালে, মনে হয় পিঁপড়ের গতিতে চলছে, অথচ স্ক্রিনে লেখা আটশ পঁচাত্তর কিলোমিটার। কোন্টা বিশ্বাস করবো, চোখের দেখা, না স্ক্রিনের লেখা? মানুষের দৃষ্টি কত দুর্বল, যা দেখে ভুল দেখে, ভুল দেখার উপর ভুল সিদ্ধান্ত নেয়, আবার দম্ভ করে বলে, আমার জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতাই হলো আমার বিশ্বাস। যা দেখি না তা আমি বিশ্বাস করি না। তোমার নির্বুদ্ধিতাকে হে মানুষ! ঈশ্বর করুণা করুন।

কত দেশ, কত শহর-জনপদ পার হলাম, কে জানে! তবে লোহিত সাগরের তীরে জিদ্দা শহরকে চিনতে ভুল হলো না। শহর তো নয়, শহরপুঞ্জ! আমাদের কয়েকটি ঢাকা অনায়াসেই এখানে হারিয়ে যেতে পারে। মাটি থেকে যে সকল ভবন-টাওয়ার, মনে হয় গগনচুম্বী, আকাশ থেকে সেগুলো যেন ছোট ছোট খেলাঘর। তবে পুরো শহরের মসজিদগুলো আলাদাভাবে চেনা যায়। পৃথিবীর যে জনপদের উপর দিয়েই তুমি যাবে, মসজিদ ও তার মিনার তোমাকে বলে দেবে, এখানে কারা থাকে, কার বন্দেগি হয়!

ধীরে ধীরে বিমান নীচের দিকে নেমে আসছে। স্ক্রিনে তখন পনেরো হাজার, বারো হাজার ফুট...। সবকিছু এখন আরো স্পষ্ট; যেন ধীরে ধীরে বড় হয়ে আসছে। মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখছি, আর ভাবছি...। কী ভাবছি, আসলে নিজেও ভালো করে জানি না। ভাবছি পাপের দুর্গন্ধে ভরা আমার জীবনের কথা, আর ভাবছি আল্লাহর সীমাহীন দয়া ও করুণার কথা।

শহরের দালান-কোঠা, ইমারত-ভবন সব যেন খুব দ্রুত কাছে চলে আসছে। বিমানবন্দর ও হজ্বটার্মিনাল দেখতে পেলাম। তাঁবু আকারের এ ভবনটি দেখলে অন্তরে অন্য এক অনুভূতি জাগে। কেমন যেন একটি পুলক, কেমন যেন একটি শিহরণ আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখে! এর নকশা যিনি করেছেন, বোঝা যায়, তার অন্তর ছিলো এবং অন্তরঙ্গতা ছিলো; দিল ছিলো এবং দরদে দিল ছিলো। শুনেছি তিনি ছিলেন বাংলাদেশেরই সন্তান। আসলে একটি জন্ম অনেক সময় অনেক জন্মকলঙ্ক মুছে দেয়।

বিমান অবতরণের সময়টিকে আমার খুব ভয়ের মনে হয়। বুকটা দুরু দুরু করতে থাকে। আমি কালিমা পড়ে প্রস্ত্তত থাকি। শেষমুহূর্তেও তো ঘটে যেতে পারে কোন দুর্ঘটনা! আমাদের জীবন-মৃত্যুর মাঝখানের পর্দাটি এত পাতলা যে, এপাশ থেকে ওপাশের কিছু কিছু দেখা যায়, খুব আবছা হলেও দেখা যায়। গাফলত থেকে সতর্ক হওয়ার জন্য এটুকুই তো যথেষ্ট, কিন্তু  আমাদের গাফলত যেন কিছুতেই আর দূর হয় না। কত বিমান-দুর্ঘটনার খবর পড়ি! শত শত বিমানযাত্রীর জ্বলেপুড়ে ভষ্ম হওয়ার বিভীৎস ছবি দেখি! কিন্তু কোথায়, আমাদের মধ্যে তো কোন ভাবান্তর নেই! অন্তত বিমানে যতক্ষণ থাকি; অন্তত বিমান যখন ওঠে, নামে!

আল্লাহ আল্লাহ করে বিমান নিরাপদে হিজাযের পুণ্যভূমি স্পর্শ করলো। স্পষ্ট অনুভব করলাম বিমানের চাকার ভূমি স্পর্শ করার মুহূর্তটি। এ আমার বড় প্রিয় মুহূর্ত, যা চিরকালের জন্য ধরে রাখতে ইচ্ছে করে অন্তরে, অনুভবের ফিতায়।

ধীরে ধীরে গতি কমলো, বিমান থামলো হজ্ব-টার্মিনাল থেকে বহু দূরে।

আলহামদু লিল্লাহ। সকল হামদ ও শোকর তোমারই জন্য হে আল্লাহ! শেষপর্যন্ত আমরা পৌঁছে গেছি হিজাযের পুণ্যভূমিতে। দয়া করে তুমি আমাদের এনেছো হে আল্লাহ! না-পাক জিসিম, সিয়াহ দিল, গান্দা দেমাগ, তারপরো তোমার এত দয়া! এত মায়া! তারপরো বান্দাকে তুমি এনেছো হিজাযের মাটিতে, হিজাযের আবহাওয়ায়!

দরজা খোলা হলো। তাড়াহুড়া যাদের পছন্দ, তারা দরকার না থাকলেও তাড়াহুড়া করলো। আমি এবং ইমাম ছাহেব জানালাপথে দেখতে লাগলাম সিঁড়ি বেয়ে অবতরণের দৃশ্য। কিছুটা যেন ঈর্ষা হলো, হিজাযের বাতাসে তারা আমার আগে শ্বাস নিলো! কিন্তু  না, আমি ঈর্ষা করবো না। আগে, আর পরে, যাত্রা তো আমাদের একই পথে, একই লক্ষ্যে! দাঁড়াবো তো একই ঘরে, একই দুয়ারে! সেখানে আগে নেই, পরে নেই; সবাই সেখানে বান্দা হাযির! রহমতের ভান্ডার সেখানে সবার জন্য সমান অবারিত!

