গবেষণামূলক উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মারকাযুদ্ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা-এর মুখপত্র

মাসিক আলকাউসার

মে-জুন ২০১৭, মে-জুন ২০১৭

‘দ্বীনের উপর চলা এবং আল্লাহর বিধান মানা বর্তমান সময়েও সম্ভব’

[বিগত ১৫-০৬-১৪৩৮ হি. মোতাবেক ১৫-০৩-২০১৭ঈ. তারিখে মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা-এর নবনির্মিত দাওয়াহ ভবনে অনুষ্ঠিত হয় এসএসসি পরীক্ষা সমাপণকারী ছাত্রদের নিয়ে দিনব্যাপী একটি দ্বীন-শিক্ষা মজলিস। ঐ মজলিসে দ্বীনের মৌলিক বিষয়াদি আলোচনার পাশাপাশি কুরআনে-কারীমের মশক ও নামাযের মশকেরও আয়োজন ছিল। আরও ছিল প্রশ্নোত্তর পর্ব, যে পর্বে অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা-এর সম্মানিত মুদীর, কিসমুদ দাওয়াহ-এর মুশরিফ হযরত মাওলানা মুফতী আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ছাহেব দা. বা.। আলকাউসারের পাঠকদেরকেও ঐ দাওয়াতী মজলিসে শামিল করে নেয়ার সদিচ্ছা থেকে ঐ মজলিসের দুটো মূল্যবান বয়ান এই সংখ্যায় প্রকাশিত হল। আল্লাহ তাআলা আমাদের যথাযথ উপকৃত হওয়ার তাওফীক দান করুন- আমীন।]

 

তোমাদের কী মনে হয়, আমরা ও তোমরা এক না দুই? এক। হাঁ, আমরা এক; আমরা কোনো ভিন্ন গোষ্ঠী বা আলাদা সম্প্রদায় নই। আমাদের সবার পরিচয়- আমরা আল্লাহর বান্দা ও মাখলুক। আমাকে যিনি সৃষ্টি করেছেন, আপনাকেও তিনি সৃষ্টি করেছেন। আমাদের আদি পিতা, যার মাধ্যমে দুনিয়াতে মানুষের আসা-যাওয়া শুরু হয়েছে, কে? আদম আলাইহিস সালাম। আদম আলাইহিস সালাম দুনিয়াতে এসেছেন। তাঁর মাধ্যমে আমরা এসেছি। কাজেই সবাই আমরা একই গোত্রের লোক।

