রজব ১৪৩৮ . এপ্রিল ২০১৭

পুরোনো সংখ্যা . বর্ষ: ১৩ . সংখ্যা: ০৪

গোল্ডেন রেশিও এবং কা‘বা শরীফ পৃথিবীর নাভি কি না- এ প্রসঙ্গ

গোল্ডেন রেশিও(Golden ratio) অর্থ সোনালী অনুপাত/স্বর্ণানুপাত। এটা হচ্ছে একটা চমৎকার গাণিতিক অনুপাত যা কোন চিত্রকর্ম, স্থাপত্যকলা ইত্যাদিতে প্রয়োগ করা হলে সেই চিত্রকর্ম ও স্থাপত্যের চমৎকারিত্ব বৃদ্ধি পায়। মিশরের পিরামিড, আগ্রার তাজমহল, আইফেল টাওয়ার, হোয়াইট হাউজ ইত্যাদিতে এই গোল্ডেন রেশিওতথা সোনালী অনুপাতের প্রয়োগ ঘটেছে বলেই বোদ্ধাদের কাছে এগুলোর চমৎকারিত্বই ভিন্ন। এতে নাকি আরকিটেকচারাল ডিজাইনের সৌন্দর্য অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। জ্যামিতির অনেক কিছুতেও এই গোল্ডেন রেশিও-এর প্রয়োগ থাকে।

অনেকে সৃষ্টির মধ্যে গাছপালা, ফল-ফুল, বিভিন্ন প্রাণী, মানুষের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, এমনকি উর্ধ্ব জগতের বিভিন্ন গ্রহ-নক্ষত্র ও গ্যালাক্সি (ছায়াপথ)-এর বাহুগুলোর মাঝেও এই গোল্ডেন রেশিওবা সোনালী অনুপাত রক্ষা হয়েছে বলে দেখিয়ে থাকেন। এমনকি শামুকের খোলস, ঘূর্ণিঝড়ের ঘুর্ণন, বৃক্ষের কাণ্ড-বিন্যাস, ফল, ফুল ইত্যাদিতেও এই গোল্ডেন রেশিওবা সোনালী অনুপাত রক্ষা হয়েছে বলে দেখিয়ে থাকেন। উদাহরণ স্বরূপ মানুষের মাথা থেকে পা পর্যন্ত অংশের মধ্যে মাথা থেকে নাভি এবং নাভি থেকে পা পর্যন্ত যে মানটি পাওয়া যাবে তা হল ১.৬১৮ অর্থাৎ, সোনালী অনুপাত। কনুই থেকে আঙ্গুলের মাথা পর্যন্ত এবং আঙ্গুলের মাথা থেকে কবজি পর্যন্ত এই সোনালী অনুপাত পাওয়া যায়। কাঁধ থেকে হাঁটু এবং হাঁটু থেকে পায়ের আঙ্গুলের মাথা পর্যন্ত দূরত্বের মাঝেও এই সোনালী অনুপাত পাওয়া যায়। এমনিভাবে চেহারা হৃদপি-সহ অন্যান্য অনেক অঙ্গের বিভিন্ন অংশে এই অনুপাত পাওয়া যায়। মানুষের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসহ প্রকৃতির অনেক কিছুর মাঝে এই অনুপাত পাওয়া যায় বলে কেউ কেউ এটাকে Divine proportion (স্বর্গীয় অনুপাত বা ঐশ্বরিক অনুপাত) বলেও আখ্যায়িত করে থাকেন। গোল্ডেন রেশিওকে গোল্ডেন মিন(Golden mean), “গোল্ডেন সেকশন(Golden section)ও বলা হয়।

খ্রিস্টের জন্মেরও পাঁচশ বছর পূর্বে এই গোল্ডেন রেশিও বা সোনালী অনুপাত প্রথমে আবিস্কার করেন পিথাগোরাস। তারপর প্লেটো, ইউক্লিড, ফিবোনাক্কি, কেপলারসহ অনেকে এই সোনালী অনুপাতের জগতে গবেষণায় অগ্রসর হন।

