যিলক্বদ ১৪৩০ . নভেম্বর ২০০৯

পুরোনো সংখ্যা . বর্ষ: ৫ . সংখ্যা: ১১

হজ্জ্বঃ হাদীস ও আছারের আলোকে

হজ্ব তিন প্রকার : তামাত্তু, কিরান ও ইফরাদ।

মক্কার বাইরে অবস্থানকারী ব্যক্তিরা উপরোক্ত যেকোনো প্রকার হজ্ব করতে পারেন। এতে তাদের ফরয হজ্ব আদায় হবে। তবে উপরোক্ত তিন প্রকার হজ্বের মধ্যে সর্বোত্তম হল হজ্বে কিরান, এরপর হজ্বে তামাত্তু, এরপর হজ্বে ইফরাদ। নিচে প্রতিটির পরিচয় ও জরুরি মাসাইল উল্লেখ করা হল।

এক. কিরান

মীকাত অতিক্রমের পূর্বে উমরা ও হজ্বের ইহরাম বেঁধে একই ইহরামে উমরাহ ও হজ্ব উভয়টি আদায় করা। প্রথমে মক্কা মুকাররামা পৌঁছে উমরা করা অতঃপর এই ইহরাম দ্বারা হজ্বের সময়ে হজ্ব করা এবং কুরবানী দেওয়া।

দুই. তামাত্তু হজ্ব

হজ্বের মাসসমূহে মীকাত থেকে শুধু উমরার নিয়তে ইহরাম বাঁধা এবং মক্কা মুকাররামায় পৌঁছে উমরার কাজ সম্পন্ন করার পর চুল কেটে বা চেঁছে ইহরামমুক্ত হয়ে যাওয়া। অতঃপর এই সফরেই হজ্বের ইহরাম বেঁধে হজ্বের নির্ধারিত কাজগুলো সম্পন্ন করা এবং কুরবানী দেওয়া।

তিন. ইফরাদ

মীকাত থেকে শুধু হজ্বের নিয়তে ইহরাম বাঁধা এবং মক্কা মুকাররামা পৌঁছে উমরা না করা বরং (সুন্নত তাওয়াফ) তাওয়াফে কুদূম করে ইহরাম অবস্থায় হজ্বের জন্য অপেক্ষা করতে থাকা। অতঃপর নির্ধারিত সময়ে হজ্বের আমলগুলো সম্পন্ন করা। উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা রা. বলেন, বিদায় হজ্বে আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে রওনা হলাম। আমাদের মধ্যে কেউ (তামাত্তুর নিয়তে প্রথমে) উমরার জন্য তালবিয়া পাঠ করলেন, কেউ (কিরানের নিয়তে) হজ্ব ও উমরার জন্য তালবিয়া পাঠ করলেন এবং কেউ (ইফরাদের নিয়তে) শুধু হজ্বের ইহরাম গ্রহণ করলেন। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজ্বে ইফরাদের জন্য তালবিয়া পাঠ করলেন। যারা শুধু হজ্ব বা একত্রে হজ্ব-উমরার (কিরানের) ইহরাম গ্রহণ করেছিলেন তারা ১০ যিলহজ্বের পূর্ব পর্যন্ত- ইহরাম থেকে মুক্ত হননি।-সহীহ বুখারী ১/২১২

ইহরামের নিয়ম

ইহরামের মূল বিষয় হচ্ছে হজ্ব বা উমরার নিয়তে তালবিয়া পাঠ। এর দ্বারাই ইহরাম সম্পন্ন হয়ে যায়। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মাথায় সিঁথি করা অবস্থায় ইহরামের তালবিয়া পাঠ করতে দেখেছি। তিনি বলেছেন, এই বাক্যগুলোর অতিরিক্ত কিছু বলেননি।-সহীহ মুসলিম ১/৩৭৬

তবে ইহরাম গ্রহণের সুন্নত তরীকা হল মোচ, নখ এবং শরীরের পরিষ্কারযোগ্য লোম চেঁছে বা কেটে পরিষ্কার করবে। উত্তমরূপে গোসল করবে, গোসল সম্ভব না হলে ওযু করবে। পুরুষগণ দু’টি নতুন বা ধৌত সাদা চাদর নিবে। একটি লুঙ্গির মতো করে পরবে। অপরটি চাদর হিসাবে ব্যবহার করবে। পায়ের পাতার উপরের অংশ খোলা থাকে এমন চপ্পল বা স্যাণ্ডেল পরবে। মহিলাগণ স্বাভাবিক কাপড় পরবে। তাদের জন্য ইহরাম অবস্থায় জুতা-মোজা পরার অবকাশ রয়েছে। ইহরাম বাঁধার আগে খালি শরীরে আতর বা সুগন্ধি ব্যবহার করা মুস্তাহাব। শরীরের আতর বা ঘ্রাণ ইহরাম গ্রহণের পর বাকি থাকলেও অসুবিধা নেই। তবে ইহরামের কাপড়ে আতর বা সুগন্ধি লাগাবে না। কেননা ইহরামের কাপড়ে এমন আতর বা সুগন্ধি লাগানো নিষেধ, যার ঘ্রাণ ইহরামের পরও বাকি থাকে। মাকরূহ ওয়াক্ত না হলে ইহরাম বাঁধার আগে দুই রাকাত নফল নামায পড়বে। অতঃপর যে হজ্ব আদায়ের ইচ্ছা সে অনুযায়ী নিয়ত করে তালবিয়া পাঠ করবে।

নিচে ইহরামের প্রতিটি বিষয় দলীলসহ আলোচনা করা হল

১. মোচ, নখ এবং শরীরের পরিষ্কারযোগ্য লোম চেঁছে বা কেটে পরিষ্কার করা। যে ব্যক্তি হজ্বে যেতে চায় তার শরীরের ক্ষৌর কার্য সম্পর্কে বিখ্যাত তাবেয়ী হযরত আতা রাহ.কে জিজ্ঞাসা করা হল। তিনি বললেন, এর অনুমতি আছে, এতে কোনো অসুবিধা নেই।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪৯৯৮

২. ইহরামের উদ্দেশ্যে উত্তমরূপে গোসল করা। হযরত যায়েদ বিন ছাবেত রা. থেকে বর্ণিত, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ইহরামের জন্য পরিহিত পোশাক খুলতে এবং গোসল করতে দেখেছেন।-জামে তিরমিযী ১/১০২ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, কোনো ব্যক্তি যখন ইহরাম বাঁধার ইচ্ছা করবে তখন তার জন্য গোসল করা সুন্নত।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫৮৪৭ গোসল সম্ভব না হলে ওযু করে নেওয়া। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি উমরার জন্য অযু করলেন, গোসল করলেন না।- মাসআলা : ঋতুমতী মহিলার জন্য ইহরামের আগে গোসল করা মুস্তাহাব।-গুনইয়াতুন নাসিক পৃ. ৬৯ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, কোনো নারী হায়েয বা নেফাস অবস্থায় মীকাতে পৌঁছলে গোসল করবে এবং ইহরাম গ্রহণ করবে। অতঃপর হজ্বের যাবতীয় কাজ করতে থাকবে। শুধু বাইতুল্লাহর তাওয়াফ ব্যতীত।-সুনানে আবু দাউদ ১/২৪৩

৩. পুরুষদের দু’টি সাদা চাদর প্রয়োজন হবে, যা নতুনও হতে পারে কিংবা ধোয়াও হতে পারে। একটি লুঙ্গির মতো করে এবং অপরটি চাদর হিসাবে পরিধান করবে। কালো রংয়ের কিংবা পুরুষের জন্য অনুমোদিত এমন যেকোনো রংয়ের কাপড় পরিধান করাও জায়েয। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণ চুল আঁচড়ালেন, তেল লাগালেন এবং লুঙ্গি ও চাদর পরিধান করে মদীনা থেকে হজ্বের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। তিনি জাফরানযুক্ত ব্যতীত অন্য কোনো চাদর ও লুঙ্গি পরতে নিষেধ করেননি।-সহীহ বুখারী ১/২০৯

৪. পায়ের পাতার উপরের উঁচু অংশ খোলা থাকে এমন চপ্পল বা স্যান্ডেল পরা যাবে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা লুঙ্গি, চাদর ও চপ্পল পরে ইহরাম গ্রহণ কর। যদি চপ্পল না থাকে তবে চামড়ার মোজা পায়ের গীরার নিচ পর্যন- কেটে তা ব্যবহার করতে পারবে।-মুসনাদে আহমদ হাদীস : ৪৮৮১

৫. মহিলাগণ স্বাভাবিক পোষাক পরবে। উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা রা. বলেন, মাসআলা : মহিলাগণ ইহরাম অবস্থায় নিজ অভিরুচি মাফিক পোষাক পরিধান করতে পারবে।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪৪৩ মাসআলা : মহিলাগণ ইহরাম অবস্থায় জুতা-মোজা ব্যবহার করতে পারবে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. মহিলাদেরকে ইহরাম অবস্থায় চামড়ার মোজা এবং পাজামা পরার অনুমতি দিতেন। তিনি বলেন, ছফিয়্যা রা. চামড়ার মোজা পরিধান করতেন, যা ছিল তাঁর হাটু পর্যন-।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫৯৬৯ আরো দেখুন : হাদীস : ১৫৯৬৫ মহিলাগণ হাত মোজা ব্যবহার করতে পারবে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, মহিলাগণ ইহরাম অবস্থায় হাত মোজা এবং পাজামা পরিধান করতে পারবে।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪৪৪০ বিখ্যাত তাবেয়ী কাসিম ইবনে মুহাম্মাদ রাহ. বলেন, ইহরাম গ্রহণকারিনী হাত-মোজা ও পাজামা পরিধান করবে এবং পূর্ণ মুখমণ্ডল আবৃত রাখবে।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫৯৬৮ তবে হাত মোজার বিষয়ে দুই ধরনের দলীল বিদ্যমান থাকায় কেউ কেউ তা পরিধান না করা উত্তম বলেছেন।

৬. ইহরাম গ্রহণের আগে খালি শরীরে আতর বা সুগন্ধি ব্যবহার করা মুস-াহাব। শরীরের আতর ও ঘ্রাণ যদি ইহরাম বাঁধার পর অবশিষ্ট থাকে তবুও কোনো অসুবিধা নেই। উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহরাম গ্রহণের সময় তাঁর সর্বাধিক উত্তম সুগন্ধিটি ব্যবহার করতেন। তিনি বলেন, ইহরাম বাঁধার পর তাঁর শ্মশ্রু ও শির মোবারকে তেলের ঔজ্জ্বল্য দেখতে পেতাম।-সহীহ মুসলিম ১/৩৭৮ মাসআলা : ইহরামের কাপড়ে আতর বা সুগন্ধি লাগাবে না। কেননা ইহরামের কাপড়ে এমনভাবে আতর বা সুগন্ধি লাগানো নিষেধ যা ইহরামের পরও অবশিষ্ট থাকে।-রদ্দুল মুহতার ২/৪৮৯; গুনইয়াতুন নাসিক পৃ. ৭০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২২২; মানাসিক মোল্লা আলী কারী পৃ. ৯৮ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তোমরা (ইহরাম অবস'ায়) এমন কোনো কাপড় পরিধান করবে না যা জাফরান বা ওয়ারসযুক্ত।-সহীহ মুসলিম ১/৩৭২

৭. মাকরূহ ওয়াক্ত না হলে ইহরাম গ্রহণের পূর্বে দুই রাকাত নফল নামায পড়া।-গুনইয়াতুন নাসিক ৭৩; মানাসিক মোল্লা আলী কারী পৃ. ৯৯; রদ্দুল মুহতার ২/৪৮২ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজ্বের উদ্দেশ্যে মদীনা থেকে রওনা হয়ে যুলহুলাইফাতে পৌঁছলেন এবং দুই রাকাত নামায পড়লেন। অতঃপর যুলহুলাইফার নিকট যখন উটনী তাঁকে নিয়ে উঠে দাঁড়াল তখন তিনি তালবিয়া পাঠ করলেন ...।-সহীহ মুসলিম ১/৩৭৬

৮. নিয়ত : (পুরুষ হলে টুপি বা মাথার কাপড় খুলে ফেলতে হবে) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, মুখমণ্ডল ও তার উপরের অংশ মাথার অন-র্ভুক্ত। অতএব ইহরাম গ্রহণকারী থুতনী থেকে উপরের কোনো অংশ আবৃত করবে না।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪৪৫২ মাসআলা : তামাত্তুকারী শুধু উমরার নিয়ত করবে, ইফরাদকারী শুধু হজ্বের নিয়ত এবং কিরানকারী হজ্ব ও উমরার নিয়ত করে তালবিয়া পাঠ করবে। উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা রা. বলেন, আমরা বিদায় হজ্বে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে বের হলাম। আমাদের মধ্যে কেউ শুধু উমরার উদ্দেশ্যে তালবিয়া পাঠ করলেন, কেউ হজ্ব-উমরা দু’টোর উদ্দেশ্যে এবং কেউ শুধু হজ্বের উদ্দেশ্যে তালবিয়া পাঠ করলেন।-সহীহ মুসলিম ১/২১২ মাসআলা : পুরুষ উচ্চ স্বরে তালবিয়া পাঠ করবে এবং মহিলাগণ নিম্নস্বরে।-মানাসিক পৃ. ১০০, গুনইয়াতুন নাসিক পৃ. ৭৪, আদ্দুররুল মুখতার পৃ. ৪৮৪ সাইব ইবনে ইয়াযিদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার নিকটে জিবরাইল আ. এলেন এবং বললেন, আমি যেন আমার সাহাবীদেরকে উচ্চস্বরে তালবিয়া পাঠের নির্দেশ দেই।-জামে তিরমিযী ১/১৭১ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, মহিলাগণ উচ্চস্বরে তালবিয়া পাঠ করবে না।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪৮৮২

তালবিয়া আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তালবিয়া এই-লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক লাব্বাইক লা শারীকা লাকা লাব্বাইক ইন্নাল হামদা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুলক লা শারীকা লাক।-সহীহ মুসলিম ১/১৭৫ মাসআলা : পূর্ণ তালবিয়া পাঠ করতে হবে। এর কিছু অংশ ছেড়ে দেওয়াও মাকরূহ।-মানাসিক পৃ. ১০২, আদ্দুররুল মুখতার ২/৪৮৪, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১২৩

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, তালবিয়া শেষ পর্যন- পাঠ কর। কেননা এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তালবিয়া।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৩৬৩৮ মাসআলা : তালবিয়ার উক্ত দুআর স'লে সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, কালিমা তাইয়্যিবা বা কোনো জিকির পাঠ করলেও ইহরাম সম্পন্ন হবে। কিন' তালবিয়া ছাড়া অন্য কিছু পাঠ করা মাকরূহ। তাই তালবিয়া পাঠ একান- অসম্ভব হলে আল্লাহ তাআলার কোনো জিকিরের মাধ্যমে ইহরাম গ্রহণ করবে।-মানাসিক ১০২, গুনয়াতুন নাসিক ৭৬, আদ্দুররুল মুখতার ২/৪৮৩ বিখ্যাত তাবেয়ী হযরত তাউস রাহ.কে জিজ্ঞাসা করা হল যে, এক ব্যক্তি ‘তালবিয়া’র স'লে ‘আল্লাহু আকবার’ বলেছে। তিনি বললেন, তার ইহরাম সম্পন্ন হয়েছে।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪৯৩৫

মাসআলা : মহিলাগণ ইহরাম অবস্থায় হাত-মোজা ও পা-মোজা ব্যবহার করতে পারবে। তবে হাত-মোজার বিষয়ে দু’ধরনের দলীল বিদ্যমান থাকায় কেউ কেউ হাত মোজা পরিধান না করাকে উত্তম বলেছেন। -আল ইসতিযকার ১১/৩০; সুনানে আবু দাউদ ২/২৫৪; আত্তারগীব ওয়াত তারহীব ৪/৪৭৭; ইলাউস সুনান ১০/৪৮; আলবাহরুর রায়েক ২/২২৩; বাদায়ে ২/৪১০; ফাতহুল মুলহিম ৩/২০৪; মানাসিক ১১৬; গুনইয়াতুন নাসিক -৭৪; ফাতাওয়া খানিয়া -১/২৮৪; আহকামে হজ্ব ৩৫

