রবিউস সানি ১৪৩৮ . জানুয়ারি ২০১৭

পুরোনো সংখ্যা . বর্ষ: ১৩ . সংখ্যা: ০১

প্রতিবেশী : রামমন্দির

ইন্ডিয়া ডটকম-এর উদ্ধৃতিতে দৈনিক নয়া দিগন্তের একটি সংবাদ শিরোনামÑরামমন্দির হবেই : বিজেপি এমপি রিপোর্টটিতে বলা হয়েছে, বিজেপি এমপি প্রবিশ বর্মার সাম্প্রতিক এক বক্তব্য নিয়ে তুমুল বিতর্ক হচ্ছে। তিনি বলেছেন, রামমন্দির তৈরি হবেই। দুনিয়ার এমন কোনো শক্তি নেই, যে রামমন্দির তৈরি করতে বাধা দেবে। মুসলিমরা কখনো বিজেপিকে ভোট দেয়নি আর দেবেও না। তাই, ওই চিন্তা আমরা করি না।

তিনি বলেন, ‘রামমন্দির তৈরি করতে কেউ তাদের আটকাতে পরবে না। বিজেপি দেশভক্ত দল। তাই তাদের ভোটব্যাংক নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। পাশাপাশি তিনি প্রশ্ন তোলেন, “সন্ত্রাসবাদীরা কেন শুধু মুসলিমই হয়?” (দৈনিক নয়া দিগন্ত, ২০ ডিসেম্বর, ২০১৬, পৃ. ৫)

বিজেপি এমপির এই বক্তব্য যে চরম সাম্প্রদায়িক তা বোধ হয় আমাদের দেশের অতি অসাম্প্রদায়িকলোকেরাও স্বীকার করবেন। তেমনি এ-ও স্বীকার করবেন যে, এ তার একার মনোভাব নয়, আরো অনেকেরই মনোভাব। এবং শুধু ক্ষমতাসীন দলের নেতাদেরই মনোভাব নয়, এ দলের কর্মী, সমর্থক, ভোটারদেরও সিংহভাগের মনোভাব। প্রবিশ বর্মা যথার্থই বলেছেন। বিজেপি দেশভক্ত দল। তাই তাদের ভোটব্যাংক নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। আসলে হিন্দু ভারতের সাম্প্রদায়িক চরিত্র নিয়ে যাদের সংশয় আছে তাদের প্রথম কাজ, চোখের কালো চশমাটা নামিয়ে ফেলা, এরপর সাদা চোখে সরল বাস্তবতা দেখার চেষ্টা করা।

প্রবিশের এ কথাও সঠিক যে, ‘দুনিয়ার এমন কোনো শক্তি নেই যে রামমন্দির তৈরি করতে বাধা দেবে।তার উদ্দেশ্য যদি এই হয় যে, দুনিয়ার শক্তিশালী দেশগুলো হচ্ছে গণতান্ত্রিক দেশ। তেমনি ভারতও বর্তমান দুনিয়ার এক বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ।  কাজেই কেউ তাদের এ কাজে বাধা দেবে না, তাহলে মানতেই হবে, তাঁর কথায় যুক্তি আছে! বাবরি মসজিদ ভাঙ্গা যদি গণতন্ত্র ও সংখ্যালঘু অধিকারের পরিপন্থী না হয় তাহলে ঐ জায়গায় রামমন্দির নির্মাণ কোন্ যুক্তিতে সেসবের পরিপন্থী হবে? কাজেই বিশ্বের তাবৎ গণতান্ত্রিক শক্তিগুলো কেনই বা এতে নাক গলাতে আসবে? হক কথা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সেক্ষেত্রে এত হাঁকডাকের কী প্রয়োজন পড়ল। এ তো এমন কোনো যজ্ঞকর্ম নয়, যা এত বাহাদুরির সাথে চ্যালেঞ্জ আকারে উচ্চারণ করতে হবে! তা দাদাবাবু! কাজটা সেরেই ফেলুন না! আপনাদের রামজী যদি এতেই আনন্দ পান তাহলে কার কী বলার আছে। আর এই যে আমরা প্রতিবেশী মুসলিমরা আছি, আপনাকে হলফ করে বলতে পারি, আমাদের দাড়ি টুপিওয়ালা (আপনার ভাষা অনুযায়ী) আতঙ্কবাদীরাই যা কিছু চেঁচামেচি করবেন, তা ওদের চেঁচামেচিতে কী আসে যায়? বড় বড় অসাম্প্রদায়িক সুশীল, যারা এই নাসিরনগরের আগাগোড়া রাজনৈতিক ব্যাপারটাকেও শতভাগ সাম্প্রদায়িক বানিয়ে ফেলেছিলেন, তাঁরাও আপনাদের ঐ কাজে একেবারে টুঁ শব্দটিও করবেন না। কাজেই কোনো ভয় নেই। চক্ষুলজ্জারও কোনো কিছু নেই। শুভস্য শীঘ্রম!

