জুমাদাল উখরা ১৪৩৮ . মার্চ ২০১৭

পুরোনো সংখ্যা . বর্ষ: ১৩ . সংখ্যা: ০৩

একটি বই, একটি চিঠি : আযান ও ইকামত

(পূর্ব প্রকাশিতের পর) 

দলীল-

হযরত বেলাল রাযি. জোড়া জোড়া বাক্যে ইকামত দিতেন

জোড়া বাক্যে ইকামত : হাদীস-

বিখ্যাত তাবিঈ হযরত আসওয়াদ ইব্ন ইয়াযীদ রাহ. বলেন :

أَنَّ بِلَالاً كَانَ يُثَنّي الْاَذَانَ وَيُثَنّي الْإِقَامَةَ

অর্থাৎ বেলাল রা. আযানের বাক্যগুলো দুইবার করে বলতেন এবং ইকামতের বাক্যগুলোও দুইবার করে বলতেন। (মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক, হাদীস নং ১৭৯০;  দারা কুতনী, হাদীস নং ৯৪০) দারা কুতনী মূলত আব্দুর রাযযাকের সূত্রে হাদীসটি তাঁর সুনান গ্রন্থে সন্নিবেশিত করেছেন। আর আব্দুর রাযযাক হাদীসটি বর্ণনা করেছেন মামারের সুত্রে । বলেছেন :

اَخْبَرنَا مَعْمَرٌ عَنْ حَمَّادٍ عَنْ اِبْرَاهِيْمَ عَنِ الْأَسْوَدِ بْنِ يَزِيْدَ.

আব্দুর রাযযাক আরেকটি সনদে আসওয়াদ ইব্ন ইয়াযীদ হতে বর্ণনা করেন যে, বিলাল রা.-এর  আযান ও ইকামত ছিল দুইবার দুইবার করে। সনদ ও হাদীসের বাক্যটি এইরূপ :

عَنِ الثَّوْرِي عَنْ أَبِي مَعْشَرٍ عَنْ اِبْرَاهِيْمَ عَنِ الْأَسْوَدِ عَنْ بِلَالٍ قَالَ كَانَ أَذَانُهُ وَ إِقَامَتُهُ مَرَّتَيْنِ مَرَّتَيْنِ.

অর্থাৎ সুফইয়ান ছাওরী আবূ মাশার থেকে, আবূ মাশার ইবরাহীম থেকে এবং ইবরাহীম আসওয়াদ থেকে বর্ণনা করেন, আসওয়াদ বিলাল রা. থেকে বর্ণনা করেন যে, বিলালের আযান ও ইকামত ছিল দুইবার দুইবার করে।

 

আসওয়াদ ইব্ন ইয়াযীদের হাদীসের উপর উত্থাপিত আপত্তি ও পর্যালোচনা

 মুযাফফর বিন মুহসিন সাহেবগণ এই হাদীসের উপর ইন্টারনেটে যে আপত্তিগুলো ছেড়ে দিয়েছেন তা হল, বিশ্লেষণ-৮ (ক) আসওয়াদ ইব্ন ইয়াযীদ তাবেঈ ছিলেন। তিনি নবী (স) এর যামানা পাননি। আর বিলাল (রা) নবী (স) এর যামানার পরে আযান দেননি। এরপর আপত্তিকারী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরে বিলাল রা. কর্তৃক আযান না দেওয়ার দাবির সমর্থনে ইব্ন হাযম রাহ.-এর একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। এরপর বলেছেন, অর্থাৎ আসওয়াদের পক্ষে বিলালের আযান শোনার সুযোগ ঘটেনি। অথচ বর্ণনাটি থেকে মনে হয় তিনি আযান শুনেছেন। তাছাড়া সহীহ মুসলিমে সহীহ সনদে এর বিপরীত হাদীস বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং বিতর্কিত এই হাদীসটি সহীহ হাদীসের মুকাবেলায় গ্রহণযোগ্য নয়।

(খ) এর সনদে ইবরাহীম (নাখয়ী মুদাল্লিস। যে ভাবে ইমাম হাকেম সুস্পষ্ট করেছেন। (তাবাকাতুল মুদাল্লিসীন পৃ. ২৮) তাঁর থেকে বর্ণিত সনদটিতে আনআনাহ আছে। সুতরাং হাদীসটি যঈফ।

(গ) হাম্মাদ (বিন আবী সুলায়মান) মুতাকাল্লাম ফীহ (বিতর্কীত) রাবী ও ইখতিলাতকারী (বর্ণনাতে হেরফেরকারী) ইমাম হায়সামী রাহ. বলেছেন : এটা সুস্পষ্ট যে, হাম্মাদ থেকে ইমাম সুফিয়ান সাওরী, ইমাম শুবা ও দাস্তাওয়ায়ির বর্ণনা স্মৃতিশক্তি নষ্ট হওয়ার পূর্বে শোনা। অন্যান্যদের শোনাটা ইখতিলাতের পরবর্তীতে ঘটেছে। (মুজমাউয যাওয়ায়েদ ১/১২৪ পৃ: অথচ এই বর্ণনাটি উক্ত তিনজনের কেউ নেই।

সুস্পষ্ট হল, সনদটি মুরসাল, তাদলীসের ত্রুটিযুক্ত ও হাম্মাদের ভুল হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। যার অপর একটি প্রমাণ হল, বর্ণনাটি সহীহ মুসলিমের বিরোধী।

 

বিশ্লেষণের বিশ্লেষণ

আপত্তিকারী লিখেছেন, আসওয়াদ ইব্ন ইয়াযীদ তাবেঈ ছিলেন। তিনি নবী (স) এর যামানা পাননি। আমি বলছি, হাঁ আসওয়াদ ইব্ন ইয়াযীদ তাবেঈ ছিলেন। সাহাবী ছিলেন না। কিন্তু তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যামানা পাননি- এই কথাটি ঠিক নয়। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যামানায় মুসলমান হয়েছেন কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাক্ষাৎ লাভ করতে পারেননি। এজন্যই তাঁকে বলা হয় মুখাদরাম। মুখাদরাম বলা হয় ঐ সকল ব্যক্তিকে যাঁরা রাসূলের যামানায় মুসলমান হয়েছেন, কিন্তু রাসূলের সাক্ষাৎ লাভ করতে পারেননি।

এরপর আপত্তিকারী লিখেছেন, অর্থাৎ আসওয়াদের পক্ষে বিলালের আযান শোনার সুযোগ ঘটেনি। অথচ বর্ণনা থেকে মনে হয় তিনি আযান শুনেছেন।

আমি বলছি, না বর্ণনা থেকে তা মনে হয় না। বর্ণনার কোথাও এরকম কোনো ইঙ্গিত আসওয়াদ ইবন ইয়াযীদ দেননি। তিনি শুধু একটি ঘটনার বিবরণ দান করেছেন যে, বিলাল রা. আযান ও ইকামতের কালিমাগুলো দুবার দুবার করে বলতেন। এটি একটি সংবাদ। কোনো সংবাদদাতা কর্তৃক একটি সংবাদদান এটা প্রমাণ করে না যে, সংবাদদাতা ঐ সংবাদ নিজে দেখে বা শুনে সংবাদ দিচ্ছেন বলে দাবি করছেন। সংবাদদাতা ঘটনা নিজে দেখে বা শুনেও সংবাদ দিতে পারেন, আবার অন্য কোনো সূত্রে জেনে বা শুনেও সংবাদ দিতে পারেন। সংবাদদাতা কীভাবে ঘটনাটি জানলেন বা শুনলেন তা বুঝা যাবে পারিপার্শ্বিক লক্ষণাবলী দ্বারা। আসওয়াদ ইব্ন ইয়াযীদ বিলাল রা. কর্তৃক আযান ও ইকামতের কালিমাগুলো দুবার দুবার করে বলার বিষয়টি কার কাছ থেকে শুনলেন বা জানলেন সে আলোচনায় পরে আসছি।

এরপর আপত্তিকারী লিখেছেন, তাছাড়া সহীহ মুসলিমে সহীহ সনদে এর বিপরীত হাদীস বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং বিতর্কিত এই হাদীসটি সহীহ হাদীসের মুকাবেলায় গ্রহণযোগ্য নয়। আমি বলছি, এই একই গান তিনি সবজায়গাতেই গেয়ে গেছেন। জোড়া বাক্যে ইকামতদান সংক্রান্ত সব হাদীসের ক্ষেত্রেই তিনি এই গান গেয়েছেন। কাজেই এ সম্পর্কে আমার বক্তব্য পরেই ব্যক্ত করতে চাই।

(খ) চিহ্নযুক্ত দফায় আপত্তিকারী ইবরাহীম নাখাঈকে মুদাল্লিস বলেছেন। আপত্তিকারীর দাবি হল, ইবরাহীম নাখাঈ যেহেতু মুদাল্লিস এবং তিনি আন দ্বারা হাদীস বর্ণনা করেছেন সেহেতু তাঁর কর্তৃক বর্ণিত হাদীসটি যঈফ।

 

ইবরাহীম নাখাঈ মুদাল্লিস এবং তাঁর মুআনআন হাদীস যঈফ?

মুহতারাম, এবার বুঝুন এরা নিজেদের মত প্রমাণ করতে কী রকম জালিয়াতির আশ্রয় নেয়? অথবা বুঝুন এদের জ্ঞানের দৌড় কতটুকুন? কারণ, প্রথমত তাহকীক ও গবেষণা-নির্ভর কথা হল, ইবরাহীম নাখাঈর ব্যাপারে মুদাল্লিস হওয়ার দাবি সন্দেহযুক্ত। দেখুন, ‘মুজামুল মুদাল্লিসীন মুহাম্মাদ বিন তালআত, পৃষ্ঠা ৭৬। দ্বিতীয়ত এই দাবি ঠিক ধরে নেওয়া হলেও তিনি দ্বিতীয় স্তরের মুদাল্লিস। আর দ্বিতীয় স্তরের মুদাল্লিস হলেন তাঁরা  যাঁদের তাদলীসকে মুহাদ্দিসগণ সহনীয় বলে জ্ঞান করেছেন এবং যাঁদের হাদীসকে তাঁরা তাঁদের কিতাবে সন্নিবেশিত করেছেন। এ সম্পর্কে পূর্বে আমি আমাশের উপর একই জাতীয় আপত্তির জবাবে মুদাল্লিস রাবীর স্তরভেদ শিরোনামে আলোচনা করে এসেছি। ইবরাহীম নাখাঈর মুআনআন হাদীস যদি যঈফ হয় তাহলে বুখারী ও মুসলিমের বহু হাদীসকে যঈফ বলতে হবে। আর তখন বুখারী ও মুসলিমকে আল জামে আস্সহীহ বিশেষণে বিশেষায়িত করতে পারবেন না। কারণ, মাশ, ইবরাহীম নাখাঈসহ বেশ কিছু মুদাল্লিস রাবীর মুআনআন বর্ণনা তাঁরা তাঁদের কিতাবে স্থান দিয়েছেন। শুধু আমাশের মুআনআন বর্ণনাই বুখারী ও মুসলিম শরীফে আছে পাঁচ শতাধিক।

 আর ইবরাহীমের মুআনআন বহু বর্ণনা বুখারী শরীফে ইমাম বুখারী বর্ণনা  করেছেন। নমুনা স্বরূপ  দেখুন ৩২, ১২৫, ৪০৯ নং হাদীস। আলোচ্য সনদের এই যে আসওয়াদ ইব্ন ইয়াযীদ, তাঁর  থেকেই ইবরাহীম নাখাঈর মুআনআন বর্ণনা বুখারী শরীফে বহু দেখতে পাবেন। উদাহরণত দেখুন ২৭১, ২৯৯, ৫০৮ ৬৭৬ নং হাদীস। এই নাম্বারগুলো দেওয়া হল নমুনা স্বরূপ। আরও বহু হাদীস আপনি দেখতে পাবেন যেগুলো ইবরাহীম নাখাঈর মুআনআন বর্ণনা, এবং যেগুলোকে ইমাম বুখারী তাঁর কিতাবে সন্নিবেশিত করেছেন। মুযাফফর বিন মুহসিন সাহেবরা আন্তর্জাতিক কোনো চক্রের খপ্পরে পড়েছেন কি না জানি না। নতুবা এরকম মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য কোনো আলেমেদ্বীন পরিবেশন করতে পারে বলে বিশ্বাস করা যায় না। 

 

হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমান সম্পর্কে আপত্তিকারীর আপত্তি নিয়ে আলোচনা

এরপর আপত্তিকারী (গ) চিহ্নযুক্ত দফায় আলোচ্য হাদীসটির সনদের একজন রাবী হাম্মাদ ইবনে আবী সুলায়মান সম্পর্কে দুটি কথা বলেছেন, এক : তিনি মুতাকাল্লাম ফীহ (বিতর্কীত) রাবী। দুই : তিনি ইখতিলাতকারী (বর্ণনাতে হেরফেরকারী)। দ্বিতীয় কথাটির পক্ষে তিনি আল্লামা হায়সামীর মন্তব্য উদ্ধৃত করেছেন।

আমার বক্তব্য হল, ‘মুতাকাল্লাম ফীহ বলে আপত্তিকারী কী বুঝাতে চেয়েছেন তা স্পষ্ট করেননি। আপত্তিকারীর মনে রাখা উচিত যে, বুখারী ও মুসলিম শরীফে বহু রাবী আছেন, যাঁরা মুতাকাল্লাম ফীহ। মুতাকাল্লাম ফীহ হলেই রাবী যঈফ হয়ে যায় না। আর আপত্তিকারী দ্বিতীয় বিশেষণ ব্যবহার করেছেন যে, তিনি ইখতিলাতকারী (বর্ণনায় হেরফেরকারী)।

প্রথম কথা হল, হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমান রাহ.-এর বিষয়ে ইখতেলাত-এর দাবিটাই ভুল। বিস্তারিত সামনে বলছি।

দ্বিতীয়ত, আপত্তিকারী ইখতিলাতের যে অর্থ করেছেন তা একেবারেই ভুল। বাংলা ভাষায় হেরফের করা দ্বারা কোনো কিছুতে ইচ্ছাকৃত রদবদল করাকে বুঝায়। অথচ হাম্মাদ বিন আবী সুলাইমানের ব্যাপারে সবাই একমত যে তিনি صَدُوْقُ اللِّسَانِ  (সত্যভাষী) ছিলেন।

সাধারণ পরিভাষা হিসেবে ইখতেলাত হল বার্ধক্য বা অসুস্থতার কারণে স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়ার ফলে তার বর্ণনাগুলোর ইয়াদ বা স্মরণ দুর্বল হয়ে যাওয়াতে ক্ষেত্রবিশেষে বর্ণনার ক্ষেত্রে মুশাব্বাহ লেগে যাওয়া বা বিভ্রম সৃষ্টি হওয়া। আর সে কারণে বিভিন্ন ভুল সৃষ্টি হওয়া। এ ভুল সামান্য পরিমানে হলে বর্ণনাকারীকে দুর্বল বলা যায় না। বেশি পরিমানে হলে বা মারাত্মক ধরনের একাধিক ভুল হয়ে থাকলে তখন বর্ণনাকারীর সে সকল ছাত্রের বর্ণনা গ্রহণ করা হয় যারা বর্ণনাকারীর এ নতুন অবস্থা সৃষ্টির পূর্বে তার কাছ থেকে হাদীস সংগ্রহ করেছেন।

বুঝা গেল, বর্ণনাকে হেরফের করার নাম ইখতেলাত নয়। বরং ইখতিলাত হল, বর্ণনাতে মুশাব্বাহ লেগে যাওয়ার কারণে তাতে কোনো ভুল হয়ে যাওয়া।

এতো হল ইখতিলাতের ব্যাখ্যা কিন্তু হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমান এর ব্যাপারে ইবনে সাদ এমন মত ব্যক্ত করে থাকলেও তা দলীলনির্ভর নয়। হাম্মাদ বিন আবী সুলাইমান রাহ. বার্ধক্যে পৌঁছার পূর্বেই ইন্তেকাল করে যান।  শামসুদ্দীন যাহাবী রাহ. লিখেছেন,

مات كهلا رحمه الله

 আরো লিখেছেন,

وليس هو بالمكثر من الرواية لأنه مات قبل أوان الرواية.

(সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ- : ৫, পৃষ্ঠা : ২৩১-২৩৭, মুআসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত)

তৃতীয়ত (হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমান ইখতিলাতকারী) এইভাবে বিশেষণ ব্যবহারের দ্বারা বুঝা যায় যে, ইখতিলাত হাম্মাদ ইবনে আবী সুলায়মানের সবসময়কার বৈশিষ্ট্য ছিল, এটা তাঁর চিরদোষ ছিল। অথচ আপত্তিকারী  এর পক্ষে হায়সামীর যে কথাকে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন এ দ্বারা তা বুঝা যায় না। হায়সামীর কথা দ্বারা বুঝা যায় যে, হাম্মাদ ইবনে আবী সুলায়মান জীবনের শেষ দিকে ইখতিলাত দোষের শিকার হয়েছিলেন। এজন্যই তো হায়সামী বলেছেন, যাঁরা তাঁর কুদামা (প্রবীণ) শাগরিদ তাঁদের রেওয়ায়েত গ্রহণযোগ্য। তাঁরা হলেন, শুবা, সুফইয়ান সাওরী ও হিশাম আদ দাসতাওয়াঈ। যদি ইখতিলাত তাঁর সবসময়কার বৈশিষ্ট্য হয়ে থাকে তাহলে তাঁর থেকে  কুদামাদের রেওয়ায়েতই বা কেন গ্রহণযোগ্য হবে? সকলের রেওয়ায়েতই তো অগ্রহণযোগ্য হওয়ার কথা।

হাম্মাদ ইব্ন আবী সুলায়মানকে আপত্তিকারী মুতাকাল্লাম ফীহ (বিতর্কিত) রাবী বলেছেন। তাঁর কারণ সম্ভবত এই যে, তাঁর সম্পর্কে নেতিবাচক ও ইতিবাচক উভয় ধরনের বক্তব্য পাওয়া যায়। তবে র্জাহ ও তাদীলের কিতাব ও আসমাউর রিজালের কিতাবসমূহ পাঠ করে আমি বুঝতে পেরেছি যে, তাঁর সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্যের কারণ ছিল এই যে, তাঁর সম্পর্কে কারও কারও ধারণা ছিল যে, তিনি মুরজিয়া ছিলেন। কিন্তু মুরজিয়া হলেও তাঁর রেওয়ায়েত গ্রহণযোগ্য। কারণ, তিনি সত্যবাদী ছিলেন। এজন্যই শুবাকে যখন জিজ্ঞেস করা হল,

لِمَ تَرْوِيْ عَنْ حَمَّادٍ بْنِ أَبِيْ سُلَيْمَانَ وَكَان مُرْجِئًا؟

(আপনি হাম্মাদ ইব্ন আবী সুলাইমান থেকে কেন রেওয়ায়েত করেন, অথচ সে ছিল মুরজিয়া?)। উত্তরে শুবা বললেন, كَانَ صَدُوْق اللِّسَانِ  (তিনি সত্যভাষী ছিলেন)।[1]আরেকটি কারণেও তাঁর সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করা হয়েছে। সেটি হল, তিনি অধিক পরিমাণে ফিকহের চর্চা করতেন। শুবা তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, كَانَ أَحْفَظَ مِنَ الْحَكَمِ  (হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমান ছিলেন হাকাম অপেক্ষা অধিক স্মৃতিশক্তির অধিকারী।) আবার অপর বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, শুবা বলেছেন, كَانَ لَايَحْفَظُ (তিনি হিফজ রাখতেন না)। শুবার বাহ্যত পরস্পরবিরোধী এই কথার ব্যাখ্যায় কেউ কেউ এই কথাই বলেন যে, তিনি হাদীসের তুলনায় ফিকহের প্রতি অধিক মনোযোগী ছিলেন। ফিকহের তুলনায় হাদীসের প্রতি মনোযোগী কম ছিলেন। ফলে ফিকহের তুলনায় তাঁর হাদীসের হিফজ অপেক্ষাকৃত কম ছিল। তাঁর সংরক্ষিত হাদীসের পরিমাণ ফিকহ-ফতোয়ার চেয়ে কম ছিল। শুবার كَانَ لَا يَحْفَظُ  কথাটির অর্থ এই নয় যে, তাঁর স্মৃতিশক্তি  দুর্বল ছিল।

আর সম্ভবত এই সবকিছুকে বিবেচনায় নিয়েই  ইয়াহইয়া ইব্ন মাঈন, ইমাম নাসাঈ, আল্লামা ঈজলী তাঁকে ছিকাহ বলে মত প্রকাশ করেছেন। এমনকি ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমানকে আবূ মাশার  যিয়াদ ইবনে কুলাইব অপেক্ষা এগিয়ে রেখেছেন। বলেছেন, حَمَّاد بْنُ أَبِيْ سُلَيْمَان يُقَدَّمُ عَلَى أَبِي مَعْشَرٍ  (অর্থাৎ হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমান আবূ মাশারের চেয়ে অগ্রগামী।) আর এই যিয়াদ ইবনে কুলাইব ছিলেন হাফেজ, মুতকিন। তাহলে বুঝুন হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমান কী পরিমাণ ছিকাহ ছিলেন। তারীখুস সিকাত গ্রন্থে আল্লামা ইজলী বলেছেন, كُوْفِيٌ ثِقَةٌ كَانَ أَفْقَهَ أَصْحَابِ إِبْرَاهِيْمَ  (অর্থাৎ হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমান কুফার অধিবাসী, ছিকাহ, তিনি ছিলেন ইবরাহীম নাখাঈর শাগরেদগণের মধ্যে সর্বাপেক্ষা অধিক ফিকহের অধিকারী।) 

বাকি রইল তাঁর ইখতিলাতের বিষয়টি। তো আগেই বলেছি যে, ইখতিলাত তাঁর চিরদোষ ছিলই না। যাঁরা তাঁর ব্যাপারে ইখতিলাতের দাবি করেছেন তাঁরা তাঁর শেষ বয়সে ইখতিলাত দোষের শিকার হওয়ার কথা বলেছেন। হতেই পারে। অনেক ছিকাহ রাবীই শেষ বয়সে ইখতিলাতের শিকার হয়েছিলেন। কিন্তু আগেই বলেছি হাম্মাদ বিন আবি সুলাইমান রাহ. তো ইখতিলাতের বয়সেই পোঁছেননি। আসলে যে রেওয়ায়েতগুলোতে কিছু ভুল দেখে তার ব্যাপারে ইখতিলাতের ধারণা করা হয়েছে সে ভুলগুলো মূলত হাম্মাদ রাহ. থেকে বর্ণনাকারীর পক্ষ থেকেই সংঘটিত হয়েছে। ইমাম শামসুদ্দীন যাহাবী রাহ.-এর ভাষায়-إِنَّمَا التَّخْلِيْطُ فِيْهَا مِنْ سُوْءِ حِفْظِ الرَّاوِيْ عّنْهُ(সিয়ারু আলামিন নুবালা, খ-: ৫, পৃষ্ঠা: ২৩৬)  আর এই যে বলা হল, হাম্মাদ থেকে তাঁর কুদামা বা প্রবীণ শাগরিদগণের রেওয়ায়েত গ্রহণযোগ্য এবং অতপর তাঁরা তাঁর কুদামা শাগরিদগণের যে তালিকা পেশ করলেন তা প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ, হাম্মাদের কুদামা শাগরিদদের তালিকায় মাত্র তিনজনের নাম উল্লেখ করে  বলা হয়েছে যে, এই তিনজন ছাড়া অন্যরা তাঁর থেকে ইখতিলাতের পরে শুনেছেন। প্রশ্ন হল, তাঁর কুদামা শাগরিদ কি শুধু এই তিনজনই? শুধু শুবা, সুফইয়ান ছাওরী আর হিশাম আদ দাসতাওয়াঈ? আর কেউ নাই? ইমাম আবু হানীফাও নাই? যিনি দীর্ঘ পঁচিশ বছরের বেশী তার সোহবতে ছিলেন। রাবীদের চরিতাভিধান তালাশ করে তো আমরা তাঁর আরও কুদামা শাগরিদের সন্ধান পাই। ইমাম আবূ হানীফা, মিস্আর ইব্ন কিদাম, সুলাইমান ইব্ন মিহরান আল আমাশ, হাকাম ইব্ন উতাইবাহ (রাহিমাহুমুল্লাহ) প্রমূখ রাবীগণ সকলেই হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমানের কুদামা শাগরিদ। এমনকি আলোচ্য হাদীসের রাবী মামারও তাঁর কুদামা শাগরিদদের একজন। দেখুন, তাঁদের প্রদত্ত তালিকার তিনজনের মধ্য হতে শুবা মৃত্যুবরণ করেছেন ১৬০ হিজরীতে। তিনি সপ্তম তাবাকার রাবী। সুফইয়ান ছাওরী মৃত্যুবরণ করেছেন ১৬১ হিজরীতে। তাঁর জন্ম ৯৭ হিজরীতে। তিনিও সপ্তম তাবাকার রাবী। অথচ ইমাম আবূ হানীফা জন্মগ্রহণ করেছেন ৮০ হিজরীতে এবং মৃত্যুবরণ করেছেন ১৫০ হিজরীতে। তিনি ষষ্ঠ তাবাকার রাবী। তো তিনি হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমানের কুদামা  শাগরিদদের তালিকাভুক্ত হলেন না কেন? তদ্রূপ মিস্আর ইব্ন কিদাম মৃত্যুবরণ করেন ১৫৩ হিজরীতে, মতান্তরে ১৫৫ হিজরীতে। তো তিনি সুফইয়ান ছাওরী অপেক্ষা ছয় বছর বা আট বছর পূর্বে ইন্তেকাল করেন। তিনিও সপ্তম তাবাকার রাবী। তিনি কেন হাম্মাদের কুদামা শাগরিদদের তালিকাভুক্ত হলেন না? আরও আশ্চর্যের বিষয় হল, সুলাইমান ইব্ন মিহরান আল আমাশও হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমান থেকে রেওয়ায়েত করেছেন, আর তিনি  জন্মগ্রহণ করেছেন ৬১ হিজরীর শুরুর দিকে এবং ইন্তিকাল করেছেন আটাশি বছর বয়সে ১৪৮ হিজরীতে। তিনি পঞ্চম তাবাকার রাবী। তো হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমানের কুদামা শাগরিদদের তালিকায় তাঁর নাম কেন ঠাঁই পেল না? তারপর দেখুন, হাকাম ইব্ন উতাইবাহ ষাট বছরের কিছু অধিক বয়স পেয়ে ১১৫ বা ১১৩  হিজরীতে ইন্তেকাল করেছেন। তিনিও ছিলেন পঞ্চম তাবাকার রাবী। আল্লামা যাহাবী আলকাশেফ গ্রন্থে তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, فَقِيْهُ الْكُوْفَةِ مَعَ حَمَّادٍ  (হাম্মাদের সঙ্গে কূফার ফকীহ ছিলেন) তিনিও হাম্মাদ ইব্ন আবী সুলাইমান থেকে রেওয়ায়েত করেছেন। তো তিনি কেন হাম্মাদের কুদামা শাগরিদদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলেন না? আর আলোচ্য হাদীসের রাবী মামার ৯৬ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন ১৫৪ হিজরীতে। তিনি ছিলেন সপ্তম তাবাকার রাবীদের মধ্যে অগ্রজ রাবীদের একজন। সুফইয়ান আর শুবা যদি হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমানের কুদামা শাগরিদ হয়ে থাকেন তাহলে মামার কেন কুদামা শাগরিদদের একজন হবেন না? এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদেরকে হয় বলতে হবে যে, তিনি ইখতিলাতের শিকার আদৌ হননি, অথবা বলতে হবে যে, তিনি ইখতিলাতের শিকার হয়ে থাকলেও তাঁর কুদামা শাগরিদগণের তালিকা তিনজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং তাঁর কুদামা শাগরিদগণের তালিকা আরও দীর্ঘ। যাঁদের মধ্যে আলোচ্য হাদীসের রাবী মামারও একজন।

 

হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমানের ইখতিলাত সম্পর্কে শেষ কথা 

এই দীর্ঘ আলোচনার পর বলতে চাই যে, হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমান ছিকাহ রাবী। তাঁর ইখতিলাত দোষের শিকার হওয়ার দাবিটি যুক্তির নিরিখে টেকে না। দেখুন, যাঁরা ইখতিলাত-দোষ সম্পন্ন রাবীদের তালিকা তৈরি করে স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেছেন তাঁরা তাঁদের ঐসব গ্রন্থে তাঁর নাম উল্লেখ করেননি। যেমন, বুরহানুদ্দীন আল হালাবী আবুল ওয়াফা ইবরাহীম ইব্ন মুহাম্মাদ বিন খলীল (মৃত্যু ৮৪১ হিজরী) একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন أَلْإِغْتِبَاطُ بِمَنْ رُمِيَ مِنَ الرُّوَاةِ بِالْاِخْتِلَاطِ নামে। এই গ্রন্থে হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমানের নাম নাই। তদ্রূপ, আল্লামা আলাঈ মুখতালিত রাবীদের তালিকা তৈরী করে اَلْمُخْتَلِطِيْنَ  নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তিনিও তাঁর এই গ্রন্থে হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমানের নাম উল্লেখ করেননি।  তিনি আল্লামা হায়সামী অপেক্ষা প্রবীণ ও পূর্বকালের। আল্লামা হায়সামী মৃত্যুবরণ করেন ৮০৭ হিজরীতে। আর আল্লামা আলাঈ মুত্যুবরণ করেন ৭৬১ হিজরীতে।  তারপর দেখুন, আল্লামা যাহাবী হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমান সম্পর্কে আলকাশিফ-এ বলেছেন, ثِقَةٌ إِمَامٌ مُجْتَهِدٌ كَرِيْمٌ جَوَادٌ (ছিকাহ, ইমাম, মুজতাহিদ, সম্ভ্রান্ত, দানশীল)। হাম্মাদ বিন আবী সুলাইমানের  ইখতিলাত দোষের কোনো উল্লেখই এখানে আল্লামা যাহাবি করেননি। বুঝা যায়, যাঁরা তাঁর সম্পর্কে এই দাবী করেছেন তাঁদের দাবিটি আল্লামা যাহাবীর নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানীও তাঁর সম্পর্কে ইখতিলাতের কথা উল্লেখ করেননি। তিনি তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, صَدُوْقٌ لَهُ اَوْهَامٌ  অর্থাৎ হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমান সত্যভাষী, (রেওয়ায়েতে) তাঁর  কিছু ওয়াহ্ম আছে। ওয়াহ্ম আর ইখতিলাত এক কথা নয়। ওয়াহ্ম তো হাফেজ রাবীদের থেকেও সংঘটিত হতে পারে। কোনো রাবী হাফেজ ও তুখোড় স্মৃতিশক্তির অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও কোনো কোনো সময় তাঁর থেকে ভুল হতে পারে। হয়ে যায়। আর ইখতিলাত হল রাবীর স্মৃতিবিভ্রাট দোষ। সুতরাং দুটো এক বিষয় নয়।

 

হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমান সম্পর্কে ইবনে হাজার রাহ.-এর মন্তব্য ও পর্যালোচনা 

 হাফেজ ইবনে হাজার রাহ. হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমান সম্পর্কে বলেছেন, صَدُوْقٌ لَهُ اَوْهَامٌ অর্থাৎ তিনি সত্যভাষী, (রেওয়ায়েতে) তাঁর কিছু ওয়াহ্ম আছে। তাকরীবুত তাহযীবের এই বক্তব্যের উপর শুআইব আলআরনাউত ও বাশ্শার আওয়াদ মারূফ টীকা লিখেছেন এই ভাষায় :

بَلْ صَدُوْقٌ حَسَنُ الْحَدِيْثِ وَ إِنَّمَا نَزَلَ اِلَى هَذِهِ الْمَرْتَبَةِ بِسَبَبِ اَوْهَامٍ كَانَتْ تَقَعُ لَهُ، وَثَّقَهُ يَحْيى بْنُ مَعِيْنٍ وَالنَّسَائِي وَالْعِجْلِي، وَفَضَّلَهُ يَحْيى بْنُ سَعِيْدٍ عَلى مُغِيْرَةَ بْنِ مِقْسَمٍ -وَهُوَ ثِقَةٌ -، لكِنَّهُ كَانَ مُنْصَرِفًا إِلى الْفِقْهِ مَعْنِيًّا بِه لَيْسَ كَعِنَايَتِه بِحِفْظِ الْآثَارِ، لِذَالِكَ قَالَ أَبُوْ حَاتِمٍ : هُوَ صَدُوْقٌ لَايُحْتَجُّ بِحَدِيْثِهِ، وَهُوَ مُسْتَقِيْمٌ فِي الْفِقْهِ، فَإِذا جَاءَ الْآثَارُ شَوَّشَ. وَضَعَّفَهُ اِبْنُ سَعْدٍ، وَ لَعَلَّ بَعْض مَنْ ضَعَّفَهُ إِنَّمَا كَانَ ذَلِكَ بِسَبَبِ كَوْنِه مِنْ اَهْلِ الرَّأْيِ، وَ مَا نُسِبَ إِلَيْهِ مِنَ الْإِرْجَاءِ، وَهُوَ تَضْعِيُفٌ ضَعِيْفٌ، وَقَالَ الذَّهَبِي : ثِقَةٌ إِمَامٌ مُجْتَهِدٌ.

