গবেষণামূলক উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মারকাযুদ্ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা-এর মুখপত্র

মাসিক আলকাউসার

জানুয়ারি ২০১৭, রবিউস সানি ১৪৩৮

‘চান্দ্রমাস’ বই : একটি পর্যালোচনা : কী দিতে চান সে নিয়েই বিভ্রান্তি

[নোট : সারা বিশ্বে একই তারিখে রোযা ও ঈদ পালনের দৃষ্টিভঙ্গির উপর একটি দীর্ঘ পর্যালোচনা পাঠকবৃন্দ ইতিপূর্বে মাসিক আলকাউসারে পড়েছেন, যার শিরোনাম ছিল মুসলমানদের মাঝে ঈমান ও ইসলামী ভ্রাতৃত্বের এক্য সৃষ্টির চেষ্টা করুন; একই দিনে ঈদ-প্রসঙ্গ দায়িত্বশীলদের উপর ছেড়ে দিন  ঐ প্রবন্ধের শেষ অংশ ছিল ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মাদ এনামুল হক সাহেবের বই চান্দ্রমাস’-এর উপর পর্যালোচনা। সে সময় উক্ত বইয়ের উপর লিখিত পর্যালোচনা অসম্পূর্ণ রেখেই বিরতি দেয়া হয়েছিল। এখন এ বিষয়টি আবার আলোচনায় আসাতে ঐ বইয়ের উপর লিখিত পর্যালোচনার আরো কয়েকটি অনুচ্ছেদ ছেপে দেয়া মুনাসেব মনে হল। এরপর ইনশাআল্লাহ প্রবন্ধের সর্বশেষ অধ্যায় ছাপা হবে। আল্লাহ তাআলা এ প্রবন্ধকে আমার ও আমাদের সকলের জন্য উপকারী করুন। আমীন! -মুহাম্মাদ আবদুল মালেক]

 

গোটা বইয়ে তিনি যা কিছু লিখেছেন তাতে তার মূল দাবি হচ্ছে, সারা বিশ্বে একই তারিখে রোযা শুরু করা ফরয এবং একই তারিখে ঈদ পালন করা ফরয!

দ্বীন পরিপূর্ণ হয়ে যাবার চৌদ্দশ বছর পর যে জিনিসের কল্পনা সবেমাত্র অস্তিত্ব লাভ করেছে, তাকে শরীয়তে ইসলামীর ফরয কাজ বানিয়ে দেওয়া স্পষ্টতই এর প্রবক্তার সত্যতাশূন্য হওয়া কিংবা সুস্থমস্তিষ্ক বঞ্চিত হওয়ার প্রমাণ। তথাপি ইঞ্জিনিয়ার সাহেব এতেই আনন্দ পান যে, এই ময়দানে তিনি অবতীর্ণ হবেন এবং দ্বৈততা ও স্ববিরোধিতার শিকার হতে থাকবেন! তিনি বড্ড পেরেশান, এই ডিম্বাকৃতির পৃথিবীময় একই তারিখে রোযা ও ঈদ পালনকে ফরয বলবার যে নতুন শরীয়ত উদ্ভাবিত হয়েছে, তার পক্ষে যুক্তি প্রমাণটা কোত্থেকে হাজির করবেন, আর এই একসঙ্গে শুরু ও একত্র পালনের ভিত্তি ধরবেন কোন জিনিসকে...?! ভালো হতো যদি তিনি নিজেই এই অস্থিরতা ও দ্বিধাদ্বন্দ্বের একটা কিছু মীমাংসা করে নিতেন এবং নির্দিষ্ট ও সুচিন্তিত একটি মতের উপর  থিতু হয়ে পাঠকদেরকে কিছু উপহার দিতেন। কিন্তু তা হয়নি। যা ঘটেছে তা রবং এর উল্টো! বইয়ের সর্বত্র স্ববিরোধী কথাবার্তা লিখে শুধু নিজের দ্বিধাদ্বন্দ্বেরই ঘোষণা দিয়ে গেছেন। শেষফল- শূন্য!

