গবেষণামূলক উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মারকাযুদ্ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা-এর মুখপত্র

মাসিক আলকাউসার

মে-জুন ২০১৭, মে-জুন ২০১৭

আহলে ইলমের পরামর্শ ও সংশোধনী গ্রহণ দ্বীনী কাজের রক্ষাকবচ

ইসলাম আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে একমাত্র মনোনীত দ্বীন। এই দ্বীন যাতে কিয়ামত পর্যন্ত আপন অবস্থায় সংরক্ষিত থাকে, প্রতিটি মানুষ যাতে এই দ্বীনের ছায়াতলে আসতে পারে, দ্বীনের উপর অটল অবিচল থাকতে পারে, সর্বোপরি এই দ্বীন যাতে অন্য সকল ধর্ম ও মতাদর্শের উপর বিজয়ী হতে পারে, এজন্য আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহর উপর বিভিন্ন কাজের দায়িত্বভার অর্পণ করেছেন।

মূলত দাওয়াত ফী সাবিল্লিাহ-তাবলীগ, তালীম, তাযকিয়া, জিহাদ, আম্র বিলমারূফ নাহি আনিল মুনকার, কালিমাতুল হাককি ইনদাস সুলতানিল জাইর ইত্যাদি যত কাজ আছে সবগুলোই খিদমতে দ্বীন ও নুসরতে দ্বীনের এক একটি শাখা। আর প্রত্যেকটি কাজই স্ব-স্ব স্থানে অতীব জরুরি।

সাথে সাথে খিদমতে দ্বীন এবং নুসরতে দ্বীনের প্রতিটি অঙ্গন যাতে সঠিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়, কোনো ধরনের ভ্রান্ত আকীদা এবং ভুল চিন্তা-দর্শনের প্রচার ও বিস্তারের মাধ্যম না হয়ে যায়, সে জন্য সর্বদা উলামা-মাশায়েখের পরামর্শ ও নির্দেশনা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। কেননা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আল্লাইহি ওয়াসাল্লামের অবর্তমানে তাঁরাই আমাদের সকল দ্বীনী কাজের নেগরান ও তত্ত্বাবধায়ক। আর হাদীস শরীফে উলামায়ে কেরামের রাহবারি এবং পথনির্দেশনা গ্রহণ না করাকে অনেক বড় ক্ষতির কারণ বলা হয়েছে। আমাদের পূর্ববর্তী আকাবির বুযুর্গানে দ্বীন এই বিষয়ে অত্যন্ত যতœশীল ছিলেন। এখানে নমুনাস্বরূপ হযরত মাওলানা ইলিয়াস রাহ. প্রতিষ্ঠিত তাবলীগ জামাতের কথা উল্লেখ করা যায়। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, সারাবিশ্বে এই জামাতের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ যে কল্পনাতীত উপকার পেয়েছে আর কোন জামাত বা সংগঠনের দ্বারা  হয়নি। আল্লাহর দরবারে আশা করছি কিয়ামত পর্যন্ত এই মেহনতের সুফল ও কল্যাণ উম্মাহ লাভ করতে থাকুক। একদম সূচনালগ্নে এই নতুন দাওয়াতী মেহনত যতই উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছিল এবং ব্যাপক থেকে ব্যাপকতর হচ্ছিল, ততই নিজের ব্যাপারে এবং কাজের বিষয়ে মাওলানা ইলিয়াস রাহ.-এর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। তিনি বারবার উলামায়ে কেরামের কাছে নিবেদন করতেন যাতে কাজের ব্যাপারে তাঁকে সুষ্ঠু পরামর্শ দিয়ে উপকৃত করা হয় এবং ভুল-ত্রুটি নজরে এলে সংশোধন করে দেয়া হয়।

হযরত মাওলানা ইলিয়াস রাহ. এক পত্রে শায়খুল হাদীস যাকারিয়া রাহ. এবং মাযাহেরুল উলুম সাহারানপুুর-এর নাযিম মাওলানা আব্দুল লতিফ ছাহেবকে সম্বোধন করে লেখেন-

প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় হযরত শায়খুল হাদীস এবং হযরত মুহতারাম জনাব নাযিম ছাহেব (দামাত বারাকাতুহুম)

আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহু।

আশা করি কুশলেই আছেন। রমযানপূর্ব সময়ে অন্তরে একটা বিষয়ের খুবই গুরুত্ব ছিল। কিন্তু নিজের মানবীয় ও ঈমানী দুর্বলতার কারণে তা একেবারেই ভুলে গিয়েছিলাম। সেটা এই যে, আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহে বর্তমানে কাজের উত্তরোত্তর উন্নতি ও জনপ্রিয়তার এত ব্যাপকতা দেখে নিজের ব্যাপারে আমি খুবই শংকাগ্রস্ত। কে জানে কখন এ দুষ্ট নফস অহংকার ও আত্মতুষ্টির শিকার হয়ে পড়ে।

সুতরাং আমি আপনাদের মতো হক্কানী আলিমের কঠোর শাসন ও নেগরানির ভীষণ মুখাপেক্ষী। আপনারাও আমাকে আপনাদের সার্বক্ষণিক নেগরানির মোহতাজ মনে করবেন। কাজের কল্যাণকর বিষয়ে দৃঢ় থাকার এবং অকল্যাণকর বিষয় পরিহার করার জন্য আমাকে কঠোরভাবে তাকীদ করবেন। (২২ শে রমাযান ১৩৬২ হিজরী মোতাবিক ২৩ শে সেপ্টেম্বর ১৯৪৩ ঈ.) -মাওলানা ইলিয়াস রাহ. আওর উনকী দ্বীনী দাওয়াত, পৃষ্ঠা : ২১৭

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হল, হযরত শায়খুল হাদীস ছাহেব এবং মাওলানা আব্দুল লতিফ ছাহেব সরাসরি আমলী ভাবে এই কাজে শরীক ছিলেন না। তা সত্ত্বেও মাওলানা ইলিয়াস রাহ. তাদের কাছে আবেদন করেছেন, যাতে কাজের মধ্যে অকল্যাণকর কোনো কিছু দেখলে সংশোধন করে দেন। অথচ হযরতজী ইলিয়াস রাহ. নিজেও ছিলেন কুরআন-সুন্নাহর একজন বিজ্ঞ আলিম।

শুধু তাই নয়, নিযামুদ্দিনের মাশওয়ারায় বহু বিষয়ে তিনি সিদ্ধান্ত দেয়া থেকে বিরত থাকতেন যাকারিয়া রাহ.-এর পরামর্শের অপেক্ষায়। হযরত শায়খুল হাদীস যাকারিয়া রাহ. লিখেছেন-তাবলীগের কাজে যদি চাচাজান কোনো বিষয়ের সম্মুখীন হতেন, নিঃসংকোচে বলে দিতেন, শায়খের সাথে আলাপ না করে কিছু বলতে পারব না। আমি প্রতিবার সফরে গিয়ে শুনতাম, আমার পরামর্শ ও মঞ্জুরির জন্য অনেকগুলো বিষয় আটকে আছে। একবার আমি নিযামুদ্দীন গেলাম। চাচাজান বললেন, আমাদের সাথীদের দাবি হল যখন জামাত গাশতে যায়, তখন তাদের সাথে একটা ছোট পতাকা থাকা উচিত। আমি বললাম, না। তিনি বললেন কেন? আমি বললাম, আপনার জামাত তো নামাযের জন্য ডাকতে যায় এবং লোকদেরকে মসজিদে জমা করে। আর নামাযের দিকে ডাকার জন্য পতাকার বিষয়টি হাদীসে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। তিনি বললেন, জাযাকুমুল্লাহ। ব্যস ভাই এই বিষয়টি বাদ। -আপবীতি ১/৩৯২

আজকাল কেউ কেউ বলে থাকেন সীরাতে রাসূল, সীরাতে সাহাবা-এর ঘটনা বিদ্যমান থাকা অবস্থায় কাজের বিষয়ে আর পরামর্শের প্রয়োজন নেই। অথচ কোন্ ঘটনার প্রয়োগ কোথায় হবে কীভাবে হবে এই বিষয়েও আহলে ইলমের সাথে পরামর্শ করা জরুরি। যেটা আমরা উপরের ঘটনায় দেখতে পেলাম।