শিকদার সাহেবকে দেখলাম, নামছেন হুমায়ূন কবীরের হাত ধরে। ঢাকায় বিমানে ওঠার সময় ছিলেন একরকম, এখানে নামার সময় দেখি অন্যরকম! তখন ছিলেন ব্যাকুল, এখন যেন আকুল! তখন ছিলেন সতেজ, এখন যেন উচ্ছল! দূর থেকে দেখে অন্তত তাই মনে হলো। সিঁড়ি থেকে নেমে হুমায়ূন সাহেবের হাত ছেড়ে দিলেন। হাঁটতে লাগলেন, যেন সুস্থ-সবল যুবক। কিন্তু না, মনের জোর শেষপর্যন্ত শরীরের দাবীকে অস্বীকার করতে পারলো না। শিকদার সাহেব বসে পড়লেন। হুমায়ূন কবীর দ্রুত গিয়ে তার হাত ধরলেন। তিনি উঠলেন এবং এবার ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলেন। খুব সাধারণ দৃশ্য, কিন্তু শিখতে পেলাম অনেক কিছু। হাতে, পায়ে, শরীরে, মস্তিষ্কে এখনো যে শক্তি অবশিষ্ট আছে তার জন্য শোকর আদায় করলাম, আর প্রার্থনা করলাম, তা যেন শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে ব্যয় হয়।

এখন আর ভিড় নেই। ধীরে ধীরে উঠে এসে দাঁড়ালাম বিমানের দরজা পার হয়ে সিঁড়ির পাটাতনে। এখানে কিছু সময়ের জন্য আমি একপাশে দাঁড়িয়ে থাকি। হিজাযের ভূমিতে, হিজাযের বাতাসে প্রথম শ্বাস নেয়ার মুহূর্তটি নিবিড়ভাবে অনুভবের চেষ্টা করি। আমার খুব ভালো লাগে। যেন নবজন্মের আনন্দে শিহরিত হই। কেন নয়! আজমের মাটিতে জন্ম হলেও হৃদয়ের আকুতি আমার, ইহার চেয়ে হতেম যদি আরব-বেদুইন! আমি গ্রহণ করেছি আজমের আলো-বাতাস, কিন্তু  ভালোবেসেছি হিজাযের জোছনা- সুবাস! পিপাসায় পান করেছি আজমের পানি, আর কামনা করেছি আবে যমযমের স্বাদ!

কিন্তু এখন! এখন তো আর নিছক স্বপ্ন নয়, নয় শুধু অক্ষম হৃদয়ের কল্পনা! হিজাযের ভূমি, হিজাযের বাতাস ও সুবাস আমার জন্য এখন বাস্তব। এ সৌভাগ্যের জন্য কোন্ ভাষায় আল্লাহর শোকর আদায় করবো?! ইচ্ছে হয়, এখানেই সিজদায় লুটিয়ে পড়ি! কিন্তু এটা পারে শুধু তারা যারা হতে পেরেছে আশিক, মজনু, দিওয়ানা! আমি কোথায় পাবো আল্লাহর মজনু যারা তাদের ইশক ও দিওয়ানাপন!

ধীরে ধীরে নামলাম সিঁড়ি দিয়ে। স্পর্শ লাভ করলাম হিজাযের পূণ্যভূমির; সত্যিকারের স্পর্শ! কারণ ফিতে ছিঁড়েছে বলে পাদুটো ছিলো খালি। বাতাসের স্পর্শে ছিলো সিণগ্ধতা, আর ভূমির স্পর্শে ছিলো উষ্ণতা। আমার প্রিয় হিজায জীবনে এই প্রথম আমাকে স্বাগত জানালো সিণগ্ধতা ও উষ্ণতার মিশ্র মাধুর্য দিয়ে। সেদিনের সেই মুহূর্তের অনুভূতি কি আর ভুলতে পারি! বাতাসের সিণগ্ধতা যেন আশ্বাসের প্রশান্তি বয়ে আনে, আর ভূমির উষ্ণতা সতর্ক-সাবধান করে দেয়। বস্ত্তত যুগপৎ প্রশান্তি ও সতর্কতা, এটাই তো বাইতুল্লাহর মুসাফিরের আসল পাথেয়!

অন্তর্জ্ঞানী যারা তারা বলেন, পথ পুরোনো, ঘর প্রাচীন, কিন্তু  প্রত্যেক সফরে নতুন সফরের স্বাদ।

বাতাসের সিণগ্ধতা ও ভূমির উষ্ণতার মিশ্র অনুভূতি সে কথাটাই যেন নতুন করে মনে করিয়ে দিলো।

বাসে উঠলাম, বাস ছাড়লো। প্রায় দুকিলোমিটার দূরে হজ্বটার্মিনাল। এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন দেশের এয়ার লাইন্স-এর অসংখ্য বিমান; আমাদের দেশে বাসটার্মিনালে বাস যেমন। কত দেশের কত হাজার যাত্রী আজ এসেছে এই পুণ্যভূমিতে বাইতুল্লাহর উদ্দেশ্যে! একেক বিমানের গায়ে লেখা একেক দেশের নাম। আফ্রীকার বিভিন্ন দেশ যেমন আছে তেমনি আছে এশিয়া-ইউরোপের দেশ। দূরে একটি বিমানের গায়ে আমার চোখ যেন হোঁচট খেলো, আমার দৃষ্টি যেন আহত হলো এবং .. এবং হঠাৎ করে হৃদয়ের পুরোনো যখম থেকে যেন রক্তক্ষরণ শুরু হলো। বিমানটির গায়ে লেখা-আলখুতুতুল জাওয়্যিয়্যাতুল ইরাকিয়্যাহ।

