জুমাদাল আখিরাহ ১৪৩১   ||   জুন ২০১০

পুষ্পবৃক্ষের ছায়ায় কিছুক্ষণ

খন্দকার মনসুর আহমদ

নানা ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন ধরেই তিনি শয্যাগত। তবুও হাসপাতাল অথবা গৃহের শয্যায় শুয়ে শুয়ে এখনও তিনি দীনী খিদমতের স্বপ্ন দেখেন। বাইতুল্লাহ শরীফের যিয়ারতের জন্য কাঁদেন। কী অসীম ব্যাকুলতা এখনও তাঁর হৃদয় জুড়ে! কল্পনা শুধু নয় পরিকল্পনাও তৈরি করেন মাঝে মাঝে পবিত্র বাইতুল্লাহ’র যিয়ারতের জন্য। সেই পবিত্র স্বপ্নের কথা জানালেন দরদ মাখা কণ্ঠে। আবার অতীতের স্মৃতি রোমন্থন করে অশ্রু ঝরালেন অবিরল ধারায়। যার কথা বলছি তিনি এ দেশের আধ্যাত্ম জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র আইয়ুবি ধৈর্যের প্রতিচ্ছবি আল্লামা আবদুল হাই পাহাড়পুরী দা. বা.। কিছুদিন পূর্বে এক শান্ত দুপুরে হাজির হয়েছিলাম তার প্রিয় সান্নিধ্যে । তাঁর সদ্য প্রকাশিত কিতাব ‘আল-হাদী ইলাস সরফ’ নিয়ে। কিতাবটির প্রকাশনা কর্মে এ নগণ্যের কিছুটা সংযুক্তি সূত্রে নতুন কপি নিয়ে তার সান্নিধ্যে পৌঁছার এই সুযোগ। জীবনের কর্মমুখর ইলমি খিদমতের সোনালি দিনগুলোতে লিখেছিলেন কিতাবটি। এটি প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য লিখিত সরফের উৎস গ্রন্থসমূহের একটি নির্যাস গ্রন্থ। মাদানী নিসাবের মাদরাসাগুলোতে এর ফটোকপি পঠিত হয়ে আসছিল দীর্ঘ দিন ধরে। পরে ভক্তদের আগ্রহে প্রকাশিত হল কিতাব আকারে। নিতান্ত অসুস্থ শরীরে নেড়ে চেড়ে দেখলেন নিজের অতীত খিদমতের ফসল। পড়িয়ে শোনলেন কিতাবের বিভিন্ন সন্তান। চোখ দিয়ে দেখতে পান না। তবুও যে ক্ষীণতম দৃষ্টিশক্তি আছে এখনও আল্লাহর অনুগ্রহে তা দিয়েই নিজেও পড়লেন কয়েকটি শব্দ। কৃতজ্ঞতা আদায় করলেন, আনন্দ প্রকাশ করলেন এবং অতীত খিদমতের কথা মনে করে অশ্রু ঝরালেন। সুস্থ থাকলে এমন কত খিদমত করতেন এখনও সেই অভিব্যক্তি-ই ফুটে ওঠে তাঁর কান্নায়। গভীর আবেগময় এক অনুভূতি। যারা সুস্থ সবল আছেন দীনের পথে তাদের কর্মমুখর থাকবার এক গভীর আবেগময় আহ্বান রয়েছে তাঁর এই ব্যাকুলতা আর কান্নার ভেতর। হযরত হাফেজ্জী হুযুর (রহ.) এর সঙ্গে প্রথম হজ্ব আদায়ের স্মৃতিচারণ করলেন। সে সফরে শাইখুল হাদীস হযরত মাওলানা যাকারিয়া (রহ.) এর সঙ্গে সাক্ষাতের সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন। সে স্মৃতির কথা বললেন এভাবে-একদিন হযরত হাফেজ্জী হুযুর (রহ.) বললেন, মৌলবী আবদুল হাই ! আমি আমার এক উসস্তাদের সঙ্গে সাক্ষাত করতে যাবো, তুমি সঙ্গে যাবে? আমি বললাম : হযরত ! বলেন কি? আপনি আমাকে রেখে আপনার উস্তাদের সঙ্গে সাক্ষাত করতে যাবেন, তা কী করে হয়? এরপর হযরতের সঙ্গে গেলাম। গিয়ে দেখি সেই উস্তাদ হলেন শাইখুল হাদীস হযরত মাওলানা যাকারিয়া (রাহ.)