আমরা গোল্ডেন রেশিও-এর বিষয়টা আলোচনায় আনছি এজন্য যে, অনেককে ইদানিং বলতে শোনা যাচ্ছে, পৃথিবীর মাঝে বায়তুল্লাহ বা কাবা শরীফের যে অবস্থান তাতেও এই অনুপাত রক্ষা করা হয়েছে। তারা বলতে চান, গোল্ডেন রেশিও হিসেবে কাবা শরীফ পৃথিবীর নাভি। এ সম্পর্কিত প্রচুর লেখা নেটে দেখতে পাওয়া যায়। বিচিত্র  নয় যে, এই ধারায় অনেক বইয়েও বিষয়টা এসে থাকবে বা এসে যাবে।

তা বক্তব্য যদি এতটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত যে, কাবা শরীফ পৃথিবীর নাভির অবস্থানে রয়েছে তাহলে তা আমাদের তেমন কিছু উদ্বেগের কারণ ছিল না। কিন্তু যেহেতু অনেকে বক্তব্যকে আরও আগে বাড়িয়ে বলতে চাচ্ছেন, কাবা শরীফ পৃথিবীর নাভি আর নাভি হচ্ছে শরীরের মাঝখান, অতএব সেই কাবা শরীফ যে মক্কায় অবস্থিত সেই মক্কাকে কেন্দ্র করেই সারা পৃথিবীর রোযা রাখা ও ঈদ করার প্রবর্তন হওয়া চাই, সোজা কথায় বলতে গেলে তারা বলতে চান, মক্কা শরীফের সাথেই একসাথে রোযা ও ঈদ করতে হবে। একারণেই এ বিষয়টার প্রতি আমাদের মনোযোগ দিতে হচ্ছে।

এটা ভিন্ন কথা যে, কাবা শরীফ বা মক্কা রোযা রাখা ও ঈদ করার ভিত্তি কি না- এ ব্যাপারে অত্যন্ত পরিষ্কার কথা হল শরীয়তে রোযা রাখা বা রোযা ছাড়ার তথা ঈদ করার ভিত্তি বানানো হয়েছে কেবল হেলাল (নতুন চাঁদ) দেখাকে। কাবা শরীফ বা মক্কা মুকাররমাকে রোযা রাখা বা রোযা ছাড়ার তথা ঈদ করার ভিত্তি বানানো হয়নি। তা ছাড়া পৃথিবীর কোন একটা স্থান নাভির স্থলে হলেই সে স্থানকে সকলের জন্য অন্য কোন আমলের ভিত্তি বানাতে হবে এর পেছনে কোন যুক্তিও নেই। (এমন বলাটা কি যুক্তিযুক্ত হবে যে, মক্কা শরীফ যেহেতু নাভি তাই সকলের বিয়ে-শাদি মক্কাতেই হতে হবে, সকলের কবরও সেখানেই হতে হবে, ইত্যাদি?) আরও কথা হল নাভি তো প্রস্থের মাঝখানে হয়, অথচ কাবা শরীফ পৃথিবীর প্রস্থের দিকের মাঝখানে তথা বিষুব রেখাতে অবস্থিত নয়। আল্লাহ পাক যদি কাবা শরীফকে নাভির স্থলেই রাখতেন তাহলে কাবা শরীফ হত বর্তমান দ্রাঘিমার বরাবর দক্ষিণে বিষুব রেখায় তথা আফ্রিকার কেনিয়ায়। এখন কাবা শরীফ তথা নাভি এক সাইডে হয়ে গেল এটা কি বেখাপ্পা হয়ে যায় না? এতে কি আল্লাহর শিল্প ডিজাইন জ্ঞানের ত্রুটি প্রকাশ পায় না? নাউযু বিল্লাহ! যাহোক আমি এ প্রসঙ্গে অতিরিক্ত আর কিছু এখানে লিখতে চাই না। এখানে শুধু গোল্ডেন রেশিও হিসেবে কাবা শরীফ পৃথিবীর নাভি কি না- এ প্রসঙ্গেই আলোচনা করতে চাই। মূল আলোচনায় প্রবেশের পূর্বে যারা গোল্ডেন রেশিও সন্বন্ধে মোটেই জানেন না, তাদের সুবিধার্থে প্রথমে গোল্ডেন রেশিও-এর পরিচয় সম্বন্ধে কিছু কথা বলে নিতে চাই।

