জুমাদাল উখরা ১৪৩৮ . মার্চ ২০১৭

পুরোনো সংখ্যা . বর্ষ: ১৩ . সংখ্যা: ০৩

কারা সন্ত্রাসী? কারা চরমপন্থী?

আমাদের চরমপন্থী বানানোর জন্য কত কিছুই না করা হল, কিন্তু আমরা মধ্যপন্থীই আছি, মধ্যপন্থীই থাকব। কারণ, আমরা ঐ জাতি, যাদেরকে উম্মাতুন ওয়াসাতুন-মধ্যপন্থী জাতি বলা হয়েছে। এ জাতির আকীদা-বিশ্বাস, আমল-ইবাদত, চিন্তা-চেতনা, সংস্কৃতি ও রাজনীতি সবকিছুতেই মধ্যপন্থা সদা বিরাজমান। না তারা মুশরিকদের মত বাহ্যপূজারী, না বৈরাগ্যবাদীদের মত দুনিয়া-বিমুখ। না ইহুদীদের মত নবীগণের অসম্মানকারী, না খ্রিস্টানদের মত নবীকে আল্লাহর পুত্র সাব্যস্তকারী।

না তারা যুদ্ধ-বিগ্রহকে মনে করে সকল বিবাদের একমাত্র সমাধান, না তীর-বন্দুককে অস্পৃশ্য মনে করে। না তারা দুনিয়াকে দ্বীনের উপর প্রাধান্য দেয়, না দ্বীনের কারণে দুনিয়া সম্পূর্ণ বর্জন করে। তাদের তো ভারসাম্য ও মধ্যপন্থার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। আর প্রতি যুগে এ শিক্ষাকে তারা নিজেদের কর্মপন্থা হিসেবে গ্রহণ করেছে।

মুসলিমদের উন্নতি-অগ্রগতি, সমৃদ্ধি ও বিজয়ের যুগ তো দূরের কথা, যে যুগকে তাদের অধঃপতন, অবক্ষয়, পরাজয়, ইসলামী আদর্শ ও দ্বীনী ইলম থেকে দূরে সরে যাওয়ার যুগ বলা হয়; সে যুগেও আপনি ঐ যুলুম দেখতে পাবেন না, যা পশ্চিমাদের পরিচয়-চিহ্ন; না লাশের সারি, না মাথার খুলির স্তুপ, না ইবাদতখানা ও পবিত্র কিতাবসমূহের অসম্মান, না নবীগণের অবমাননা। আর না ধর্ম-পরিবর্তনের জন্য জোর-যুলম।  অথচ মুসলিমদের চরমপন্থার দিকে ধাবিত করার জন্য উপরোক্ত সব কিছুই তাদের সাথে করা হয়েছে।

একটি বিড়ালের উপর যদি তার চেয়ে দশগুণ বেশি শক্তিধর কুকুর আক্রমণ করে, তো প্রাণরক্ষার জন্য ঐ দুর্বল বিড়ালও কঠিন মূর্তি ধারণ করে, নিজেকে রক্ষার জন্য যা করা প্রয়োজন করে। একে তো তার চরমপন্থা ও উগ্রপন্থা বলা যায় না। চরপন্থী তো সে যে দুর্বলের প্রতি যুলুম করে, অন্যায় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে তাদেরকে ক্ষেপিয়ে তোলে, তাদের সন্তানদের উঠিয়ে নিয়ে যায়, তাদের নারীদের ইজ্জত-আব্রু ভূলুণ্ঠিত করে এবং নিজ ভূমিতে তাদেরকে উদ্বাস্তু বানিয়ে ফেলে।

যদি বিড়ালের মত দুর্বল এক প্রাণীরও নিজেকে ও নিজ সন্তানদের রক্ষা করার অধিকার থাকে তাহলে মুসলিমদের কেন থাকবে না আত্মরক্ষার অধিকার? আর একেই কেন আখ্যা দেওয়া হবে চরমপন্থা ও উগ্রপন্থা বলে?

চরমপন্থী তো তারা, যারা মুসলমানদের সমুদ্রপথ অন্যায়ভাবে দখল করে রেখেছে। যারা মুসলিম ভূখ-গুলোর খনিজ সম্পদ লুট করছে।

চরমপন্থী তো তারা, যারা বিভিন্ন ক্যাম্পে আটকেপড়া ফিলিস্তিনীদের মৃত ও হারাম প্রাণীর গোস্ত ভক্ষণ করতে বাধ্য করেছে। যারা ফিলিস্তিনীদের ভিটেমাটি হারা করেছে। জেলে বন্দী করে নির্যাতনের স্টীম রোলার চালিয়েছে।

চরমপন্থী তো তাদেরকে বলতে হবে, যাদের অন্যায় অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে ১৫ লাখ ইরাকী শিশু ক্ষুধা ও চিকিৎসার অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরেছে। যাদের জ্বালানো আগুনে আজও জ্বলছে বসরা ও কূফা, কারবালা ও বাগদাদ।