ত্রিশ, পঞ্চাশ বছর আগেও ছিলো এ নাম। ইরাকের এ অভিজাত বিমানের যাত্রী হয়েছিলেন একদিন হযরত হাফেজ্জী হুযূর রহ.। এই জিদ্দাভূমি থেকেই তিনি উড়ে গিয়েছিলেন শান্তির শহর বাগদাদে, দুই মুসলিম দেশের মধ্যে জ্বলে ওঠা যুদ্ধের আগুন নেভাতে। আল্লাহর শোকর, আমিও  ছিলাম সেই কাফেলায়। তখন যুদ্ধ ছিলো, তবু ইরাক জীবন্ত ছিলো, বাগদাদ সবুজ-সজীব ছিলো। কিন্তু হায় ইরাক, হায় বাগদাদ, বাংলাদেশের বৃদ্ধ মানুষটি তোমাদের সতর্ক করেছিলেন ঐ ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে যা তোমাদের শান্তির শহরের দিকে ধেয়ে আসছে। কিন্তু তোমরা সতর্ক হলে না। মেহমানদারি করলে, কিন্তু মেহমানের কথা শুনলে না।

আগে যদ্দুর মনে পড়ে-আলখুতুতুল জাওয়্যিয়্যাতুল ইরাকিয়্যাহ এ লেখটি ছিলো সবুজ। কারণ স্বৈরাচারের অধীনে থাকলেও তখন ইরাক ছিলো সবুজ, তার অর্থনীতি ছিলো সজীব, ছিলো সামাজিক নিরাপত্তা।

বিমানের গায়ে এখন ঐ লেখাটি লাল। কারণ ইরাক এখন দাউ দাউ আগুনে জ্বলছে! দজলা-ফোরাতে এখন রক্তের স্রোত বইছে। সে রক্ত পুরুষের শরীরের এবং নারীর ইজ্জতের।

ইরাকের মুসলিম ভায়েরা এত দিন আল্লাহর ঘরে আসতে পারেনি, কারণ নব্যক্রশেডারদের অনুমতি ছিলো না। এবছর তারা আসতে পেরেছে, কারণ গ্রীনজোন গ্রীন সিগনাল দিয়েছে। কী নির্মম পরিহাস, এরই নাম আবার স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র! এ দুটো উপাদেয় বস্ত্তর স্বাদ গ্রহণ করাবার কথা বলেই তো মার্কিন হায়েনা ইরাকের ভূমিতে হানা দিয়েছিলো! হে ইরাক, হে বাগদাদ, আমার বড় জানতে ইচ্ছা করে, তোমাদের ভিতরে কি কোন গাদ্দার ছিলো; আছে? নইলে এত সহজে কেমনে গিলে ফেললো আস্ত একটা দেশ! গলায় একটা কাঁটা পর্যন্ত বিঁধলো না!

দেখলাম, ইরাকী বিমানের দরজা খুললো, হাজীরা নামতে শুরু করলো। পুরুষ, নারী, যুবক, বৃদ্ধ। এত দূর থেকেও দেখা গেলো, এক -নারীর কোলে ছোট্ট একশিশু। হিংস্র হায়েনার দন্তনখরে ক্ষতবিক্ষত ইরাকের হে অবুঝ শিশু! কামনা করি, তুমি যেন বুক চিতিয়ে, মাথা উঁচিয়ে দাঁড়াতে পারো স্বাধীন ইরাকের ঝান্ডা হাতে। তোমার বুক ঝাঝরা হয়ে যাক, তোমার বুক থেকে রক্তের ফোয়ারা ছুটুক, তবে সেই রক্তের হরফে যেন লেখা হয় ইসলামের দুশমনদের আখেরি আন্জাম।

হাজীরা নেমে আসছে। সেই একই লেবাস, ইহরামের শুভ্র লেবাস, যাতে কোন দেশের, কোন ভাষা ও গোত্রের ছাপ নেই; আছে শুধু ঈমানের শুভ্রতার ছাপ। দূর থেকে বোঝা যায় না। আমার খুব ইচ্ছা হলো, কাছে থেকে চেহারার আয়নায় ওদের ভিতরের ছবিটা দেখার; মুখের কথা থেকে বুকের ক্ষত অনুভব করার। কে জানে হজ্বের সময় হারামে, মিনা-আরাফায় দেখা হবে কি না তাদের কারো সঙ্গে?

হঠাৎ মনে হলো, মনের চিন্তা এখন অন্যদিকে নিবদ্ধ হওয়া হয়ত ঠিক হলো না। এখন তো আমি আল্লাহর ঘরের মুসাফির। এখন তো আমার সমগ্র সত্তা বাইতুল্লাহর ভাব ও ভাবনায় সমর্পিত থাকার কথা। মনের পর্দায় এখন অন্য কোন ভাবনার ছায়া পড়ে কেন? কিন্তু  আবার মনে হলো, এ চিন্তা তো ঈমানের কারণে, ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের কারণে, ভাইয়ের প্রতি ভাইয়ের হামদর্দি ও সহমর্মিতার কারণে! এ চিন্তা তো লিবাসুল ইহরামের শুভ্রতার ঐক্যের কারণে, আমরা সবাই আল্লাহর ঘরের মুসাফির হওয়ার কারণে এবং আল্লাহর দুশমনদের প্রতি ঘৃণা ও ক্রোধের কারণে!

বাসটা ঘুরে গেলো, ফলে ইরাকী বিমান এবং বিমান থেকে নেমে আসা যাত্রীরা চোখের আড়ালে চলে গেলো, কিন্তু হৃদয়ের আড়ালে নয়। হে আমার ভাই, তোমাদের প্রতি আমি নিবেদন করছি আমার হৃদয়ের অক্ষম ভালোবাসা ও সহানুভূতি। এমন কঠিন অবস্থার ভিতরেও, প্রতিমুহূর্ত মৃত্যুর বিভীষিকার মধ্যে বাস করেও তোমরা হজ্বের নিয়তে, ইহরামের লিবাসে আল্লাহর ঘরে এসেছো। তোমাদেরকে এবং তোমাদের দেশকে আল্লাহ দুশমনদের না-পাক অস্তিত্ব থেকে পাক করুন। তাদের কবরও যেন না হয় ইরাকের মাটিতে। লাশের মিছিল যেন চলতে থাকে ইরাকের ভূমি থেকে শত্রুভূমির দিকে। আবার যেন ফিরে আসে তোমাদের স্বাধীনতা, আবার যেন তোমরা ফিরে পাও তোমাদের তেলসম্পদের মালিকানা। অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে তোমরা যেন ফিরে আসতে পারো শরীয়তের পথে, কোরআন ও সুন্নাহর ছায়াতলে।

