রবিউস সানি ১৪৩৮ . জানুয়ারি ২০১৭

পুরোনো সংখ্যা . বর্ষ: ১৩ . সংখ্যা: ০১

দুআয়ে কুনূত : মর্ম ও শিক্ষা

দুআ আল্লাহ তাআলার অতি পছন্দনীয় একটি ইবাদত। দুআর মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর অনেক নিকটবর্তী হতে পারে। তাই রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে অনেক দুআ শিখিয়ে গেছেন। সেগুলো অর্থে ও মর্মে যেমন অনন্য, তেমনি ভাব ও শিক্ষায় পরিপূর্ণ।

অধিকাংশ দুআতে রয়েছে আল্লাহর উলুহিয়্যাত ও রবুবিয়্যাতের বর্ণনা, তাঁর উত্তম প্রশংসা, এরপর প্রার্থনা। এটা দুআর সর্বোত্তম পদ্ধতি। এভাবে দুআ করলে আল্লাহ তাআলা অনেক খুশি হন এবং বান্দার ডাকে সাড়া দেন।

জীবন ও জগতের প্রায় সকল বৈধ চাহিদার প্রার্থনা হাদীসে বর্ণিত দুআসমূহে এসে গেছে। আর নবীজীর শেখানো দুআসমূহে আমাদের জন্য রয়েছে অনেক শিক্ষা। কারণ, দুআয় মানুষ ঐ বিষয়গুলোই প্রার্থনা করে, যা সে পেতে চায়, যা সে হতে চায় এবং যা তার জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য। দুআর মর্ম যথাযথ উপলব্ধি করতে পারলে সেখান থেকে আমরা বুঝতে পারি আমাদের জীবনের লক্ষ্য কী হওয়া উচিত। এ সংক্ষিপ্ত নিবন্ধে দুআয়ে কুনূতের মর্ম ও তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।

কুনূতশব্দের বিভিন্ন অর্থ রয়েছে। যেমন : নীরবতা, সালাত, কিয়াম, ইবাদত ইত্যাদি। এখানে উদ্দেশ্য হল : নামাযে কিয়ামের হালতে দুআ করা। যেমন : বিত্রের নামাযের তৃতীয় রাকাতে কেরাতের পর তাকবীর বলে দুআ করা হয় এবং বিপদাপদের সময় ফজরের নামাযের দ্বিতীয় রাকাতে রুকুর পর দাঁড়িয়ে দুআ করা হয়। তবে দুআয়ে কুনূত বলতে সাধারণত বিতরের নামাযের দুআকে বোঝায়। হাদীস শরীফে একাধিক দুআয়ে কুনূত বর্ণিত হয়েছে। তন্মধ্যে একটি-

اللّهُمَّ اهْدِنِي فِيمَنْ هَدَيْتَ، وَعَافِنِي فِيمَنْ عَافَيْتَ، وَتَوَلَّنِي فِيمَنْ تَوَلَّيْتَ، وَبَارِكْ لِي فِيمَا أَعْطَيْتَ، وَقِنِي شَرَّ مَا قَضَيْتَ، إِنَّكَ تَقْضِي وَلَا يُقْضَى عَلَيْكَ، وَإِنَّهُ لَا يَذِلُّ مَنْ وَالَيْتَ،وَ لَا يَعِزُّ مّنْ عَادَيْتَ، تَبَارَكْتَ رَبَّنَا وَتَعَالَيْتَ .

(সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৪২৫)

এ দুআর মর্ম ও তাৎপর্য নিয়ে আগামী কোনো সংখ্যায় আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ। এ প্রবন্ধে আমরা শুধু হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত দুআয়ে কুনূতের মর্ম ও তাৎপর্যনিয়ে আলোচনা করব। ওয়াল্লাহুল মুআফ্ফিকু ওয়াল মুঈন।

ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত দুআটি বিভিন্ন রেওয়ায়েতে শব্দ ও বাক্যের সামান্য বিভিন্নতাসহ বর্ণিত হয়েছে।