। হযরত শাইখুল হাদীস সাহেব (রাহ.) হাফেজ্জী হুযুর (রাহ.)-কে অনেক আদর করলেন এবং নেক দু‘আ দিলেন। সেই সঙ্গে আমাকেও দু‘আ দিলেন।’ এভাবেই হযরত পাহাড়পুরী দা. বা. তাঁর স্মৃতির কথা বললেন। এই সফরে হাকীমুল ইসলাম হযরত মাওলানা কারী তাইয়িব (রাহ.) এর সঙ্গেও সাক্ষাত হয়েছিল, সে স্মৃতির কথাও বললেন। আমার এ কথোপকথনের সময় কাছে উপসি'ত ছিলেন হযরত পাহাড়পুরী হুযুরের বড় সাহেবজাদা মাওলানা আশরাফ। তিনি হযরত পাহাড়পুরীকে ঐ হজ্বসফরে শ্রুত হযরত কারী তায়িব (রাহ.)-এর উচ্চারিত একটি বিখ্যাত উক্তির কথা জিজ্ঞেস করলেন। হযরত পাহাড়পুরী তখন আবেগ জড়িত কণ্ঠে সেই উক্তিটি শোনালেন ‘আঁহ ওহ দারূল উলূম দেওবন্দ কেয়সা থা, জিস মেঁ বড়ে বড়ে মুহাদ্দিস সে লে-কার এক আদনা দারবান আওর চাপরাসী তক সাহিবে নিসবত থে’ (হায় ! সেই দারূল উলূম কেমন ছিল, যেখানে শীর্ষ মুহাদ্দিস থেকে নিয়ে একজন সামান্য দারোয়ান-চাপরাশি পর্যন্ত সাহিবে নিসবত আল্লাহওয়ালা ছিল)। আরেকটি বাক্য ছিল এ রকম-‘আঁহ ওহ দারূল উলূম দেওবন্দ কেয়সা থা, জিস মেঁ ওলামা তালাবা সে লে-কার দারাখত আওর দারাখত কে পাত্তো, ঘাছ সে ভী আল্লাহ আল্লাহ আওয়ায গৌঁজতী থী’ (হায় ! সেই দারুল উলূম কেমন ছিল, যেখানে ছাত্র শিক্ষক থেকে নিয়ে গাছ এবং গাছের পাতা আর ঘাস-গুল্ম থেকেও আল্লাহ আল্লাহ যিকিরের আওয়াজ গুঞ্জরিত হতো)। এরপর তিনি হযরত হাফেজ্জী হুযুর (রহ.) স্মারক-গ্রন্থের হাওয়ালা দিয়ে তাতে প্রকাশিত তাঁর স্মৃতিচারণমূলক লেখাটি দেখতে বললেন। সেখানে শাইখুল হাদীস (রহ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাতের ঘটনাটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে, ‘একদিন হুজুর আমাকে বললেন, : মক্কা শরীফে আমার এক উস্তাদ এসেছেন, আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যাব। তুমি কি আমার সাথে যাবে ? আমি বললাম, অবশ্যই যাব। হুযুরের সঙ্গে গেলাম মাদরাসায়ে সওলাতিয়ায়। এশার পর। মসজিদে বসে ওযীফা পড়ছেন অত্যন্ত বৃদ্ধ ও যয়ীফ এক নূরানী চেহারার বুযুর্গ আলিম। খাটিয়ায় বসিয়ে চার জনে ধরে তাকে কামরায় আনলেন। জানলাম ইনিই হযরত যাকারিয়া (রহ.)। শাইখুল হাদীস (রহ.) কে কামরায় আনার পর হযরত হাফেজ্জী হুযুর (রহ.) তার সামনে বসলেন মকতবের এক শিশুর মত। আমি প্রাণভরে মহান দুই বুযুর্গের সাক্ষাত-পর্ব প্রত্যক্ষ করলাম। আরেকদিন ফজরের পর বাবে উম্মে হানীতে হযরতের কাছে বুখারী শরীফের সবক পড়ছি। একপর্যায়ে তিনি আমাকে বললেন, মৌলবী আবদুল হাই! দেওবন্দ মাদরাসার মুহতামিম কারী তায়্যিব সাহেব হজ্বে