অর্থ : বরং সত্যভাষী, হাসানুল হাদীস (অর্থাৎ তাঁর হাদীস হাসান পর্যায়ের)। তিনি এই স্তরে নেমে এসেছেন তাঁর ওয়াহ্মের কারণে। ইয়াহ্ইয়া ইবনে মাঈন, নাসাঈ ও ইজলী তাঁকে ছিকাহ বলেছেন। আর ইয়াহ্্ইয়া ইবনে সাঈদ তাঁকে মুগীরাহ ইবনে মিকসামের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। -আর মুগীরাহ ইবনে মিকসাম ছিকাহ রাবী- তবে তিনি (হাম্মাদ) ফিকহের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। ফিকহের প্রতি যতটা মনোযোগী ছিলেন, হাদীস সংরক্ষণের ব্যাপারে ততটা মনোযোগী ছিলেন না । এজন্যই আবূ হাতেম বলেছেন, ‘তিনি সত্যভাষী, তাঁর হাদীস দ্বারা দলীল গ্রহণ করা যায় না।[2] তিনি ফিকহের ক্ষেত্রে যথার্থ। কিন্তু যখন হাদীস আসে তখন (কখনও কখনও বর্ণনায়) উলট পালট হয়ে যায়। ইবনু সাদ তাঁকে যঈফ বলে সাব্যস্ত করেছেন। যাঁরা তাঁকে যঈফ বলে সাব্যস্ত করেছেন তাঁদের কেউ কেউ সম্ভবত তাঁকে তায্ঈফ (যঈফ সাব্যস্ত) করেছেন তিনি আহলুর রায় হওয়ার কারণে। আর এটি যঈফ তায্ঈফ। যাহাবী বলেছেন, তিনি ছিকাহ, ইমাম, মুজতাহিদ। (তাহরীরু তাকরিবুত তাহযীব, খ- : ১ পৃষ্ঠা : ৩১৯)

 লক্ষ করুন, শুআইব আলআরনাউত ও বাশ্শার আওয়াদ মারূফ তাঁদের বক্তব্য শুরু করেছেন বরং শব্দ দিয়ে। কারণ, আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানীর صَدُوْقٌ لَهُ اَوْهَامٌ  -তিনি সত্যভাষী, তাঁর (রেওয়ায়েতে) কিছু ওয়াহ্ম আছে- কথাটি দ্বারা কেউ ভুল বুঝতে পারে যে, তিনি দলীলযোগ্য নন। তাঁরা বরং শব্দ দিয়ে বক্তব্য শুরু করে তা খ-ন করে বললেন যে, না তিনি এমন নন। বরং হাসানুল হাদীস। তাঁর বর্ণিত হাদীস হাসান পর্যায়ের। এরপর তাঁরা বলতে চাইছেন যে, তিনি ছিকাহ রাবী হওয়ার কারণে তাঁর হাদীস সহীহ হওয়ারই কথা ছিল। কিন্তু কিছু ওয়াহ্মের কারণে তিনি একটু নিচের পর্যায়ে নেমে এসেছেন। কিন্তু তাঁর ওয়াহ্ম এই পর্যায়ের নয়, যে পর্যায়ের হলে তাঁকে যঈফ বলে সাব্যস্ত করা যায়। এরপর তাঁরা ফিকহের প্রতি হাম্মাদের অধিক মনোনিবিষ্টতার কথা তুলে ধরেছেন এবং যাঁরা তাঁকে যঈফ বলে সাব্যস্ত করেছেন তাঁদের কথা উল্লেখ করে বলেছেন যে, যাঁরা তাঁকে যঈফ বলে মত ব্যক্ত করেছেন তাঁরা মূলত ফিকহের প্রতি হাম্মাদের অধিক মনোনিবিষ্টতা ও তাঁর আহলুর রায় হওয়ার কারণে তাঁকে যঈফ বলে মত ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু এই কারণে কোনো রাবীকে যঈফ বলে অভিমত ব্যক্ত করা দুর্বল অভিমত।

হাম্মাদ সম্পর্কে এটাই শেষ ও চূড়ান্ত কথা। তিনি শেষ বয়সে ইখতিলাতের শিকার হয়েছিলেন এই দাবি সঠিক নয়। সঠিক হলে মুখতালিত রাবীদের সম্পর্কে লিখিত চরিতাভিধানে তাঁর নাম অবশ্যই থাকত। আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী এবং আল্লামা যাহাবী কর্তৃক তাঁর সম্পর্কে ইখতিলাত দোষের উল্লেখ না করণ প্রমাণ করে যে, যাঁরা তাঁর সম্পর্কে ইখতিলাতের দাবি করেছেন তাঁদের দাবিটি তাঁদের উভয়ের নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। আর  শেষ বয়সে তাঁর ইখতিলাত হয়েছিল বলে যদি ধরেও নেই তাহলেও প্রশ্ন থেকে যায় যে, তাঁর কুদামা শাগরিদদের তালিকা তো বেশ দীর্ঘ। তাহলে কেন শুধু তিনজনের রেওয়ায়েত গ্রহণযোগ্য হবে? অন্যান্যরা কেন তাঁর কুদামা শাগরিদদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবেন না? এ সম্পর্কে আমি বিস্তারিত আলোচনা করে এসেছি। আলোচ্য হাদীসের রাবী মামারও তাঁর কুদামা শাগরিদদের একজন। তাঁর রেওয়ায়েত কেন গ্রহণযোগ্য হবে না?  মোটকথা হাম্মাদ ছিকাহ রাবী এতে কোনো সন্দেহ নেই। হাঁ, ছিকাহ হওয়া সত্ত্বেও বিশেষ কারণবশত তাঁর হাদীসকে  সহীহ বলা যাচ্ছে না সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু তাঁর হাদীস হাসান পর্যায়ের অবশ্যই।

দেখুন, মুযাফফর বিন মুহসিন সাহেবদের চিন্তাগুরু ও তাহকীক ও গবেষণার ক্ষেত্রে তাঁদের সর্বাপেক্ষা অধিক ভরসাস্থল নাসিরুদ্দীন আলবানী রাহ.-ও হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমান কর্তৃক বর্ণিত হাদীসকে যঈফ বা ত্রুটিপূর্ণ বলতে সাহস পাননি। হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমান বর্ণিত حُسْنُ الصَّوْتِ زِيْنَةُ الْقُرْآنِ  হাদীসটিকে শায়েখ আলবানী রাহ. হাসান বলেছেন। বলেছেন-

وَهذَا إِسْنَادٌ حَسَنٌ، مَدَارُ طُرُقِه عَلى حَمَّاد بْنِ اَبِيْ سُلَيْمَانَ وَهُوَ صَدُوْقٌ لَهُ اَوْهَامٌ.

এটা হাসান সনদ, এই হাদীসের সকল সনদের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব হলেন, হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমান। তিনি সত্যভাষী। তাঁর রেওয়ায়েতে অনেক ওয়াহ্ম আছে। (দ্রষ্টব্য : সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহাহ, খ- ৪, ভুক্তি নং ১৮১৫।)

বুঝা গেল, তিনি তাঁর ওয়াহমকে ঐ পর্যায়ের গণ্য করেননি যে পর্যায়ের ওয়াহমের কারণে রাবীকে যঈফ বলা যায়। আরও উল্লেখ্য যে, এই হাদীসটি হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমান থেকে বর্ণনাকারী শুবা, সুফইয়ান ছাওরী বা হিশাম আদ দাসতাওয়াঈ- এই তিনজনের কেউ নয়। হাদীসটি তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন আবূ উবাইদাহ সাঈদ ইবনে যারবী এবং আবূ মুয়াবিয়া আল আবাদানী। বুঝা গেল যে, হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমান থেকে শুবা, সুফইয়ান ছাওরী এবং হিশাম আদ দাসতাওয়াঈ ব্যতীত অন্য কারও বর্ণনা গ্রহণযোগ্য নয়- আল্লামা হাইসামীর এই দাবি আলবানী সাহেবও প্রত্যাখ্যান করেছেন। এ ছাড়া হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমান বর্ণিত তবারানীর আল-মুজামুল আওসাতের ৫১১৬ নং হাদীসকেও আলবানী সাহেব হাসান বলেছেন। (দ্রষ্টব্য : সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহাহ, খ- ৫, ভুক্তি নং ২৪২৬।) আরও  মজার ব্যাপার হল, এই দুটো হাদীসই হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমান বর্ণনা করেছেন ইবরাহীম নাখাঈ থেকে। যাঁকে মুযাফফর বিন মুহসিন সাহেবরা মুদাল্লিস বলে আখ্যায়িত করে তাঁর হাদীসকে যঈফ বলে সাব্যস্ত করতে চেয়েছেন। 

হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমানের কোনো কোনো হাদীসকে তো মরহুম আলবানী সাহেব হাসান নয়, সহীহ বলে মত ব্যক্ত করেছেন। উদাহরণত হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমান কর্তৃক বর্ণিত সুনানে আবূ দাউদের ৩৭২ নং হাদীসকে তিনি সহীহ বলেছেন। সেই হাদীসটির বর্ণনাকারীও শুবা, সুফইয়ান ছাওরী ও হিশাম এই তিনজনের কেউ নয় বরং হাদীসটি তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন হাম্মাদ ইবনে সালামাহ। সুনান আন নাসাঈর ৫৬৫৪ নং হাদীসকেও তিনি সহীহ বলেছেন। এই হাদীসটিতেও হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমান আছেন এবং তাঁর থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন হাম্মাদ ইবনে সালামাহ।

হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমান সম্পর্কে এত দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু বিরক্তিকর হওয়া সত্ত্বেও  আলোচনা দীর্ঘ করতে হল শুধু মুযাফফর বিন মুহসিন সাহেবদের অজ্ঞতা ও হঠকারী চরিত্রের নমুনা তুলে ধরতে।  

 

হাদীসটির সুত্র-বিচ্ছিন্নতার দাবি নিয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত

 এখন বাকি রইল এই প্রশ্ন যে, আসওয়াদ ইবনে ইয়াযীদ তো তাবিঈ ছিলেন, আর হযরত বিলাল রা. যেহেতু রাসূলের ইন্তিকালের পর আযান দেননি সেহেতু আসওয়াদের পক্ষে বিলাল রা.-এর আযান শোনার সুযোগ ঘটেনি, তাহলে তিনি যে জোড়া জোড়া বাক্যে আযান ও ইকামত দিতেন তা আসওয়াদ ইবনে ইয়াযীদ জানলেন কোত্থেকে? যার নিকট থেকে জানলেন তাঁর নাম যেহেতু উল্লেখ নেই সেহেতু হাদীসটি সুত্র-বিচ্ছিন্ন।

এই প্রশ্ন ও আপত্তির জবাবে বলব যে, হযরত বিলাল রা.-এর আযান শোনার সুযোগ ঘটেনি বলেই যে, আসওয়াদ রাহ. হযরত বিলাল রা.-এর আযান ও ইকামতের ধরন কিরকম ছিল তা জানবেন না তা তো ঠিক নয়। কারণ, হতে পারে হযরত বিলাল রা.-এর নিকট হতেই বর্ণনা আকারে আসওয়াদ শুনেছেন যে, তিনি জোড়া জোড়া বাক্যে আযান ও ইকামত দিতেন।  

কিন্তু তখন এই আপত্তি উত্থাপিত হতে পারে যে, হযরত বিলাল রাযি. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের পরপরই শামে চলে গিয়েছিলেন। এদিকে আসওয়াদ রাহ. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় মদীনায় আসেননি। বুঝা গেল, আসওয়াদ রাহ. বিলাল রা.-এর নিকট হতে বিষয়টি জানেননি। অন্য কোনো সূত্রে জেনেছেন। যেহেতু সেই সূত্রের উল্লেখ নেই সেহেতু এটি সূত্র-বিচ্ছিন্ন ও যঈফ।

 এর জবাব হল, হযরত বিলাল রা. কখন শামে গিয়েছিলেন, তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে দ্বিমত আছে। একটি মত এও রয়েছে যে, তিনি নবীজীর ইন্তিকালের পরপরই নয়, বরং তিনি শামে চলে গিয়েছিলেন হযরত উমর রা.-এর খিলাফতকাল শুরু হওয়ারও কিছুদিন পর।

(দ্রষ্টব্য : ইবনে সা, আত তাবাকাত ২/২৭০; ইবনুল আছীর, উসদুল গাবাহ ১/২৪৪।

উল্লেখ্য, বরাতটি সংগৃহীত হয়েছে মাওলানা আবদুল মতীন ছাহেব প্রণীত দলীলসহ নামাযের মাসায়েল গ্রন্থ হতে)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের অব্যবহিত পরেই হযরত বিলাল রা.-এর চলে যাওয়া তো দূরের কথা, এমনকি যাঁরা দাবি করেছেন যে, তিনি হযরত আবূ বকর রা.-এর খিলাফতকালে শামে চলে গিয়েছিলেন আল্লামা শাওকানী রাহ. তাঁদের দলীলকেও খ-ন করেছেন। তিনি বলেছেন-

أَمَّا مَا رَوَاهُ اَبُوْ دَاود مِنْ أَنَّ بِلَالًا ذَهَبَ إِلى الشَّامِ فِيْ حَيَاةِ أَبِيْ بَكْرٍ فَكَانَ بِهَا حَتّى مَاتَ فَهُوَ مُرْسَلٌ وَفِيْ إِسْنَادِه عَطَاءٌ اَلْخُرَاسَانِى وَهُوَ مَدَلِّسٌ.

অর্থাৎ আর আবূ দাউদ যা বর্ণনা করেছেন যে, বিলাল আবূ বকরের জীবদ্দশায় শামে চলে গিয়েছিলেন এবং আমৃত্যু সেখানেই ছিলেন সেটি মুরসাল বর্ণনা। তাছাড়া বর্ণনাটির সনদে আতা আলখুরাসানী আছেন, আর তিনি মুদাল্লিস রাবী।

আতাকে শাওকানী রাহ. শুধু মুদাল্লিস বলেছেন। কিন্তু হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. তাঁর সম্পর্কে তাকরীবুত তাহযীবে বলেছেন : صَدُوْقٌ يَهِمُ كَثِيْرًا وَيُرْسِلُ وَيُدَلِّسُ  অর্থাৎ তিনি সত্যভাষী, প্রচুর ভুল করতেন, ইরসাল করতেন এবং তাদলীস করতেন।

এ দ্বারা বুঝা গেল যে, বিলাল রা. শামে গমন করেছিলেন রাসূলের ইন্তিকালের অব্যবহিত পরে তো নয়ই, এমনকি হযরত আবূ বকরের জীবদ্দশাতেও নয় বরং তিনি শামে গিয়েছিলেন হযরত উমর রা.-এর খেলাফতকালে।

মুহতারাম, এ ছাড়া আরেকটি বিষয়ও প্রণিধানযোগ্য যে, হযরত আসওয়াদ ইবনে ইয়াযীদ ছিলেন একেবারে প্রথম সারির তাবিঈ। তিনি রাসূলের যামানায় মুসলমান হয়েছেন কিন্তু রাসূলের সাক্ষাৎ লাভ করতে পারেননি। রাসূলের যামানা পেয়েছেন বলে তাঁকে মুখাদরাম বলা হয়। মুখাদরাম তাঁদেরকে বলা হয় যাঁরা রাসূলের যামানায় মুসলমান হয়েছেন কিন্তু রাসূলের সাক্ষাৎ লাভ করতে পারেননি। আসওয়াদ যেহেতু প্রথম সারির তাবিঈ তাই তিনি যে বহু সাহাবীর সাক্ষাৎ পেয়েছেন তা নিশ্চিত। কাজেই তিনি যদি হযরত বিলাল রা.-এর সাক্ষাৎ নাও পেয়ে থাকেন তবুও তাঁর বর্ণিত এই হাদীসটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কোনো সংশয় সৃষ্টি হয় না।

দেখুন, আসওয়াদ ইবনে ইয়াযীদ ছিলেন প্রথম সারির তাবিঈ আর  আব্দুল আযীয ইবনে রুফাই নামক একজন তাবিঈ ছিলেন তৃতীয় সারির তাবিঈ। অথচ তাঁর কর্তৃক বর্ণিত এইরূপ একটি মুরসাল হাদীসকে শায়েখ আলবানী রাহ. কমপক্ষে শক্তিশালী সাক্ষী ও সমর্থক হিসেবে গ্রহণযোগ্য বলে মত ব্যক্ত করেছেন। যোহরের সালাতের ওয়াক্ত সংক্রান্ত আলোচনায় আমি এ বিষয়ে আলোচনা করে এসেছি। আপনার সুবিধার্থে আলবানী সাহেবের সেই বক্তব্যটি পুনরায় উদ্ধৃত করছি। আলবানী সাহেব তাঁর ইরওয়াউল গালীল গ্রন্থে ৪৯৬ নং হাদীসের আলোচনার এক পর্যায়ে আবদুল আযীয ইবনে রুফাই কর্তৃক বর্ণিত  একটি হাদীস উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন :

أَخْرَجَهُ الْبَيْهَقِى. وَهُوَ شَاهِدٌ قَوِيٌّ فَإِنَّهُ رِجَالُهُ كُلُّهُمْ ثِقَاتٌ، وَعَبْدُ الْعَزِيْزِ بْنُ رُفَيْعٍ تَابِعِيٌّ جَلِيْلٌ رَوَى عَنِ الْعَبَادِلَةِ: اِبْنِ عُمَرَ وَاِبْنِ عَبَّاسٍ وَاِبْنِ الزُّبَيْرِ وَغَيْرِهِمْ مِنَ الصَّحَابَةِ وَجَمَاعَةٍ مِنْ كِبَارِ التَّابِعِيْنَ، فَإِنْ كَانَ شَيْخُهُ ـ وَهُوَ الرَّجُلُ الَّذِي لَمْ يُسَمِّه ـ صَحَابِيًّا فَالسَّنَدُ صَحِيْحٌ، لِأَنَّ الصَّحَابَةَ كُلُّهُمْ عُدُوْلٌ فَلَا يَضُرُّ عَدَمُ تَسْمِيَتِهِ كَمَا هُوَ مَعْلُوْمٌ، وَإِنْ كَانَ تَابِعِيًّا، فَهُوَ مُرْسَلٌ لَا بَأْسَ بِهِ كَشَاهِدٍ، لِأَنَّهُ تِابِعِىٌّ مَجْهُوْلٌ، وَالْكِذْبُ فِى التَّابِعِيْنَ قَلِيْلٌ، كَمَا هُوَ مَعْرُوْفٌ.

অর্থাৎ হাদীসটিকে তাখরীজ করেছেন বায়হাকী। হাদীসটি শক্তিশালী সাক্ষী ও সমর্থক। কেননা, হাদীসটির সকল রাবী নির্ভরযোগ্য। আর আবদুল আযীয ইবনে রুফাই জ্যেষ্ঠ ও প্রবীণ তাবিঈগণের একজন। তিনি আবদুল্লাহগণ হতে তথা আবদুল্লাহ ইবন উমার, আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস, আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র প্রমুখ সাহাবী হতে এবং একদল জ্যেষ্ঠ ও প্রবীণ তাবিঈ হতে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তো যদি তাঁর শাইখ -যাঁর নাম তিনি উল্লেখ করেননি- সাহাবী হন তাহলে সনদটি সহীহ। কারণ, সাহাবীগণ সকলেই নির্ভরযোগ্য। সুতরাং তাঁদের নাম উল্লেখ না করা ক্ষতির কোনো কারণ নয়। সকলের নিকট যেমনটা সুবিদিত। আর যদি তাবিঈ হন তাহলে হাদীসটি এমন মুরসাল যা সমর্থক হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে অসুবিধা নেই। কেননা, ঐ তাবিঈ মাজহুল। আর তাবিঈগণের মধ্যে মিথ্যার চর্চা ছিল কম, যেমনটা সকলের নিকট প্রসিদ্ধ।

শায়েখ আলবানীর এই বক্তব্যের সার কথা হল, হাদীসটির সকল রাবী যেহেতু নির্ভরযোগ্য সেহেতু আবদুল আযীয যদি হাদীসটি শ্রবণ করে থাকেন সাহাবী থেকে তাহলে হাদীসটির সনদ সহীহ। আর যদি তিনি হাদীসটি শ্রবণ করে থাকেন তাবিঈ হতে তাহলে তা এমন মুরসাল যা সমর্থক হাদীস হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। কেননা, ঐ যুগে মিথ্যার চর্চা ছিল কম। কাজেই মারবী আনহু যদি তাবিঈ হন তবে তার পরিচয় জানা না গেলেও অর্থাৎ তিনি মাজহুল হলেও হাদীসটিকে যঈফ বলা যায় না।

তো আসওয়াদ ইবনে ইয়াযীদ ছিলেন প্রথম সারির তাবিঈ। সুতরাং প্রথমত এই সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না যে, তিনি হযরত বিলাল রা. কর্তৃক আযান ও ইকামতের বাক্যগুলোর বর্ণনাটি সরাসরি হযরত বিলাল রা. থেকে শুনেছেন। দ্বিতীয়ত এই সম্ভাবনাও প্রবল যে, তিনি কোনো সাহাবী থেকে বর্ণনাটি শুনেছেন। তা-ই যদি হয় তাহলে তখন হাদীসটির সনদ হবে সহীহ তথা হাদীসটি হবে সহীহ। আর যদি কোনো তাবিঈ হতে শুনে থাকেন তবে দ্বিতীয় সারির নয়, প্রথম সারির কোনো তাবিঈ হতেই তিনি তা শুনে থাকবেন সেই সম্ভাবনাটাই এখানে প্রবল। তাহলে আবদুল আযীযের মুরসাল বর্ণনা গ্রহণযোগ্য হলে আসওয়াদ ইবনে ইয়াযীদের মুরসাল বর্ণনা অপেক্ষাকৃত অধিকতর গ্রহণযোগ্য হওয়ার কথা। তাই নয় কি? আমি মনে করি, হাদীসটি সহীহ। তিনি বিলাল রা. বা অন্য কোনো সাহাবী হতে বর্ণনাটি শুনেছেন। যদি কেউ এই দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে তাহলে সে নিদেন পক্ষে হাদীসটিকে শক্তিশালী সমর্থক ও সাক্ষী হিসেবে বিবেচনার বিষয়টিকে উড়িয়ে দিতে পারে না। না, কোনোভাবেই না। ৩[3]

 জোড়া জোড়া বাক্যে ইকামত : হাদীস-৩

সুওয়াইদ ইব্ন গাফালাহ রাহ. বলেন :

سَمِعْتُ بِلَاَلاً يُؤَذِّنُ مَثْنَى وَيُقِيْمُ مَثْنَى (أخرجه الطحاوي، رقم الحديث ৮২৭)

আমি বিলাল রা.-কে আযান ও ইকামত দুইবার দুইবার করে বলতে শুনেছি। -ত্বহাবী, হাদীস ৮২৭

 

হাদীসটির উপর উত্থাপিত আপত্তি ও পর্যালোচনা

মুযাফফর বিন মুহসিন সাহেবগণ এই হাদীসটির উপর তিনটি আপত্তি উত্থাপন করেছেন। তাঁরা বলেছেন :

(ক) সুওয়ায়দ রাহ.ও তাবেঈ এবং তাঁর পক্ষেও বিলাল (রা) আযান শোনাটা পূর্বের বর্ণনাটির ন্যায় সম্ভব নয়।

(খ) এর সনদে শরীক বিন আবদুল্লাহ কাযী আছে। তিনি মুদাল্লিস এবং বর্ণনাটিতে আনআনাহ আছে। সুতরাং হাদীসটি যঈফ। তাছাড়া শরীকও হাদীসের ক্ষেত্রে ইখতিলাতকারী।

(ঘ) সর্বোপরি হাদীসটি সহীহ মুসলিমে বর্ণিত বিলাল (রা) বর্ণনাটির বিরোধী বিধায় প্রত্যাখ্যাত।

মুহতারাম, আমার বক্তব্য হল, সুওয়াইদ রাহ.-ও প্রথম সারির একজন তাবিঈ ছিলেন। তিনি মুখাদরাম ছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশাতেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যেদিন দাফন করা হয় ঠিক সেইদিনই তিনি মদীনাতে আগমন করেন। তিনি বলছেন, আমি বিলালকে শুনেছি জোড়া জোড়া বাক্যে আযান ও ইকামত দিতে। সুতরাং হাদীসটির সনদ যদি গ্রহণযোগ্য হয় তাহলে সুওয়াইদ রাহ. কর্তৃক বিলাল রা.-এর আযান ও ইকামত শোনাটাকে কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। শুধু একটি প্রশ্ন থেকে যাবে যে, বিলাল রা. তো রাসূলের পরে মদীনাতে আর আযান দেননি তাহলে সুওয়াইদ রাহ. কী করে তাঁর আযান শুনলেন? এই প্রশ্ন নিয়ে আমরা পরে আলোচনায় আসব। প্রথমে দেখে নেই, হাদীসটির সনদ কিরূপ এবং কী কী আপত্তি এই সনদের উপর উত্থাপিত হয়েছে।

এই সনদটির উপর আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে যে, হাদীসটির একজন বর্ণনাকারী শরীক ইবনে আবদুল্লাহ কাযী। তিনি মুদাল্লিস এবং বর্ণনাটিতে আনআনাহ আছে। সুতরাং হাদীসটি যঈফ। আপত্তিকারীকে বলছি, সিদ্ধান্ত তো খুব দ্রুত দিয়ে ফেললেন। আরেকটু তালাশ ও যাচাই করে সিদ্ধান্ত দিলে কি ভালো হত না? দেখুন, প্রথমত হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. তাঁর তাদলীস সম্পর্কে বলেছেন, وَكَانَ يَتَبَرَّأُ مِنَ التَّدْلِيْسِ  তিনি তাদলীস থেকে সম্পর্কহীনতা ঘোষণা করতেন। এরপর দুইজন ব্যক্তির কথা উল্লেখ করে বলেছেন যে, তাঁরা শরীককে তাদলীসের অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন। প্রথমে করেছেন দারাকুতনী, এরপর করেছেন আবদুল হক। হাফেজ সাহেবের বর্ণনাভঙ্গী দ্বারা বুঝা যায় যে, তাদলীসের অভিযোগটি তাঁর নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। এজন্যই সম্ভবত হাফেজ সাহেব তাকরীবুত তাহযীবে তাঁর তাদলীসের কথাটি উল্লেখই করেননি। আল্লামা যাহাবীও তাঁর তাদলীস সম্পর্কে কিছু বলেননি। অথচ  তাকরীবুত তাহযীব ও আলকাশেফ-এর প্রণেতাদ্বয় যথাক্রমে হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী ও আল্লামা যাহাবী তাঁদের এই গ্রন্থদ্বয়ে সাধারণত রাবীদের দোষ ও গুণসমূহের চুম্বকাংশই তুলে ধরেন। রাবীর তাদলীসের বিষয়টি তার সমূহ দোষের মধ্য হতে একটি বড় দোষ। এই দোষটির কথা তাঁদের দুইজনের কেউ উল্লেখ করলেন না। এটি একটি বড় প্রমাণ যে, শরীকের ব্যাপারে উত্থাপিত তাদলীসের অভিযোগটি তাঁদের দুইজনের  কেউই আমলে নেননি। এটি একটি দুর্বল অভিযোগ। তবে হাঁ,  তাবাকাতুল মুদাল্লিসীন গ্রন্থে হাফেজ সাহেব তাঁর নামটিও তালিকাভুক্ত করেছেন। তবে সেখানে তিনি তাঁকে দ্বিতীয় স্তরের মুদাল্লিসগণের তালিকায় উল্লেখ করেছেন। আর আমি আগেই আলোচনা করে এসেছি যে, এই দ্বিতীয় স্তরের মুদাল্লিসগণ কর্তৃক আন দ্বারা বর্ণিত হাদীস মুহাদ্দিসগণ ব্যাপকভাবে গ্রহণ করেছেন। কাজেই শরীকের হাদীসটি আন দ্বারা বর্ণিত হওয়ার কারণে হাদীসটিকে যঈফ বলে দেওয়া মুযাফফর বিন মুহসিন সাহেবদের জ্ঞানের অপ্রতুলতাকে স্পষ্ট করে তোলে।

আর শরীকের ইখতিলাত দোষের বিষয়টি অস্বীকার করার মত নয়। তবে মুযাফফর বিন মুহসিন সাহেবগণের  জ্ঞাতার্থে বলছি যে, তিনি ইখতিলাত-দোষের শিকার হয়েছিলেন ১৫০ হিজরীতে কুফার কাযী নিযুক্ত হওয়ার পরে। এর আগে নয়। দেখার বিষয় হল, এই হাদীসটি যে দুইজন রাবী শরীক ইব্ন আবদুল্লাহর বরাতে বর্ণনা করেছেন তাঁরা শরীকের নিকট হতে ইখতিলাতের পূর্বে হাদীসটি শুনেছিলেন, না ইখতিলাতের পরে। বিষয়টি সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে বলা তো মুশকিল। তবে আমাদের অনুসন্ধান মতে মুহাম্মাদ ইব্ন সুলাইমান লুওয়াইন ১১৮ বা ১১৯ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন। তিনি ইন্তিকাল করেন ২৪৫ বা ২৪৬ হিজরীতে। সিয়ারু আলামিন নুবালা গ্রন্থে আল্লামা যাহাবী আহমাদ ইবনুল কাসেম ইব্ন নাস্র এর উক্তি উদ্ধৃত করেছেন যে, আহমাদ ইবনুল কাসেম ইব্ন নাস্র বলেন,

حَدَّثَنَا لُوَيْنٌ فِى سَنَةِ اَرْبَعِيْنَ وَمِئَتَيْنِ، فَسَأَلَهُ اَبِى كَمْ لَكَ؟ قَالَ: مِأَةُ سَنَةٍ وَ ثَلَاثَ عَشْرَةَ سَنَةً.