সহজে গোল্ডেন রেশিও”-এর পরিচয় হল গোল্ডেন রেশিও হচ্ছে একটি বিশেষ গাণিতিক অনুপাত। সেই অনুপাতটি হল ১.৬১৮। একটা রেখাকে যদি এমন দুই ভাগে ভাগ করা হয় যার বড় অংশকে ছোট অংশ দ্বারা ভাগ করলে যে ভাগফল পাওয়া যায় উভয় অংশের যোগফলকে বড় অংশ দ্বারা ভাগ করলেও সেই ফল পাওয়া যায়, আর সেই ভাগফল হবে ১.৬১৮ (প্রকৃত সংখ্যা হচ্ছে ১.৬১৮০৩৩৯৮৮৭৫) তাহলে সেটা হচ্ছে গোল্ডেন রেশিও। যেমন ৬১০ ইঞ্চি একটা রেখাকে দুই ভাগে ভাগ করুন। বড় অংশ (এটাকে বলা যায় A অংশ) ধরুন৩৭৭ ইঞ্চি আর ছোট অংশ (এটাকে বলা যায় B অংশ) ধরুন২৩৩ইঞ্চি। এবার বড় অংশ তথা A অংশকে ছোট অংশ তথা B অংশ দ্বারা ভাগ দিন ফল হবে ১.৬১৮ (৩৭৭÷২৩৩=১.৬১৮) আবার A+B-র টোটালকে অর্থাৎ ৬১০ কে A অংশ দ্বারা ভাগ দিন তাহলেও ফল হবে ১.৬১৮ (৬১০÷৩৭৭=১.৬১৮) তাই সংক্ষেপে গোল্ডেন রেশিওর পরিচয় এভাবেও দেয়া হয়- a+b is to a as a is to bঅর্থাৎ, a+b÷a= a÷bবিষয়টিকে চিত্রে এভাবে দেখানো যায়-

 

 

 

 

 

আবার চিত্রে এভাবেও দেখানো যায়-

 

 

 

 

 

 

 

গোল্ডেন রেশিওকে সাধারণত তিন প্রকারে ভাগ করা হয়। (এক) সাধারণ গোল্ডেন রেশিও। এ সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে। (দুই) ১.৬১৮ রেশিও রক্ষা করে কোন আয়তক্ষেত্র তৈরি করলে (যে আয়তের দৈর্ঘ প্রস্থ উভয়টার রেশিও হবে ১.৬১৮) সেটাকে বলে গোল্ডেন রেকট্যাংগ্ল্ (Golden Rectangle) বা আয়তক্ষেত্রের গোল্ডেন রেশিও। যেমন দ্বিতীয় চিত্রে দেখানো হয়েছে। (উল্লেখ্য, চার সমকোণবিশিষ্ট চতুর্ভূজকে আয়তক্ষেত্র বলা হয়।) (তিন)আবার যদি উভয় আয়তক্ষেত্রের পিঠে ফিবোনাক্কি ক্রম অনুযায়ী (এ বিষয়ে পরে বর্ণনা আসছে।) আরও একটা আয়তক্ষেত্র তৈরি করা হয়, তারপর সবগুলোর পিঠে অনুরূপভাবে আরও একটা আয়তক্ষেত্র তৈরি করা হয়। এভাবে কয়েকটা আয়তক্ষেত্র তৈরি করার পর সবগুলো আয়তের কোণা একের পর এক প্যাঁচানো রেখা দিয়ে যুক্ত করা হয়, তাহলে সেটাকে বলে গোল্ডেন স্পাইরাল (Golden Spiral) বা শঙ্খিল গোল্ডেন রেশিও।এই স্পাইরালের বক্ররেখাতেও গোল্ডেন রেশিও থাকে।

স্পাইরাল হল সমুদ্রের এক ধরনের শামুক যা প্যাঁচানো আকৃতিতে গড়ে ওঠে। সূর্যমুখী ফুলের পাপড়ি এবং হাতের বৃদ্ধ আঙ্গুলের ছাপের দিকে লক্ষ্য করলেও এই গোল্ডেন স্পাইরাল দেখতে পাওয়া যায়। নিচের ছবিতে গোল্ডেন স্পাইরাল লক্ষ্য করুন।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 গোল্ডেন রেশিওর সঙ্গে ফিবোনাক্কি (Fibonacci কেউ কেউ উচ্চারণ লেখেন ফিবোনেসি/ ফিবোনাচ্চি/ ফিবোনোচ্চি) সিরিজের একটা বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। তাই ফিবোনাক্কি সিরিজ সম্বন্ধেও কিছু কথা জানতে হয়।