মাসআলা : মহিলাগণ ওযর অবস্থায় অর্থাৎ মাসিক ঋতুস্রাব, সন্তান প্রসবোত্তর স্রাব ইত্যাদি থাকলেও তালবিয়া পাঠ ও ইহরাম গ্রহণ করতে পারবে। হজ্বের অন্যান্য কাজও করা যাবে। তবে এ অবস্থায় তাওয়াফ করা ও নামায পড়া জায়েয নয়। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মহিলাগণ হায়েয বা নেফাস অবস্থায় মীকাতে এলে গোসল করবে এবং ইহরাম গ্রহণ করবে। অতঃপর হজ্বের আমলসমূহ সম্পন্ন করবে শুধু তওয়াফ ব্যতীত।-সুনানে আবু দাউদ ১/২৪৩ মাসআলা : ইহরামের হালতেও মহিলাদের জন্য পরপুরুষের সামনে চেহারা খোলা নিষেধ। তাই এ অবস্থায় এমনভাবে চেহারা আবৃত রাখা জরুরি যাতে মুখমণ্ডলের সঙ্গে কাপড় লেগে না থাকে। এখন এক ধরনের ক্যাপ পাওয়া যায়, যা পরিধান করে সহজেই চেহারার পর্দা করা যায়। উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা রা. বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে হজ্বের ইহরাম অবস্থায় ছিলাম। হাজ্বীদের কাফেলা যখন আমাদের নিকট দিয়ে অতিক্রম করত তখন আমরা মাথা থেকে চেহারার উপর চাদর ঝুলিয়ে দিতাম। যখন তারা আমাদেরকে অতিক্রম করে যেত তখন চাদর সরিয়ে ফেলতাম।-সুনানে আবু দাউদ ১/২৫৪;

হযরত আলী রা. মহিলাদেরকে নিষেধ করতেন তারা যেন ইহরাম অবস'ায় নেকাব ব্যবহার না করে। তবে চেহারার উপর দিয়ে কাপড় ঝুলিয়ে দিবে।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪৫৩৯; আদিল্লাতুল হিজাব ৩২৯-৩৩৪; নাইলুল আওতার ৫/৭১ মানাসিক ১১৫, ফাতহুল বারী ৩/৪৭৫; ইলামুল মুআককিয়ীন ১/১২২-১২৩,

তাবেয়ী তাউস রাহ. থেকেও উপরোক্ত সিদ্ধান- বর্ণিত হয়েছে। দেখুন : মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪৫৪০ মাসআলা : হজ্বের মাস শুরু হওয়ার আগে অর্থাৎ শাওয়াল মাসের আগে হজ্বের ইহরাম গ্রহণ করা মাকরূহ।-শরহু লুবাবিল মানাসিক ৯৮; গুনইয়াতুন নাসিক পৃ. ৬৭

হযরত জাবির রা. বলেন, শুধু ‘আশহুরে হজ্ব’ বা হজ্বে মাসসমূহেই হজ্বের ইহরাম গ্রহণ করা যায়।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪৮৩৮ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, সুন্নাহ্ এই যে, ‘আশহুরে হজ্বে’ই হজ্বের ইহরাম গ্রহণ করা হবে।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪৮৩৭

মাসআলা : ইহরাম অবস্থায় ইহরামের পোশাক পরিবর্তন করা যাবে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহরাম অবস্থায় ‘তানয়ীম’ নামক স্থানে কাপড় পরিবর্তন করেছিলেন।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫০১০ বিখ্যাত তাবেয়ী ইবরাহীম নাখাঈ রাহ. বলেন, ইহরাম গ্রহণকারী ইহরামের কাপড় পরিধান করার পর যখন ইচ্ছা তা পরিবর্তন করতে পারবে।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫০১১

মাসআলা : ইহরাম অবস্থায় কেউ মারা গেলে তাকে অন্যান্য মৃতের মতোই গোসল দেওয়া হবে এবং যথানিয়মে অন্যান্য কাজ সম্পন্ন করা হবে। হযরত আয়েশা রা.কে ইহরাম অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হল। তিনি উত্তরে বললেন, সাধারণ মৃতের বেলায় যা করে থাক তার বেলায়ও তা-ই করবে।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪৬৪৯

ইহরাম অবস'ায় নিষিদ্ধ বিষয়

১। পুরুষের জন্য শরীর বা শরীরের কোনো অঙ্গের আকার অনুযায়ী তৈরিকৃত বা সেলাইকৃত কাপড় পরিধান করা নিষিদ্ধ। যেমন : পাঞ্জাবি, জুব্বা, শার্ট, সেলোয়ার, প্যান্ট, গেঞ্জি, কোট, সোয়েটার, জাঙ্গিয়া ইত্যাদি। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করল, মুহরিম কী কী কাপড় পরতে পারবে? তখন তিনি ইরশাদ করলেন, জামা, পাগড়ি, পাজামা, টুপি ও মোজা পরবে না। তবে চপ্পল না থাকলে চামড়ার মোজা গিরার নিচ পর্যন- কেটে পরতে পারবে। তোমরা এমন কোনো কাপড় পরিধান করো না যাতে ‘জাফরান’ বা ‘ওয়ারছ’ লেগেছে।-সহীহ মুসলিম ১/৩৭২ মাসআলা : ইহরামের কাপড় ছিঁড়ে গেলে তা সেলাই করে কিংবা জোড়া দিয়ে পরিধান করা যাবে। তবে ইহরামের কাপড় এ ধরনের সেলাইমুক্ত হওয়াই ভালো। -রদ্দুল মুহতার ২/৪৮১, শরহু লুবাবিল মানাসিক ৯৮

মাসআলা : ইহরাম অবস'ায় সেলাইযুক্ত ব্যাগ ব্যবহার করা ও বেল্ট বাঁধা নিষিদ্ধ নয়। তাবেয়ী উরওয়া রাহ. মুহরিমের জন্য টাকা-পয়সা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র হেফাযতের উদ্দেশ্যে ব্যাগ ব্যবহার করা বৈধ মনে করতেন।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫৬৯৯

তাউস রাহ. বলেন, মুহরিম কোমরবন্দ (বেল্ট) ব্যবহার করতে পারবে।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫৬৮৯ ২। পুরুষের জন্য মাথা ও মুখমণ্ডল আবৃত করা নিষেধ। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, মুখমণ্ডল ও তার উপরের অংশ মাথার অন-র্ভুক্ত। অতএব ইহরাম গ্রহণকারী থুতনী থেকে উপরের দিকে আবৃত করবে না।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪৪৫২

এ প্রসঙ্গে মহিলাদের বিধান ইতিপূর্বে উল্লেখিত হয়েছে। তাদের জন্য মুখমণ্ডল আবৃত করা নিষেধ নয়। তবে মুখমণ্ডলে কাপড় লাগানো নিষেধ। তাই তারা পর পুরুষের সামনে এমনভাবে মুখমণ্ডল আবৃত করবেন যেন তাতে কাপড়ের স্পর্শ না লাগে।

৩। পুরুষের জন্য পায়ের পাতার উপরের উঁচু হাড় ঢেকে যায় এমন জুতা পরিধান করা নিষেধ। তাই এমন জুতা বা স্যান্ডেল পরতে হবে যা পরলে ওই উচু অংশ খোলা থাকে।-রদ্দুল মুহতার ২/৪৯০ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা চাদর, লুঙ্গি ও চপ্পল পরে ইহরাম বাঁধবে। যদি চপ্পল না থাকে তবে চামড়ার মোজা গীরার নিচ পর্যন- কেটে পরিধান করবে।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ৪৮৮১

৪। ইহরামের কাপড়ে বা শরীরে ইহরাম গ্রহণের পর আতর বা সুগন্ধি লাগানো নিষেধ। হযরত ইয়া’লা ইবনে উমাইয়্যা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন জিঈররানা নামক স্থানে অবতরণ করলেন, তখন এক ব্যক্তি তার কাছে এলেন, যার পরনে ছিল জাফরান মিশ্রিত এক ধরনের সুগন্ধিযুক্ত জুব্বা। ... রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, সুগন্ধির চিহ্ন দূর কর এবং জুব্বা খুলে ফেল।’-সহীহ মুসলিম ১/৩৭৩

মাসআলা : সুগন্ধিযুক্ত তেল, যয়তূন ও তিলের তেলও লাগানো যাবে না। সুগন্ধি সাবান, পাউডার, স্নো, ক্রীম ইত্যাদি ব্যবহার করা যাবে না। বিখ্যাত তাবেয়ী হযরত আতা রাহ. বলেন, ‘ইহরাম গ্রহণকারী তার শরীরে কিংবা কাপড়ে সুগন্ধিযুক্ত তেল লাগালে তার উপর কাফফারা ওয়াজিব হবে।’-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪৮৩৩

মাসআলা : পৃথকভাবে সুগন্ধি জর্দা খাওয়াও নিষেধ। আর পানের সাথে খাওয়া মাকরূহ।-মানাসিক ১২১; আহকামে হজ্ব ৩৪ বিখ্যাত তাবেয়ী হযরত কাসেম রাহ. মুহরিমের জন্য খাবারের সাথে সুগন্ধি জাফরান খাওয়া অপছন্দ করতেন।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৩২৭৮

মাসআলা : ইচ্ছাকৃতভাবে ফল-ফুলের ঘ্রাণ নেওয়া মাকরূহ। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. মুহরিমের জন্য ফুলের ঘ্রাণ নেওয়া অপছন্দ করতেন।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪৮২৭ আবুয যুবাইর রাহ. বলেন, আমি জাবির রা.কে জিজ্ঞাসা করলাম, ইহরাম গ্রহণকারী কি ফুল বা সুগন্ধি শুঁকতে পারে? তিনি বললেন, না।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪৮২৮

৫। নখ কাটা কিংবা শরীরের কোনো স্থানের চুল, পশম কাটা বা উপড়ানো নিষেধ। হযরত আতা, তাউস ও মুজাহিদ রাহ. প্রমুখ বিখ্যাত তাবেয়ীগণ বলেন, ‘মুহরিম তার বগলের নিচের পশম উপড়ালে বা নখ কাটলে তার উপর ফিদয়া দেওয়া ওয়াজিব হবে।’-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৩৬০৪

৬। ইহরাম অবস্থায় স্বামী-স্ত্রীর বিশেষ সম্পর্ক স্থাপন করা বা স্ত্রীর সামনে এ সংক্রান- কোনো কথা বা কাজ করা নিষেধ। কুরআন মজীদে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হজ্বের মাসগুলি সুবিদিত। অতএব যে ব্যক্তি এ মাসগুলিতে হজ্ব করা সি'র করে অতঃপর হজ্বে না অশ্লীলতা আছে এবং না অসৎ কাজ এবং না ঝগড়া-বিবাদ।’-সূরা বাকারা : ১৯৭

এক ব্যক্তি তাওয়াফে যিয়ারতের পূর্বে স্ত্রীর সাথে সহবাসে লিপ্ত হয়ে গেল। তাদের সম্পর্কে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. কে জিজ্ঞাসা করা হল। তিনি একটি উট জবাই করার নির্দেশ দিলেন।-মুয়াত্তা মুহাম্মাদ পৃ. ২৩৮

হযরত ইবনে আব্বাস রা.কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল যে, আমি ইহরামের হালতে কামভাবের সাথে নিজ স্ত্রীকে চুম্বন করেছি। এখন আমার করণীয় কী? তিনি উত্তরে বললেন, তুমি একটি কুরবানী কর।-কিতাবুল আছার, ইমাম মুহাম্মাদ পৃ. ৫৩

৭। কোনো বন্য পশু শিকার করা বা শিকারীকে সহযোগিতা করা নিষিদ্ধ। কুরআন মজীদে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, তোমাদের উপর স'লের প্রাণী শিকার করা হারাম করা হয়েছে যে পর্যন- ইহরাম অবস্থায় থাক।-সূরা মায়িদাহ : ৯৬

হযরত জাবির রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ইহরাম অবস্থায় স্থলভাগের শিকারকৃত প্রাণী তোমাদের জন্য হালাল যদি তা তোমরা নিজেরা শিকার না কর কিংবা তোমাদের উদ্দেশ্যে শিকার করা না হয়।-জামে তিরমিযী ১/১৭৩ হযরত আবু কাতাদাহ রা. বিদায় হজ্বে হজ্ব কাফেলার সাথে হজ্বের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। কাফেলার সবাই ইহরাম অবস'ায় ছিলেন, কিন' তিনি তখনো ইহরাম গ্রহণ করেননি। এ অবস্থায় একটি শিকারী প্রাণী দেখে তিনি তা শিকার করে ফেললেন। অতঃপর তা নিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপসি'ত হলেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাফেলার লোকদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদের কেউ কি আবু কাতাদাহকে এই প্রাণীটি ইঙ্গিত করে দেখিয়েছ বা অন্য কোনোভাবে শিকার করতে সহযোগিতা করেছ? সবাই বলল, না, ইয়া রাসূলুল্লাহ! তখন তিনি বললেন, তাহলে তোমরা তা খেতে পার।-সহীহ মুসলিম ১/৩৮১

৮। ঝগড়া-বিবাদ সাধারণ সময়েও নিষিদ্ধ। ইহরাম অবস্থায় তা আরো ভয়াবহ। কুরআন মজীদে আছে, ‘হজ্বের মাসগুলি সুবিদিত। অতএব যে ব্যক্তি এ মাসগুলিতে হজ্ব করা সি'র করে অতঃপর হজ্বে না অশ্লীলতা আছে এবং না অসৎ কাজ এবং না ঝগড়া-বিবাদ।’-সূরা বাকারা : ১৯৭

হযরত জাবির ইবনে যায়েদ রাহ. আল্লাহ তাআলার বাণী ‘এবং না ঝগড়া-বিবাদ’ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘তোমার জন্য এই অবকাশ নেই যে, সঙ্গীর সঙ্গে তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হবে এবং তাকে রাগান্বিত করবে।’-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৩৩৯৪

৯। কাপড় বা শরীরের উকূন মারা নিষিদ্ধ।-আদ্দুররুল মুখতার ২/৪৮৬-৪৯০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২২৪; মানাসিক ১১৭-১২০; গুনইয়াতুন নাসিক ৮৫ বিখ্যাত তাবেয়ী ইকরামা রাহ. কে জিজ্ঞাসা করা হল, ইহরাম গ্রহণকারী তার কাপড়ে উকূন দেখতে পেলে কী করবে? উত্তরে তিনি বললেন, আলতোভাবে ধরে যমীনে রেখে দিবে, মেরে ফেলবে না।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৩২৯৭ মাসআলা : ইহরাম অবস্থায় যেসব কাজ নিষিদ্ধ তাতে লিপ্ত হওয়া গুনাহ। এর কারণে হজ্ব অসম্পূর্ণ হয়ে যায়। উপরন' কিছু বিষয় এমন রয়েছে যাতে লিপ্ত হলে ‘দম’ ওয়াজিব হয়। ইবরাহীম নাখাঈ রাহ. বলেন, বলা হত যে, যে ব্যক্তি হজ্বে নিষিদ্ধ কোনো কাজ করল সে এর জন্য একটি পশু জবাই করবে।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫১৯১

মাসআলা : আরাফায় অবস্থানের পূর্বে স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হলে হজ্ব নষ্ট হয়ে যায়। এক্ষেত্রে গরু বা উট যবেহ করা ছাড়াও পরবর্তী বছর তা কাযা করা জরুরি।-আদ্দুররুল মুখতার ২/৫৫৮-৫৫৯, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৪৪, মানাসিক ১১৭ এক ব্যক্তি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর নিকট এসে বলল, আমি ইহরাম অবস্থায় স্ত্রীর সাথে মিলিত হয়েছি। এখন আমার কী করণীয়? তিনি বললেন, তোমরা উভয়ে হজ্বের অবশিষ্ট আমলগুলো সম্পন্ন করবে। অতঃপর আগামী বছর এ হজ্ব কাযা করবে।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৩২৪৫

হযরত আলী রা. বলেন, স্বামী-স্ত্রী প্রত্যেকের উপর একটি করে ‘বাদানা’ তথা গরু বা উট জবাই করা ওয়াজিব।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৩২৫৯

এক ব্যক্তি আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.কে জিজ্ঞাসা করলেন যে, আমি ও আমার স্ত্রী মুহরিম ছিলাম। এ অবস'ায় আমি স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হয়েছি (এখন আমাদের করণীয় কী?) ইবনে উমর রা. বললেন, তুমি হজ্ব নষ্ট করে ফেলেছ। তুমি ও তোমার স্ত্রী অন্যান্যদের সঙ্গে থাকবে এবং তাদের মতো হজ্বের (অবশিষ্ট) কাজ করতে থাকবে এবং তারা যখন ইহরাম থেকে মুক্ত হয় তখন তোমরাও মুক্ত হবে। অতঃপর আগামী বছর তুমি ও তোমার স্ত্রী হজ্ব করবে এবং ‘হাদি’ (জবাই করার পশু) নিয়ে আসবে। যদি তোমাদের হাদির সামর্থ্য না থাকে তাহলে হজ্বের মধ্যে তিনটি রোযা রাখবে এবং প্রত্যাবর্তনের পর সাতটি।-সুনানে কুবরা বায়হাকী ৫/১৬৭

