গবেষণামূলক উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মারকাযুদ্ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা-এর মুখপত্র

মাসিক আলকাউসার

জানুয়ারি ২০১৭, রবিউস সানি ১৪৩৭

ওলিদের আলোচনায় দিল তাজা হয় : হযরত মাওলানা সাইয়েদ আহমাদ ছাহেব রাহ. (ওলামা বাজারের দ্বিতীয় হযরত)

অচলপ্রায় এক বুড়োকে নিয়ে তার ছেলেরা হজ্বের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করল। এক মানজিলে গিয়ে বুড়ো ছেলেদের ডেকে বলল, আমাকে বিয়ে করিয়ে দাও। ছেলেরা তো অবাক, ব্যাপার কী? বাবা নিজে যেখানে চলতে পারেন না, সেখানে বিয়ে করতে চাচ্ছেন কেন? ছেলেরা খুব পেরেশান হয়ে গেল। তবে বুদ্ধি করে বাবার বয়সের লোকদের কাছে বিষয়টি নিয়ে পরামর্শ করল। তারা বলল, তাকে নিয়ে আপনারা সামনের দিকে অগ্রসর হয়ে যান। ছেলেরা বুড়োদের পরামর্শ মোতাবেক তাই করল। সামনের মানজিলে গিয়ে বাবা আর বিয়ের কথা বলেন না দেখে ছেলেরাই বাবার কাছে কথাটা পেড়ে বসল। বাবা! আপনাকে কি বিয়ে করিয়ে দেব? বাবা বললেন, তোদের কি মাথা খারাপ? আমি নিজে যেখানে চলা-ফেরা করতে পারি না, সেখানে বিয়ে করব কোন্ দুঃখে? ছেলেরা বলল, আপনি যে আগে বলেছিলেন। বাবা বলল, আমার তো কিছু মনে পড়ছে না; আমি এ ধরনের অযৌক্তিক কথা কেন বলব। তখন ছেলেরা পেছনের মানজিলে গিয়ে ঐ এলাকার সেই বুড়োদের সাথে আবারো মিলিত হল এবং বলল, বাবা তো এখন আর বিয়ের কথা বলছেন না। তবে আপনাদের কাছে তখন পরামর্শ চাইলে আপনারাই বা এই মনজিল ত্যাগ করে সামনের মানজিলে চলে যেতে বলেছিলেন কেন? তখন বুড়োরা বলল, এখানে তার বয়সী আমরা সবাই আবারো বিয়ে করেছি, তাই এখানে আসার পর আপনাদের বাবার মধ্যেও আমাদের আচরণ ও স্বভাবের প্রভাব পড়েছিল। তাই বলেছিলাম যে, আপনারা সামনের মানজিলে অগ্রসর হয়ে যান। ভিন্ন জায়গায় ভিন্ন পরিবেশে হয়তো এই আছর বা প্রভাব নাও থাকতে পারে। এতক্ষণে ছেলেরা বুঝতে সক্ষম হল যে, এই মানজিলে আসার পর তাদের বাবার ওপর ঐ এলাকার বুড়োদের স্বভাবের আছর পড়েছিল বলেই বাবা বিয়ের কথা বলেছিলেন।

গল্পটার সত্য-মিথ্যা যাচাই করার কোনো সুযোগ আমার কাছে নেই। গল্পটা আমি শুনেছি ঢাকা তিব্বিয়া কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল আমার বিশেষ বন্ধু মরহুম মাওলানা হাকিম আজিজুল হকের কাছ থেকে।

আমি যখন ওলামা বাজার মাদরাসায় ভর্তি হই তখন আমার অবস্থা বিলকুল পরিবর্তন হয়ে যায়। আগে আমার বয়সও কম ছিল, উপরন্তু ডানপিটে টাইপের ছেলে ছিলাম বলে দুষ্টুমি একটু বেশি মাত্রায়ই করতাম। কিন্তু ওলামা বাজার আসার পর আমার অবস্থা বিলকুল শান্ত  হয়ে গেল। দাগন ভুঁইয়া থেকে পায়ে হেটে নদীপার হলেই আমার অঝোর ধারায় কান্না এসে যেত। আমি ভাবতাম, আমি এখন কোথায় যাচ্ছি? এখানে সব আল্লাহর ওলিরা থাকেন; ছাত্ররাও আল্লাহর ওলি। তাই আমাকেও ঠিক হয়ে যেতে হবে, আমাকেও আল্লাহর ওলি হতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার বিশ্বাস, আমার অবস্থার এই পরিবর্তনের পেছনে আমার আসাতেযায়ে কেরামের প্রভাবই বেশি কাজ করেছিল।