কিসের ভিত্তিতে সমগ্র বিশ্বে একই সঙ্গে রোযা ও ঈদ পালন করা যাবে, এ ব্যাপারে ইঞ্জিনিয়ার সাহেব আমাদের কতগুলি পরামর্শ দিয়েছেন- একটু মনোযোগ দিয়ে শুনুন :

 

১. সর্বপ্রথম  দেখাধর্তব্য হবে

একাধিকবার তিনি বলেছেন, পৃথিবীর যে অঞ্চলে সর্বপ্রথম চাঁদ দৃষ্টিগোচর হবে তাকেই ভিত্তি ধরতে হবে। সর্বপ্রথম দেখাকে ভিত্তি মেনে সারা বিশ্বে একই তারিখে রোযা শুরু করা এবং ঈদ পালন করা জরুরি। তিনি লিখেছেন,

পৃথিবীর যে কোনো স্থানে প্রথম যখন নতুন চাঁদ দেখা যাবে তাকেই বলা হবে নবচন্দ্র

তাই একই পৃথিবীতে একই মাসে একাধিক নতুন চন্দ্রোদয়  হতে পারে না। অতএব, প্রথম চন্দ্রোদয় দিয়েই মাসের প্রথম দিন শুরু হবে; আর ২৪ ঘণ্টা পরে ২য় দিন আরম্ভ হবে।

এভাবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সারা পৃথিবীর মানুষ নতুন চন্দ্র দিয়ে রোযা আরম্ভ করবে এবং ঈদ উদ্যাপন করবে।’ (চান্দ্রমাস, পৃষ্ঠা : ৩০, প্যারা : ৫, , ৯)

একই কথা পৃষ্ঠা ৩২-৩৩, পর্ব ১৪-এ লিখেছেন। আরো দেখুন, পৃষ্ঠা : ৩৪-৩৫, পর্ব : ১৬; পৃষ্ঠা : ৩৬, প্যারা : ৯; পৃষ্ঠা : ৮৮, প্যারা : ১০, ১১, ১৬; পৃষ্ঠা : ১১২, ৪৪/১২-১৩ এবং পৃষ্ঠা : ১৭৫, প্যারা : ২। পৃষ্ঠা : ৪৪/১৩, পৃষ্ঠা : ১১২ এবং ১৭৫ পৃষ্ঠায় এই বিধানকে আল্লাহ তাআলা এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেয়া বিধান বলে উল্লেখ করেছেন। আর পৃষ্ঠা ৩২-৩৩সহ বেশ কয়েকটি জায়গায় বলেছেন, চার মাযহাব কিংবা তাদের অধিকাংশের এবং ও. আই. সির ফেকাহ একাডেমির সিন্ধান্তও এটাই।

পাঠক নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন এখানে কয়টা কথা ঠিক আর কয়টা কথা বাস্তবতার খেলাফ; নিছক গায়ের জোরে বলা আর কি! আমি এখন শুধু তার বক্তব্যের স্ববিরোধিতার দিকটাই দেখাতে চাইছি। ভুল-ভালের বিচার তোলা রইল।

যাইহোক, ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের প্রথম পরামর্শ দাঁড়ালো এই যে, সর্বপ্রথম দেখার ভিত্তিতে সমগ্র বিশ্ববাসীর আমল করা অপরিহার্য। দ্বিতীয় পরামর্শটি হল :

 

২. সৌদির দেখার অনুসরণ করা হোক

এক জায়গায় লিখেছেন, ‘সৌদি আরব যেহেতু মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত সেহেতু ধারণা করা যায় যে, তারা প্রথম নবচন্দ্রের খবর নিয়েই রোযা/ঈদ পালন করছেন। সেক্ষেত্রে সৌদি আরবকে অনুসরণ করা যায়। তবে বাংলাদেশ যে নিয়মে রোযা/ঈদ পালন করছে তা ঠিক হচ্ছে না। তার চেয়ে সৌদি আরবকে অনুসরণ করা বেশি সমর্থনযোগ্য। তবে বিশ্বে সর্বপ্রথম নতুন চাঁদের শুরুকে অনুসরণ করাই উত্তম কাজ হবে (চান্দ্রমাস, পৃষ্ঠা : ১৯৩)