গাড়ী এসে ভিড়লো বার নম্বর প্রবেশ পথের সামনে। আমরা নামলাম এবং সেই পরিচিত বিরাট হলঘরটিতে প্রবেশ করলাম। পঁচিশবছর আগে এবং ঊনিশবছর আগে বার নম্বর প্রবেশপথ দিয়ে এখানেই এসেছিলাম। ভিতরে আল্লাহর ঘরের যাত্রীদের সমাগমে গমগম করছে। সবাই একই দেশের একই বিমানের যাত্রী এবং আমার দেশের মানুষ বলে শোরগোলটাও একটু বেশী। তবু ভালো লাগলো। কারণ আশা করি, এখানে এই মজমায় এমন কেউ অবশ্যই আছেন যিনি ঘরের সত্যিকার আশিক, যার ইশক ও মুহববতের নূরানী রিশতা জুড়ে আছে দূর অতীতের সঙ্গে, যার সঙ্গপরশে আমিও হয়ে যাবো আলোসণাত, আমারও সফর হয়ে যাবে কবুলিয়াত-ধন্য, আমারও ঘরের দীদার হয়ে যাবে ঘরের মালিকের দীদার-সমতুল্য। আমি জানি না, এ মজমায় কে তিনি সেই পুণ্যবান? তবে আছেন তিনি। আল্লাহর বান্দাদের নেক মজমা এমন আলোকিত মানুষ থেকে কখনো খালি থাকে না।

দেয়ালের গায়ে আরবীতে লেখা-আহলান ওয়া সাহলান। দেখে অন্তরে আশ্চর্য  এক আনন্দ-কম্পন বয়ে গেলো। এখনো স্পষ্ট মনে পড়ে, পঁচিশ বছর আগে আমার তরুণহৃদয়ে আবেগ-অনুভূতির কী অপূর্ব তরঙ্গদোলা সৃষ্টি করেছিলো, ঠিক যেন আমাকে উদ্দেশ্য করে উচ্চারিত হিজাযভূমির এই প্রথম সম্ভাষণ- আহলান ওয়া সাহলান।

সত্যি বলছি, এ সম্ভাষণ সেদিন শুধু দেয়ালের গায়ে লেখা ছিলো না;  কোন অদৃশ্য কণ্ঠের সুমধুর উচ্চারণেও যেন আমি শুনতে পেয়েছিলাম-আহলান ওয়া সাহলান।

অন্যান্য ভাষায়ও লেখা আছে একই সম্ভাবষণ-খোশ আমদেদ।

ওয়েল কাম, স্বাগতম, ইত্যাদি। কিন্তু আহলান ওয়া সাহলান-এর যে ভাব ও মর্ম এবং যে শ্রুতিমাধুর্য তা অন্যকিছুতে নেই। খোশ আমদেদ, ওয়েলকাম বা স্বাগতম, এসবের মূল বার্তাটি হলো, তোমার আগমনে আমি আনন্দিত। কিন্তু তুমি কে? তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্ক কী? তা জানা গেলো না। কিন্তু আহলান ওয়া সাহলান মানে তুমি তোমার প্রিয় ভূমিতে প্রিয়জনদের কাছে এসেছো। পঁচিশবছর আগে আহলান ওয়া সাহলানকে মনে হয়েছিলো আমার প্রাণের অংশ; তাই তা আমার অন্তরজুড়ে সৃষ্টি করেছিলো আবেগের অপূর্ব এক তরঙ্গদোলা। এবারও অনুভব করলাম সেই তরুণজীবনের তরঙ্গদোলার কিছুটা কম্পন।

অযুর-ইস্তিঞ্জার অপ্রতুল ব্যবস্থায় আগেও কষ্ট হয়েছে, প্রতিবারই হয়, এবারও হলো। আল্লাহর বান্দাদের এ কষ্টটা কোনভাবে যদি দূর হতো!

অনেক কষ্টের পর ফারেগ হয়ে অযু করে মাগরিবের নামায আদায় করলাম। বড় জামাত হলো। যিনি নামায পড়ালেন, বিশুদ্ধ তিলাওয়াত করলেন। হিজাযভূমির প্রথম নামায খুব ভালো লাগলো। দিলে যেন সাকীনা নাযিল হলো।

এখানে প্রথম যে জিনিসটির মুখোমুখি হলাম তা হলো মোবাইলের ছড়াছাড়ি। বাঙ্গালী পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা সিম বিক্রি করছে। প্রায় প্রত্যেকে সিম ক্রয় করছে, আর দেশের মানুষের সঙ্গে কথা বলছে গলার সর্বোচ্চ শক্তি ব্যয় করে। সে এক ভয়াবহ অবস্থা।

ইতিমধ্যে একটি আরবদেশের (পরে জানা গেলো সিরিয়ার) হজ্বযাত্রীরা এসে গেলো। আমাদের সবকিছুতে যেমন অসচ্ছলতার ছাপ তেমনি তাদেরও দেখেই সচ্ছলতার  ছোঁয়া; শুধু পরিচ্ছদে নয়, আচরণেও। সবকিছুতেই আছে তাদের স্বাতন্ত্র্য। নিজেদের মধ্যে কোন বিষয়ে কোন কষাকষি নেই, যা আমাদের মধ্যে ছিলো এবং অনেকটা অকারণেই।

বেশ শান্ত-সংযত; নারী-পুরুষ সবাই, কয়েকটি বালক-বালিকা ছিলো, তারাও। আর অবিশ্বাস্য বিষয় এই যে, আমাদের কয়েকটি শিশু কোলে কান্নাজুড়ে মায়েদের অস্থির করে তুলছিলো, অথচ ওখানে শিশুরা দিবিব চুপচাপ!

মোবাইলের ছড়াছড়ি তাদের মধ্যেও ছিলো, তবে চিৎকার ছিলো না; যেন কাছের মানুষের সঙ্গে আলাপ করছে। আমি যেমন তাদের পর্যবেক্ষণ করছি তেমনি তারাও অনেকে আমাদের অবস্থা দেখছে তাজ্জব হয়ে, কিছুটা যেন বিরক্ত হয়েও। আমি এবং আরো দুএকজন লজ্জা বোধ করছি, আর ভাবছি, কবে আমাদের জাতীয় চরিত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে?