এরপর আল্লাহ তাআলা তাঁর মেহেরবানিতে আমাদেরকে মুসলমান বানিয়েছেন। আল্লাহকে স্বীকার করে-এমন বান্দা বানিয়েছেন। সৃষ্টিকর্তাকে স্বীকার করে-তাদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। পৃথিবীতে দুই শ্রেণির মানুষই আছে। এক শ্রেণি আল্লাহকে মানে, আরেক শ্রেণি আল্লাহকে মানে না। এর একটি সহজ উদাহরণ দিচ্ছি। আমরা সবাই মা-বাবার মাধ্যমে দুনিয়াতে এসেছি। কিন্তু সব ঘরের সন্তান কি মা-বাবার কথা শুনে? শুনে না। মা-বাবার মাধ্যমে সে দুনিয়াতে এসেছে, তা জানা সত্ত্বেও মা-বাবার কথা শুনে না। তাদের খোঁজ-খবর নেয় না। তাদের সাথে সুসম্পর্ক রাখে না। অনেক অবনতির পরও আমাদের দেশের পরিবারিক অবস্থা এখনো ভালো। যে সকল দেশকে আমরা উন্নত দেশ বলি, পশ্চিমের দেশগুলো, ওখানে আইনই আছে যে, একুশ বছর হয়ে গেলে স্বাধীন। ওখানে সন্তানের বয়স একুশ বছর হয়ে গেলে মা-বাবা থেকে সন্তান স্বাধীন হয়ে যায়। মা-বাবা বুড়ো হলে সন্তানরা তাদেরকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেয়। ওখানে যদি মারা যায়, খবর পাঠায় ছেলের কাছে। কোনো সময় সম্ভব হলে, তার সৎকার ও আনুষাঙ্গিক কাজ-কর্মের জন্য ছেলে যায়। অনেকে আবার টাকা পাঠিয়ে দেয়, বলে আপনারা করে ফেলেন। আমার আসা সম্ভব নয়। এরকম একটা দুইটা না। অহরহ ঘটনা ঘটছে। তাহলে দেখা গেল, অনেকে মা-বাবার ঘরে জন্মলাভ করেও মা-বাবার পরিচয় দেওয়ার দরকার মনে করে না। ঠিক অনুরূপভাবে অনেকে আল্লাহর বান্দা হয়েও নিজেকে আল্লাহর বান্দা হিসেবে স্বীকার করার প্রয়োজন মনে করে না। তো যারা আমরা নিজেদেরকে আল্লাহর বান্দা বলে স্বীকার করি, তারা এক শ্রেণির ও এক প্রকারের মানুষ। আমাদের বিশ্বাস এক, আদর্শ এক। আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ মানুষকে শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে চালাবার জন্য, দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য, যুগে যুগে নবীদের পাঠিয়েছেন। আমরা যারা বিশ্বাসী ও ঈমানদার তারা সবাই এই সূত্রে এক যে, আমরা আদম আলাইহিস সালামকে বিশ্বাস করি, নূহ আলাইহিস সালামকে বিশ্বাস করি, ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে বিশ্বাস করি; সকল নবী ও রাসূলকে বিশ্বাস করি। এরপর আমাদের সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, যাঁর নির্দেশ ও নির্দেশনা চলবে কিয়ামত পর্যন্ত; আমরা তাঁকে বিশ্বাস করি এবং তাঁর শরীয়তের আনুগত্য করি। তিনিই শেষ নবী এবং তাঁর শরীয়তই শেষ শরীয়ত। এই পৃথিবী ততদিন পর্যন্ত ধ্বংস হবে না যতদিন তার নির্দেশনা অন্তত কিছু হলেও মানা হবে। কিছু লোকে মানবে। এমন হবে যে, এমন লোক একজনও নেই, পৃথিবীতে আল্লাহর নাম নেওয়ার কেউ নেই তখন আর পৃথিবী থাকবে না।

এই যে এখনো টিকে আছে, মাঝে মাঝেই বড় বড় দুর্যোগ ঘটে। ভূমিকম্প হয়, সুনামী হয়, এক একটা এলাকা শেষ হয়ে যায়। পুরো পৃথিবীও শেষ হয়ে যেতে পারে। এক সময় কি শেষ হবে না? হবে। কিয়ামতের আগে। কেন শেষ হবে? শেষ হবে এজন্যই যে, ঐ সময় আল্লাহ বলার, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশনা মানার মত একজনও থাকবে না। ওদের উপরই কিয়ামত হবে। 