দেখুন, এই বেলায় সর্বপ্রথম দেখার অনুসরণকে বলছেন কেবল উত্তম কাজ একটু আগে এটাকেই কুরআন ও সুন্নাহর রেফারেন্সে অপরিহার্য বলে উল্লেখ করেছিলেন। আর সৌদি আরব কিংবা মধ্যপ্রাচ্যেই প্রথম চাঁদ দেখা যায় এমন ধারণা জ্যোতির্শাস্ত্রের নীতিমালা অনুসারে ভুল এবং জ্যোতির্শাস্ত্রবিদদের স্পষ্ট বক্তব্যেরও পরিপন্থী। স্বয়ং আমার কাছেই আমার প্রশ্নের জবাবে শাস্ত্রজ্ঞদের দেয়া সমাধান উপস্থিত আছে। আর বাস্তব ঘটনার বিচারেও এর অবাস্তব হওয়া খুবই পরিষ্কার। নেটে মুন সাইটিংয়ে যে কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রস্তুতকৃত চন্দ্রগোলকের নকশার কিছু নমুনা যদি আপনি দেখেন, তাহলে লক্ষ্য করবেন যে, সাধারণত প্রথম দেখা প্রসঙ্গে দূর পাশ্চাত্যের উল্লেখ করা হয়েছে। আর বাস্তবেই চাঁদ দেখার সমীক্ষা নেয়া হলে এমনটাই প্রমাণিত হবে। তবে সেই পর্যালোচনায় যাওয়া এই মুহূর্তে আমার উদ্দেশ্য না। এখন শুধু তার বক্তব্যের স্ব-বিরোধিতার চিত্রটুকু দেখানো উদ্দেশ্য।

তো প্রথম পরামর্শের বরখেলাফ তার দ্বিতীয় পরামর্শ দাঁড়াল এই যে, সৌদির চাঁদ দেখার অনুসরণ করা হবে। এ সম্পর্কে আরেক জায়গায় লিখেছেন, ‘এ পর্যায়ে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা ছাড়া কোনো উপায় নেই। আর তা হলো রেডিও টেলিভিশনের মাধ্যমে পাওয়া খবরের ভিত্তিতে সৌদি আরবকে অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া। শরিয়ার দৃষ্টিতে এই পরামর্শকে সম্পূর্ণ সঠিক বলা যাবে না। কারণ সৌদি আরবের দেখা নবচন্দ্র বিশ্বের জন্য প্রথম নবচন্দ্র নাও হতে পারে। আবার সেটা প্রথম নবচন্দ্র হতেও পারে, যেহেতু সৌদি আরব সেই এলাকায় অবস্থিত যেই এলাকার কোথাও না কোথাও প্রথম নবচন্দ্র দেখা যাবে। তাই বর্তমানে ২/৩ দিন পরে রোযা/ঈদ করে বাংলাদেশে আমরা যে ভুল করছি সেই ভুলের মাত্রা তাৎক্ষণিকভাবে সর্বনি¤œ পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হলে সৌদি আরবের অন্ধঅনুকরণ করাটাই ব্যক্তিগত পর্যায়ের জন্য সর্বোত্তম উপায় (চান্দ্রমাস, পৃষ্ঠা : ১৮৩)

অথচ নিজেই ৩৬ পৃষ্ঠায় পর্ব ১৮-এর শিরোনাম করেছেন, ‘সৌদি আরবকে অন্ধঅনুকরণ করা যাবে না তবে... তবের পর বইতেও এরকম কতগুলি ডট রয়েছে।

অন্ধঅনুকরণ তো এমনিতেই খারাপ, তার উপর নিজেই লিখে এসেছেন যে, অন্ধঅনুকরণ করা যাবে না। এখন বলছেন, সৌদি আরবের অন্ধঅনুকরণই সর্বোত্তম উপায়!!