বরং ইলিয়াস রাহ.-এর আকাঙ্ক্ষা ছিল খেদমতে দ্বীনের সকল শাখার অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শক্রমে এই দাওয়াতী মেহনত পরিচালিত হোক।

দারুল উলূম দেওবন্দের মুহতামিম ক্বারী তৈয়্যেব ছাহেব রাহ.-এর উদ্দেশে লিখিত এক পত্রে তিনি লিখেছেন-

আমার মতে, সকল পীর-মাশায়েখ, আলেম-উলামা ও রাজনীতি-বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিবর্গের এমন একটি যৌথ জামাতের পরামর্শের অধীনে এ মুহূর্তে তাবলীগের সব কাজ করা দরকার, যারা একটি নির্দিষ্ট নিয়ম ও ব্যবস্থাপনার আলোকে প্রয়োজনমত পরামর্শক্রমে সকলের সদয় সম্মতি সাপেক্ষে ধারাবাহিকতা রক্ষা করে কাজগুলো পরিচালনা করবেন। মাঠ পর্যায়ের সকল কাজ এর অধীনেই হওয়া উচিত। অতএব, এ মুহূর্তে প্রথমত এমন একটি পরিষদ গঠন হয়ে যাওয়া দরকার। -মাকাতীবে হযরত মাওলানা ইলিয়াস রাহ., পৃষ্ঠা : ১৪৪

হায়! যেখানে ইলিয়াস রাহ. স্বয়ং এই কাজে সকলের সুষ্ঠু পরামর্শ কামনা করতেন সেখানে আজ কোনো কোনো সাথীর যবানে এমন কথা শোনা যায় যে, যারা এই  কাজের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত নয় তাঁদের পরামর্শ ও সংশোধনী গ্রহণযোগ্য নয়। চাই তিনি যত উঁচু স্তরের আলেম হোন না কেন। তাঁদের পরামর্শ ও সংশোধনী গ্রহণের দ্বারা নাকি এই কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হবে!

দ্বিতীয় হযরতজী মাওলানা ইউসুফ ছাহেব রাহ.-ও সাথীদেরকে সর্বদা আহলে ইলম ও আহলে যিকির-এর তত্ত্বাবধান ও পরামর্শ গ্রহণের জোর তাগিদ করতেন। স্বয়ং তিনি নিজেও এ বিষয়ে যতœবান ছিলেন।

এক পত্রে লিখেছেন-ইলম ও যিকির এ কাজের দুটি বাহু। এর কোনো একটির কমতি বা দুর্বলতা মূল কাজের জন্য  মারাত্মক ক্ষতি ও দুর্বলতার কারণ হবে।

প্রত্যেকটিই আপন আপন স্থানে অতীব জরুরি। ইলম ও যিকিরের মারকায হল মাদরাসা ও খানকাহ। আমি আমার এই দুই বাহুকে শক্তিশালী করার জন্য বিভিন্নভাবে বিভিন্ন সময় আহলে ইলম, উলামা সুলাহা ও মাশায়েখদের মুখাপেক্ষী। তাঁরা এই গুরুত্বপূর্ণ দুই কাজে আমাদের ইমাম। কেননা তাদের নিকট নবুওতের ইলম ও নবুওতের মনিমুক্তা বিদ্যমান। এই ইলম ও যিকিরের কারণে তাঁদের কদর করা, তাঁদের খেদমত করা, তাঁদের সোহবত ও সংশ্রবকে নিজেদের ইসলাহ ও নাজাতের কারণ মনে করা আমাদের জন্য অতীব জরুরি। এ কারণে এ দুটি বিষয় তাবলীগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। উলামা-মাশায়েখের সাথে সাক্ষাৎ করা ও তাদের কাছ থেকে দুআ নেয়া এবং দাওয়াত ও তাবলীগের অবস্থা তুলে ধরে তাঁদের থেকে উত্তম পরামর্শ গ্রহণ করা। -সাওয়ানেহে ইউসুফী রাহ., পৃষ্ঠা : ৪৬৪