তো কথা যেখান থেকে শুরু করেছিলাম, সব মুসলমান, যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে-তারা সবাই এক। স্কুল পড়ুয়া, মাদরাসা পড়ুয়া, কৃষক, ব্যবসায়ী, শ্রমিক, আমলা সকলের প্রথম পরিচয় হল আমরা মুসলমান। বিশ্বাস ও আদর্শের কোনো পার্থক্য নাই। এখন শিক্ষার যে পার্থক্য, সম্পূর্ণ আলাদা দুটো ধারা- হাজার বছর পর্যন্ত মুসলিম সমাজে এটা ছিল না। এই বিভক্তিটা সৃষ্টি করা হয়েছে এবং এটা কৃত্রিম। এটা আমাদের বারবার আলোচনা করতে হবে এবং গভীরভাবে বুঝতে হবে। অনেক বছর আগের কথা নয়। হাজার বছরেরও বেশি সময় আমাদের শিক্ষাধারা এই ছিল যে, মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত একই রকমের পড়া হত। মাধ্যমিক স্তরে পড়ার পরে এখন যেমন ইন্টারমিডিয়েটে ভাগ হয়। অনার্স-এ গিয়ে এক একজন এক এক সাবজেক্ট নেয়। এরকম ভাগ হত। কেউ ডাক্তার হত। কেউ ইঞ্জিনিয়ার হত। কেউ আলেম হত। কেউ মুফতী, মুহাদ্দিস হত। কিন্তু এই ম্যাট্রিক পর্যায়ের পড়াটা, ম্যাট্রিক নাম না থাকুক, মাধ্যমিক স্তরের পড়াটা এক-ই পড়া ছিল। এই জন্য তখন এই বিভক্তি ছিল না। এখন তো এই শিক্ষা-ক্ষেত্রেই মুসলমানরা কতভাবে বিভক্ত। এখন জেনারেল শিক্ষাও কি এক রকম? কেউ ইংলিশ মিডিয়াম, কেউ বাংলা মাধ্যম। কত পদ্ধতি, কত ভাগ। যদি আজকেও সেই আগের শিক্ষাব্যবস্থা থাকত তাহলে কি ম্যাট্রিকওয়ালাদেরকে এখানে আলাদাভাবে ডেকে নিয়ে আসা লাগত? অন্তত এখন যে উদ্দেশ্যে দাওয়াত করা হয়েছে, সেই একেবারে দ্বীনের প্রাথমিক আলোচনার জন্য ডেকে তা করা লাগত না।

আমাদের চিন্তা-চেতনা একটাই; মুসলমানরা কাছাকাছি আসুক। যারা মানুষের ইহজাগতিক প্রয়োজনগুলো পূরণ করার শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছে। সে চাকরি করবে, সে ইঞ্জিনিয়ার হবে, সে ডাক্তার হবে; সে মুসলমান ইঞ্জিনিয়ার হোক, মুসলমান ডাক্তার হোক। তার স্বকীয়তা থাকুক। আরেক ডাক্তার ও তার মধ্যে পার্থক্য থাকুক। আরেকজন ইঞ্জিনিয়ার ও তার মধ্যে  পার্থক্য থাকুক। আরেকজন ইঞ্জিনিয়ার ফাঁক-ফোকর বের করবে। কোন্ দিক দিয়ে কত কী করা যায়। আর সে চিন্তা করবে, কীভাবে উন্নত করা যায়। ভালো করা যায়। তার এবং তার সহকর্মীর মধ্যে পার্থক্য থাকবে। মুসলমান ডাক্তার তৈরি হওয়া, মুসলমান ইঞ্জিনিয়ার তৈরি হওয়া। মুসলমান শিক্ষক তৈরি হওয়া, মুসলমান ব্যবসায়ী তৈরি হওয়া। এগুলো হল এই চিন্তার উদ্দেশ্য। এই চিন্তা থেকেই দ্বীনী-দাওয়াতী কাজগুলো হয়ে থাকে। এই চিন্তা থেকেই এখানকার এই জমায়েত।

তো চাইলে আমরা রাতারাতি এই শিক্ষাব্যবস্থা পরিবর্তন করে দিতে পারব না। আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারব না। এটা একটা চালু ব্যবস্থা। তাছাড়া ইসলামী শিক্ষা বিস্তারে যাদের চিন্তায় আঘাত লাগে, তারা কিন্তু সহ্য করবে না। আপনি যখন কিছু বলবেন, ধর্মের কথা বলবেন, ওরা একসাথে হৈ চৈ করে উঠবে। এটাকে এমন মনে করার সুযোগ নেই যে, ওরা একটু ধর্মের বিরুদ্ধে বলছে আর কি! না, এ সমস্ত লোক অনেক পেছন থেকে কাজ করে। আন্তর্জাতিকভাবে এসবের জন্য নিয়োগ করা এজেন্ট থাকে। এই প্রসঙ্গটা দীর্ঘ করছি না। আপনারা বড় হলে, চারপাশের অভিজ্ঞতা হলে অনেক কিছুই পরিষ্কার হবে। তো এই ক্ষেত্রে কাজ করা কি খুবই সহজ!

