জুমাদাল উলা-১৪৩২   ||   এপ্রিল-২০১১

পয়লা বৈশাখ : এখন যেমন

মাওলানা শরীফ মুহাম্মাদ

মিরপুর বার নম্বর বাসস্ট্যান্ড থেকে কালশি সাংবাদিক আবাসিক এলাকায় যাচ্ছি। রিকশায় বসে। ছোট্ট একটা প্রয়োজনে একটা দোকানের সামনে থামলাম। আমার সামনে দুজন লোক দাঁড়িয়ে দোকানদারের সঙ্গে কথা বলছেন। পেছন থেকে এক নজর দেখে একজনকে মনে হল, শীর্ণকায় হিন্দু বৃদ্ধ। পাঞ্জাবি, ধূতি পরা। কাছে যেতেই দেখি, সে আসলে এক যুবক। শহুরে হিন্দু যুবকরা এখন আর ধূতি পরে না বলেই এ দৃশ্য দেখে কিছুটা অবাক হলাম। আর সঙ্গে সঙ্গেই লক্ষ্য করলাম, তার গায়ের ধূতিটা আসলে ধূতি নয়, ধূতি-পায়জামা। ধূতির মতোই কুচি, ধূতির মতোই স্ফীত। শুধু ধরে রাখার জন্য মাঝে একটা সেলাই। কথায় ও আচরণে বুঝতে পারলাম, ছেলেটা মুসলিম। ঘটনাটি দু বছর আগের এক পয়লা বৈশাখ সন্ধ্যার।  

দুই.

আর কদিন পরই পয়লা বৈশাখ। সৌরবর্ষ কিংবা বাংলা বর্ষের হিসেবে নববর্ষ। শুরুতে গ্রাম বাংলা ও মফস্বলের হালখাতার এ দিনটি এখন রাজধানীসহ নগরজীবনে বিরাট আয়োজন করে পালিত হয়। চিত্রটি জাঁকালো হয়ে উঠেছে গত দুই-তিন দশকে। পান্তা-ইলিশ, মেলা, চড়ক, বিশেষ রঙের শাড়ি আর বিশেষ ধরনের পাজামা-পাঞ্জাবি পরা মানুষের থৈ থৈ স্রোত নামে রাস্তায়। একদিনের জন্য বাঙ্গালি সাজার একটা ধুম পড়ে যায়। দেখা যায়, বাঙ্গালি সাজার প্রতিযোগিতায় ছুটতে গিয়ে পোশাক-আশাক থেকে নিয়ে জীবন ও আচারের বহু ক্ষেত্রে ভিন্ন সম্প্রদায় ও প্রতিবেশী ধর্মের সংস্কৃতির কাছে আত্মসমর্পণ করতেও পিছপা হয় না নতুন প্রজন্মের মুসলিম নর-নারী। এ যেন এ প্রজন্মের দেশ ও জাতিপ্রেমের নতুন মহড়া। বাংলা সালের শেষ মাস চৈত্রের শেষ দিনে চৈত্র সংক্রান্তি থেকে নিয়ে নববর্ষ উদযাপনের ধাপে ধাপে ভিন্ন ধর্মের প্রতীক ও বিশ্বাস জড়িত আচরণে নিজেদের তারা সঁপে দিচ্ছে। বুঝে না বুঝে।

তিন.

পয়লা বৈশাখে আগে গ্রামগঞ্জে ও মফস্বলে হালখাতা অনুষ্ঠান হত। মুসলিম ব্যবসায়ীরা নতুন হিসাব-নিকাশ শুরু করে দোকানে দুআ করাতেন। হিন্দুরা পূজা-আর্চনা করে মঙ্গলপ্রদীপ জ্বালাতেন। বছরের প্রথম দিনে ব্যবসা-বাণিজ্য ও কাজ শুরুর একটা আনুষ্ঠানিকতা ঘোষিত হত, যার যার রীতিতে। কোনো কোনো গ্রামে হাতে বানানো জিনিসপত্র ও তৈজসপাতি বেচাকেনার হাট বসত। কেউ বেচতে যেত-কেউ কিনতে। নগরজীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে তো দূরের কথা, সব গ্রামেও এ দিনটি নিয়ে তেমন কোনো মাতামাতি হতে দেখা যেত না। প্রধানত ব্যবসা ও দোকানদারির হিসাব শুরু-শেষের সঙ্গেই এর আনুষ্ঠানিকতা আবদ্ধ থাকত। কিন্তু গত দুই দশকে হঠাৎ-   বিস্তৃত গণমাধ্যম ও মুসলিম জাতিসত্তার সঙ্গে বৈরিতাবাদী সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো এ দিনটি বাঙ্গালি সংস্কৃতির ঠিকানা বানাতে উঠে পড়ে লেগেছে। নগরজীবনে হাঁসফাঁস করা মানুষের একটি অংশ উৎসবের গন্ধ পেয়ে এ দিনটিতে পথে নামতে শুরু করেছে।