অর্থাৎ লুওয়াইন আমাদের নিকট হাদীস বর্ণনা করলেন দুইশত চল্লিশ সনে। আমার পিতা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার বয়স কত? তিনি বললেন, ‘একশত তেরো বছর। তো দুইশত চল্লিশ সনে তাঁর বয়স একশত তেরো বছর হয়ে থাকলে নিশ্চয়ই তাঁর জন্ম হয়েছিল একশত সাতাইশ সনে। এ হিসেবে শরীক বিন আবদুল্লাহ আল কাযী ১৫০ হিজরীতে যখন কুফার কাযী নিযুক্ত হন তখন মুহাম্মাদ বিন সুলাইমান লুওয়াইন ছিলেন  তেইশ বছর বয়সের টগবগে যুবক, যে বয়সে তৎকালের হাদীস চর্চাকারীগণ মুহাদ্দিস হিসাবে স্বীকৃতি পেয়ে যেতেন। তদ্রƒ, আরেকজন রাবী মুহাম্মাদ ইবনে সিনান ইন্তিকাল করেন দুইশত তেইশ হিজরীতে। আর আল্লামা যাহাবী বলেন, ‘তিনি নব্বইয়ের উপর বয়স পেয়েছিলেন। অতএব, শরীক বিন আবদুল্লাহ আল কাযী ১৫০ হিজরীতে যখন কুফার কাযী নিযুক্ত হন তখন মুহাম্মাদ ইবনে সিনানের বয়স ছিল সতের বছরের বেশি। সুতরাং এই সম্ভাবনা অত্যন্ত প্রবল যে, তাঁরা উভয়ে শরীকের নিকট থেকে হাদীস শ্রবণ করেছিলেন তাঁর ইখতিলাত-দোষে শিকার হওয়ার পূর্বে। আমাদের বন্ধুবর মুযাফফর বিন মুহসিন সাহেব তাঁর সহযোগীদের সংগে নিয়ে এই সম্ভাবনার প্রাবল্য প্রমাণ করুন যে, তাঁরা উভয়েই শরীকের নিকট হতে হাদীস শ্রবণ করেছেন তাঁর ইখতিলাত-দোষে শিকার হওয়ার পরে, পূর্বে নয়।

 বাকি রইল বিলাল রা. থেকে সুওয়াইদ ইবনে গাফালাহ রাহ.-এর শ্রবণের বিষয়টি। তো এ সম্পর্কে বলব যে, সহীহ সনদে যখন পাওয়া যাচ্ছে যে, তিনি বলেছেন, আমি বিলালকে আযান দিতে শুনেছি তখন এ ব্যাপারে আপত্তি উত্থাপন করার কোনো অর্থ হয় না। তাছাড়া আমরা আসওয়াদ ইবনে ইয়াযীদের হাদীস নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে বলেছি যে, বিলাল রা. শামে গিয়েছিলেন হযরত উমর রা.-এর খেলাফতকালে। সুতরাং সুওয়াইদ রাহ. কর্তৃক তাঁর থেকে হাদীস শোনার বিষয়টি একরকম নিশ্চিত বলেই বলা চলে। দেখুন, সুওয়াইদ ইবনে গাফালাহর হাদীস সম্পর্কে শাওকানী রাহ. বলেছেন-

وَاسْتَدَلُّوْا أَيْضًا بِمَا رَوَاهُ الْحَاكِمُ وَالْبَيْهَقِيُّ فِي الْخِلَافِيَّاتِ وَالطَّحَاوِي مَنْ رِوَايَةِ سُوَيْدٍ بْنِ غَفَلَةَ أَنَّ بِلَالًا كَانَ يُثَنِّي الْأَذَانَ وَالْإِقَامَةَ وِادَّعَى الْحَاكِمُ فِيْهِ الْاِنْقِطَاعَ. قَالَ الْحَافِظُ : وَلَكِن فِي رِوَايَةِ الطّحَاوِي سَمِعْتُ بِلَالًا وَيُؤَيِّدُ ذّلِكَ مَا رَوَاهُ اِبْنُ أَبِي شَيْبَةَ عَنْ جَبْرٍ بْنِ عَلِيٍّ عَنْ شَيْخٍ يُقَالُ لَهُ الْحَفْصُ عَنْ أَبِيْهِ عَنْ جَدِّهِ وَهُوَ سَعْدٌ اَلْقَرَظُ قَالَ : أَذَّنَ بِلَالٌ حَيَاةَ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى الله عليه وآله وَسَلَّمَ ثُمَّ أَذَّنَ لِأَبِي بَكْرٍ فِي حَيَاتِهِ وَلَمْ يُؤَذِّنْ فِي زَمِانِ عُمَرَ وَسُوَيْدُ بْنُ غَفَلَةَ هَاجَرَ فِي زَمَنِ أَبِيْ بَكْرٍ.

অর্থাৎ তাঁরা (তথা জোড়া বাক্যে ইকামত প্রদানের প্রবক্তাগণ) দলীল গ্রহণ করেছেন হাকেম কর্তৃক বর্ণিত, বাইহাকী কর্তৃক আল খিলাফিয়াত-এ বর্ণিত এবং তাহাবী কর্তৃক বর্ণিত সুওয়াইদ ইবনে গাফালাহ রাহ.-এর এই হাদীস দ্বারা যে, বিলাল আযান ও ইকামত দিতেন জোড়া জোড়া বাক্যে। হাকেম হাদীসটির সূত্র-বিচ্ছিন্নতার দাবি করেছেন। হাফেজ (ইবনে হাজার আসকালানী রাহ.) বলেন, কিন্তু তাহাবীর বর্ণনায় আছে, ‘আমি বিলালকে শুনেছি। আর এটাকে সমর্থন করে ইবনে আবী শাইবাহ্র একটি বর্ণনা, যা তিনি বর্ণনা করেছেন জাব্র ইবনে আলী থেকে আর তিনি হাফস নামক এক শায়েখ থেকে, আর তিনি তার পিতা থেকে, আর তার পিতা তার -(হাফসের)- দাদা সাদ আলকারায থেকে যে, সাদ আলকারায বলেন, বিলাল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় আযান দিয়েছেন। অতপর আযান দিয়েছেন আবূ বকরের জন্য তাঁর জীবনকাল যাবৎ। উমরের খেলাফতকালে তিনি আযান দেননি। আর সুওয়াইদ ইবনে গাফালাহ হিজরত করেছেন আবূ বকরের আমলে।

হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রাহ.-এর বক্তব্য দ্বারা স্পষ্ট হয় যে, সুওয়াইদ ইবনে গাফালাহ রা. হযরত আবূ বকরের খেলাফতকালে মদীনায় হিজরত করে আসেন এবং বিলাল রা. হযরত আবূ বকরের আমলে মদীনায় আযান দিয়েছিলেন। এর দ্বারা তিনি হযরত সুওয়াইদ ইবনে গাফালাহ কর্তৃক বিলাল রা.-এর আযান শ্রবণকে প্রমাণ করেন। এর পূর্বে তিনি সুওয়াইদ ইবনে গাফালাহ্র এই উক্তি আমি বিলালকে শুনেছি দ্বারা প্রমাণ উপস্থাপন করেন যে, তিনি বিলাল রা.-এর আযান শ্রবণ করেছিলেন। শাওকানী রাহ. এই বক্তব্যের বিরোধিতায় কিছুই বলেননি। বুঝা যায় যে, তিনিও এটার সমর্থন করছেন। আর সমর্থন করছেন বলেই যারা আবূ দাউদের একটি বর্ণনা দ্বারা প্রমাণ করতে চান যে, বিলাল রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের অব্যবহিত পরেই মদীনা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন তাঁদের উপস্থাপিত আবূ দাউদের বর্ণনাকে তিনি যঈফ বলেছেন। আসওয়াদ ইবনে ইয়াযীদের হাদীস নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে আমি সেই বর্ণনাটি শাওকানীর বরাতে উল্লেখ করেছি এবং তিনি যে যঈফ বলেছেন সেটিও উদ্ধৃত করেছি। আলোচনাটি আবার পাঠ করা যেতে পারে। 

   

জোড়া জোড়া বাক্যে ইকামত : হাদীস-

ইবরাহীম নাখাঈ বলেন,

اِنَّ بِلَالًا كَانَ يُثَنّي الْأَذَانَ وَ الْإِقَامَةَ

বিলাল রাযি. আযান ও ইকামত দিতেন জোড়া জোড়া বাক্যে। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবাহ, হাদীস ২১৫৪

হাদীসটির সনদ সহীহ। সনদটি এইরূপ :

قَالَ أَبُوْ بَكْرٍ ابْنُ أَبِيْ شَيْبَةَ، حَدَّثَنَا أَبُوْ أُسَامَةَ عَنْ سَعِيْدٍ عَنْ أَبِى مَعْشَرٍ عَنْ إِبْرَاهِيْمَ قَالَ : ...

হাদীসটির  রাবী আবূ উসামাহ হচ্ছেন হাম্মাদ ইবনে উসামাহ। আর সাঈদ হচ্ছেন সাঈদ ইবনে আবী আরূবাহ। আবূ মাশার হচ্ছেন যিয়াদ ইব্ন কুলাইব। এঁরা সকলেই সহীহ বুখারী ও মুসলিমসহ প্রায় সব হাদীস গ্রন্থের রাবী। কাজেই সনদটির উপর কোনো আপত্তি উত্থাপিত হওয়ার কথা নয়। তবে মুযাফফর বিন মুহসিন সাহেবগণ তো ঁহঢ়ৎবফরপঃধনষব। তাঁদের মস্তিষ্ক থেকে কোন্ হাদীসের উপর কখন কী আপত্তি উত্থাপিত হয় তা আগেভাগে অনুমান করা কঠিন। কারণ, তাঁদের আপত্তির ধরন সম্পর্কে আপনি ইতোমধ্যেই অবগত হয়েছেন যে, তাঁরা উদ্ভট সব আপত্তি উত্থাপন করে থাকেন। আলোচ্য সনদটির রাবীগণের কাকে যে তারা কী অভিধায় অভিহিত করবেন তা বলা মুশকিল। আমার লেখা প্রকাশিত হওয়ার পর তাঁদের কোনো আপত্তি দেখলে সে সম্পর্কে তখন বিস্তারিত আলোচনা করা যাবে।

 

সাঈদ ইবনে আবী আরূবাহ সম্পর্কে উত্থাপন-সম্ভব আপত্তি ও পর্যালোচনা

তবে এটা অনুমান করতে পারি যে, তাঁরা সাঈদ ইবনে আবী আরূবাহ সম্পর্কে বলতে পারেন যে, তিনি মুদাল্লিস ছিলেন এবং তিনি ইখতিলাতের শিকার হয়েছিলেন। তো এ সম্পর্কে আমার বক্তব্য হল, হাফেজ যাহাবী রাহ. আলকাশেফ গ্রন্থে তাঁর তাদলীস সম্পর্কে কিছুই বলেননি। হাঁ, হাফেজ ইবনে হাজার রাহ. তাকরীবুত তাহ্যীবে তাঁর সম্পর্কে বলেছেন যে, তিনি كَثِيْرُ التَّدْلِيْسِ  তথা প্রচুর তাদলীসকারী ছিলেন। তাঁর এই বক্তব্যটি তাঁর তাবাকাতুল মুদাল্লিসীন গ্রন্থের বক্তব্যের সংগে সাংঘর্ষিক। কেননা, তিনি তাবাকাতুল মুদাল্লিসীন গ্রন্থে তাঁকে দ্বিতীয় স্তরের মুদাল্লিসের তালিকায় উল্লেখ করেছেন। আর দ্বিতীয় স্তরের মুদাল্লিস হচ্ছেন ঐ সকল রাবী যাঁদের  তাদলীসের পরিমাণ নেহায়েতই স্বল্প। যে কারণে মুহাদ্দিসগণ তাঁদের তাদলীসকে সহনীয় বলে গণ্য করেছেন এবং তাঁদের হাদীসকে তাঁরা তাঁদের সহীহ গ্রন্থসমূহে সন্নিবেশিত করেছেন। ইমাম মুসলিম রাহ সাঈদ ইবনে আবী আরূবাহ্র একাধিক মুআনআন হাদীসকে গ্রহণ করেছেন। নমুনা স্বরূপ দেখুন ১২৭, ৩৪৭, ৪৯৮, ৯৩২, ১০৮৪, ১১১৯, ১২৮৭ ও ৫৬৬৩ নং হাদীস। এগুলোর কোনোটি তিনি কাতাদাহ থেকে, কোনোটি শাবাবাহ ইবনে সাওয়ার থেকে আবার কোনোটি নাদ্র ইবনে আনাস থেকে আন শব্দ দ্বারা বর্ণনা করেছেন। আরেকটি বিষয়ও প্রণিধানযোগ্য যে, মুহাদ্দিসগণ একদল রাবীর নাম উল্লেখ করে বলেছেন যে, ‘এঁদের বরাতে  সাঈদ ইবনে আবী আরূবাহ হাদীস বর্ণনা করেছেন,  অথচ তাঁদের নিকট থেকে তিনি হাদীস শ্রবণ করেননি। তাই যদি হয় তাহলে তো তা ইরসাল হবে, তাদলীস নয়। তাদলীস তো বলা হয় রাবী কর্তৃক  এরূপ মারবী আনহুর বরাতে হাদীস বর্ণনা করা যে মারবী আনহু হতে তাঁর অন্যান্য হাদীস শ্রবণের বিষয়টি প্রমাণিত, কিন্তু আলোচিতব্য কোনো একটি হাদীস তিনি মারবী আনহু হতে শ্রবণ করেননি, অথচ তিনি এরূপ শব্দ দ্বারা হাদীসটি বর্ণনা করেছেন যদ্দারা মনে হয় যে, তিনি হাদীসটি মারবী আনহু হতে শ্রবণ করেছেন। যাঁর নিকট হতে কোনো হাদীস শ্রবণ প্রমাণিতই নয় তাঁর বরাতে আন দ্বারা হাদীস বর্ণনা করাকে ইরসাল বলা হয় তাদলীস নয়। হাঁ ইমাম বুখারী, ইবনে আদী প্রমুখ মুহাদ্দিসগণ এটিকে তাদলীস বললেও জুমহুর মুহাদ্দিস এটাকে তাদলীস বলেন না, ইরসাল বলেন।

 

সাঈদ ইবনে আবী আরূবাহ-এর ইখতিলাত নিয়ে আলোচনা

আর তাঁর ইখতিলাতের বিষয় সম্পর্কে সংক্ষেপে এতটুকু বলব যে, হাঁ তিনি ইখতিলাতের শিকার হয়েছিলেন। তবে তাঁর শাগরিদ আবূ উসামাহ তাঁর নিকট হতে তাঁর ইখতিলাতের পূর্বে হাদীস শুনেছেন। আর এজন্যই ইমাম মুসলিম রাহ. আবূ উসামাহ কর্তৃক বর্ণিত সাঈদ ইবনে আবী আরূবাহ্র হাদীস তাঁর কিতাবে সন্নিবেশিত করেছেন। উদাহরণ স্বরূপ দেখুন, সহীহ মুসলিমের ৯৩২, ৫৫৫০ ও ৭১১৭ নং হাদীস তিনটি। উপমহাদেশীয় ছাপা কিতাবে হাদীস তিনটি সন্নিবেশিত হয়েছে যথাক্রমে খ- ১ পৃষ্ঠা ১৭৩, খ- ২ পৃষ্ঠা ২৯৩ ও ৩৫২ -এ।

 

ইবরাহীম নাখাঈর মুরসাল বর্ণনা সম্পর্কে আলোচনা

মুযাফফর বিন মুহসিন সাহেবগণ আরেকটি আপত্তি উত্থাপন করতে পারেন যে, হাদীসটি ইবরাহীম নাখাঈর মুরসাল বর্ণনা। সুতরাং তা গ্রহণযোগ্য নয়। এই আপত্তির জবাব এই যে,  মুহাদ্দিসগণের নিকট ইবরাহীম নাখাঈর দুইটি মুরসাল বর্ণনা ব্যতীত সকল মুরসাল বর্ণনা সহীহ। যেমনটা আব্বাস আদ-দূরী-এর বর্ণনা অনুযায়ী ইয়াহ্ইয়া ইবনে মাঈন বলেছেন। আদ-দূরী বর্ণনা করেন, ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন বলেছেন :

وَمُرْسَلَاتُ اِبْرَاهِيْمَ النَّخَعِيِّ صَحِيْحَة إِلَّا حَدِيْثَ تَاجِر الْبَحْرَيْنِ وَحَدِيْثَ الضّحْكِ فِي الصَّلَاةِ.