এজন্য ব্যক্তি পর্যায়ের কাজ করা সহজ। আমরা নিজেরা সতর্ক থাকা সহজ। এজন্য যেটা আমার এক নম্বর দরকার তা হল, আমার ঈমানকে বাঁচিয়ে রাখা। আমি আগে নিজেকে দিয়ে শুরু করব এরপর সমাজ বদলাবার চেষ্টা করব। এখানে কোনো ভিন্ন দল বা রাজনীতি হবে না। বরং নিজেকে ঠিক করা। আমার পড়ার জীবনটা যেন ভালো হয়। একজন ভালো মানুষ হিসেবে যেন চলতে পারি। একটু আগে আমরা কুরআনের তিলাওয়াত শুনেছি-

إِنَّ اللهَ مَعَ الَّذِينَ اتَّقَوْا وَالَّذِينَ هُمْ مُحْسِنُونَ.

আল্লাহ তাদেরই সাথে আছেন, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মপরায়ণ। -সূরা নাহল (১৬) : ১২৮

যাদের মধ্যে তাকওয়া আছে, তাদের সাথে আল্লাহ আছেন। আর যারা ভালো লোক, তাদের সাথে আল্লাহ আছেন। যার সাথে আল্লাহ আছেন তার কি আর কিছু লাগবে?

আপনি চলবেন আল্লাহ আপনার সাহায্য করবেন। আপনার পড়া মুখস্থ হয় না, আল্লাহ তাআলা আপনার সাহায্য করবেন। চাকরি পান না, জীবিকার ব্যবস্থা হয় না, আল্লাহ সাহায্য করবেন। আপনি অসুস্থ, আল্লাহ সাহায্য করবেন। আল্লাহ আপনার সাথে আছেন, তো আপনার সব কিছু আছে। কোনো কিছুরই অভাব নাই।

إِنَّ اللهَ مَعَ الَّذِينَ اتَّقَوْا যদি তাকওয়া থাকে। তাকওয়া কাকে বলে? সহজ ভাষায় তাকওয়া হল; আল্লাহর একজন বান্দা হিসেবে চলা। আল্লাহর একজন বান্দা হিসেবে চলতে হলে কী করতে হবে? আল্লাহ যা আদেশ করেছেন তা করতে হবে। আর যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকতে হবে। এর নামই তাকওয়া। অনেক লম্বা কথা নয়। আমি আপনি পারি না- এরকম নির্দেশ কিন্তু আল্লাহ দেননি। বরং মানুষের সাধ্যের ভেতরে যেই কাজগুলো, সেগুলোর নির্দেশই তিনি দেন। যখন আমরা দ্বীনের কাছাকাছি আসব। আলেম-উলামাদের সংশ্রবে আসব তখন বুঝা যাবে দ্বীনের উপর চলা এবং আল্লাহর বিধানগুলো মানা কঠিন কিছু নয়। স্কুলে পড়ার জীবনেও এটা সম্ভব। পেশাজীবনেও সম্ভব। চাকরি-বাকরি, ব্যবসা-বানিজ্য সর্বক্ষেত্রেই সম্ভব। তবে জানতে তো হবে। এর জন্য কোনো একজন পরহেযগার নির্ভরযোগ্য আলেমকে নিজের মুরব্বী হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। তার পরামর্শে চলতে হবে। দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে বের হওয়া খুবই উপকারী। তবে অবশ্যই নিজের মুরব্বী আলেমের নির্দেশনা মোতাবেক চলতে হবে। উলামায়ে কেরামের মজলিসগুলেতে বসতে হবে। মারকাযের প্রধান দফতরে প্রতি ইংরেজী মাসের প্রথম বুধবার আসর থেকে ইশা পর্যন্ত ‘দ্বীনী মাহফিল’ হয়। আগামী মাস থেকে হযরতপুর প্রাঙ্গণেও তা শুরু হবে। আপনার প্রশ্নের উত্তর দেয়ারও একটা পর্ব থাকবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের সকলকে কবুল করুন।

وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين.

[অনুলিখন : মুহাম্মাদ সাইফুল্লাহ বিন  ওয়াক্কাস]