মাসআলা : ইহরাম অবস্থায় মাথা ও মুখ ব্যতীত পূর্ণ শরীর চাদর ইত্যাদি দিয়ে আবৃত করা যাবে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, এক ব্যক্তি ইহরাম অবস্থায় সওয়ারীর পিঠ থেকে পড়ে মৃত্যু বরণ করলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা তাকে বড়ই পাতা মেশানো পানি দিয়ে গোসল দাও এবং তার পরনের কাপড় দু’টি দ্বারা কাফন পরাও। তার চেহারা ও মাথা আবৃত করো না। কেননা সে কিয়ামতের দিন উত্থিত হবে তালবিয়া পড়তে পড়তে।-সহীহ মুসলিম ১/৩৮৪ মাসআলা : কান, ঘাড়, পা ঢাকা যাবে। মাথা ও গাল বালিশে রেখে শোয়া যাবে। তবে পুরো মুখ বালিশের উপর রেখে ঢেকে শোয়া যাবে না। -মানাসিক ১২৩-১২৪, গুনইয়াতুন নাসিক ৯৩

মাসআলা : ইহরাম অবস্থায় পান খাওয়া নিষিদ্ধ নয়। তবে পানে সুগন্ধিযুক্ত মসলা বা জর্দা খাওয়া নিষিদ্ধ। বিখ্যাত তাবেয়ী হযরত কাসেম রাহ. ‘মুহরিম’ ব্যক্তির জন্য খাবারের সঙ্গে সুগন্ধি জাফরানের মিশ্রণকে অপছন্দ করতেন।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৩২৭৮

মাসআলা : ইহরাম অবস্থায় পানিতে ডুব দেওয়া যাবে।-গুনইয়াতুন নাসিক ৯১

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা ‘জুহফা’ নামক স্থানে উপসাগরের পাশে ছিলাম। তাতে আমরা ডুব দিয়েছি। হযরত উমর তখন আমাদের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, কিন' তিনি আমাদেরকে এজন্য দোষারোপ করেননি। আমরা ছিলাম ইহরাম অবস্থায়।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৩০১৩

উমরার পদ্ধতি

উমরার ফরয দুটি

১। উমরার ইহরাম গ্রহণ। অর্থাৎ উমরার নিয়তে তালবিয়া পাঠ করা।
২। বাইতুল্লাহ শরীফের তাওয়াফ করা ।

উমরার ওয়াজিব দুটি


১। সাফা-মারওয়ার মাঝে সায়ী করা।
২। মাথার চুল মুণ্ডানো বা ছাঁটা।

হযরত আবদুর রহমান ইবনে আমর বলেন, আমরা হযরত উসমান রা.-এর সঙ্গে মক্কায় এসেছি। তাঁকে দেখেছি, তিনি মক্কা থেকে বের হওয়ার আগে ইহরাম খুলতেন না। তিনি শুধু বাইতুল্লাহ শরীফের তাওয়াফ করতেন এবং সাফা-মারওয়ার মাঝে সায়ী করতেন। এরপর মাথা মুণ্ডিয়ে ফেলতেন।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৩৭৮৬

তাবেয়ী হযরত ইবরাহীম রাহ. বলেন, যখন কেউ শুধু উমরা করবে তখন সে চাইলে মাথার চুল ছাঁটতেও পারে আবার মুণ্ডাতেও পারে।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৩৭৮৮

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, জিঈররানা নামক স্থান থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণ উমরা করেছেন। তাঁরা তাওয়াফকালে ‘রমল’ করেছেন এবং পরিধেয় চাদর (ডান কাঁধ খালি রেখে) বগলের নিচ দিয়ে বের করে বাম কাঁধের উপর রেখেছেন।-সুনানে আবু দাউদ ১/২৫৭

মাসআলা : উমরার তাওয়াফ ও যে তাওয়াফের পর সায়ী আছে সেই তাওয়াফের প্রথম তিন চক্করে রমল করা অর্থাৎ বীরদর্পে কাঁধ দুলিয়ে কিছুটা দ্রুত বেগে চলা সুন্নত। তদ্রূপ পুরো তাওয়াফে ইজতিবা করা (পরিধেয় চাদর ডান বগলের নিচে দিয়ে বের করে বাম কাঁধের উপর রাখা) সুন্নত। তবে এ দু’টি বিষয়-রমল ও ইজতিবা শুধু পুরুষের জন্য সুন্নত।-মানাসিক ১২৯; আদ্দুররুল মুখতার ২/৪৯৮; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২২৫ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, হজ্ব ও উমরায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাওয়াফ করতেন তখন প্রথম তিন চক্করে রমল করতেন। বাকি চার চক্করে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতেন। এরপর দু’ রাকাত নামায পড়তেন। এরপর সাফা-মারওয়া মাঝে সায়ী করতেন।-সহীহ মুসলিম ১/৪১০

হযরত সফওয়ান তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাওয়াফকালে ‘ইজতিবা’ করতেন।-মুসনাদে দারেমী হাদীস : ১৯৭৪; জামে তিরমিযী ১/১৭৪

মাসআলা : মহিলাদের জন্য রমল নেই। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, মহিলাদের জন্য ‘রমল’ করার বিধান নেই।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৩১১১ তাবেয়ী হযরত ইবরাহীম বলেন, মহিলারা মাথার চুল খাটো করবে। তাদের জন্য মাথা মুণ্ডানো ও রমলের বিধান নেই।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৩১১৪

মাসআলা : তাওয়াফকালে সীনা বাইতুল্লাহর দিকে করে তাওয়াফ করা যাবে না। এমনকি রুকনে ইয়ামানী স্পর্শ করার সময় কিংবা হাজরে আসওয়াদ চুমু দেওয়ার সময় সীনা বাইতুল্লাহর দিকে ঘুরে গেলে যেখান থেকে ঘুরেছে সেখান থেকেই সীনা ঠিক করে আবার তাওয়াফ শুরু করা জরুরি।-মানাসিক ১৫৩, গুনইয়াতুন নাসিক ১১৩, রদ্দুল মুহতার ২/৪৯৪

হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কায় এলেন তখন হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করলেন এবং ডান দিকে চলতে আরম্ভ করলেন। প্রথম তিন চক্করে ‘রমল’ করলেন। অবশিষ্ট চার চক্কর স্বাভাবিকভাবে হাঁটলেন।-সহীহ মুসলিম ১/৪০০ মাসআলা : সকল তাওয়াফের পর দুই রাকাত নফল নামায পড়া ওয়াজিব। তাওয়াফ নফল হোক বা ফরয। আর এই দুই রাকাত নামায মাকামে ইব্রাহীমীর পিছনে পড়া ভালো।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কায় এলেন তখন বাইতুল্লাহর চারপাশে সাত বার তাওয়াফ করলেন। তাওয়াফ শেষে মাকামে ইবরাহীমের পেছনে দু’ রাকাত নামায পড়লেন। এরপর সাফা-মারওয়ার দিকে গেলেন। ... -সহীহ বুখারী ১/২২০

মাসআলা : মাকামে ইবরাহীমীর পিছনে পড়া সম্ভব না হলে মসজিদে হারামের যে কোনো স্থানে এই দুই রাকাত নামায পড়া যাবে। ইবনে আবী আম্মার বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রা.কে তাওয়াফ করতে দেখেছি। তিনি তাওয়াফ শেষে দু’ রাকাত নামায পড়লেন। তখন তাঁর ও কিবলার মাঝে তাওয়াফকারীরা তাওয়াফরত ছিল।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫২৬৮

মাসআলা : দু’ রাকাত নামায হেরেমের সীমানার ভিতরে পড়লেও ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। হযরত উম্মে সালামা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় তাকে বলেছেন, যখন ফজরের নামায শুরু হবে এবং লোকেরা নামাযরত অবস্থায় থাকবে তখন তুমি উটে আরোহণ করে তাওয়াফ করে নিবে। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি তাই করলেন এবং (দু’ রাকাত) নামায না পড়ে বের হয়ে এলেন।-সহীহ বুখারী ১/২২০

মাসআলা : দু’ রাকাত নামায হরমের বাইরে পড়া মাকরূহ। তবে পড়লে আদায় হয়ে যাবে। দম ওয়াজিব হবে না।-মানাসিক ১৫৫, আদ্দুররুল মুখতার ২/৪৯৯, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২২৬, গুনইয়াতুন নাসিক ১১৬ বিখ্যাত তাবেয়ী হযরত আতা রাহ. বলেছেন, তাওয়াফের দু’ রাকাত নামায, ইচ্ছে হলে নিজ ঘরেও আদায় করতে পার।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫২৬৭

মাসআলা : তাওয়াফ পরবর্তী দুই রাকাত নামায তাওয়াফের পর অবিলম্বে আদায় করা উত্তম। বিনা ওজরে বিলম্বে পড়া মাকরূহ। তবে মাকরূহ ওয়াক্ত হলে পরে পড়বে। -রদ্দুল মুহতার ২/৪৯৯, মানাসিক ১৫৫, গুনইয়াতুন নাসিক ১১৬

মাসআলা : একাধিক তাওয়াফ করে পরবর্তী দুই রাকাত নামাযকে একত্রে পড়া মাকরূহ। নাফে’ রাহ. থেকে বর্ণিত, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. একত্রে একাধিক তাওয়াফ করা অপছন্দ করতেন। তিনি বলেন, প্রত্যেক সাত চক্করে (অর্থাৎ এক তাওয়াফের পর) দুই রাকাত নামায পড়া জরুরি। তিনি একত্রে দুই তাওয়াফ করতেন না।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ৯০১২ বিখ্যাত তাবেয়ী মুহাম্মাদ, ছালিম ও উবায়দুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ রাহ. থেকে বর্ণিত, তাঁরা প্রত্যেক তাওয়াফের পর দুই রাকাত নামায আদায় করতেন এবং একাধিক তাওয়াফ একত্রে করতেন না।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫০২৯

মাসআলা : তাওয়াফের পরের সময় যদি মাকরূহ ওয়াক্ত হয়ে থাকে তবে মাকরূহ ওয়াক্ত শেষ হওয়ার পর একাধিক তাওয়াফের নামায একত্রে আদায় করা যাবে।-গুনইয়াতুন নাসিক ১১৭; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২২৭

হযরত মিছওয়ার ইবনে মাখরামা রা. ফজরের পর একত্রে তিন তাওয়াফ করতেন এবং সূর্যোদয়ের পর প্রত্যেক তাওয়াফের জন্য দুই রাকাত নামায আদায় করতেন। তিনি আসরের পরও অনুরূপ করতেন। অতঃপর সূর্যাসে-র পর প্রত্যেক তাওয়াফের জন্য দুই রাকাত নামায আদায় করতেন।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৩৪২২

হজ্বের পদ্ধতি

হজ্বের ফরয তিনটি :

১। ইহরাম বাঁধা। ইতিপূর্বে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। ২। উকূফে আরাফা। অর্থাৎ ৯ যিলহজ্ব সূর্য ঢলে যাওয়ার পর থেকে পরবর্তী রাতের সুবহে সাদিক উদিত হওয়ার পূর্বে স্বল্প সময়ের জন্য হলেও আরাফার ময়দানে অবস্থান করা।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরাফার দিন সকালে ফজর নামায পড়ে মিনা থেকে আরাফার উদ্দেশে রওয়ানা হলেন এবং আরাফায় পৌঁছে নামিরাতে অবস্থান করলেন। নামিরা হল আরাফার ঐ স্থান যেখানে ইমাম অবস্থান করেন। অতঃপর যখন যোহরের সময় হল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্রূত নামায আদায় করলেন। এখানে তিনি যোহর ও আসর একত্রে পড়লেন এবং খুতবা দিলেন। তারপর আরাফার মাওক্বিফের দিকে রওয়ানা হলেন এবং সেখানে উকূফ (অবস্থান) করলেন।-সুনানে আবু দাউদ ১/২৬৫ সায়ীদ ইবনুল মুসাইয়িব রাহ. বলেন, ‘যে ব্যক্তি সুবহে সাদিকের পূর্বে আরাফায় অবস্থান করতে সক্ষম হল সে হজ্ব পেল।’-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৩৮৬১

৩। তাওয়াফে যিয়ারত। ১০ যিলহজ্ব থেকে ১২ তারিখ সূর্যাসে-র আগে এ তাওয়াফ সম্পন্ন করতে হবে। হযরত ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর দিন তাওয়াফে যিয়ারত করেছেন অতঃপর মিনায় এসে যোহর আদায় করেছেন।-সহীহ মুসলিম ১/৪২২

হজ্বের ওয়াজিবসমূহ এই-

১। উকূফে মুযদালিফা। ১০ যিলহজ্ব সুবহে সাদিকের পর হতে সূর্যোদয় পর্যন্ত- সময়ের ভিতর সামান্য সময় মুযদালিফায় অবস'ান করলেও এ ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। হযরত উরওয়াহ ইবনে মুযাররিছ রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মুযদালিফায় অবস্থানকালে বলতে শুনেছি, যে আমাদের সঙ্গে এই নামায (ফজরের নামায) আদায় করল অতঃপর এখানে অবস'ান করল এবং ইতিপূর্বে সে আরাফায় অবস্থান করেছে রাতে কিংবা দিনে, তার হজ্ব পূর্ণ হয়েছে।-সুনানে নাসাঈ ২/৩৮

২। সাফা-মারওয়ার মাঝে সায়ী করা। এ সায়ী তাওয়াফে যিয়ারতের পরও করা যায়। আবার ৮ যিলহজ্বের আগেও নফল তওয়াফের পর আদায় করা যায়। ইফরাদ হজ্ব আদায়কারীগণ মক্কা প্রবেশের পর যে ‘তাওয়াফে কুদূম’ করে থাকেন তখনও হজ্বের ওয়াজিব সায়ী করে নিতে পারেন। কুরআন মজীদে আল্লাহ তাআলা বলেন, নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন-র্ভুক্ত। সুতরাং যে (কাবা) গৃহের হজ্ব করে কিংবা উমরা করে তার জন্য এ দুয়ের মাঝে সাঈ করাতে কোনো দোষ নেই।-সূরা বাকারা : ১৫৮

৩। নির্দিষ্ট দিনগুলোতে জামরাতে রমী তথা কংকর নিক্ষেপ করা। হযরত জাবির রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর দিন কংকর নিক্ষেপ করেছেন চাশতের সময়। আর পরবর্তীগুলো করেছেন সূর্য ঢলে যাওয়ার পর।-সহীহ মুসলিম ১/৪২০

৪। তামাত্তু ও কিরান হজ্ব আদায়কারীর জন্য দমে শোকর তথা হজ্বের কুরবানী। কুরআন মজীদে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, (তরজমা) তারপর যখন তোমরা নিরাপদে থাক তখন যে ব্যক্তি উমরাকে হজ্বের সঙ্গে একত্র করে লাভবান হয় সে (যবেহ করবে) কুরবানী যে প্রাণী সহজলভ্য হয়।-সূরা বাকারা : ১৯৬

৫। মাথার চুল মুণ্ডানো বা ছোট করা। হযরত আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জামারাতে এসে কংকর নিক্ষেপ করলেন। অতঃপর মিনার নির্দিষ্ট স্থানে এসে কুরবানী করলেন। এরপর ক্ষৌরকারকে প্রথমে ডান দিকে তারপর বাম দিকে ইশারা করে মাথা মুণ্ডানোর আদেশ করলেন। অতঃপর চুল মুবারক মানুষের মাঝে বন্টন করে দিলেন।-সহীহ মুসলিম ১/৪২১

৬। মীকাতের বাহির থেকে আগত লোকদের ‘তাওয়াফে বিদা’ করা। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, হাজীগণ বিভিন্ন দিকে প্রত্যাবর্তন করছিল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কেউ যাতে বাইতুল্লাহর নিকট তার সর্বশেষ উপসি'তি ব্যতীত ফিরে না যায়।-সহীহ মুসলিম ১/৪২৭ হজ্বের পাঁচ দিনের আমল

নিম্নে ৮ যিলহজ্ব থেকে ১২ যিলহজ্ব পর্যন- হজ্বের পাঁচ দিনের আমলগুলোর কর্মপদ্ধতি ও সংশ্লিষ্ট মাসায়িল আলোচনা করা হচ্ছে :

প্রথম দিন ৮ যিলহজ্ব

আজ সূর্যোদয়ের পর সকল হাজীকে ইহরাম অবস্থায় মিনা গমন করতে হবে। যোহর থেকে পরবর্তী দিনের ফজর পর্যন- মোট পাঁচ ওয়াক্ত নামায মিনায় পড়া এবং ৮ তারিখ দিবাগত রাত্রি মিনায় অবস্থান করা সুন্নত।- রদ্দুল মুহতার ২/৫০৩, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২২৭ হযরত জাবির রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৮ যিলহজ্ব মিনায় গমন করলেন এবং সেখানে যোহর, আসর, মাগরিব, ইশা ও ফজর নামায আদায় করলেন।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪৭৫৫

হজ্বের ইহরাম : ইফরাদ হজ্ব ও কিরান হজ্ব আদায়কারী হজ্বের ইহরাম পূর্ব থেকেই করে থাকে। তামাত্তু হজ্ব আদায়কারী আজ মিনায় যাওয়ার পূর্বে হজ্বের ইহরাম গ্রহণ করবেন।