এসেছেন এবং তিনি এখানেই আছেন। তার সাথে সাক্ষাত করতে মনে চাচ্ছে। তুমি কী তালাশ করে দেখবে, তিনি কোথায় আছেন? আগ্রহের সঙ্গেই সম্মতি জানালাম। এরপর হুযুর যখন এশরাকের নামাজ পড়ার জন্য দাঁড়ালেন তখন আমি বের হয়ে পড়লাম ক্বারী তয়্যিব সাহেব এর সন্ধানে। অল্প সময়ের মধ্যে আমি তাকে পেয়ে গেলাম মাতাফের মধ্যেই। হাজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানীর মাঝামাঝি স্থানে। সেখানে শুধু হযরত কারী সাহেবই ছিলেন না, ছিলেন হযরত মুফতী শফী সাহেব (রহ.) এবং থানবী (রহ.) এর আফ্রিকার অধিবাসী একজন খলীফা। তার নাম মনে নেই। হাকীমুল উম্মতের তিনজন খলীফা এক জায়গায় বসে আছেন। এ সংবাদ হুযুরের জন্য নিশ্চয় অত্যন্ত আকর্ষণীয় হবে। আমি ছুটতে ছুটতে বাবে উম্মে হানীতে গিয়ে দেখলাম হযরত বসে আছেন। আমি তাকে খবরটি জানালাম। তিনি একজন উদ্যমী যুবকের মত লাফ দিয়ে ওঠে বললেন : কোথায় তাঁরা ? আমি তাদের অবস্থানের কথা জানানো মাত্রই তিনি চলতে শুরু করলেন। আশ্চর্য মিল। হাফেজ্জী হুযুর তাদের সামনে গিয়ে পৌঁছামাত্রই তারাও যেন সিপ্রং এর মত দাঁড়িয়ে গেলেন। এরপর সালাম, মুসাফাহা, মু‘আনাকাহ করলেন। হযরত হাকীমুল উম্মতের চারজন খলীফা একসঙ্গে বসলেন আর আমি সেই দৃশ্য দেখতে লাগলাম।১ এত বছর পর রোগ-বিছানায় শুয়ে শুয়ে বার্ধক্যের জরাগ্রস্ত দেহ নিয়ে দ্বীনী খিদমতের স্বপ্ন ও পরিকল্পনা প্রসঙ্গে এই সব স্মৃতির কথা মনে পড়ে গিয়েছিল কা‘বা প্রেমিক আল্লামা আবদুল হাই পাহাড়পুরীর। নানা ব্যাধিতে শরীর প্রায় অচল। তবুও বিগত মাহে রমযানের রোজাসহ অন্যান্য আমল করতে পেরেছিলেন আল্লাহর অনুগ্রহে। নিয়মতান্ত্রিক এবাদতে কমতি হয়নি। সে জন্য তিনি আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত। বাসায় খতম তারাবীহ আদায় করেছেন ছেলেদের ইমামতিতে। নিয়মিত খিদমতে রয়েছেন ওফাদার দুই পুত্র। মাওলানা আশরাফুয্‌যামান ও মাওলানা আবরারুয্‌যামান। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস হাসপাতালের কক্ষেও নিয়মিত সঙ্গী তাঁর এই দুই পুত্র। খিদমতে কোন অলসতা নেই। কোনো বিরক্তি নেই। পবিত্র কোরআনে যে ‘ওলাদুন হালীম’ (স্থিরবুদ্ধি সহনশীল পুত্র) এর কথা বলা হয়েছে সম্ভবত তেমন পুত্র আল্লাহ তাআলা তাঁকে দান করেছেন। মানবিক অনুভূতিবশত: রোগ কষ্টে কখনও কখনও মৃত্যুর কামনা চিন্তায় আসে, সে কথা জানালেন এবং বললেন ‘কিন্তু চাই বা না চাই অবশিষ্ট জীবন আমাকে ভোগ করতেই হবে’। পরবর্তীতে একদিন জানিয়েছেন- যখন মওতের কামনা চিন্তায় আসে তখন সাথে সাথে বুখারী শরীফ ২য় খণ্ডের ঐ হাদীসটির কথাও মনে পড়ে যায়, তোমাদের কেউ যেন মৃত্যুর আকাঙ্খা না করে। এভাবে এখনও তাঁর স্মৃতিতে থাকা কুরআন হাদীসের বিভিন্ন বাণী দিয়ে তিনি আইয়ুবি সবরের অনুশীলন করেন দিন রাত। তাঁকে দেখলে তাই মহান পয়গাম্বর হযরত আইয়ুব (আ.)