তাজেরুল বাহরাইন ও সালাতে হাসার কারণে ওযূ ভাঙা সংক্রান্ত হাদীস দুইটি ব্যতীত ইবরাহীম নাখাঈর সকল মুরসাল বর্ণনা সহীহ। -তারীখে ইবনে মাঈন, ভুক্তি নং ৯৫৮

আল্লামা ইব্ন আবদুল বার রাহ.-এর ভাষা দ্বারা তো বুঝা যায় যে, এটি শুধু ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন নয় বরং সকল মুহাদ্দিসের অভিমত। তিনি বলেন,

فَمَراسِيْلُ سَعِيْدِ بْنِ الْمُسَيِّبِ وَمُحَمَّدِ بْنِ سِيْرِيْنَ وَإِبْرَاهِيْمَ النَّخَعِيِّ عِنْدَهُمْ صِحَاحٌ.

সাঈদ ইবনুল মুসায়িব, মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন এবং ইবরাহীম নাখাঈর মুরসাল বর্ণনাসমূহ তাঁদের (তথা মুহাদ্দিসগণের) মতে সহীহ। -আত তামহীদ লিমা ফিল মুআত্তা মিনাল মাআনী ওয়াল আসানীদ, খ- ১, পৃষ্ঠা ৩০

 

দলীল-৩

 সাহাবীগণের শিষ্যগণ ইকামতের বাক্যগুলো দুবার করে বলতেন।

জোড়া জোড়া বাক্যে ইকামত : হাদীস-

আবূ ইসহাক রাহ. বলেন :

كَانَ أَصْحَابُ عَلِيٍّ وَ أَصْحَابُ عَبْدِ الله يَشْفَعُوْنَ الْأَذَانَ وَالْإِقَامَةَ (أخرجه ابن أبي شيبة، رقم الحديث ২১৫৪)

আলী রাযি.-এর শিষ্যগণ এবং আবদুল্লাহ (ইব্ন মাসঊদ রাযি.)-র শিষ্যগণ আযান ও ইকামতের বাক্যগুলো দুইবার করে বলতেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবাহ, হাদীস ২১৫৪

 

হাদীসটির উপর কৃত আপত্তি নিয়ে আলোচনা

মুযাফফর বিন মুহসিন সাহেবরা ইন্টারনেটে হাদীসটির উপর আপত্তি উত্থাপন করে লিখেছেন : এর সনদে হাজ্জাজ বিন আরতাত বর্ণনাকারী আছে। তিনি যদিও সত্যবাদী কিন্তু ব্যাপক ভুল করতেন, তিনি মুদাল্লিস। তাছাড়া তার শিক্ষক আবূ ইসহাক বর্ণনাতে ইখতিলাত (কমবেশী) করতেন। সর্বোপরি হাদীসটি যঈফ। যারা সনদটিকে সহীহ দাবী করেন তাদেরকে প্রমাণ করতে হবে- হাজ্জাজ তার উস্তায থেকে ইখতিলাতের পূর্বে বর্ণনাটি শুনেছেন। তর্কের খাতিরে সনদটিকে সহীহ ধরে নিলেও বর্ণনাটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত নবী (স) এর সাথে সম্পৃক্ত মারফু হাদীসের বিরোধী বিধায় পরিত্যাজ্য।

হাজ্জাজ সম্পর্কে তাকরীবুত তাহযীবে লিখিত বক্তব্য উদ্ধৃত করে দিয়েই গবেষণার এ্যানার্জি ফুরিয়ে গেল? তাহলে জেনে নিন যে, হাঁ হাজ্জাজ ইবন্  আরতাত মুদাল্লিস ছিলেন। তৃতীয় স্তরের মুদাল্লিস। কিন্তু এই স্তরের মুদাল্লিস রাবীর হাদীস শর্তহীনভাবে যঈফ হয়ে যায় না। আমরা  জানি যে, তৃতীয় ও চতুর্থ স্তরের মুদাল্লিস রাবী যদি সত্যবাদী হন আর তিনি মারবী আনহু থেকে শুনেছেন বলে স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেন তাহলে তাঁর হাদীস গ্রহণযোগ্য হয়। (দ্রষ্টব্য :  আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী প্রণীত তাবাকাতুল মুদাল্লিসীন-এর ভূমিকা।) এই কারণেই হাজ্জাজ ইবনুল আরতাত সম্পর্কে আবূ হাতেম রাযি বলেছেন,

اِذَا قَالَ حَدَّثَنَا فَهُوَ صَالِحٌ لَايُرْتَابُ فِي صِدْقِهِ وَحِفْظِهِ اِذَا بَيَّنَ السَّمَاعَ.

অর্থাৎ হাজ্জাজ যখন বলেন حَدَّثَنَا   (অমুকে আমাদের নিকট বর্ণনা করেছে) তখন তাঁর বর্ণনা হয় শুদ্ধ। তাঁর সত্যবাদিতা ও স্মৃতিশক্তিতে তখন সন্দেহের অবকাশ থাকে না, যখন তিনি শ্রবণ করেছেন বলে স্পষ্টরূপে ব্যক্ত করেন।

এখন হাদীসটির সনদটি দেখুন, তিনি কীভাবে বর্ণনা করেছেন। সনদটি এইরূপ :

حَدَّثَنَا عَفَّانُ، قَالَ : حَدَّثَنَا عَبْدُ الْوَاحِدِ بْنُ زِيَادٍ، قَالَ : حَدَّثَنَا الْحَجَّاجُ بْنُ أَرْطَاةَ، قَالَ : حَدَّثَنَا أَبُو إِسْحَاقَ، قَالَ : ...

নিশ্চয়ই দেখতে পেয়েছেন যে, তিনি حدثنا  শব্দ ব্যবহার করে বলেছেন, حدثنا أبو إسحاق  (আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন আবূ ইসহাক)। তাহলে হাজ্জাজ মুদাল্লিস হওয়ার কারণে এই হাদীসটি কী করে যঈফ হবে? আশ্চর্যের বিষয় হল, ‘আউয়াল ওয়াক্তে সালাত আদায় মুস্তাহাব- এই দাবি প্রমাণ করতে গিয়ে মুযাফফর বিন মুহসিন সাহেব বাকিয়্যাহ ইবনুল ওয়ালীদ কর্তৃক বর্ণিত একটি হাদীসকে প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অথচ তিনি ছিলেন আরও নীচের স্তরের মুদাল্লিস। চতুর্থ স্তরের মুদাল্লিস। তদুপরি তিনি হাদীসটি বর্ণনা করেছেন আন শব্দ দ্বারা। তো দেখা যাচ্ছে যে, মুযাফফর বিন মুহসিন সাহেবগণ তাঁদের হঠকারিতা বজায় রাখতে গিয়ে চতুর্থ স্তরের মুদাল্লিস রাবীর মুআনআন হাদীসকেও প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেন, আর অপেক্ষাকৃত উঁচু স্তরের রাবীর তথা তৃতীয় স্তরের মুদাল্লিস রাবীর বর্ণনাকে যঈফ হিসেবে সাব্যস্ত করেন, যদিও তা বর্ণিত হয় حدثنا  শব্দ দ্বারা। বড় চমৎকার তাঁদের সত্যনিষ্ঠতা! চমৎকার তাঁদের গবেষণা!

 আর তিনি ব্যাপক ভুল করতেন হাজ্জাজ সম্পর্কে এই উক্তিটি একটি অতিশয়োক্তি। বাড়াবাড়ি রকমের উক্তি। আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. কর্তৃক কৃত মন্তব্যের উপর টীকা লিখতে গিয়ে শুআইব আলআরনাউত ও বাশ্শার আওয়াদ মারূফ লিখেছেন-

اَمَّا وَصْفُهُ بِكَثْرَةِ الْخَطَإِ فَمِنَ الْمُبَالَغَةِ

আর অধিক ভুলকরণের দোষে তাঁকে দোষী বলে উক্তিকরণ একটি অতিশয়োক্তি।

হাজ্জাজ ইবনে আরতাত সম্পর্কে আলকাশেফ নামক সংক্ষিপ্ত চরিতাভিধানে আল্লামা যাহাবী লিখেছেন :

اَحَدُ الْاَعْلَامِ عَلَى لِيْنٍ فِيْهِ، عَنْ عِكْرِمَةَ وَعَطَاءٍ وَ عَنْهُ شُعْبَةُ وَعَبْدُ الرَّزَّاقِ وَخَلْقٌ، قَالَ الثَّوْرِي : مَا بَقِيَ اَحَدٌ اَعْلَمُ بِمَا يَقُوْلُ مِنْهُ، وَ قَالَ حَمَّادٌ بْنُ زَيْدٍ : كَانَ أَفْهَمَ لِحَدِيْثِه مِنْ سُفْيَانَ، وَ قَالَ اَحْمَدُ : كَانَ مِنْ حُفَّاظِ الْحَدِيُثِ. وَقَالَ الْقَطَّانُ : هوَ وَ اِبْنُ اِسْحَاقَ عِنْدِي سَوَاءٌ. وَ قَالَ اَبُوْ حَاتِمٍ : صَدُوْقٌ يُدَلِّسُ، فَاِذَا قَالَ حَدَّثَنَا فَهُوَ صَالِحٌ. وَ قَالَ النَّسَائي : لَيْسَ بِالْقَوِيِّ، مَاَتَ ১৪৫ م قرنه

অর্থাৎ কিছুটা দুর্বলতা তাঁর মধ্যে বিদ্যমানতা সত্ত্বেও তিনি প্রবাদতুল্য মুহাদ্দিসগণের একজন। তিনি বর্ণনা করেছেন ইকরিমা, ‘আতা থেকে। আর তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন শুবা ও আবদুর রাযযাক এবং আরও অনেকে। ছাওরী বলেন,  কী বলা হচ্ছে তা জেনে বুঝে বলার ক্ষেত্রে হাজ্জাজ ইবনে আরতাত অপেক্ষা অধিক জ্ঞানী আর কেউ বর্তমানে অবশিষ্ট নেই। হাম্মাদ ইবনে যায়েদ বলেন, সুফইয়ান অপেক্ষা হাজ্জাজ তাঁর হাদীসের অধিক বোদ্ধা ছিলেন। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বাল বলেন, তিনি ছিলেন হাফেজে হাদীসদের একজন। আলকাত্তান বলেছেন, হাজ্জাজ এবং ইবনে ইসহাক আমার মতে সমপর্যায়ের। আবূ হাতেম বলেন, সত্যনিষ্ঠ, তাদলীস করে থাকেন। সুতরাং তিনি যখন বলেন, حدثنا  তখন তিনি গ্রহণযোগ্য। নাসাঈ বলেন, শক্তিশালী নন।

মুহতারাম, হাজ্জাজ সম্পর্কে উপরিউক্ত উদ্ধৃতিসমূহ এবং আমার পর্যালোচনা দ্বারা যে সার কথাটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে তা এই যে, হাজ্জাজ কিছুটা দুর্বল রাবী ছিলেন। কিন্তু তাঁর দুর্বলতা এই পর্যায়ের নয় যদ্দ¦ারা তাঁর হাদীসকে যঈফ বলা যায়। বরং তাঁর হাদীস কমপক্ষে হাসান পর্যায়ের। আলকাত্তান যেমনটা বলেছেন যে, হাজ্জাজ এবং ইবনে ইসহাক তাঁর মতে সমপর্যায়ের। আর ইবনে ইসহাকের হাদীসকে হাসান পর্যায়ের বলে গণ্য করা হয়। ইবনে ইসহাক কর্তৃক বর্ণিত বেজোড় বাক্যে ইকামত সংক্রান্ত একটি হাদীসকে আমি হাসানই বলে এসেছি। আর হাজ্জাজের তাদলীসের বিষয়টি সম্পর্কে পূর্বেই বলেছি যে, তিনি ছিলেন, তৃতীয় স্তরের মুদাল্লিস। যে স্তরের মুদাল্লিসগণ حدثنا  শব্দ দ্বারা হাদীস বর্ণনা করলে তাঁদের হাদীস গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়ে থাকে। হাজ্জাজ সম্পর্কে ইমাম আবূ হাতেম তেমনটাই বলেছেন।   

 

 দলীল -

ইবরাহীম নাখাঈর ফতোয়া

হাদীস-

ইবরাহীম নাখাঈ বলেন,

اَلْاَذَانُ وَالْإِقَامَةُ مَثْنَى مَثْنَى

আযান ও ইকামত দুইবার দুইবার করে। -ইমাম মুহাম্মাদ, কিতাবুল হুজ্জাহ আলা আহলিল মাদীনাহ, পৃষ্ঠা ২২

ইবরাহীম নাখাঈর উক্তিটি বর্ণনা করেছেন হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমান এবং তাঁর থেকে ইমাম আবূ হানীফা রাহ.। হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমান সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করে এসেছি। তাঁকে যঈফ সাব্যস্তকরণ ধোপে টেকে না। তাঁর হাদীস কমপক্ষে হাসান পর্যায়ের। আর আবূ হানীফা রাহ.-এর ব্যাপারে তো মুযাফফর বিন মুহসিন সাহেবদের এ্যালার্জি আছে। কাজেই তাঁর ব্যাপারে তাঁরা যাচ্ছে তা বলবেন তা জানা কথা। তবে মনে রাখতে হবে যে, চামচিকার চেঁচামেচিতে বা সারমেয়র ঘেউ ঘেউতে চাঁদের আলোর কোনো ক্ষতি হয় না, চাঁদের আলো নিষ্প্রভ হয়ে যায় না। চাঁদের আলো সর্বদা উজ্জ্বলই থাকে। চাঁদ তার উজ্জ্বল ও ¯িœগ্ধ আলোয় রাতের পৃথিবীকে আলোকিত করে তোলে, কমনীয় ও মোহনীয় করে তোলে।   

 

ইবরাহীম নাখাঈর উক্তি

জোড় বাক্যে ইকামত : হাদীস-

ইবরাহীম নাখাঈ রাহ. বলেন :

لاَ تَدَعْ أَنْ تُثَنِّيَ الإِقَامَةَ ইকামতের বাক্যগুলো দুবার করে বলতে ছাড়বে না। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবাহ, হাদীস ২১৫৩  

এই হাদীসে একজন রাবী আছেন মুহাম্মাদ ইবনে আবী লায়লা। তিনি আসলে মুহাম্মাদ ইবনে আবদির রহমান ইবনে আবী লায়লা। দাদার সাথে সম্পৃক্ত করে তাঁকে বলা হয় মুহাম্মাদ ইবনে আবী লায়লা। তাঁর সম্পর্কে মুযাফফর বিন মুহসিন সাহেবগণ ইন্টারনেটে আপত্তি উত্থাপন করে বলেছেন যে, তিনি যঈফ।

আমি বলব যে, হাঁ অনেকেই তাঁকে যঈফ বলেছেন। তবে কেউ কেউ তাঁকে বিশ^স্তও বলেছেন। আল্লামা ইজলী বলেছেন, صَدُوْقٌ ثِقَةٌ  তিনি সত্যনিষ্ঠ ও বিশ^স্ত। দারাকুতনী তাঁর সুনানে (১/১২৪) বলেছেন, ثِقَةٌ فِي حِفْظِه شَيء  তিনি বিশ্বস্ত, তবে তাঁর স্মৃতিশক্তিতে কিছু সমস্যা ছিল। সকলের মতামতকে সামনে রেখে আল্লামা যাহাবী তাঁর তাযকিরাতুল হুফ্ফায গ্রন্থে বলেছেন,  

حَدِيْثُهُ فِي وَزْنِ الْحَسَنِ وَ لَايَرْتَقِيْ إِلى الصِّحَّةِ لِأَنَّهُ لَيْسَ بِالْمُتقِنِ عِنْدَهُمْ.