ইটালিয়ান গণিতবিদ লিওনার্দ ফিবোনাক্কি (Leonardo Fibonacci) এই সিরিজটি আবিস্কার করেন বলে একে ফিবোনাক্কি সিরিজবলা হয়। এই সিরিজে কতগুলো সংখ্যা দেখানো হয়, যেগুলোর প্রতিটি সংখ্যা তার আগের দুইটি সংখ্যার যোগফলের সমান। সিরিজভুক্ত সংখ্যাগুলোর প্রত্যেকটিকে তার আগের সংখ্যা দ্বারা ভাগ করলে ভাগফল ১.৬১৮-এর কাছাকাছি হবে এবং ১৩ তম সংখ্যা এর পরে (৬১০ থেকে)সবগুলোর ভাগফল হুবহু ১.৬১৮ হবে।

এবার ফিবোনাক্কি সিরিজটি লক্ষ্য করুন- , , , , , , ১৩, ২১, ৩৪, ৫৫, ৮৯, ১৪৪, ২৩৩, ৩৭৭, ৬১০, ৯৮৭, ১৫৯৭, ২৫৮৪, ৪১৮১ ... এর পরবর্তী আরও সংখ্যা আপনি বের করতে পারবেন। শেষ সংখ্যাকে তার পূর্বের সংখ্যার সাথে যোগ দিলেই পরবর্তী সংখ্যা বের হবে।

এখানে আরও উল্লেখ্য যে, প্রতিটি সংখ্যার AB অংশ কি হবে তা বের করা আজকাল সহজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নেটে Golden ratio calculator পাওয়া যায়, তার সহযোগিতা নিলেই হয়। এমনকি একটা চিত্রে গোল্ডেন রেশিও কীভাবে অবস্থিত তা বের করাও এখন সহজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফাইমেট্রিক্স-এর সহযোগিতা নিন। ফাইমেট্রিক্স হচ্ছে এক ধরনের সফটওয়ার যা দ্বারা কোন ছবির গোল্ডেন রেশিও পয়েন্ট মাপা হয়।

গোল্ডেন রেশিও বোঝানোর জন্য Φ চিহ্ন ব্যবহৃত হয়। এরূপ লেখা হয় Φ ১.৬১৮ Φ হচ্ছে একটি ল্যাটিন ভাষার অক্ষর। এটাকে বলা হয় Phi (ফাই) এটা হচ্ছে বড় হাতের ফাই। আবার ছোট হাতের ফাই অর্থাৎ, φও ব্যবহৃত হয়। তখন লেখা হয় φ০.১৬৮। দেখা গেল ছোট হাতের ফাই ব্যবহার করলে দশমিকের পূর্বের ১ লেখা হয় না। কখনও কখনও এরূপও লেখা হয় Phi ১.৬১৮ আবার এরূপও লেখা হয় G ১.৬১৮ এই G হচ্ছে Golden ratio-এর সংক্ষেপ। তবে বেশিরভাগ Phiই লেখা হয়।

এতক্ষণ গোল্ডেন রেশিও-র পরিচয় সম্বন্ধে মোটামুটি বর্ণনা পেশ করা হল। এবার আমরা মূল আলোচনায় প্রবেশ করছি। যারা কাবা শরীফকে পৃথিবীর নাভি বলতে চান তারা অক্ষের বিচারে দুইভাবে গোল্ডেন রেশিও দেখান এবং দ্রাঘিমার বিচারে দুইভাবে তা দেখান। এ ছাড়াও আরও একভাবে (কো অর্ডিনেট পদ্ধতিতে) তা দেখান। সর্বমোট ৫টা পদ্ধতিতে তারা কাবা শরীফকে গোল্ডেন রেশিও পয়েন্টে দেখাতে চান। আর কেউ কেউ একভাবে কাবা শরীফকে পৃথিবীর মাঝখান বলে দেখাতে চান। এই মোট ৬টা পদ্ধতি। নিম্নে পদ্ধতি ষষ্ট ও সে  সম্বন্ধে পর্যালোচনা পেশ করা গেল।

 

১ম পদ্ধতি: (অক্ষের বিচারে)

A অংশ ১১১.৮২/১৮০=১.৬০৯।

পর্যালোচনা :