-এর কথা মনে পড়ে। শরীর একটু ভালো লাগলে কুরআন তিলাওয়াত করেন ক্ষীণ দৃষ্টি দিয়েই। চশমা খুলে চোখের একেবারেই কাছে কুরআন শরীফ তুলে নিয়ে তিলাওয়াত করেন। কিছুদিন আগে জানিয়েছিলেন- প্রায়শই জোহর থেকে আসরের মধ্যবর্তী সময়ের মধ্যে এক পারা কোরআন শরীফ তিলাওয়াতের সৌভাগ্য হয়। রাতে ঘুম ভেঙে গেলে কাউকে না জাগিয়ে একা একা জিকির আযকার করেন। আল্লাহর কাছে একান্তে সমর্পিত হন। এভাবে সুস্থ বয়সে কৃত আমলের পুনরাবৃত্তির চেষ্টা করেন। কী আশ্চর্য! রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত দেহ নিয়ে এখনও সেই আমল, যা আমরা সুস্থ সবল দেহের লোকেরাও করতে পারি না। মনে হয় এ কোন পবিত্র সোহবতের বরকত। কবি নজরুল যথার্থই বলেছেন- ইসলাম সে তো পরশমাণিক তারে কে পেয়েছে খুঁজি পরশে তাহার সোনা হল যারা তাদেরেই মোরা বুঝি প্রাণবন্ত আবেগে অনেক কথাই বললেন। সব প্রশ্নের জবাব দিলেন ইতিবাচক। মাওলানা আশরাফের কাছে জানতে পারলাম সাধারণত এমন বাক-স্বাচ্ছন্দ্যের অবস্থা কম হয় হুযুরের। ভাগ্য-জোরে আজ এ অবস্থায় পাওয়া গেল তাঁকে। আমি বিদায়ের পূর্বে দু‘আ নিয়ে বললাম : অনেক মূল্যবান সময় নিয়ে হুযুরকে তক্‌লীফ দিলাম। তিনি বললেন : না বরং ছুরুর ও ফারহাতের সাথে কাটালাম। তাঁর এ কথা শুনে হৃদয়ে এক আশ্চর্য আবেগ ও আনন্দ অনুভূত হল। উৎসাহ দেওয়ার এই যে আশ্চর্য গুণ এটা তো এই যুগে বিরল। আমরা এই সব মহান আল্লাহওয়ালাদের ত্যাগ, ধৈর্য, উদারতা এবং আমলের সুকঠিন অনুশীলনের কথাকে আমাদের খেয়ালি লেখার বিষয় তো করে নিতে পারি, কিন্তু আমাদের শুষ্ক অন্তর দিয়ে সেসব চেতনার দীপ্তি পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারি না। কারণ এ পথ আমাদের চেনা নেই। আমরা আমাদের চেতনার দুয়ার বন্ধ করে ব্যস্ত পৃথিবীর কর্মস্রোতে ভেসে চলেছি। আর আত্মার চিকিৎসকগণ এক এক করে গুটিয়ে নিচ্ছেন তাদের চিকিৎসালয়। চলে যাচ্ছেন অনন্ত অবসরে। কোন সুখময় বিশ্রামাগারের দিকে। একে একে সব নিভিছে দেউটি। তবে আশার কথা হল ইল্‌ম ও তাকওয়ার এই বাতিঘরটি মহান আল্লাহ এখনও জ্বালিয়ে রেখেছেন আমাদের মাঝে। আল্লামা আবদুল হাই পাহাড়পুরী নামক পুষ্পবৃক্ষের ছায়া এখনও আছে আমাদের ওপর। আসুন আমরা মহান আল্লাহ তাআলার কাছে তাঁর হায়াতে তয়্যিবার জন্য দু‘আ করি। ইল্‌ম ও তাকওয়ার পথের যাত্রীরা তাঁর মাধ্যমে আরও উপকৃত হোক, এই কামনা করি। টিকা ১. : হযরত হাফেজ্জী হুযুর (রহ.) স্মারক গ্রন্থ, পৃষ্ঠা. ৩৭৮

 

advertisement