গবেষণামূলক উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মারকাযুদ্ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা-এর মুখপত্র

মাসিক আলকাউসার

মে-জুন ২০১৭, মে-জুন ২০১৭

সমগ্র বিশ্বে একই দিনে চান্দ্রমাসের সূচনা : একই দিনে রোযা ও ঈদ

প্রথমত : ভৌগোলিক ও জ্যোতির্শাস্ত্রীয় বাস্তবতার আলোকে

সমগ্র বিশ্বে একই দিনে রোযা শুরু করা, রমযান মাস শেষ হলে একই দিনে ঈদ করা এবং একই দিনে ঈদুল আযহা করাÑ ভৌগোলিক ও জ্যোতির্শাস্ত্রীয় বাস্তবতার দিক থেকে এগুলো মূলত সম্ভবই নয়। কার্যত যা সম্ভব নয়, শরীয়ত নাযিলের সময় সে বিষয়ের ধারণা থাকলেও, শরীয়ত এর হুকুম দেয় না। আর একে তো অসম্ভব, আবার সে সময় এর ধারণাও ছিল না, এমন বিষয়ের হুকুম শরীয়ত কীভাবে দেবে?

কথা এমনিতেই খুব পরিষ্কার; তা সত্ত্বেও আরো স্পষ্ট করার জন্য প্রথমে আমরা বাস্তবতার আলোকে এর সম্ভাব্যতা যাচাই করে দেখব তারপর শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে এর আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।

 

সম্ভাব্যতা যাচাই

রোযা ও ঈদের ঐক্যের ডাক বেশি আগের নয়, আবার বেশি নতুনও নয়, ষাট বছরেরও কিছু বেশি এর বয়স। প্রথমে যারা এই আওয়াজ তুলেছেন তারা শুধু মুসলিম বিশ্বব্যাপী ঐক্যের প্রস্তাব পেশ করেছেন। পরবর্তীরা বিশ্বব্যাপী এক করার জন্য পীড়াপীড়ি করছেন এবং এখনও করে চলেছেন।

আমরা উভয় দাবির সম্ভাব্যতা যাচাই করতে চাই। নিম্নোক্ত বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা করুন :

এক. আমাদের কি বিশ্বব্যাপী কোনো সর্বজনীন নেতৃত্ব আছে?

একই দিনে বিশ্বব্যাপী রোযা ও ঈদ করা, অন্তত সমগ্র মুসলিম বিশ্বে একই দিনে রোযা ও ঈদ করা, এক্ষেত্রে জানা কথা যে, আমাদের সম্মিলিত কোনো খেলাফত বা নেতৃত্ব অথবা সম্মিলিত কোনো রাষ্ট্র কিছুই নেই। বিশ্বব্যাপী তো নেইই; মুসলিম বিশ্বব্যাপীও নেই। অথচ হিলালের বিশ্বব্যাপী সিদ্ধান্ত দেওয়ার জন্য কোনো না কোনো বিশ্বব্যাপী শক্তি ও নেতৃত্বের প্রয়োজন, যেই নেতৃত্ব সবাই মেনে নেবে। এমন কিছু তো বিলকুল নেই! ওআইসি, এটা তো কোনো বিশ্বজনীন সংস্থা নয়। এর নামই তো হল অর্গানাইজেশন অফ ইসলামিক কোঅপারেশন। আর ওআইসির ফিকহ একাডেমীর সিদ্ধান্তও ওআইসি সমর্থিত হওয়া জরুরি নয়। তাই ফিকহ একাডেমীর সিদ্ধান্ত ওআইসির কাছে কোনো আইনী মর্যাদা রাখে না। ফিকহ একাডেমী ১৯৮৬ ঈ. সনে এই সুপারিশ পাশ করে যে, কোনো এক শহরে চাঁদ দেখা প্রমাণিত হলে সকল মুসলমানের উপরই ঐ চাঁদ দেখা মোতাবেক আমল ওয়াজিব হয়ে যাবে। এই সুপারিশের পর এখন ২০১৬ ঈ. শেষ হয়ে গেল। মোট ত্রিশ বছর পার হয়ে গেল। এখনও পর্যন্ত সেই সুপারিশের উপর আমলের কী পদ্ধতি হবে সে বিষয়ের কোনো খসড়াও তারা পেশ করতে পারেনি এবং ওআইসির মন্ত্রীসভাও একে কার্যকর করার জন্য বাস্তব পদক্ষেপ নেয়নি।

এই প্রস্তাব অর্থাৎ সমগ্র বিশ্বে বা সমগ্র মুসলিম বিশ্বে একই দিনে রোযা ও ঈদ করা, একে বাস্তবায়ন করার জন্য অন্তত চাঁদ দেখার সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে একটি সম্মিলিত বিশ্বজনীন সংগঠনের প্রয়োজন, যার প্রতি সবার ঐকমত্য থাকবে। এর সিদ্ধান্তের প্রতি সমস্ত মুসলমানের আস্থা থাকবে। অন্তত চাঁদ দেখার সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে এই সংগঠনের ফায়সালা অবশ্য-গ্রহণীয় বলে বিবেচিত হবে। আজও পর্যন্ত কি এরকম কোনো সম্মিলিত সংগঠন অস্তিত্বে এসেছে?

ডক্টর এ কে এম মাহবুবুর রহমান, ডক্টর আব্দুল্লাহ মারূফ প্রমুখের গ্রন্থনা ও সম্পাদনায় প্রকাশিত পুস্তিকা পৃথিবীব্যাপী একই দিনে রোযা ও ঈদ : শরীয়াহ কী বলে? এর শেষ কথায় তারা যা লিখেছেন, তা হলÑ

আসুন আমরা হকের পক্ষে কথা বলি :

আলেম সমাজ ও আম জনতাকে আহ্বান জানাচ্ছি, আসুন আমরা সকল অসত্যের জাল ছিন্ন করে বেড়িয়ে আসি, সঠিক দ্বীনি চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে এসকল সমস্যার সমাধান করি। আজকের মুসলমানদের ফরয দায়িত্ব হচ্ছে, মানুষের তৈরি সীমানা উপড়ে ফেলে মরক্কো থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত ইসলামী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার[1], যারা জীবনের সকল ক্ষেত্রে সঠিকভাবে ইসলাম বাস্তবায়ন করবে এবং ইসলাম অনুযায়ী সমাধান প্রদান করবে, সকল মুসলমানকে একই তারিখে রোযা রাখা এবং ঈদ উদযাপন করার ঘোষণা প্রদান করবে এবং সকল উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করবে। মূলতঃ একমাত্র ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্রের পক্ষেই তা সম্ভব। আমীন। (পৃথিবীব্যাপী একই দিনে রোযা ও ঈদ : শরীয়াহ কী বলে?, পৃ. ৪৮)

এই কথাটাই হল আসল কথা, রোযা ও ঈদের ক্ষেত্রে ঐক্যের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার জন্য প্রথমে এটাই করা উচিত। এটা না হোক অন্তত এটুকু তো অবশ্যই হওয়া উচিত, যা উপরে বলা হয়েছেÑ অন্ততঃ চাঁদ দেখার প্রসঙ্গে সর্বমান্য, সর্বসম্মত, বিশ্বজনীন  গ্রহণযোগ্য চাঁদের সিদ্ধান্ত দানকারী কোনো সংগঠন হওয়া উচিত। কিন্তু কোথায় সেরকম সংগঠন? তাছাড়া যদি এমন কোনো সম্মিলিত সংগঠন অস্তিত্বে এসেও যায় তারপরেও কার্যত একই দিনে বা একই তারিখে সমগ্র বিশ্বে তো দূরের কথা গোটা ইসলামী বিশ্বেও সময়ের ব্যবধানের কারণে ঐক্য সম্ভব হবে না।

 

দুই. ঐক্যের ভিত্তি কী হবে?

দ্বিতীয় কথা হল, চান্দ্রমাসের সূচনার ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী আমরা যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছি, সেই ঐক্য কীসের ভিত্তিতে হবে? শরয়ী পদ্ধতিতে চাঁদ দেখার ভিত্তিতে, না জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাবের ভিত্তিতে? দুই পদ্ধতির যে পদ্ধতিই গ্রহণ করা হোক বাস্তব  ক্ষেত্রে ঐক্য অসম্ভব।

(ক)

শরয়ী পদ্ধতিতে চাঁদ দেখার বিধান ছেড়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাবের পদ্ধতি যদি গ্রহণ করা হয় তাহলে প্রথম কথা তো হল, কোনো রাষ্ট্রেই আহলে হক উলামা এবং তাদের অনুসারীগণ এই পদ্ধতির সাথে একমত হবেন না এবং একমত হতে পারেন না! সেক্ষেত্রে ঐক্যের চিন্তা করাটাই ভুল। তারপরও কথার কথা, কেউ যদি জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাবের পদ্ধতি গ্রহণ করতে চান তাহলে কি তিনি চাঁদের সম্মিলন বা সংযোগ (কনজাঙ্কশান) এর হিসাব গ্রহণ করবেন নাকি চাঁদ দৃষ্টিগোচর হওয়ার সম্ভাব্যতার পদ্ধতি গ্রহণ করবেন? যদি চাঁদের কনজাঙ্কশানের হিসাব গ্রহণ করতে চান, তাহলে কনজাঙ্কশান তো দিন-রাতের যে কোনোও সময়ে, যে কোনো জায়গায় হতে পারে। এখন ধরুন, কনজাঙ্কশানের সময় কোনো এলাকায় সাহরীর সময় চলছে, তারা তো রোযা রাখতে পারবে, ঠিক আছে, কিন্তু যেসব এলাকায় ঐ সময় ফজরের নামায হয়ে গিয়েছে /সূর্য ঢলে পড়েছে সেখানকার অধিবাসীরা কি সেদিন রোযা রাখবে, না পরের দিন? যদি সেদিনই রোযা রাখে তবে তো সেটা অযৌক্তিক; বাস্তবতার নিরিখেও এবং শরীয়তের বিধান হিসেবেও। আর যদি পরের দিন রাখে তবে আর ঐক্য হল কোথায়?

(খ)

যদি চাঁদ দৃষ্টিগোচর হওয়ার সম্ভাব্যতার হিসাব গ্রহণ করা হয়, তাহলেও প্রথম কথা হল, চাঁদ দৃষ্টিগোচর হওয়ার সম্ভাব্যতার ভিত্তি খোদ জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছেই ভিন্ন ভিন্ন। এ জন্যই চাঁদ দৃষ্টিগোচর হওয়ার সম্ভাব্যতার নীতি অনুযায়ী প্রস্তুতকৃত লুনার ক্যালেন্ডারে পরস্পর অনেক বৈপরিত্য ও ভিন্নতা পাওয়া যায়। সুতরাং চাঁদ দেখার সম্ভাব্য সময়ই যেহেতু ভিন্ন ভিন্ন সেহেতু এর ভিত্তিতে ঐক্য কীভাবে হবে? এত লুনার ক্যালেন্ডার দিয়ে রোযা ও ঈদ একসাথে কীভাবে করা যাবে?

আরেকটি কথা চিন্তা করার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে জুমার নামাযই IDL (ইন্টারন্যাশনাল ডেট লাইন)-এর এ পাশে আর ও পাশে ভিন্ন ভিন্ন তারিখে হচ্ছে! তাহলে এরপরও ঈদ কি একই দিনে হয়?!

(গ)

এখন বাকি থাকল শরয়ী ভিত্তি হিলাল দেখা। আর এটাই একমাত্র সঠিক ব্যবস্থা, যার ভিত্তিতে ইসলামী মাসসমূহের শরয়ী সূচনা হবে, রোযা শুরু হবে, ঈদ হবে...। হিলাল দেখার ভিত্তিতে রোযা ও ঈদ করলে অন্তত একদিনের ব্যবধান অবশ্যই হবে। হিলাল দেখার ভিত্তিতে সমগ্র বিশ্বে একই দিনে রোযা শুরু করা, একই দিনে ঈদ করা বাস্তব ক্ষেত্রে সম্ভবই নয়। প্রত্যেকে যদি নিজ নিজ অঞ্চলের হিলাল দেখে আমল করে তাহলে ঐক্য সম্ভব না হওয়া তো খুবই স্পষ্ট! সাড়ে চৌদ্দশ বছরের এটাই বাস্তবতা! আর যদি কোনো এক অঞ্চলের হিলাল দেখাকে ভিত্তি বানানো হয়, তবে সেটা কোন অঞ্চল? শরীয়তের কোন্ দলীলের মাধ্যমে সেটা নির্ধারিত হবে? কীসের ভিত্তিতে সেটা অগ্রাধিকার পাবে?

(ঘ)

কেউ যদি কোনো দলীল ছাড়াই শুধু আবেগের বশে সৌদিআরব অথবা মধ্য প্রাচ্যের কোনো অঞ্চলের হিলাল দেখাকে ভিত্তি বানায় তাহলে বিষয়টি বোঝার জন্য নিম্নোক্ত উদাহরণ লক্ষ্য করুন, যা ডক্টর মাহবুবুর রহমান তার গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তিনি  লেখেনÑ

প্রতি চান্দ্র মাসের নতুন চাঁদ সকল সময়ই মধ্য প্রাচ্যের কোনো দেশে সর্ব প্রথম দৃষ্টিগোচর হয়। তাই মধ্য প্রাচ্যের স্থানীয় সময়ের সবচেয়ে দূরতম অগ্রগামী সময়ের দেশ হচ্ছে জাপান। তার সাথে সময়ের পার্থক্য ৭-৩০ ঘণ্টা। ধরা যাক যদি, মধ্য প্রাচ্যে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টায় নতুন চাঁদ দেখে। ঐ সময় পৃথিবীর সর্বপূর্ব স্থান জাপানে রাত ১টা ৩০ মিনিট। তখন জাপানে সাহরী খাওয়ার সর্বনি¤œ সময় হলো ৩টা ৪৩ মিনিট। তাহলে জাপানবাসী চাঁদ উদয়ের সংবাদ পাওয়ার পরেও রোযা রাখতে সাহরী খাওয়ার জন্য সময় পাচ্ছেন। উপরন্ত ঐ সময়ের মধ্যে তারাবীর নামায আদায় করাও সম্ভব এবং শুক্রবার রোযা পালন করা সম্ভব। মধ্যপ্রাচ্যের পূর্বে অবস্থিত অন্যান্য দেশের সাথে সময়ের পার্থক্য আরো কম ফলে তারা রোযা রাখার জন্য আরো বেশি সময় পাবেন।’ (পৃথিবীব্যাপী একই দিনে রোযা ও ঈদ : শরীআহ কী বলে?, পৃ. ৩৯-৪০)

তিনি এটা খেয়াল করেননি যে, এরা তো রাত দেড়টায় গভীর ঘুমে থাকবে। সে সময় চাঁদের খবর তারা কীভাবে পাবে। আর এখানে যা সময় বলা হয়েছে, তা হল জাপানের একটি শহরের হিসেবে। আরো পূর্বের শহরগুলোতে রাতের আরো কম সময় বাকি থাকবে। তাছাড়া উদাহরণটি একটি ভুল তথ্যের উপর ভিত্তি করে পেশ করা হয়েছে। তা হল, ‘প্রতি চান্দ্র মাসের নতুন চাঁদ সকল সময়ই মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশে সর্ব প্রথম দৃষ্টিগোচর হয়।অথচ এটা জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের বক্তব্য এবং বাস্তবতার পরিপন্থী। নতুন চাঁদ সাধারণত পৃথিবীর পশ্চিম প্রান্তেই দৃষ্টিগোচর হয়। এমনকি তা কোনো কোনো মাসে প্রশান্ত মহাসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগর থেকে সর্বপ্রথম দৃষ্টিগোচর হয়। তাছাড়া পশ্চিম প্রান্তের সাথে জাপান নয় ইন্দোনেশিয়ার সময় ধরুন। মৌরতানিয়ায় যখন হিলাল দেখা যাবে তখন ইন্দোনেশিয়ায় দিনের কোন সময়? একটু চিন্তা করুন!