সবগুলো রেওয়ায়েতের সমন্বয়ে এভাবে পড়া হয়-

اللّهُمَّ إِنَّا نَسْتَعِينُكَ وَنَسْتَغْفِرُكَ وَنُؤْمِنُ بِكَ وَنَتَوَكَّلُ عَلَيْكَ وَنُثْنِيْ عَلَيْكَ الْخَيْرَ وَنَشْكُرُكَ وَلاَ نَكْفُرُكَ، وَنَخْلَعُ وَنَتْرُكُ مَنْ يَّفْجُرُكَ، اللّهُمَّ إِيَّاكَ نَعْبُدُ، وَلَكَ نُصَلِّيْ وَنَسْجُدُ، وَإِلَيْكَ نَسْعٰى وَنَحْفِدُ، نَرْجُو رَحْمَتَكَ وَنَخْشٰى عَذَابَكَ، إِنَّ عَذَابَكَ بِالْكُفَّارِ مُلْحِقٌ.

ইয়া আল্লাহ, আমরা তোমারই সাহায্য চাই। তোমার কাছেই ক্ষমা প্রার্থনা করি। তোমার প্রতিই ঈমান আনি। তোমার উপরই ভরসা করি। আর তোমার প্রশংসা করি। আমরা তোমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। অকৃতজ্ঞ হই না। যে তোমার নাফরমানী করে, আমরা তাকে ত্যাগ করি, বর্জন করি।

ইয়া আল্লাহ! আমরা তোমারই ইবাদত করি, তোমরই জন্য নামায পড়ি ও সিজদা করি। তোমারই দিকে ধাবিত হই তোমারই আনুগত্য করি। তোমার রহমতের আশা রাখি আর তোমার আযাবকে ভয় করি। নিশ্চয়ই তোমার আযাব ধরে ফেলবে কাফেরদের।

 

আলোচনা

এ দুআয় মুমিনের অনেকগুলো সিফাতের উল্লেখ রয়েছে, যা বান্দার  চিন্তা-চেতনা বোধ-বিশ্বাস এবং নীতি ও কর্মের সাথে সংশ্লিষ্ট। রয়েছে সাহায্য প্রার্থনা ও ক্ষমা প্রার্থনা এবং ঈমান-আমলের কিছু মৌলিক বিষয়ের স্মরণ ও স্বীকারোক্তি।

 

সাহায্য প্রার্থনা (نَسْتَعِينُكَ )

আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা দিয়ে এ দুআয়ে কুনূত শুরু হয়েছে। আর এটি ঈমানের অপরিহার্য অংশ। মুমিন সাহায্য প্রার্থনা করে একমাত্র আল্লাহ তাআলার কাছে। কারণ তার ঈমান- আল্লাহ ছাড়া আর কেউ উপকার-অপকারের মালিক নয়।

قُلِ ادْعُوا الَّذِينَ زَعَمْتُمْ مِنْ دُونِهِ فَلَا يَمْلِكُونَ كَشْفَ الضُّرِّ عَنْكُمْ وَلَا تَحْوِيلًا.

বলুন, তোমরা ডাক ওদেরকে, যাদের তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে (নিজেদের কর্মবিধায়ক) ভেবে আছ। ওরা না তোমাদের দুঃখ নিবারণের ক্ষমতা রাখে, না তা পরিবর্তনের। -সূরা বনী ইসরাঈল (১৭) : ৫৬

সুতরাং সাহায্য প্রার্থনা একমাত্র আল্লাহর কাছে।

إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ

ইয়া আল্লাহ আমরা শুধু তোমারই ইবাদত করি এবং শুধু তোমারই কাছে সাহায্য চাই।

 

ক্ষমা প্রার্থনা (وَنَسْتَغْفِرُكَ)

নবীজী বলেছেন, ‘তোমরা বিতরকে রাতের শেষ নামায বানাও।তো দুআয়ে কুনূত হল রাতের শেষ নামাযের প্রার্থনা। সারাদিনের চলা-ফেরায়, কায়-কারবারে কত ভুল হয়, কত রকম গুনাহ হয়। দুআয়ে কুনূতে যেন সারাদিনের ভুল-ভ্রান্তির স্বীকারোক্তি ও ক্ষমা চেয়ে নেওয়া হচ্ছে। 