অর্থাৎ তার হাদীস হাসান মানের। সহীহের মানে তার হাদীস উন্নীত হবে না। কারণ, তিনি মুহাদ্দিসগণের দৃষ্টিতে সুদৃঢ় ছিলেন না।

হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. তাকরীবুত তাহযীব গ্রন্থে তাঁর সম্পর্কে বলেছেন,صَدُوْقٌ سَيِّءُ الْحِفْظِ  তিনি সত্যনিষ্ঠ, দুর্বল স্মৃতিশক্তিসম্পন্ন। হাফেজ সাহেব তাঁর এই গ্রন্থে যে সকল রাবী সম্পর্কে صَدُوْقٌ سَيّءُ الْحِفْظِ  শব্দ ব্যবহার করেছেন তাদেরকে তিনি পঞ্চম স্তরের রাবী হিসেবে গণ্য করেছেন। যাদেরকে তিনি ষষ্ঠ স্তরের রাবী হিসেবে গণ্য করেছেন তাদের সম্পর্কে তিনি মাকবূল শব্দ ব্যবহার করেছেন। আর কিতাবটির ভূমিকায় তিনি উল্লেখ করেছেন যে, মাকবূল শব্দটি তিনি তাদের সম্পর্কেই ব্যবহার করেছেন যাদের থেকে খুব স্বল্প সংখ্যক হাদীস বর্ণিত হয়েছে, কিন্তু তাদের এমন কোনো দোষের প্রমাণ পাওয়া যায় না, যে দোষের কারণে তাদের হাদীসকে বর্জন করা যায়। তবে এটা তখনই যদি তাদের হাদীসের মুতাবি বা সমর্থক হাদীস পাওয়া যায়। নতুবা তাদের সম্পর্কে তিনি لَيِّنُ الْحَدِيْثِ শব্দ ব্যবহার করেছেন। সপ্তম স্তর থেকে তিনি শুরু করেছেন যঈফ শব্দসহ অন্যান্য শব্দের ব্যবহার। যে শব্দগুলো রাবীর হাদীসকে যঈফ, মাতরূক, জাল বলে নির্দেশ করে। দেখা যাচ্ছে যে, ষষ্ঠ স্তরের মাকবূল রাবীর হাদীসকেও তিনি শর্ত নিরপেক্ষভাবে যঈফ বলে মনে করেন না। তিনি মাকবূল রাবীর হাদীসকে যঈফ বলে গণ্য করেন তখন যখন তার হাদীসের কোনো মুতাবি পাওয়া না যায়। অতএব এর এক স্তরের উপরের রাবী- যার সম্পর্কে তিনি صَدُوْقٌ سَيِّء الْحِفْظِ  শব্দ ব্যবহার করেন তার হাদীসকে যে তিনি শর্তনিরপেক্ষভাবে যঈফ বলে মনে করেন না তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আর এ কারণেই তিনি তাঁর نَتَائِجُ الْأَفْكَارِ গ্রন্থে মুহাম্মাদ ইবনে আবী লায়লা সম্পর্কে বলেছেন,

إِنَّ مُحَمَّدًا ابْنَ أَبِي لَيْلى صَدُوْقٌ وَإِنْ ضَعَّفَّهُ بَعْضُهُمْ مِنْ جِهْةِ حِفْظِهِ.

অর্থাৎ মুহাম্মাদ ইবনে আবী লায়লা সত্যনিষ্ঠ, যদিও কেউ কেউ তাঁকে তাঁর স্মৃতিশক্তির দুর্বলতার কারণে যঈফ বলেছেন। (নাতাইজুল আফকার খ- ১, পৃষ্ঠা ১৩৭)

মুহাম্মাদ ইবনে আবী লায়লাকে তাঁর স্মৃতিশক্তির বিবেচনায় কেউ কেউ যঈফ বললেও তিনি সাদূক বা সত্যনিষ্ঠ- হাফেজ ইবনে হাজার রাহ.-এর এই ভাষা ইঙ্গিত করে যে, তিনি মুহাম্মাদ ইবনে আবী লায়লাকে ঢালাওভাবে বা শর্তনিরপেক্ষভাবে  যঈফ বলার পক্ষপাতি নন। তাঁর হাদীসকে প্রাসঙ্গিক লক্ষণাবলী দ্বারা যঈফ সাব্যস্ত করা যেতে পারে, কারণ তিনি দুর্বল স্মৃতিশক্তিসম্পন্ন ছিলেন। অপরদিকে প্রাসঙ্গিক লক্ষণাবলী দ্বারা তাঁর হাদীস হাসান স্তরেরও হয়ে যেতে পারে।

 আমি মনে করি, মুহাম্মাদ ইবনে আবী লায়লার হাদীসকে শর্তনিরপেক্ষভাবে হাসান বলে ব্যক্তকৃত আল্লামা যাহাবীর মতের সঙ্গে যেমন সহমত পোষণ করা যায় না তেমনই তার হাদীসকে শর্তনিরপেক্ষভাবে যঈফ বলে যাঁরা মত ব্যক্ত করেছেন তাঁদের সঙ্গেও সহমত পোষণ করা যায় না। বরং এতদুভয়ের মাঝামাঝি অবস্থানকেই শ্রেয় বলে মনে করি। অর্থাৎ মনে করি যে, তাঁর হাদীস অন্য হাদীস দ্বারা সমর্থিত হলে তাঁর সেই হাদীসকে হাসান বলা যায়। অপরদিকে তাঁর হাদীস অন্য হাদীসের জন্য সমর্থক হওয়ার যোগ্যতা রাখে। তাঁর হাদীস এরূপ হাসান নয়, যা স্বতন্ত্র দলীল হওয়ার যোগ্যতা রাখে। আবার এরূপ যঈফ নয়, যা বর্জনযোগ্য। বরং এরূপ যঈফ, যা গ্রহণযোগ্য।

ইকামত সংক্রান্ত ইবরাহীম নাখাঈর যে উক্তিটি ইমাম মুহাম্মাদ রাহ. কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে তা নিঃসন্দেহে সহীহ; কেননা, আমরা আগেই বলেছি যে, উক্তিটি সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে। আর তা যেহেতু মুহাম্মাদ ইবনে আবী লায়লার সনদে বর্ণিত ইবরাহীম নাখাঈর উক্তি সংক্রান্ত বর্ণনাটিকে সমর্থন করে এবং জোরালোভাবে সমর্থন করে সেহেতু মুহাম্মাদ ইবনে আবী লায়লার বর্ণনাটিকে হাসান হিসাবে গ্রহণ না করার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না।

 

দলীল-

মক্কার মুয়াযযিন হযরত আবূ মাহযূরাহ রাযি.-কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইকামতের বাক্যগুলো দুইবার দুইবার করে বলতে শিখিয়েছিলেন

 

জোড় বাক্যে ইকামত : হাদীস-

 

আবূ মাহযূরাহ রা. বলেন,

عَلَّمَنِي النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم الأَذَانَ تِسْعَ عَشْرَةَ كَلِمَةً وَالإِقَامَةَ سَبْعَ عَشْرَةَ كَلِمَةً، الأَذَانُ : اللَّهُ أَكْبَرُ، اللَّهُ أَكْبَرُ، اللَّهُ أَكْبَرُ، اللَّهُ أَكْبَرُ، ... وَالإِقَامَةُ : اللَّهُ أَكْبَرُ، اللَّهُ أَكْبَرُ، اللَّهُ أَكْبَرُ، اللَّهُ أَكْبَرُ، أَشْهَدُ أَنْ لاَّ إلهَ إِلاَّ اللهُ، أَشْهَدُ أَنْ لاَّ إلهَ إِلاَّ اللهُ، أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَّسُولُ اللهِ، أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَّسُولُ اللهِ، حَيَّ عَلَى الصَّلاَةِ، حَيَّ عَلَى الصَّلاَةِ، حَيَّ عَلَى الْفَلاَحِ، حَيَّ عَلَى الْفَلاَحِ، قَدْ قَامَتِ الصَّلاَةُ، قَدْ قَامَتِ الصَّلاَةُ، اللَّهُ أَكْبَرُ، اللَّهُ أَكْبَرُ، لاَ إلهَ إِلاَّ اللَّهُ.

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে আযানের কালিমা শিখিয়েছেন ১৯টি এবং ইকামতের কালিমা শিখিয়েছেন ১৭টি। আযানের কালিমাগুলো হল, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার; আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার।... আর ইকামতের কালিমাগুলো হল, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার; আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ; আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ, আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ; হাইয়া আলাস সালাহ, হাইয়া আলাস সালাহ; হাইয়া আলাল ফালাহ, হাইয়া আলাল ফালাহ; কাদ কামাতিস সালাহ, কাদ কামাতিস সালাহ; আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার; লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবাহ, হাদীস ২১৩২; সুনানে আবূ দাউদ, হাদীস ৫০২

উল্লেখ্য, হাদীসটি মুসলিম শরীফেও উদ্ধৃত হয়েছে। তবে সেখানে ইকামতের বিবরণ আসেনি। তার কারণ, রাবী হাদীসটিকে সংক্ষিপ্তরূপে বর্ণনা করেছেন। আর এই সংক্ষেপায়ণের কারণ সম্ভবত এই যে, আবূ মাহযূরার আযানের  তারজী  বিষয়টিকেই রাবী হাইলাইট করতে চেয়েছেন। রাবীর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত ছিল তারজীর বিবরণ দানের উপর। ফলে তিনি ইকামতের বিবরণ দান করেননি। এর প্রমাণ হল, হাদীসটিতে রাবী আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ও আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ চারবার করে উল্লেখ করেছেন অথচ আযানের শুরুতে আল্লাহু আকবার চারবারের স্থলে দুইবার উল্লেখ করেছেন, অথচ আবূ মাহযূরা রাযি.-এর আযানেও আল্লাহু আকবার চারবার ছিল। এরূপ বিবরণ দানের কারণ এ ছাড়া আর কিছুই নয় যে, রাবী তাঁর বর্ণনায় তারজীর বিষয়টাকে প্রাধান্য দান করেছেন এবং হাদীসটিকে সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণনা করেছেন।

 

জোড় বাক্যে ইকামত : হাদীস-

আবূ মাহযূরা রা. বলেন,

أَنَّ النَّبِيَّ صلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَّمَهُ الأَذَانَ تِسْعَ عَشَرَةَ كَلِمَةً وَالْإِقَامَةَ سَبْعَ عَشَرَةَ كَلِمَةً.

অর্থাৎ আবূ মাহযূরা রা. বলেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে আযানের বাক্য শিক্ষা দিয়েছেন ১৯টি এবং ইকামতের বাক্য শিক্ষা দিয়েছেন ১৭টি। -জামে তিরমিযী, হাদীস ১৯২; সুনানে দারিমী, হাদীস ১১৯৬, ১১৯৭; নাসাঈ, হাদীস ৬৩০

আবূ মাহযূরাহ রা.-এর উপরিউক্ত হাদীস দুটির রাবীগণের ভাগ্য সুপ্রসন্ন যে, মুযাফফর বিন মুহসিন সাহেবগণ তাঁদের কারও উপর কোনো অন্যায় আক্রমণ করেননি। মুযাফফর বিন মুহসিন সাহেবগণের স্বভাবসুলভ আচরণের দাবি অনুযায়ী তাঁদের এই কথা বলাই স্বাভাবিক ছিল যে, হাদীস দুটির অমুক রাবী মুদাল্লিস, তমুক রাবী ইখতিলাতের শিকার, অমুক রাবী যঈফ ইত্যাদি। এটা শুধু হাদীস দুটির রাবীগণের জন্যই সৌভাগ্যজনক নয় বরং মুযাফফর বিন মুহসিন সাহেবগণের জন্যও সৌভাগ্যজনক। কারণ, হাদীসের রাবীগণকে অন্যায় অভিযোগে অভিযুক্ত করার দ্বারা নিজের জন্য জাহান্নামের পথ সুগম করা ছাড়া আর কোনো লাভ হয় না।

তবে মুযাফফর বিন মুহসিন সাহেবগণ ইন্টারনেটে হাদীস দুটির একটি উদ্ভট ব্যাখ্যা ও জবাব দাঁড় করেছেন। তাঁরা বলেছেন,

(ক) উক্ত হাদীসে দুই অশহাদু দুইবার করে বলার পর পুণরায় দুইবার বলা হয়েছে। একে বলা হয় তারজী আযান। ফলে আযানের মোট বাক্য হয় ১৯টি। কিন্তু হানাফীদের কাছে এই তারজী আযান গ্রহণযোগ্য নয়। আবার তারাই তারজীযুক্ত আযানের সাথে সম্পৃক্ত ইকামতটি মেনে থাকেন। যা তাদের স্ববিরোধী নীতি। অর্থাৎ মনমত হলে তারা হাদীস গ্রহণ করেন, অন্যথায় বর্জন করেন।

(খ) যখন আযান তারজী হবে তখন ইকামত জোড়া হবে। অর্থাৎ যে মুয়াযযিন তারজী তথা ১৯ বাক্যের আযান দিবেন তিনি জোড়া তথা ১৭ বাক্যের ইকামত দিবেন। বুঝা গেল, সর্ববস্থায় আযানের বাক্য থেকে ইকামতের বাক্য সংখ্যা কম হবে।

(গ) যেহেতু হানাফীগণ তারজী আযান অস্বীকার করে থাকেন এবং বলেন : এটা সাহাবী আবূ মাহযুরাহ (রা) এর শেখানোর জন্য ছিল। সেহেতু উক্ত ইকামতের পদ্ধতির ক্ষেত্রেও সেই ব্যাখ্যাই তাদের পক্ষ থেকে আসা উচিত।

(ঘ) যেহেতু আযানের ক্ষেত্রে হানাফীরা সহীহ মুসলিমের সাহাবী বিলাল (রা) থেকে তারজীহীন আযানের অনুসরণ করেন সেহেতু ইকামতের ক্ষেত্রে ঐ হাদীসের বেজোড় বাক্যকে গ্রহণ করবেন। অন্যথায় তাদের আমল ও দলীল তাদের বিপক্ষে যায়।

(ক) চিহ্নযুক্ত বক্তব্যের এক পর্যায়ে তাঁরা বলেছেন, কিন্তু হানাফীদের কাছে এই তারজী আযান গ্রহণযোগ্য নয়। আমি বলব যে, মুযাফফর বিন মুহসিন মহোদয়গণ! কথা বলতে বা লিখতে আপনাদের আরও পড়াশোনার প্রয়োজন আছে। হানাফীরা তারজীযুক্ত আযানকে কখনওই অগ্রহণযোগ্য বলেন না। তাঁরা তারজীযুক্ত আযানকেও গ্রহণযোগ্য বলেন, কিন্তু তাঁরা প্রাধান্য দিয়ে থাকেন তারজীবিহীন আযানকে, ব্যস এই পর্যন্তই। তারজীযুক্ত আযানকে তাঁরা গ্রহণযোগ্যতার গ-ি থেকে কখনওই বের করে দেননি। তাঁদের পরিবেশিত তথ্যটি তাঁরা কোথায় পেলেন তা তাঁরা  জানাবেন কি?