ডক্টর মাহবুবুর রহমান সামনে আরো লিখেছেন-

এবার পশ্চিমাঞ্চলীয় দেশ নিয়ে আলোচনা করা যাক। ১০৫ ডিগ্রী পশ্চিম দ্রাঘিমার দেশসমূহ মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্রের আলবুক্য়ার্ক, ডেনভার, সিয়েন, মাইলস্ সিটিতে চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছবে স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সকাল ৯ টায়। এমনিভাবে সর্বশেষ ১৮০ ডিগ্রী পশ্চিম দ্রাঘিমার দেশ যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে চাঁদ দেখার সংবাদ পৌঁছবে সেখানের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার ভোর ৪ টায়। অতএব মধ্যপ্রাচ্য বৃহস্পতিবার চাঁদ দেখার উপর ভিত্তি করে তারা শুক্রবার ১ রমযানের রোযা পালন করবে। অর্থাৎ সারা পৃথিবীব্যাপি একই দিন রোযা পালন করা সম্ভব।’ (পৃথিবীব্যাপী একই দিনে রোযা ও ঈদ : শরীআহ কী বলে?, পৃ. ৪০)

এটা তিনি আজব কথা লিখেছেন, কারণ কথা যদি এটাই হয় যে, সমগ্র বিশ্বে একই হিলালের উপর আমল করতে হবে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে যে হিলাল দেখা যাবে, সেই হিলালের উপর তো হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ-বাসীদের তৎক্ষণাৎ আমল করা উচিত। তাদের তো বৃহস্পতিবার থেকেই রোযা রাখা উচিত। সৌদি আরব অথবা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশে হিলাল দেখার পর যে এলাকায় সাহরীর সময় পাওয়া যাবে, অন্তত রোযার নিয়ত করার সময় পাওয়া যাবে তাদের তো জুমার দিন পর্যন্ত রোযা বিলম্ব করার পরামর্শ দেওয়া ভুল। আপনি যেহেতু সমগ্র বিশ্বে একই হিলালের উপর আমল করার কথা বলেন, তো আপনি কীভাবে তাদেরকে এই পরামর্শ দিতে পারেন? তো তারা যদি বৃহস্পতিবার রোযা রাখে তাহলে তারা মধ্যপ্রাচ্যের অধিবাসীদের চেয়ে একদিন আগে রোযা রাখল। আর যদি শুক্রবার রাখে তাহলে তো এরা বৃহস্পতিবার (দিবাগত) সন্ধ্যায় নিজেরাই হিলাল দেখবে। তাদের রোযা তাদের হিলাল দেখা মোতাবেকই হবে। মধ্যপ্রাচ্যের হিলাল দেখা মোতাবেক নয়। বৃহস্পতিবারের হিলালই তাদের জন্য হিলাল। যদিও আপনারা জবরদস্তি করে এটাকে পুরোনো চাঁদ বলতে চান। অথচ মধ্যপ্রাচ্যের দ্বিতীয় চাঁদ এখনও পর্যন্ত উদিত হয়ইনি।

এই সকল সম্মানিত ব্যক্তি যদি এই উদাহরণ নিয়েই চিন্তা-ভাবনা করেন, তাহলে তারা ইসলামী চান্দ্রমাসের ক্ষেত্রে একের অধিক হিলালের বিষয়টিও বুঝতে পারবেন। তাহলে জ্যোতির্বিজ্ঞান; যার দোহাই দিয়ে এত লড়াই-ঝগড়া, উলামায়ে কেরামকে এত জাহেল বলা, সেই জ্যোতির্বিজ্ঞানও তো একের অধিক হিলালের ধারণাই দেয়। জ্যোতির্বিজ্ঞানও তো উদয়স্থলের ভিন্নতাকে মেনে নিচ্ছে। এরকম প্রত্যক্ষ ও বাস্তব বিষয়কে জ্যোতির্বিজ্ঞান কখনোই অস্বীকার করে না।

যাই হোক, এখন আমরা যা বলতে চাচ্ছি তা হল, মধ্যপ্রাচ্যের হিলালকে যদি প্রথম এবং একমাত্র হিলাল ধরা হয় এরপর একে সমগ্র বিশ্বে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে বাস্তব ময়দানে কত জটিলতা সামনে আসবে সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা।

চিন্তা করুন, যে সন্ধ্যায় হিলাল দেখা যায়, রোযা এর পরের দিন হয়। এ ক্ষেত্রে হাওয়াইবাসীরা তো বিশ্বব্যাপী প্রথম হেলাল দিয়ে রোযা রাখার নীতি অনুযায়ী বৃহস্পতিবারে রোযা রাখবে, তারা তো হিলালের আগের দিন রোযা রাখছে! আপনার কাছে এর কী ব্যাখ্যা?

আরো শুনুন, এরা যখন বৃহস্পতিবারে রোযা রাখল তখন তো শুক্রবার রাত (বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত) তাদের জন্য দ্বিতীয় তারিখ। কারণ ইসলামী চান্দ্র ক্যালেন্ডারে দিন ও তারিখ সূর্যাস্তের পর থেকেই শুরু হয়ে যায়। এখন যাদের নতুন চাঁদ দেখে হাওয়াইবাসীরা বৃহস্পতিবার রোযা রেখেছে অর্থাৎ (মধ্যপ্রাচ্যের অধিবাসীদের চাঁদ) তারা তো রোযা রাখবে শুক্রবারে, যা হাওয়াইবাসীদের জন্য অবশ্যই অবশ্যই দ্বিতীয় তারিখ। এটাকে যদি হাওয়াইবাসীদের জন্য প্রথম তারিখ বলা হয়, তবে কি তারা শাবানে রোযা রেখেছে? যেহেতু এটা মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম তারিখ আর হাওয়াইয়ে দ্বিতীয় তারিখ আর হাওয়াইবাসীদের রোযা হয়েছে বৃহস্পতিবার, মধ্যপ্রাচ্যের অধিবাসীদের রোযা হয়েছে শুক্রবার তবে তো এখানে দিন তারিখ সবই ভিন্ন ভিন্ন হল! আর এটাও কত অবাক কা- যে, যাদের হিলাল দেখে রোযা রাখা হচ্ছে, তারা রোযা রাখছে পরে, আর অন্যরা রোযা রাখছে আগে।

এটা অবশ্য ভিন্ন এক বিষয় যে, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন হিলাল উঠার সম্ভাব্য সন্ধ্যা যখন, তখন তো হাওয়াইবাসীরা রাত যাপন করছে। তো বেচারাদেরকে শেষ রাতে ঘুমের অবস্থায় চাঁদ দেখার সংবাদ/সাক্ষ্য কীভাবে পৌঁছানো হবে?

আপনি যদি বলেন, হাওয়াইবাসীরা মধ্যপ্রাচ্যে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দৃষ্টিগোচর হওয়া হিলালের ভিত্তিতে (যার সংবাদ তারা বৃহস্পতিবার সুবহে সাদিকের কিছু আগে বা সুবহে সাদিকের পর পেয়েছে) শুক্রবার রোযা রাখবে। তাহলে প্রথম প্রশ্ন হলÑ আপনাদের কথা মত যদি সর্বপ্রথম হিলাল দেখার মাধ্যমেই সমগ্র বিশ্বে হিলাল উদিত হয়ে রমযান শুরু হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে তারা পূর্ণ একদিন রোযা ছাড়া কীভাবে কাটাবে? আপনারা যেভাবে কাফফারার ভয় দেখান, তাদের উপর এক রোযার পরিবর্তে ষাট রোযার কাফফারা আসবে না তো?!

(ঙ)

এ কথা আগেও বলা হয়েছে যে, এই ধারণা ভুল যে, নতুন চাঁদ প্রথমে মক্কায়, অথবা সৌদি রাষ্ট্রের সীমানায় অথবা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো রাষ্ট্রে দেখা যায়। আমরা বেশ কয়েকজন জ্যোতির্বিজ্ঞানীর কাছে এই বিষয়ে জানতে চেয়েছিলাম। তারা বলেছেন, নতুন চাঁদ সর্বপ্রথম দেখা যাবে এমন নির্দিষ্ট কোনো জায়গা নেই। এটাও নির্দিষ্ট নেই যে, প্রতি মাসে নতুন চাঁদ একই জায়গায় প্রথমবার দেখা যাবে। বরং কখনো এক জায়গায় দেখা যায়, কখনো অন্য জায়গায়। তবে অধিকাংশ সময় পৃথিবীর পশ্চিম প্রান্তেই সর্বপ্রথম নতুন চাঁদ দৃষ্টিগোচর হয়। তাদের পত্রগুলো আমাদের কাছে আছে। এ বিষয়ের কিতাবে ইনশাআল্লাহ সেগুলো প্রকাশ করা হবে। 

এই বিষয়টি জানার জন্য ইন্টারনেটে জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে দেওয়া মুন সাইটিংয়ের চান্দ্রগোলকের বিভিন্ন ছবি দেখা যেতে পারে। সেখানে দেখবেন যে, বছরের অনেক মাসে বরং কোনো কোনো বছরের অধিকাংশ মাসে প্রথম দর্শনযোগ্য চাঁদের দৃষ্ট-রেখার বৃত্তে মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশ নেই। বৃত্তের ভেতরে আছে কখনো প্রশান্ত মহাসাগর বা আটলান্টিক মহাসাগর, কখনো হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ, কখনো পৃথিবীর পশ্চিম প্রান্তের অন্যান্য দেশ।

যেহেতু এটাই বাস্তবতা যে, সবসময় হিলাল প্রথমবার সৌদিআরব বা মধ্যপ্রাচ্যে দৃষ্টিগোচর হয় না; বরং অধিকাংশ সময় পৃথিবীর পশ্চিম প্রান্তে দৃষ্টিগোচর হয় সুতরাং বাস্তব ক্ষেত্রে রোযা ও ঈদের ঐক্য সম্ভব কি না তা যাচাই করার জন্য পশ্চিম প্রান্তের এলাকাগুলোর সাথে পূর্ব প্রান্তের এলাকাগুলোর সময় মিলিয়ে দেখতে হবে। এ জন্য নিম্নোক্ত উদাহরণটি লক্ষ্য করুনÑ

ধরে নিন, ৫ই জুন সন্ধ্যা ২৯ শাবানের সন্ধ্যা। কিন্তু প্রাচ্যের ও পাশ্চাত্যের কোনো দেশেই চাঁদ দেখা যায়নি। আবাদি স্থানগুলোর মধ্যে শুধু হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে হিলাল দেখা গেছে সন্ধ্যা ছয়টায়। ধরে নিন যে, কোনো গ্রহণযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে এর সাক্ষ্য বা সংবাদ প্রাচ্যের দেশগুলোতেও এসে পৌঁছল। কিন্তু বিষয় হল, হাওয়াইতে ৫ই জুন সন্ধ্যায় হিলাল দেখা গেছে, তখন বাংলাদেশে ৬ই জুন সকাল দশটা এবং মালয়েশিয়ায় সকাল আটটা। এখন এখানকার লোকেরা যে রোযা রাখবে কীভাবে রাখবে? আর যদি না রাখে তাহলে সাতই জুন হবে তাদের প্রথম রোযা অথচ সেদিন হাওয়াই-র অধিবাসীদের ২য় রোযা চলছে। তাহলে একই দিনে সবার রোযা হল কোথায়? কীভাবেই বা হতে পারে? আর যদি বলেন, হোক না হোক, প্রাচ্যের অধিবাসীদের ৬ই জুনই রোযা রাখতে হবে, তাহলে তারাবীহ ছাড়া, সাহরী ছাড়া, রাতে নিয়ত করা ছাড়া কোন্ দলীলের ভিত্তিতে এদের উপর রোযা ফরয করে দেওয়া হবে?[2] এর চেয়ে বড় কথা হল, রোযার নির্ধারিত সময় তো সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। অথচ এক্ষেত্রে প্রাচ্যের বাসিন্দাদের দিনের বিভিন্ন সময়ে রোযা শুরু করতে হচ্ছে?!

এর চেয়েও বড় কথা হল, হিলাল দেখার আগে তো রোযার সময় শুরুই হয় না; প্রাচ্যের বাসিন্দাদের কাছে যদি দিনের কোনো অংশে হাওয়াইয়ের হিলাল দেখা প্রমাণিত হয়ে যায়, আর ততক্ষণ পর্যন্ত এরা কিছু না খেয়েও থাকে তাহলেও তো তাদের রোযা সুবহে সাদিক থেকে হয়েছে গণ্য হবে না। কারণ তাদের সুবহে সাদিকের সময় দুনিয়ার কোথাও নতুন চাঁদ দেখাই যায়নি। এ জন্য ঐটা রোযার সময় ছিল না।

আর যদি মেনেও নেওয়া হয় যে, প্রাচ্যের বাসিন্দারা ৬ই জুনই রোযা রাখবে তাহলে প্রশ্ন হল, পরবর্তীতে যদি হাওয়াইয়ের বাসিন্দারা তাদের হিসাব মতো ২৯ শাবান সন্ধ্যায় হিলাল না দেখে তাহলে তো তাদের পূর্ণ ত্রিশ দিন রোযা রাখতে হবে। তখন প্রাচ্যের বাসিন্দাদের মোট রোযা হয়ে যাচ্ছে একত্রিশটি!

দ্বিতীয় প্রশ্ন হল, প্রাচ্যের বাসিন্দাদের এই অসম্পূর্ণ রোযা রমযানের ফরয রোযা হিসাবেই ধর্তব্য হবে নাকি এর কাযা আদায় করা তাদের জন্য আবশ্যক? যদি কাযা করতে হয়, তাহলে ঐক্যের আর অর্থ কী? আর যদি কাযা না করতে হয় তাহলে অসম্পূর্ণ রোযা দিয়ে ফরয কীভাবে আদায় হবে?

আজ ১৬ই ডিসেম্বর ২০১৬ ঈ. জুমাবার দিবাগত রাত এখানে সন্ধ্যা সাতটা বিশ মিনিটে কানাডার রিরহরঢ়বম শহরে অবস্থানরত এক বন্ধুর কাছে কিছু তথ্যের বিষয়ে ফোন করা হয়েছিল। তিনি বললেন, ‘আমাদের এখানে আজকে জুমাবার সকাল সাতটা বিশ মিনিট। অর্থাৎ পূর্ণ বার ঘণ্টার ব্যবধান। আর আমাদের তো শনিবার শুরু হয়ে গেছে, অথচ তারা এখনও জুমার নামাযই পড়েননি। ধরে নিন কানাডাতে যদি হিলাল প্রথম দৃষ্টিগোচর হয়, যেদিন সন্ধ্যায় সেখানে হিলাল দেখা যাবে, সেসময় আমাদের এখানে হবে পরের দিন সকাল। আমরা যদি ঐ দিনই রোযা রাখি, তবে সে রোযা হবে অসম্পূর্ণ, আর যদি পরের দিন রোযা রাখি, তাহলে দিন ও তারিখ ভিন্ন হয়ে যাবে।

এমনিভাবে প্রথম হিলাল যদি আলাস্কায় হয় তাহলে তো কোরিয়ার মুসলমানেরা যখন এর সংবাদ পাবে তখন তারা সকাল ৯/১০টা পার করছে। তাদের জন্য তো নিয়মমত রোযা রাখা সম্ভবই নয়। আবার এই হিলালের সংবাদ নিউজিল্যান্ডে এমন সময় পৌঁছবে যখন তাদের দিন-তারিখ সব পরিবর্তন হয়ে গেছে। কারণ হল, এক দেশ ইন্টারন্যাশনাল ডেট লাইনেরএক পাশে আরেক দেশ অপর পাশে। নিউজিল্যান্ডের অধিবাসীরা যদি আলাস্কার অধিবাসীদের সাথে একই ভোরে রোযা শুরু করে তাহলেও তাদের দিন ও তারিখ ভিন্ন হবে।

মোটকথা, প্রথমত বিশ্বজনীন কোনো নেতৃত্ব নেই। দ্বিতীয়ত সময়ের ব্যবধান অনেক। এসব কারণে বাস্তবতার আলোকে একই দিনে রোযা শুরু করা, একই দিনে ঈদ করা না বিশ্বব্যাপী সম্ভব না মুসলিম বিশ্বে সম্ভব।

এবার আমরা দেখব যে, শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে এর অবস্থান কী? এ ধরনের প্রয়াস-প্রচেষ্টা কি শরীয়তে কোনো জরুরি বিষয়? বা অন্তত মুস্তাহাব পর্যায়ের কোনো সওয়াবের কাজ?

 

শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে

বিশ্বব্যাপী একই দিনে বা একই তারিখে রোযা ও ঈদ করাকে ফরয/জরুরি সাব্যস্ত করার শরয়ী দৃষ্টিভঙ্গি আলোচনা করার জন্য নিম্নোক্ত বিষয়গুলো সামনে রাখতে হবে :

১. যে বিষয় গোড়া থেকেই সম্ভব নয় বা যে বিষয় পালনে অনেক জটিলতার সৃষ্টি হয়, শরীয়ত কখনো এমন বিষয়ের আদেশ করে না। এজন্য যে কোনো সমঝদার ব্যক্তির কাছে প্রথম ধাপেই এই ফলাফল স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, বিশ্বব্যাপী একই দিনে রোযা ও ঈদ করা শরীয়তের নির্দেশ হতেই পারে না। অসম্ভব অথবা প্রায় অসম্ভব কোনো কাজের আদেশ শরীয়ত করতে পারে না।

২. শরীয়ত নাযিলের সময় যে বিষয়ের কোনোও ধারণা-কল্পনাও ছিল না, এরকম বিষয় শরীয়তের নির্দেশ হওয়ার কথা ভাবাই যায় না। সুতরাং এখানে তো একথা পরিষ্কার যে, এই কাজ শরীয়তের নির্দেশ হতে পারে না।

৩. নব উদ্ভাবিত কোনো কাজকে ফরয-ওয়াজিব তো দূরের কথা; সুন্নতের মর্তবাও যদি দেওয়া হয় তাহলেও এটা বিদআত হয়ে যায়। আর বিদআত তো গোমরাহী আর ভ্রষ্টতা।

৪. যে কাজের বিশেষ কোনো সওয়াব বা ফযীলত কুরআন হাদীসে বর্ণিত হয়নি আবার এই কাজ করতে গেলে অনেক কষ্ট ও অসুবিধা দেখা দেয় এরকম কাজ তো নিঃসন্দেহে তাকাল্লুফতথা লৌকিকতা ও নিরর্থক আয়োজন ছাড়া কিছু নয়। আর এ উম্মতকে এসব তাকাল্লুফ থেকে নিষেধ করা হয়েছে। হাদীস শরীফে এসেছেÑ نهينا عن التكلف  আমাদেরকে তাকাল্লুফ থেকে নিষেধ করা হয়েছে।

৫. বিশ্বব্যাপী এই ঐক্যের শরয়ী কোনো মানদ- নেই। এটা যদি শরীয়তে নির্দেশিত হতই তাহলে শরীয়তে এর কোনো মানদ-ও থাকত। এই প্রসঙ্গে যে তিনটি মানদ- বলা হয়, এর একটাও আমলযোগ্য নয়!