এখানে নিখুঁত গোল্ডেন রেশিও হয়নি। কেননা নিখুঁত গোল্ডেন রেশিও হতে হলে দুটো অনুপাতই (B/A এবং A/A+B) ১.৬১৮হতে হবে। এখানে দ্বিতীয় অংশে অনুপাতটি কাছাকাছি হলেও প্রথমটি গোল্ডেন রেশিওর ধারে-কাছেও যায়নি। কেননা A অংশ ১১১.৮২ হলে B অংশ হবে (১৮০-১১১.৮২=) ৬৮.১৮। অতএব A অংশকে B অংশ দ্বারা ভাগ দিলে হবে (১১১.৮২÷৬৮.১৮=) ১.৬৪০। ১.৬৪০ কে কাছাকাছি ধরা হলেও উভয় অনুপাত এক সমান হয়নি অতএব সঠিক গোল্ডেন রেশিও হল না। সঠিক গোল্ডেন রেশিও হতে গেলে উভয় অনুপাত সমান হতে হবে। এতএব অক্ষের বিচারে এখানে গোল্ডেন রেশিও দেখানোর যে চেষ্টা করা হয়েছে তা নিখুঁত নয়। আল্লাহ পাক কাবা শরীফকে পরিকল্পিতভাবে গোল্ডেন রেশিও পয়েন্টে রাখলে নিখুঁত গোল্ডেন রেশিওই থাকত। আল্লাহর সৃষ্টিতে কোন খুঁত থাকে না।

বস্তুত মক্কার সঠিক অবস্থান (২১.৪২২ºউত্তর অক্ষাংশ) হিসাবে A অংশ হওয়া চাই ১১১.৪২ এবং B অংশ হওয়া চাই ৬৮.৫৮। তাহলে ১১১.৪২÷৬৮.৫৮=১.৬২৪ এবং ১৮০÷১১১.৪২= ১.৬১৫। দেখা গেল কোনভাবেই সঠিক গোল্ডেন রেশিও হচ্ছে না।

২য় পদ্ধতি: (অক্ষের বিচারে)

দক্ষিণ মেরু থেকে কাবার দূরত্ব ১২৩৪৮.৩২ কি. মি। এটা হচ্ছে A অংশ। আর উত্তর মেরু থেকে কাবা শরীফের দূরত্ব হচ্ছে ৭৬৩১.৬৮ কি. মি। এটা হচ্ছে B অংশ। টোটাল- ১৯৯৮০ কি. মি। এখানে সবভাবেই গোল্ডেন রেশিও তথা ১.৬১ পাওয়া যায়।

পর্যালোচনা:

কাবা শরীফের উত্তর দক্ষিণে যে দূরত্ব দেখানো হয়েছে, (১২৩৪৮.৩২+৭৬৩১.৬৮=১৯৯৮০ কি. মি) তা ভুল। প্রকৃত দূরত্ব হচ্ছে ১২৪২৯.৯ মাইল= ২০০০৩.৯৩ কি. মি। (নেটে Length of Prime meridian সাইটে সার্চ দিলে বিষয়টি পাওয়া যাবে।) সম্ভবত তারা ইচ্ছাকৃতভাবে এরূপ ভুল তথ্য দিয়ে গোল্ডেন রেশিওর নামে ধোঁকা দিতে চেয়েছে।

 

৩য় পদ্ধতি (দ্রাঘিমার বিচারে)

অ অংশ ২১৯.৮২/৩৬০=১.৬১

(অর্থাৎ, তারা বোঝাতে চান কাবা শরীফ যেহেতু ৩৯.৮২৬ºঊ য়ে অবস্থিত তাহলে আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা থেকে আমেরিকা আফ্রিকার দিক হয়ে কাবা শরীফ পর্যন্ত হয় ২১৯.৮২º)

পর্যালোচনা:

(এক) হিসাবে ভুল হয়েছে। সঠিক ফলাফল হবে ১.৬৩৭ আর এটা সঠিক গোল্ডেন রেশিও নয়।

(দুই) এখানে দ্বিতীয় অংশে ১.৬৩৭ তথা গোল্ডেন রেশিওর কাছাকাছি হলেও প্রথম অংশে গোল্ডেন রেশিওর ধারে-কাছেও যায়নি। কেননা A অংশ ২১৯.৮২ হলে B অংশ হবে (৩৬০-২১৯.৮২=) ১৪০.১৮আর ২১৯.৮২÷ ১৪০.১৮=১.৫৬৮। তাহলে গোল্ডেন রেশিওর ধারে-কাছেও গেল না। এ জন্যই সম্ভবত তারা এই প্রথম অংশ হিসেবে দেখান না। অথচ নিখুঁত গোল্ডেন রেশিও প্রমাণ করতে হলে উভয় অংশেই সমান অনুপাত ১.৬১৮ (বা অন্তত এর কাছাকাছি) থাকতে হবে।