সম্মানিত পাঠক! খেয়াল রাখুন, এখানে ইঞ্জিনিয়ার সাহেব সৌদির দেখার অনুসরণ করতে বলছেন। তার আরেকটি পরামর্শ হলো, সৌদির দেখার পরিবর্তে সৌদি আরবের সরকারি ক্যালেন্ডার তাকবীমু উম্মিল কুরা’ (উম্মুল কুরা পঞ্জিকা)-এর অনুসরণ করা। সেটা ভিন্ন আরেকটি পরামর্শ। তার আলোচনা সামনে আসছে।

(সর্বপ্রথম দেখা এবং সৌদির দেখা) এই দুই পরামর্শে যাইহোক ইঞ্জিনিয়ার সাহেব চাঁদ দেখার ভিত্তিতে রোযা ও ঈদ পালনের কথা বলছেন। আর প্রথম পরামর্শে তো পরিষ্কার বলেছেন, সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য সর্বপ্রথম দেখা অনুসারে মাস আরম্ভ করা এবং রোযা ও ঈদ করা অপরিহার্য এবং এটাই আল্লাহ তাআলা ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হুকুম। কিন্তু বইয়ের অধিকাংশ জায়গায় একে রদ করেছেন এবং মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বলেছেন, কুরআনে জ্যোতির্শাস্ত্রীয় হিাসাবের কথা বলা হয়েছে, ‘দেখার কথা নয়। আর হাদীসে যদিও দেখার কথা আছে, কিন্তু এটা সেই কালের পরিপ্রেক্ষিতে বলা হয়েছে। এখন যামানা বদলে গেছে। অতএব এখন আর এ অনুযায়ী আমল করা চলবে না। বরং জ্যোতির্শাস্ত্রীয় হিসাবের নিরীখে মাস শুরু করতে হবে এবং সে অনুসারেই সকল স্থানে একই তারিখে রোযা ও ঈদ পালন করতে হবে। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন!

জ্যোতির্শাস্ত্রীয় হিসাবের প্রসঙ্গ তোলা হলে যে কথাটা প্রথমেই চলে আসে তা হলো, জ্যোতির্শাস্ত্রীয় হিসাবের বিচারে চান্দ্রমাসের গণনা তো বিভিন্ন রকম হতে পারে এবং একেক গণনার ভিত্তিতে চান্দ্রমাসের শুরু ও শেষ একেক রকম হবে, তা-ই স্বাভাবিক। প্রশ্ন হল, কোনো জাতি বা সম্প্রদায় যদি (আল্লাহ রক্ষা করেন) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষাকে বাদ দিয়ে নতুন চাঁদ দেখার পরিবর্তে জ্যোতির্শাস্ত্রীয় হিসাবের ভিত্তিতে রোযা ও ঈদ পালন করতে চায় তাহলে তারা কোন্ ধরনের গণনার অনুসরণ করবে?

এ ব্যাপারে ইঞ্জিনিয়ার সাহেব উম্মতকে বেশ কয়েকটি উপায় নির্দেশ করেছেন। তার মধ্যে প্রায় প্রত্যেকটি উপায়কে তিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের হুকুম বলে উল্লেখ করেছেন। তারপর এই সবগুলো উপায়ের বিরোধিতা করে একটি নতুন উপায়ও তিনি উদ্ভাবন করেছেন। তারপর নিজেই আবার তার বিরোধিতা করেছেন এবং এখনো করে চলেছেন!! সামনে দেখুন :

 