 

ক. জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাবের ভিত্তিতে প্রস্তুতকৃত লুনার ক্যালেন্ডার

এতে শরীয়তের বিধান পরিবর্তন হয়ে যায়। সুতরাং এটা সম্পূর্ণ না-জায়েয। শরীয়ত-নির্ধারিত ভিত্তি হিলাল দেখাপরিবর্তন করার ইখতিয়ার কারো নেই। কেউ যদি পরিবর্তন করে দেয়ও তাহলেও আহলে হক মুসলমানরা একে গ্রহণ করবে না। তাহলে ঐক্য কীভাবে হবে।

 

খ. প্রথম হিলাল দেখা

এটা এ জন্য মানদ- হতে পারে না যে, প্রথমবার কোথায় হিলাল দৃষ্টিগোচর হয়, তা অনুসন্ধান করার হুকুম শরীয়ত দেয়নি। আর বাস্তবে দূর-দূরান্তের অঞ্চলের জন্য প্রথম হিলাল কোথায় কখন দেখা গিয়েছে তা অনুসন্ধান করা অনেক জটিল বিষয়। তারপরও যদি হিলাল সাব্যস্ত হয়েও যায়, তাহলেও সেটাকে বিশ্বব্যাপী কার্যকর করতে গেলে অনেক জটিলতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। এজন্য এই পদ্ধতিও আমলযোগ্য নয়। 

 

গ. সৌদি আরবের হিলাল দেখাকে ভিত্তি বানানো

সৌদিআরবের চাঁদ দেখার ভিত্তিতেও বিশ্বব্যাপী আমল করা সম্ভব নয়। তাছাড়া কোনো এক জায়গার হিলালকে সমগ্র বিশ্বের জন্য নির্ধারণ করে দেওয়া, শুধু এতটুকু নয় যে, তা দলীলবিহীন, বরং এটা দলীলবিরোধী। সুতরাং এই পদ্ধতিই আসলে গ্রহণ করা উচিত যে, প্রত্যেক অঞ্চলের বাসিন্দারা নিজ নিজ অঞ্চলের হিলাল দেখা অনুসারে আমল করবে।

সুতরাং যেহেতু বিশ্বব্যাপী ঐক্যের শরয়ী কোনো মানদ- নেই তাহলে এটা শরীয়তে ফরয /ওয়াজিব বা সুন্নত তো দূরের কথা; অন্তত শরীয়তের কাম্যও হয় কীভাবে?

৬. শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে বাস্তবতা হল এ-ই। কিন্তু তথাকথিত প্রগতিপন্থী কিছু লোক বিষয়টাকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন এবং এর জন্য এমন এমন দলীল বের করেন, যেন কুরআন-হাদীসে সম্পূর্ণ সুস্পষ্টভাবেই বিশ্বব্যাপী একই দিনে রোযা শুরু করা এবং একই দিনে ঈদ করার কথা বলা হয়েছে। তারা এটাও বলেন যে, ‘যেহেতু আগের যামানায় প্রচারমাধ্যম এত উন্নত ছিল না; যা এখন হয়েছে, সেজন্য আগের লোকেরা শরীয়তের ঐ ওয়াজিব বিধান বাস্তবায়ন করতে পারেননি। তাদের যদি সুযোগ হত তাহলে তারা অবশ্যই এটা বাস্তবায়ন করতেন।

এখন তো প্রচারমাধ্যম এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা এত উন্নত হয়েছে যে, পুরো বিশ্ব যেন একটি গ্রাম। এখন আমাদের কুরআন-হাদীসের সেই বিধান বাস্তবায়ন করতে বাধা কোথায়?’

সামনে আমরা সেই ভাইদের পেশকৃত দলীলের (বাস্তবে যেগুলো দলীল নয়) উপর পর্যালোচনা করতে চাই। যেন এ কথা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, এরা কোনো দলীল ছাড়াই একটি নব উদ্ভাবিত বিষয়কে শরীয়তের আবশ্যকীয় বিধান সাব্যস্ত করতে লেগেছেন।

৭. উদয়স্থলের ভিন্নতা ধর্তব্য না হওয়ার অভিমত আর একই দিনে রোযা ও ঈদ জরুরি হওয়ার মতকে এক মনে করা।

তাদের বড় এক দুর্বলতা হল, তারা ফিকহ-ফতোয়ার কিছু কিতাবে দেখেছেন যে, হানাফী মাযহাবে, (বরং এক অনির্ভরযোগ্য বর্ণনা মতে শাফেয়ী মাযহাব ছাড়া অন্য তিন মাযহাবেও এবং এক বক্তব্য অনুযায়ী শাফেয়ী মাযহাবেও) উদয়স্থলের ভিন্নতা ধর্তব্য নয়। সুতরাং যদি অন্য কোনো এলাকা থেকে তরীকে মুজিবঅর্থাৎ বিশ্বস্ত ও শরয়ী নিয়ম-সমর্থিত পদ্ধতিতে খবর পাওয়া যায় তাহলে সে অনুযায়ী আমল করা জরুরি। এখান থেকে তাঁরা    এটা বুঝে নিয়েছেন যে, দেখ! সমগ্র বিশ্বে একই দিনে রোযা ও ঈদ করার কথা তো ইমাম আবু হানীফা, ইমাম মালেক, ইমাম আহমদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহিমও বলে গিয়েছেন!!

এটা তাদের অসম্পূর্ণ বুঝের পরিণাম ছাড়া কিছুই নয়। প্রথম কথা তো হল, لاعبرة لاختلاف المطالع  ‘উদয়স্থলের ভিন্নতা ধর্তব্য নয়এমন ব্যাপক ও নিঃশর্ত কথা তো কোনো ইমামই বলেননি। ফিকহের কিতাবের পরবর্তী মুসান্নিফগণের অনেকে এ ধরনের নিঃশর্ত কথা যদিও লিখেছেন, কিন্তু ইমামদের কেউই এরকম নিঃশর্ত কথা বলেননি। ইমাম আহমদ ছাড়া অন্য তিন ইমামের মাযহাবেই অগ্রগণ্য বক্তব্য, যার উপর অধিকাংশ ফকীহ ফতোয়া দিয়েছেন তা এই যে, ‘কাছাকাছি অঞ্চলের ক্ষেত্রে তো এক জায়গার হিলাল দেখা অন্য জায়গার জন্য অবশ্য-অনুসরণীয় হবে, কিন্তু দূরবর্তী অঞ্চলের ক্ষেত্রে এক জায়গার হিলাল দেখা অন্য জায়গার জন্য প্রযোজ্য নয়। হানাফী মাযহাবেরই অনেক বড় বড় ফকীহ এটা বলেছেন। ইমাম আবু হানীফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি  থেকে এর বিপরীতে একটি শব্দও বর্ণিত হয়নি।  উদয়স্থলের বিভিন্নতা ধর্তব্য নয়জাতীয় বাক্য ইমাম আবু হানীফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি থেকে পাওয়া যায়নি। আর হানাফী মাযহাবে জাহিরুর রিওয়ায়াহ মানে হল ঐসব মাসআলা, যা ইমাম আবু হানীফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহির শাগরেদ ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান রাহমাতুল্লাহি আলাইহির ছয় কিতাবে উল্লেখ আছে। আলহামদু লিল্লাহ ইমাম মুহাম্মাদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহির সব কিতাব এখন ছাপা আছে। এসব কিতাবের কোথাও لاعبرة لاختلاف المطالعউদয়স্থলের বিভিন্নতা ধর্তব্য নয়জাতীয় কোনো বাক্য পাওয়া যায়নি।

অবশ্য এই বাক্য কানযুদ দাকায়েকসহ ফিকহে হানাফীর কিছু কিতাবে অবশ্যই এসেছে। কিন্তু এর যে অর্থ এখন উদ্ভাবন করা হয়েছে যে, পৃথিবীব্যাপী একই দিনে রোযা ও ঈদ করা ফরয, এরকম কথা সেই মুসান্নিফদের কল্পনার আশেপাশেও আসেনি। এখানে সম্পূর্ণ নব উদ্ভাবিত একটি বিষয়কে এই বাক্যের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য শুধু এ কথা বলা যে, নিজ অঞ্চলের বাইরে থেকেও হিলাল সাব্যস্ত হওয়ার শরয়ী সাক্ষ্য যদি তরীকে মুজিবএর মাধ্যমে এসে যায়, তবে সে অনুযায়ী আমল করা জরুরী। কিন্তু তাদের কেউ এ কথা বলেননি যে, ২৯ শাবান সন্ধ্যায় মুসলমানদের দায়িত্ব শুধু এটুকু নয় যে, নিজ নিজ এলাকায় হিলাল তালাশ করবে বরং তাদের উপর এটাও ফরয যে, সারা বিশ্বের কোনো এলাকায় আজ হিলাল দেখা গিয়েছে কি না তা সন্ধান করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট সংবাদ ও সাক্ষ্য সংগ্রহ করে তা যাচাই করতে হবে, হিলাল দেখা প্রমাণিত হলে তা সারা বিশ্বে বাস্তবায়ন করতে হবে। এ কথা যদি কোনো একজন ফকীহও কোথাও লিখতেন, তাহলেও বলা যেত যে, যাক! একজন ফকীহ তো অন্তত এ কথা বলেছেন! কিন্তু চার মাযহাবের ফিকহ-ফতোয়ার কিতাবের বিশাল ভাণ্ডারে কোনো নির্ভরযোগ্য ফকীহের কিতাব থেকে এরকম কথা ইনশাআল্লাহ দেখানো যাবে না! বরং এর বিপরীতে যে সকল আলিম لاعبرة لاختلاف المطالع বক্তব্যকে হানাফী মাযহাবের বা অন্য মাযহাবের অগ্রগণ্য সিদ্ধান্ত মনে করেছেন তাদেরকেই যখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছে যে, সারা বিশ্বে নয়, বরং বড় কোনো অঞ্চল জুড়ে প্রথম হিলাল দেখার ভিত্তিতে রোযা ও ঈদের আয়োজন করার শরয়ী বিধান কী, তখন তারা সুস্পষ্টভাবে লিখেছেন, এটা ওয়াজিব তো কখনোই নয় বরং শরীয়তে এটা কাম্য বিষয়ও নয়। (এমদাদুল ফাতাওয়া খ. ২, পৃ. ১২৯)

তো আমরা বলছিলাম, তাদের বড় দুর্বলতা এই যে, তারা কয়েক বছর আগের উদ্ভাবিত একটি প্রস্তাবকে কয়েকশ বছর আগের ফিকহ-ফতোয়ার কিতাবের উপর চাপিয়ে দিয়েছেন। এই ভুল ধারণার ভিত্তিতে যে لاعبرة لاختلاف المطالع  বাক্যে একথাই বলা হয়েছে, অথচ বিষয়টি এমন নয়।

৯. কুরআন ও হাদীসে কি একই দিনে রোযা ও ঈদ করার হুকুম দেওয়া হয়েছে?

তাদের এরচেয়েও বড় দুর্বলতা হল, তারা নবউদ্ভাবিত একটি প্রস্তাব, যার সূচনাই হয়েছে বেশি দিন হয়নি, তারা একে সরাসরি কুরআন-হাদীসের হুকুম সাব্যস্ত করছেন।৩[3] তারা বলছেন, কুরআন কারীমের আয়াত ২ : ১৮৫ -এ এবং -صوموا لرؤيته وأفطروا لرؤيته শীর্ষক হাদীসে এই হুকুম দেওয়া হয়েছে যে, বিশ্বব্যাপী একই দিনে রোযা শুরু করতে হবে, একই দিনে রোযা শেষ করে ঈদ করতে হবে। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

জানি না, তারা সাধারণ বুদ্ধিকে কেন একটু কাজে লাগান না। যদি কোনো হুকুম কুরআন ও হাদীসে স্পষ্টভাবে এসে থাকে তাহলে সেটা আর নতুন কথা হবে কীভাবে? এটা তো তাহলে আয়াত যখন নাযিল হয়েছে, হাদীস যখন ইরশাদ হয়েছে তখন থেকে মানুষের মাঝে একটা জানাশোনা বিষয় হত। অনেক পুরোনো বিষয় হত। তাফসীরের কিতাবে, হাদীসের ব্যাখ্যার কিতাবে, ফিকহের কিতাবে এর আলোচনা হত। প্রত্যেক যুগের আলিম ও ফকীহগণের মুখে এর চর্চা হত। এমন কেন হল যে, পনেরো শতকে এসে এটা আবিষ্কার করতে হল আর দলীল-প্রমাণের  খোঁজে নামা হল।

যাই হোক, এখানে মনে হচ্ছে উক্ত আয়াত এবং উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যা পূর্বাপরসহ উল্লেখ করে দিই। যাতে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এই আয়াত এবং এই হাদীসকে আলোচ্য বিষয়বস্তুতে টেনে আনা আয়াত ও হাদীসের উপর কত বড় জুলুম।

 

২ : ১৮৫ আয়াতের মর্ম

কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা বলেনÑ

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِیْۤ اُنْزِلَ فِیْهِ الْقُرْاٰنُ هُدًی لِّلنَّاسِ وَ بَیِّنٰتٍ مِّنَ الْهُدٰی وَ الْفُرْقَانِ،  فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْیَصُمْهُ،  وَ مَنْ كَانَ مَرِیْضًا اَوْ عَلٰی سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ اَیَّامٍ اُخَرَ،  یُرِیْدُ اللهُ بِكُمُ الْیُسْرَ وَ لَا یُرِیْدُ بِكُمُ الْعُسْرَ  وَ لِتُكْمِلُوا الْعِدَّةَ وَ لِتُكَبِّرُوا اللهَ عَلٰی مَا هَدٰىكُمْ وَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُوْنَ.