আমার সব কজন উস্তাযই আল্লাহওয়ালা মহান আখলাকের অধিকারী ছিলেন। সকল উসতাযের প্রতিই আমার যথাযথ শ্রদ্ধা-ভক্তি ছিল। তারপরও আমার কাছে বেশি প্রিয় ও বেশি বরণীয় ব্যক্তি হিসেবে চারজন উস্তায সবার ওপরে ছিলেন। তার মধ্যে এক নাম্বার ছিলেন আমার পরম উস্তায ও আমার শায়েখ তখনকার বড় হুজুর বা মুহতামিম হযরত মাওলানা আবদুল হালীম সাহেব (ওলামা বাজারের হুজুর)

আর আমার অন্তরে দ্বিতীয় স্থানে ছিল আজকের আলোচ্য ব্যক্তিত্ব হযরত মাওলানা সাইয়্যেদ আহমদ ছাহেব (নায়েব ছাহেব হুযুর) যিনি প্রায় ৫০/৫৫ বছর যাবৎ ওলামা বাজার মাদরাসার নায়েবে মুহতামিমের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

আগের হযরতের তবিয়তে ছিল ছিফাতে জালালের প্রাধান্য, আর এই হযরতের তবিয়তে ছিল সিফাতে জামালের প্রাধান্য। সব মানুষেরই মত-পথ একটু ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে, ফলে কোনো কাজে মতের ভিন্নতার কারণে এখতেলাফ বা মতানৈক্য হওয়াটা স্বাভাবিক ব্যাপার। মাদরাসার কাজেও এ ধরনের সমস্যা যে মাঝেমধ্যে হয়নি  তা নয়, অনেক সময় এই ভিন্নতার কারণে মতানৈক্য হয়েছে। এমনকি আগের হযরতের জালালী তবিয়তের কারণে অনেক সময় এই হযরত এখানে আর থাকবেন না মনে করে বাড়ি পর্যন্ত চলে গেছেন, কিন্তু হযরত বাড়িতে গিয়ে আবার নিয়ে এসেছেন। কারণ মানুষ তো পাওয়া যাবে হয়তো, কিন্তু এমন সোনার মানুষ কোথায় পাওয়া যাবে? যার এখলাছ ও তাকওয়ার কাছে সবকিছুই হার মানে।

আগের হযরতের তাবিয়ত ছিল আ-মএছলাহ করার, যা তিনি ছাত্র-শিক্ষক সকলকে সামনে রেখে অধিকাংশ সময় মসজিদে বয়ানের মাধ্যমেই করতেন। হযরতের উদ্দেশ্য হতো একজনের সংশোধনের জন্য যে কথাগুলো বলা হবে, তা যদি সকলকে সামনে রেখে বলা হয় তাহলে অন্যরাও এ বিষয়ে সংশোধন হয়ে যাবে। ছাত্রদের বেলায় তো ঠিক আছে, কিন্তু উস্তাযগণের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি অনেক কঠিন হয়ে যায়। সংশোধনপ্রার্থী ব্যক্তির জন্য অনেক বেশি ধৈর্য ও তাহাম্মুলের প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে উস্তাযের বিষয় যদি ছাত্রদের সামনে হয় তা তো আরো মারাত্মক বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু আমরা দেখতাম, এমন সময়ও আমাদের শ্রদ্ধেয় আসাতেযায়ে কেরাম মাথা নিচু করে চুপচাপ বরদাশত করে যেতেন। বিশেষ করে এ লেখার বড় হুজুর তো বিলকুল সমর্পিত একজন মুরিদের মতো সব যজরমাথা পেতে নিতেন। অথচ হযরত তাঁর মুরিদও নন; বরং পীর ভাইয়ের মতো ছিলেন। হযরতের এই ধৈর্য ও তাহাম্মুল যে হযরতকে কোন আলা মাকামে পৌঁছে দিয়েছে তা আজ সবার কাছেই পরিষ্কার।