হযরত জাবির রা. বলেন, যখন আমরা ইহরাম থেকে মুক্ত হলাম তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে আদেশ করলেন, আমরা যেন মিনার উদ্দেশে রওনা হওয়ার সময় ইহরাম গ্রহণ করি। আমরা আবতাহ নামক স'ানে ইহরাম গ্রহণ করলাম।-সহীহ মুসলিম ১/৩৯২

হজ্বের ইহরাম বাঁধার স্থান

মাসআলা : হজ্বের ইহরাম বাঁধার জন্য পুরুষ-মহিলা কারো জন্যই মসজিদে হারামে যাওয়া জরুরি নয়। ইবরাহীম রাহ. বলেন, মক্কাবাসী (যারা তামাত্তু হজ্বের নিয়তে ওমরা করে মক্কায় অবস্থান করেন তারাও মক্কাবাসীর অন-র্ভুক্ত) ওমরার ইহরামের জন্য হারামের সীমানা থেকে বের হবে আর হজ্বের ইহরাম নিজ স্থানেই গ্রহণ করবে।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫৩৯৯ মাসআলা : মহিলাগণ নিজ নিজ অবস্থান স্থল থেকেই ইহরাম বাঁধবে। পুরুষরাও হোটেল বা আবাস-স্থান থেকে ইহরাম বাঁধতে পারে। তবে পুরুষের জন্য সম্ভব হলে মসজিদে হারামে এসে নিয়ম অনুযায়ী ইহরাম বাঁধা ভালো।

ইসমাইল ইবনে আবদুল মালিক থেকে বর্ণিত, হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর রাহ. ৮ যিলহজ্ব স্বস্থান থেকে পায়ে হেঁটে বের হলেন, আমিও তার সঙ্গে বের হলাম। তিনি মসজিদে হারামে প্রবেশ করে দুই রাকাত নামায আদায় করলেন। অতঃপর মসজিদ থেকে বের হয়ে কাবার দিকে ফিরে তালবিয়া পাঠ করলেন।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫৯৩১

মাসআলা : হজ্বের ইহরামের পর থেকে ১০ তারিখ জামরা আকাবায় কংকর নিক্ষেপের পূর্ব পর্যন- তালবিয়া পড়তে থাকবে। কংকর নিক্ষেপের পর থেকে তালবিয়া বন্ধ হয়ে যাবে।-মানাসিক ২২৫; গুনইয়াতুন নাসিক ১৭০ হযরত ফযল ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জামরা আকাবায় কংকর নিক্ষেপ করা পর্যন- তালবিয়া পাঠ করেছেন।-সহীহ মুসলিম ১/৪১৫

মিনায় অবস্থান না করা

মাসআলা : ৮ তারিখ দিবাগত রাতে যদি কেউ মিনায় অবস্থান না করে কিংবা এ তারিখে মোটেই মিনায় না যায় তাহলেও তার হজ্ব আদায় হয়ে যাবে। তবে মাকরূহ হবে।-মানাসিক ১৮৮-১৮৯; আহকামে হজ্ব ৬২ বিখ্যাত তাবেয়ী হযরত আতা রাহ. থেকে বর্ণিত, উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রা. ৮ তারিখের সন্ধ্যা এবং আরাফার পূর্ণ রাত মক্কায় অবস্থান করেছেন।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪৭৫৮

তাবু মিনার বাইরে হলে

মাসআলা : মিনায় জায়গা সংকুলান না হওয়ার কারণে মিনার এলাকার বাইরে বহু তাবু লাগানো হয়। যেহেতু এটি জায়গার সংকীর্ণতার ওজরে করা হয়ে থাকে তাই আশা করা যায়, এ সকল তাবুতে অবস্থানকারীরাও মিনায় অবস্থানের ফযীলত পেয়ে যাবে। তবে যারা তাবুর বাইরে মিনার এলাকায় গিয়ে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করতে পারেন তাদের জন্য সেখানে অবস্থান করাই ভালো। নির্ধারিত সময়ের আগেই মিনার উদ্দেশে রওয়ানা

মাসআলা : মিনায় রওয়ানা হওয়ার সময় হল ৮ তারিখ সূর্যোদয়ের পর। কিন' আজকাল ৭ তারিখ দিবাগত রাতেই মুআল্লিমের গাড়ি রওয়ানা হয়ে যায় এবং রাতে রাতেই মিনায় পৌঁছে যায়। যদিও ৮ তারিখ সূর্যোদয়ের পর রওয়ানা হওয়া নিয়ম এবং এটিই ভালো, কিন' অধিক ভিড়ের কারণে আগে চলে যাওয়া দোষের বিষয় নয়।-মানাসিক ১৮৮; গুনইয়াতুন নাসিক ১৪৬, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২২৭ হাজ্জাজ রাহ. বলেন, আমি হযরত আতা রাহ.কে ‘ইয়াওমুত তারবিয়া’র একদিন পূর্বে (অর্থাৎ ৭ তারিখে) মিনায় যাওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছি। তিনি তা দোষের বিষয় মনে করেননি।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫৫৩৪

তাকবীরে তাশরীক

মাসআলা : ৯-১৩ যিলহজ্ব প্রত্যেক ফরয নামাযের পর তাকবীরে তাশরীক পড়া ওয়াজিব। তাই প্রত্যেক হাজীকে এ বিষয়ে যত্নবান হতে হবে। হযরত আলী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি যিলহজ্বের ৯ তারিখ ফজর থেকে ১৩ তারিখ আসর পর্যন- প্রত্যেক ফরয নামাযের পর তাকবীরে তাশরীক পাঠ করতেন।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ৫৬৭৮

দ্বিতীয় দিন ৯ যিলহজ্ব

কূফে আরাফা

আজ হজ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রোকন আদায়ের দিন। ৯ যিলহজ্ব সূর্য ঢলার পর থেকে পরবর্তী রাতের সুবহে সাদিকের মধ্যে কিছু সময় আরাফার ময়দানে উপসি'ত থাকলে এই ফরয আদায় হয়ে যায়।

হযরত আবদুর রহমান ইবনে ইয়া’মার রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘হজ্ব হল (উকূফে) আরাফা। যে ব্যক্তি আরাফার রাত (অর্থাৎ ৯ তারিখ দিবাগত রাত) পেল তার হজ্ব পূর্ণ হল।’-সুনানে নাসাঈ ২/৩৭ অন্য হাদীসে এসেছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে আরাফায় রাতের কিছু অংশ অবস'ান করেছে তার হজ্ব পূর্ণ হয়েছে আর যে তা করল না তার হজ্ব হয়নি। অতএব সে উমরা করে ইহরাম থেকে মুক্ত হবে এবং পরবর্তী বছর পুনরায় হজ্ব করবে।-সুনানে দারাকুতনী ২/২৪১

অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূর্য ঢলে যাওয়ার পর আরাফার উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।-সুনানে আবু দাউদ ১/২৬৫ তবে এ দিন সূর্যাসে-র আগে আরাফায় পৌঁছলে সূর্যাস- পর্যন্ত- আরাফায় অবস্থান করা ওয়াজিব।-গুনইয়াতুন নাসিক ১৫৭; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২২৯; আহকামে হজ্ব ৬৩

হযরত জাবির রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূর্য ঢলার পর ক্বসওয়া নামক উটনীতে আরোহণ করে রওনা হয়েছেন এবং বাতনে ওয়াদি অর্থাৎ আরাফায় এসে খুতবা দিয়েছেন। অতঃপর সেখানে সূর্যাস- পর্যন- অবস্থান করেছেন।-সহীহ মুসলিম ১/৩৯৭ আরাফার উদ্দেশে রওয়ানা

মাসআলা : ৯ তারিখ সূর্যোদয়ের পর মিনা থেকে আরাফার উদ্দেশে রওয়ানা হওয়া উত্তম।-রদ্দুল মুহতার ২/৫০৩; গুনইয়াতু নাসিক ১৪৬-১৪৭ হযরত জাবির রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিনায় ফজর নামায আদায় করলেন অতঃপর কিছুক্ষণ অবস'ান করলেন। ইতিমধ্যে সূর্যোদয় হল এবং তিনি আরাফার উদ্দেশে রওনা হলেন।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪৭৬৬

উল্লেখ্য, ভিড়ের কারণে বহু লোক ৮ তারিখ রাতেই আরাফায় চলে যায়। মুআল্লিমের গাড়িগুলোও রাত থেকেই হাজী সাহেবদেরকে আরাফায় পৌঁছাতে শুরু করে। অথচ রাতে চলে গেলে একাধিক সুন্নাতের খেলাফ হয়। যথা : এক. রাতে মিনায় থাকা সুন্নত। তা আদায় হয় না। দুই. ৯ তারিখ ফজর নামায মিনায় পড়া সুন্নত। এটিও ছুটে যায়। তিন. সূর্যোদয়ের পর আরাফার উদ্দেশে রওনা হওয়া মুস্তাহাব। সেটিও আদায় হয় না। তাই সাধ্যমতো চেষ্টা করা চাই যেন বাসগুলো অন-ত ফজরের পর ছাড়ে। যদি মানানো সম্ভব না হয় তাহলে বৃদ্ধ ও মহিলারা মাহরামসহ আগে চলে যাবেন। আর সুস' সবল হাজীগণ মিনায় ফজরের নামায পড়ে আরাফার উদ্দেশে রওয়ানা হবেন। মিনায় ফজর পড়ে হেঁটে গেলেও সুন্দরভাবে দুপুরের আগেই আরাফায় পৌঁছানো যায়। গাড়িতে গেলে যানজটের কারণে একটু বিলম্ব হলেও সময়ের ভেতরই আরাফায় পৌঁছানো যায়। তবে এ ক্ষেত্রে অনেক সময় একেবারে তাঁবুর নিকটে পৌঁছানো যায় না। কিছুটা আগে নেমে যেতে হয়। তাই মাযূর হাজীগণ রাতেও যেতে পারেন। আর যারা সুস' সবল পায়ে হেঁটে যেতে অসুবিধা নেই তাদের সূর্যোদয়ের পর রওয়ানা হওয়া উচিত।-রদ্দুল মুহতার ২/৫০৩

হযরত আ’লা ইবনুল মুসাইয়িব রাহ. তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, মিনায় ফজর নামায পড়ার আগে আরাফার উদ্দেশে রওনা হবে না।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪৭৭০

আরাফায় পূর্ণ নামায পড়বে

মাসআলা : আরাফায় কসর করবে না, পূর্ণ নামায পড়বে। অধিকাংশ সাহাবায়ে কেরামের মতে আরাফার ময়দানে মুকীম হাজীগণ যোহর-আসর পূর্ণ চার রাকাতই পড়বে। হানাফী মাযহাবের সিদ্ধান-ও তাই। তাই নিজ নিজ তাবুতে পড়লে মুকীম হাজীগণ পূর্ণ নামায পড়বেন, কসর করবেন না।-রদ্দুল মুহতার ২/৫০৫ গুনইয়াতুন নাসিক ১৫১, ফাতাওয়া হিন্দিয়া -১/২২৮, ২/৫০৬, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২২৯ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতহে মক্কার সময় চার রাকাত বিশিষ্ট ফরজ নামাযগুলো দুই রাকাত পড়তেন এবং নামায শেষে শহরবাসীদের উদ্দেশে বলতেন, হে শহরবাসী, তোমরা চার রাকাত পূর্ণ কর, আমরা মুসাফির।-সুনানে আবু দাউদ ১৭৩

যোহর ও আসর একত্রে পড়া

মাসআলা : মসজিদে নামিরার জামাতে অংশগ্রহণ করতে পারলে যোহর ও আসর একত্রে ইমামের পিছনে আদায় করবে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরাফার দিন সকালে ফজর নামায পড়লেন এবং মিনা থেকে আরাফার উদ্দেশে রওনা হলেন। আরাফায় পৌঁছে নামিরাতে অবস্থান করলেন। নামিরা হল আরাফার ঐ স্থান যেখানে ইমাম অবস্থান করেন। অতঃপর যখন যোহরের সময় হল তখন দ্রূত নামায আদায় করলেন এবং যোহর ও আসর একত্রে পড়লেন। অতঃপর খুতবা দিলেন। খুতবা শেষে আরাফার মাওক্বিফের দিকে রওনা হলেন এবং সেখানে উকূফ (অবস্থান) করলেন।-সুনানে আবু দাউদ ১/২৬৫

মাসআলা : মসজিদে নামিরার জামাতে অংশগ্রহণ করা সম্ভব না হলে জোহরের সময় জোহর এবং আসরের সময় আসরের নামায আদায় করবে। এ অবস্থায় একত্রে পড়লে সময়ের আগে পড়া নামায আদায় হবে না।

বিখ্যাত তাবেয়ী হযরত ইবরাহীম রাহ. বলেন, আরাফায় যখন নিজ তাঁবুতে নামায আদায় করবে তখন প্রত্যেক নামায ওয়াক্ত মতো পড়বে এবং প্রত্যেক নামাযের জন্য ভিন্ন ভিন্ন আযান-ইকামত দিবে।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪২৩৫

উকূফে আরাফার করণীয়

উত্তম হল, কিবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত- পর্যন্ত- দুআ করা। সহীহ মুসলিম ১/৩৯৮

এত দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে না পারলে অল্প সময় বসবে। পুনরায় দাঁড়িয়ে দুআ ও মুনাজাতে মগ্ন থাকবে।-আহকামে হজ্ব ৬৫ হযরত জাবির রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উটে আরোহণ করে মাওক্বিফে এলেন। ... অতঃপর সূর্যাস- পর্যন- কিবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫৬২২

সূর্যাস্তে-র পূর্বে আরাফা থেকে বেরিয়ে যাওয়া

অনেকে সূর্যাসে-র আগেই মুযদালিফার উদ্দেশে রওনা হয়ে যায়। এরূপ হয়ে গেলে কর্তব্য হল পুনরায় আরাফায় ফিরে আসা। অন্যথায় দম দিতে হবে।-মানাসিক ২১০; গুনইয়াতুন নাসিক ১৬০; রদ্দুল মুহতার ২/৫৫২

বিখ্যাত তাবেয়ী হযরত হাছান রাহ. বলেন, ইমামের পূর্বে যে মুযদালিফায় পৌঁছবে তার উপর দম আসবে। অন্য বর্ণনায় আছে, আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর বলেন, ইমাম সূর্যাস্তে-র পর আরাফা থেকে রওনা হবে।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫৪১৭ ৯ তারিখ সূর্যাসে-র আগে আরাফায় পৌঁছতে না পারলে কেউ যদি ৯ তারিখ সূর্যাসে-র আগে আরাফার ময়দানে কোনো কারণে পৌঁছতে না পারে তবে সুবহে সাদেক হওয়ার আগে কিছু সময়ের জন্য আরাফায় অবস্থান করলেও ফরয আদায় হবে। আর এ কারণে দম বা অন্য কিছু ওয়াজিব হবে না। তবে যথাসময় আরাফায় পৌছার ফযীলত থেকে বঞ্চিত হবে।-মানাসিক ২০৫-২০৬; গুনইয়াতুন নাসিক ১৫৯

হযরত আবদুর রহমান ইবনে ইয়া’মার রা. থেকে বর্ণিত, নজদের কিছু লোক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এল। তখন তিনি আরাফায় অবস্থান করছিলেন। তিনি এক ব্যক্তিকে এই মর্মে ঘোষণা করতে বললেন যে, হজ্ব হল আরাফা। যে ৮ তারিখ দিবাগত রাতে ফজরের পূর্বে আরাফায় পৌঁছল সে হজ্ব পেল।-জামে তিরমিযী ১/১৭৮

আরাফায় জুমআ

মাসআলা : আরাফার ময়দানে জুমআ পড়া জায়েয নয়। তাই এদিন শুক্রবার হলে হাজীগণ যোহর পড়বেন। কেননা আরাফার দিন শুক্রবার হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যোহর নামায পড়েছেন।-মানাসিক ১৯৬ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরাফার দিন যোহরের সময় যোহর-আসর একত্রে পড়েছেন।-সুনানে আবু দাউদ ১/২৬৫

অন্য হাদীসে আছে, এক ইয়াহুদী হযরত ওমর রা.কে বলল, আমীরুল মু’মিনীন, কুরআনের এমন একটি আয়াত আপনারা তেলাওয়াত করেন, যা আমাদের উপর অবতীর্ণ হলে আমরা সেই দিন ঈদ পালন করতাম। ওমর রা. বললেন, কোন আয়াতটি? সে বলল, ওমর রা. বললেন, আমি জানি, আয়াতটি কোথায় এবং কোন দিন অবতীর্ণ হয়েছে। আয়াতটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর জুমআর দিন আরাফার ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছে।-সহীহ মুসলিম ২/৪২০