রমযান মাসÑ যে মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছে। যা মানুষের জন্য আদ্যোপান্ত হিদায়াত এবং এমন সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী সম্বলিত, যা সঠিক পথ দেখায় এবং সত্য-মিথ্যার মাঝে চূড়ান্ত ফায়সালা করে দেয়। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তিই এই মাস পাবে সে যেন এই সময় অবশ্যই রোযা রাখে। আর তোমাদের মধ্যে কেউ যদি অসুস্থ হয় বা সফরে থাকে তবে অন্য সময় সে সমান সংখ্যা পূরণ করবে। আল্লাহ তোমাদের পক্ষে যা সহজ, সেটাই করতে চান। তোমাদের জন্য জটিলতা সৃষ্টি করতে চান না। যাতে তোমরা রোযার সংখ্যা পূরণ করে নাও এবং আল্লাহ তোমাদের যে পথ দেখিয়েছেন সে জন্য আল্লাহর তাকবীর পাঠ কর এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।

আয়াতে কারিমায় فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْیَصُمْهُ  অংশটির এক অর্থ তো এটাই, যা উক্ত তরজমা থেকে বুঝে আসছে। অর্থাৎ যে ব্যক্তিই এই মাস পাবে, অন্য কথায় যে ব্যক্তিই এই মাসে উপনীত হবে সে যেন অবশ্যই এই মাসের রোযা রাখে।

এর আরেক অর্থ এটাও হতে পারে যে, যে ব্যক্তি এই সময় মুকীমঅবস্থায় থাকবে সে যেন অবশ্যই এই মাসের রোযা রাখে।  (যে সফরে থাকবে তার জন্য ঐ সময় রোযা ফরয নয়, তার জন্য পরবর্তীতে কাযা করে নেওয়ার অনুমতি আছে।) যে অর্থই গ্রহণ করা হোক, এখানে তো দূর থেকেও এ কথা বের করা যায় না যে, বিশ্বব্যাপী একই হিলাল এবং প্রথম হিলালের ভিত্তিতে রোযা রাখা ফরয। বিশ্বব্যাপী একই তারিখে রোযা শুরু করা এবং একই তারিখে ঈদ করা ফরয। এই প্রসঙ্গ আয়াতের কোন্ শব্দ থেকে বুঝে আসে? আয়াতে তো রমযান শুরু হলে শরীয়ত পালনে আদিষ্ট প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য রোযা রাখা ফরযÑ এটুকুই বলা হয়েছে। রমযান কীভাবে শুরু হবে সে বিষয়ে এ আয়াত নীরব। তাহলে এ আয়াতের ঐ অর্থ কীভাবে বানানো হচ্ছে? তাদের কেউ কেউ বলেন যে, আয়াতে من শব্দটি ব্যাপকতা বুঝাচ্ছে। কিন্তু এ কথা কে অস্বীকার করে যে, من শব্দটি ব্যাপকতা বুঝাচ্ছে! من শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক।  সে কারণেই তো সকল মুসলিম নর-নারীর উপর রোযা ফরয! হাঁ, ওযরের কারণে শরীয়ত যাদেরকে অনুমতি দিয়েছে তাদের কথা ভিন্ন। এই আয়াতে সকল মুসলমানকেই রোযা রাখার হুকুম দেওয়া হয়েছে। এ থেকে এটা কীভাবে বুঝা যায় যে, প্রত্যেক এলাকার মুসলমানদের উপর একই দিনে রোযা শুরু করা ফরয। এটা তো ভিন্ন এক প্রসঙ্গ। এ বিষয়ে আয়াত নীরব।

যদি আয়াতের ইশারাই ধরা হয়, তাহলে তো শায়েখ মুহাম্মাদ বিন সালেহ আলউছাইমীনের কথা মতো এ আয়াতে এদিকে ইশারা আছে যে, যে অঞ্চলে লোকেরা এখনও রমযান পায়নি তাদের রোযা এখন শুরু হবে না। যখন তারা নিজেরা চাঁদ দেখার মাধ্যমে তাদের ওখানে রমযান শুরু হবে আর তারা রমযান পাবে তখনই তাদের উপর রোযা শুরু করা ফরয হবে। লক্ষ্য করুন যদি কারো রমযান না পাওয়ার বিষয়ই এখানে না থাকে তাহলে এভাবে বলার কী অর্থ যে, তোমাদের মধ্যে যারা রমযান পাবে!

যাইহোক, এটা তো একটা সূক্ষ্ম ইশারা। এ আয়াতে এর সম্ভাবনা আছে বটে! কিন্তু এই আয়াতের সুস্পষ্ট যে অর্থ, তা হল, রমযান শুরু হলে শরীয়ত পালনে আদিষ্ট প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য রোযা ফরয।  উদয়স্থলের বিভিন্নতা ধর্তব্য কি ধর্তব্য নয় এই বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো হুকুম না এই আয়াতে আছে, না অন্য কোনো আয়াতে! এটা তো এক মুজতাহাদ ফীহ (ইজতিহাদ নির্ভর) মাসআলা। ফকীহগণ এই বিষয়ে ইজতিহাদের পথ অবলম্বন করেছেন এবং তাতে তাদের মাঝে মতভিন্নতাও হয়েছে। এই আয়াতের উদ্দিষ্ট মর্মের মধ্যে উদয়স্থলের বিভিন্নতার মাসআলা সরাসরি দাখিল করা ভুল। আর এই দাবি করা তো অনেক দূরের কথা যে, এই আয়াতে একই হিলাল ও প্রথম হিলালের ভিত্তিতে বিশ্বব্যাপী একই দিনে রোযা ও ঈদ করার হুকুম দেওয়া হয়েছে। নাউযুবিল্লাহিল আযীম।

রমযান কীভাবে শুরু করতে হবে সে আলোচনা তো ২ : ১৮৯ আয়াতে এসেছে।

یَسْـَٔلُوْنَكَ عَنِ الْاَهِلَّةِ  قُلْ هِیَ مَوَاقِیْتُ لِلنَّاسِ وَ الْحَجِّ

অর্থাৎ মানুষ আপনাকে হিলালসমূহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। আপনি বলে দিন সেগুলো মানুষের জন্য (অর্থাৎ তাদের ইবাদত ও লেনদেনের জন্য, বিশেষ করে) হজ্বের জন্য সময় নিরূপণের মাধ্যম।

তো রমযান কীভাবে শুরু হবে তার বিবরণ এই আয়াতে এবং হাদীস শরীফে এসেছে। লক্ষ্য করুন! এ আয়াত এবং যেসব হাদীসকে এই আয়াতের ব্যাখ্যা বলা হয়েছে, কোথাও এ কথা  নেই যে, ইসলামী মাসসমূহের শরয়ী সূচনা সমগ্র বিশ্বে একই সাথে করা জরুরি এবং একই হিলালের দেখার ভিত্তিতে সমগ্র বিশ্বে একই দিনে রোযা ও ঈদ করা জরুরি! হিলালের মাধ্যমে সময় নির্ধারণের ফায়দা সৃষ্টির সূচনা থেকেই মানুষ লাভ করে আসছে। ইসলামে রোযা ফরয হওয়ার সময় থেকেই মানুষ হিলালের মাধ্যমেই রোযার সময়, রমযানের শুরু ও শেষ নির্ধারণ করে আসছে। কখনোই তো তাদের কল্পনায়ও এ কথা আসেনি যে, এই আয়াতে বিশ্বব্যাপী এবং প্রথম দেখা হিলালের ভিত্তিতেই সময় নির্ধারণ করা এবং এক হিলাল ও প্রথম হিলাল দেখার ভিত্তিতে রোযা শুরু করা এবং ঈদ করা ফরয করা হয়েছে। বড় আশ্চর্যের কথা যে, আয়াত নাযিল হওয়ার পর থেকে এতদিন পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহ আয়াতের উপর যেভাবে আমল করে এসেছে তা আয়াতের মর্ম নয়। আর যে কথা কালকের সৃষ্ট আর তাও আবার নিছক চিন্তা ও দর্শনের আকারেই রয়ে গেছে, সেটাই নাকি আয়াতের উদ্দিষ্ট অর্থ!!

কুরআনের তাফসীরের কোনো এক নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকেও কি এই নব উদ্ভাবিত ব্যাখ্যার একটি উদ্ধৃতি পেশ করা সম্ভব? সালাফে সালেহীনের নির্ভরযোগ্য কোনো এক কিতাবেও কি এই নব উদ্ভাবিত ব্যাখ্যার একটিও উদ্ধৃতি পেশ করা সম্ভব? কোনো সন্দেহ নেই যে, তা কোনোদিনই সম্ভব নয়!

এবার হাদীস শরীফের ভাষ্যটি লক্ষ্য করুন :

হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছেÑ

إن الله تبارك و تعالى جعل الأهلة مواقيت للناس، فصوموا لرؤيته، وأفطروا لرؤيته، فإن غم عليكم فعدوا له ثلاثين يوما.

নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা হিলালকে মানুষের জন্য মীকাত (সময় নিরূপণের মাধ্যম) বানিয়েছেন। সুতরাং তোমরা হিলাল দেখে রোযা রাখ এবং হিলাল দেখে রোযা ছাড়। যদি হিলাল দেখা না যায় তাহলে (চলতি মাসের) ত্রিশ দিন গণনা কর! Ñমুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক বিন হাম্মাম (১২৬-২১১ হি.), খ. ৪, পৃ. ১৫৬, হাদীস ৭৩০৬; আসসুনানুল কুবরা বাইহাকী, খ. ৪, পৃ. ২০৫; আলমুসতাদরাক, হাকেম আবু আব্দুল্লাহ, খ. ১, পৃ. ৪২২, হাদীস ১৫৭৯; আস সহীহ, ইমাম ইবনে খুযাইমা (২২২-৩১১হি.) খ. ৩, পৃ. ২০১, হাদীস ১৯০৬)

উক্ত হাদীসে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে, হিলাল দেখে রমযান মাস শুরু হবে। পরবর্তী হিলাল দেখে রমযান মাস শেষ হবে। এই জন্য হিলাল দেখে রোযা শুরু করতে হবে। হিলাল দেখে রোযা শেষ করতে হবে। যদি হিলাল দেখা না যায় তাহলে চলতি মাস ত্রিশ দিন গণনা করতে হবে। এই হল, হাদীসের মর্ম। তো এখানে কোথায় আছে যে, বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের এক হিলাল এবং প্রথম হিলাল দেখে একই দিনে রোযা শুরু করতে হবে। একই দিনে ঈদ করতে হবে? আবার বলা হচ্ছে, ‘তা শুধু সওয়াবের কাজ তাই নয়, বরং এটা করা ফরয। অন্যথায় ফরয রোযা ছেড়ে দেওয়ার কবীরা গুনাহ এবং ঈদের দিনে রোযা রাখার গুনাহ তাদের উপর আসবে। এতসব কথা উক্ত হাদীসের কোন্ শব্দ আর কোন্ বাক্য থেকে বের হল? আসলে তা নব উদ্ভাবিত বিষয়কে হাদীসের উপর চাপিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কী?[4]

তারা বলেনصوموا لرؤيته-এর মধ্যে صوموا (তোমরা রোযা রাখ) হচ্ছে আদেশসূচক সম্বোধন এবং বহুবচনের শব্দ। এতে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমগ্র বিশ্বের মুসলমানদেরকে সম্বোধন করে হুকুম করেছেন যে, তারা যেন হিলাল দেখে রোযা রাখে! এই কথা শত ভাগ সঠিক, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এই জন্যই সমগ্র বিশ্বের সকল মুসলমানদের উপর রোযা ফরয। কোনো অঞ্চলের মুসলমানরাই এই হুকুমের বাইরে নয়। সবার উপরই রোযা ফরয। আর হিলাল দেখার পরই রোযা ফরয । কারও জন্য এটা জায়েয নেই যে, হিলাল দেখা ছাড়া শুধু হিলালের সম্ভাবনার ভিত্তিতে মাস শুরু করবে এবং এটা জায়েয নেই যে, হিলাল দেখা বাদ দিয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাবের ভিত্তিতে মাস শুরু করবে। রোযা সব অঞ্চলের সব মুসলমানের উপর ফরয। আর হিলাল দেখার পরই রোযা ফরয, এর আগে নয়।

এ হল হাদীসের সরল অর্থ। এখানে এ কথা কোত্থেকে এল যে, বিশ্বব্যাপী সমস্ত মুসলমানকে একই হিলাল এবং প্রথম হিলালের অথবা বিশেষ কোনো অঞ্চলের হিলালের ভিত্তিতে একই তারিখে রোযা শুরু ফরয? বহুবচনের শব্দ দিয়ে সবাইকে রোযা রাখতে বলা হয়েছে। সেখান থেকে এটা কীভাবে সাব্যস্ত হল যে, সবার রোযার সূচনা একই তারিখে হওয়া জরুরি। আচ্ছা أقيموا الصلاة (তোমরা নামায আদায় কর) এ কথার অর্থ কি এই যে, সবাই একই সময়ে নামায আদায় কর? অথবা آتوا الزكاة (তোমরা যাকাত আদায় কর) এর অর্থ কি এই যে, সবাই একই তারিখে যাকাত আদায় কর? أقيمواآتوا শব্দদ্বয় সম্বোধনসূচক বহুবচন। উভয় শব্দের সম্বোধনই ব্যাপক। বিশ্বের সকলকে সম্বোধন করা হচ্ছে। কিন্তু এখানে কি এ অর্থ হতে পারে যে, সবাই একই সময়ে নামায আদায় কর, সবাই একই তারিখে যাকাত আদায় কর? ওখানে যদি এ অর্থ হয় যে, সবাই নিজ নিজ সময়ে নামায আদায় কর এবং সবাই নিজ নিজ নেসাবের বছর পূর্ণ হলে যাকাত আদায় কর, তাহলে صوموا لرؤيته -এর ক্ষেত্রে কেন এই অর্থ হবে না যে, সকল মানুষ নিজ নিজ অঞ্চলের হিলাল দেখে রোযা শুরু করবে।

সুতরাং এ কথা বলা যে, ‘صومواবলে সব অঞ্চলের সমস্ত মুসলমানকে সম্বোধন করা হয়েছে। আর সে জন্য বিশ্বব্যাপী এক হিলাল এবং প্রথম হিলাল দেখার ভিত্তিতে সমস্ত মুসলমানের উপর রোযা শুরু করা ফরযÑ সম্পূর্ণ ভুল। সম্বোধন সবাইকে করা হয়েছে এ কথা তো ঠিক আছে, কিন্তু শুধু হিলাল দেখাএতটুকু বিধানের সাথে তারা যে এক হিলাল দেখা এবং প্রথম হিলাল দেখা অথবা সৌদিআরবের হিলাল দেখার কথা বলছেন তা তো হাদীসে নেই। এসব তো তাঁদের সংযোজন। শরীয়তের কোনো দলীলের আলোকে তাঁরা হাদীসের মর্মের মধ্যে এসব কথা যুক্ত করছেন? জানা কথা যে, এসব তাঁদের নিজেদের থেকে সংযোজন। এসব না কোনো আয়াতে আছে, না কোনো হাদীসে!

হিলাল দেখার সাক্ষ্যের হাদীসসমূহ থেকে কি এ কথা প্রমাণিত হয় যে, বিশ্বব্যাপী একই দিনে রোযা ও ঈদ করা ফরয?

তারা এটাও দাবি করেন যে, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্য এলাকা থেকে আগত হিলালের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে রোযা ও ঈদ করেছেন। তাহলে বুঝা গেল, যে কোনো এলাকাতে হিলাল দেখা গেলে সব এলাকায় রোযা ও ঈদ করা উচিত।

 

পর্যালোচনা : হিলাল দেখার সাক্ষ্য কবুল করার হাদীসসমূহের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে চিন্তা করা উচিত। শাবানের ২৯ তারিখ, রমযানের ২৯ তারিখ, অথবা যিলকদের ২৯ তারিখ এসব তারিখে কখনো কি এমন হয়েছে যে, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিলাল দেখার জন্য অথবা হিলালের সংবাদ বা সাক্ষ্য সংগ্রহ করার জন্য এক দিন দূরত্ব নয়; পাঁচ-দশ মাইল দূরত্বের কোনো এলাকায়ও কোনো লোক পাঠিয়েছেন? হাদীস, সীরাত ও ইতিহাসের গ্রন্থাবলীতে এর একটিও কি দৃষ্টান্ত আছে? উত্তর না-বাচক ছাড়া আর কী? খুব ভালো করে চিন্তা করা দরকার, এক হল সাক্ষ্য এসে গেলে সাক্ষ্য কবুল করা, আরেক হল সাক্ষ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা করা, দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। একই হিলাল এবং প্রথম হিলালের ভিত্তিতে রোযা ও ঈদ করা যদি কুরআন ও হাদীসের নির্দেশ হয়ে থাকে তাহলে অন্যান্য অঞ্চল থেকে নতুন চাঁদের সংবাদ এবং সাক্ষ্য সংগ্রহ করাও তো ফরয হবে। কিন্তু নবী-যুগে এর উপর আমল হল না কেনএসে যাওয়া সাক্ষ্য গ্রহণেই কেন ক্ষ্যান্ত থাকা হল?