যারা রাসায়নিক অস্ত্রের মিথ্যা অজুহাতে ইরাকের যমীনে হাজার হাজার টন বোমা বর্ষণ করেছে; তামা তামা করে দিয়েছে ইরাকের সবুজ ভূমি।

যারা ইরাকী জনগণকে সাদ্দামের গোলামী থেকে মুক্তি দিতে এবং ইরাকবাসীকে গণতন্ত্রের নিআমতে সৌভাগ্যশালী করতে এক নাটকের অবতারণা করেছে। যা ছিল নিআমতের নামে আযাব এবং মুক্তির নামে গোলামীর পরওয়ানা।

সন্ত্রাসী তো তারা, যারা একজন ব্যক্তিকে বাহানা বানিয়ে গোটা আফগানিস্তানকে তছনছ করে দিয়েছে এবং আফগানিস্তান কবজা করার পর আফগানীদের সাথে ভেড়া-বকরীর চেয়েও নিকৃষ্ট আচরণ করেছে। পৈশাচিক নির্যাতন করেছে। তাদেরকে কন্টেইনারে ভরে তপ্ত মরুভূমিতে ছেড়ে দিয়েছে; যেখানের ভূমি উত্তপ্ত তাওয়ার চেয়েও গরম, সূর্য যেখানে আগুনের বৃষ্টি ঝড়ায়। উত্তপ্ত কন্টেইনারে বন্দী বনী আদম তাপ-যন্ত্রণায় গগণবিদারী চিৎকার করেছে, পানির পিপাসায় ছটফট করেছে। তড়পাতে তড়পাতে মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছে; কিন্তু মাযলুমের আর্তনাদে সন্ত্রাসী-হৃদয় একটুকুও গলেনি।

চরমপন্থী তো তারা, যারা মুসলিম দেশগুলোকে কুকুরের সাথে উপমা দিয়েছে এবং তাদের পবিত্র ধর্ম-গ্রন্থের অবমাননা করেছে। আর এ তাদের জাতীয় ঐতিহ্য। কারণ, এ ধরনের অবমাননাকর ও উস্কানিমূলক কর্মকা- এ-ই  প্রথম নয়। বরং অনেকবার তারা এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে এবং ঘটিয়ে চলেছে। এমনকি মুসলিম মুজাহিদদের ক্ষেপিয়ে তোলার জন্য যাঁকে তারা পৃথিবীর সকল মানুষ থেকে, বরং নিজেদের প্রাণ থেকেও বেশি ভালোবাসে- তাঁকেও গালি দিয়েছে। কখনো সালাহুদ্দীন আইয়ূবীর মত মহান বীর মুজাহিদকে গালি দিয়েছে।

কখনো ইহুদী সৈন্য মুসহাফের উপর পা রেখে -নাউযু বিল্লাহ- মাযলুম মুসলিম বন্দীদের হৃদয় ক্ষতবিক্ষত করেছে আর বলেছে- ডাক তোদের রবকে, পারলে রক্ষা করুক তোদের!

ইহুদী-খ্রিস্টানরা নানা উপায়ে আমাদেরকে চরমপন্থার দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু মুসলিমরা সে পথ প্রত্যাখ্যান করেছে। না আমরা ইহুদী-খ্রিস্টানদের শিশুদের ক্ষুৎ পিপাসায় আক্রান্ত করেছি; না তাদের যুবকদের মৃত প্রাণী ভক্ষণে বাধ্য করেছি। না তাদের সম্মানিত ব্যক্তিত্বদের গালি দিয়েছি; আর না তাদের ধর্ম-গ্রন্থের অবমাননা করেছি।

কারণ, সর্বাবস্থায় আমাদের মধ্যপন্থা অবলম্বন করেই চলার তাকীদ করা হয়েছে। ইসলামের সঠিক জ্ঞান যাদের রয়েছে তারা জানেন, সন্ত্রাসী ও চরমপন্থীদের প্রতিহত করার জন্য ইসলামে যে জিহাদের বিধান সেটাও মধ্যপন্থা।

ইনশাআল্লাহ, আমরা আমরণ মধ্যপন্থা অবলম্বন করেই চলব।

 

[লেখকের কলাম-সমগ্র- গরীবে শহর কি এল্তেজা, পৃ. ১৩২-১৩৫ থেকে

ভাষান্তর : মুহাম্মাদ ফজলুল বারী]

আরও পড়ুন:   অনৈতিকতা | অপসংস্কৃতি | আদব-শিষ্টাচার | ইসলামের সৌন্দর্য-মাধুর্য | দ্বীনিয়াত

কুরআন মজীদ ও সহীহ হাদীসের আলোকে মাহে রমযান