তাদের আচরণের একটা দিক অবশ্য আমাকে যথেষ্ট বেদনা দিয়েছে, যা এখানে উল্লেখ করা সঙ্গত মনে হয় না।

এখনো মনে পড়ে নূরানী চেহারার সেই বৃদ্ধ মানুষটিকে। আমাদের দেশের মত আলিমানা সফেদ দাড়ি। যেন নূরের একটি ফোয়ারা। সব আলো নিভে গেলেও যেন এখানে আলোর অভাব হবে না, এমনই নূরানিয়াতপূর্ণ তাঁর উপস্থিতি।

আমি বুঝতে পারিনি, কিসের আকর্ষণে কখন উঠলাম এবং ঐ নূরানী মানুষটির সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। দৃষ্টি অবনত, হয়ত কোন ভাব ও ভাবনায় নিমগ্ন। সঙ্গে ছিলেন তাঁর পুত্র। বয়সে সম্ভবত আমার কিছু বড়। বাবার পরিচয় দিলেন, শামের প্রসিদ্ধ আলিম ও শায়খ। পুত্র নিজেও আলিম, তবে যথেষ্ট আধুনিক। আমি নিজের পরিচয় দিলাম, বাংলাদেশের সামান্য এক তালিবে ইলম, সালাম -মুছাফাহা করে শায়খের দুআ নিতে চাই।

পুত্রের ডাকে তিনি মাথা তুললেন। আমার দিকে তাকালেন। নিমগ্নতার ব্যাঘাতে, মনে হলো, বিরক্ত হলেন না। স্মিতমুখে সালামের জওয়াব দিলেন। বাড়িয়ে দেয়া হাত মুছাফাহায় গ্রহণ করলেন।  হযরত হাফেজ্জী হুযূর রহ.-এর সঙ্গে মুছাফাহায় যে অনুভূতি হতো সেই রকম অনুভূতি হলো। আমি দুআ চাইলাম, আল্লাহ যেন মকবুল হজ্ব নছীব করেন। আন্তরিকতা উপচে পড়া কণ্ঠে দুআ করলেন। কিছু কথা হলো। দেশে আমি আরবীভাষার খেদমত করি শুনে খুশী হলেন। বললেন, তুমি হিন্দুস্তানী অথচ আরবী বলো ঠিক আরবের মত।

আমি আশ্চর্য হলাম যখন তিনি জানতে চাইলেন, আবুল হাসান আলী নদবী রহ.-কে দেখেছি কি না? আমার মুখ থেকে বে-ইখতিয়ার এসে গেলো-কা-না ইয়ুহিববুনী।

(তিনি আমাকে ভালোবাসতেন) এ কথা শুনে শায়খ আমার ডান হাত তার দুহাতের মাঝখানে নিলেন এবং কিছুক্ষণ ধরে রাখলেন। তিনি আমার হাদীছের সনদ জিজ্ঞাসা করলেন, দ্বিতীয় নাম যখন বললাম, শায়খ হোসায়ন আহমদ আলমাদানী (রহ) তখন আমার ধরে রাখা হাতে আরো গভীরভাবে চাপ দিলেন। স্পর্শের গভীরতার মাধ্যমে তিনি যেন তাঁর হৃদয়ের উষ্ণতা ছড়িয়ে দিলেন আমার অস্তিত্বের মধ্যে।

শায়খের সামান্য সময়ের ছোহবত, মনে হলো, হৃদয় থেকে আরো কিছু মলিনতা দূর করে দিলো এবং হৃদয়ে আরো কিছু শুভ্রতা এনে দিলো। বাইতুল্লাহর মুসাফিরের হৃদয়ের জন্য এর বড় প্রয়োজন। এই নূরানী মানুষটির সঙ্গে হঠাৎ করে এই যে দেখা, হয়ত এটাই জীবনের প্রথম ও শেষ দেখা। এ দেখা কেন হলো? কার ইশারায় হলো? নিশ্চয় এটা বাইতুল্লাহর মুসাফিরের জন্য তারবিয়াতের গায়বি নেযাম।

সফরে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন ছূরতে, বিভিন্ন উপায়ে এ গায়বি তারবিয়াত চলতে থাকে। আমরা যদি তা অনুভব করতে পারি, তাহলেই লাভ। কিন্তু  দুর্ভাগ্য, গাফলতের ঘোরে আমরা এমনই বেহুঁশ থাকি যে, তারবিয়াতের ফায়দা দূরের কথা, আরো যেন গোমরাহি আমাদের উপর ভর করে।

গায়বের এই যে তারবিয়াত, এটা কখনো হয় শোকরের তরিকায়, কখনো হয় ছবরের তারিকায়। শোকর ও ছবরের দুটি উদাহরণ এখানে মনে পড়লো। হজ্বের এক সফরে আমরা চলেছি মক্কা থেকে  সোনার মদীনায়। পথে গাড়ী থামলো। কাফেলায় ইমাম ছাহেব তো ছিলেনই, আর ছিলেন আমার প্রিয় ছাত্র মাওলানা সাইফুল ইসলাম (আবুল বাশার)।

সেখানে হঠাৎ দেখা হয়ে গেলো আওলাদে রাসূল হযরত মাওলানা সৈয়দ হোসায়ন আহমদ মদনী রহ.- এর ছোট ছাহেবযাদা হযরত মাওলানা সৈয়দ আরশাদ মদনী (মু. যি. আ.)-এর সঙ্গে। ইমাম ছাহেব এবং মাওলানা আবুল বাশার ছিলেন তাঁর পরিচিত। তাঁদের উছিলায় আমি অধমও পরিচিত হলাম আহলে বাইতের পবিত্র রক্তধারার অধিকারী এই মহান মানুষটির সঙ্গে। আহলে বাইতের যারা বংশধর তাদের আখলাকই অন্যরকম; এত সুন্দর ও সুবাসিত যে, তাদের কারো সঙ্গে কিছু সময় যদি তুমি যাপন করো, সেই সুবাসে তুমিও হয়ে যাবে সুবাসিত।

যদ্দুর মনে পড়ে, তিনি সপরিবারে মদীনা থেকে ফিরছিলেন মক্কায়। আমাদের মত গরীব মুসাফিরদের সঙ্গে তিনি এমন সদাচারের পরিচয় দিলেন যে কী বলবো! মনে মনে শুধু দুরূদ পড়লাম, আর বললাম, হে নবী, এখনো আছে আপনার আখলাকে তাইয়েবার সুবাস আপনার আওলাদের মধ্যে!