নামাযের মধ্যে হযরতের দাঁড়ানোর যে কাইফিয়ত ও ছুরত হত তা আমি একমাত্র তাঁর শায়েখ হযরত হাফেজ্জী হুযুরের মধ্যেই দেখেছি। এত তাওয়াযু ও সমর্পনের দৃশ্য খুব কম লোকের মধ্যেই দেখা যায়।

হযরত মিষ্টভাষী ছিলেন। সব সময় ছোট ছোট করে কথা বলতেন। চাই সেটা বয়ান হোক বা সাধারণ নসীহত। এমনকি কারো সাথে কথা বলার সময় পর্যন্ত অত্যন্ত নিচু স্বরে কথা বলতেন। হযরতের আমানতদারি ও দিয়ানতদারির কোনো তুলনা নেই। যার ফলে আগের হযরতের জালালের সাথে বর্তমান হযরতের জামালের সংমিশ্রণ ওলামা বাজার মাদরাসাকে সারা দেশে সমুজ্জ্বল একটি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করেছে। সমস্ত আসাতিযায়ে কেরাম ও সমস্ত তলাবায়ে এযামকেই হযরতের প্রতি পরম ভক্তি ও শ্রদ্ধা নিবেদনে কোনো রকম কার্পণ্য করতে দেখা যায়নি।

হযরতের তাহাজ্জুদ ছিল ভিন্ন রকমের। কাউকে কিছু  বলতেন না, চুপেচুপে উঠে তাহাজ্জুদে নিমগ্ন হয়ে যেতেন। এমনকি চরম শীতেও দেখা গেছে খাদেমকে ডাকতেন না এবং গরম পানির এন্তেজারও করতেন না। ফজরের পর এশরাক পর্যন্ত এবং মাগরিবের পর এশা পর্যন্ত প্রায় মোরাকাবাতে কাটাতেন। মাদরাসার মূল মসজিদ দূরে হওয়ার কারণে অনেক মা-জুর ব্যক্তিই একদম কাছে অবস্থিত নতুন মসজিদে নামায পড়ে থাকেন; কিন্তু দূরে হলেও দুজনের হাত ধরে হযরত মূল মসজিদেই চলে যেতেন। প্রায় ১০০ বছর বয়সেও  দাঁড়িয়ে নামায পড়েছেন الحمد لله  অথচ আমার নিজেরও বসে বসেই নামায পড়তে হয়। অত্যন্ত দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোরাকাবায় কাটিয়ে দিতেন। কখনো তাঁকে আল্লাহর যিকির থেকে গাফেল হতে দেখা যেতনা। এ বিষয়েও তিনি তাঁর শায়েখ হযরত হাফেজ্জী হুযুরের মতো আল্লাহর যিকিরে সদা মশগুল থাকতেন।

৫০/৫৫ বছর পর্যন্ত নায়েবে মুহতামিমের দায়িত্ব সুচারুরূপে আদায় করা অবস্থায় আগের হযরতের এন্তেকাল হয়ে গেলে হযরতের দাফনের দিন ০২/১২/১৯৯১ ঈ. থেকে মজলিসে শুরার সিদ্ধান্ত মোতাবেক হযরত মৃত্যু পর্যন্ত অর্থাৎ ৪/১২/২০১৬ ঈ. পর্যন্ত ২৫ বছর দুই দিন একটানা মুহতামিমের দায়িত্ব পালন করে গেছেন। আগের হযরত দু-একবার লন্ডন ও আমেরিকা সফর করেছিলেন, তাই এই হযরতও বেশ কয়েক বছর লন্ডন সফর করেছিলেন। কিন্তু বার্ধক্যের কারণে শেষে আর লন্ডন যেতে পারতেন না বলে অন্য এক উস্তায লন্ডন সফরে যেতেন। দেশের সর্বত্র হযরত দ্বীনী কারণে সফর করতেন, যা আর করতে পারেননি।