৩. এস্ট্রোনমিক্যাল নিউমুনের মাধ্যমে মাস শুরু

এ বিষয়ে পাঠক তার বিভিন্ন বক্তব্য পর্যালোচনাসহ পড়ে এসেছেন। সেখানে দেখেছেন, এই ভিত্তিহীন বিষয়টিকে প্রমাণ করার জন্য তিনি কত ধরনের বিভ্রান্তি ও ছলাকলার আশ্রয় নিয়েছেন এবং আয়াত- یَسْـَٔلُوْنَكَ عَنِ الْاَهِلَّةِ  (২ : ১৮৯)-এর অর্থ বিকৃত করে কেমন ধৃষ্টতার সাথে একে তার সংস্কারকর্ম বলে দাবি করেছেন! কিন্তু ইঞ্জিনিয়ার সাহেব যখন নিজেই তার সংস্কারকর্ম (?!)-এর বিরোধিতা করতে শুরু করেন, তখন কারই বা কী করার থাকে! পাঠক এও দেখছেন, তার বইয়ে তিনি কুরআনের তরজমাকারীদেরকে, তাফসীরকারদেরকে এবং গোটা উম্মতে মুসলিমাকে বারবার দোষারোপ করেছেন যে, তারা یَسْـَٔلُوْنَكَ عَنِ الْاَهِلَّةِ-এর অর্থ বোঝেননি। আর কুরআনের তরজমাকারীগণও এর ভুল তরজমা করেছেন। তিনি বারবার গোঁ ধরেছেন যে, আয়াতে হিলাল বা নবচন্দ্র নয়, বরং অমাবস্যাকালীন দর্শনযোগ্য নয়- এমন চাঁদ দিয়েই মাস শুরু করতে বলা হয়েছে। এই মিথ্যা দাবির স্বপক্ষে দ্বিতীয় আরেকটি মিথ্যার অবতারণা করেছেন যে, কুরআন নবচন্দ্রের খোঁজ জানতে বলেছে হিসাবের মাধ্যমে!!

এখন দেখুন, গ্রন্থকার নিজেই দুটো কথার বিরোধিতা করেছেন। বইয়ে দ্বিতীয় পরিচ্ছেদের শুরুর দিকে আয়াত ২ : ১৮৯-এর নিজের বানোয়াট তরজমা লিখে ব্যাখ্যাসহ মন্তব্য’-এর অধীনে লিখেছেন, ‘এর জবাবে আল্লাহ বলেছেন, এই নবচন্দ্র সারা বিশ্বের মানুষের জন্য মাসসমূহ  হিসাব করার মাধ্যম। নতুন চন্দ্রোদয় দিয়ে মাস আরম্ভ হবে। আর পরবর্তী মাস আরম্ভ হবে আরেক নতুন চন্দ্রোদয় দিয়ে (চান্দ্রমাস, নবম সংস্করণ, পৃষ্ঠা : ১১২, সপ্তম সংস্করণ, পৃষ্ঠা : ৫৫)

আরো লিখেছেন, ‘তাই বিশ্বের যে কোনো স্থানেই নূতন চন্দ্রোদয় হলে সারা পৃথিবীতে চান্দ্রমাস আরম্ভ হয়ে যাবে (পৃষ্ঠা : ১১২) এ-ও লিখেছেন, ‘এই আরম্ভটা পৃথিবীর যে কোনো স্থান থেকে নবচন্দ্র দেখার মাধ্যমে সংঘটিত হতে পারে

দেখুন, নিজেই কত স্পষ্টভাবে বলছেন যে, আয়াতে নতুন চাঁদের প্রথম দেখার মাধ্যমে মাস শুরুর হুকুম দেয়া হয়েছে। এখন, অমাবস্যার চাঁদ তো দেখতে পাওয়া এমনিতেই সম্ভব নয়। তাছাড়া ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের ভাষ্যমতে অমাবস্যার সময় চন্দ্রোদয় হয়ই না। তাহলে এখানে যে তিনি নতুন চন্দ্রোদয়ের মাধ্যমে মাস আরম্ভের কথা বলছেন নিশ্চয়ই সেটা অমাবস্যার চাঁদ নয়।

আরেক জায়গায় লিখেছেন, ‘পূর্বাকাশে চন্দ্রোদয় এবং পশ্চিমাকাশে সূর্যাস্ত একই সময় সংঘটিত হলে পূর্ণিমা হয়। আর পশ্চিমাকাশে চন্দ্র-সূর্য একই সাথে অস্ত গেলে অমাবস্যা হয়। তাই প্রথম চন্দ্রোদয় দিয়েই পৃথিবীতে চান্দ্রমাস আরম্ভ হবে। বাকি দিনগুলোতেও চন্দ্রোদয় হবে। তবে তা হবে পুরাতন চন্দ্রোদয়। সূরা ইয়াসীন-এর আয়াত- ৩৯-এর মধ্যে এ বিষয়টা আল্লাহ পরিষ্কার করেই বলে দিয়েছেন। তারপর তো আর না বুঝার কিছু নেই (চান্দ্রমাস, পৃষ্ঠা : ৩৭, পর্ব : ১৯)

এখানেও কুরআনের উদ্ধৃতিতে অমাবস্যার পর নতুন চাঁদের প্রথম উদয়কে ভিত্তি বানানোর কথা বলছেন। এরপর তাহলে কেন এই একগুঁয়েমি যে, কুরআন অমাবস্যার চাঁদ দিয়ে মাস আরম্ভ  করতে বলেছে?