বিদায় নিয়ে আমরা চলে এলাম আমাদের বাসের দিকে। মাওলানা আবুল বাশারকে কী জন্য যেন তিনি রেখে দিলেন। একটু পরে দেখি ফল-শরবতের বড় এক ক্যান হাতে তিনি আসছেন। এসে বললেন, হযরত মাদানী কাফেলার সবার জন্য এই শরবত হাদিয়া পাঠিয়েছেন, আর বলেছেন...।

ইমাম ছাহেব তখন খুব জাযবার মধ্যে এসে বললেন, আমাদের বড় সৌভাগ্য যে, আমরা তাজদারে মাদীনার যিয়ারাতে চলেছি, আর আল্লাহর তাআলা আমাদেরকে আওলাদে রাসূলের মাধ্যমে শরবত দ্বারা আপ্যায়ন করেছেন। আমাদের খুব শোকর আদায় করা এবং বেশী বেশী দুরূদ পড়া কর্তব্য।

ইমাম ছাহেবের কথায় দিলের কী যে হালাত হলো তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। শুধু বলতে পারি, মদীনার প্রবেশপথ থেকেই যেন মদীনার সুবাস পেতে শুরু করলাম! ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

সেবার মদীনার যিয়ারাতে যে ফায়য ও ফায়যান আল্লাহ দান করেছিলেন, পেয়ারা হাবীবের রাওযা শরীফে দুরূদ ও সালামের নাযরানা পেশ করার সময় যে কায়ফ ও সুরূর হাছিল হয়েছিলো তা আর কখনো হয়নি।

ঘটনা এখানেই শেষ নয়। মদীনা শরীফ থেকে দেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার আগে মসজিদে নববীতে হঠাৎ করে দেখা ডঃ আব্দুল আওয়াল ছাহেবের সঙ্গে। তিনি বাংলাদেশের মানুষ। আমেরিকান পরিচয়ে মদীনার নিকটবর্তী পেট্টোলিয়াম-বিষয়ক বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চস্তরের শিক্ষক। মদীনা শরীফে দাওয়াত ও তাবলীগের যিম্মাদারি পালন করেন। এমন ভালো মানুষ যে, বলতে গেলে কথা দীর্ঘ হবে। মাওলানা আবুল বাশার তার ছেলের শিক্ষক। সেই সুবাদে আমরাও তাঁর অন্তরঙ্গতা লাভ করলাম। তিনি দাওয়াত করলেন তাঁর বাসায়। আমরা রাজি হবো কি হবো না ভাবছি, তখন তিনি বললেন, আহলে বাইতের একজন বিশিষ্ট দ্বীনী ব্যক্তিত্বকেও দাওয়াত করেছি। এই সুযোগে তাঁর সঙ্গে আপনাদের পরিচয় হবে।

এখন তো আমরা ডক্টর ছাহেবের দাওয়াত যাকে বলে লুফে নিলাম।

যথাসময়ে তিনি গাড়ি করে আমাদের নিয়ে গেলেন। সেখানে আহলে বাইতের সেই মহান ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় হলো। কেমন দেখলাম তাঁকে? কেমন পেলাম তাঁকে? বিশদ করে বললে অনেক বলা যায়, তবু মনে হবে অনেক কিছু বলা হয়নি। শুধু এইটুকু বলি, মনে হলো, হয় তাঁকে তৈরী করা হয়েছে গোলাবের পাপড়ি দ্বারা, আর না হয় গোলাববাগানের মাটি দ্বারা।

ডঃ ছাহেবের ঘরের দস্তরখান ছিলো বড় শানদার। যেমন জিহবার স্বাদে তেমনি অন্তরের আস্বাদনে।

ঘটনা এখানেই শেষ নয়। দস্তরখান থেকে ফারেগ হওয়ার পর আহলে বাইতের সেই মহান ব্যক্তি কী আশ্চর্য বিনয়ের সঙ্গে তাঁর ঘরে তাঁর দস্তরখানে আমাদের দাওয়াত দিলেন। মুখের কথা ও অভিব্যক্তি এমন যেন দাওয়াত কবুল করলে তিনি কৃতার্থ হন!

এমন সৌভাগ্য কি ছাড়তে আছে! দাওয়াত কবুল করে আমরা ধন্য হলাম, আর আহলে বাইতের মুখের উদ্ভাস দেখে মনে হলো তিনি ...।

সেদিন আমি ও ইমাম ছাহেব একসঙ্গে রওযা শরীফে যিয়ারতে গেলাম। বলা ঠিক হবে কি না জানি না, সালাম পেশ করার সময় মনে হলো আজ রাতে আল্লাহর নবীর...!

জীবনে আর কোন দস্তরখানের জন্য এমন ব্যাকুলতা আমার মনে পড়ে না। বিকেলে ইমাম ছাহেব বললেন, আহলে বাইতের জন্য কিছু হাদিয়া তো নিতে হয়, কিন্তু  আমাদের মত গরীব মুসাফির কী হাদিয়া নিতে পারি! দুই বন্ধু মিলে মসজিদে নববীর নিকটবর্তী বিনদাউদে গেলাম। সে এক অন্য জগত। থাক সে কথা।

কত কিছু দেখলাম, কত কিছু ভাবলাম, কত কিছু বাছাই করলাম, কিন্তু আহলে বাইতের শায়ানে শান কিছুই মনে হলো না, সেই সঙ্গে ছিলো আমাদের সামর্থ্যের বিষয়।

হঠাৎ আমার নযরে পড়লো সাতটি আজওয়া খেজুরের ছোট্ট সুন্দর একটি প্যাকেট। তার গায়ে লেখা আজওয়া-সম্পর্কিত মশহুর হাদীছ।

আমার মন বলে উঠলো, পেয়েছি! আমাদের কাঙ্ক্ষিত ধন পেয়েছি!