হযরতের জন্মতারিখ নথিবদ্ধ না থাকায় হযরত নিজেও তা বলতে পারেননি, প্রায় ১০০ বছর পূর্বে নোয়াখালী জেলার কবির হাট থানাধীন চাপরাশির হাট এলাকায় রামেশ্বরপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত দ্বীনী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মৌলবী আবদুল আজিজ এবং মায়ের নাম হালিমা খাতুন। শিক্ষাজীবন আরম্ভ হয় ৬ বছর বয়সে গ্রামের মক্তব থেকে। এরপর চাপরাশির হাট সরকারী মাদরাসায় ২ বছর পড়ালেখা করেন। তারপর নোয়াখালী ইসলামিয়া মাদরাসায় ভর্তি হয়ে সুনামের সাথেই শরহেজামী পর্যন্ত পড়েন। শরহে বেকায়া থেকে দাওরায়ে হাদীস ও তাফসীর বিভাগ পর্যন্ত সমাপ্ত করেন দারুল উলূম দেওবন্দে। তাঁর স্বনামধন্য উস্তাযগণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন আওলাদে রাসূল শায়খুল আরব ওয়াল আজম, স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম বীরপুরুষ হযরত সাইয়্যেদ হুসাইন আহমদ মাদানী রাহ., হযরত মাওলানা এজায আলী রাহ. প্রমুখ মনীষীগণ।

ফারাগাতের পর সর্বপ্রথম তাদরীসের খেদমত করেন নোয়াখালীর ছয়ানী মাদরাসায়। সেখানে দু-এক বছর খেদমত করার পর খ-কালীন কিছু দিনের জন্য ফেনী আলিয়া মাদরাসায়ও খেদমত করেন। তারপর থেকে প্রায় ৭০ বছরেরও বেশি সময় বৃহত্তর নোয়াখালীর অন্যতম প্রধান মাদরাসা দারুল উলূম আলহুসাইনিয়া ওলামা বাজার মাদরাসায় খেদমত করেন। অত্যন্ত সুনামের সাথেই একটানা খেদমত করে গেছেন। অধম লেখকের তাঁর কাছে কাফিয়া, জালালাইনের একটি খ- ও নাসায়ী শরীফ পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য ছাত্রবৃন্দের মধ্যে ওলামা বাজার মাদরাসার বর্তমান শায়খুল হাদীস ওয়াল আদব আমার পরম উস্তায হযরত মাওলানা নূরুল ইসলাম ছাহেব দা.বা. (আদীব ছাহেব হুযুর) অন্যতম। আরো আছেন ওলামা বাজার মাদরাসার সাবেক নায়েবে মুহতামিম আমার শ্রদ্ধেয় উস্তায হযরত মাওলানা আবদুশ শাকুর ছাহেব রাহ. বর্তমান নায়েবে মুহতামিম বন্ধুবর জনাব মাওলানা হাফেয আবু তাহের ছাহেবও আমার সহপাঠী। আমিশ্বা পাড়া মাদরাসার শায়খুল হাদীস জনাব মাওলানা হাফেয আবু বকর ছাহেব।

হযরত ছাত্রজীবন থেকেই তাযকিয়ায়ে-নফসের চিন্তায় নিমগ্ন ছিলেন। তাই ফেনী শর্শদী মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা, হযরত থানভী রাহ.-এর অন্যতম খলিফা হযরত মাওলানা সূফী নূর বখশ্ ছাহেবের হাতে বাইআত গ্রহণ করেন। তাঁর ইন্তেকালের পর ছাত্রজীবনেই তাঁর উস্তায শায়খুল আরব ওয়াল আজম হযরত সাইয়েদ হুসাইন আহমাদ মাদানী রাহ.-এর হাতে বাইআত হন। কিন্তু ফারাগাতের পর বিদায়কালে হযরত মাদানী রাহ. বলেছেন যে, দেশে এসে যেন কারো হাতে বাইআত হন; কেননা দূরে এবং দুই দেশ হওয়াতে হযরতের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা কঠিন হবে। উল্লেখ্য, হযরত থানভী রাহ.-কে তিনি দেখতে পাননি, দেওবন্দ যাওয়ার পূর্বেই হযরত থানভী রাহ.-এর ইন্তেকাল হয়ে যায়। দেশে এসে থানভী রাহ.-এর প্রিয় খলীফা হাফেজ্জী হুযুরের সাথে ইসলাহী তাআল্লুক কায়েম করেন। তিনি হযরতের আজাল্লে খোলাফাদের অন্যতম। হযরত হাফেজ্জী হুযুরের পর হযরত থানভী রাহ.-এর সর্বশেষ খলিফা হযরত মাওলানা আবরারুল হক ছাহেবের (হারদুই হযরত) হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেন এবং সেখান থেকেও এজাযতপ্রাপ্ত হন।