সুতরাং মদীনা মুনাওয়ারার আশেপাশেও কাউকে না পাঠানো এবং মদীনায় হিলাল দেখা গেলেই রোযা শুরু করা /ঈদ করা এবং মদীনায় হিলাল দেখা না গেলে রোযা শুরু না করা এবং শাওয়ালের হিলাল দেখা না গেলে ত্রিশ রোযা পূর্ণ করা, এগুলোই তো দলীল যে, নিজ নিজ এলাকার হিলাল দেখার ভিত্তিতে আমল করলেই মানুষ দায়িত্বমুক্ত হয়ে যায়।

ভূমিকাস্বরূপ এই প্রয়োজনীয় কথাগুলো মনে রেখে এবার চাঁদ দেখার সাক্ষ্যের হাদীসগুলো নিয়ে চিন্তা করুনÑ

ক. এক হাদীসে আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযিআল্লাহু আনহুর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে রোযা রাখার ঘটনা এসেছে। স্পষ্টই যে, এখানে খোদ মদীনার অধিবাসীদেরই এক ব্যক্তির সাক্ষ্য অনুযায়ী রোযা রাখা হয়েছে।

খ. আরেক হাদীসে এসেছে যে, এক বেদুঈন হাররা থেকে এসে রমযানের চাঁদ দেখার সাক্ষ্য দিয়েছে এবং সেই সাক্ষ্য গ্রহণ করে নেওয়া হয়েছে। হাররা আজকাল তো মদীনা মুনাওয়ারারই অংশ। মাসজিদে নববী থেকে হাররা মাত্র ৪-৫ কিলোমিটার দূরত্বে।

গ. আরেক হাদীসে দুই বেদুঈনের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে ঈদ করার ঘটনা এসেছে। এতে একথার উল্লেখ নেই যে, এই দুই বেদুঈন কোথা হতে এসেছে। কিন্তু বেদুঈনদের বসতি মদীনার আশপাশেই ছিল। এবং এরা সকাল সকাল এসে সাক্ষ্য দিয়েছিল। এটাও তো তাহলে মদীনা থেকে একেবারে কাছের এলাকারই সাক্ষ্য হল।

ঘ. মুসনাদে আহমদ এবং সুনানে ইবনে মাজাহ-এ একটি ঘটনা এমনও বর্ণিত হয়েছে যে, একবার ঊনত্রিশে রমযান সন্ধ্যায় হিলাল দেখা গেল না, তাই সবাই ত্রিশ রমযানের রোযা রাখলেন। দিনের শেষে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এক কাফেলা এল। তারা সাক্ষ্য দিল যে, গতকাল সন্ধ্যায় তারা হিলাল দেখেছে, নবী  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোযা ভেঙ্গে ফেলার এবং পরের দিন ঈদের নামাযের জন্য ঈদগাহে যাওয়ার আদেশ করলেন। (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২০৫৮৪; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১৬৫৩)

তো এই কাফেলা কতই বা দূর থেকে আসবে যে, ২৯ শে রমযান সন্ধ্যায় হিলাল দেখে পরের দিন (আসরের সময়ই ধরুন) মদীনায় পৌঁছে যাবে? সেদিন হিলাল দেখার পর থেকে তারা যদি বিরামহীন লাগাতার উটের পিঠে সফর করে থাকে, তাহলে বেশির চেয়ে বেশি পঁচিশ মাইল, আরো বাড়ালে ত্রিশ মাইল দূর থেকেই হয়তো এসে সাক্ষ্য দিয়েছেন।

হাদীসের কিতাবসমূহে একটু দূরবর্তী এলাকা থেকে আগত সাক্ষ্য গ্রহণ করার এই একটি ঘটনাই আছে যাকে মূলত দূর বলা যায় না। ফিকহের ভাষায় এটা বিলাদে মুতাকারিবার সংজ্ঞায় পড়ে। অপরদিকে সহীহ মুসলিমে এবং সহীহ ইবনে খুযায়মাসহ হাদীসের অন্যান্য অনেক কিতাবে সহীহ সনদে কুরাইব রাহমাতুল্লাহি আলাইহির বর্ণনাকৃত প্রসিদ্ধ হাদীসটি আছে। এই হাদীসে এসেছে যে, দামেস্কে, যা তখন দারুল খিলাফাহ ছিল, সেখানে স্বয়ং আমীরুল মুমিনীনের সিদ্ধান্ত মোতাবেক একদিন আগে রমযান শুরু হওয়ার সংবাদ আসলেও হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযিআল্লাহু আনহু সেদিকে দৃষ্টিপাত করেননি। তিনি বলেছেন, আমরা তো শনিবার সন্ধ্যায় হিলাল দেখেছি। এইজন্য আমরা ত্রিশ রোযা পূর্ণ করব। তবে নিজেরা যদি হিলাল দেখি সেটা ভিন্ন কথা। তাকে জিজ্ঞাসা করা হল, মুআবিয়া রাযিআল্লাহু আনহুর হিলাল দেখা এবং রোযা রাখা কি আপনি যথেষ্ট মনে করেন না? তিনি বললেন, না, আমাদেরকে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবেই আদেশ করেছেন।

এই হাদীস থেকে জানা গেল, অনেক দূর-দূরান্তের এলাকা থেকে হিলাল দেখার সংবাদ আসলে সেটা ভিন্ন মাসআলা। হিলাল দেখার সাক্ষ্য গ্রহণ করার প্রসঙ্গে এক হাদীসের বর্ণনাকারী স্বয়ং আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযিআল্লাহু আনহু। এরপরও তিনি এ কথা বলছেন, তাহলে বুঝা গেল ভিন্ন এলাকার হিলালের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে রোযা ও ঈদ করা বিষয়ে দূর ও নিকটের পার্থক্য আছে।[5]

দূর ও নিকটের পার্থক্য যদিও কতিপয় ফকীহ গ্রাহ্য করেননি, কিন্তু কোনো ফকীহ, মুজতাহিদ এই ফতোয়া দেননি যে, দূর-দূরান্তের অঞ্চল থেকে হিলাল দেখার সাক্ষ্য সংগ্রহ করে সব এলাকার জন্য সেই হিলালের বিধান বাস্তবায়ন করা জরুরি। হিলাল দেখার সাক্ষ্য গ্রহণের সমস্ত হাদীসের মর্ম ও আবেদনও এ কথার সমর্থন করে না। কেননা এসব হাদীসের প্রেক্ষাপট হল, মদীনা মুনাওয়ারা থেকে হিলাল দেখার জন্য অথবা হিলাল দেখার সাক্ষ্য সংগ্রহ করার জন্য কোনো প্রতিনিধি দলকে এদিক সেদিক পাঠানো হয়নি। যদি রোযা ও ঈদের তারিখের ক্ষেত্রে ঐক্য সৃষ্টি করা জরুরি হত তাহলে অবশ্যই এটা করা হত।

 

ঐ যামানায় কি প্রচার-ব্যবস্থা ও যোগাযোগ-ব্যবস্থা বিলকুল ছিল না?

এর জবাবে এই কথা যেন না বলা হয় যে, ঐ যামানায় তো যোগাযোগের উন্নত ব্যবস্থা ছিল না। এই সীমাবদ্ধতার কারণে বাধ্য হয়ে তারা নিজ নিজ এলাকার  হিলাল দেখার ভিত্তিতে রোযা ও ঈদ করত। নয়তো তাদেরও জানা ছিল যে, কুরআন-হাদীসে এক হিলাল এবং প্রথম হিলালের ভিত্তিতে সমগ্র বিশ্বে একই দিনে রোযা ও ঈদ করা এবং একই সাথে অন্যান্য চান্দ্রমাস  শুরু করার হুকুম দেওয়া হয়েছে!

এ কথা এ জন্য যথাযথ হবে না যে, প্রচারব্যবস্থা ইসলামের শুরুর যুগ থেকে সব যুগে কমবেশি ছিল। প্রত্যেক যুগেই তার পূর্ববর্তী যুগ থেকে উন্নত থেকে উন্নততর ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। প্রশ্ন হল, প্রত্যেক যুগের দায়িত্বশীল ও আলিমগণ এবং  পীর ও মাশায়েখ কি নিজ নিজ সময়ের প্রচারব্যবস্থাকে সম্ভাব্য পর্যায় পর্যন্ত এই কাজে লাগিয়েছেন? উত্তর যদি না-বাচক হয়ে থাকে তাহলে চিন্তা করুনÑ আপনাদের দৃষ্টিতে তো এটা কুরআন-হাদীসের বিধান। আর ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হকের কথা মতে এটা কুরআন-হাদীসের সুস্পষ্ট বিধান, তাহলে এই গুরুত্বপূর্ণ বিধান সম্পর্কে ইলমে দ্বীনের ধারক-বাহকগণ, যারা নবীগণের ওয়ারিস তারা কীভাবে অবহেলা-উদাসীনতা প্রদর্শন করতে পারেন?

ঐ যামানায় প্রচলিত প্রচারমাধ্যম এবং যোগাযোগমাধ্যমগুলোর মধ্যে আমরা শুধু নিন্মোক্ত বিষয়গুলোর আলোচনা করতে চাই :

১. দূত পাঠানো

২. হাতে হাতে চিঠি পাঠানো

এখানে এই আপত্তির সুযোগ নেই যে, ২৯ শে শাবান সন্ধ্যায় হিলাল দেখে পরের দিন সকালে রোযা রাখার  সংবাদ এবং ২৯ শে রমযান সন্ধ্যায় হিলাল দেখে পরের দিন ঈদ করার সংবাদ দূত মাধ্যমে বা হাতে হাতে চিঠির মাধ্যমে কত দূর আর পৌঁছানো সম্ভব?

চতুর্র্দিকে দশ মাইল পর্যন্তও যদি পৌঁছানো যায় তবু সেটা কম কীসে? এইটুকু অঞ্চলের বাসিন্দারা অন্তত প্রথম হিলাল দেখার ভিত্তিতে আমল করা থেকে মাহরূম থাকতো না। এরপরে বিষয় তো শুধু হিলাল দেখার সংবাদ রাতের মধ্যেই পৌঁছানো পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। যদি পহেলা শাওয়াল আছর পর্যন্তও সংবাদ পৌঁছে যায়, তবুও তো সবাই ঈদের দিন রোযা রাখার গুনাহ থেকে বেঁচে যেত। আর পরের দিন ঈদের নামায পড়ে নিত। এমনিভাবে দূর-দূরান্তে ২৭ শে রমযান পর্যন্তও যদি খবর  পৌঁছে যায় তাহলে তো সবাই সঠিক ২৯ তারিখ নির্ধারণ করতে পারবে। একটি রোযা কাযা করতে হবে, তা জানতে পারবে। পঁচিশ রমযানে খবর পৌঁছলে তো সঠিক ২৭-এর রাতও নির্ধারণ করতে পারবে। আর ঈদুল আযহা, কুরবানী, তাকবীরে তাশরীক ও শবে বরাত এসব তারিখের ক্ষেত্রে তো দূত এবং চিঠির ব্যবস্থা শত শত মাইল পর্যন্ত কাজে আসতে পারতো।

৩. ডাকযোগে পাঠানো

ডাকের ব্যবস্থা হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযিআল্লাহু আনহুর যামানায়ও ছিল। পরবর্তীতে এই ব্যবস্থা অনেক উন্নতি করেছে। খেলাফতে বনু উমাইয়া এবং খেলাফতে আব্বাসিয়ার সময়ে তো এই ব্যবস্থা অনেক অনেক উন্নতি করেছে। আরবে ঘোড়ার ডাকঅনেক প্রাচীন। ডাকপিয়ন সাধারণ মুসাফিরদের মত সফর করতো না যে, দিনে চলত আর রাতে বিশ্রাম নিত। বরং ডাকপিয়নের রাতদিন লাগাতার সফর করতে হত। কয়েক মাইল পর পর তাজাদম ঘোড়া প্রস্তুত থাকত। যেন ঘোড়া ক্লান্ত হয়ে যাওয়ার কারণে ডাক পৌঁছতে বিলম্ব না হয়ে যায়। এভাবে অনেক দীর্ঘ পথও ডাকপিয়ন সংক্ষিপ্ত সময়ে অতিক্রম করে ফেলতো। ডাকের কথা সহীহ বুখারীতেও এসেছে। কুফার ডাকঘরে আবু মূসা আশআরী রাহ.-এর নামায আদায় করার বিবরণ সহীহ বুখারীতে (ফাতহুল বারীর নুসখা, খ. ১, পৃ. ৪০০, কিতাবুল উযু, অধ্যায় ৬৬ أبواب الإبل و الدواب و الغنم و مرابضها) এসেছে। আবু মূসা আশআরী রাযিআল্লাহু আনহু খেলাফতে রাশেদার দ্বিতীয় এবং তৃতীয় যুগে কুফার গভর্নর ছিলেন। (ফাতহুল বারী, খ. ১, পৃ. ৪০১)

আরবে ডাকব্যবস্থা প্রাচীনকালে কত উন্নত ছিল সে বিষয়ের আলোচনা الطائر الغريد في وصف البريد নামক কিতাবে দেখা যেতে পারে। নুমান আফেন্দীর ডাকের ইতিহাসের উপর লিখিত এই চমৎকার ও অনবদ্য গ্রন্থটি মিসরের  المقتطف প্রেস থেকে ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে ছেপে প্রকাশিত হয়েছে। উক্ত গ্রন্থে আগের কালে প্রচলিত আকাশ-ডাকের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রকার পায়রার ডাকসহ অন্যান্য প্রকারের বিষয়েও আলোচনা আছে। আরো দেখুন আততারাতীবুল ইদারিয়্যা’, আব্দুল হাই কাত্তানী রাহ. (খ. ১ পৃ. ১৯১-১৯৪)

এরপর যখন চীন পারস্য এবং সিন্ধু ও হিন্দুস্তানসহ অন্যান্য অগ্রসর দেশসমূহও ইসলামের বিজিত অঞ্চলের অধীনে এসে গেছে তখন তো সেখানকার যোগাযোগ মাধ্যমও মুসলিম উম্মাহর ব্যবহারে চলে এসেছে।

দুটি নমুনা

ঐতিহাসিক তাকীউদ্দীন মাকরিযী রাহ. (৮৪৫হি.)-এর আলমাওয়ায়েজ ওয়াল ইতিবার’  খ. ১, পৃ. ৩২২) কিতাবে ইতিহাসের সেই সোনালি  অধ্যায়টিরও উল্লেখ আছে যে, ২৬১ হিজরীতে আফ্রিকায় যে সময় ইবরাহীম বিন মুহাম্মদ বিন আলআগলাবের শাসন প্রতিষ্ঠিত হল তখন তিনি সমুদ্রতীরে ধারাবাহিকভাবে কয়েক মাইল পর পর দূর্গ ও চৌকি স্থাপন করেন। তার কালে পথ ছিল সম্পূর্ণ নিরাপদ। ঐ সময় দূর্গে দূর্গে আগুন প্রজ্বলিত করার মাধ্যমে সাবতা থেকে ইস্কান্দরিয়া পর্যন্ত এক রাতেই সংবাদ পৌঁছে যেত। অথচ সাবতা আর ইস্কান্দারিয়ার মাঝে চার হাজার দুইশ ঊনআশি কিলোমিটারের দূরত্ব। বর্তমানে বাসেই ঊনসত্তর ঘণ্টার পথ।

এমনিভাবে ইস্কান্দরিয়া থেকে তারাবলুসে রাতে কয়েক ঘণ্টায় খবর পৌঁছে যেত। উভয় শহরের মাঝে দূরত্ব মোট আঠার শত বিরাশী কিলোমিটার। এটা হল মুরাবিতীনের শাসন আমলের ঘটনা। দেখুন আবু মুহাম্মদ আবদুল ওয়াহিদ বিন আলী আততামীমী আলমারাকেশী (৫৮১-৬৪৭)-এর কিতাব আলমুজিব ফি তালখীসী আখবারিল মাগারিব’, পৃ. ২৫০

প্রশ্ন হল, আমাদের পূর্বসূরীদের যুগে, বিশেষত সোনালী তিন যুগে চাঁদ দেখার সাক্ষ্য এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় আদান-প্রদানের জন্য কোনো মাধ্যম কি ব্যবহার করা হয়েছিল? উত্তর যদি না-বাচক হয়ে থাকে তাহলে এর কারণ কী? দ্বীনের বিষয়ে তারা শিথিলতা করতেন বলে কেউ যদি অপবাদ দেয়, সে তো নিজেই নিজের ঈমান বরবাদ করবে, আখেরাত নষ্ট করবে। তাহলে এটা মেনে নেওয়া ছাড়া কি কোনো উপায় আছে যে, আসলে ইসলাম যেহেতু মানব-স্বভাবের অনুকূল ধর্ম, এতে সবক্ষেত্রে সব যুগের এবং সব এলাকার মানুষের সহজতার দিক লক্ষ্য করা হয়েছে। তাই ইসলামী শরীয়তে এই হুকুম দেওয়াই হয়নি যে, হোক না হোক বিশ্বব্যাপী সমস্ত মানুষ যেন তাদের চান্দ্রমাস একই দিনে শুরু করে! একই দিনে রোযা ও ঈদ করে!  সেই জন্যই তো ইসলামের সাড়ে চৌদ্দশত বছরের সুদীর্ঘ ইতিহাসে এর একটাও নযীর পাওয়া যায় না। এর নযীর তো পাওয়া যায়ই না, যা পাওয়া যায় তা হল, খেলাফতে রাশেদার যুগে খেলাফতের অধীন সমস্ত এলাকায় এটা লিখে পাঠানো হয়েছে যে, তোমরা হিলাল দেখে রোযা রাখ। হিলাল দেখেই রোযা শেষ কর। এই প্রসঙ্গে হযরত উমর রাযিআল্লাহু আনহু  সেনাবাহিনীর সেনাপ্রধানদের নিকট যে পত্র লিখতেন তা খতীব বাগদাদী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির উদ্ধৃতিতে ইমাম নববী রাহমাতুল্লাহি শরহুল মুহাযযাবকিতাবে উল্লেখ করেছেন। (খ. ৭ পৃ. ৬৪৯-৬৫০) আরেকটি ফরমান মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাতেও আছে। এই প্রসঙ্গে শাবানের শেষে সালাফের খুতবা ও বক্তৃতা দেখা যেতে পারে। কেউ মদীনায় বলছেন صوموا لرؤيته, কেউ দামেশকে বলছেন صوموا لرؤيتهপ্রতিটি খুতবাতে একই কথা যে, صوموا لرؤيته وأفطروا لرؤيته তোমরা হিলাল দেখে রোযা রাখ। হিলাল দেখে রোযা ছাড়। এসবের নিশ্চিত ও অবশ্যম্ভাবী অর্থ কি এই নয় যে, তারা এবং তাদের শ্রোতারা এই হাদীস থেকে নিজ নিজ এলাকার হিলাল দেখার অর্থই বুঝেছেন!

