গবেষণামূলক উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মারকাযুদ্ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা-এর মুখপত্র

মাসিক আলকাউসার

মে-জুন ২০১৭, শা‘বান-রমযান ১৪৩৮

শিক্ষাদীক্ষা : কুরআন ও মুসলমান

বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত একটি ছোট্ট ছবি অনেক মুসলিমকে মুগ্ধ করেছে। বিষয়টি অতি স্বাভাবিক হলেও বর্তমান অবস্থায় তা সাধারণত দুর্লভ। আর সে কারণেই তা হয়ে উঠেছে অনন্যসাধারণ। ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোয়ান তার নাতীকে কুরআন পড়াচ্ছেন!

আবারও তুরস্ক, আবারও এরদোয়ান। বলা যায়, তুরস্কের এরদোয়ান আর এরদোয়ানের তুরস্কের বিশিষ্টতা এখানেই যে, বিশ্বব্যাপী কোটি মুসলিমের কিছু মনের কথা তার কণ্ঠে মাঝে মাঝে উচ্চারিত হচ্ছে, আর হৃদয়ের কিছু ভালো লাগা তার মাধ্যমে মূর্ত হচ্ছে।

একটি মুসলিমসমাজের রাষ্ট্রনায়কের সবচেয়ে বড় পরিচয় তো এটাই হওয়ার কথা যে, তিনি হবেন কুরআনের সেবক। নিজেও হবেন কুরআনের আলিম আর কুরআনী ইলমের বিস্তারই থাকবে তার সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। মুসলিম উম্মাহর স্বর্ণযুগের চিত্র এমনই ছিল। এরপর ধীরে ধীরে এই জাতি কুরআন থেকে দূরে সরেছে। ফলে শুধু নীতি ও আদর্শ থেকেই নয়, প্রভাব ও প্রতিষ্ঠার কক্ষপথ থেকেও ছিটকে বেরিয়ে গেছে। কুরআনের সাথে এই জাতি এমনই আজনবী হয়ে গেছে যে, যাদের হওয়ার কথা ছিল কুরআনের সেবক তাদেরই কোনো একজনের কুরআন শেখানোর একটি টুকরো দৃশ্যও হয়ে উঠেছে এক বিরল ও অভাবিতপূর্ব দৃশ্য!

এই কথাগুলোতে কি কিছুমাত্রও অতিরঞ্জন হয়েছে? বাস্তব অবস্থা কি এমনই নয়? এখন কুরআনের শুদ্ধ তিলাওয়াতটুকুও কি শ্রেণিবিশেষের বৈশিষ্ট্য হয়ে যায়নি? মাদরাসা-পড়য়াদের বাইরে কুরআন মাজীদের শুদ্ধ তিলাওয়াতও এখন দুর্লভ। আমাদের এই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের কলেজ-ভার্সিটিগুলো থেকে প্রতি বছর লাখো শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে বের হচ্ছে। কিন্তু বুকে হাত দিয়ে বলুন, তাদের কয়জন কুরআনের শুদ্ধ তিলাওয়াতে সক্ষম।

শিক্ষার্থীদের কথা ছাড়, আমাদের এই মুসলিমদেশের কাণ্ডরী যেই নেতৃবৃন্দ, তাদের যদি সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত করতে বলা হয় তাহলে কয়জন আছেন শুদ্ধভাবে তিলাওয়াত করতে পারবেন? আমাদের সংসদ, সচিবালয়, আদালত এবং অন্যান্য অঙ্গনের যারা কর্তা ব্যক্তি, আমাদের সাহিত্যিক-সাংবাদিক, চিকিৎসক- বিভিন্ন বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা প্রকৌশলী, আমলা-কূটনীতিক, এবং সুশীল সমাজের ব্যক্তিবর্গের উপর যদি একটি জরিপ চালানো হয় যে, তাদের কয়জন শুদ্ধ তিলাওয়াতে সক্ষম তাহলে প্রমাণ হয়ে যাবে কুরআন থেকে এই জাতি কী ভয়াবহ রকম দূরে সরে পড়েছে। এই রকম একটি জরিপের কথা ভাবতেই তো দেহের লোম দাঁড়িয়ে যাচ্ছে!

সত্য কথা এই যে, সাধারণ শিক্ষিত কারো মুখে সুললিত কণ্ঠের বিশুদ্ধ তিলাওয়াত এখন এই দেশে এই সমাজেও স্বপ্নের মত ব্যাপার। আর সে কারণেই সাধারণ শিক্ষিত কেউ যদি শুদ্ধভাবে তিলাওয়াত করেন তাহলে আমরা সচকিত হয়ে উঠি। এক অন্যরকম ভালবাসায় মনটা ভরে ওঠে। এ যেন প্রবাস জীবনে স্বদেশী কারো সাক্ষাৎ পাওয়ার মত ঘটনা।

এখন তো আরেক প্রকারের সমস্যার বিস্তার ঘটেছে, যা মুখে প্রকাশ করাও কষ্টের, মনে চেপে রাখাও কষ্টের। বোধহয় এ ধরনের  বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়েই কোনো কবি বলেছিলেন-

مرا دردیست اندر دل اگر گويم زباں سوزد

وگر در دل نہاں دارم دماغ  استخواں سوزم

একশ্রেণির মানুষের মধ্যে কুরআন সংলগ্নতার প্রকাশ এভাবে ঘটছে যে, তারা যেন কুরআন থেকে গ্রহণ করতে ইচ্ছুক নন; বরং কুরআনকেই কিছু দান করতে ইচ্ছুক। নাউযু বিল্লাহিল আযীম! আর এক্ষেত্রে তারা প্রয়োগ করছেন তাদের তরজমা-নির্ভর কুরআনীজ্ঞান!

আমরা তরজমা শেখার বিরুদ্ধে নই। তবে কুরআন তরজমার সাথে কুরআনের ভাব ও মর্মও তো সঠিকভাবে শিখতে হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা হল, কুরআনের চর্চা হতে হবে কুরআন থেকে গ্রহণ করার জন্য, কুরআনকে দান করার জন্য নয়। এই শ্রেণির লোকের মাঝে এবং এদের প্রভাবে অন্যদের মাঝেও আজকাল যে উপসর্গ লক্ষ্য করা যায় তা হচ্ছে, কুরআনের সহীহ-শুদ্ধ তিলাওয়াত শেখার ব্যাপারে অনীহা। এই মানসিকতা বর্জনীয়।

কুরআনের সহীহ-শুদ্ধ তিলাওয়াত শেখার গুরুত্ব অনেক। এটা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরয। কাজেই অনীহা বা অবহেলার কোনো অবকাশ নেই।

কোনো কোনো ভালো মানুষের জন্য লজ্জাও একটি বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তারা ভাবেন, এত বয়স হয়েছে, এখন তিলাওয়াত শিখতে যাব? লোকে কী বলবে?

দেখুন, কুরআন শেখা লজ্জার ব্যাপার নয়; সৌভাগ্য ও মর্যাদার ব্যাপার। আর মুসলিম হিসেবে আমার অবশ্য-কর্তব্য। নানা কারণে এতদিন এই কর্তব্য পালিত হয়নি বলে এখনও পালন করব না, তা হয় না। বরং এখনো যে আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, কুরআন না শিখে কবরে চলে যাইনি এ তো বড় বাঁচা বেঁচে যাওয়া। কাজেই আর দেরি নয়।

বয়েস হওয়ার পর যাদের বোধ জেগেছে এবং কুরআন শিক্ষায় নিজেকে নিয়োজিত করেছেন তাদের জন্যও আছে সান্ত¡নার অনেক বড় উদাহরণ। আর তা হচ্ছে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনেক বড় বড় সাহাবী কুরআন শিখেছেন বয়েস হওয়ার পর! এখন কুরআন শিখতে বসে তাদের সাথে আমার মতো নগণ্যের যদি একটুখানি সাদৃশ্য তৈরি হয়ে যায় তাহলে সে তো গৌরবের ব্যাপার!

তাঁরা তো ঈমানই এনেছেন বয়েস হওয়ার পর। তো আমাদের ঐ পূর্বসূরিরা যদি পৌত্তলিক সমাজের সকল প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে ঈমান আনতে পারেন ও কুরআনের আলোয় আলোকিত হতে পারেন আমরা উত্তরসূরিরা কি মুসলিমসমাজে থেকেও কুরআন শিখতে পারব না, যা একজন মুসলিমের পক্ষে অতি স্বাভাবিক?

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিখ্যাত বাণী-

خَيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْآنَ وَعَلَّمَه .

তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সে যে কুরআন শেখে এবং শেখায়। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৫০২৭

চিন্তা করার ব্যাপার এই যে, খাইর ও কল্যাণের মাত্রাও যেন কুরআনের পঠন-পাঠনের মাত্রার সাথেই যুক্ত। মুসলিম উম্মাহর শ্রেষ্ঠ যুগ সেটিই ছিল যে যুগে কুরআনের চর্চাকারী ছিলেন সর্বাধিক। এরপর ধীরে ধীরে খাইর ও কল্যাণ ততটাই হ্রাস পেয়েছে, যতটা হ্রাস পেয়েছে কুরআনের পঠন-পাঠন, চর্চা ও অনুশীলন। আজকের অবস্থা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। শিক্ষা ও সংস্কৃতির গালভরা উচ্চারণের সমান্তরালে দেখতে পাচ্ছি সমাজের সর্বস্তরে চরম সহিংসতা ও দুর্নীতি।

আসলে খাইর ও কল্যাণের উৎস হচ্ছে আলকুরআন। কুরআনী শিক্ষার বিস্তারের দ্বারাই কল্যাণের বিস্তার ঘটবে এবং সততা ও বিশ্বস্ততার দ্বার উন্মুক্ত হবে।

 

আজ পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে এমন কর্তারই প্রয়োজন, যিনি নিজেও হবেন কুরআনমুখী এবং তার চারপাশের সকলকে করবেন কুরআনঅভিমুখী।