হযরতের আজাল্লে খোলাফার  অন্যতম হলেন, পটিয়া মাদরাসার প্রধান মুফতী হযরত মাওলানা হাফেয আহমাদুল্লাহ ছাহেব। উল্লেখ্য, তিনি হযরত হাফেজ্জী হুযুরের পক্ষ থেকেও খেলাফতপ্রাপ্ত হন। আরো যাঁরা খলীফা রয়েছেন তাঁদের মধ্যে আমিশ্বা পাড়া মাদরাসার শায়খুল হাদীস অধমের সহপাঠী জনাব মাওলানা হাফেয আবু বকর ছাহেব, মিরওয়ারিশপুর হুসাইনিয়া মাদরাসার নাযেম হযরত মাওলানা হাফেয মুস্তাফিজুর রহমান ছাহেব, চৌমুহনী নাজিরপুর ইসলামিয়া মাদরাসার হযরত মাওলানা হাফেয আবদুর রহমান ছাহেব, ফেনী জামিয়া মাদানিয়ার প্রধান মুফতী হযরত মাওলানা মুফতী আহমাদুল্লাহ ছাহেব ও দারুল ইফতা ইসলামী গবেষণা কেন্দ্র চট্টগ্রামের হযরত মাওলানা মুফতি আবদুল মান্নান ছাহেব প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।

তাসাউফের লাইনে হযরতের মেহনত-মুজাহাদা সব সুলূকে সালাফের লাইনে হয়েছে; সুলূকে খালাফের লাইনে নয়। আমার আগের মরহুম হযরত বলতেন, সুলূকে সালাফ پر امن بے خطر (পুর আম্ন বে-খতর) পক্ষান্তরে সুলূকে খালাফ অনেক ক্ষেত্রেই অনেকের জন্য پر خطر     بے امن  (পুর খতর বে-আম্ন) হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ সুলূকের সরাসরি মাসনূন পদ্ধতি হচ্ছে সম্পূর্ণ আম্ন ও নিরাপদ পদ্ধতি, যাতে কোনো খতরা বা পদস্খলনের আশংকা নেই। হযরত সাইয়েদ আহমাদ ছাহেব রাহ. এই পদ্ধতিতেই মেহনত-মুজাহাদা করেছেন।

বছর দুয়েক আগে হযরতের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে ওলামা বাজার গিয়েছিলাম। হযরতের সাথে খাওয়ার সময় দেখলাম, লজিং থেকে রুটি-তরকারী এসেছে, তিনি ঐ রুটি খাচ্ছেন। মাঝখানে জানতে পারলাম যে, তিন বেলাই তিনি রুটি খান। আমি প্রশ্ন করলাম, হযরতের তো ডায়াবেটিস রোগ নেই আলহামদু লিল্লাহ, তবুও তিনবেলা রুটি খান কেন? হযরত বললেন, নবীযুগের সাথে কিছুটা মুশাবাহাত (সাদৃশ্য) অর্জনের জন্য আমি অবাক হয়ে গেলাম তাঁর কথা শুনে, তখন আমি বললাম, কিতাবে দেখেছি, ইমামে রব্বানী হযরত মাওলানা রশিদ আহমদ গঙ্গুহী রাহ.-এর চোখের জ্যোতি চলে যাওয়ার পর একদিন চোখে সুরমা দিতে দেখে কেউ প্রশ্ন করেছে যে, হযরত! চোখের জ্যোতি তো নেই, তবে আর সুরমা কেন লাগাচ্ছেন? হযরত বললেন, আমি তো চোখের জ্যোতির জন্য সুরমা ব্যবহার করি না, বরং শুধু অনুসরণের নিয়তে সুরমা ব্যবহার করে থাকি।