বস্তুত সঠিক গোল্ডেন রেশিওর হিসাব মিলাতে হলে কাবার শরীফের অবস্থান হতে হবে ২২২.৪৯২ºE তথা ৪২.৪৯ºEতাহলে A অংশ হবে ২২২.৪৯২ আর B অংশ হবে ১৩৭.৫০৮। তাহলে ৩৬০÷২২২.৪৯২=১.৬১৮ এবং ২২২.৪৯২÷১৩৭.৫০৮=১.৬১৮। উল্লেখ্য, উক্ত ৪২.৪৯ºE (এবং ২১.২৪ºN)-এর অবস্থানে রয়েছে তুরবা ও রনিয়্যা নামক দুটো অঞ্চলের মধ্যবর্তী স্থান। এ স্থানটি মক্কা শরীফ থেকে তায়েফের অবস্থান যত দূরে তায়েফ থেকে তার চেয়ে প্রায় দেড়গুন দূরে পূর্বদিকে অবস্থিত। আল্লাহ তাআলা যদি কাবা শরীফকে গোল্ডেন রেশিও পয়েন্টে রাখার পরিকল্পনা রাখতেন তাহলে গোল্ডেন রেশিওর এই নিখুঁত পয়েন্টেই কাবা শরীফকে রাখতেন।

(তিন) দ্রাঘিমার বিচারে কাবা শরীফকে নাভির স্থানে দেখাতে গিয়ে গ্রীনিচ রেখাকে মূল মধ্যরেখা এবং আন্তর্জাতিক তারিখ রেখাকে পৃথিবীর দৈর্ঘের শুরু মেনে নেয়া হয়েছে। অথচ গ্রীনিচ রেখা পৃথিবীর দৈর্ঘের মধ্যখান এবং আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা পৃথিবীর দৈর্ঘের শুরু- এ বিষয়টা না কোন শরয়ী দলীলে স্বীকৃত বিষয় না বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। প্রাকৃতিক এমন কোন নিদর্শনও নেই যার ভিত্তিতে বিষয় দুটো সর্বজনস্বীকৃত হতে পারে। এটা তো নিছক বিশেষ একটা হিসেবের সুবিধের জন্য মেনে নেয়া হয়েছে।। কেউ এটা না মেনে ভিন্ন রকম মানচিত্রও দাঁড় করাতে পারে। যেমন ফ্রান্স প্যারিসের উপর দিয়ে অতিক্রান্ত দ্রাঘিমা রেখাকেই মূল মধ্যরেখা গণ্য করে থাকে।

 

৪র্থ পদ্ধতি (দ্রাঘিমার বিচারে)

শোনা যায় তাদের অনেকে প্রশান্ত মহাসাগরকে চন্দ্রের প্রথম উদয়স্থল বলতে চায়। এ হিসেবে তারা কাবা শরীফকে নাভি প্রমাণ করার চেষ্টা করে থাকেন।

পর্যালোচনা:

তাহলে প্রমাণ করতে  হবে যে, চন্দ্রের প্রথম উদয়স্থল ১৭৭.৩৩৪ পূর্ব দ্রাঘিমায়। কেননা পূর্ব দ্রাঘিমার ই অংশ হতে হবে ১৩৭.৫০৮। আর কবা শরীফ ৩৯.৮২৬ºEতে অবস্থিত। অতএব ৩৯.৮২৬+১৩৭.৫০৮=১৭৭.৫০৮ তে চন্দ্রের প্রথম উদয় ঘটতে হবে। অথচ ১৭৭.৫০৮ তে চন্দ্রের প্রথম উদয় ঘটার বিষয় না শরয়ীভাবে প্রমাণিত না বৈজ্ঞানিকভাবে।

 

৫ম পদ্ধতি

তারা বলতে চান, কো অর্ডিনেট পদ্ধতিতে কাবা শরীফ গোল্ডেন রেশিও পয়েন্টে অবস্থিত। তারা বলতে চান, পূর্ব দ্রাঘিমাংশ + ৩৯.৮২ এবং উত্তর অক্ষাংশ + ২১.৪২। এতে কাবা শরীফে গোল্ডেন রেশিও প্রমাণিত হয়। এভাবে- ৯০+৩৯.৮২ = ১১১.৪২

সুতরাং ১১১.৮২/১৮০= ০.৬১...