মানুষ জানা-অজানায়, প্রকাশ্যে-গোপনে কত গুনাহ করে ফেলে। তন্মধ্যে সগীরাগুলো তো নেক আমল দ্বারাও মাফ হয়। কিন্তু কবিরা গুনাহ তওবা-এস্তেগফার ছাড়া মাফ হয় না। তাই আমাদের উচিত বেশি বেশি তওবা-এস্তেগফার করা। জীবনের সমস্ত গুনাহের জন্য বারবার ক্ষমা চাওয়া।

এ দুআয় যেমন আছে আল্লাহর নিআমতের শোকরগোযারি, তেমনি আছে জীবনের সমস্ত গুনাহ থেকে এস্তেগফার ও ক্ষমা প্রার্থনা। আর শোকর ও এস্তেগফার- এ দুই আমলই বান্দাকে আল্লাহর নিকটবর্তী হতে সাহায্য করে।

 

ঈমানের স্বীকারোক্তি (وَنُؤْمِنُ بِكَ)

ঈমান বিল্লাহর অর্থ- আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করা। উলুহিয়্যাত ও রবুবিয়্যাতে তাঁর একত্বকে স্বীকার করা। তাঁর সিফাত ও গুণাবলীর উপর বিশ্বাস স্থাপন করা। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে শিক্ষা ও বিধান নিয়ে আগমন করেছেন তা সমর্পিতচিত্তে গ্রহণ করা এবং নিজের জীবনে এর প্রতিফলন ঘটানো। এ দুআয় মুমিন এ সব কিছুর স্বীকারোক্তি দেয়।

 

আল্লাহ্র উপর তাওয়াক্কুল

 (وَنَتَوَكَّلُ عَلَيْكَ)

তাওয়াক্কুল অর্থ- ভরসা করা। বান্দার হাতে জীবন-যাপনের যত সামগ্রীই থাকুক, যত উপায়-উপকরণের ব্যবস্থা হোক, বান্দার ভরসা এগুলোর উপর হবে না; ভরসা হবে একমাত্র আল্লাহর উপর।

বস্তুবাদীরা উপায়-উপকরণের উপর ভরসা করে, কিন্তু মুমিন ভরসা করে  আল্লাহর উপর।

মুশরিকেরা প্রতিমার পূজা করা। এক এক বিষয়ে এক এক দেব-দেবীর উপর ভরসা করে। পক্ষান্তরে একজন খালেছ ঈমানদার একমাত্র আল্লাহর উপর ভরসা করে। জগতের সকল উপায়-উপকরণ ও বস্তু সামগ্রীকে কেবল মাধ্যমমনে করে। সকল নির্জীব প্রতিমা ও দেব-দেবীকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে।

 

হামদ ও শোকর

(وَنُثْنِيْ عَلَيْكَ الْخَيْرَ وَنَشْكُرُكَ)

মুমিন আল্লাহর প্রশংসা করে। সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি জগৎসমূহের রব।আল্লাহ তাআলা সকল প্রশংসনীয় গুণের অধিকারী, পৃথিবীতে আমরা প্রশংসনীয় যা কিছু দেখি, গুণ, সৌন্দর্য, শক্তি সবই আল্লাহর সৃষ্টি, আল্লাহর দান। সুতরাং সকল প্রশংসা তাঁরই। আর শোকর অর্থ- কৃতজ্ঞতা। জন্মের পর থেকে আজ পর্যন্ত আল্লাহর যত অনুগ্রহ, তার ব্যাপারে এ বিশ্বাস পোষণ করা যে, সবই আল্লাহর দান। কোনো যোগ্যতা  বা উপযুক্ততা ছাড়াই আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে আমাকে এগুলো দান করেছেন। হাজারো মানুষ এমন রয়েছে, যারা এ সকল নিআমত লাভ করেনি। তাদের উপর আমার কোনো শ্রেষ্ঠত্ব ছিল না। কোনো অগ্রাধিকার ছিল না। তবুও তিনি আমাকে দান করেছেন। এটা তাঁর একান্ত অনুগ্রহ ছাড়া আর কিছু নয়।

শোকর ও কৃতজ্ঞতার মাধ্যমে বান্দা উন্নত থেকে উন্নততর নিআমত লাভ করতে থাকে। আর তা না করলে প্রাপ্ত নিআমত থেকেও ধীরে ধীরে বঞ্চিত হতে থাকে। ইরশাদ হয়েছে-