মাসআলা : আরাফার ময়দানে ‘বাতনে উরানা’ নামক একটি স্থান রয়েছে। মসজিদে নামিরার পশ্চিমের কিছু অংশ এর অন-র্ভুক্ত। এখানে উকূফ গ্রহণযোগ্য নয়।

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘পূর্ণ আরাফা উকূফের স্থান তবে তোমরা ‘বতনে উরানা’ থেকে উপরে চলে আসবে।’-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪০৬৩ আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. বলেন, ‘বতনে উরানা ব্যতীত পূর্ণ আরাফাই উকূফের স'ান।’-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪০৬৮; আদ্দুররুল মুখতার ২/৫০৪

মুযদালিফার উদ্দেশে রওনা

মাসআলা : আরাফার ময়দান থেকে সূর্যাস্তে-র পর মাগরিবের নামায না পড়ে মুযদালিফার উদ্দেশে রওয়ানা হতে হবে। সূর্যাসে-র পর বিলম্ব না করাই শ্রেয়।-রদ্দুল মুহতার ২/৫০৮; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৩০

হযরত উসামা ইবনে যায়েদ রা. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরাফার উদ্দেশে রওনা হলেন। পথিমধ্যে এক উপত্যকায় নেমে ইসি-ঞ্জা সারলেন এবং অযু করলেন। আমি বললাম, নামায! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এই নামায সামনে রয়েছে। এরপর মুযদালিফায় এসে পূর্ণ অযু করলেন এবং ইকামত দিয়ে মাগরিব নামায আদায় করলেন।-সহীহ বুখারী ১/২২৭

৯ তারিখ দিবাগত রাত্রির মাগরিব ও ইশা

মাসআলা : আজ মাগরিব ও ইশা ইশার ওয়াক্তে মুযদালিফায় গিয়ে পড়তে হবে। কেউ যদি মুযদালিফায় পৌঁছার আগেই রাস-ায় মাগরিব-ইশা পড়ে নেয় কিংবা মুযদালিফায় পৌঁছার আগে শুধু মাগরিব পড়ে তবে উভয় ক্ষেত্রে মুযদালিফায় পৌঁছে পুনরায় মাগরিব-ইশা একত্রে পড়া জরুরি।-মানাসিক ২১৬, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৩০, গুনইয়াতুন নাসিক ১৬৪

হযরত উসামা ইবনে যায়েদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরাফা থেকে রওনা হয়ে মুযদালিফায় পৌঁছলেন। অতঃপর মাগরিব ও ইশা একত্রে আদায় করলেন।-সহীহ মুসলিম ১/৪১৬

বিখ্যাত তাবেয়ী মুহাম্মাদ রাহ. বলেন, ‘মুযদালিফার রাতে নামায শুধু মুযদালিফাতেই।’-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪২২৪ মাসআলা : মুযদালিফায় মাগরিব ও ইশা এক আযান ও এক ইকামতে পড়া উত্তম। পৃথক পৃথক ইকামতও জায়েয।-মানাসিক ২১৪, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৩০; রদ্দুল মুহতার ২/৫০৮

হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর রাহ. বলেন, আমরা আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. এর সঙ্গে মুযদালিফায় পৌঁছলাম। তিনি আমাদেরকে নিয়ে মাগরিব-ইশা এক ইকামতে আদায় করলেন। অতঃপর আমাদের দিকে ফিরে বললেন, ‘নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুযদালিফায় আমাদেরকে এভাবে নামায পড়িয়েছেন।’-সহীহ মুসলিম ১

হযরত আবু জা’ফর আল বাক্বির রাহ. বলেন, হযরত আলী রা. ও আবদুল্লাহ রা. প্রত্যেক যে নামায একত্রে পড়া হয় তা ভিন্ন আযান ও ইকামত দ্বারা পড়ার বিষয়ে একমত ছিলেন।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪২৫১

মাসআলা : ইশার ওয়াক্তের মধ্যে (সুবহে সাদিকের পূর্বে) মুযদালিফায় পৌঁছা সম্ভব না হলে পথিমধ্যে মাগরিব-ইশা পড়ে নিবে। এক্ষেত্রে মুযদালিফায় পৌঁছার পর ইশার ওয়াক্ত বাকী থাকলে এ দুই নামায পুনরায় পড়তে হবে।-তাবয়ীনুল হাকায়েক ২/২৮, আলবাহরুর রায়েক ২/৩৪২, আলমুহীতুল বুরহানী ৩/৪০৪, তাতারখানিয়া ২/৪৫৮, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৩০; গুনইয়াতুন নাসিক ১৬৪

বিখ্যাত তাবেয়ী তাউস রাহ. থেকে বর্ণিত, তিনি মুযদালিফা ব্যতীত অন্য কোনো স্থানে নামায পড়া মাকরূহ মনে করতেন। তবে প্রয়োজন বশত হলে মাকরূহ মনে করতেন না।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪২৩১

ইশার ওয়াক্তের পূর্বেই মুযদালিফা পৌঁছে গেলে

মাসআলা : যদি কেউ ইশার ওয়াক্তের পূর্বে মুযদালিফায় পৌঁছে যায় তবে সে তখন মাগরিব পড়বে না; বরং ইশার ওয়াক্ত হওয়ার পর মাগরিব-ইশা একত্রে আদায় করবে।-মানাসিক ২১৮; আদ্দুররুল মুখতার ২/৫০৯; গুনইয়াতুন নাসিক পৃ. ১৬৪ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাগরিবের নামায ইশার ওয়াক্তে আদায় করেছেন।-সহীহ মুসলিম ১/৪১৬; গুনইয়াতন নাসিক ১৬৭; মানাসিক মোল্লা আলী কারী পৃ. ২২০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৩০; আদ্দুররুল মুখতার ২/৫০৮

মাসআলা : মুযদালিফায় দুই নামায একত্রে পড়ার জন্য জামাত শর্ত নয়। একা পড়লেও দুই নামায একত্রে ইশার সময় পড়বে। তবে নিজেরা জামাত করে পড়া ভালো।-মানাসিক ২১৪, গুনইয়াতুন নাসিক ১৬৩-১৬৪

মাসআলা : কেউ যদি দুই নামাযের মাঝে নফল বা সুন্নত নামায পড়ে কিংবা অন্য কোনো কাজে বিলম্ব করে যেমন খানা-খাওয়া ইত্যাদি তবে ইশার জন্য ভিন্ন ইকামত দেওয়া উচিত।-মানাসিক ২১৯

হযরত উসামা ইবনে যায়েদ রা. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরাফার উদ্দেশে রওনা হলেন। পথিমধ্যে এক উপত্যকায় নেমে ইসি-ঞ্জা সারলেন এবং হালকা অযু করলেন। উসামা রা. বলেন, আমি তাঁকে মাগরিব নামায সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, এই নামায সামনে। এরপর মুযদালিফায় এসে পূর্ণ অযু করলেন এবং ইকামত দিয়ে মাগরিব নামায আদায় করলেন। অতঃপর প্রত্যেকে নিজ নিজ উট স্বস্থানে বসাল। এরপর ইকামত দিয়ে ইশার নামায আদায় করলেন। এ দুই নামাযের মাঝে অন্য কোনো নামায পড়েননি।-সহীহ বুখারী ১/২২৭ মাসআলা : মুযদালিফায় রাত্রি যাপন করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা।

হযরত জাবির রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুযদালিফায় এসে মাগরিব ও ইশার নামায আদায় করলেন। এরপর সুবহে সাদিক পর্যন- শয্যাগ্রহণ করলেন।-সহীহ মুসলিম ১/৩৯৮

৩য় দিন ১০ যিলহজ্ব

উকূফে মুযদালিফা

মাসআলা : উকূফে মুযদালিফার সময় ১০ তারিখ সুবহে সাদিক থেকে সূর্যোদয়ের পূর্ব পর্যন্ত-। সুবহে সাদিকের পর সামান্য কিছু সময় অবস'ান করে মুযদালিফা ত্যাগ করলেও ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। তবে সূর্যোদয়ের কিছু পূর্ব পর্যন- অপেক্ষা করা সুন্নত। এ বিষয়ক কিছু মারফূ হাদীস ইতিপূর্বে উল্লেখিত হয়েছে।-মানাসিক ২১৫, ২১৮; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৩০; গুনইয়াতুন নাসিক ১৬৫

হযরত কাসেম রাহ. বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রা.কে বলতে শুনেছি, হজ্বের একটি সুন্নত এই যে, ফজরের নামায পড়ে মুযদালিফায় অবস্থান করবে। যখন (সূর্যোদয়ের পূর্বে) আলো ছড়িয়ে পড়ে তখন রওনা হবে।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫৫৬৫

মাসআলা : উকূফে মুযদালিফা ওয়াজিব। তাই বিশেষ ওযর ব্যতীত নির্ধারিত সময়ে উকূফ না করলে দম ওয়াজিব হবে। বিখ্যাত তাবেয়ী আতা রাহ. বলেন, যে ব্যক্তি মুযদালিফার নিকবর্তী হল অথচ তাতে অবতরণ করল না তার উপর দম আসবে।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস :১৫৪৬৮

ইবরাহীম রাহ. বলেন, যে ব্যক্তি মুযদালিফার পাশ দিয়ে অতিক্রম করল অথচ তার জানা নেই যে, এখানে উকূফ করতে হয় ফলে সে উকূফ না করে মিনায় চলে গেল তাকে দম দিতে হবে।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫৪৬৬ মাসআলা : ভিড়ের কারণে সূর্যোদয়ের আগে মুযদালিফায় পৌঁছা সম্ভব না হলে দম ওয়াজিব হবে না।-মানাসিক ২১৯; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৩১; আদ্দুররুল মুখতার ২/৫১১

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, মুযদালিফার রাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আব্বাস রা.কে বললেন, তুমি আমাদের দুর্বল ব্যক্তি ও নারীদেরকে নিয়ে মিনার উদ্দেশে রওনা হও। সেখানে তোমরা ফজরের নামায আদায় করবে। এরপর মানুষের ভিড়ের আগেই রমী করবে।-শরহু মাআনিল আছার ১/৪৩৬

উকূফের স্থান

মাসআলা : মুযদালিফা ময়দানের যেকোনো অংশেই উকূফ করা যায়। তবে মসজিদে মাশআরে হারামের নিকট উকূফ করা উত্তম। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. নিজ পরিবারের দুর্বল ব্যক্তিদেরকে অগ্রসর করে দিতেন। তারা মুযদালিফায় এসে রাতে মাশআরে হারামের নিকটে অবস্থান করতেন এবং যতক্ষণ ইচ্ছা যিকিরে মশগুল থাকতেন।’-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪০৭৫; সহীহ মুসলিম ১/৪১৮ হযরত ইবরাহীম নাখঈ রাহ. বলেন, ‘সাহাবায়ে কেরাম মুযদালিফায় পাহাড়ের সমান-রালে উকূফ করতে পছন্দ করতেন।’-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪০৭৬

মাসআলা : মুযদালিফার বাইরে মিনার দিকে ‘ওয়াদিয়ে মুহাস্সির’ নামক স্থানে উকূফ করা যাবে না। কারণ এখানে উকূফ করা নিষিদ্ধ। এ স্থানের উকূফ ধর্তব্য নয়।-গুনইয়াতুন নাসিক ১৬৭; মানাসিক মোল্লা আলী কারী পৃ. ২২০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৩০; আদ্দুররুল মুখতার ২/৫০৮ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, ‘বতনে মুহাসসির ব্যতীত পুরো মুযদালিফা উকূফ করার স্থান।’-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪০৭২, ১৪০৭১

মাসআলা : অতিশয় বৃদ্ধ, দুর্বল কিংবা অধিক পীড়িত ব্যক্তির জন্য মুযদালিফায় অবস্থান না করে আরাফা থেকে সোজা মিনায় চলে যাওয়ার অনুমতি আছে। এতে তাদের উপর দম বা কোনো কিছু ওয়াজিব হবে না।-মানাসিক ২১৯; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৩১

উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রা. বলেন, মুযদালিফার রাতে সওদা রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট মিনায় চলে যাওয়ার অনুমতি চাইলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে অনুমতি দিলেন। কেননা সওদা ছিলেন তখন ভারী ও ধীর গতিসম্পন্ন।-সহীহ বুখারী ১/২২৮

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুযদালিফার রাতে তাঁর পরিবারের দুর্বল ব্যক্তিদের সঙ্গে যাদের পূর্বেই পাঠিয়ে দিয়েছিলেন আমি তাদের মধ্যে শামিল ছিলাম।’-সহীহ বুখারী ১/২২৭

১০ম যিলহজ্বের দ্বিতীয় ওয়াজিব জামরায়ে আকাবার রমী

রমীর পদ্ধতি

মাসআলা : রমী অর্থ কংকর নিক্ষেপ করা। মসজিদে হারামের দিক থেকে সর্বশেষ কংকর নিক্ষেপের স্থানকে ‘জামরা আকাবা’ বলে। এখানে ৭টি কংকর নিক্ষেপ করতে হয়।

আবদুল্লাহ ইবনে ইয়াযীদ বলেন, ‘হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. ‘বাতনে ওয়াদী’ থেকে জামরা আকাবায় ৭টি কংকর নিক্ষেপ করলেন এবং প্রতি কংকর নিক্ষেপের সময় তাকবীর বললেন।’-সহীহ মুসলিম ১/৪১৮, ৪২০

মাসআলা : কংকর নিক্ষেপের স্থানে যে চওড়া দেয়াল আছে তাতে কংকর লাগানো জরুরি নয়; বরং বেষ্টনীর ভিতরে পড়াই যথেষ্ট। দেয়ালের কংকর লেগে তা যদি বেষ্টনীর বাইরে গিয়ে পড়ে তবে তা ধর্তব্য হবে না, ঐ কংকর পুনরায় নিক্ষেপ করতে হবে। কংকর দেয়ালের গোড়ায় মারা ভালো। দেয়ালের উপরের অংশে মারা অনুত্তম।-গুনইয়াতুন নাসিক ১৭১ রদ্দুল মুহতার ২/৫১২

মাসআলা : প্রথম দিনের সাতটি কংকর মুযদালিফা থেকে সংগ্রহ করা মুস্তাহাব। মুজাহিদ রাহ. বলেন, তিনি জামারাতে নিক্ষেপের জন্য মুযদালিফা থেকে কংকর সংগ্রহ করতেন।’-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৩৬২৩ তাবেয়ী মাকহুল বলেন, ‘মুযদালিফা থেকে কংকর সংগ্রহ করো।’-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৩৬২৬ অন্য বর্ণনায় আছে যে, মুজাহিদ রাহ.ও মুযদালিফা থেকে কংকর সংগ্রহ করতেন।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৩৬২৩ অবশ্য অন্য জায়গা থেকে নিলেও ক্ষতি নেই।

বিখ্যাত তাবেয়ী আতা রাহ. ও সায়ীদ ইবনে জুবাইর রাহ. থেকে বর্ণিত, তারা বলেন, ‘যেখান থেকে ইচ্ছা কংকর সংগ্রহ করতে পার।’-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৩৬২৮, ১৩৬২৪

মাসআলা : জামরার নিকট থেকে কংকর নিবে না। কারণ, এই স'ানের পাথরগুলো হাদীসের ভাষ্যমতে আল্লাহ তাআলার দরবারে ধিকৃত। যাদের হজ্ব কবুল হয়নি তাদের কংকর এখানে পড়ে থাকে।

এ সংক্রান্ত- পূর্ণ হাদীসটি হল, হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. বলেন, আমরা বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ, প্রতি বছর এই যে কংকরগুলো নিক্ষেপ করা হয় আমাদের মনে হয় এগুলোর পরিমাণ হ্রাস পেয়ে যায়। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে কংকরগুলো কবুল হয় তা উঠিয়ে নেওয়া হয়। (অর্থাৎ যার হজ্ব কবুল হয় তার নিক্ষিপ্ত কংকর আল্লাহর পক্ষ হতে উঠিয়ে নেওয়া হয়।) যদি এটা না হত তবে তোমরা পাহাড় পরিমাণ কংকরের স'প দেখতে পেতে।-মুসতাদরাকে হাকেম হাদীস : ১৭৯৫ আরো দেখুন : মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫৫৭২, ১৫৫৭৩ মাসআলা : পরবর্তী দিনের কংকর মুযদালিফা থেকে নেওয়া মুস্তাহাব নয়। জামরার নিকট থেকে নেবে না, অন্য যেকোনো স'ান থেকে নিতে পারবে। -মানাসিক মোল্লা আলী কারী পৃ. ২২২, গুনইয়াতুন নাসিক ১৬৮, আদ্দুররুল মুখতার ৫১৫