(খ) চিহ্নযুক্ত বক্তব্যে তাঁরা যে মূলনীতি উল্লেখ করেছেন সেই মূলনীতিটি তাঁরা কোন্ হাদীসে পেয়েছেন তাঁরা বলবেন কি?

মুহতারাম, আপনার মাধ্যমে তাঁদের জ্ঞাতার্থে বলছি যে, প্রবাদতুল্য ও অনন্যসাধারণ মুহাদ্দিস ও ফকীহ,  ইমাম মালেক ও ইমাম শাফিঈ (রাহিমাহুমাল্লাহ) উভয়েই আবূ মাহযূরাহ রা.-এর তারজীযুক্ত আযানকে প্রাধান্য দান করেছেন। কিন্তু ইকামতের ক্ষেত্রে তাঁরা বিলাল রা.-এর বেজোড় বাক্যের ইকামতকে প্রাধান্য দান করেছেন। তারজীযুক্ত আযান আর জোড় বাক্যের ইকামত যদি একটি আরেকটির জন্য অপরিহার্য হয়ে থাকে তাহলে তাঁরা তারজীযুক্ত আযানকে গ্রহণ করে জোড় বাক্যের ইকামতকে পরিহার করলেন কেন? আর তারপরও মুযাফফর বিন মুহসিন সাহেবগণ অভিযোগের তীর শুধু হানাফীদের দিকে ছুঁড়ে দিলেন কেন? হানাফীদের ব্যাপারে তাঁদের এত এ্যালার্জি কেন? হানাফীদের সবকিছুতেই তাঁদের এত গা জালা কেন?

(গ) চিহ্নযুক্ত বক্তব্যে তাদের প্রথম বাক্যের জবাবে বলব, না, হানাফীরা তারজীযুক্ত আযানকে অস্বীকার করেন না। তাঁরা শুধু তারজীবিহীন আযানকে তারজীযুক্ত আযানের উপর প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। ব্যস এই পর্যন্তই। উভয় ধরনের আযানকেই তাঁরা শরীয়তসম্মত মনে করেন। কোনোটাকেই সুন্নাহ-বহির্ভূত বলেন না। এরপর মুযাফফর বিন মুহসিন সাহেবগণের দাবি হল, হানাফীরা যেহেতু বলেন, এটা (তথা তারজীযুক্ত আযান) আবূ মাহযূরাহকে শেখানোর জন্য ছিল সেহেতু তাঁর ইকামতের ব্যাপারেও সেই ব্যাখ্যাই তাঁদের থেকে আসা উচিত।

এ সম্পর্কে আমার বক্তব্য হল, প্রথম কথা হল, ফিকহে হানাফীর কিতাব হিদায়াহতে যে ব্যাখ্যা করা হয়েছে তা একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা। চূড়ান্ত ব্যাখ্যা নয়। আরও ব্যাখ্যা আছে সেটি পরে বলছি। হিদায়াহ প্রণেতার ব্যাখ্যাকে মেনে নিলেও বলব যে, আযানের ক্ষেত্রে  ঐ ব্যাখ্যা দ্বারা এটা অপরিহার্য হয় না যে, ঐ একই ব্যাখ্যা ইকামতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বলে বলতে হবে। তার কারণ, আবূ মাহযূরাহ রা.-কে শেখাতে গিয়ে তাঁকে দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ চারবার করে বলিয়েছিলেন তার কারণ, আবূ মাহযূরাহ রা. আযানের বাক্য নিয়েই ঠাট্টা করছিলেন। ইকামতের বাক্যগুলো নিয়ে নয়। সুতরাং একই ব্যাখ্যা ইকামতের বাক্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় না।                                  

দ্বিতীয় আরেকটি ব্যাখ্যা হল এইরূপ :  রাসূলুল্লাহ যখন আবূ মাহযূরাহ রা.-কে আযান শিক্ষা দেন তখন আবূ মাহযূরাহ রা. ছিলেন ছোট্ট বালক। হুনায়নের যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুয়াযযিন যখন আযান দিচ্ছিলেন তখন এই ছোট্ট বালক তার বালসুলভ স্বভাব অনুযায়ী মুয়াযযিনের বাক্যগুলোকে ঠাট্টাস্বরূপ উচ্চারণ করতে থাকে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তাকে স্নেহভরে কাছে ডেকে আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ও আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ বলতে বলেন। উভয় বাক্য দুই দুইবার করে নিম্নস্বরে তাঁকে দিয়ে উচ্চারণ করান। এর ফলে আবূ মাহযূরাহর অন্তরে ঈমানের আলো প্রজ্জ্বলিত হয়। এরপর আবার তাঁকে দিয়ে দুই দুইবার করে উভয় বাক্য উচ্চস্বরে উচ্চারণ করান। প্রথমে দুইবার আস্তে উচ্চারণ করানোর দ্বারা রাসূলের উদ্দেশ্য ছিল, আবূ মাহযূরাহর অন্তরে ইখলাস সৃষ্টি করা, ঈমানের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি করা এবং ঈমানের বীজ বপন করে দেওয়া। আর এই উদ্দেশ্য সফল করতে উচ্চস্বরের তুলনায় নিম্নস্বরে উচ্চারণ করানোটা ছিল অধিক ফলপ্রসূ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উদ্দেশ্য সফল হয়েছিল। হযরত আবূ মাহযূরাহ রা. এরই বরকতে ইসলাম গ্রহণ করার মহা সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন। এরপর দুইবার করে উচ্চস্বরে বাক্যদুটিকে বলতে বলেছিলেন আযানের অংশ হিসাবে। পরবর্তীতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাঁকে মক্কার মুয়াযযিন নিযুক্ত করলেন তখন তিনি আবূ মাহযূরাহ রা.-এর আযানে শাহাদাতাইনকে তথা দুই আশহাদুকে চারবার করেই রেখে দিয়েছিলেন। কারণ এরই বরকতে তিনি ইসলাম গ্রহণ করার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন। ফলে তারজীযুক্ত আযান হয়ে গিয়েছিল একমাত্র আবূ মাহযূরাহ রা.-এর জন্য বিশেষ রীতি। ব্যাপকভাবে সকলের জন্য নয়। তাই আমরা তারজীযুক্ত আযানের উপর ব্যাপক রীতির আযান তথা দুইবার করে আশহাদু বলার রীতিকে প্রাধান্য দান করেছি। কিন্তু ইকামতের বিষয়টি ভিন্ন। কারণ, আবূ মাহযূরাহ রা. ইকামতের সময় কোনো ঠাট্টা করেননি। তাঁকে জোড়া জোড়া বাক্যে ইকামত শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল আযানের উৎস আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদ রা.-এর দেখা স্বপ্নের ইকামত অনুযায়ী। বাকি রইল এই প্রশ্ন যে, তাহলে বিলাল রা.-কে ইকামতের বাক্যগুলো একবার করে বলতে শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল কেন? কেন তাঁকে আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদ রা.-এর স্বপ্ন অনুযায়ী জোড়া জোড়া বাক্যে ইকামত শিক্ষা দেওয়া হল না?

মুহতারাম, এর প্রকৃত হিকমত ও রহস্য তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই জানেন। তবে আমরা অন্যান্য ক্ষেত্রের ন্যায় এ ক্ষেত্রেও এই হিকমতের কথা ব্যক্ত করি যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ক্ষেত্রে প্রশস্ততা সৃষ্টি করেছেন, উভয় পদ্ধতিকেই সুন্নাহ হিসেবে গ্রহণযোগ্য বলে সাব্যস্ত করতে চেয়েছেন। ওয়াল্লাহু আলাম। আল্লাহই সর্বজ্ঞাত।

(ঘ) চিহ্নযুক্ত করে যে আপত্তি মুযাফফর বিন মুহসিন সাহেবগণ উত্থাপন করেছেন তার জবাব হবে (খ) চিহ্নযুক্ত তাদের বক্তব্যের জবাবের অনুরূপ। দেখুন, ইমাম মালেক রাহ. ও ইমাম শাফিঈ রাহ.-এর ন্যায় প্রবাদপুরুষ ফকীহ ও মুহাদ্দিসগণ আযানের ক্ষেত্রে আবূ মাহযূরাহ রা.-এর তারজীযুক্ত আযানকে প্রাধান্য দান করেছেন কিন্তু তাঁরা ইকামতের ক্ষেত্রে আবূ মাহযূরাহ রা.-এর ইকামতকে প্রাধান্য দান না করে বেজোড় বাক্যের ইকামতকে প্রাধান্য দান করেছেন। তাহলে তাদের বিরুদ্ধে এই আপত্তি উত্থাপন করা যাবে না কেন যে, তাঁরা যখন আযানের ক্ষেত্রে আবূ মাহযূরাহর তারজীযুক্ত আযানের অনুসরণ করেন সেহেতু তাঁদের উচিত ছিল আবূ মাহযূরাহ রা.-এর জোড় বাক্যের ইকামতের অনুসরণ করা। তবে আমরা এরূপ গর্দভ-মস্তিষ্কজাত আপত্তি উত্থাপন করতে চাই না। কারণ, আমি আগেই বলেছি যে, তারজীযুক্ত বা তারজীবিহীন আযানের সাথে জোড় বাক্যের ইকামত বা বেজোড় বাক্যের ইকামত অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত নয়। একটি আরেকটিকে অপরিহার্য করে তোলে না। তারজীযুক্ত আযানও সুন্নাহসম্মত, তারজীবিহীন আযানও সুন্নাহসম্মত। জোড় বাক্যে ইকামতও সুন্নাহসম্মত, বেজোড় বাক্যে ইকামতও সুন্নাহসম্মত। যে মুজতাহিদ যেটিকে প্রাধান্য দান করেছেন তো করেছেন। তাতে আপত্তির কিছু আছে বলে আমি মনে করি না। 

 



[1] ১ যার মধ্যে ইরজা রয়েছে তাকে মুরজী বলা হয়, অনেকের ক্ষেত্রে মুরজিয়া। মুরজী শব্দটি অপরিচিত বলেই এখানে একজনের ক্ষেত্রেও বহুর শব্দ মুরজিয়া ব্যবহার করা হয়েছে। তবে যে অর্থে হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমান রাহ.-কে মুরজী বলা হয়েছে, তা কোনো বিদআতী মতবাদ নয়। বরং তা অনেক ফকীহ ও মুহাদ্দিসের অভিমত। যদিও এ বিষয়ে  ২য় ও ৩য় শতাব্দীর অধিকাংশ মুহাদ্দিসের ভিন্ন মত ছিল। হাফিজুল হাদীস ইমাম শামসুদ্দীন যাহাবী তার কিতাব সিয়ারু আলামিন নুবালায় বিভিন্ন জায়গায় বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। এমনকি হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমানের জীবনীতেও (খ- : ৫, পৃষ্ঠা : ২৩৩)  তিনি লিখেছেন, والنزاع على هذا لفظي إن شاء الله (আবদুল মালেক)

[2] তার হাদীস দ্বারা দলীল গ্রহণ করা যায় নাকথাটি আবু হাতিম রাহ.-এর উস্তায ইবনে মায়ীনের অভিমত বিরোধী। এমনকি তার উস্তাযের উস্তায ইয়াহইয়া ইবনে সায়ীদ আলকাত্তানের অভিমতেরও বিরোধী। ইমাম আবু হানীফা রাহ., ইমাম আবু ইউসুফ রাহ. ও ইমাম মুহাম্মাদ রাহ. সহ হাদীস ও ফিকহের অনেক ইমামই তার হাদীসকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাই শামসুদ্দীন  যাহাবী রাহ. যখন সিয়ারেআবু হাতিম রাহ.-এর উক্তিটি উদ্ধৃত করেছেন  তখন তাঁর বক্তব্যের এই অংশটুকু ছেড়ে দিয়েছেন। দেখুন, ‘সিয়ারু আলামিন নুবালাখ- : ৫, পৃষ্ঠা : ২৩৪ (আবদুল মালেক)

[3] ৩ মাওলানা আব্দুল গাফফার দামাত বারাকতুহুম এখানে ছাড় দিয়ে কথা বলেছেন। আসল কথা হল, আসওয়াদ রাহ. হযরত আবু বকর রা., হযরত উমর রা., হযরত মুআয বিন জাবাল রা.সহ অনেক বড় বড় সাহাবায়ে কেরাম থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। হযরত আবু বকর রা. এবং হযরত উমর রা.-এর সাথে তিনি হজ্জের সফর করেছেন। হযরত উমর রা.-এর যমানায় তার মদিনা মুনাওয়ারার সফরও ইতিহাসে প্রমাণিত। তাই হযরত বিলাল রা.-এর সাথে তার সাক্ষাতের বিষয়টি একেবারেই স্বভাবিক। তাছাড়া তিনি হযরত বিলাল রা. থেকে বর্ণনাও করেছেন।  দেখুন, সুনানে নাসায়ী, হাদীস ৬৪৯। তাতে এই হাদীসটিই সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণিত হয়েছে। সেখানে ইবরাহীম থেকে বর্ণনাকারী হলেন আমাশ। আমাদের জানা মতে হাদীসের কোনো ইমাম এ বর্ণনাকে মুরসাল বা মুনকাতি বলেননি। আর না কোনো ইমাম ইরসাল বা তাদলীসকারীদের তালিকায় আসওয়াদ ইবনে ইয়াযিদ রাহ.-এর নাম উল্লেখ করেছেন। তাই হাফেয ইবনে আব্দুল হাদী রাহ. তানকীহুত তাহকীকেইবনুল জাওযীর বক্তব্যকে আপত্তিকর বলেছেন। (নসবুর রায়াহ, খ- : ১, পৃষ্ঠা : ২৬৯)। আলোচ্য হাদীসে হাম্মাদের বর্ণনায় যদিও রেওয়ায়েতের উপস্থাপন হয়েছে أن بلالا এ শব্দ দিয়ে কিন্তু আবু মাশার ও আমাশের বর্ণনায় এর উপস্থাপন হয়েছে عن بلال قال এর মাধ্যমে। যার স্বাভাবিক অর্থ হল, আসওয়াদ রহ. এ কথা সরাসরি হযরত বিলাল রা. থেকে বর্ণনা করেছেন। তাই কমপক্ষে ইমাম মুসলিম রাহ. ও অধিকাংশ মুহাদ্দিসীনের উসূল মুতাবেক এ বর্ণনা মুত্তাসিল হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। দেখুন, ‘তাহযীবুত তাহযীব’, খ- : ১, পৃষ্ঠা : ৩৪২-৩৪৩; ‘তাহযীবুল কামাল’, খ- : ২, পৃষ্ঠা : ২৫১-২৫২; ‘কিতাবুল জারহি ওয়াততাদীল, ইবনে আবী হাতিম, খ- : ১, পৃষ্ঠা : ২৯১-২৯২ (আবদুল মালেক)

আরও পড়ুন:   ইসলামের সৌন্দর্য-মাধুর্য | দ্বীনিয়াত | নামায-সালাত

কুরআন মজীদ ও সহীহ হাদীসের আলোকে মাহে রমযান