এবং ১৮০+৩৯.৮২ = ২১৯.৮২

সুতরাং ২১৯.৮২/৩৬০ = ০.৬১...

পর্যালোচনা:

(এক) পুরো হিসেবটাই ভুলে ভরা। কারণ, (১) ৯০ + ৩৯.৮২ = ১১১.৪২ ভুল বরং সঠিক হল ৯০ + ৩৯.৮২ = ১২৯.৮২ (২) অতএব অনিবার্য কারণে পরবর্তী লাইন ১১১.৮২/১৮০ = ০.৬১... এটাও ভুল। বরং এটা হবে ১২৯.৮২/১৮০ = ১.৩৮৬। তাহলে গোল্ডেন রেশিও পাওয়া গেল না। (৩) শেষ লাইনে দেখানো হয়েছে ২১৯.৮২/৩৬০ = ০.৬১... এটাও ভুল। হবে ২১৯.৮২/৩৬০ = ০.৬৩৭...

(দুই) ৩য় পদ্ধতির পর্যালোচনায় যা বলা হয়েছিল আবারও তাই বলতে চাই যে, এখানে গ্রীনিচ রেখাকে মূল মধ্যরেখা এবং আন্তর্জাতিক তারিখ রেখাকে পৃথিবীর দৈর্ঘের শুরু মেনে নিয়ে হিসেব দাঁড় করানো হয়েছে। অথচ গ্রীনিচ রেখা পৃথিবীর দৈর্ঘের মধ্যখান এবং আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা পৃথিবীর দৈর্ঘের শুরু- এ বিষয়টা না কোন শরয়ী দলীলে স্বীকৃত বিষয় না বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। প্রাকৃতিক এমন কোন নিদর্শনও নেই যার ভিত্তিতে বিষয় দুটো সর্বজনস্বীকৃত হতে পারে। এটা তো নিছক বিশেষ একটা হিসাবের সুবিধার জন্য মেনে নেয়া হয়েছে। অতএব এই কল্পিত বিষয়কে কেন্দ্র করে যে গোল্ডেন রেশিও দেখানো হচ্ছে তা কাল্পনিক গোল্ডেন রেশিও হতে পারে বাস্তব গোল্ডেন রেশিও নয়।

 

৬ষ্ঠ পদ্ধতি

কাবা শরীফ পৃথিবীর মাঝখান। কেননা-

(এক)  কাবা শরীফ থেকে আলাস্কা এবং নিউজিল্যান্ড মাপলে সমান দূরত্ব পাওয়া যায়।

(দুই) কাবা শরীফ ম্যাগনেটিক ফিল্ডের মাঝে অবস্থিত।

পর্যালোচনা :

 ১. নিউজিল্যান্ড ছাড়াও তো তার পূর্বে চ্যাথাম দ্বিপ, বাউন্টি দ্বিপ ইত্যাদি রয়েছে, সেগুলোকে হিসেবে কেন ধরা হল না। তাছাড়া আলাস্কা কাবা শরীফ থেকে (গ্লোবে) সোজা উত্তরে- এদিকটা ধরা হল, সোজা দক্ষিণের মাপ কেন আনা হল না। কাবা শরীফ থেকে সোজা পূর্ব পশ্চিমের মাপও কেন আনা হল না?

২. কাবা শরীফ ম্যাগনেটিক ফিল্ডের মাঝে অবস্থিত হলে তার বিপরীত দিকের অঞ্চলও তো ম্যাগনেটিক ফিল্ডের মাঝে অবস্থিত হবে, তাহলে সেটাকেও কি পৃথিবীর মাঝখান বলতে হবে?

 

সারকথা, কাবা শরীফকে পৃথিবীর নাভি দেখাতে গিয়ে গোল্ডেন রেশিওর যে বর্ণনাগুলো পেশ করা হয়ে থাকে তা হয় ভুল না হয় খুঁতযুক্ত, যা পূর্বে বিস্তারিতভাবে দেখানো হয়েছে। আর কাবা শরীফকে পৃথিবীর মাঝখান দেখানোর যে প্রচেষ্টা দেখানো হয়েছে তা একটা খাপছাড়া বিষয়।

আরও পড়ুন:   ইসলামের সৌন্দর্য-মাধুর্য | দ্বীনিয়াত

কুরআন মজীদ ও সহীহ হাদীসের আলোকে মাহে রমযান