 

নব উদ্ভাবিত এই প্রস্তাব সামনে আসার পর আলিমগণ কী বলেছেন?

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগ থেকে চলে আসা এখনও পর্যন্ত বহাল ও বলবৎ এই সুন্নতে মুতাওয়ারাসার বিপরীতে যখন কতিপয় যুক্তিবাদী লোকের পক্ষ থেকে তথাকথিত ঐক্যের  আওয়াজ উঠল তখন আহলে হক আলিমগণ যথাসময়ে এর প্রতিবাদ করেছেন এবং তাদের উত্থাপিত যুক্তিসমূহের বাস্তবতা উন্মোচন করে দিয়েছেন।

 

১. ইবনে আব্দুর রাযযাক রাহ.

هل يمكن اتحاد الشمال الأفريقي مواسم وأعيادا

(গোটা উত্তর আফ্রিকায় একই দিনে ঈদ করা কি সম্ভব?) এবং

هل يمكن توحيد الأعياد الدينية في الأقطار الإسلامية

(গোটা মুসলিম বিশ্বে দ্বীনী পর্বসমূহের তারিখের ক্ষেত্রে ঐক্য সৃষ্টি করা কি সম্ভব?) প্রথম শিরোনামে যখন আলমাগরিব পত্রিকায় ৫ম সংখ্যা ১০ মুহাররম ১৩৬৩ হি. মোতাবেক ৭ জানুয়ারি ১৯৪৪ ঈ.-এ এবং দ্বিতীয় শিরোনামে আলইলম পত্রিকায় ৫২তম সংখ্যা ১৫ই যিলহজ্ব ১৩৫৫ হি. মোতাবেক ১০ নভেম্বর ১৯৪৬ ঈ. দুটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হল তখন এর বিস্তারিত খণ্ডন লিখেছেন মরক্কোর বিশিষ্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানী আলেম আল্লামা মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব ইবনে আব্দুর রাযযাক (১৯০৬-২০১১ঈ.)। যা তার কিতাব العذب الزلال في مباحث رؤية الهلال -এ যুক্ত আছে। (পৃষ্ঠা : ১৭৪-২০৭) এই কিতাব কাতারের ধর্মমন্ত্রণালয় থেকে বড় বড় দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। পৃষ্ঠা সংখ্যা : ৮৩৪, রচনাকাল : মুহাররম ১৩৬৭ হি. মুতাবেক ডিসেম্বর ১৯৪৭ঈ.

العذب الزلال  -এর উপর অনেক বড় বড় মণীষী আলিমগণের অভিমত আছে। যা কিতাবের শেষে ছাপা হয়েছে।

 

২. শায়খ আব্দুল্লাহ বিন হুমাইদ, হারামুল মাক্কীর সাবেক ইমাম

শায়খ আব্দুল্লাহ বিন হুমাইদ রাহ.-ও এ মতবাদকে তার কিতাব >تبيان الأدلة في إثبات الأهلة< -এ প্রমাণিক খ-ন করেছেন। শায়েখের এ কিতাবের উর্দূ তরজমা আলফুরকানপত্রিকায় Ñযা মাসলাকে দেওবন্দের মূখপত্রÑ প্রকাশিত হয়েছে। এমনিভাবে উলামায়ে আহলে হাদীসও পাকিস্তানে এ কিতাবের উর্দূ তরজমা প্রকাশ করেছেন।

 

৩. রাবেতার ফিকহ একাডেমী

পরে যখন কিছু লোকের পক্ষ থেকে   আবার একই তাকাযা পেশ করা হয়, তখন রাবেতাতুল আলামিল ইসলামীর অঙ্গ প্রতিষ্ঠান আলমাজমাউল ফিকহিল ইসলামী (ফিকহ একাডেমী, মক্কা মুকাররমা) এর খ-ন করে এই সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেছে :

لا حاجة إلى توحيد الأهلة والأعياد في العالم الإسلامي، لأن توحيدها لا يكفل وحدتهم، كما يتوهمه كثير من المقترحين لتوحيد الأهلة والأعياد. وأن تترك قضية إثبات الهلال إلى دور الإفتاء والقضاة في الدول الإسلامية، لأن ذلك أولى وأجدر بالمصلحة الإسلامية العامة، وأن الذي يكفل توحيد الأمة وجمع كلمتها، هو اتفاقهم على العمل بكتاب الله وسنة رسول الله صلى الله عليه وسلم في جميع شؤونهم.

মুসলিম জাহানে হিলাল ও ঈদ এক করার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ তা মুসলিমদের ঐক্য নিশ্চিত করবে না যেমনটা হিলাল ও ঈদ এক করার অনেক প্রস্তাবকের ধারণা। হিলাল প্রমাণ হওয়ার বিষয়টি ইসলামী দেশগুলোর কাযা ও ফতোয়া বিভাগগুলোর উপর ছেড়ে দেওয়াই সমীচীন। কারণ এটিই ইসলামের সাধারণ কল্যাণ বিবেচনায় অধিকতর উত্তম ও উপযোগী।

আর যে বিষয়টি উম্মাহর ঐক্য নিশ্চিত করবে তা হচ্ছে, সকল বিষয়ে আল্লাহর কিতাব ও আল্লাহর রাসূলের সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করার বিষয়ে সবাই ঐক্যবদ্ধ হওয়া।’’ (কারারাতুল মাজমাইল ফিকহিল ইসলামী, মক্কা মুকাররমা, পৃষ্ঠা : ৮৭-৮৯)

রাবেতায়ে আলমে ইসলামীর আলমাজমাউল ফিকহী’-এর ঐ অধিবেশনে, যাতে উপরোক্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, পুরো বিশ্বের এবং সকল মাযহাবের বড় বড় ব্যক্তিত্ব উপস্থিত ছিলেন। সিদ্ধান্তে  স্বাক্ষরকারীদের নাম আমরা আলকাউসার শাওয়াল ১৪৩৪ হি. (আগস্ট ২০১৩ঈ.) সংখ্যায় পড়েছি।

 

৪. শায়খ মুহাম্মাদ বিন ইবরাহীম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি

শায়খ মুহাম্মাদ বিন ইবরাহীম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি (১৩১১-১৩৮৯ হি.) যিনি শায়খ বিন বায রাহমাতুল্লাহি আলাইহির আগে সৌদিআরবের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। রবিউল আউয়াল ১৩৭৭ হিজরীতে জামিয়াতুদ দুয়ালিল আরাবিয়্যার পক্ষ থেকে তার সামনে তাওহীদুল আহিল্লার’ (হিলাল এক করা) বিষয়ে সেমিনারের প্রস্তাব পেশ করা হয়, তখন তিনি এতে সম্মত হননি।

তাঁর উত্তরের সারকথা হল, এটি এমন কোনো বিষয় নয়, যার জন্য সেমিনার ডাকা কাম্য। এটা তো একটা শাখাগত মাসআলা। صوموا لرؤيته وأفطروا لرؤيته শীর্ষক হাদীসের মধ্যেই এর ফায়সালা আছে। এই হাদীসের বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে যে মতপার্থক্য হয়েছে (এক অঞ্চলের হিলাল দেখা অন্য অঞ্চলের জন্য অবশ্যগ্রহণীয় কি না) সেটা অন্যান্য শাখাগত মতপার্থক্যের মতই। এই মতপার্থক্যে কোনো ক্ষতি নেই।

আসল কথা তো হল, গোটা উম্মত তাওহীদে উলূহিয়্যাত এবং তাওহীদে রুবূবিয়্যাতের উপর ঐক্যবদ্ধ হওয়া। পরস্পর বিবাদ-বিসম্বাদের ক্ষেত্রে কুরআন ও সুন্নাহকে একমাত্র সিদ্ধান্তদানকারী হিসেবে গ্রহণে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। মজলিস তো এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য হওয়া উচিত।

সুতরাং রোযা ও ঈদের হিলালের বিষয়ে (তাওহীদুল আহিল্লাহর প্রস্তাব) উক্ত মজলিসের সাথে একমত নই। আমার দৃষ্টিতে এ জন্য মজলিসের প্রয়োজন  নেই, মুসলিম উম্মাহ সুদীর্ঘ চৌদ্দ শতাব্দী অতিবাহিত করল, রোযা ও ঈদের মধ্যে তারিখের পার্থক্য ছিল, কিন্তু তারা একে ক্ষতিকর মনে করেননি। আর না তারা এর জন্য সেমিনার আহ্বান করার প্রয়োজন বোধ করেছেন! (ফতোয়া ওয়া রাসাইলি সামাহাতিশ শায়খ মুহাম্মাদ বিন ইবরাহীম আলুশ শায়খ, খ. ৪, পৃ. ১৫৫-১৫৮, ফতোয়া নাম্বার : ১০৯৬)

এই বিষয়ে রাবেতাতুল আলামিল ইসলামীর ফিকহ একাডেমীর বিবৃতি একটু আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। সৌদি আরবের হাইয়াতু কিবারিল উলামার সুপারিশ আমরা আলকাউসার শাওয়াল ১৪৩৪ হি. (আগস্ট ২০১৩ঈ.) সংখ্যায় পড়েছি।

 

৫. হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ শফী রাহ.

হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ শফী রাহ. এই বিষয়ে যে সারৎসার ও অনবদ্য প্রবন্ধ রচনা করেছেন তা তাঁর পুস্তিকা রুইয়াতে হিলালের পৃষ্ঠা : ১১-১২, ৩২-৩৭ -এ বিদ্যমান আছে। যার বাংলা অনুবাদও প্রকাশিত হয়েছে।

 

৬. হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ ইউসূফ বিন্নুরী রাহ.

হযরত রাহ.-এর তিরমিযীর শরাহ মাআরেফুস সুনানদেখা যেতে পারে। তিনি সেখানে তাওহীদুল আহিল্লার মতকে শরীয়তের মেযাজের খেলাফ বলেছেন।

 

৭. মাওলানা আব্দুল মাজিদ দরিয়াবাদী রাহ.

মাওলানা আব্দুল মাজিদ দরিয়াবাদী রাহ. মাওলানা ছাড়াও তিনি ছিলেন একজন পণ্ডিত ও চিন্তাবিদ ব্যক্তিত্ব। যে বন্ধুরা সবসময় বুদ্ধির কথা বলেন, তাদের তো তাঁর কথার প্রতি মান্যতা থাকা চাই। বিশ্বব্যাপী নয়, শুধু ভারতব্যাপী একই তারিখে রোযা ও ঈদের জবরদস্তি করার উপর তিনি কী রকম সমালোচনা করেছেন তা তার তাফসীরে মাজেদী খ. ১, পৃ. ৩৩৮-৩৪০ আয়াত (২ :) ১৮৫ এ দেখা যেতে পারে। এই কিতাবের উর্দূ ও ইংরেজী উভয় সংস্করণই হাতের নাগালে পাওয়া যায়। ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে এর বাংলা অনুবাদও প্রকাশিত হয়েছে।

 

৮. মাওলানা আব্দুর রহমান কীলানী রাহ.

আহলে হাদীস ঘরানার বড় আলেম, মাওলানা আব্দুর রহমান কীলানী রাহ. (১৯২৩-১৯৯৫ঈ.) তার কিতাব الشمس والقمر بحسبان (اسلام كا نظام فلكيات)  -এর পঞ্চম অধ্যায়ে (উদয়স্থলের বিভিন্নতা এবং ইসলামী পর্ব-উৎসবে ঐক্যের প্রচেষ্টা) শিরোনামে তিনি সে বিষয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। পরিশেষে তিনি লেখেনÑ

‘...হযরত উমর রাযিআল্লাহু আনহুর মত চিন্তাশীল ও বিচক্ষণ ব্যক্তিত্ব, যিনি জনসাধারণের সহজতার জন্য অসংখ্য  নীতি ও ব্যবস্থার উদ্ভাবক বলে স্বীকৃত। তিনি মদীনা মুনাওয়ারা থেকে হাজার হাজার মাইল বিস্তৃত সা¤্রাজ্য সুন্দর ও সঠিকভাবে শাসন করেছেন। তিনি যদি ভালো মনে করতেন তাহলে কি মুসলমানদের এই ঐক্যের জন্য ব্যবস্থা না নিয়ে পারতেন? তিনি তো কথায় কথায় মজলিসে শূরা ডেকে তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত জারী করতেন কিন্তু কখনোই ঈদ বা রমযানের ঐক্যের মাসআলা তাঁর আলোচনায় আসেনি! ঐ স্বর্ণযুগে যদি এর কোনো নযীর না পাওয়া যায়, তাহলে এখন অনেক বছর পরে এসে এ বিষয়ে কেন এত চাপাচাপি?

ইসলামের দুই ঈদ, ইবাদত এবং শোকরের নামায আদায়। ইসলামে ঈদ উৎসব পালনের জন্য নয়। তাই ঈদের ক্ষেত্রে ঈদের নামায (ফিতরা ও কুরবানী) ছাড়া আর কোনো বিধান ইসলামে দেওয়া হয়নি।

মুসলিম  ঐক্যের জন্য ইসলাম যে বিষয়গুলোর তাকীদ করেছে সেগুলোর মধ্যে হল, দলীয় সাম্প্রদায়িকতা থেকে বেঁচে থাকা। ফরয নামায জামাতের সাথে আদায় করা, যাকাত-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, হজ্বের সম্মিলন ইত্যাদিসহ আরো বিষয়। এসব বিষয়ে তো মুসলমানদের কোনো মনোযোগ নেই। শুধু অন্যান্য ধর্মের দেখাদেখি ধর্মীয় আবেগের সর্বোচ্চ সীমা কেবল উৎসব উদযাপনÑ ঈদ ও অন্যান্য পর্বের তারিখ এক করার আওয়াজ তোলা। বস্তুত ধর্মের সাথে সম্পর্কহীনতার প্রকাশ যে, মানুষ জরুরি বিষয়গুলোর দিকে নযর দেয় না। নিজের সমস্ত শক্তি অপ্রয়োজনীয় ও অহেতুক কাজে ব্যয় করে। (ইসলাম কা নেযামে ফালাকিয়্যাতমাওলানা আব্দুর রহমান কীলানী, মাকতাবাতুস সালাম, লাহোর, পৃষ্ঠা: ৭৯)

 

৯. হাফেজ সালাহুদ্দীন ইউসুফ

আহলে হাদীস ঘরানার আরেকজন বরেণ্য ব্যক্তিত্ব হাফেজ সালাহুদ্দীন ইউসুফ তাঁর কিতাব مسألۂ رؤیت ہلال اور بارہ اسلامی مہینے  -এর মধ্যে বিশদ আলোচনা শেষে সারসংক্ষেপে লেখেনÑমুসলিম বিশ্বে একই দিনে ঈদ পালন করা, রমযান ও অন্যান্য মাস একই দিনে সূচনার যে মতবাদ, তা শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও দলীলবিহীন। সৌদিআরবের হিলাল দেখাকেও এক্ষেত্রে ভিত্তি বানানো যাবে না।’ (পৃষ্ঠা: ১৫৩, দারুস সালাম ইন্টারন্যাশনাল)

 

১০. পীর করম শাহ আজহারী

তিনি তার তাফসীরগ্রন্থ যিয়াউল কুরআন’  খ. ১ পৃ. ১২৫-এ লেখেনÑ

কারণ, উদয়স্থলের ভিন্নতা একটি স্বীকৃত বিষয়। এ কারণে ফকীহগণ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, যদি দূর-দূরান্তের অঞ্চলে চাঁদ দেখা যায় তাহলে তা ধর্তব্য হবে না।

إن البلاد إذا تباعدت كتباعد الشام من الحجاز، فالواجب على أهل كل بلد أن تعمل على رؤيته دون رؤية غيره. (قرطبي)  

(প্রকাশক যিয়াউল কুরআন পাবলিকেশন্স, গঞ্জ বখশ রোড লাহোর, মুদ্রণকাল: ১৯৯৫ ঈ.)