কংকর কেমন হবে

মাসআলা : বুট বা ছোলার দানার মতো ছোট কংকর মারা ভালো। বড়জোর খেজুরের বিচির মতো হতে পারে। বড় পাথর মারা মাকরূহ। তদ্রূপ নাপাক কংকর মারাও মাকরূহ। কংকর নাপাক হওয়ার আশঙ্কা থাকলে তা ধুয়ে নিক্ষেপের কাজে ব্যবহার করা যাবে। -মানাসিক মোল্লা আলী কারী পৃ. ২২২

জামরা আকাবাতে রমীর সময়

মাসআলা : সম্ভব হলে ১০ যিলহজ্ব সূর্যোদয়ের পর থেকে সূর্য ঢলে যাওয়া পর্যন- সময়ের ভিতর রমী করা মুস্তাহাব। হযরত জাবির রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘ইয়াওমুন নাহর’ (অর্থাৎ ১০ যিলহজ্ব) চাশতের সময় রমী (কংকর নিক্ষেপ) করেছেন। আর পরবর্তী দিবসসমূহের রমী সূর্য ঢলে যাওয়ার পরে করেছেন।-সহীহ মুসলিম ১/৪২০ তবে ১০ তারিখ সুবহে সাদিক থেকে ১০ তারিখ দিবাগত রাতের সুবহে সাদিক পর্যন- রমী করা জায়েয। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, ১০ যিলহজ্ব মিনায় এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করল, আমি সন্ধ্যার পর রমী করেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘কোনো সমস্যা নেই।’-সহীহ বুখারী ১/২৩৪

উল্লেখ্য, বিনা ওজরে মুস্তাহাব সময় রমী না করে অন্য সময় রমী করা মাকরূহ। কিন' আজকাল যেহেতু মুস্তাহাব সময়ে রমীর স্থানে প্রচণ্ড ভিড় হয় তাই মহিলা ও দুর্বলদের মতো অন্যদের জন্যও মুস্তাহাব সময়ের বাইরে রমী করার অবকাশ রয়েছে। ওজর থাকার কারণে তা মাকরূহ হবে না।-গুনইয়াতুন নাসিক ১৬৯-১৭০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ২৩৩

হযরত সাফিয়্যার কন্যা মুযদালিফায় সন্তান প্রসব করলেন। তখন মা ও কন্যা মুযদালিফায় রয়ে গেলেন। ১০ যিলহজ্ব দিবাগত রাতে তাঁরা মিনায় এসে কংকর নিক্ষেপ করলেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. তাদেরকে কিছু বলেননি এবং কোনো ধরনের কাযা আদায় করারও আদেশ করেননি।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫৫৫৩

সাত কংকর সাত বারে মারতে হবে

মাসআলা : কেউ যদি সাত কংকর একবারে নিক্ষেপ করে তবে এক কংকর মারা হয়েছে বলা হবে। এক্ষেত্রে আরো ছয়টি কংকর পৃথক পৃথক মারতে হবে।-আহকামে হজ্ব ৭৫ হযরত জাবির রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হজ্বের বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন, ‘এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জামরাতুল কুবরার নিকট এলেন এবং সাতটি কংকর নিক্ষেপ করলেন। প্রতিটি কংকর নিক্ষেপের সময় তাকবীর বলেন।’ -সহীহ মুসলিম ১/৩৯৯ মাসআলা : জামরা আকাবার রমীর পর দুআর জন্য এখানে অবস্থান না করা সুন্নত। তাই আজ কংকর মেরে দুআর জন্য বিলম্ব করবে না; বরং কংকর মেরে দ্রুত স্থান ত্যাগ করবে।-মানাসিক ২২৪

আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বাতনে ওয়াদী থেকে জামরা আকাবায় কংকর নিক্ষেপ করতেন। অতঃপর জামরা আকাবার নিকট অবস্থান না করে স্থান ত্যাগ করতেন এবং বলতেন, আমি রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এভাবে করতে দেখেছি।-সহীহ বুখারী ১/২৩৬ আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আছ রা. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জামরা আকাবায় এসে কংকর নিক্ষেপ করেছেন অতঃপর সেখানে অবস্থান করেননি।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৩৫৭৪

সময়মতো রমী না করলে

মাসআলা : ১০ তারিখ দিবাগত রাতের সুবহে সাদিকের আগে জামরা আকাবার রমী করতে না পারলে ইমাম আবু হানীফা রহ.-এর মতে দম ওয়াজিব হবে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলতেন, যে ব্যক্তি হজ্বের কোনো (ওয়াজিব) আমল ভুলে যায় অথবা ছেড়ে দেয় তার জন্যে দম দেওয়া জরুরি।-মুয়াত্তা মুহাম্মাদ পৃ. ২৩৫ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, যে ব্যক্তি হজ্বের কোনো (ওয়াজিব) আমল নির্ধারিত সময়ের আগে বা পরে আদায় করে তার জন্য দম দেওয়া জরুরি।-শরহু মাআনিল আছার ১/৪৪৭ ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ রহ.-এর মতে দম ওয়াজিব হবে না। বেশি মাজুর ব্যক্তিগণ এই মত গ্রহণ করতে পারেন। তবে ১৩ তারিখ সূর্যাসে-র আগে রমী সমাপ্ত করতে হবে। এরপরে কংকর মারার অবকাশ নেই। এক্ষেত্রে কংকর না মারার কারণে সবার মতেই ভিন্ন দম ওয়াজিব হবে।-আহকামে হজ্ব ৭৬ ইবনে আব্বাস রা. বলতেন, যে ব্যক্তি হজ্বের (ওয়াজিব) আমলের থেকে কোনো আমল ভুলে যায় অথবা ছেড়ে দেয় তার জন্য দম দেওয়া ওয়াজিব।-মুয়াত্তা মুহাম্মাদ পৃ. ২৩৫

অন্যকে দিয়ে রমী করানো

মাসআলা : প্রত্যেক হাজী পুরুষ হোক বা মহিলা, নিজের রমী নিজেই করবে। ভিড়ের কারণে কিংবা অন্য কোনো শরয়ী ওযর ব্যতীত অন্যের দ্বারা রমী করানো জায়েয নয়। শরয়ী ওযর ব্যতীত অন্যকে দিয়ে রমী করালে তা আদায় হবে না। এক্ষেত্রে ওই ব্যক্তিকে পুনরায় নিজের রমী করতে হবে। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি তার বাচ্চাদেরকে হজ্ব করাতেন। তাদের মধ্যে যারা নিজেরা রমী করতে পারত তারা নিজেরাই রমী করত। আর যারা রমী করতে অক্ষম ছিল তাদের পক্ষ থেকে রমী করা হত।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪০২৯ মাসআলা : উপরোক্ত ক্ষেত্রে যদি নিজের রমী পুনরায় না করে তবে দম ওয়াজিব হবে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলতেন, যে ব্যক্তি হজ্বের কোনো ওয়াজিব আমল ভুলে যায় অথবা ছেড়ে দেয় তার জন্য দম দেওয়া জরুরি।-মুয়াত্তা মুহাম্মাদ পৃ. ২৩৫

মাসআলা : শরয়ী ওযর হল এমন অসুস'তা বা দুর্বলতা যার কারণে বসে নামায পড়া জায়েয। অথবা অসুস'তার কারণে জামরাত পর্যন- পৌঁছানো খুবই কষ্টকর হয় কিংবা রোগ অতিমাত্রায় বেড়ে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে তবে এরূপ ব্যক্তি অন্যকে দিয়ে রমী করাতে পারবে।-আহকামে হজ্ব ৭৬-৭৭ আতা রাহ. বলেন, ‘অসুস' ব্যক্তির পক্ষ থেকে রমী করা যাবে।’-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪০২১ তাউস রাহ. কে এক অসুস' মহিলা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, ‘তার পক্ষ থেকে তার পরিবারের কেউ রমী করে নিবে।’-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪০২৬

মাসআলা : মাজুর ব্যক্তির পক্ষ থেকে রমী করার জন্য তার অনুমতি লাগবে। বিনা অনুমতিতে কেউ তার পক্ষ থেকে রমী করলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। তবে অচেতন, পাগল এবং ছোট বাচ্চার অনুমতি ছাড়া তাদের পক্ষ থেকে অভিভাবক রমী করতে পারবে। -আহকামে হজ্ব ৭৭ মাসআলা : যে ব্যক্তি অন্যের পক্ষ থেকে রমী করবে, তার জন্য উত্তম হল প্রথমে নিজের রমী সমাপ্ত করা তারপর বদলী রমী করা। একটি কংকর নিজের পক্ষ থেকে দ্বিতীয়টি অন্যের পক্ষ থেকে-এভাবে মারা মাকরূহ। তাই প্রথমে নিজের সাত কংকর নিক্ষেপ করবে এরপর বদলী আদায় করবে। -আহকামে হজ্ব ৭৭

মাসআলা : ঋতুমতী মহিলাগণও রমী করতে পারবে। উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা রা. বলেন, আমি যখন মক্কায় এলাম তখন ঋতুমতী ছিলাম। তাই তাওয়াফ ও সাফা-মারওয়ার মাঝে সায়ী থেকে বিরত থাকলাম। এরপর রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট সমস্যা তুলে ধরলে তিনি বললেন, হাজীরা যেসব কাজ করে তুমিও তা করতে থাক তবে পবিত্র হওয়ার আগে বাইতুল্লাহর তাওয়াফ করবে না।-সহীহ বুখারী ১/২২৩ ১০ম যিলহজ্বের তৃতীয় ওয়াজিব

দমে শোকর বা হজ্বের কুরবানী

মাসআলা : তামাত্তু ও কিরান হজ্ব আদায়কারীদের জন্য একটি কুরবানী করা ওয়াজিব। আল্লাহ তাআলা বলেন, তারপর যখন তোমরা নিরাপদে থাক তখন যে ব্যক্তি উমরাকে হজ্বের সঙ্গে একত্র করে লাভবান হয় সে (যবেহ করবে) কুরবানী, যে পশু সহজলভ্য হয় ...।-সূরা বাকারা : ১৯৬ ইবনে ওমর রা. বলেন, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কায় এলেন তখন লোকদেরকে লক্ষ করে বললেন, তোমাদের মধ্যে যারা কুরবানীর পশু সঙ্গে এনেছ তারা যেন হজ্ব সম্পন্ন করার পূর্বে হালাল (ইহরামমুক্ত) না হয়। আর যারা কুরবানীর পশু সঙ্গে আনেনি তারা তাওয়াফ করবে এবং সাফা-মারওয়ার মাঝে সায়ী করে চুল ছেঁটে হালাল হয়ে যাবে। অতঃপর (নির্ধারিত সময়ে) হজ্বের ইহরাম গ্রহণ করবে এবং কুরবানী করবে ...।-সহীহ মুসলিম ১/৪০৩

এক বর্ণনায় আছে যে, ছুবাই ইবনে মা’বাদ রাহ. হজ্বে কিরান করলেন। তাকে উমর রা. ভেড়া যবাই করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪০৪৩ অনুরূপ বিষয় উমর ইবনে আবদুল আযীয, ইবরাহীম ও আতা রাহ. থেকেও বর্ণিত আছে।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪০৪৭, ১৪০৪৩, ১৫৫৯৮

মাসআলা : জামরায়ে আকাবার রমীর পর কুরবানী করবে এবং মাথা মুণ্ডাবে। আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিনায় এসে জামরায়ে আকাবায় রমী করলেন। অতঃপর মিনায় নিজ অবস্থানস্থলে ফিরে গেলেন এবং কুরবানী করলেন। অতঃপর ক্ষৌরকারকে মাথা মুণ্ডাতে বললেন। প্রথমে ডান পাশের চুলের দিকে ইশারা করলেন অতঃপর বাম পাশের চুলের দিকে। অতঃপর চুল মোবারক উপসি'ত লোকদের মাঝে বিতরণ করে দিলেন।-সহীহ মুসলিম ১/৪২১

মাসআলা : ইফরাদ হজ্বকারীর উপর হজ্বের কুরবানী করা ওয়াজিব নয়। তবে করলে ভালো। সায়ীদ ইবনুল মুসাইয়িব রাহ. বলেন, যে ব্যক্তি হজ্বের মাসে অর্থাৎ শাওয়াল, যিলকদ, যিলহজ্বে উমরা করল, অতঃপর হজ্ব সম্পন্ন করা পর্যন- সেখানে অবস্থান করল সে তামাত্তুকারী, তার কর্তব্য যা কিছু সহজলভ্য তা দিয়ে কুরবানী করা। অথবা কুরবানীর পশু না পাওয়া গেলে রোযা রাখা। আর যে ব্যক্তি হজ্বের মাসে উমরা করার পর তার পরিবারের কাছে ফিরে এল তারপর ঐ বছরই হজ্ব করল সে তামাত্তুকারী নয়।-মুয়াত্তা মুহাম্মাদ পৃ. ২১৯ আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, যে ব্যক্তি হজ্ব করল এবং কুরবানী করল সে একটি হজ্ব ও একটি উমরা করে নিজ পরিবারে প্রত্যাবর্তন করল।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪৪০৬

মাসআলা : ইফরাদ হজ্বকারীদের যেহেতু ওয়াজিব কুরবানী নেই তাই তারা রমীর পরই চুল কাটতে পারবে। রমীর আগে চুল কাটলে দম ওয়াজিব হবে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, যে ব্যক্তি হজ্বের কোনো (ওয়াজিব) আমল নির্ধারিত সময় থেকে আগে বা পরে করল তার উপর দম ওয়াজিব হবে।-শরহু মাআনিল আছার ১/৪৪৭

দমে শোকর বা হজ্বের কুরবানীর সময়

মাসআলা : ১০ যিলহজ্ব সুবহে সাদিকের পর থেকে ১২ যিলহজ্ব সূর্যাসে-র আগ পর্যন- সময়ের ভিতর কুরবানী করতে হবে। সুন্নত সময় শুরু হয় ১০ যিলহজ্ব সূর্যোদয়ের পর থেকে। ইকরামা রাহ. বলেন, আমি তামাত্তু হজ্ব করলাম, কিন' কুরবানী করতে ভুলে গেলাম। ইতিমধ্যে (কুরবানীর) দিনগুলো অতিবাহিত হয়ে গেল। তখন আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.কে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, (তুমি দু’টি কুরবানী করবে) তামাত্তুর জন্য একটি এবং বিলম্ব করার কারণে একটি।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫৭০৯ আলী ইবনে আবী তালিব রা. বলেছেন, ‘রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদেরকে তিন দিনের অধিক কুরবানীর পশুর গোশত খেতে নিষেধ করেছেন।’-সহীহ বুখারী ২/৮৩৫ আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, কুরবানীর সময় হল কুরবানীর দিনের পর আরো দুই দিন।-আল ইসতিযকার ১৫/১৯৭; রদ্দুল মুহতার ২/৫৩২

কুরবানীর স্থান

মাসআলা : হজ্বের কুরবানী হরমের সীমার ভিতরে করা জরুরি। হরমের বাইরে জবাই করলে হজ্বের কুরবানী আদায় হবে না। হে মুমিনগণ, ইহরামে থাকা অবস্থায় তোমরা শিকার-জন্তু হত্যা করো না। তোমাদের মধ্যে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে তা হত্যা করলে (তার উপর) বিনিময় (ওয়াজিব হবে) যা সেই পশুর সমতুল্য হয় যা সে হত্যা করেছে, যার ফয়সালা করবে তোমাদের মধ্যে দুই জন নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি। কাবাতে প্রেরিতব্য কুরবানীরূপে-অথবা ...।-সূরা মাইদা : ৯৫ জুনদুব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (হুদায়বিয়ার বছর) যখন কুরবানীর পশু হেরেমে নিয়ে যেতে বাধা দেওয়া হল তখন আমি রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে আরয করলাম, আল্লাহর রাসূল! কুরবানীর পশুগুলো আমার কাছে দিন, আমি তা হরমের ভিতরে নিয়ে জবাই করব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কীভাবে হেরেমের ভিতর নিয়ে যাবে? আমি বললাম, এমন উপত্যকা দিয়ে নিয়ে যাব যে, মক্কার কাফিররা আমাকে ধরতে পারবে না। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পশুগুলো আমার কাছে সমর্পণ করলেন এবং আমি তা হরমে নিয়ে কুরবানী করলাম।-শরহু মাআনিল আছার ১/৪৫০

মাসাআলা : হেরেমের যে কোনো স্থানে কুরবানী করা যায়। মিনাতে করা জরুরি নয়। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. মক্কায় কুরবানী করতেন এবং আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. মিনায়।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫৭৭৭ জাবির রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘গোটা মিনা কুরবানীর স্থান এবং মক্কার সকল গলি চলার পথ ও কুরবানীর স্থান।’-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫৭৭৩; রদ্দুল মুহতার ২/৫৩২ হাজীদের জন্য ঈদুল আযহার কুরবানী