لَىِٕنْ شَكَرْتُمْ لَاَزِیْدَنَّكُمْ وَ لَىِٕنْ كَفَرْتُمْ اِنَّ عَذَابِیْ لَشَدِیْدٌ

যদি তোমরা শোকর কর তাহলে আমি তোমাদের (নিআমত) বৃদ্ধি করে দিব। আর যদি অকৃতজ্ঞ হও, (তাহলে  জেনে রেখো) নিশ্চয়ই আমার আযাব অতি কঠিন। -সূরা ইবরাহীম (১৪) : ৭

এ আয়াতের অর্থ ও মর্ম চিন্তা করলে আমরা বুঝতে পারি, বান্দার জন্য শোকর আদায় কত গুরুত্বপূর্ণ। দুআ কুনূতের শব্দ-বাক্যে বান্দা আল্লাহর দরবারে শোকর আর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।

 

মুমিন অবিশ্বাসী অকৃতজ্ঞ হয় না

 (وَلاَ نَكْفُرُكَ)

আল্লাহকে খালিক ও রব এবং একমাত্র উপাস্য হিসেবে স্বীকার করা, সকল বিষয়ে র্শিক থেকে মুক্ত থাকা, তাঁর অনুগত থাকা- এটা স্রষ্টার প্রতি মুমিনের কৃতজ্ঞতা। সুতরাং মুমিন কৃতজ্ঞ। আর কাফের বা নাস্তিক এ স্বীকারোক্তি দেয় না- তাই সে অকৃতজ্ঞ।

দুআ কুনূতে আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে এ স্বীকৃতি দেয়া হচ্ছে যে, আল্লাহ! আমি তোমার অকৃতজ্ঞ হই না। এর ন্যূনতম পর্যায় তো আল্লাহকে খালিক, মালিক, রব ও ইলাহ হিসেবে স্বীকার করা, তাঁর সাথে র্শিক না করা। আর ব্যাপক অর্থে- জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধানকে স্বীকার করা এবং আল্লাহর অনুগত বান্দা হিসেবে জীবন-যাপন করা।

তো মুমিন অবিশ্বাসী অকৃতজ্ঞ হয় না। প্রতিদিন দুআ কুনূতে এ কথাই স্মরণ করা হয় এবং আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে এর স্বীকারোক্তি দেয়া হয়।

 

নাফরমান-আল্লাহ্দ্রোহীর সাথে মুমিনের বন্ধুত্ব হতে পারে না

(وَنَخْلَعُ وَنَتْرُكُ مَنْ يَّفْجُرُكَ)

মুমিনকে আল্লাহ তাআলা সত্যবাদীদেরসাথে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন-

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَ كُوْنُوْا مَعَ الصّٰدِقِیْنَ  .

হে ঈমাদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর আর সত্যবাদীদের সাথে থাক। -সূরা তাওবা (৯) : ১১৯

সুতরাং মুমিন নিজেও হবে সত্যবাদী আর তার বন্ধুত্বও হবে সত্যবাদীর সাথে। নাফরমান আল্লাহ্দ্রোহীর সাথে মুমিনের বন্ধুত্ব নেই। যে নাফরমান মুমিন তাকে হেদায়েতের পথে আহ্বান করবে। তার মঙ্গল কামনা করবে। কিন্তু তার সাথে এমন বন্ধুত্ব ও অন্তরঙ্গতার সম্পর্ক করবে না, যে কারণে সে মুমিনকে সৎপথ থেকে বিচ্যুত করে ফেলে। তার কারণে নাফরমানীতে লিপ্ত হয়।

অসৎসঙ্গ মানুষকে অনেক সময়ই বিপথগামী করে ফেলে। পক্ষান্তরে সৎসঙ্গ হেদায়েতের উপর টিকে থাকতে সহায়তা করে। একটি হাদীসে এ বিষয়টিই বিবৃত হয়েছে-

مَثَلُ الجَلِيسِ الصَّالِحِ وَالسّوْءِ، كَحَامِلِ المِسْكِ وَنَافِخِ الكِيرِ، فَحَامِلُ المِسْكِ: إِمَّا أَنْ يُحْذِيَكَ، وَإِمَّا أَنْ تَبْتَاعَ مِنْهُ، وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ مِنْهُ رِيحًا طَيِّبَةً، وَنَافِخُ الكِيرِ: إِمَّا أَنْ يُحْرِقَ ثِيَابَكَ، وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ رِيحًا خَبِيثَةً.