 

১১. ড. ইউসূফ আলকারযাভী

আল্লামা ড. ইউসুফ কারযাভী রাহ. প্রথমে যা কিছুই লিখে থাকুন সম্প্রতি ২০১৬ ঈ. ইস্তাম্বুলে হিজরী ক্যালেন্ডারের উপর যে সেমিনার অনুষ্ঠিত হয় তাতে তিনি পরিষ্কার বলেছেন যে, কুরআন-হাদীসে কোথাও নেই যে, গোটা দুনিয়ায় একই দিনে রোযা ও ঈদ করতে হবে।

সেমিনারের পর সাক্ষাৎকারে আরো বলেছেন, মুসলিম উম্মাহর মধ্যকার স্থানগত ও সময়গত এত দূরত্ব থাকা অবস্থায় চাঁদসমূহ এক করার চিন্তা সম্পূর্ণ অর্থহীন। দেখুন:

http://www.huffpostarabi.com/2016/05/30/story_n_10203036.html

মোটকথা, বিশ্বব্যাপী একই দিনে রোযা ও ঈদ করার মতবাদ একটি নতুন বিষয়। চার মাযহাবেরই অধিকাংশ আলেম এবং এই উপমহাদেশের দেওবন্দী, বেরলভী ও আহলে হাদীস, সকল ঘরানার অধিকাংশ আলেম একে এক অপ্রয়োজনীয় বরং ভিত্তিহীন প্রচেষ্টা গণ্য করেছেন। আর এ প্রয়াসকে বিশেষ কোনো সওয়াবের কাজ মনে করা হলে তা বিদআত হওয়ার বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। দ্বীনের ইলম এবং শরীয়তের রুচি-প্রকৃতি সম্পর্কে বেখবর থাকার কারণে যারা একে ফরয বা ওয়াজিব বলতে চান, তারা তো বুঝে অথবা না বুঝে শরীয়তের বিকৃতিতে লিপ্ত।

প্রকাশ থাকে যে, যারা একই দিনে রোযা ও ঈদকে ফরয বা ওয়াজিব বলার প্রবক্তা, মাজমাউল ফিকহিল ইসলামীর (জিদ্দা ফিকহ একাডেমী) সুপারিশে তাদের এই মতের পক্ষে কোনো দলীল নেই।

 

জ্যোতির্বিদগণ কী বলেন?

তাদের উলামায়ে কেরাম সম্পর্কে আপত্তি হল, ‘আলিমরা বিজ্ঞান জানে না, জ্যোতির্বিজ্ঞান বুঝে না। এজন্যই মুসলিম জাতি আজ অধঃপতনের শিকার। আলিমরা জ্যোতির্বিজ্ঞান না জানার কারণেই রোযা ও ঈদের ঐক্যের বিরোধী’! কিন্তু তাদের এই আপত্তির বাস্তবতা আজও আমাদের বুঝে আসে না! ধরে নিন, একজন মৌলবী সাহেবও জ্যোতির্বিজ্ঞান জানে না, কিন্তু আমাদের ইঞ্জিনিয়ার সাহেবরা তো জানেন। (যদিও আফসোসের কথা হল, একবিংশ শতাব্দীতে এসেও আমাদের দেশে এস্ট্রোনমির গবেষণার কাজ ইঞ্জিনিয়ারদেরকেই করতে হচ্ছে। দেশে আমাদের জানা মতে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েই এস্ট্রোনমি বিভাগ নেই।) কিন্তু এরা জ্যোতির্বিজ্ঞান জানা সত্ত্বেও কেন বলেন যে,

১. চান্দ্রমাস হয়তো ঊনত্রিশ দিন হবে, নয়তো ত্রিশ দিনঅথচ জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুসারে চান্দ্রমাসের সময়ের মধ্যে ভাংতি আছে।

২. কেন তারা বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী একই দিনে রোযা ও ঈদ করা উচিত’, অথচ জ্যোতির্বিজ্ঞান বলে বিশ্বের সব জায়গায় একই দিনে নতুন চাঁদ দেখা অসম্ভব। এ জন্যই জ্যোতির্বিজ্ঞান উদয়স্থলের বিভিন্নতা স্বীকার করে। কারণ এটা একটা বাস্তবতা।

৩. কেন তারা বলেন, ‘চাঁদ দৃষ্টিগোচর হওয়ার সম্ভাব্যতার পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে লুনার ক্যালেন্ডার প্রস্তুত করে সেই মোতাবেক রোযা ও ঈদ করা উচিত। অথচ জ্যোতির্বিজ্ঞান এস্ট্রোনমিক্যাল নিউমুন থেকে চান্দ্রমাস হিসাব করে। এদিকে ইসলামের শিক্ষা হল, চান্দ্রমাস হিলাল দৃষ্টিগোচর হওয়ার সম্ভাব্য সময় থেকে নয়, দেখার মাধ্যমে শুরু হবে। এই জন্য হিলাল দৃষ্টিগোচর হওয়ার সম্ভাব্যতার পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে প্রস্তুতকৃত লুনার ক্যালেন্ডার মোতাবেক আমল করলে না ইসলামী শরীয়তের শিক্ষা মোতাবেক আমল হবে, না জ্যোতির্বিজ্ঞানের পদ্ধতি অনুসারে আমল হবে।

মেহেরবানী করে একটু বলুন দেখি, শরীয়ত তো চান্দ্রমাসের হিসাবকে চাঁদ দেখার সাথে সম্পৃক্ত করেছে। এক্ষেত্রে শরীয়তের নিকট জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাবের কোনো ইতিবার নেই। তাহলে বাস্তবেই যদি আলিমগণ জ্যোতির্বিজ্ঞান না জানেন, এতে এমন কী অন্যায় হয়ে গেল যে, এর কারণে তাঁরা হিলালের সাথে সম্পৃক্ত শরীয়তের বিধান বুঝবেন না?!

যাই হোক এখন আমরা বলতে চাচ্ছি, তারা তো জ্যোতির্বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে আলিমগণের সাথে মতানৈক্যে লিপ্ত হচ্ছেন। অথচ আমরা দেখি যে, হিলাল দেখার মাসআলায়ও এবং একই তারিখে রোযা ও ঈদ করার ইস্যুতেও বড় বড় জ্যোতির্বিজ্ঞানী আলিমগণের সাথেই আছেন।

দ্বীনী বিষয় বিশেষত রোযা, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আযহা, হজ্ব ও কুরবানী ইত্যাদির ক্ষেত্রে হিলাল দেখার ভিত্তিতেই চান্দ্রমাসের হিসাব হবে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাবের ভিত্তিতে নয়।

এখানে আমরা শুধু দরসে নেযামীর পাঠ্যভুক্ত একটি কিতাবের পাঠ উল্লেখ করছি। দরসে নেযামীআমাদের উপমহাদেশের সমস্ত মাদরাসার নেসাবের ভিত্তি। কিতাবটির নাম হল শরহে চিগমিনী। এটি মূসা পাশা বিন মুহাম্মাদ (৮৯৯হি.)-এর রচনা। যা মাহমূদ বিন উমর চিগমিনী রাহ. (৬১৮হি.)-এর কিতাব আলমুলাখ্খাসেরব্যাখ্যাগ্রন্থ। এতে আছেÑ

وأوضح الأوضاع هوالهلال، لكن رؤية الهلال تختلف باختلاف المساكن، كما أشرنا إليه، فلم يلتفت إليها عند أهل الحساب إلا في الأمور الشرعية امتثالا لأمر الشرع.

চাঁদের কলাসমূহের সবচেয়ে সুস্পষ্ট কলা হল, হিলাল। কিন্তু স্থানভেদে হিলাল দেখা ভিন্ন ভিন্ন হয়। এজন্য জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা হিলালের দিকে দৃষ্টিপাত করেননি। কিন্তু দ্বীনী বিষয়াদিতে শরীয়তের হুকুম তামিল করার জন্য হিলালকে গ্রহণ করেছেন। (শরহু চিগমিনী, পৃষ্ঠা: ১২৭, মাকতাবায়ে আশরাফিয়া দেওবন্দ থেকে ১৩৮৭ হি.-এ মুদ্রিত)

তো বুঝা গেল, জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা নিজস্ব শাস্ত্রীয় পরিম-লে যদিও এস্ট্রোনমিক্যাল নিউমুন থেকে চাঁদের হিসাব শুরু করেন কিন্তু দ্বীনী বিষয়ে যেহেতু শরীয়তের হুকুম মান্য করতে হবে আর শরীয়ত যেহেতু দ্বীনী বিষয়ে হিলাল দেখার উপর ভিত্তি রেখেছে সেহেতু তারা দ্বীনী বিষয়ের ক্ষেত্রে হিলাল দেখারই অনুসরণ করে। নিজস্ব শাস্ত্রের মর্যাদা ও ব্যবহারের ক্ষেত্র শাস্ত্রজ্ঞরা বেশি বুঝেন নাকি ভিন্ন শাস্ত্রের লোকেরা?

এখন বলছিলাম যে, ‘আলিমরা জ্যোতির্বিজ্ঞান বুঝে নাÑ একে বাহানা বানিয়ে তারা বিশ্বব্যাপী একই তারিখে রোযা ও ঈদ করার প্রচারণা চালাচ্ছেন, তাদের তো খবর নিয়ে দেখা উচিত যে, এই বিষয়ে স্বয়ং জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের বক্তব্য কী? আমরা এখানে আগের ও পরের এবং বর্তমান সময়ের দুচারজন জ্যোতির্বিজ্ঞানীর উদ্ধৃতি পেশ করছি :

 

১. আলবেরুনী (৪৪০হি.=১০৪৮ঈ.)

আলবেরুনী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি হিসাব-নির্ভর লুনার ক্যালেন্ডারের ভিত্তিতে রোযা ও ঈদ পালনকারী বাতিল ফিরকা বাতেনী শীয়াদের খ-ন করতে গিয়ে যে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন তার সামান্য একটি অংশ এইÑ

فإذن لا يمكن ما ذكروه من تمام شهر رمضان أبدا ووقوع أوله وآخره في جميع المعمور من الأرض متفقا كما يخرجه الجدول الذي يستعملونه.

অর্থ : এটা সম্ভব নয় যে, রমযান মাস সবসময় ত্রিশ দিনেই হবে এবং এটাও সম্ভব নয় যে, মাসের শুরু ও শেষ সমগ্র বিশ্বে একই তারিখে হবে। যেমনটা তাদের ক্যালেন্ডারে দেওয়া থাকে। আলআসারুল বাকিয়া আনিল কুরূনিল খালিয়া, পৃষ্ঠা : ৬৬

 

২. ইবনে রুশদ (৫২০-৫৯৫ হি.)

তিনি একইসাথে জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও দার্শনিক ছিলেন এবং অনেক বড় ফকীহও ছিলেন। তিনি ইলমুল ফিকহ বিষয়ে তাঁর কিতাব বিদায়াতুল মুজতাহিদ (খ. ১, পৃ. ৩৫৮)-এ লিখেছেন, দূর-দূরান্তের অঞ্চলের ক্ষেত্রে এক এলাকার হিলাল দেখা অন্য এলাকার জন্য ইতেবার করা হবে না। তার আরবী বক্তব্য এইÑ

>وأجمعوا أنه لا يراعى ذلك في البلدان النائية كالأندلس والحجاز<.

তিনি আরো লিখেছেনÑদূরবর্তী ও নিকটবর্তী অঞ্চলসমূহের এক অঞ্চলের হিলাল দেখা অন্য অঞ্চলের জন্য ধর্তব্য হওয়া না হওয়ার পার্থক্য করা আকলেরও দাবি।

তার আরবী পাঠ হলÑ

والنظر يعطي الفرق بين البلاد النائية والقريبة، وبخاصة ما كان نأيه في الطول والعرض كثيرا.

৩. ডক্টর হুসাইন কামালুদ্দীন (১৩৩২ হি.=১৯১৩ ইংÑ১৪০৭ হি.=১৯৮৭ ঈ.)

প্রকৌশল ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে তার অবদান অনেক। মিশর ও সৌদিআরবের বড় বড় ইউনিভার্সিটিতে তিনি এ বিষয়ে অধ্যাপনা করেছেন। তিনি دورتا الشمس  والقمر وتعيين أوائل الشهور العربية باستعمال الحساب নামে তার বিখ্যাত গ্রন্থ রচনা করেছেন। লক্ষণীয় বিষয় হল, তিনি তার এই কিতাবে (পৃষ্ঠা: ২৮-এ) প্রথমে জ্যোতির্বিজ্ঞানের আলোকে হিলালের উদয়স্থলের বিভিন্নতার বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। এরপর তিনি লিখেছেন

>وهكذا بنى الشارع على اختلاف المطالع كثيرا من الأحكام ومن أظهرها مواقيت الصلاة، ولا يجوز توحيد الصوم والأعياد لجميع أهل الأرض<.

শরীয়ত উদয়স্থলের বিভিন্নতাকে অনেক আহকামের ভিত্তি বানিয়েছে। তন্মধ্যে সুস্পষ্ট আহকাম হল নামাযের সময়। আর সারা পৃথিবীতে রোযা ও ঈদের ঐক্য জায়েয নয়।

 

৪. মূসা রূহানী (১৪১৯হি.= ১৯৯৮ঈ.)

শায়খুল হাদীস ও শায়খুত তাফসীর হওয়ার সাথে সাথে প্রাচীন ও আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের বড় পারদর্শী ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব। জ্যোতির্বিজ্ঞানের উপর চল্লিশের কাছাকাছি ছোট-বড় কিতাব রচনা করেছেন। তিনি তার সায়রুল কামার ওয়া ঈদুল ফিতরকিতাবে নিজ নিজ এলাকার হিলাল দেখার বিধানকেই সমর্থন করেছেন আর পরিষ্কার লিখে দিয়েছেন যে, শরীয়তের বিধানের ভিত্তি শরয়ী দলীল, বিজ্ঞানের গবেষণা নয়। তিনি এটাও সুস্পষ্ট করে বলেছেন যে, সৌদিআরবের ঈদ থেকে উপমহাদেশের ঈদ পরে হওয়াতে আশ্চর্যের কিছু নেই। শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকেও নয়, জ্যোতির্বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকেও নয়।

 

৫. ডক্টর ইউসুফ মুরওয়া

Jackson university of Mississippi থেকে নিউকিøয়ার ফিজিক্সে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করা ছাড়াও বৃটেন, জার্মানি ও আমেরিকার বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে নিউকিøয়ার ফিজিক্সসহ সাইন্সের আরো কিছু বিষয়ে উচ্চ ডিগ্রি অর্জনকারী এবং বিজ্ঞানের জগতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশেষ কৃতিত্বের অধিকারী প্রতিষ্ঠানالجمعية اللبنانية للأبحاث العلمية -এর প্রতিষ্ঠাতা প্রধান ড. ইউসুফ মুরওয়া একই দিনে রোযা ও ঈদের মতবাদের পর্যালোচনা ঐ সময়ের আকাবির ওলামা মাশায়েখের খেদমতে পেশ করেছেন। তাতে তিনি লিখেছেনÑ

যেহেতু মুসলিম বিশ্ব মাশাআল্লাহ বেশ বড় সীমানা জুড়ে বিস্তৃত। ইন্দোনেশিয়া থেকে পশ্চিম আফ্রিকা পর্যন্ত, ১৪২ ডিগ্রি পূর্ব থেকে ১৮ ডিগ্রি পশ্চিম পর্যন্ত বিস্তৃত। তাই ভৌগোলিকভাবে ইসলামী বিশ্বকে তিনটি জোনে ভাগ করা চাই।

১. ৩০ ডিগ্রি পূর্ব থেকে ২০ ডিগ্রি পশ্চিম পর্যন্ত যেসব রাষ্ট্র রয়েছে যথা লিবিয়া তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া, মরক্কো, মৌরতানিয়া, মালী, চাঁদ, নাইজেরিয়া, ক্যামেরুন, বেনীন, ঘানা ইত্যাদি।

২. ৩০ ডিগ্রি পূর্ব এবং ৮০ ডিগ্রি পূর্বের মধ্যবর্তী রাষ্ট্রগুলো। যথা মিশর, সুদান, সোমালিয়া, সৌদিআরব, ইয়েমেন, জর্দান, লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, কুয়েত  ইরান, তুরস্ক পশ্চিম আফগানিস্তান, পাকিস্তান...।

৩. ৮০ ডিগ্রি পূর্ব এবং ১৪০ ডিগ্রি পূর্বের মধ্যবর্তী অঞ্চলসমূহ। যথা বাংলাদেশ, বার্মা, থাইল্যান্ড, চীন মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া।

তিনি লিখেছেন, এই হল তিনটি জোন। এবার কোনো এক জোনে নতুন চাঁদ দর্শনযোগ্য হওয়ার অর্থ এই নয় যে, অবশ্যই অবশ্যই অন্য দুই জোনেও তা দর্শনযোগ্য হয়েছে।

তার এই লেখা মাজাল্লাতু মাজমায়িল ফিকহিল ইসলামী, সংখ্যা : ২, খ- : ২, পৃষ্ঠা : ৮৮৭-৮৯০-এ প্রকাশিত হয়েছে। আলোচনাটি তার কিতাব আলউলূমুত তাবয়িয়্যাহ ফীল কুরআনেও যুক্ত আছে। (পৃ. ১১-১২)

৬. জামালুদ্দীন আব্দুর রাযযাক

 الجمعية المغربية لعلم الفلك-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার জামালুদ্দীন আব্দুর রাযযাকের কিতাব التقويم القمري الإسلامي الموحد (একক ইসলামী চান্দ্র ক্যালেন্ডার) ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে মরক্কোর রাবাত থেকে প্রকাশিত হয়েছে। তাতে তিনি পরিষ্কার লিখেছেনÑ

لا سبيل إلى التوحيد إذا اعتمدنا رؤية الهلال، حتى مع إقرار الموقف الثالث.