পরাণুকরণবাদী সুশীল, সংস্কৃতিকর্মী ও শেকড়ভুলা বাজারবাদী প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক গণমাধ্যমের সুবাদে এ মিথ্যাটাই প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে যে, বাংলা বছরের পয়লা দিনটিকে উৎসব করে কাটাতে হবে হিন্দুয়ানী তথাকথিত বাঙ্গালি সংস্কৃতির অনুষঙ্গগুলো আপন করে নিয়ে। এটাই বাঙ্গালি জাতির আবহমান কালের সংস্কৃতি। মুসলিম জাতিত্ব ও ইসলামের বৈশিষ্ট্য, বিধিবিধান ও রুচিবোধের কোনো প্রশ্ন এখানে উঠানো যাবে না। এখন বাঙ্গালি নাম দিলেই হলো, কোনো আচরণ ও অনুষ্ঠানে নিজেদের সঁপে দিতে ঢাকা মহানগরীর একটি অংশের মানুষের আর কোনো আপত্তি নেই।

চার.

আরেকটি বিষয় এখানে বড়। সেটি হচ্ছে, অনুষ্ঠান ও উৎসব-প্রবণতা এবং এর সঙ্গে হুজুগ। এই উপাদানটা যেখানে যেখানে পাওয়া যায় সেখানেও এদেশের গণমাধ্যমের ভূমিকাও থাকে বাতাস দেওয়া। এতে ষোলকলা পুরা হয়। গত দুই দশক ধরে এ অবস্থাটাই দেখা যাচ্ছে। শুধু পয়লা বৈশাখের মাতামাতির মধ্যে  চোখ আটকে রাখলে বিষয়টা বুঝতে সমস্যা হবে। একটু অন্যদিকেও চোখ ফেরানো যাক।

এদেশে কি ৩১ ডিসেম্বর রাত বারটার পর কোনো অনুষ্ঠানের রেওয়াজ ছিল বিশ বছর আগে? ছিল না। মিডিয়াও সেটি নিয়ে কোনো ভূমিকা তখন রাখেনি। হঠাৎ মহানগরীর কোনো কোনো অভিজাত এলাকায় থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপনের খবর প্রচার হল। মিডিয়া দিল আরও বাতাস। শুরু হল প্রস্ত্ততি। বিশ্ব বিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে নিয়ে সারাদেশে এ রাতটি সরগরম হয়ে উঠল। মনে হতে থাকল এটাই এ জাতির গুরুত্বপূর্ণ সংস্কৃতি। ইদানীং অবশ্য উন্মাদনা বেড়ে যাওয়ায় কিছু নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে।

চৌদ্দই ফেব্রুয়ারি তথাকথিত ভালবাসা দিবসের কথা কি এ দেশে কেউ জানত? জানত না এবং কেউ ঘুণাক্ষরেও এ দিনটি নিয়ে কিছু ভাবত না। মিডিয়া বাতাস দিল। তরুণ-তরুণীদের গায়ে আগুন লেগে গেল। দেশব্যাপী এটা এমনভাবে পালিত হতে লাগল যে, মনে হতেই পারে-এটা এদেশের আবহমান কালের একটি সংস্কৃতি। এখন খুবই লজ্জা লাগে, এ দিনটি উপলক্ষে যখন অপরাপর বহু জিনিসের সঙ্গে বিশেষ ধরনের কনডমের বিজ্ঞাপনও পত্রিকার পাতায় চোখে পড়ে।

ফুটবল বিশ্বকাপ আর ক্রিকেট বিশ্বকাপের কথাই ধরুন। এমন হুজুগ আর মাতোয়ারা অবস্থা এদেশে ইদানীং তৈরি হয় যে, মনে হতে থাকে দেশবাসীর সামনে আর কোনো সমস্যাই নেই। ভাবা ও করার মতো কোনো কাজই বাকি নেই। এটাই সবার আচার-অনুষ্ঠান। এটাই সবার ধ্যান-জ্ঞান। তাহলে এসবও কি এদেশের সংস্কৃতির অঙ্গ?