আরো একটি নতুন অবস্থা দেখলাম। তাঁর হুজরার সামনে বারান্দায় একটি খাট বিছানো। জানতে পারলাম, ছাত্রদের সালাম নেয়া ও দেয়ার জন্যই এই খাটের ব্যবস্থা। অর্থাৎ হযরত খাটের ওপর হেলান দিয়ে বসে থাকেন আর যিকিরে মশগুল থাকেন, ছাত্ররা এদিক দিয়ে যাওয়ার সময় সালাম দেয় আর হযরত বড় মজার সাথে সালামের জবাব দিয়ে নেকী অর্জন করেন। সুবহানাল্লাহ! সুন্নতের কেমন সায়দারী। কতো মুহাব্বতের সাথে একেকটি সুন্নতের ওপর আমল করেছেন। আল্লাহ আমাদেরকেও তাওফীক দান করুন। আমীন।

হযরতের কাশ্ফ-কারামতও অনেক, তবে হযরত থানভী রাহ. বলেছেন, কাশ্ফ ও কারামতের মাকাম হুযূরে কাল্বব্যতীত যিকিরের যে মাকাম তারও অনেক নিচে। অথচ সাধারণের কাছে কাশ্ফ-কারামতেরই মূল্য বেশি, যার কোনো দামই নেই। বেলায়েতের জন্য কাশ্ফ-কারামত কোনো শর্তও নয়? বরং আল্লাহ জাল্লা শানুহু কোনো হেকমতের কারণে, বিশেষ করে বান্দারা আল্লাহর ওলী থেকে উপকৃত হবার জন্যেই ঐ ওলীর মাধ্যমে কারামত ইত্যাদি প্রকাশ করে থাকেন। এতে ওলীর কোনো উপকার নেই, উপকার মানুষের। তাই এখানে কারামতের কোনো ঘটনা উল্লেখ করলাম না।

হযরতের পুরো জিন্দেগীটাই কেটেছে তালীম-তাদরীস ও আধ্যাত্মিক তরবিয়ত ও আত্ম-সাধনার মধ্যে। তার পীরের মতো প্রথম দিকটায় স্বতন্ত্রভাবে কোনো রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতেন না। তবে ওয়াক্তি প্রয়োজনে সব বাতিলের বিরুদ্ধেই সোচ্চার ছিলেন। তাঁর শায়েখের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সময় থেকে হযরতও খেলাফত আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন এবং খেলাফত আন্দোলনের একজন প্রধান মুরব্বীর ভূমিকাও পালন করেছেন।

আলহামদু লিল্লাহ, হযরতের কোনো রোগ-বালাই ছিল না। শুধু বার্ধক্যের কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন মাত্র। তাই শেষের দিকে কোথাও যেতে পারতেন না। শুয়ে-বসে যিকির-আযকারই ছিল তাঁর বড় আমল।

হযরত ছাত্র জীবনেই বিয়ে করেছেন। নোয়াখালী ইসলামিয়া মাদরাসার স্বনামধন্য সদরে মুদাররিস তাঁর শফীক উস্তায হযরত মাওলানা ফজলুর রহমান ছাহেব তাঁর কন্যাকে হযরতের কাছে বিয়ে দিয়েছেন। হযরতের ১ মেয়ে ৩ ছেলে। মেয়েটি বিয়ে দেয়ার পর ইন্তেকাল করেন। আর তিন ছেলে জনাব মাওলানা হুসাইন আহমদ, মাওলানা মাসউদুল হক ও মাওলানা আবদুর রহমান। তারা সবাই বিভিন্ন মাদরাসায় খেদমতে নিয়োজিত আছেন। হযরতের বিবি ছাহেবা (আমাদের আম্মাজান) প্রায় ১২/১৪ বছর পূর্বেই ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রা-জিউন।