মাসআলা : মুসাফিরের উপর ঈদুল আজহার কুরবানী ওয়াজিব নয়। সুতরাং যারা ১০-১২ তারিখ সূর্যাস- পর্যন- মুসাফির থাকবে তাদের উপর ঈদুল আযহার কুরবানী ওয়াজিব হবে না। ইবরাহীম রাহ. বলেন, উমর রা. হজ্ব করতেন এবং ফিরে যাওয়া পর্যন- কোনো কিছু কুরবানী করতেন না।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪৩৯৪ অন্য বর্ণনায় আছে যে, উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা রা. হজ্ব করতেন এবং তাঁর ভাতিজাদের পক্ষ থেকে কুরবানী করতেন না।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪৩৯৭

মাসআলা : যারা মিনায় রওনা হওয়ার আগে মক্কাতেই ১৫ দিনের নিয়তে অবস্থান করেছে তারা মুকীম। তাদেরকে হজ্বের কুরবানী ছাড়াও ঈদুল আযহার ভিন্ন কুরবানী দিতে হবে।-রদ্দুল মুহতার ২/৫১৫

আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে কুরবানী করল না সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটেও না আসে।’-সুনানে ইবনে মাজা পৃ. ২২৬ হজ্বের কুরবানীর গোশত

মাসআলা : হজ্বের কুরবানীর গোশত ঈদুল আযহার কুরবানীর মতো। হাজী নিজেও তা খেতে পারবে। হযরত জাবির রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর স্থানে গিয়ে নিজ হাতে ৬৩টি পশু জবাই করলেন। অতঃপর আলী রা.কে দিলেন। তিনি অবশিষ্ট পশুগুলো জবাই করলেন। তাকে কুরবানীর পশুতে শরীক করেন। এরপর প্রত্যেক পশু থেকে এক টুকরা গোশত নিয়ে রান্না করার নির্দেশ দিলেন। রান্না হওয়ার পর উভয়ে তা আহার করলেন।-সহীহ মুসলিম ১/৩৯৯ সায়ীদ ইবনে যুবাইর রাহ. বলেন, ‘নফল ও তামাত্তু কুরবানীর গোশত আহার করা যেতে পারে।’-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫৫৮৪ হজ্বের কুরবানীর সামর্থ্য না থাকলে

মাসআলা : তামাত্তু ও কিরানকারী কোনো হাজীর যদি হজ্বের কুরবানীর সামর্থ্য না থাকে তাহলে তাকে ১০টি রোযা রাখতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, তারপর যখন তোমরা নিরাপদে থাক তখন যে ব্যক্তি উমরাকে হজ্বের সঙ্গে একত্র করে লাভবান হয় সে (যবেহ করবে) কুরবানী, যা সহজলভ্য হয় আর যে তা না পায় (সে) রোযা রাখবে তিন দিন হজ্বের সময়, আর সাত দিন যখন তোমরা হজ্ব হতে প্রত্যাবর্তন করবে। এই পূর্ণ দশ দিন।-সূরা বাকারা : ১৯৬

আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি হজ্বের কুরবানীর পশু পাবে না তার জন্য হজ্বের মাঝে তিনটি এবং নিজ পরিবারে ফিরে যাওয়ার পর সাতটি রোযা রাখা জরুরি।’-সহীহ বুখারী ১/২২৯ মাসআলা : ৩টি রোযা আরাফার দিন পর্যন- শেষ হতে হবে। আর বাকী সাতটি পরবর্তীতে সুযোগমতো রাখা যাবে। হযরত আলী রা. উপরোক্ত তিন রোযা সম্পর্কে বলেন, ‘ইয়াওমুত তারবিয়ার পূর্বের দিন, ইয়াওমুত তারবিয়া ও ইয়াউমে আরাফায় (অর্থাৎ ৭, ৮ ও ৯ যিলহজ্ব) উক্ত তিন রোযা।’-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫৩৮০

আল্লাহ তাআলার বাণী-‘হজ্বের মাঝে তিন দিন’ প্রসঙ্গে ইমাম শাবী রাহ. থেকেও উপরোক্ত তিন দিনের কথা বর্ণিত হয়েছে।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫৩৮৭ আতা রাহ. বলেন, যিলহজ্বের দশ দিনের প্রথম দিকেও রাখা যায়, মাঝেও রাখা যায় তবে শেষ দিন হল ইয়াওমে আরাফা।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫৩৮৩

মাসআলা : আরাফার দিন সহ তিনটি রোযা রাখা না হলে তার জন্য কুরবানী দেওয়াই জরুরি হয়ে যাবে। প্রখ্যাত তাবেয়ী মুজাহিদ রাহ. বলেন, যে ব্যক্তি ইয়াওমুত তারবিয়ার পূর্বের দিন, ইয়াওমুত তারবিয়া ও ইয়াওমে আরাফা মিলে উক্ত তিন রোযা রাখল না তার এই রোযা ছুটে গেছে।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫৩৮৯ আতা ও সায়ীদ ইবনে যুবায়ের রাহ. বলেন, যে তামাত্তু হজ্ব করেছে, কিন' কুরবানী করেনি এবং রোযাও রাখেনি তার উপর দম ওয়াজিব।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫৭১১

মাসআলা : যে ব্যক্তি আরাফার দিন পর্যন- তিনটি রোযা পূর্ণ করতে সক্ষম হল না সে তাৎক্ষণিক কুরবানীর ব্যবস্থা করতে না পারলে চুল কাটবে এবং পরবর্তীতে দুটি পশু যবেহ করবে। একটি হজ্বের কুরবানী হিসাবে। অপরটি কুরবানী না করে চুল কাটার কারণে। সায়ীদ ইবনে যুবায়ের রাহ. বলেন, যে ব্যক্তি হজ্বের কোনো আমল নির্ধারিত সময়ের পূর্বে করল অথবা কুরবানীর পূর্বে চুল মুণ্ডন করল তার উপর দম ওয়াজিব।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫১৮৯ মাসআলা : হজ্বের কুরবানীতে ঈদুল আযহার কুরবানীর ন্যায় গরু, মহিষ, উটের সাত ভাগের একভাগ দেওয়া যাবে। এ ছাড়া ছাগল, ভেড়া, দুম্বাও কুরবানী করা যাবে।

আবু জামরা রাহ. বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.কে তামাত্তু সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি আমাকে তা করার আদেশ দিলেন। এরপর হজ্বের কুরবানীর পশু সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, ‘হজ্বের কুরবানীতে উট, গরু, ছাগল কিংবা এক পশুতে শরীক হয়ে কুরবানী করতে পারবে।’-সহীহ বুখারী ১/২২৮

১০ যিলহজ্বের চতুর্থ ওয়াজিব মাথা মুণ্ডানো বা চুল ছোট করা

মাথা মুণ্ডানোর সময়

মাসআলা : ১০ যিলহজ্ব কুরবানীর পর থেকে ১২ যিলহজ্ব সূর্যাসে-র পূর্ব পর্যন্ত- মাথা মুণ্ডানোর সুযোগ আছে। এর চেয়ে বিলম্ব করলে দম ওয়াজিব হবে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, যে ব্যক্তি হজ্বের কোনো ওয়াজিব আমল তার নির্দিষ্ট সময় থেকে আগে বা পরে করল তার জন্য দম দেওয়া জরুরি।-শরহু মাআনিল আছার ১/৪৪৭

মাসআলা : অবশ্য ১০ যিলহজ্ব মাথা না মুণ্ডালে ইহরাম থেকে মুক্ত হতে পারবে না। ১২ তারিখ রমী করে মাথা মুণ্ডাবে। ১১ ও ১২ তারিখ ইহরাম অবস্থায় রমী করতে হবে। উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, যখন তোমাদের রমী, কুরবানী ও চুল মুণ্ডন সমাপ্ত হল তখন স্ত্রী ছাড়া সবকিছু তোমাদের জন্য হালাল।-আলক্বিরা লিমাক্বাসিদি উম্মিল কুরা পৃ. ৪৭১; হিদায়া ১/২৭৬; গুনইয়াতুন নাসিক ১৭৫; রদ্দুল মুহতার ২/৫৫৪; বাদায়েউস সানায়ে ২/৩৩০; মাবসূতে সারাখসী ৪/৭০

চুল কাটার পরিমাণ

মাসআলা : মাথার চুল না মুণ্ডিয়ে যদি খাটো করে তবে আঙুলের এক কর (প্রায় এক ইঞ্চি) পরিমাণ ছোট করা ওয়াজিব। মহিলাগণ অন-ত এতটুকু ছোট করবে। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. বলেন, ‘মহিলাগণ ইহরাম অবস্থায় চুল একত্র করে তা থেকে আঙুলের এক কর পরিমাণ ছোট করবে।’-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৩০৬৫

ইবরাহীম রাহ. বলেন, ‘মহিলাগণ আঙুলের এক কর পরিমাণ চুল ছোট করবে।’-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৩০৭৩ মাসআলা : এ পরিমাণ চুল মাথার এক চতুর্থাংশ থেকে কাটা হলেই হালাল হয়ে যাবে। হযরত হাসান বসরী রাহ. বলেন, মুহরিম মহিলা তার ললাটের কেশগুচ্ছ থেকে চুল কাটবে। হযরত হাফসা বিনতে সীরীন রাহ. বলেন, আমার কাছে এটাই ভালো মনে হয় যে, যুবতী নারী চুল বেশি পরিমাণে কাটবে না। আর বৃদ্ধা নারী অধিক কাটতে পারবে। তবে সেও এক চতুর্থাংশের বেশি চুল কাটবে না।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৩০৬৮ মাসআলা : মাথার এক অংশ মুড়িয়ে অন্য অংশে চুল রাখা বা ছোট বড় করে রাখা মাকরূহ তাহরীমী। তাই এমন করবে না। -রদ্দুল মুহতার ২/৫১৫; মানাসিক পৃ. ২২৯

মাসআলা : মাথা মুণ্ডানো বা চুল কাটার আগে নখ বা শরীরের অতিরিক্ত পশম কাটা যাবে না। যদি কাটে তবে জরিমানা দিতে হবে।-গুনইয়াতুন নাসিক পৃ. ১৭৪; রদ্দুল মুহতার ২/৫১৫

মাসআলা : জামরা আকাবার কংকর নিক্ষেপের পর হজ্ব আদায়কারী নিজের চুল কাটার আগে অন্যের চুল কাটতে পারবে। ইবনে জুরাইজ রাহ. বলেন, আমি আতা রাহ.কে জিজ্ঞাসা করলাম, এক ব্যক্তি জামরা আকাবার রমী (কংকর নিক্ষেপ) করেছে কিন' এখনো চুল মুণ্ডন করেনি। সে কি অন্যের চুল কামিয়ে দিতে পারবে? তিনি বললেন, হাঁ, পারবে।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৬১৩৯ মাসআলা : কিন' নিজের চুল কাটার সময় হওয়ার পূর্বে অন্যের চুল কেটে দিলে যে কাটছে তার উপর এক ফিতরা পরিমাণ সাদকা করা জরুরি হবে।-আহকামে হজ্ব ৯৯, আহসানুল ফাতাওয়া ৪/৫১২

খুছায়েফ রাহ. বলেন, আমি ইহরাম অবস্থায় মুহাম্মাদ ইবনে মারওয়ান রাহ.-এর মোচ কেটে দিই। পরে এ সম্পর্কে সায়ীদ ইবনে যুবায়ের রাহ.কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি এক দিরহাম সদকা করার নির্দেশ দিলেন।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৩৪৭৪ অনুরূপ সিদ্ধান- মুজাহিদ রাহ. ও হাসান রাহ. থেকেও বর্ণিত আছে।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৩৪৭৫ মাসআলা : কারো মাথা পূর্ব থেকে মুণ্ডানো থাকলে কিংবা পুরো মাথা টাক থাকলে হালাল হওয়ার জন্য মাথায় ক্ষুর বুলিয়ে নেওয়াই যথেষ্ট।-বাদায়েউস সানায়ে ২/২১২, রদ্দুল মুহতার ২/৫১৬, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৩১

তাবেয়ী মাছরূক রাহ.কে জিজ্ঞাসা করা হল, যে ব্যক্তি উমরা করে চুল মুণ্ডন করেছে এরপর হজ্ব করেছে সে কী করবে? তিনি বলেন, ‘সে তার মাথায় ক্ষুর বুলিয়ে নিবে।’-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৩৭৯৯ নাফে রাহ. বলেন, ‘আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-এর পুরো মাথা ছিল কেশবিহীন। তাই তিনি হজ্ব-উমরার সময় মাথার ক্ষুর বুলিয়ে নিতেন।’-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৩৮০৩

মাথা মুণ্ডানোর স্থান

মাসআলা : হাজীদের ইহরাম থেকে হালাল হওয়ার জন্য মিনাতে মাথা মুণ্ডানো বা চুল কাটা সুন্নত। আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিনায় এসে জামরা আকাবায় কংকর নিক্ষেপ করলেন। অতঃপর মিনায় নিজ অবস্থান স্থলে গেলেন এবং কুরবানী করলেন। এরপর চুল মুণ্ডনকারীকে চুল মুণ্ডানোর আদেশ করলেন। প্রথমে ডান পাশের চুলের দিকে ইশারা করলেন। অতঃপর বাম পাশের চুলের দিকে। অতঃপর কেশ মোবারক লোকদের মাঝে বিতরণ করে দিলেন।-সহীহ মুসলিম ১/৪২১

মাসআলা : হেরেমের সীমার ভিতর অন্য কোথাও চুল মুণ্ডালেও ওয়াজিব আদায় হবে। ইবরাহীম রাহ. বলেন, চুল কেবল মক্কাতেই মুণ্ডানো যাবে।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪০৭৮ মাসআলা : হরমের বাইরে মাথা কামালে দম ওয়াজিব হবে। -আহকামে হজ্ব ৭৯; মানাসিক পৃ. ২৩০

হজ্বের তৃতীয় ফরয তাওয়াফে যিয়ারত

তাওয়াফে যিয়ারতের সময়

মাসআলা : সুন্নত হল জামরা আকাবার রমী, কুরবানী এবং মাথা কামানোর পর তাওয়াফ করা। জাবির রা. থেকে বর্ণিত ... রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বৃক্ষের নিকটবর্তী জামরায় ৭টি কংকর নিক্ষেপ করলেন। অতঃপর কুরবানীর স্থানে গিয়ে কুরবানী করলেন। এরপর সওয়ারীতে আরোহণ করে বাইতুল্লাহর উদ্দেশে রওনা হলেন এবং মক্কায় যোহরের নামায আদায় করলেন।-সহীহ মুসলিম ১/৩৯৯

মাসআলা : উকূফে আরাফার পূর্বে তাওয়াফে যিয়ারত করলে তা দ্বারা ফরয তাওয়াফ আদায় হবে না। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি যখন মক্কা থেকে ইহরাম গ্রহণ করতেন তখন মিনা থেকে ফেরার আগে বাইতুল্লাহর তাওয়াফ ও সাফা-মারওয়ার মাঝে সায়ী করতেন না।-আলক্বিরা লিমাক্বাসিদি উম্মিল ক্বুরা পৃ. ২৬৪ মুজাহিদ ও সায়ীদ ইবনে যুবায়ের রাহ. থেকে বর্ণিত, তারা ৮ যিলহজ্ব যখন হজ্বের ইহরাম বাঁধতেন তো ১০ যিলহজ্বের পূর্বে বাইতুল্লাহর তাওয়াফ করতেন না।-আল ক্বিরা লিমাকাসিদি উম্মিল কুরা পৃ. ২৬৪

মাসআলা : উকূফে আরাফার পর ১০ যুলহজ্ব সুবহে সাদিক থেকে ১২ যুলহজ্ব সূর্যাসে-র আগে এই তাওয়াফ করার অবকাশ রয়েছে। মুজাহিদ রাহ. থেকে বর্ণিত, তাওয়াফে যিয়ারত ইয়াওমুন নাহর (অর্থাৎ ১২ যিলহজ্ব) পর্যন- বিলম্ব করলে অসুবিধা নেই।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৩২২৮

মাসআলা : যদি ১২ তারিখ সূর্যাস- হয়ে যায় এবং তাওয়াফে যিয়ারত করা না হয় তবে দম দেওয়া জরুরি।-রদ্দুল মুহতার ২/৫১৭, ৫৩৩, আহকামে হজ্ব ৮০

ইবরাহীম রাহ. বলেন, যদি ঐ দিনগুলোতে তা (তাওয়াফে যিয়রাত) না করা হয় তবে দম দিতে হবে।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৩২২৭ মাসআলা : অসুস্থ হলেও তাওয়াফে যিয়ারত নিজেকেই করতে হবে। প্রয়োজনে হুইল চেয়ার ব্যবহার করতে পারবে। কিন্তু অন্যকে দিয়ে তাওয়াফ করানো যাবে না।

উম্মে সালামা রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট অসুস'তার অভিযোগ করলাম। তিনি বললেন, ‘সওয়ারীতে আরোহণ করে ভিড় থেকে দূরে সরে তাওয়াফ করো।’-সহীহ বুখারী ১/২২১

