রজব ১৪৩৮ . এপ্রিল ২০১৭

পুরোনো সংখ্যা . বর্ষ: ১৩ . সংখ্যা: ০৪

শিক্ষা-দীক্ষা : চেতনার দীপ জ্বলুক!

৩ মার্চ জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আয়োজনে এক মানববন্ধনে শিক্ষকদের প্রতি ইঙ্গিত করে শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, প্রশ্নপত্র শিক্ষকদের হাতে পৌঁছে দিয়ে তারা যখন চিন্তামুক্ত হচ্ছেন, তখন পরীক্ষা শুরুর ঘণ্টাখানেক আগে প্রশ্নপত্র ফেসবুকে আসতে দেখা যাচ্ছে।  ...শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আমরা এমন একটি পরিবেশের মধ্যে আছি, সব খুলে বলতেও পারি না, সহ্যও করতে পারি না। সত্যিকার অর্থে আমাদের মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষক বেশি দরকার।

সমস্যা নিয়ে তো দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন নেই। সমস্যা এখন সবার সামনে। শিক্ষাঙ্গনের নানা অনাচার, শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি, ভর্তিবাণিজ্য, কোচিংপ্রবণতা, প্রশ্নফাঁস, যৌন কেলেঙ্কারি ইত্যাদি যে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে তা কারো অজানা নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, সমস্যার এই ভয়াবহ বিস্তারের কারণ কী আর তা সমাধানের উপায়ই বা কী? স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়ের উপলদ্ধি হচ্ছে, ‘সত্যিকার অর্থে আমাদের মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষক বেশি দরকার।

জী, মূল্যবোধেরই এখন সবচেয়ে বেশি সংকট। আমাদের শিক্ষা আছে, সংস্কৃতি আছে; প্রগতি আছে, প্রযুক্তি আছে; ‘চেতনাআছে, চেতনার অহং আছে; সাহিত্য আছে, সাংবাদিকতা আছে; সমাজ আছে এবং সমাজব্যবস্থাও আছে, কিন্তু একটি জিনিসই নেই। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর ভাষায় তা হচ্ছে, ‘মূল্যবোধ এই জিনিসটা যেখানে তৈরি হওয়ার কথা এবং যাদের মাধ্যমে তৈরি হওয়ার কথা সেই শিক্ষা-ব্যবস্থা ও শিক্ষকসমাজের মধ্যেও নাকি তা নেই! এখানেই যখন নেই তখন অন্যখানে কতটুকু থাকবে তা খুব সহজেই অনুমেয়।

এখন তাহলে একটা খুব বড় প্রশ্ন সামনে এসে যাচ্ছে, আর তা হল, মূল্যবোধ নেই কেন? আমাদের চারপাশের এত শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি; এত চেতনা, প্রগতি, প্রযুক্তি এগুলো তাহলে করছেটা কী? এরা কি তবে সবই করছে শুধু মূল্যবোধটুকু তৈরি করা ছাড়া? আর এই মূল্যবোধের অভাবেই সবকিছু হয়ে উঠছে অর্থহীন?

আচ্ছা, মূল্যবোধ মানে কী? যারা বলছেন মূল্যবোধের সংকট তাঁরাই কি বুঝতে পারছেন তারা আসলে কীসের অভাব বোধ করছেন? তারা কি ভেতরের পরিশুদ্ধির অভাব বোধ করছেন? তাদের কি মনে হচ্ছে, মানুষের ভেতরটা পচেগলে গেছে? বাইরের সভ্য-ভদ্র পোষাকী মানুষটা ভেতরে ভেতরে পঙ্কিল? অর্থের লোভ, ক্ষমতার মোহ, ভোগের লালসা- এই সব পঙ্কিলতায় মানুষের ভেতরটা কি হয়ে উঠেছে পূতিগন্ধময়? আর এরই প্রকাশ ঘটছে দুর্নীতি, হানাহানি, যৌন নিপীড়ন ইত্যাদি নানা উপায়ে? মূল্যবোধের অভাব বলতে যদি এই রিক্ততার উপলদ্ধিই আপনার মনে জেগে থাকে তাহলে বলব, আপনি সত্যের খুব কাছাকাছি অবস্থান করছেন?