ইমাম ছাহেবও খুশী হয়ে বললেন-হাযা হুয়া।

এই তো সেই!

এখানেও আমার সেই একই জিজ্ঞাসা, ইমাম ছাহেবের দিলে হাদিয়ার খেয়াল কীভাবে এলো? কীভাবে এই খেজুরের প্যাকেট আমার নযরে এলো? কার গায়বি ইশারা কাজ করে এর পিছনে? ভাবলে অনেক কিছু, না ভাবলে কিছু নয়!

সেই হাদিয়া নিয়ে এশার পর আমরা আহলে বাইতের গৃহে উপস্থিত হলাম। সেই মধুর সম্ভাষণ শাব্দিক অর্থেই যেন আমাদের কানে মধু বর্ষণ করলো-

আহলান ওয়া সাহলান।

(এসো, এসো, নিজের ঘরে এসো!)

তিনি বললেন, তাঁর ছোট্ট বাচ্চাটিও বললো-আহলান ওয়া সাহলান।

কলজে ঠান্ডা করা এবং হৃদয় শীতল করা সম্ভাষণ! আহলে বাইত বলছে-

আহলান ওয়া সাহলান।

ইচ্ছে হলো নিজের সৌভাগ্যে নিজেকেই ঈর্ষা করি। ইমাম ছাহেব ও মাওলানা আবুল বাশার একবাক্যে বললেন, মদীনার আহলে বাইত তাহলে এমন হয়!

কিছুটা কুণ্ঠার সঙ্গেই আমরা হাদীয়া পেশ করলাম, আর.. আর সেই হাদিয়া তিনি মাথায় তুলে নিলেন। নিজে খেলেন, বাচ্চাকে দিলেন এবং ঘরের ভিতরে নিয়ে গেলেন। মেহমানকে ইকরাম করার কত আদা ও আন্দায যে তাঁরা জানেন!

দস্তরখানে এযুগের প্রাচুর্য ছিলো এবং সে যুগের মাধুর্য ছিলো। দুয়ে মিলে তৃপ্তি ও পরিতৃপ্তির সে এক অনাস্বাদিতপূর্ব স্বাদ!

কত কথা যে বলার ছিলো! কত বিষয় যে লেখার ছিলো! কিন্তু ...

বিদায়ের সময় কতভাবে যে আমাদের শুকরিয়া আদায় করলেন! বারবার বললেন, আমাদের উপর তোমাদের কত হক, কিন্তু আমরা তোমাদের জন্য কিছুই করতে পারি না। আগামীকাল তো তোমরা দেশে ফিরে যাবে, আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে নেয়ামত ও বরকত দ্বারা মালামাল করে দিন।

আমরা বললাম, আমীন!

বিদায়-মুছাফাহা করবো, তখন তিনি বললেন, চলো, তোমাদের অবস্থানক্ষেত্রে রেখে আসি। আমরা তো অপ্রস্ত্তত, কিন্তু তিনি কিছুতেই ছাড়লেন না। নিজে গাড়ী করে আমাদের পৌঁছে দিয়ে গেলেন।

ইমাম ছাহেব ও মাওলানা আবুল বাশার দুজনই বললেন, আল্লাহর কত মেহেরবানি! মদীনায় আসার সময় একজন আহলে বাইত আমাদের আপ্যায়ন করেছেন, আর এখন বিদায়ের সময় মদীনার একজন আহলে বাইত আমাদের মেহমানদারি করলেন!

উভয়ের কথা শুনে হৃদয়ের গভীরে কৃতজ্ঞতার, কৃতার্থতার কী অপূর্ব এক তরঙ্গদোলা যে অনুভূত হলো! মনে হলো, এখন শুধু একটাই কামনা থাকতে পারে, মদীনার মাটি যেন আমাদের গ্রহণ করে!

বিদায়-যিয়ারাতের সময় মুখে যখন উচ্চারিত হলো-

আসসালাতু ওয়াস সালামু ইয়া রাসূলাল্লাহ!

আর চোখদুটো অশ্রুসজল হয়ে উঠলো তখন.. হয়ত নিছক মনের কল্পনা, তবু মনে হলো, একটি আওয়ায যেন এলো, মেযবানিতে খুশী হয়েছো! আচ্ছা, এবার খুশী খুশী ফিরে যাও!

সেবার মদীনা থেকে বিদায় গ্রহণের সময়, আশ্চর্য, মনে কোন বিষণ্ণতা ছিলো না! এত আনন্দের, এত শান্তি ও প্রশান্তির, এত তৃপ্তি ও পরিতৃপ্তির যিয়ারাতে মাদীনা সত্যি বলছি, আর কখনো নছীব হয়নি।

তো বলছিলাম, গায়বের ইশারায় এমন অনেক কিছু আমাদের সবার সঙ্গেই হতে থাকে! সালাম পেশ করে বের হলাম, আর কেউ হাতে একটা খেজুর তুলে দিলো। এমন অনেক কিছু হয়, কিন্তু আমাদের খেয়াল হয় না, এটা কি শুধু খেজুর, না অন্য কিছু? আমি যদি ভাবি, তাহলে তো এটা হতে পারে আল্লাহর দান, রওযা শরীফের তোহফা! এই একটুকরো খেজুরের কেমন শোকর আদায় করা কর্তব্য তখন! অথচ আমরা কী করি!

এবার অন্য রকম একটি ঘটনা। অন্য এক সফরে মক্কা থেকে চলেছি মদীনায়। আল্লাহ মাফ করুন, পুরো কাফেলায় কেমন একটা গাফলতের হালাত ছিলো! গাড়ী চলে, আমরা ঝিমুই, কিংবা গল্প করি, দুরূদের কথা যেন ভুলেই গেছি। ইমাম ছাহেব জোরে দুরূদ পড়ে সবাইকে সচেতন করার চেষ্টা করছেন, কিন্তু! কাফেলাটাই যেন সেবার কেমন ছিলো!