হযরতজী ইউসুফ ছাহেব রাহ. তাঁর এক বন্ধুকে এক পত্রে লিখেছেন-দেখুন, ভালভাবে বুঝুন। আমরা সবসময় আকাবির উলামার মুখাপেক্ষী। তাদের ছাড়া আমাদের কোনো উপায় নেই। তাদের আঁচল ধরে রাখা আমাদের জন্য সৌভাগ্যের কারণ। তাঁরা অনেকগুলো ভালো গুণ ও নববী নূরের ধারক-বাহক। তাঁদের মূল্য ও মর্যাদা দেয়া মানে নবুওতের মর্যাদা দেয়া। আমরা তাঁদের যে পরিমাণ খেদমত করব, তাদের খেদমতে উপস্থিত হওয়াকে ইবাদাত মনে করে তাঁদের উপদেশবাণীর উপর আমল করব এবং সার্বিক বিষয়ে তাদের সাথে পরামর্শ করব ততই উলূমে নববীর আলো থেকে উপকৃত হতে থাকব। -সাওয়ানেহে ইউসুফী, পৃষ্ঠা : ৪৫২)

উপরোক্ত দুটি চিঠির বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, হযরতজী ইউসুফ ছাহেব রাহ. এই দাওয়াতী কাজের বিষয়ে উলামা-মাশায়েখের থেকে পরামর্শ গ্রহণ করাকে কত গুরুত্বের সাথে দেখতেন।

শুধু সাথীদেরকে তাগিদ করেই ক্ষান্ত হননি; বরং তিনি নিজেও এর উপর আমল করতেন। হযরত মাওলানা ইউসুফ ছাহেব রাহ.-এর সিলেট সফরের কারগুজারী বর্ণনা করতে গিয়ে মুফতী আযীযুর রহমান ছাহেব লিখেছেন: সিলেট হল হযরত শায়খুল ইসলাম মাদানী রাহ.-এর ভক্ত ও অনুরক্তদের এলাকা।...

সিলেটের ইজতেমায় হযরত মাদানী রাহ.-এর বহু খলীফা অংশগ্রহণ করেন। মাওলানা ইউসুফ রাহ. তাঁদের কদর করেন এবং মাশওয়ারায়ও তাঁদেরকে শামিল করেন। তাঁদের পূর্ণ শ্রদ্ধা বজায় রেখে এ কাজের প্রতি তাঁদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। -জামআতে তাবলীগ পার ইতেরাযাত কা জাওয়াবাত : পৃষ্ঠা ২৯ 

তৃতীয় হযরতজী মাওলানা ইনআমুল হাসান ছাহেব রাহ.-ও সর্বদা এই কাজে আহলে ইলমের নেগরানী ও তত্ত্বাবধান কামনা করতেন। তিনি নিজেই বলেছেন-একবার এক মুফতী ছাহেব নিযামুদ্দীন মারকাযে আসলেন। আমি তাঁর কাছে আবেদন করলাম, তিনি যেন এখানে নিয়মিত আসতে থাকেন। তিনি বললেন : এখানে আমাদের কী কাজ? আমি বললাম, আপনাদের কাজ হল আমাদের কোনো কাজ শরীয়তের খেলাফ হচ্ছে কি না এটা পর্যবেক্ষণ করা। -সাওয়ানেহে হযরতজী ছালেছ রাহ. খ- : ৩, পৃষ্ঠা ২৫৯)

যেখানে প্রত্যেক হযরতজী এই দাওয়াতী কাজের বিষয়ে আহলে ইলম ও আহলে যিকিরের পরামর্শ ও সংশোধনীকে এতটা গুরুত্ব দিতেন, চাই তারা এই কাজের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকুন বা না থাকুন সেখানে বলা হচ্ছে, যারা এই কাজের বাহিরে থেকে পরামর্শ ও সংশোধনী দেয় তাদের পরামর্শ ও সংশোধনী গ্রহণযোগ্য নয়।

কোন সন্দেহ নেই যে, এই মেযাজ ও চিন্তা পূর্ববর্তী তিন হযরতজীর চিন্তা ও মেযাজের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

 

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সব ধরনের প্রান্তিকতা থেকে মুক্ত হয়ে মধ্যপন্থার উপর অবিচল থেকে সব ধরনের দ্বীনী খেদমত করার তাওফীক দান করুন। আমীন।