হযরত সব সময় ওলামা বাজার থাকাতে নিজ এলাকায় হযরতের তেমন পরিচিতি নেই বললেই চলে। তবে কিছুদিন হল একটি কওমী মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন, যা হযরতের ছাহবেযাদাহ মাওলানা আবদুর রহমান ছাহেবের পরিচালনায় সুচারুরূপেই চলছে আলহামদু লিল্লাহ।

গত ২৫/১১/২০১৬ ঈ. হযরতের ব্রেইন এবং হাটস্ট্রোক করে। তাঁকে ঢাকা শমরিতা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ঠিক ১০ দিনের মাথায় আজ ৪ ডিসেম্বর ২০১৬ ঈ. রোববার প্রায় বেলা ১১ টার দিকে হযরতের রূহ মোবারক পরওয়ায করে মাওলায়ে কারীমের কাছে চলে যায়। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। রাত সাড়ে আটটায় মাদরাসার মাঠে হযরতের জানাযার নামায অনুষ্ঠিত হয়। হাজার হাজার আলেম-তালিবুল ইলম তাঁর নামাযে জানাযায় অংশগ্রহণ করে। নামাযে জানাযায় ইমামতি করেন আখেরী নিশান প্রাণপ্রিয় উস্তাযে মুহতারাম হযরত মাওলানা নুরুল ইসলাম আদীব ছাহেব হুযুর দা.বা. মসজিদের সামনে মাকবারায়ে হালীমির পাশে তাঁকে দাফন করা হয়।

আল্লাহ তাআলা তাঁর সকল খেদমতকে কিয়ামত পর্যন্ত বাকি রাখুন। সদাকায়ে জারিয়া হিসেবে কবুল করুন। তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসে আলা মাকাম নসীব করুন। আমীন

পুনশ্চ : হযরত মাওলানা সাইয়েদ আহমাদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি উম্মতের ঐ সকল ব্যক্তিত্বের একজন, যাঁদের ব্যাপারে এসেছে-

الَّذِينَ إِذَا رُؤُوا ذُكِرَ اللَّهُ

(যাদের দেখলে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়)

আলহামদু লিল্লাহ, আমরা তাঁর সোহবত-সান্নিধ্যে ধন্য হয়েছি। মারকাযুদ দাওয়াহ যখন মোহাম্মাদপুর আসাদ এভিনিউ ও সাত মসজিদ রোডের সংযোগমুখের কোণায় একটি ভাড়া করা ভবনে ছিল তখন হযরত সর্বপ্রথম মারকাযে তাশরীফ আনেন। এটা ছিল আমাদের প্রতি হযরত মাওলানা মুমিনুল্লাহ ছাহেব দামাত বারাকাতুহুমের এহসান। তিনি হযরতকে নিয়ে এসেছিলেন। রাতেও মারকাযে ছিলেন। পরবর্তীতে দু-তিনবার এসেছেন। মারকাযের হযরতপুর প্রাঙ্গণেও একবার এসেছেন। আসাতিযা ও তলাবায়ে কেরামের উদ্দেশে বয়ান রেখেছেন। তিনি যতবার এসেছেন আমাদেরকে সুন্নতের তাকীদ করেছেন। উলামা বাজার মাদরাসা বা অন্য যেখানেই তাঁর সাথে সাক্ষাৎ হয়েছে তাঁকে ধীরস্থির ও বিনয়ী পেয়েছি।

হযরতের সুন্নতের অনুসরণ ছিল ব্যাপক ও বিস্তৃত অর্থে। ইত্তিবায়ে সুন্নত তো মূলত- নবী-আদর্শের পূর্ণ আমলী অনুসরণের চেষ্টা করা; ফরয ও ওয়াযিব আদায়ের ক্ষেত্রে কোনোরূপ অলসতা না করা। হুকূকুল ইবাদের (বান্দার হকের) বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকা। মুআমালা-লেনদেন, খানা-পিনা, পোষাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদি জীবন-যাপনের সকল ক্ষেত্রে হালাল-হারাম মেনে চলা। দায়িত্ব ও জিম্মাদারি আদায়ের ক্ষেত্রে সততা-আমানতদারি বজায় রাখা। নিজ পরিবার-পরিজন, সহপাঠী, সহকর্মী ও অধীনস্থদের সাথে ভালো ব্যবহার করা। গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা। যিকিরের ক্ষেত্রে কুরআন তিলাওয়াতের এহতেমাম করা এবং মাসনূন যিকির ও দুআসমূহকে অগ্রাধিকার দেয়া। নববী আদব-আখলাককে নিজের স্বভাবে পরিণত করা।