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সৎসংগ ও অসৎসংগের উদাহরণ হল, আতর বিক্রেতা ও কামারের মত। তুমি যদি আতর বিক্রেতার সংশ্রবে থাক তাহলে সে তোমাকে একটু আতর মাখিয়ে দিবে, অথবা তুমি তার কাছ থেকে আতর ক্রয় করবে, কমসে কম আতরের সুঘ্রাণ তো পাবে। আর যদি তুমি কামারের সংশ্রবে থাক, তাহলে হয়ত সে তোমার কাপড় পুড়িয়ে ফেলবে; অন্তত দুর্গন্ধ তো অবশ্যই পাবে। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৫৩৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৬২৮

 

আমার সিজদা-সালাত আল্লাহরই জন্য

اللّهُمَّ إِيَّاكَ نَعْبُدُ، وَلَكَ نُصَلِّيْ وَنَسْجُدُ

এ দুআর মাঝখানে বান্দা স্বীকারোক্তি প্রদান করে- হে আল্লাহ আমি একমাত্র তোমাকেই ইলাহরূপে বিশ্বাস করি। একমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং তোমার কাছেই প্রার্থনা করি। অন্য কোনো ব্যক্তি বা সত্তাকে দুআ বা ইবাদতের উপযুক্ত মনে করি না। আমার সালাত-সিজদা শুধু তোমারই জন্য। তুমি ছাড়া ইবাদতের উপযুক্ত কেউ নেই।

এখানে সালাতের সাথে সিজদাকে আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এখান থেকে মাজারপূজারী-কবরপূজারীরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে, যারা বিভিন্ন শিরোনামে গায়রুল্লাহকে সিজদা করছে এবং গায়রুল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছে। আমার সিজদা শুধু তোমারই জন্য’- নিজের এ স্বীকারোক্তির উপর সে থাকতে পারল না। তাহলে কীভাবে নাজাতের আশা করা যায়!

আল্লাহ তাআলার অস্তিত্ব তো অনেকেই বিশ্বাস করে। তাকে সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা হিসেবেও মানে। কিন্তু তাকে একমাত্র ইলাহরূপে বিশ্বাস করে শুধু মুসলিম।

অন্যরা আল্লাহকে রব হিসেবে বিশ্বাস করলেও বিশ্বাসে বা কর্মে আল্লাহকে একমাত্র ইলাহ মানে না। ইবাদত ও প্রার্থনায় তারা আল্লাহর সাথে শরীক করে। এ দুআর মাধ্যমে মুসলিম এই সহীহ আকীদা-বিশ্বাসের ঘোষণা দেয়।

 

আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে অনন্তর ছুটে চলা

(وَإِلَيْكَ نَسْعٰى وَنَحْفِدُ)

সকল মানুষ আল্লাহর কাছ থেকেই এসেছে, আল্লাহর কাছেই ফিরে যাবে; আনুগত্য ও কৃতজ্ঞতার চিহ্ন ললাটে ধারণ করে, অথবা অকৃজ্ঞতার কলুষ-কালিমা নিয়ে। মুমিন কখনো অকৃতজ্ঞতার পথে পা বাড়ায় না। তার সকল দৌড়-ঝাঁপ কৃতজ্ঞতার পথে। আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে। মুমিন অক্লান্ত ছুটে চলে আল্লাহর পানে।  আল্লাহর সন্তুষ্টি মুমিনের চূড়ান্ত চাওয়া-পাওয়া। রাত-দিনের সকল ব্যস্ততায় মুমিনের লক্ষ্য- আল্লাহ কীভাবে আমার উপর রাজি-খুশি হয়ে যান।

দুআ কুনূতে মুমিন এ কথাই স্মরণ করে উপরের শব্দ-বাক্যে। প্রতিদিনের দুআ কুনূতে যেন মুমিন নতুন করে বুঝে নেয় তার চলার পথ।

 

আল্লাহর রহমত মুমিনের সম্বল

(نَرْجُو رَحْمَتَكَ)

আল্লাহর রহমতই মুমিনের চলার শক্তি। তাঁর রহমত ছাড়া দুনিয়া-আখেরাত অর্থহীন। মুমিনের প্রার্থনা-

اللّهُمَّ رَحْمَتَكَ أَرْجُو، فَلَا تَكِلْنِي إِلَى نَفْسِي طَرْفَةَ عَيْنٍ.