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস' ছিলেন। তাই উটের উপর আরোহণ করে বাইতুল্লাহর তাওয়াফ করেছেন।’-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৩৩০৩

মাসআলা : অচেতন ব্যক্তির পক্ষ থেকে বদলী তাওয়াফে যিয়ারত করা যাবে। আর সুস' ব্যক্তিদের জন্য পায়ে হেঁটে তাওয়াফে যিয়ারত করা ওয়াজিব। মাসআলা : পায়ে তাওয়াফ করার সামর্থ্য থাকাবস্থায় হুইল চেয়ারে করে বা অন্য কোনো বাহনে চড়ে তাওয়াফে যিয়ারত করা যাবে না। -রদ্দুল মুহতার ২/৫১৭; মানাসিক পৃ. ২৩৩ হিশাম ইবনে উরওয়া রাহ. বলেন, ‘আমার বাবা লোকদেরকে বাহনে চড়ে তাওয়াফ করতে দেখলে নিষেধ করতেন।’-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৩৩০৬

তাওয়াফে যিয়ারাতে রমল ও সায়ী

মাসআলা : যারা মিনায় যাওয়ার পূর্বে হজ্বের সায়ী করেছে অর্থাৎ ইফরাদ হজ্বকারী যদি তাওয়াফে কুদূমের পর সায়ী করেন তদ্রূপ তামাত্তু ও কিরানকারী ভিন্ন করে নফল তাওয়াফের পর সায়ী করলে তাদের যেহেতু তাওয়াফে যিয়ারতের পর সায়ী করতে হবে না তাই এই তাওয়াফে তাদেরকে রমলও করতে হবে না।

হিশাম রাহ. তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, ‘ইয়াওমুন নাহরে (অর্থাৎ তাওয়াফে যিয়ারতে) রমল নেই।’-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫২৯৮ আতা রাহ. বলেন, ‘ইয়াওমুন নাহরের তাওয়াফে (অর্থাৎ তাওয়াফে যিয়ারতে) রমল নেই।’-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫৩০০ মাসআলা : যারা ইতিপূর্বে হজ্বের সায়ী করেনি তাদের যেহেতু এই তাওয়াফের পর সায়ী করতে হবে তাই তাওয়াফে রমলও করতে হবে। ইবনে খুছায়েম রাহ. বলেন, ‘আমি মুজাহিদ রাহ.কে তাওয়াফে যিয়ারতে রমল করতে দেখেছি।’-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫২৯৯;

আহকামে হজ্ব ৮১

ঋতুমতী মহিলার তাওয়াফ

মাসআলা : ঋতুমতী নারীর স্রাব চলা অবস্থায় তাওয়াফ করা নিষেধ। তাই পবিত্র হওয়া পর্যন- অপেক্ষা করবে। উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা রা. বলেন, আমি যখন মক্কায় পৌঁছলাম তখন আমার হায়েয চলছিল। আমি বাইতুল্লাহর তাওয়াফ করিনি এবং সাফা-মারওয়ার মাঝে সায়ী করিনি। তিনি বলেন, তখন আমি এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে অভিযোগ করলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হাজী যে কাজগুলো করে তুমিও তা করতে থাক। শুধু বাইতুল্লাহর তাওয়াফ পবিত্র হওয়া পর্যন্ত- করবে না।-সহীহ বুখারী ১/২২৩

মাসআলা : ১২ তারিখ সূর্যাসে-র আগে পবিত্র হয়ে গেলে অবশ্যই এর ভিতরে তাওয়াফ সেরে নিতে হবে। যদি ১২ তারিখ সূর্যাসে-র ভিতর পবিত্র না হয় তাহলে পবিত্র হওয়ামাত্র আদায় করবে। এক্ষেত্রে বিলম্বের কারণে কোনো জরিমানা আসবে না। -রদ্দুল মুহতার ২/৫১৯ পবিত্র হওয়ার আগেই দেশে ফিরতে হলে

মাসআলা : যদি কোনো মহিলা হায়েয বা নেফাস অবস্থায় থাকার কারণে তাওয়াফে যিয়ারত করতে না পারে, আর তার দেশে ফেরার সময় হয়ে যায়, কোনোভাবেই তা বাতিল করা বা বিলম্ব করা সম্ভব না হয় তবে এই অপারগতার কারণে সে অবস্থাতেই তাওয়াফ করবে। আর এজন্য একটি উট বা গরু জবাই করবে। সাথে আল্লাহ তাআলার দরবারে ইস্তি-গফারও করবে। মোটকথা কোনো অবস্থাতেই তাওয়াফে যিয়ারত না করে দেশে যাবে না। অন্যথায় তাকে আবার মক্কায় এসে তাওয়াফ করতে হবে। যতদিন তাওয়াফ না করবে ততদিন স্বামীর সাথে থাকতে পারবে না। -রদ্দুল মুহতার ২/৫১৮-৫১৯; মাআরিফুস সুনান ৬/৩৫৭-৩৫৮

মাসআলা : কোনো মহিলার ওষুধ সেবনের কারণে যদি স্রাব একেবারে বন্ধ হয়ে যায় তবে সে গোসল করে তাওয়াফ করতে পারবে। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-এর নিকট এক মহিলা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হল, যে ওষুধ সেবন করে স্রাব বন্ধ করেছে। ইবনে উমর রা. তা দোষের বিষয় মনে করেননি।-আলক্বিরা লিমকাসিদি উম্মিল কুরা পৃ. ৪৬০

হজ্বের ৪র্থ দিন ১১ যুলহজ্ব

মাসআলা : ১১ ও ১২ যুলহজ্বের রাত্রিতে মিনায় অবস্থান করা সুন্নত। কেউ যদি মিনায় না থাকে তবে সুন্নতের খেলাফ হবে বটে, কিন্তু কোনো প্রকার জরিমানা দিতে হবে না।-ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৩৩ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষ দিন যোহর পড়ে মক্কায় এলেন (তাওয়াফে যিয়ারতের জন্য) অতঃপর মিনায় ফিরে গেলেন এবং আইয়্যামে তাশরীকের রাত্রিগুলো মিনায় অবস্থান করলেন ...।-সুনানে আবু দাউদ ১/২৭১

মুহাম্মাদ ইবনে কা’ব রাহ. বলেন, সুন্নত এই যে, তুমি যখন বাইতুল্লাহর তাওয়াফ (তাওয়াফে যিয়ারত) করবে তখন অবশ্যই মিনায় রাত্রি যাপন করবে।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪৬০৬

১১ যিলহজ্ব রমীর সময়

মাসআলা : যোহরের সময় থেকে আগত রাত্রের সুবহে সাদিক পর্যন- রমীর সময়। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূর্য ঢলে যাওয়ার পর রমী করতেন।-জামে তিরমিযী ১/১৮০ মাসআলা : সম্ভব হলে এই রমী সূর্যাসে-র আগে করে নেওয়া ভালো। সূর্যাসে-র পর মাকরূহ সময়। হাসান রাহ. থেকে বর্ণিত, তিনি রাতে রমী করাকে মাকরূহ বলেছেন।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫৫৫১ উরওয়া রাহ.ও রাতে রমী করাকে মাকরূহ বলেছেন।-মুসন্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫৫৫২

মাসআলা : মহিলা ও দুর্বল ব্যক্তিদের জন্য কিংবা অত্যধিক ভিড়ের কারণে সূর্যাসে-র পর এই রমী করার অবকাশ রয়েছে। আমর রা. বলেন, এক ব্যক্তি আমাকে জানিয়েছেন যে, তিনি একজন উম্মুল মু’মিনীনকে (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রী) সূর্যাসে-র সময় রমী করতে দেখেছেন।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫৫৫৬ আতা ও তাউস রাহ. থেকে বর্ণিত, যে ব্যক্তি দিনে রমী করতে ভুলে যায় সে রাতে রমী করতে পারবে।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫৫৫৭

মাসআলা : ১১ যুলহজ্ব তিন জামরাতেই রমী করতে হবে। প্রথম দুই জামরাতে রমী (কংকর নিক্ষেপ) করে কিবলামুখী হয়ে দুআ করা সুন্নত। জামরায়ে আকাবার রমীর পর দুআ নেই।-রদ্দুল মুহতার ২/৫২১ উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা রা. বলেন, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যোহর পড়ে দিনের শেষ ভাগে (তাওয়াফে যিয়ারতের উদ্দেশ্যে) মক্কায় এলেন। অতঃপর মিনায় গেলেন এবং আইয়্যামে তাশরীকের রাতগুলো মিনায় যাপন করলেন। তিনি সূর্য ঢলে যাওয়ার পর রমী করতেন। প্রতি জামরায় ৭টি করে কংকর নিক্ষেপ করতেন এবং প্রতি কংকর নিক্ষেপের সময় তাকবীর (আল্লাহু আকবার) বলতেন। প্রথম ও দ্বিতীয় জামরায় দীর্ঘ সময় অবস্থান করতেন এবং কাকুতি-মিনতির (সঙ্গে দুআ) করতেন। তৃতীয় জামরায় রমী করে সেখানে অবস'ান করতেন না।-সুনানে আবু দাউদ ১/২৭১

পঞ্চম দিন ১২ যিলহজ্ব

রমীর তৃতীয় দিন

মাসআলা : এদিন রমী করার সময় যোহরের সময় থেকে রাতের সুবহে সাদিক পর্যন-। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, ‘সূর্য যখন ঢলে যেত তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কংকর নিক্ষেপ করতেন।’-জামে তিরমিযী ১/১৮০; মুয়াত্তা মালেক ১/১৫৮ হযরত জাবির রা. বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়াওমুন নাহর (অর্থাৎ ১০ যিলহজ্ব) চাশতের সময় কংকর নিক্ষেপ করতেন। পক্ষান-রে পরবর্তী দিনসমূহে রমী (কংকর নিক্ষেপ) করতেন সূর্য ঢলে যাওয়ার পর।’-সহীহ মুসলিম ১/৪২০ মাসআলা : সম্ভব হলে সূর্যাসে-র পূর্বে রমী করা মুস্তাহাব।

আবদুল্লাহ ইবনে উসমান রাহ. বলেন, আমি সাঈদ ইবনে জুবাইর রাহ.কে রমীর জন্য সূর্য ঢলার অপেক্ষায় থাকতে দেখেছি। তিনি সূর্য ঢলার সাথে সাথেই রমী করতেন।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪৭৯৬

মাসআলা : আজও তিন জামরাতেই কংকর নিক্ষেপ করতে হবে। উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা সিদ্দীকা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আইয়্যামে তাশরীকের রাতগুলোতে মিনায় অবস'ান করতেন এবং সূর্য যখন ঢলে যেত তখন প্রতি জামরায় ৭টি করে কংকর নিক্ষেপ করতেন।-সুনানে আবু দাউদ ১/২৭১ মাসআলা : ১১ ও ১২ তারিখ যোহরের পূর্বে রমীর সময় শুরু হয় না। তাই এ সময় কেউ রমী করলে তা আদায় হবে না। হযরত জাবির রা. বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ১০ যিলহজ্ব চাশতের সময় কংকর নিক্ষেপ করতেন। পক্ষান-রে পরবর্তী দিনগুলোতে রমী করতেন সূর্য ঢলে যাওয়ার পর।’-সহীহ মুসলিম ১/৪২০

মাসআলা : কেউ যদি ১১ ও ১২ তারিখে নির্ধারিত সময়ের ভিতর রমী করতে না পারে তবে ১৩ তারিখ সূর্যাস্তে-র পূর্ব পর্যন্ত- তা কাযা করার (অর্থাৎ রমী করার) সুযোগ আছে। কিন' ১৩ তারিখ সূর্যাসে-র পূর্বে কাযা করতে না পারলে এরপর আর রমী করার সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে দম দেওয়া জরুরি।-রদ্দুল মুহতার ২/৫২১

বিখ্যাত তাবেয়ী আতা রাহ.কে এক ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হল, যে শুধু পাঁচটি কংকর নিক্ষেপ করেছে। জবাবে তিনি বললেন, যদি আইয়্যামে তাশরীক অতিবাহিত না হয়ে থাকে তাহলে বাকি কংকর নিক্ষেপ করবে। আর আইয়্যামে তাশরীক অতিবাহিত হয়ে গেলে দম দিতে হবে।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৩৬১৬

১৩ যিলহজ্ব, রমী করা

মাসআলা : ১২ তারিখ দিবাগত রাতে মিনায় থাকা উত্তম এবং ১৩ তারিখ রমী করাও উত্তম। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চতুর্থ দিন অর্থাৎ ১৩ তারিখ রমী করে মিনা ত্যাগ করেছিলেন। ইতিপূর্বে একাধিকবার উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা রা.-এর সূত্রে বর্ণিত হাদীসটি উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আইয়্যামে তাশরীক (অর্থাৎ ১১, ১২ ও ১৩ যিলহজ্ব) মিনায় অবস্থান করেছেন এবং মিনায় রাত্রি যাপন করেছেন।

তবে কেউ যদি মিনা ত্যাগ করতে চায় তাহলে রমী সমাপ্ত করে ১২ তারিখ সূর্যাসে-র আগেই চলে যেতে হবে। কেননা, ১২ তারিখ সূর্যাসে-র পূর্বে রমী করে মিনা ত্যাগ করতে না পারলে সূর্যাসে-র পর মিনা ত্যাগ করা মাকরূহ। তবে এ কারণে দম বা কোনো কিছু ওয়াজিব হবে না। হযরত ইবরাহীম রাহ. বলেছেন, কারো যদি মিনায় আইয়্যামে তাশরীকের দ্বিতীয় দিন সন্ধ্যা হয়ে যায় তাহলে তৃতীয় দিন আসার পূর্বে সে মিনা ত্যাগ করবে না।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১২৯৫৪, ১২৯৫৯ আর মিনায় ১৩ তারিখ সুবহে সাদিক হয়ে গেলে ঐ দিন রমী করা ওয়াজিব। রমী না করে চলে যাওয়া না জায়েয এবং এতে দম ওয়াজিব হবে। -রদ্দুল মুহতার ২/৫২১, আহকামে হজ্ব ৮৫

মাসআলা : ১৩ তারিখ যোহরের পূর্বেও রমী করা জায়েয। হযরত ইবনে আবী মুলাইকা রাহ. বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.কে লক্ষ্য করছিলাম। দেখলাম তিনি দ্বিপ্রহরের সময় সূর্য ঢলে যাওয়ার পূর্বেই রমী করলেন।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪৭৯৫, ১৪৭৯৩ মাসআলা : তবে যোহর থেকে সূর্যাস- পর্যন- রমী করার সুন্নত ওয়াক্ত।- রদ্দুল মুহতার ২/৫২১; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৩৩ হযরত জাবির রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ১০ যিলহজ্ব চাশতের সময় রমী করেছেন পক্ষান-রে পরবর্তী দিনগুলোতে রমী করেছেন সূর্য ঢলে যাওয়ার পর।-সহীহ মুসলিম ১/৪২০

তাওয়াফে বিদা

মাসআলা : মীকাতের বাইরে অবস্থানকারী হাজীদের জন্য মক্কা মুকাররামা ত্যাগ করার আগে একটি তাওয়াফ করা ওয়াজিব। একে তাওয়াফে বিদা বলা হয়। এই তাওয়াফ মক্কা থেকে বিদায়ের সময় করা উত্তম।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, লোকেরা চর্তুদিকে চলে যেতে আরম্ভ করল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কেউ যেন বাইতুল্লাহর নিকট তার শেষ উপসি'তি ব্যতীত ফিরে না যায়।-সহীহ মুসলিম ১/৪২৭ মাসআলা : মক্কা ও মীকাতের ভিতর অবস্থানকারীদের জন্য তাওয়াফে বিদা ওয়াজিব নয়, মুস্তাহাব।-রদ্দুল মুহতার ২/৫২৩ বিখ্যাত তাবেয়ী হযরত মুজাহিদ রাহ. বলেন, তারা (সাহাবায়ে কেরাম) পছন্দ করতেন যেন বিদায়ের সময় তাদের শেষ উপসি'তি বাইতুল্লাহর নিকট হয়।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৪৮৫৪

তাওয়াফে যিয়ারতের পর হাজী নফল তাওয়াফ আদায় করলেও তা দ্বারা বিদায়ী তাওয়াফের ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। অবশ্য এরপরও ভিন্ন করে বিদায়ী তাওয়াফের নিয়তে একটি তাওয়াফ করে নেওয়া ভালো।

লক্ষণীয় হজ্বের মৌলিক বিষয়গুলো উপরে উল্লেখ করা হল। এগুলো ছাড়াও হজ্বের আরো বহু মাসআলা রয়েছে। প্রয়োজন হলে কোনো নির্ভরযোগ্য আলেম থেকে তা জেনে নেওয়া আবশ্যক।

এ সংখ্যার প্রচ্ছদ

হজ্ব এবং কুরবানী বিষয়ক প্রবন্ধসমূহ