আমাদের সকল আকাবিরের মত হযরত রাহ.-এর সুন্নতের অনুসরণও ছিল ঐ গভীর ও বিস্তৃত অর্থে। এমনকি তিনি একান্ত স্বভাবগত বিষয়েও নবীজীর  পবিত্র শামায়েলের সাথে সাদৃশ্য রাখার চেষ্টা করতেন। হযরত মাওলানা ওবায়দী দামাত বারাকাতুহুম তাঁর এই শেষ প্রকারের অনুসরণেরও একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করেছেন। প্রসঙ্গত এখানে এ কথাটিও আরয করছি যে, আমরা অনেকেই বুযুর্গদের সুন্নতের অনুসরণের আলোচনা করতে গিয়ে শুধু স্বভাবগত বিষয়ে নবীজীর পবিত্র শামায়েল অনুসরণের দৃষ্টান্ত আলোচনা করি। এ সম্ভবত এই নিয়তে করা হয় যে, যিনি এ সকল ক্ষেত্রেও নবীজীর অনুসরণের এহতেমাম করেন তিনি সুন্নতের মৌলিক বিষয়ে নবীজীর অনুসরণের কী পরিমাণ এহতেমাম করবেন তা বলাই বাহুল্য। কথা ঠিক আছে, কিন্তু আমাদের বুঝের স্বল্পতা এবং গাফলাত ও উদাসীনতার কারণে বুযুর্গদের মাসলাক থেকে দূরে সরে যাচ্ছি; আমরা কোনো কোনো সময় সুন্নতে নববীর (উসওয়ায়ে হাসানার) গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অত্যন্ত উদাসীনতার পরিচয় দিই আর অভ্যাসগত ক্ষেত্রে সুন্নতের সাদৃশ্যের উপরই সন্তুষ্ট হয়ে যাইবুযুর্গদের জীবন থেকে সবক হাসিলের উদ্দেশ্যে এখন আমাদের করণীয় হল, শুধু অভ্যাসগত নয়; বরং ফরয-ওয়াজিব-সুন্নত, আদাব-আখলাক এবং হুকুক ও জিম্মাদারি আদায়ের ক্ষেত্রে তাঁরা কীভাবে এবং কী পরিমাণ গুরুত্বের সাথে সুন্নতের অনুসরণ করতেন সেগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা। যেমন, হযরতকে কাছ থেকে দেখেছেন এমন কেউ তাঁর এহতেমামের দায়িত্বকালের শিক্ষণীয় ঘটনাগুলো লিপিবদ্ধ করবেন। কেউ তাঁর লেনদেনের স্বচ্ছতা এবং মানুষের সাথে উঠাবসা-সামাজিকতার শিক্ষণীয় ঘটনাগুলো লিখবেন ইত্যাদি। তাহলে ইনশাআল্লাহ তা আমাদের জন্য এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য গভীর ও বিস্তৃত অর্থে সুন্নতের অনুসরণের আমলী নমুনা হবে।

আশা রাখি, হযরতের মুজায, শাগরেদগণ এবং মুহিব্বীন-মুতাআল্লিকীন তাঁর জীবনীর উপর স্বতন্ত্র কিতাব রচনা করবেন; যে বিষয়ে হযরতের জীবদ্দশায়ই চিন্তা-ভাবনা চলছিল। জানি না কী কারণে তা আর সামনে অগ্রসর হয়নি।

আল্লাহ তাআলা হযরতকে ভরপুর মাগফিরাত করুন। দারাজাত বুলন্দ করুন। ইল্লিয়্যিনের আলা মাকাম নসীব করুন। হযরতের সন্তান-সন্ততি, পরিবার-পরিজনকে সবরে জামীলের তাওফীক দিন। আমীন। -বান্দা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক 