সফর ১৪৩৯ . নভেম্বর ২০১৭

চলতি সংখ্যা . বর্ষ: ১৩ . সংখ্যা: ১০

মুমিনের কিছু গুণ

 

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

 

বিভিন্ন প্রকারের নেক আমল

২০. তাবেয়ী আবদুর রহমান বিন উযায়নাহ বলেন

سَأَلْتُ أَبَا ذَرٍّ، قُلْتُ دُلّنِي عَلَى عَمَلٍ إِذَا عَمِلَ الْعَبْدُ بِه دَخَلَ الْجَنّةَ، قَالَ: سَألتُ عَنْ ذَلِكَ رَسُولَ الله صَلّى الله عَلَيْهِ وَسَلّمَ، فقَالَ يُؤْمِنُ بِالله. قَالَ: فَقُلْتُ يَا رَسُولَ الله! إِنّ مَعَ الْإِيمَانِ عَمَلًا؟ قَالَ يَرْضَخُ مِمّا رَزَقَهُ الله. قُلْتُ: وَإِنْ كَانَ مُعْدَمًا لَا شَيْءَ لَهُ؟ قَالَ يَقُولُ مَعْرُوفًا بلسانه. قال: قلت: وإن كَانَ عَيِيّا لَا يُبْلِغُ عَنْهُ لِسَانُهُ؟ قَالَ: فَيُعِينُ مَغْلُوبًا. قُلتُ: فَإِنْ كَانَ ضَعِيفًا لَا قُدْرَةَ لَهُ؟ قَالَ: فَلْيَصْنَعْ لِأَخْرَقَ. قُلْتُ وَإِنْ كان أخرق؟ قال: فالتفت إلي وقال: مَا تُرِيدُ أَنْ تَدَعَ فِي صَاحِبِكَ شَيْئًا مِنَ الْخَيْرِ فَلْيَدَع النّاسَ مِنْ أَذَاهُ فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ الله، إِنّ هَذِهِ كَلِمَةُ تَيْسِيرٍ! فقَالَ صَلّى الله عَلَيْهِ وَسَلّمَ وَالّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، مَا مِنْ عَبْدٍ يَعْمَلُ بِخَصْلَةٍ مِنْهَا يُرِيدُ بِهَا مَا عِنْدَ الله، إِلّا أَخَذَتْ بِيَدِه يَوْمَ القِيَامَةِ حَتّى تُدْخِلَه الجَنّةَ   .

আমি আবু যর রা.-এর কাছে আবেদন জানালাম, আমাকে এমন আমল বলে দিন, যেই আমল করলে বান্দা জান্নাতে যাবে? তিনি বললেন, এই বিষয়টি আমিও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আবেদন করেছিলাম, তিনি জওয়াব দিয়েছেন, সে আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখবে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, নিশ্চয় ঈমানের সাথে কোনো আমল আছে? তিনি বললেন, আল্লাহ তাকে যা দান করেছেন তা থেকে কিছু পরিমাণে দান করবে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, যদি এমন নিঃস্ব হয় যে, তার কিছুই নেই? তিনি বললেন, মুখে সুন্দর কথা বলবে। আমি বললাম, যদি কথা বলতে না পারে? তিনি বললেন, তাহলে বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করবে। আমি বললাম, যদি সে এমন দুর্বল হয় যে, তার কোনো ক্ষমতা নেই? তিনি বললেন, তাহলে কর্মহীনকে কর্ম যুগিয়ে দেবে। আমি বললাম, সে নিজেই যদি কর্মহীন হয়? তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার দিকে তাকালেন, বললেন, তুমি যদি বলতে চাও যে, তোমার সঙ্গীর মধ্যে ভালো কোনো যোগ্যতাই নেই, তবে সে যেন অন্তত তার কষ্ট দেওয়া থেকে মানুষকে নিরাপদ রাখে। তখন আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এ তো অনেক সহজ কথা! আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ঐ সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ, যে বান্দাই আল্লাহর কাছে প্রতিদান পাওয়ার উদ্দেশ্যে এসবের কোনো একটার উপর আমল করবে, কিয়ামতের দিন উক্ত আমল তাকে হাত ধরে নিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দেবে। -সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ৩৭৩

 নেক আমল ঈমানের শাখা। নেক আমলের অঙ্গন অতি বিস্তৃত। এক আমল সম্ভব না হলে অন্য আমলের দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন কাম্য।

 

ঈমান পরিপন্থী কিছু কর্ম

২১. আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

لَيْسَ الْمُؤْمِنُ بِالطّعّانِ، وَلَا اللّعّانِ، وَلَا الْفَاحِشِ، وَلَا الْبَذِيءِ.

মুমিন কটুভাষী হতে পারে না, লানতকারী হতে পারে না এবং অশ্লীল ও অশালীন কথা বলতে পারে না। -আলআদাবুল মুফরাদ, হাদীস ৩১২; জামে তিরমিযী, হাদীস ১৯৭৭

এসব কর্ম ঈমানের ও মুুমিনের শানের পরিপন্থী। মুমিনের কর্তব্য, এগুলো থেকে নিজেকে পবিত্র রাখা। (মাআরিফুল হাদীস, খ. ১, হিস্যা. ১, পৃ. ১০২)

২২. আবু বারযা আলআসলামী রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

يَا مَعْشَرَ مَنْ آمَنَ بِلِسَانِهِ وَلَمْ يَدْخُلِ الْإِيمَانُ قَلْبَهُ! لَا تَغْتَابُوا الْمُسْلِمِينَ وَلَا تَتّبِعُوا عَوْرَاتِهِمْ؛ فَإِنّهُ مَنْ يَتّبِعْ عَوْرَاتِهِمْ يَتّبِعِ اللهُ عَوْرَتَهُ، وَمَنْ يَتّبِعِ اللهُ عَوْرَتَهُ يَفْضَحْهُ فِي بَيْتِهِ.

হে ঐ সকল লোক, যারা মুখে ঈমান এনেছে, অথচ ঈমান এখনো তাদের অন্তরে প্রবেশ করেনি, তোমরা মুসলমানদের গীবত করো না, তাদের অপ্রকাশিত দোষ-ত্রুটির অনুসন্ধান করো না, কেননা যে ব্যক্তি তাদের দোষ অনুসন্ধান করবে, আল্লাহ তার দোষ অনুসন্ধান করবেন। আর আল্লাহ যার দোষ অনুসন্ধান করবেন তাকে তো তিনি তার ঘরে লাঞ্ছিত করবেন। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৯৭৭৬; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৮৮০

এই হাদীস থেকে জানা গেল যে, কোনো মুসলমানের গীবত করা, তার দোষ-দুর্বলতা প্রকাশে উৎসুক হওয়া প্রকৃতপক্ষে এমন এক মুনাফিকী কর্ম, যা শুধু ঐ লোকদের থেকেই প্রকাশিত হতে পারে যারা মুখে তো মুসলমান কিন্তু ঈমান এখনো তাদের অন্তরে স্থান করে নিতে পারেনি। (মাআরিফুল হাদীস, খ. ১, হিস্যা. ২, পৃ. ১৬৩)

২৩. আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

لاَ يَزْنِي الزّانِي حِينَ يَزْنِي وَهُوَ مُؤْمِنٌ، وَلاَ يَشْرَبُ الخَمْرَ حِينَ يَشْرَبُ وَهُوَ مُؤْمِنٌ، وَلاَ يَسْرِقُ حِينَ يَسْرِقُ وَهُوَ مُؤْمِنٌ، وَلاَ يَنْتَهِبُ نُهْبَةً يَرْفَعُ النّاسُ إِلَيْهِ فِيهَا أَبْصَارَهُمْ حِينَ يَنْتَهِبُهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ. وفي رواية: وَلَا يَغُلّ أَحَدُكُمْ حِينَ يَغُلّ وَهُوَ مُؤْمِنٌ، فَإِيّاكُمْ إِيّاكُمْ.

ব্যভিচারী যখন ব্যভিচার করে মুমিন অবস্থায় করে না, মদ্যপ যখন মদপান করে মুমিন অবস্থায় করে না, চোর যখন চুরি করে মুমিন অবস্থায় করে না, ছিনতাইকারী যখন ছিনতাই করে, মানুষ তার দিকে (অসহায় দৃষ্টিতে) তাকিয়ে থাকে, সে মুমিন অবস্থায় করে না । অন্য বর্ণনায় আছে, দুর্নীতিগ্রস্ত যখন দুর্নীতি করে মুমিন অবস্থায় করে না। সুতরাং তোমরা বেঁচে থাক, অবশ্যই বেঁচে থাক। -সহীহ বুখারী, হাদীস ২৪৭৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস ৫৭

এখানে উদ্দেশ্য হল, চুরি, ব্যভিচার, মদপান, ছিনতাই ও দুর্নীতি, এসব আপরাধ সম্পূর্ণরূপে ঈমানের পরিপন্থী। কোনো ব্যক্তি যখন এসব অপরাধে লিপ্ত হয় তখন তার অন্তরে ঈমানের নূর বিলকুল থাকে না। এখানে এটা উদ্দেশ্য নয় যে, সে ঈমানের গ-ি থেকে বের হয়ে কাফির হয়ে গেছে। স্বয়ং ইমাম বুখারী রাহ. এই হাদীসের ব্যাখ্যা করে বলেছেন-

لا يكون هذا مؤمنا تاما ولا يكون له نور الإيمان.

এইসব অপরাধকারী যখন এই অপরাধগুলো করে তখন সে পূর্ণ মুমিন থাকে না, তার ভেতরে ঈমানের নূর থাকে না।

বিষয় হল, হৃদয়ের যে বিশেষ অবস্থা ও অনুভূতিকে ঈমান বলা হয়, ব্যক্তির মধ্যে তা যদি সপ্রাণ ও জাগ্রত থাকে, হৃদয় যদি ঈমানের আলোয় আলোকিত থাকে, তাহলে তার থেকে কোনো অবস্থাতেই এমন অপরাধ হতে পারে না। এই ধরনের হীন ও নিকৃষ্ট অপরাধের দিকে মানুষ তখনই অগ্রসর হয় যখন তার অন্তরে ঈমানের নূর থাকে না এবং সেই ঈমানী অনুভূতি বিলুপ্ত বা নিষ্প্রাণ হয়ে যায়; গুনাহ ও পাপাচারের ক্ষেত্রে যা মানুষের রক্ষাকবচ। (মাআরিফুল হাদীস, খ. ১, হিস্যা. ১, পৃ. ১০৩)

 

মুমিনের গুনাহ হয়ে গেলে

২৪. আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

إِنّ الْمُؤْمِنَ إِذَا أَذْنَبَ كَانَتْ نُكْتَةٌ سَوْدَاءُ فِي قَلْبِهِ، فَإِنْ تَابَ وَنَزَعَ وَاسْتَغْفَرَ، صُقِلَ قَلْبُهُ، وَإِنْ زَادَ زَادَتْ، حَتّى يَعْلُوَ قَلْبَهُ. ذَاكَ الرّانُ الّذِي ذَكَرَ اللهُ عَزّ وَجَلّ فِي الْقُرْآنِ: كَلَّا بَلْ رَانَ عَلَى قُلُوبِهِمْ مَا كَانُوا يَكْسِبُونَ .

মুমিনের গুনাহ হয়ে গেলে তাতে তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে যায়। তখন সে যদি তাওবা করে, গুনাহ ছেড়ে দেয় এবং ইস্তিগফার করে তাহলে তার অন্তর পরিষ্কার হয়ে যায়। কিন্তু যদি আরো গুনাহ করে, তাহলে কালো দাগ বাড়তে থাকে, একসময় তার অন্তর কালো দাগে ছেয়ে যায়। এটাই সেই জং, যা আল্লাহ তাআলা কুরআনে উল্লেখ করেছেন-

 كَلَّا بَلْ رَانَ عَلَى قُلُوبِهِمْ مَا كَانُوا يَكْسِبُونَ

না, কখনো নয়; বরং তাদের কৃতকর্ম তাদের অন্তরে জং ধরিয়ে দিয়েছে। [সূরা মুতাফফিফীন (৮৩) : ১৪] -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৭৯৫২; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ৪২৪৪

কুরআন মাজীদে অবাধ্য ও হতভাগ্য কাফিরদের অবস্থা বর্ণণা করতে গিয়ে ইরশাদ হয়েছে-

كَلاَّ بَلْ رانَ عَلى قُلُوبِهِمْ مَا كانُوا يَكْسِبُونَ

না, কখনো নয়; বরং তাদের কৃতকর্ম তাদের অন্তরে জং ধরিয়ে দিয়েছে। -সূরা মুতাফফিফীন (৮৩) : ১৪

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উক্ত হাদীস থেকে জানা গেল যে, গুনাহ, পাপাচার ও মন্দকর্মের কারণে শুধু কাফিরদেরই অন্তর কালো হয়ে যায় তা নয়, বরং মুসলমানও যদি গুনাহ করে তাহলে তার অন্তরেও গুনাহের গান্দেগীর কারণে কালো দাগ পড়ে যায়। কিন্তু সে যদি অন্তর থেকে তাওবা করে, ইস্তেগফার করে তাহলে সেই কালো দাগ দূর হয়ে যায়, কলব আবার আগের মত পবিত্র ও আলোকিত হয়ে যায়। কিন্তু গুনাহ হয়ে যাওয়ার পর যদি তাওবা-ইস্তিগফার না করে, গুনাহ ও অবাধ্যতার পথেই চলতে থাকে, তাহলে অন্তরে অন্ধকার বাড়তে থাকে। একসময় পুরো অন্তর অন্ধকারে ছেয়ে যায়।

কোনো মুমিনের জন্য এর চেয়ে মর্মান্তিক আর কী হতে পারে যে, গুনাহের অন্ধকারে তার অন্তর কালো হয়ে যাবে, তার অন্তরে শুধু অন্ধকার আর অন্ধকারই থাকবে?! আল্লাহ রক্ষা করুন। (মাআরিফুল হাদীস, খ. ৩, পৃ. ২০১)

 

সালামের প্রসার ঘটানো

২৫. আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

لَا تَدْخُلُونَ الْجَنّةَ حَتّى تُؤْمِنُوا، وَلَا تُؤْمِنُوا حَتّى تَحَابّوا، أَوَلَا أَدُلّكُمْ عَلَى شَيْءٍ إِذَا فَعَلْتُمُوهُ تَحَابَبْتُمْ؟ أَفْشُوا السّلَامَ بَيْنَكُمْ.

তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা মুমিন হও। আর তোমরা মুমিন হবে না, যতক্ষণ না তোমরা একে অপরকে ভালোবাস। আমি কি তোমাদেরকে এমন কাজের কথা বলে দেব না, যে কাজ করলে তোমাদের পরস্পরের মাঝে প্রীতি-ভালোবাসা সৃষ্টি হবে? তোমাদের মধ্যে সালামের প্রসার ঘটাও। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৫৪

এই হাদীস থেকে স্পষ্ট জানা গেল যে, ঈমান, যার উপর জান্নাতে প্রবেশের সুসংবাদ ও ওয়াদা, তা কেবল কালিমা পড়ে নেওয়া বা কিছু আকীদা-বিশ^াসের নাম নয়। বরং তা এমন এক বিস্তৃত হাকীকত যে, ঈমানদারদের পরস্পরের সম্প্রীতি ও ভালোবাসাও ঈমানের অপরিহার্য শর্ত। আর রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অতি গুরুত্বের সাথে ইরশাদ করেছেন যে, একে অপরকে সালাম দেওয়া, সালামের জবাব দেওয়ার মাধ্যমে এই সম্প্রীতি  ও ভালোবাসা অন্তরে জন্ম নেয়।

এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, কোনো আমলের খাছ তাছীর ও ফলাফল তখনই প্রকাশ পায় যখন সেই আমলে রূহ ও প্রাণ থাকে। নামায, রোযা, হজ¦, যিকির, সব আমলের ক্ষেত্রেই বিষয়টা তাই। হুবহু একই কথা সালাম মুসাফাহার ক্ষেত্রেও। সালাম-মুসাফাহা যদি ইখলাসের সাথে ঈমানী সম্পর্কের ভিত্তিতে সঠিক জযবা ও প্রেরণায় হয় তাহলে তা অন্তরের কলুষ দূর হওয়া, অন্তরে প্রীতি ও ভালোবাসা জন্মাবার সুন্দর এক উপায়। কিন্তু এখন আমাদের সব আমলই তো রূহবিহীন-নিষ্প্রাণ। (মাআরিফুল হাদীস, খ. ৩, পৃ. ৩৩৯)

এই হাদীস থেকে এও জানা গেল যে, ঈমানের দাবিদার কোনো জাতি এবং সমাজের জন্য অপরিহার্য যে, তাদের পরস্পরের মাঝে সম্প্রীতি ও ভালোবাসা থাকবে। তা যদি না থাকে তাহলে বুঝতে হবে যে, তারা ঈমানের হাকীকত ও ঈমানের বরকত থেকে বঞ্চিত। (মাআরিফুল হাদীস, খ. ১, হিস্যা. ১, পৃ. ৯৬)

 

মুমিনের বৈশিষ্ট্য সুহৃদতা ও অন্তরঙ্গতা

২৬. আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

الْمُؤْمِنُ مَأْلَفٌ، وَلَا خَيْرَ فِيمَنْ لَا يَأْلَفُ وَلَا يُؤْلَفُ.

মুমিন সবার আপন হয়, (সে অন্তরঙ্গ হয় এবং তার সাথে অন্তরঙ্গ হওয়া যায়।) যে অন্তরঙ্গ হয় না এবং যার সাথে অন্তরঙ্গ হওয়া যায় না, তার মাঝে কোনো কল্যাণ নেই। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৯১৯৮

অর্থাৎ মুমিন হবে অন্তরঙ্গ প্রকৃতির। সে অন্যদের ভালোবাসবে, আপন করে নেবে। অন্যরাও তাকে ভালোবাসবে, আপন মনে করবে। যদি এই বৈশিষ্ট্য কারো না থাকে, তাহলে যেন তার মধ্যে কোনো কল্যাণই নেই। না সে অন্যদের উপকার করতে পারে আর না অন্যরা তার থেকে উপকৃত হতে পারে।

বলাবাহুল্য যে, এই প্রীতি, ভালোবাসা ও অন্তরঙ্গতা সবই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হবে এবং আল্লাহর বিধানের অধীনে হবে। (মাআরিফুল হাদীস, খ. ৩, হিস্যা. ২, পৃ. ১২৮)

 

মুমিন দম্পতি

২৭. আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

لَا يَفْرَكْ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً، إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقاً، رَضِيَ مِنْهَا آخَرَ.

কোনো মুমিন (স্বামী তার) মুমিন (স্ত্রী)কে যেন ঘৃণা না করে। (তার) কোনো আচরণ খারাপ লাগলে অন্য আচরণ ভালো লাগবে। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৪৭২৩

স্ত্রীর কোনো অভ্যাস বা আচরণ যদি স্বামীর রুচি ও মেযাজের বিপরীত হয়, তার কাছে পছন্দনীয় না হয়, তাহলে এর কারণে যেন স্বামী স্ত্রীকে ঘৃণা না করে এবং সম্পর্ক নষ্ট না করে; বরং স্ত্রীর মধ্যে যেসব ভালো গুণ ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে, সেগুলোর দিকে লক্ষ্য করে এবং তার যথাযথ মর্যাদা উপলব্ধি করে। এটা মুমিন স্বামীর ঈমানের দাবি এবং মুমিন স্ত্রীর ঈমানের হক। এই প্রসঙ্গেই কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে-

وَ عَاشِرُوْهُنَّ بِالْمَعْرُوْفِ  فَاِنْ كَرِهْتُمُوْهُنَّ فَعَسٰۤی اَنْ تَكْرَهُوْا شَیْـًٔا وَّ یَجْعَلَ اللهُ فِیْهِ خَیْرًا كَثِیْرًا.

আর তোমরা স্ত্রীদের সাথে সদ্ভাবে জীবন যাপন করো। তোমরা যদি তাদেরকে অপছন্দ কর, তবে এর যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে যে, তোমরা কোনো জিনিসকে অপছন্দ করছ অথচ আল্লাহ তাতে প্রভূত কল্যাণ নিহিত রেখেছেন। -সূরা নিসা (৪) : ১৯ (মাআরিফুল হাদীস, খ. ৩, পৃ. ৩০১)

 

মুমিন শক্তিশালী হওয়া এবং দুর্বল হওয়া

২৮. আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

الْمُؤْمِنُ الْقَوِيّ خَيْرٌ وَأَحَبّ إِلَى اللهِ مِنَ الْمُؤْمِنِ الضّعِيفِ، وَفِي كُلٍّ خَيْرٌ. اِحْرِصْ عَلَى مَا يَنْفَعُكَ، وَاسْتَعِنْ بِاللهِ وَلَا تَعْجِزْ. وَإِنْ أَصَابَكَ شَيْءٌ، فَلَا تَقُلْ لَوْ أَنِّي فَعَلْتُ، كَانَ كَذَا وَكَذَا، وَلَكِنْ قُلْ: قَدّرَ اللهُ وَمَا شَاءَ فَعَلَ، فَإِنّ لَوْ تَفْتَحُ عَمَلَ الشّيْطَان.

শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর কাছে দুর্বল মুমিন অপেক্ষা প্রিয় ও উত্তম, তবে উভয়ের মাঝে কল্যাণ রয়েছে, তোমাকে যা উপকৃত করবে সে বিষয়ে তুমি অনুরাগী হও। আর আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও। অক্ষম হয়ে যেয়ো না। কোনো কিছু যদি তোমাকে আক্রান্ত করে তুমি বলো না যে, যদি আমি এটা করতাম তাহলে তো এটা হতো (বা হতো না)। বরং বলো, আল্লাহ তকদীরে রেখেছেন। আল্লাহ যা চান তাই করেন। কেননা যদিশব্দটা শয়তানের কাজের সুযোগ খুলে দেয়। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৬৬৪

 

মুমিনের সুখেও কল্যাণ, দুঃখেও কল্যাণ

২৯. ছুহাইব রা. বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ، إِنّ أَمْرَهُ كُلّهُ لَهُ خَيْرٌ، وَلَيْسَ ذَاكَ لِأَحَدٍ إِلَّا لِلْمُؤْمِنِ، إِنْ أَصَابَتْهُ سَرّاءُ شَكَرَ، فَكَانَ خَيْرًا لَهُ، وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرّاءُ صَبَرَ، فَكَانَ خَيْرًا لَهُ.

মুমিনের বিষয় বড়ই আশ্চর্যজনক। তার সবকিছুই তার জন্য কল্যাণকর; মুমিন ছাড়া আর কারও এই বৈশিষ্ট্য নেই। সে যখন আনন্দদায়ক কিছু লাভ করে তখন শোকর করে, আর শোকর তার জন্য কল্যাণের বিষয়। যখন কষ্টদায়ক কোনো কিছুর সম্মুখীন হয়, তখন সে ছবর করে, আর ছবরও তার জন্য কল্যাণের বিষয়। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৯৯৯

দুনিয়াতে সুখ-দুঃখ ও আনন্দ-বেদনা তো সবার জীবনেই আসে। কিন্তু এই সুখ ও আনন্দ, এই দুঃখ ও বেদনার মাধ্যমেও আল্লাহ তাআলার নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জন করা- এটা কেবল ঐ সকল ঈমানদারদেরই ভাগ্য, যারা আল্লাহ তাআলার সাথে এমন ঈমানী সম্পর্ক স্থাপন করে নিয়েছে যে, নিজেদের সব সুখ ও আনন্দ, সব প্রাপ্তি ও অর্জনকে তারা আল্লাহর দান মনে করে এবং আল্লাহর শোকর আদায় করে। আর তারা যদি দুঃখ-বেদনা, বিপদ ও দুর্দশায় আপতিত হয় তখন তারা বন্দেগী ও দাসত্বের পূর্ণ শান ও মহিমা নিয়ে আল্লাহর কাছে ছবর করে। এ বিশ্বাস রাখে যে, আল্লাহরই ইচ্ছায় এই দুঃখ-বেদনা, এই বিপদ ও দুর্দশা আমার উপর এসেছে। আল্লাহই পারেন তা দূর করে দিতে।

যেহেতু সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার অনুষঙ্গ মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না, তাই আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের অন্তর সব সময় ছবর ও শোকরের অনুভূতিতে পরিপূর্ণ থাকে। (মাআরিফুল হাদীস, খ. ১, হিস্যা. ২, পৃৃ. ১৯১)

 

মুমিনের দৃষ্টান্ত

৩০. আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

مَثَلُ المُؤْمِنِ كَمَثَلِ خَامَةِ الزّرْعِ، يَفِيءُ وَرَقُهُ مِنْ حَيْثُ أَتَتْهَا الرِّيحُ تُكَفِّئُهَا، فَإِذَا سَكَنَتِ اعْتَدَلَتْ، وَكَذَلِكَ المُؤْمِنُ يُكَفّأُ بِالْبَلاَءِ، وَمَثَلُ الكَافِرِ كَمَثَلِ الأَرْزَةِ صَمّاءَ مُعْتَدِلَةً حَتّى يَقْصِمَهَا الله إِذَا شَاءَ.

মুমিনের দৃষ্টান্ত হল নরম কোমল শস্যের মত, বাতাস যেদিকে দোলা দেয়, শস্যের পাতা সেদিকেই দুলতে থাকে। বাতাস থেমে গেলে স্থির হয়ে যায়। মুমিনও তেমনি বিভিন্ন আপদ-বিপদ দিয়ে তাকে দোলা দেওয়া হয়। আর কাফিরের দৃষ্টান্ত হল দেবদারু গাছের মত, দৃঢ় স্থির (বাতাস তাকে টলাতে পারে না) অবশেষে আল্লাহ যখন ইচ্ছা করেন তাকে মূলোৎপাটন করে দেন। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৭৪৬৬

অর্থাৎ দুনিয়ার জীবনে সময়ে সময়ে মুমিনের উপর বিভিন্ন বিপদ-মুসীবত, রোগ-শোক, কষ্ট-ক্লেশ ইত্যাদি এসে থাকে। এগুলোর মাধ্যমেও মুমিন আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রভূত কল্যাণ এবং বিশেষ দয়া ও রহমত লাভ করে থাকে। এতে তার গুনাহ মাফ হয়। আল্লাহর কাছে তার মর্তবা বুলন্দ হয়। আমল-ইবাদতের কমতির ক্ষতিপূরণ হয়। সৌভাগ্যবান বান্দা যারা, তাদের আত্মিক তারবিয়াত হয়।

এরপর আল্লাহই তাদের রোগ-শোক, বিপদ-আপদ সব দূর করে দেন, তাঁর নেয়ামত দ্বারা পরিপূর্ণ করে দেন।

আর কাফিরকে আল্লাহ তাআলা ঢিল দেন। দুনিয়াতে সে অনেক আরাম-আয়েশ, স্বচ্ছন্দতা লাভ করে। আখেরাতে তার জন্য কিছুই নেই। শুধুই যন্ত্রণা আর যন্ত্রণা। অবশেষে যখন আল্লাহ তাকে ধ্বংস করার ইচ্ছা করেন, তখন তাকে যন্ত্রণাদায়ক ভয়ংকর মৃত্যুর মুখোমুখি করেন এবং অনন্তকাল তার জন্য আযাব ও শাস্তির ফয়সালা করেন।

 

মুমিনের নামায

৩১. আনাস রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

إِنّ المُؤْمِنَ إِذَا كَانَ فِي الصّلاَةِ، فَإِنّمَا يُنَاجِي رَبّهُ، فَلاَ يَبْزُقَنّ بَيْنَ يَدَيْهِ وَلاَ عَنْ يَمِينِهِ، وَلَكِنْ عَنْ يَسَارِهِ أَوْ تَحْتَ قَدَمِهِ.

মুমিন যখন নামাযে থাকে তখন সে আসলে তার রবের সাথে আলাপেথাকে। সুতরাং সে যেন তার সামনে ও ডান পাশে থুথু না ফেলে...। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৪১৩

 

কুরআনের সাথে মুমিনের সম্পর্ক

৩২. আবু মূসা রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

المُؤْمِنُ الّذِي يَقْرَأُ القُرْآنَ وَيَعْمَلُ بِهِ كَالأُتْرُجّةِ، طَعْمُهَا طَيّبٌ، وَرِيحُهَا طَيّبٌ. وَالمُؤْمِنُ الّذِي لاَ يَقْرَأُ القُرْآنَ وَيَعْمَلُ بِهِ كَالتّمْرَةِ، طَعْمُهَا طَيّبٌ، وَلاَ رِيحَ لَهَا. وَمَثَلُ المُنَافِقِ الّذِي يَقْرَأُ القُرْآنَ كَالرّيْحَانَةِ، رِيحُهَا طَيِّبٌ، وَطَعْمُهَا مُرّ. وَمَثَلُ المُنَافِقِ الّذِي لاَ يَقْرَأُ القُرْآنَ كَالحَنْظَلَةِ، طَعْمُهَا مُرّ أَوْ خَبِيثٌ، وَرِيحُهَا مُرّ.

যে মুমিন কুরআন তিলওয়াত করে এবং কুরআন অনুযায়ী আমল করে সে হল কমলা লেবুর মত। এর স্বাদও উত্তম, ঘ্রাণও উত্তম। আর যে মুমিন কুরআন তিলওয়াত করে না, তবে কুরআন অনুযায়ী আমল করে, সে হল খেজুরের মত। স্বাদ ভালো, তবে এর কোনো ঘ্রাণ নেই। আর মুনাফিক, যে কুরআন পাঠ করে, সে হল রায়হান ঘাসের মত, এর ঘ্রাণ ভালো, তবে স্বাদ তিক্ত। আর যে মুনাফিক কুরআন তিলওয়াত করে না, সে হল মাকাল ফলের মত, স্বাদও তিক্ত, আবার দুর্গন্ধযুক্ত। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৫০২০; সহীহ মুসলিম, হাদীস ৭৯৭

 

মুমিন ও সমাজ

৩৩. আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

الْمُؤْمِنُ الّذِي يُخَالِطُ النّاسَ وَيَصْبِرُ عَلَى أَذَاهُمْ خَيْرٌ مِنَ الّذِي لَا يُخَالِطُ النّاسَ وَلَا يَصْبِرُ عَلَى أَذَاهُمْ.

যে মুমিন মানুষের সাথে মেশে এবং তাদের উৎপাত-উপদ্রব সহ্য করে সে তার চেয়ে উত্তম যে মানুষের সাথে মেশে না এবং তাদের উপদ্রবও সহ্য করে না। -আলআদাবুল মুফরাদ, হাদীস ৩৮৮; জামে তিরমিযী, হাদীস ২৫০৭

 

মুমিনের স্বভাব

৩৪. আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

الْمُؤْمِنُ غِرّ كَرِيمٌ، وَالْفَاجِرُ خَبّ لَئِيمٌ.

মুমিন সহজ-সরল, উদার হয়ে থাকে। আর ফাজের (পাপিষ্ঠ) হয়ে থাকে ঠকবাজ, সংকীর্ণমনা। -আলআদাবুল মুফরাদ, হাদীস ৪১৮; জামে তিরমিযী, হাদীস ১৯৬৪

 

মুমিনের সতর্কতা ও বিচক্ষণতা

৩৫. আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

لَا يُلْدَغُ الْمُؤْمِنُ مِنْ جُحْرٍ وَاحِدٍ مَرّتَيْنِ.

মুমিন একই গর্তে দুইবার দংশিত হয় না। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৬১৩৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৯৯৮

 

অন্যায় প্রতিরোধে মুমিন

৩৬. আবু সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ، وَذَلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ.

তোমাদের কেউ যখন কোনো অন্যায় কাজ হতে দেখে, তখন সে যেন তা হাত দ্বারা প্রতিহত করে, যদি সে তা না পারে, তাহলে যেন মুখের কথা দ্বারা তা প্রতিহত করে, এও যদি না পারে তাহলে যেন অন্তরে এটাকে ঘৃণা করে। আর এটা হল ঈমানের দুর্বলতম স্তর। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৪৯

এই হাদীসে কোনো অন্যায় দেখলে সেটা প্রতিরোধ করা ও অন্যায় মিটিয়ে দেওয়ার সাধ্যমতো চেষ্টা করার হুকুম করা হয়েছে এবং এর তিনটি স্তর বলা হয়েছে-

১. যদি সেই অন্যায় দমন করার শক্তি ও ক্ষমতা থাকে তাহলে শক্তি প্রয়োগ করে অন্যায় দমন করবে।

২. যদি শক্তি না থাকে তাহলে মৌখিক উপদেশ, মৌখিক বোঝানো-সমঝানোর মাধ্যমে তা রোধ করা এবং সংশোধন করার চেষ্টা করবে।

৩. আর যদি পরিস্থিতি এতই প্রতিকূল হয় আর দ্বীনদার শ্রেণি এতই দুর্বল অবস্থানে হয় যে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খোলারও অবকাশ নেই, তাহলে সর্বশেষ স্তর হল, অন্তর থেকে এটাকে অন্যায় মনে করবে এবং তা দূর করার প্রেরণা অন্তরে পোষণ করবে। এর স্বাভাবিক ফল অন্তত এই হবে যে, আল্লাহর কাছে দুআ করতে থাকবে এবং এটা মিটানোর পন্থা ও ব্যবস্থাও চিন্তা করতে থাকবে...। এই সর্বশেষ স্তরটাকে হাদীসে أضعف الإيمان বলা হয়েছে। এর অর্থ, এটা হল ঈমানের সেই সর্বশেষ দুর্বল স্তর, যার পরে ঈমানের আর কোনো স্তর নেই। (মাআরিফুল হাদীস, খ. ১, হিস্যা. ১, পৃ. ১০০)

 

মুমিনের আহার

৩৭. আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি,

المُؤْمِنُ يَأْكُلُ فِي مِعًى وَاحِدٍ، وَالكَافِرُ يَأْكُلُ فِي سَبْعَةِ أَمْعَاءٍ.

মুমিন এক উদরে আহার করে (মুমিনের খাবারের প্রতি লোভ থাকে না) আর কাফির সাত উদরে আহার করে (খাবারের প্রতি তার থাকে অতিশয় লোভ ও আসক্তি)। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৩৯৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস ২০৬০

 

মুমিনের দুনিয়া

৩৮. আবু হুরায়রা রা. বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

الدّنْيَا سِجْنُ الْمُؤْمِنِ، وَجَنّةُ الكَافِرِ.

দুনিয়া হল মুমিনের কারাগার আর কাফেরের জান্নাত। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৯৫৬

কারাগারে বন্দীজীবনের এক বৈশিষ্ট্য হল, কারাগারের বন্দী তার জীবন-যাপনের ক্ষেত্রে কখনোই স্বাধীন থাকে না। সবক্ষেত্রেই সে অন্যের হুকুম মেনে চলতে বাধ্য। যখন খাবার দেওয়া হয়, যাই দেওয়া হয় সে খেয়ে নেয়। যা পান করতে দেওয়া হয় তাই পান করে নেয়।  যেখানে বসতে বলা হয় সেখানেই বসতে হয়, যেখানে দাঁড়াতে বলা হয় সেখানেই দাঁড়াতে হয়। মোটকথা, তাকে যা করতে বলা হয়, তাই করতে হয়। তার ইচ্ছা-আকাক্সক্ষা অনুযায়ী চলার কোনো সুযোগ নেই। ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় প্রতিটি কাজে তাকে অন্যের হুকুম পালন করে যেতে হয়।

দ্বিতীয়ত : কারাগারের আরেক বৈশিষ্ট্য হল, কোনো বন্দীই কারাগারের জীবনকে আপন করে নেয় না। কারাগারকে নিজের বাড়ী মনে করে না। বরং সবসময় সে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসার চিন্তায় থাকে, সেই প্রত্যাশায় সে দিন গুনে।

অন্যদিকে জান্নাতের বৈশিষ্ট্য হল, জান্নাতীদের জান্নাতে কোনো নিয়ম-কানুন, বাধ্যবাধকতা থাকবে না। প্রত্যেকে নিজের ইচ্ছেমতো জীবন কাটাবে। তার সব চাহিদা ও আকাক্সক্ষা পূরণ করা হবে। আর শত শত বছর পার হলেও কোনো জান্নাতীর মন জান্নাত ও জান্নাতের নায-নেয়ামত থেকে নিরাসক্ত হবে না।

এই হাদীসে ঈমানদারদের বিশেষ সবক দেওয়া হয়েছে যে, তারা যেন দুনিয়াতে কারাগারের মত নিয়ম পালনের জীবন-যাপন করে, দুনিয়ার প্রতি মোহ ও আসক্তি তাদের যেন না আসে। আর এই বাস্তবতা যেন সবসময় উপলব্ধিতে থাকে যে, দুনিয়াকে জান্নাত মনে করা দুনিয়ার মোহে পড়ে যাওয়া, দুনিয়ার ভোগ-বিলাসকেই জীবনের লক্ষ্য বানিয়ে নেওয়া, এসবই হচ্ছে কাফিরসুলভ কর্ম।

এই হাদীসটি যেন একটি আয়না, যার মধ্যে প্রত্যেক মুমিনই নিজের চেহারা দেখে নিতে পারে...। (মাআরিফুল হাদীস, খ. ১, হিস্যা. ২, পৃ. ৪৯)

 

মুমিনের আল্লাহর সাক্ষাতের বাসনা

৩৯. আয়েশা রা. বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

مَنْ أَحَبّ لِقَاءَ اللهِ، أَحَبّ اللهُ لِقَاءَهُ، وَمَنْ كَرِهَ لِقَاءَ اللهِ،كَرِهَ اللهُ لِقَاءَهُ، فَقُلْتُ: يَا نَبِيّ اللهِ، أَكَرَاهِيَةُ الْمَوْتِ؟ فَكُلّنَا نَكْرَهُ الْمَوْتَ، فَقَالَ: لَيْسَ كَذَلِكِ، وَلَكِنَّ الْمُؤْمِنَ إِذَا بُشِّرَ بِرَحْمَةِ اللهِ وَرِضْوَانِهِ وَجَنّتِهِ، أَحَبّ لِقَاءَ اللهِ، فَأَحَبّ اللهُ لِقَاءَهُ، وَإِنَّ الْكَافِرَ إِذَا بُشِّرَ بِعَذَابِ اللهِ وَسَخَطِهِ، كَرِهَ لِقَاءَ اللهِ، وَكَرِهَ اللهُ لِقَاءَهُ.

যে ব্যক্তি আল্লাহর সাক্ষাৎ পছন্দ করে, আল্লাহও তার সাক্ষাৎ পছন্দ করেন । আর যে আল্লাহর সাক্ষাৎ অপছন্দ করে, আল্লাহও তার সাক্ষাৎ অপছন্দ করেন। এ কথা শুনে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর নবী! মৃত্যুকে অপছন্দের কথা বলছেন? আমরা প্রত্যেকেই মৃত্যুকে অপছন্দ করি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সেটা নয়, বরং (মৃত্যুর সময়) যখন মুমিনকে আল্লাহর রহমত, সন্তুষ্টি ও জান্নাতের খোশখবর দেওয়া হয় তখন সে আল্লাহর সাক্ষাৎ পছন্দ করে, আল্লাহও তার সাক্ষাৎ পছন্দ করেন। আর কাফিরকে যখন (মৃত্যুর সময়) আল্লাহর আযাব ও গযবের সুখবর দেওয়া হয় তখন সে আল্লাহর সাক্ষাৎ অপছন্দ করে। আল্লাহও তার আল্লাহর সাক্ষাৎ অপছন্দ করে। আল্লাহও তার   সাক্ষাৎ অপছন্দ করেন। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৬৮৫; সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৫০৭

 

মুমিনের বিদায়

৪০. হযরত আবু কাতাদাহ ইবনে রিবয়ী আলআনসারী বর্ণনা করেন,

أَنَّ رَسُولَ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ مُرّ عَلَيْهِ بِجِنَازَةٍ، فَقَالَ: مُسْتَرِيحٌ وَمُسْتَرَاحٌ مِنْهُ. قَالُوا: يَا رَسُولَ الله، مَا المُسْتَرِيحُ وَالمُسْتَرَاحُ مِنْهُ؟ قَالَ: العَبْدُ المُؤْمِنُ يَسْتَرِيحُ مِنْ نَصَبِ الدّنْيَا وَأَذَاهَا إِلَى رَحْمَةِ الله، وَالعَبْدُ الفَاجِرُ يَسْتَرِيحُ مِنْهُ العِبَادُ وَالبِلاَدُ وَالشّجَرُ وَالدّوَابّ.

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে দিয়ে একটি জানাযা গেল। তিনি বললেন, সে শান্তি পাবে বা শান্তি দিবে। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! শান্তি পাবে বা শান্তি দিবে- কী অর্থ? রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মুমিন বান্দা (মৃত্যুর মধ্য দিয়ে) দুনিয়ার ক্লান্তি ও কষ্ট থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর রহমতের কোলে শান্তি পায়। আর পাপিষ্ঠ বান্দা (মরে গিয়ে) সমস্ত মানুষ ও ভূখ-, বৃক্ষলতা ও পশুপ্রাণীকে শান্তি দেয়। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৫১২; সহীহ মুসলিম, হাদীস ৯৫০

 

 

আরও পড়ুন:   আদব-শিষ্টাচার | ইসলামের সৌন্দর্য-মাধুর্য | দ্বীনিয়াত

সম্মানিত পাঠক!
মাসিক আলকাউসারের ওয়েব পেজটির উন্নয়ন কাজ চলছে। তাই বর্তমান সংখ্যাটি হালনাগাদ করতে বিলম্ব হচ্ছে। আপনাদের সাময়িক অসুবিধার জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত।

হজ্ব এবং কুরবানী বিষয়ক প্রবন্ধসমূহ