আসলে সুনীতি ও সদগুণাবলী ছাড়া মানুষের কোনোই মূল্য নেই। মানুষ তো মানবীয় গুণাবলীর কারণেই মানুষ। আর তাই মানুষের সকল অর্জন ম্লান হয়ে যায় এই সদগুণাবলীর অভাবে। শুধু ম্লানই হয় না এই সুশিক্ষিত প্রশিক্ষিত বুদ্ধিমান প্রাণীটি তার চারপাশের সবার জন্য মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে ওঠে! কাজেই মানবসমাজেরও সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সদগুণাবলীর অধিকারী মানুষ।

এখন মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীকে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হচ্ছে, আপনার শিক্ষা-কারিকুলাম ও শিক্ষা-ব্যবস্থায় সদগুণাবলীসম্পন্ন মানুষ গড়ে তোলার কী কী উপাদান আছে। একটি দৈনিকের রির্পোট অনুযায়ী শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, ‘কিন্তু কুলাঙ্গার ঢুকে পড়েছে শিক্ষকতার মহান পেশায়!এই ঢুকে পড়ারতত্ত্বটা এবার ছাড়ন তো। শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি সবক্ষেত্রেই কিন্তু এই এক তত্ত্বের নির্বিচার ব্যবহার চলছে- ঢুকে পড়েছে! কে ঢুকে পড়েছে? কোত্থেকে এসে ঢুকে পড়েছে? এখানে চারপাশে তো ঢুকেপড়াদেরই দেখতে পাচ্ছি। বিভিন্ন ক্ষেত্রে কিছু ঈমানদার নীতিবান মানুষ যারা আছেন তারা তো কোণঠাসা হয়েই আছেন। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এখন সব অঙ্গনে ঢুকেপড়াদেরই স্বর্গরাজ্য। অন্যরা অবাঞ্ছিত। আসলে ঢুকে পড়া টড়ার ব্যাপার নয়। এখানে গলদ আছে গোড়াতেই। ঐ যেটা একটু আগে বলেছেন, মূল্যবোধের দরকার, এইটাই হচ্ছে খাঁটি কথা। কাজেই ভেতরের এই পচন রোধের উপায় সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে।

আমাদের কাছ থেকে যদি শুনতে চান তাহলে একটু ধৈর্য্য ধরে শুনতে হবে আর শোনার পরই উত্তেজিত না হয়ে একটু ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তাও করতে হবে। শুনুন- ভেতরের এই পচন রোধ করার উপায় হচ্ছে ঈমান ও তাকওয়া। জী, বিশ্বাস ও  খোদাভীতি। এই জিনিসের চর্চা ও বিস্তার ছাড়া কোনোভাবেই সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। সারা জীবন যেই বন্ধুরা বাম দর্শনের আয়নায় জগতের সব সমস্যার বর্ণ নির্ণয়ের চেষ্টা করেছেন তাদের ঐ বর্ণবাদী আয়নাটা একটু নামিয়ে রাখতে হবে। ধর্ম ও নৈতিকতার প্রশ্ন এলেই যাদের সেক্যুলারীয় অহং জেগে ওঠে তাদেরও একটু সংযত হতে হবে। এরপর সবাইকে মুক্ত মনে চিন্তা করতে হবে যে, ঈমান ও ইসলামের পথে যদি সমাজের এই পচন রোধ করা যায় তাহলে কেন নয়?

এই সমাজের সিংহভাগ মানুষ মুসলিম, এদের মনের নিভৃত কোণে এখনো আছে খোদাভীতির কণিকা। আছে ইসলাম ও ইসলামের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধার সুষুপ্ত অনুভূতি। এটি অনেক বড় সম্পদ। সংশোধনের অনেক বড় হাতিয়ার। খোদাভীতির কণিকাটুকু যদি ফুঁ দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া যায়, হৃদয়ের সুষুপ্ত নবীপ্রেম যদি শিক্ষায়-সান্নিধ্যে জাগিয়ে দেয়া যায় তাহলে খুব সহজেই বড় বড় সমস্যার সমাধান হতে পারে। মানুষ যদি উপলদ্ধি করতে শেখে যে, আমি মুসলিম, আর এই কাজটি গুনাহ, না এই গুনাহের কাজ আমি করব না, তখনই অনাচার রোধের সকল আয়োজন সফল হতে পারে।

বাইরের পরিবেশে অর্থাৎ শিক্ষা-দীক্ষায়, সাহিত্য-সংস্কৃতিতে, সামাজিক জীবনাচারে যদি ঈমানী চেতনা বিকাশের এবং ইসলামী বিধি-বিধান সম্পর্কে সচেতনতার উপাদান থাকে, তাহলে জাতির অন্তরে ঈমানের যে চেতনা ঘুমন্ত রয়েছে তা আবার সজাগ হবে এবং একমাত্র এই শক্তিই পারবে, আল্লাহর ইচ্ছায়, মানুষকে আবার মানুষকরে তুলতে। দেখার ইচ্ছে থাকলে চারপাশে এর বাস্তব উদাহরণও যে একেবারেই নেই তা নয়।

ঈমানী চেতনা বিস্তারের প্রসঙ্গ এলেই অনেকের উপর জঙ্গিবাদের জুজু সওয়ার হয়। অতিসম্প্রতি এমন কিছু ঘটনা যদিও ঘটে গেছে, যা সাধারণ জনগণের জন্য শঙ্কা ও উদ্বেগের কারণ হয়েছে। কিন্তু এই সকল ঘটনার বিভিন্ন দিক বরাবরই অস্পষ্ট থেকেছে। আমরা আগেও বলেছি, এখনও বলছি, এরও কারণ সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ ইসলামী জ্ঞানের অভাব এবং আরো কিছু বিষয়। এটা রোধ করতে হলে স্কুল-কলেজ ও ভার্সিটি সর্বস্তরে ইসলামী শিক্ষা বিস্তারের উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ বাস্তবতা হচ্ছে, ধর্ম-অধর্ম যে নামেই হোক সন্ত্রাস ও জুলুম রোধ করার বিকল্পহীন উপায় হচ্ছে ঈমানী চেতনা ও সঠিক ধর্মীয় জ্ঞানের বিস্তার।

একই সাথে মুসলিম জনগণের ধর্মীয় চেতনার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং উসকানী ও অবমাননামূলক কথা-কাজ থেকে বিরত থাকাও কর্তব্য। শুধু শঙ্কা ও অনুমান দ্বারা তো সমস্যার সমাধান হবে না।

অন্যরা বুঝুক বা না বুঝুক দায়িত্বশীলদের তো বুঝতে হবে যে, ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা এবং যথার্থ দ্বীনী জ্ঞানের বিস্তারের মাধ্যমেই সর্ব প্রকারের অন্যায়, অবিচার রোধ করা যেতে পারে।

 

আবারও মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর ঐ কথাটিতে ফিরে যাচ্ছি, আমাদের মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষক দরকার। সঠিক অর্থে এই কথার সাথে আমরাও একমত। দেশের আলিম-উলামা ও দ্বীনদার শ্রেণির সকল দাওয়াতী তৎপরতার উদ্দেশ্যও তাই- সর্বস্তরের মুমিনের মাঝে ঈমানী চেতনা ও মূল্যবোধ জাগ্রত করা। দয়াময় আল্লাহ এই উপলদ্ধিটুকু যখন দান করেছেন তখন এই প্রার্থনাও করি যে, মূল্যবোধের সঠিক অর্থ ও তা সৃষ্টির সঠিক উপায় সম্পর্কেও যেন আমাদের দায়িত্বশীলেরা সঠিক বোধপ্রাপ্ত হন- আমীন।

আরও পড়ুন:   অনৈতিকতা | দ্বীনিয়াত

কুরআন মজীদ ও সহীহ হাদীসের আলোকে মাহে রমযান