দেখতে দেখতে আমাদের গাফলাতের মধ্যেই মাওকিফুল হিজরা এসে গেলো, যেখানে বাস থামে। হাজীদের পাসপোর্ট দেখা হয়, আর খেজুর, ফল, জুস ইত্যাদির সুন্দর একটি প্যাকেট দ্বারা আপ্যায়ন করা হয়।

মদীনা শরীফের মানুষ সত্যি অন্যরকম। কথায়, আচরণে আশ্চর্য বিনয়, আপ্যায়নে অপূর্ব আন্তিরকতা ও অন্তরঙ্গতা। এমনই দেখে এসেছি সবসময়, কিন্তু  সেবার হলো অদ্ভুত ব্যতিক্রম। খাবারের পুরো বাক্স বাসের পাটাতনের উপর ধড়াম করে ফেলে দিয়ে চলে গেলো; ইচ্ছে হলে নিজেরা নিয়ে নিয়ে খাও। আমার স্ত্রী সঙ্গে ছিলেন। মুখে কিছু বললেন ন, কিন্তু বোঝা গেলো, বেশ অবাক হয়েছেন, এত দিন তো অন্যরকম শুনে এসেছেন!

কাফেলার সফরসঙ্গী ছিলেন ভাই পারভেয, সঙ্গে তার স্ত্রী। তিনি খুব ভালো মানুষ, তবে স্বভাবটা গরম। মিনায়, আরাফায়, মুযদালেফায় এবং হারামে দীর্ঘ সাহচর্যে ধীরে ধীরে একটা অন্তরঙ্গতা তৈরী হয়েছে। শুরুতে যে গরমিটা ছিলো, শেষদিকে তা অনেকটা শান্ত হয়ে এসেছিলো। কিন্তু এটা তার পক্ষে সহ্য করা কঠিন হলো। তিনি ছিলেন সামনের আসনে, আর বাক্সটাও ফেলা হয়েছে তার সামনে। বিভিন্নরকম মন্তব্য থেকে বোঝা গেলো, সবারই আত্মসম্মানে বেশ ঘা লেগেছে। আমি তখন বললাম, ভাই সকল! একটু চিন্তা করে দেখুন। আমরা কোথায় চলেছি, আর আমাদের হালাত কী! এক যামানা ছিলো, আশিকানে রাসূল মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হতেন। ভয়ে, ভক্তিতে তাদের বুক দুরু দুরু করতো। যদি কোন বেআদবি হয়ে যায়! যদি মাহরূমি এসে যায়! সারা পথ তারা শুধু দুরূদ পড়তেন, আর নবীপ্রেমের তরঙ্গদোলায়, ভয়ে আনন্দে আন্দোলিত হতেন। সেযুগে তো এমনও ঘটনা আছে যে, নবীর শহরে আদবের সামান্য খেলাফ হয়েছে, আর রাত্রে স্বপ্নযোগে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তুমি আমার শহরে থাকার উপযুক্ত নও, তুমি বের হয়ে যাও।

ভাই, আমরা নিজেদের অবস্থা একটু চিন্তা করে দেখি, কেমন বেহুদা কথাবার্তায় মশগুল, দিলে ফিকির নাই, মুখে দুরূদ নাই। আমরা কি আসলে নবীর শহরে দাখেল হওয়ার উপযুক্ত!

আমি এবং ইমাম ছাহেব বহুবার মদীনা শরীফে এসেছি, কিন্তু এমন ঘটনা কখনো ঘটেনি, যা আজ ঘটলো।

আমার বিশ্বাস, যিনি খাবারের বাক্স এভাবে ফেলে গিয়েছেন তিনি নিজে এটা করেননি। গায়ব থেকে আল্লাহ তাকে দিয়ে করিয়েছেন আমাদের তারবিয়াতের জন্য, আমাদের সতর্ক করার জন্য যে, সাবধান হও। গাফলত তরক করো, নবীর শহরের আদব রক্ষা করে দাখেল হও। অন্যথায় এ পবিত্র শহরে তোমাকে সাদরে গ্রহণ করা হবে না। ...

এধরনের কিছু কথা বললাম এবং আলহামদু লিল্লাহ ভালো আছর হলো। গল্পগুজব বন্ধ হয়ে গেলো। পুরো বাসে দুরূদের সুমধুর গুঞ্জন শুরু হলো।

এটা হলো ছবরের মাধ্যমে তারবিয়াত। এমন অনেক কিছু আমাদের সঙ্গে ঘটে। আমরা ক্রুদ্ধ হই, ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হই, কিন্তু  একবারও ভেবে দেখি না যে, আসলে গায়বের ইশারায় এ ঘটনা আমার সঙ্গে ঘটেছে, যাতে ছবরের মাধ্যমে আমি গায়বের তারবিয়াত গ্রহণ করি, তবেই না হাছিল হবে হজ্বের রূহ ও রূহানিয়াত এবং নূর ও নূরানিয়াত। আল্লাহ আমাদের কবুল করুন, আমীন।

দেখো, কোত্থেকে কোথায় চলে গিয়েছি! এ স্বভাবদুর্বলতা থেকে আমার বুঝি আর মুক্তি নেই! আচ্ছা, ফিরে আসি আগের কথায়।

হঠাৎ দেখি, বাংলাদেশী হাজীদের মধ্যে তোড়জোড় এবং জোড়তোড় শুরু হয়ে গেছে। হলঘর ছেড়ে সবাই পরবর্তী অংশে ছুটে যাচ্ছে রীতিমত ছোটাছুটি করে। শায়খ দাঁড়িয়ে আলিঙ্গন করে আমাকে বিদায় দিলেন। আমিও আমার সম্প্রদায়ের একজন হয়ে উঠি-পড়ি করে দৌড়ে এলাম এবং এসেই বুঝলাম, এর কোন দরকার ছিলো না।

লাইন কবার দাঁড়ালো, আর কবার ভাঙ্গলো, তার হিসাব নেই।

(চলবে ইনশাআল্লাহ)

 

 

advertisement