দেখুন না, বার্মায় রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর যে বর্বর গণহত্যা এতেও তো দুনিয়ার কোনো শক্তি বাধা দিচ্ছে না। সম্প্রতি মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক নেত্রী সূচিও বেশ চ্যালেঞ্জের সুরে বলেছেন, ‘রাখাইনে এসে গণহত্যা বন্ধ করুন।অর্থাৎ তিনিও আপনার মতোই বললেন, ‘দুনিয়ার এমন কোনো শক্তি নেই, যে রোহিঙ্গা গণহত্যা বন্ধ করতে পারে।

প্রিয় পাঠক! বর্তমান বিশ্ব-ব্যবস্থায় নীতি, আদর্শ ও মানবিকতা মুখ্য নয়, শক্তি ও স্বার্থই মুখ্য। আর এ শুধু এ যুগের চরিত্র নয়, সব যুগের জাহেলী সমাজ-ব্যবস্থার চরিত্র। সূচি যেহেতু দেখছেন, তার দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ ও শক্তিমান জেনারেলরা এই গণহত্যার পক্ষে তাই তিনিও এর পক্ষে। উপরন্তু তিনি নিজেও তো ঐ সাম্প্রদায়িক জাতিরই একজন। একইভাবে বিজেপি যখন দেখছে ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সাম্প্রদায়িক তখন তারাও তাদের স্বার্থ, ক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠার পক্ষে সাম্প্রদায়িক অবস্থানকেই অনুকূল মনে করছে।

এখান থেকে অন্তত দুটো উপলব্ধি অর্জন করা উচিত :

এক. মুসলিম হিসেবে আমাদের নিজস্ব সক্ষমতা সৃষ্টির কোনো বিকল্প নেই। আর তা হতে হবে দুই দিক থেকে : সর্বস্তরে মুসলমানিত্বের চেতনা জাগ্রত করে। এতে মুসলিম সমাজের বিদ্যমান শক্তি মুসলিম স্বার্থরক্ষায় সক্রিয় হবে। এটা যতই কষ্টসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ মনে হোক এ ছাড়া দ্বিতীয় কোনো সংক্ষিপ্ত পথ নেই।

আর শিক্ষা-দীক্ষা, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি এবং সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা তৈরিতে অগ্রসর হয়ে আমাদের জাতীয় শিক্ষা-ব্যবস্থাকে ইসলামী চেতনায় ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি শিক্ষা-দীক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার প্রচেষ্টা অপরিহার্য। আর এর জন্য প্রয়োজন সকল অঙ্গনে ব্যাপক ঈমানী ও দাওয়াতী বিপ্লবের।

দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণের আশা আকাক্সক্ষাকে মূল্য দেয়ার অপরিহার্যতা। এই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিষ্ঠার জন্য এর কোনো বিকল্প নেই। চাটুকার ও স্বার্থান্বেষী সুশীল শ্রেণীর অপব্যাখ্যায় বিভ্রান্ত হয়ে গণমানুষের আশা আকাক্সক্ষা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হলে তা হবে চূড়ান্ত অপরিণামদর্শিতা।

ইসলাম আল্লাহর মনোনীত দ্বীন। এ দ্বীন কখনো কারো প্রতি যুলুম-অবিচারে উৎসাহিত করে না। প্রতিপক্ষ ও অমুসলিমের সাথেও ন্যায়সঙ্গত আচরণের তাগিদ করে। সুতরাং মুসলিম জনগণের আশা-আকাক্সক্ষাকে আস্থায় নেয়া আদর্শ ও ন্যায়নিষ্ঠারও দাবি।

প্রবিশ বর্মার শেষ বাক্যটিও বেশ। তিনি প্রশ্ন করেছেন, ‘সন্ত্রাসবাদীরা কেন শুধু মুসলিমই হয়?’ পর্যালোচনার জন্য বেশি দূরে যাওয়ার তো দরকার নেই, যে প্রসঙ্গে তাঁর এ বাক্য তাতেই কী দেখা যাচ্ছে? মুসলিমদের ঐতিহ্যবাহী ইবাদতখানা বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা হল, সেই জায়গায় রামমন্দির নির্মাণের এক মাস্তানী চ্যালেঞ্জও ছুড়ে দেয়া হল, এরপর সেই ধ্বংসযজ্ঞ সম্পন্নকারীই মুসলিমদের লক্ষ্য করে বলে উঠলেন, মুসলিমরাই কেন শুধু সন্ত্রাসবাদী হয়? বেশ! প্রবিশ বাবু! আমাদের আর কী বলার আছে, রবিঠাকুরের সেই দুই বিঘে জমিহারানো নিপীড়িত ভূমিপুত্রের মতো বলা ছাড়াÑ

 তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ

 আমি আজ চোর বটে।’ 

আরও পড়ুন:   অনৈতিকতা

হজ্ব এবং কুরবানী বিষয়ক প্রবন্ধসমূহ