হে আল্লাহ! আমি তোমার রহমতেরই আশা রাখি; (তোমার রহমতেরই ভিখারী। তোমার রহমত ছাড়া আমার গত্যন্তর নেই। তোমার রহমতের উপরই আমার নির্ভরতা।) সুতরাং এক মুহূর্তের জন্যও আমাকে আমার নিজের কাছে সোপর্দ করো না। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৫০৯০

প্রতিদিন বান্দা কমপক্ষে পাঁচবার আল্লাহর ঘরে যায়। তখনও তার প্রার্থনা-

اللّهُمَّ افْتَحْ لِي أَبْوَابَ رَحْمَتِكَ

ইয়া আল্লাহ! আমার জন্য আপনার রহমতের দরজাসমূহ খুলে দিন।

আল্লাহ রাহমানুর রাহীম; যোগ্যতা ছাড়াই বান্দাকে দান করেন। বান্দার যত প্রাপ্তি সব তাঁর রহমতেরই দান। আমরা তাঁর নাফরমানীতে আকণ্ঠ ডুবে থাকি, তবু তিনি আমাদের সাথে রহমতের আচরণ করেন। তাই মুমিন সকাল-সন্ধ্যা তাঁর রহমতের প্রত্যাশী। সে আশা রাখে তাঁর রহমতেই আখেরাতে নাজাত পাবে। এ কথাই সে উচ্চারণ করে نَرْجُو رَحْمَتَكَ বলে।

 

মুমিন আল্লাহ্র আযাবকে ভয় করে

(وَنَخْشٰى عَذَابَكَ)

দুআয়ে কুনূতের এ বাক্যটি বান্দাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয়। দিনশেষে গাফূরুর রাহীমের সামনে দাঁড়িয়ে তার উচ্চারণ- ‘আল্লাহ আমি তোমার আযাবকে ভয় করি।আলিমুল গাইবের সামনে এ বান্দার কাতর নিবেদন।

বান্দার তখন সারাদিনের সকল গুনাহের কথা স্মরণ হয়। সে বিনয়াবনত হয় রাব্বুল আলামীনের সামনে। আর ফিরে আসার সংকল্প ব্যক্ত করে।

এভাবে সকল গুনাহের কথা স্মরণ করে বান্দা যখন আল্লাহর কাছে মাফ চায়, আল্লাহ খুশি হন; বান্দাকে তিনি রহমতের চাদরে ঢেকে নেন।

সবশেষে বান্দা উচ্চারণ করে-

(إِنَّ عَذَابَكَ بِالْكُفَّارِ مُلْحِقٌ)

নিশ্চয়ই তোমার আযাব ধরে ফেলবে কাফেরদের

তোমার আযাব থেকে পালানোর কোনো উপায় নেই। সুতরাং তুমি যদি ক্ষমা কর তাহলেই আমার মুক্তি, নতুবা মুক্তির কোনো পথ নেই। এই সকাতর মিনতি ও সমর্পণের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয় দুআয়ে কুনূত।

প্রতিদিন বিতরের নামাযে আমরা এ দুআটি নিয়মিত পাঠ করি। আমাদের কর্তব্য, শুধু পাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এর অর্থ ও মর্ম নিয়েও চিন্তা-ভাবনা করা। এর প্রত্যেকটি বাণী ও শিক্ষাকে নিজের জীবনে বাস্তবায়িত করার চেষ্টা করা। তাহলেই আমাদের এ দুআ যথার্থ ও ফলদায়ক হবে। আল্লাহ তাআলা তাওফীক দান করুন। 

 

 

আরও পড়ুন:   দ্বীনিয়াত | নামায-সালাত

কুরআন মজীদ ও সহীহ হাদীসের আলোকে মাহে রমযান