পাঁচ.

হুজুগ পেয়ে গেলেই যে কোনো আচার-অনুষ্ঠান ও ইস্যুকে জোর করে সার্বজনীনতা দেওয়া বাংলাদেশের প্রভাবশালী মিডিয়ার একটি অভ্যাস হয়ে গেছে। এ কারণে তারা এসব হুজুগে ইস্যুকে দেশপ্রেম ও জাতির প্রতি বিশ্বস্ততার মাপকাঠি বানিয়ে ছাড়ে। পয়লা বৈশাখের কথাই বলুন, ক্রিকেট বিশ্বকাপের কথাই বলুন, এখানে কেউ স্রোতের উল্টা কিংবা নিস্পৃহ থাকলে তাকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হতে থাকে। ভাবখানা এমন যে, এই স্রোতে ভাসলেই তিনি দেশপ্রেমের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ, উল্টোটা হলে তার মাঝে দেশপ্রেম নেই, সে দেশের শত্রু।

সৈয়দ আবুল মকসুদ একজন সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত। ১৪১৩ সালের দৈনিক সমকাল-এর ১ বৈশাখের ক্রোড়পত্রে তার ছাপা হওয়া একটি লেখার অংশ উদ্ধৃত করছি।

আমি আমার নিজের শৈশব ও কৈশোরের পহেলা বৈশাখকে যেভাবে দেখেছি, আজকের পহেলা বৈশাখ উদযাপনের সঙ্গে সেই নববর্ষ উৎসবের কোনো মিলই নেই। তখনকার নববর্ষের উৎসবের মধ্যে ছিল অকৃত্রিম প্রাণের আমেজ, তাতে ন্যূনতম কৃত্রিমতা ছিল না, আয়োজনে বিন্দুমাত্র মেকি বা লোক দেখানো বিষয় ছিল না। যা করা হত, তা হতো স্বতঃস্ফূর্তভাবে, প্রাণের আনন্দে ও অকৃত্রিম জাতীয়তাবাদী আবেগে।

আজ আমরা কি দেখতে পাচ্ছি? পহেলা বৈশাখের সকালে ঘটা করে রাস্তার মধ্যে দাঁড়িয়ে খুব বিত্তবান ঘরের মানুষ মাটির শানকিতে পান্তাভাত, খাট্টা ডাল, ইলিশ মাছের ঝোল, মুড়িঘণ্ট, খেজুর গুড়ের ক্ষীর হাপুস-হুপুস করে খাচ্ছে। এই যে রেওয়াজ শুরু হয়েছে, এটি মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণীর প্রবর্তিত আয়োজন। এ জাতীয় জিনিস পহেলা বৈশাখে নববর্ষের চিরকালের চেতনা বিরোধী। কারণ এ সমাজের পঞ্চাশ শতাংশ মানুষ খুবই দরিদ্র, তারা ক্ষুধার জ্বালায় পান্তাভাত, পঁচাডাল ও অখাদ্য জাতীয় জিনিস যা পায় প্রতিদিন তা-ই খায়। রাস্তায় দাঁড়িয়ে পান্তাভাত আর ইলিশের তরকারি, মুড়িঘণ্ট যারা খায়, তারা বস্ত্তত এক ধরনের সাংস্কৃতিক অপরাধ করে। এসব আচরণের মাধ্যমে তারা আসলে দেশের অগণিত দরিদ্র মানুষকে পরিহাস করে।

পয়লা বৈশাখের বর্তমান রেওয়াজ ও মাতামাতি সম্পর্কে এ কথাগুলো কোনো মাওলানা সাহেবের বলা নয়। কথাগুলো যিনি লিখেছেন, তিনি কথিত বাঙ্গালি সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেকে একাত্ম মনে করেন। তারপরও সত্য স্বীকার করে তিনি কথাগুলো লিখতে বাধ্য হয়েছেন।

ছয়.

পয়লা বৈশাখের কথা আসলেই অবধারিতভাবে আসে সংস্কৃতির কথা। স্থানীয় সংস্কৃতির সূত্র ধরে জোরটা দেওয়া হয় বাঙ্গালি সংস্কৃতির ওপর। আর বাঙ্গালি সংস্কৃতির উপাদান হিসেবে সামনে আনা হয় হিন্দু ধর্মীয় বিভিন্ন প্রতীক ও আচার-অনুষ্ঠান। একই সঙ্গে উপরের সূত্র ও নীতি অনুসরণ করে পয়লা বৈশাখ উদযাপন করা -না করার প্রস্ত্ততিকে চিহ্নিত করা হয় জাতীয়তার মিত্রতা ও শত্রুতা হিসেবে। এভাবে হিন্দুয়ানী সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরার জন্য একটা প্রবল ও গভীর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করা হয় এদেশের সব স্তরের মুসলিম নাগরিকদের ওপর।

প্রশ্ন হচ্ছে, এক্ষেত্রে আসলে মুসলমানদের করণীয় কী? স্থানীয় সংস্কৃতির নামে অপর ধর্মের বৈশিষ্ট্য ও প্রতীকসহ যে কোনো উৎসব ও অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কোনো সুযোগ কি ইসলামে আছে? ইসলাম যে অঞ্চলে বিস্তার লাভ করে, সেখানকার ভালোমন্দ সব সংস্কৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়ার অনুমতি কি তার অনুসারীদের দেয়? হাদীস শরীফের ভাষ্য, সাহাবায়ে কেরামের আমল এবং ইসলাম বিস্তারের দীর্ঘ হাজার বছরের ইতিহাস থেকে যে সত্যটি ফুটে ওঠে সেটি হচ্ছে, বিশ্বাস, ইবাদত ও জীবনাচারের মৌলিক বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে ইসলাম যে পয়গাম নিয়ে এসেছে সে ব্যাপারে ইসলাম আপসহীন। জীবনাচারের মৌলিক বিষয়ে ইসলাম তার সুনীতি ও শুদ্ধির দীক্ষা দিয়ে কখনো কখনো সেসবের অনুষঙ্গগুলো স্থানীয় সংস্কৃতির ওপর ছেড়ে দেয়। মৌলিক বিষয়ে মিশে যাওয়া ও একাত্ম হওয়ার নীতি ইসলামে থাকতে পারে না। কারণ দূষণ দূর করে শুদ্ধতা আনাই ইসলামের কাজ। এ কারণেই অপর ধর্মের সঙ্গে ওৎপ্রোতভাবে জড়িত ও অপর ধর্মের পরিচায়ক কোনো বৈশিষ্ট্যকেও আপন করে নেওয়ার অনুমতি ইসলাম মুসলমানদেরকে দেয় না।

পশু জবাই করার ইসলামী নীতি অনুসৃত হওয়ার পর সে পশুর গোশত ভুনা করে নাকি ঝোল করে নাকি কাবাব করে খেতে হবে-এ বিষয়ে ইসলামের কোনো চাপ নেই। স্থানীয় মানুষের রুচি ও সুবিধার ওপর তা ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। মাছের তরকারির ধরণ কী হবে, তাজা হবে নাকি শুটকি হবে, হালাল জিনিস দিয়ে বানানো রুটি বা পিঠার ধরণ কী হবে, মিষ্টি হবে নাকি ঝাল হবে-এ ব্যাপারে স্থানীয় সংস্কৃতি অনুসরণে কোনো বাধা নেই। তবে খাদ্য হালাল হওয়া, অপচয় না করা, খাওয়ার আদব ও সুন্নত পদ্ধতি বজায় রাখা নিয়ে ইসলামের নির্দেশনা ও প্রেরণা আছে। একইভাবে পোশাকের ক্ষেত্রেও নারী ও পুরুষের পোশাকের ইসলামী নীতি ও বিধান অনুসৃত হওয়ার পর তা মোটা হলো, না পাতলা হলো, তা এ দেশীয় কাপড়ে হলো না ভিনদেশি কাপড়ে হল তাতে ইসলামের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। পোশাকের সীমা ও নীতি, আবরণ ও শালীনতা বজায় থাকার পর বাকি বিষয়গুলোতে স্থানীয়দের সুবিধা ও রুচি প্রয়োগের স্বাধীনতা দিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এভাবেই মুসলমানের জীবনাচারের সবক্ষেত্রে মৌলিক নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে ইসলামেরই। এক্ষেত্রে স্থান-কাল-ভাষা ও সংস্কৃতির কোনো কুহক দিয়ে ইসলামী নীতি ও চেতনাকে আহত করার অধিকার কোনো মুসলমান রাখেন না। সে হিসেবে পয়লা বৈশাখই হোক, আর অপর কোনো উৎসবই হোক, যদি তাতে ইসলামের নির্দেশনা অনুসৃত হওয়ার পরিবর্তে বিপরীত কোনো বৈশিষ্ট্যকে অনুসরণ করা হয় তবে তাতে যুক্ত হওয়ার ও সমর্থন দেওয়ার সুযোগ মুসলমানের নেই। বাংলাদেশী মুসলমানদের আচার-অনুষ্ঠান হিসেবে সাব্যস্ত করা বা চাপিয়ে দেওয়ার জন্য বাঙ্গালি সংস্কৃতি একক ও প্রধান কোনো তত্ত্ব হতে পারে না।  সেটা ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিংবা সামঞ্জস্যশীল কি না অবশ্যই দেখতে হবে। কারণ এভাবে কেবল বাঙ্গালি সংস্কৃতির কথা বললে তো বলতে হবে-মন্দিরে গিয়ে পূজা করাও বাঙ্গালি সংস্কৃতি, উলুধ্বনি-কাশর ধ্বনিও বাঙ্গালি সংস্কৃতি, মঙ্গল প্রদীপ, সিঁথির সিঁদুর, পুণ্যার্থে গঙ্গাস্নান, গোমূত্রে পবিত্রকরণ-সবই বাঙ্গালি সংস্কৃতি। ওই অর্থে ধূতি পরা, পৈতা লাগানো, শাঁখা ব্যবহারও বাঙ্গালি সংস্কৃতি। এগুলো কি তাহলে বাঙ্গালি সংস্কৃতি  হওয়ার কারণে বাংলাদেশের মুসলমানদেরও অনুসরণ করতে হবে?

মনে রাখা দরকার, কোনো মুসলমান যদি সচেতনভাবে শিরকের প্রতীকযুক্ত কোনো উৎসবে মুগ্ধ হয়ে যোগ দেয় তাহলে তার জন্য সেটা শিরিকে লিপ্ত হওয়ার গোনাহ হবে। আর কোনো কিছু না বুঝে হেলাফেলা করে এসবে জড়িত হলে অবশ্যই ফিসক-ফুজুরের সে মুরতাকিব হবে।

হুজুগের অথৈ পাঁকে ডুবে না গিয়ে আত্মসচেতন মুসলমান হিসেবে এসব বিষয়ে একটু ভাবার চেষ্টা করা সবার দায়িত্ব।

সাত.

জুমআর নামাযে দাঁড়াবো। কাতার ঠিক করছি। এ সময় সামনের কাতারের এক যুবকের পায়জামার কুচির দিকে চোখ পড়ল। প্রথমে মনে হল, মেয়েদের পায়জামা বা সেলোয়ার পরে সে মসজিদে চলে এসেছে। পরেই লক্ষ্য করলাম, তার পায়জামার পুরোটা জুড়েই কুচি। একটা পয়েন্ট থেকে চারদিকে ভাঁজ ভাঁজ করে কাপড় ছড়িয়ে আছে। হঠাৎ মনে হল এটাতো দেখা যাচ্ছে, সেই সেলাই করা ধূতি। এরপর ঠিক আমার সামনে দাঁড়িয়ে ধূতি পরে এক মুসলিম যুবক জমুআ আদায় করল। যথারীতি নামাযের পর নিষ্ঠার সঙ্গে সে দুআ করল। সুন্নত পড়ল। তারপর মসজিদ থেকে ধীরে সুস্থে বের হল। মুসল্লী হিসেবে নিষ্ঠার কোনো কমতি তার নেই। আবার ধূতি পরা নিয়ে তার মাঝে কোনো সংকোচ বা জড়তাও নেই।

ঘটনা এই চৈত্রের।

গত দু বছরে এরকম ধূতি-পায়জামা আরো দু-চারবার দেখেছি। তখন ততোটা চোখে বিঁধেনি। দেখেছি, রাস্তায়, দূর থেকে। কেমন তরুণ, কতোটা সচেতন কিংবা কী পরিমাণ ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলে জানা ছিল না তখন। রাস্তাঘাটে চোখে পড়া বহু অনভিপ্রেত দৃশ্যের মতো সেটাও ছিল গা-সওয়া। কিন্তু জুমআর নামাযে ধূতি-পায়জামা পরে আসা এই যুবককে দেখে প্রচন্ড হোচট খেলাম।

আট.

এ প্রসঙ্গে দুটি বিষয় আমরা স্মরণ রাখতে পারি এবং দুটি কাজ করতে পারি। এক. বাংলা. হিজরী, ঈসায়ী যে কোনো বছরের শুরুতে, বা শুরুর দিনে বিগত বছরের ভুলত্রুটি, গোনাহ খাতার জন্য তাওবা-ইস্তেগফার করতে পারি। সামনের বছরটিতে দ্বীনী ও পার্থিব সব কাজের মঙ্গলের জন্য, সব ক্ষেত্রে খায়র-বারাকাতের জন্য ব্যক্তিগতভাবে দুআ করতে পারি। ভালো নিয়্যত ও প্রত্যয়  গ্রহণ করতে পারি। এ কাজটি আমরা প্রতি মাসে, প্রতি সপ্তাহে, এমনকি প্রতিদিনও করতে পারি। মূলত কেবল বছর বছর নয়, কাজটি দৈনিক ভিত্তিতে করাই আমাদের জন্য কল্যাণকর। সময়ের ভাগটাকে গুরুত্ব না দিয়ে, আনুষ্ঠানিকতা ও উৎসব প্রবণতাকে এড়িয়ে আমরা জীবনের শুদ্ধ ও কল্যাণযাত্রার প্রতিজ্ঞা  যে কোনো সময়ই করতে পারি।

দুই. সংস্কৃতির নামে জীবনাচার, অনুষ্ঠান, পর্ব ও উৎসবের যেসব ক্ষেত্রে ঐতিহ্যগতভাবে অথবা পরিকল্পিতভাবে অপর ধর্মের বৈশিষ্ট্যের উপস্থিতি থাকবে, সেসব ক্ষেত্র থেকে মুসলিম হিসেবে নিজেদের সরিয়ে রাখা। অপর ধর্মের অনুসারীদের জন্য তাদের সংস্কৃতির অংশ হিসেবে সেটা তাদের কাছে গ্রহণীয় হতেই পারে, সেখানে বিরোধের কিছু নেই। কিন্তু কিছুতেই সেটিকে বাংলাদেশের সর্বজনগ্রাহ্য বা সার্বজনীন সংস্কৃতি মনে করে তার সঙ্গে মুসলমানরা একত্রিত হতে পারেন না। এতদঞ্চলের ধর্মীয় বৈশিষ্ট্য সংবলিত কোনো সংস্কৃতি আঞ্চলিক ও দেশীয় পরিমন্ডলে সার্বজনীন সংস্কৃতি হিসেবে সাব্যস্ত হতে পারে না। সেটি সবার জন্য অনুসরণীয়ও হতে পারে না। সে সংস্কৃতি সংশ্লিষ্ট ধর্মানুসারীদের সংস্কৃতি হিসেবেই গণ্য হতে পারে। এ জাতীয় সংস্কৃতি সার্বজনীন নয়, বিভাজিত সংস্কৃতিরূপে সাব্যস্ত হতে পারে। কখনো সংখ্যাগুরুদের সংস্কৃতি, কখনো সংখ্যালঘুদের সংস্কৃতি। এ সংস্কৃতি কখনো সার্বজনীন বাংলাদেশী সংস্কৃতি হিসেবে গণ্য হতে পারে না। তবে এর সঙ্গেও থাকতে পারে সহাবস্থান ও সৌহার্দ্য। চাকমা, মগ, গারোদের বহু সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আমরা যেমন দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মপন্থা অনুসরণ করে থাকি, ঠিক তেমনি। তাদেরটা তারা করুন, কোনো সমস্যা নেই। সেটা আমাদেরও করতে হবে কেন? জুমআর নামাযে দাঁড়িয়ে সামনের কাতারে ধূতি-পায়জামা পরা মুসল্লী দেখার আগ্রহ তো আমাদের থাকার কথা নয়।

 

 

advertisement