لا سبيل إلى التوحيد إذا اشترطنا أن ساعة الدخول في الشهر، في بلد ما، تأتي بعد إثبات إمكان الرؤية، في مكان ما من العالم، حتى مع إقرار الحساب وإقرار الموقف الثالث. هذه النقطة من الأهمية بمكان<.

যদি হিলাল দেখাকেই ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করা হয়, তাহলে (রোযা ও ঈদের তারিখের ক্ষেত্রে) ঐক্য সম্ভব নয়। এমনকি যদি এক্ষেত্রে উদয়স্থলের বিভিন্নতা ধর্তব্য না হওয়ার মতটিকেই অগ্রগণ্য ধরা হয় তবুও সম্ভব নয়; বরং কোনো শহরে মাস শুরু হওয়ার জন্য যদি এই শর্ত যুক্ত করা হয় যে, পুরো বিশ্বের কোথাও না কোথাও হিলাল দৃষ্টিগোচর হওয়ার সম্ভাব্যতা সৃষ্টি হতে হবে। (অন্যথায় মাস শুরু করা যাবে না) তাহলেও ঐক্য সম্ভব নয়। এক্ষেত্রেও জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাবকে ভিত্তি বা উদয়স্থলের ভিন্নতা ধর্তব্য না হওয়ার মতকে গ্রহণ করা হলেও ঐক্য সম্ভব নয়।’ (আততাকবীমুল কামারিল ইসলামিয়্যিল মুওয়াহহিদ’, জামালুদ্দীন আব্দুর রাযযাক, পৃ. ৫)

এই সুস্পষ্ট বাস্তবতা স্বীকার করে নিয়েও তিনি একক ইসলামিক হিজরী ক্যালেন্ডারের নমুনা পেশ করেছেন। কিন্তু জানা কথা যে, শরীয়তের মানসূস আলাইহি এবং মুজমা আলাইহি বিধান হিলাল দেখার বিধান বাদ দিয়ে এটা গ্রহণ করবে তার বক্তব্য উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হল, স্বয়ং বড় বড় জ্যোতির্বিজ্ঞানীরাই শরীয়ত নির্ধারিত ভিত্তি (হিলাল দেখা) বহাল রেখে এবং উদয়স্থলের বিভিন্নতা ধর্তব্য নয় মত গ্রহণ করেও বিশ্বব্যাপী ঐক্য অসম্ভব বলেছেন।

 

৭. ডক্টর মুহাম্মাদ শওকত ঊদাহ

International Astronomical Center ICOP -এর প্রধান, জর্দান আলজামইয়্যাতুল ফালাকিয়্যার হিলাল পর্যবেক্ষণ কমিটির প্রধান, আলইত্তিহাদুল আরাবী লিউলূমিল ফিযায়ি ওয়াল ফালাক’-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, ডক্টর মুহাম্মাদ শওকত ঊদাহ প্রথমে পুরো পৃথিবীকে দুই ভাগে ভাগ করে প্রত্যেক ভাগের জন্য আলাদা আলাদা লুনার ক্যালেন্ডার তৈরী করেছেন। এটা ২০০১ সনের কথা। পরে তিনি পুরো পৃথিবীকে তিন ভাগে ভাগ করে একেক অংশের জন্য আলাদা আলাদা ক্যালেন্ডার তৈরী করেন। পরবর্তীতে তিনি আরো চিন্তা গবেষণার পর চূড়ান্তভাবে আরেকটি লুনার ক্যালেন্ডার তৈরী করেছেন। তাতে পুরো পৃথিবীকে দুই ভাগে ভাগ করে প্রত্যেক অংশের জন্য একটি করে ক্যালেন্ডার তৈরী করেন। এক অংশে উত্তর আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকা। দ্বিতীয় অংশে অন্য সব মহাদেশ। তিনি পরিষ্কার লিখেছেন, হিলাল দৃষ্টিগোচর হওয়ার সম্ভাব্যতার উপর ভিত্তি করে যদি লুনার ক্যালেন্ডার প্রস্তুত করা হয়, তাহলে সমগ্র বিশ্বের জন্য একটি লুনার ক্যালেন্ডার অনুযায়ী আমল করা কখনোই সম্ভব হবে না। বিশ্বকে অন্তত দুই ভাগে ভাগ করা জরুরি, তিনি দালীলিক আলোচনা করে তার সিদ্ধান্ত এই ভাষায় পেশ করেছেনÑ

>ومن هنا برزت الحاجة الضرورية لتقسيم العالم إلى قسمين على الأقل<. (تطبيقات تكنولوجيا المعلومات لإعداد تقويم هجري عالمي، دكتور محمد شوكت عودة، ص ৭-৮)

উভয় ক্যালেন্ডারে কোনো মাসে তারিখ অভিন্ন আবার কোনো মাসে ভিন্ন। যাই হোক, শওকত ঊদাহ এই ক্যালেন্ডার কোনো মাসআলা হিসেবে পেশ করেননি। তিনি শুধু একটি প্রস্তাব উলামায়ে কেরামের কাছে রেখেছেন।

তার কাছে আমরা একই দিনে রোযা ও ঈদের প্রসঙ্গে জানতে চেয়েছিলাম যে, কিছু লোক এই মতবাদের দাওয়াত দিচ্ছে, এ বিষয়ে আপনারা কী মনে করেন, তিনি উত্তরে লিখেছেনÑ

>مسألة هل يصوم الناس معا أو لا يصوموا معا فهي مسألة فقهية يجيب عليها الفقهاء وليس نحن الفلكيون، بالنسبة لنا فنحن مجرد حاسبون، نطوع حساباتنا لما يطلبه ويقره الفقهاء<.

সমস্ত মানুষ একই তারিখে রোযা রাখবে, না আলাদা আলাদা রাখবে এটা তো ফিকহী মাসআলা। এর জওয়াব তো উলামায়ে কেরাম দেবেন। আমরা তো হিসাব জানি, ব্যস, ফকীহগণ যেভাবে বলবেন, আমরা সেভাবেই হিসাবের খেদমত পেশ করে দেব।এটা তিনি আমাদেরকে ১৫ ই অক্টোবর, ২০১৪ ঈ.-এর চিঠিতে লেখেন।

১৩ই মে ২০১৩ ঈ.-এর পত্রে তিনি এটাও লিখেছেনÑ

>من الناحية العملية والعلمية لا يمكن توحيد جميع البلاد الإسلامية بناء على رؤية الهلال، فلا يمكن الطلب من سكان أندونسيا وماليزيا والدول الشرقية الانتظار لمعرفة نتيجة تحري الهلال في موريتانيا، ففي هذه الحالة ستشرق الشمس في أندونسيا والناس لا تعرف بعد هل هذا اليوم هو عيد أم لا مثلاً!

فغاية ما يمكن فعله هو توحيد الدول الإسلامية بناء على تقويم هجري مبني على الحسابات الفلكية، أما التوحيد المبني على الرؤية الفعلية فهذا وهم، ولا يمكن تحقيقه<.

বাস্তবতার আলোকে এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে কোনোভাবেই হিলাল দেখার ভিত্তিতে মুসলিম বিশ্বব্যাপী তারিখ এক করা সম্ভব নয়। এটা কীভাবে হতে পারে যে, আমরা ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও অন্যান্য প্রাচ্যের দেশগুলোর উপর বিধান চাপিয়ে দেব যে, তারা যেন মৌরতানিয়ার চাঁদ দৃষ্টিগোচর হওয়ার সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করে। এমন করতে গেলে তো ইন্দোনেশিয়ায় সূর্যোদয় হয়ে যাবে তখনও তারা জানতে পারবে না যে, আজ ঈদ হবে না, রোযাই রাখতে হবে।

হাঁ, সর্বোচ্চ যা হতে পারে তা হল, জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাবের ভিত্তিতে প্রণীত একটি হিজরী ক্যালেন্ডারের মাধ্যমে কেবল মুসলিম বিশ্বে ঐক্য সৃষ্টি করা যেতে পারে। কিন্তু হিলাল দেখার ভিত্তিতে ঐক্য বাস্তবে অসম্ভব। এটা নিছক কল্পনা। একে বাস্তবের রূপ দেওয়া সম্ভব নয়।

তো শরীয়ত যখন হিলাল দেখাকেই ভিত্তি বানিয়েছে, আর পৃথিবীর প্রাকৃতিক অবস্থাই এরকম যে, হিলাল দেখার ভিত্তিতে অন্তত ইসলামী বিশ্বেও একই দিনে রোযা ও ঈদ সম্ভব নয়। হাঁ, জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাবকে ভিত্তি বানালে শুধু বর্তমান মুসলিম বিশ্বে একই দিনে রোযা ও ঈদ করার কথা ভাবা যায়। কিন্তু সমগ্র বিশ্বে একই দিনে রোযা ও ঈদ করা কখনো সম্ভব নয়। তাহলে কোনো মুসলমান এমন আছে যে, শরয়ী ভিত্তি বাদ দিয়ে একই তারিখে রোযা ও ঈদ করতে যাবে? আল্লাহ প্রদত্ত শরীয়ত অনুসরণ উদ্দেশ্য নাকি দিলের খাহেশ পুরা করা?

ডক্টর মুহাম্মদ শওকত ঊদাহ এই বিষয়টি তার প্রবন্ধ আলহিলাল বাইনাল হিসাবাতিল ফালাকিয়্যাতি ওয়ার রুইয়াতিতেও লিখেছেন। তিনি বলেছেন কোনো স্থানের হিলাল দেখা গোটা মুসলিম বিশ্বের জন্য ধর্তব্য হবে কি না এর ফায়সালা উলামায়ে কেরাম করবেন, জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ নয়।

তিনি আরো লিখেন, হিজরী মাসের সূচনা কীভাবে হবে এটা শরীয়তের মাসআলা। এর ফায়সালা করবেন ফকীহগণ। জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ নয়। আর জানা কথা যে, এই বিষয়ে ফকীহগণের ইজমা আছে যে, এই বিষয়ে চাঁদ দেখাই ভিত্তি। অন্য কিছু নয়। দেখুন, তার প্রবন্ধ আলহিলাল বাইনাল হিসাবাতিল ফালাকিয়্যাতি ওয়ার রুইয়াতি’, পৃ. ৭, ১১ ও ১৩

মুহাম্মদ শওকত ঊদাহ একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী, কোনো ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার নন। তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানী, তাই তিনি ভালোভাবেই বুঝতে পারছেন যে, কোন্ মাসআলা শরীয়তের সাথে সম্পৃক্ত আর কোনটা জ্যোতির্বিজ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত। একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানীর এই বাস্তবতার বিষয়ে সুস্পষ্ট জবানবন্দীর পর আপনি ঐ ভাইদের কথার হাকীকত বুঝতে পারবেন, যারা বলে বলে ক্লান্ত হয়ে যান যে, আলিমরা জ্যোতির্বিজ্ঞান জানে না। তাই তারা লুনার ক্যালেন্ডারের বিরোধিতা করেন। এই জন্যই তারা একই দিনে বিশ্বব্যাপী রোযা ও ঈদ করার বিপক্ষে। নাউযুবিল্লাহিল আযীম।

এ সকল ভাইয়ের খেদমতে আমরা বর্তমান সময়ের বিশিষ্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানী প্রফেসর ড. ইলিয়াসের একটি কথা পেশ করতে পারি যা তিনি Washington Islamic centre কর্তৃক প্রকাশিত লিফলেটের উপরে মন্তব্য করে বলেছেন। লিফলেটের বক্তব্য ছিলÑ  

".... Many good Muslim leaders call for the unification of Muslim dates on the basis of astronomical findings, especially now that science has advanced so much as to put man on the face of the moon. "

এর উপর মন্তব্য করে ড. ইলিয়াস বলেন,

"... Statements of this nature are common in private discussions that take place every year especially at the time of Ramadan. also the mass media, especially newspapers, are full of such comments, mostly from those lacking any appropriate background in astronomy and /or in the Islamic aspects  concerned...." (Astronomy of Islamic Calendar, by: Mohammad Ilyas, page- 60, Published by: A.S. NOORDEEN, Kuala Lumpur, Malaysia, First Published in 1997)

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এ বাস্তবতা উপলব্ধি করার তাওফিক দান করুন এবং সকল প্রকার প্রান্তিকতা থেকে মুক্ত রাখুনÑ আমীন।

وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين.

 



[1] জানি না এ সীমানা নির্ধারণের সূত্র কী? অমুসলিম দেশগুলো তো আল্লাহর জমীনেরই অংশ। এগুলোর উপর তাদের দখলদারিত্ব পুরোটাই জোরপূবর্ক। এগুলোকে কেন বাদ দেওয়া হচ্ছে? তাছাড়া মরক্কোকে কেন মুসলিমদেশগুলোর শেষ সীমানা ধরা হল মৌরতানিয়াও তো মুসলিম দেশ। (আবদুল মালেক)

[2] হানাফী মাযহাবে রমযানের রোযার জন্য সুবহে সাদিকের আগেই নিয়ত করে নেওয়া মুস্তাহাব। আর অন্যান্য মাযহাবে তো এটা রোযা সহীহ হওয়ার জন্য শর্ত। সাহরী করা সুন্নত। রমযানের তারাবী প্রথম রাত্রেও সুন্নাতে মুআক্কাদা। অথচ একই দিনে রোযার এই উদ্ভাবিত পদ্ধতির কারণে এসব আমল হ-য-ব-র-ল হয়ে যায়।

[3] ৩. ১৫ই জ্বিলহজ্ব ১৩৬৫ হি. মোতাবেক ১০ নভেম্বর ১৯৪৬ খৃ., ‘আলইলমপত্রিকার ৫২তম সংখ্যায় এই শিরোনামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করা হয়-هل يمكن توحيد الأعياد الدينية في الأقطار الإسلامية (মুসলিম বিশ্বে দ্বীনী পর্বসমূহের তারিখের ক্ষেত্রে ঐক্য সৃষ্টি করা সম্ভব?)। তখন শায়খ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব ইবনে আব্দুর রাযযাক (১৯০৬-২০১১ঈ.) যিনি জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং দ্বীনী ইলম, উভয় শাস্ত্রে পাণ্ডিত্যের অধিকারী। তিনি তার কিতাব العذب الزلال في مباحث رؤية الهلال (খ. ১, পৃ. ১৮৯-২০৭)-এ উক্ত প্রবন্ধের বিস্তারিত খ-ন লিখেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, যুগ যুগ ধরে অনুসৃত কর্মপন্থাই সঠিক। এ থেকে সরে আসার কোনো অর্থই হয় না।

আমাদের জানা নেই, ১৯৪৬ -এর আগেও  কেউ এই ধরনের দাবি করেছেন কি না, কিন্তু আফসোস হলসময় যতই যাচ্ছে আবেগ-প্রবণ লোকদের বাড়াবাড়ি বেড়ে চলেছে। প্রথমে বলা হয়েছিল, শুধু মুসলিম বিশ্বে একই তারিখে রোযা ও ঈদ কর। এখন বলা হচ্ছে, সমগ্র বিশ্বেই একই তারিখে কর! আসলে এটাও অসম্ভব ওটাও অসম্ভব!

[4] বিশ্বব্যাপী একই দিনে রোযা ও ঈদ করার থিওরিকে এই হাদীসের উদ্দিষ্ট অর্থ বলে সাব্যস্ত করা হাদীসের সুস্পষ্ট বিকৃতি। উদয়স্থলের বিভিন্নতা ধর্তব্য না হওয়ার বিষয়ে এই হাদীস দিয়ে দলীল পেশ করা  যেমন কয়েকজন ফকীহ করেছেন- সেটা একটা সম্ভাবনাপূর্ণ বিষয়। হাদীসের পূর্বাপরের সাথে তা পুরোপুরি মিলে না। এটা হাদীসের স্বাভাবিক মর্মের বাইরের একটি বিষয়। এটাকে হাদীসের সরাসরি উদ্দিষ্ট মর্ম সাব্যস্ত করা আপত্তিজনক। সৌদিআরবের সাবেক সর্বোচ্চ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব শায়েখ মুহাম্মাদ বিন ইবরাহীমও এই হাদীস থেকে উক্ত বিষয়ে দলীল প্রদানের উত্তর দিয়েছেন। দেখুন, ফাতাওয়া ওয়া রাসায়িলি সামাহাতিশ শায়েখ মুহাম্মাদ বিন ইবরাহীম, খ. ৪, পৃ. ১৫৫, ফতোয়া : ১০৯৫।

[5] কুরাইব রাহমাতুল্লাহি আলাইহির বর্ণিত হাদীসটি নিঃসন্দেহে সহীহ। মুহাদ্দিসগণ একে সহীহ বলেছেন এবং এর মাধ্যমে দলীল পেশ করেছেন এবং বড় বড় ফকীহগণও এই হাদীস দিয়ে দলীল দিয়েছেন। এর উপর মাসআলার ভিত্তি রেখেছেন।