তার বক্তব্যের এই স্ববিরোধিতার দিকেই শুধু এখন দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাচ্ছি। দীর্ঘ আলোচনা নয়। তো কী দেখলাম? এক জায়গায় তিনি বলছেন একসঙ্গে রোযা ও ঈদ পালনের ভিত্তি হবে সর্বপ্রথম দেখা। আরেক জায়গায় বলছেন, তা করতে হবে এস্ট্রোনমিক্যাল নিউমুনের ভিত্তিতে। আবার দুটোকেই বলেছেন কুরআনের নির্দেশ। দুটোকেই আয়াত ২ : ১৮৯-এরই ব্যাখ্য ও বিধান বলে উল্লেখ করছেন। তবে নতুন চন্দ্রোদয়ের মাধ্যমে মাস আরম্ভ  হবার পক্ষে সূরা ইয়াসীন-এর আয়াত ৩৯-কে বাড়তি হাওয়ালা হিসেবে পেশ করেছেন। ঐ দিকে আবার প্রথম চাঁদ দেখা ছেড়ে সৌদির চাঁদ দেখাকে ভিত্তি বানাতেও বলছেন!

 

৪. চাঁদের আগে সূর্য অস্তমিত হওয়া

২১ পর্বে লিখেছেন, ‘পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের জন্য সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের নিখুঁত হিসাব বিজ্ঞানীদের কাছে করা আছে। একইভাবে চন্দ্রোদয় চন্দ্রাস্তের হিসাবও বিজ্ঞানীদের কাছে করা আছে। অতএব প্রতি মাসের শেষে যে কোনো স্থানে সূর্যাস্তের পরে যখন চন্দ্রাস্ত হবে তখনই পৃথিবীতে নবচন্দ্রের শুরু হয়েছে বুঝতে হবে। এর ভিত্তিতে চন্দ্রালোকের ভগ্নাংশের হিসাবসহ বাৎসরিক ক্যালেন্ডার বিজ্ঞানীরা অনেক আগেই করে রেখেছেন (চান্দ্রমাস, পৃষ্ঠা : ৪০, প্যারা : ৭)

কুরআন, সুন্নাহ এবং ইজমার লঙ্ঘন করে, চাঁদ দেখার পরিবর্তে তিনি যে হিসাবের ভিত্তিতে চান্দ্রমাস শুরু করাতে চান, সেই হিসাবের দ্বিতীয় মাপকাঠি তিনি এখানে এই উল্লেখ করলেন যে, প্রত্যেক মাসের শেষে পৃথিবীর যে কোনো স্থানে চন্দ্রাস্ত যদি সূর্যাস্তের পরে হয় তাহলে তাই হবে চান্দ্রমাসের শুরু।

আমরা বিনয়ের সঙ্গে জিজ্ঞেস করতে চাই, ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের কাছে এ কথার কী অর্থ? তিনি কি একেই এস্ট্রোনমিক্যাল নিউমুন মনে করছেন? যদি তা-ই হয় তাহলে তো জ্যোতির্বিজ্ঞানে তার দক্ষতার হাল-হাকীকত এখান থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায়। কেননা জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রাথমিক ছাত্রদেরও জানা আছে যে, জ্যোতির্শাস্ত্রীয় নিউমুন’-এর চন্দ্রোদয় ও চন্দ্রাস্তের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। বরং নিউমুন’-এর আসল ব্যাপার হল, মিলন বা সংযুক্তি (কনজাঙ্কশন) অর্থাৎ সূর্য, চন্দ্র ও পৃথিবী একই সরল রেখার উপর একত্রিত হওয়া, আর চাঁদ মাঝখানে এসে পড়া। ইতোপূর্বে উদ্ধৃতিসহ এর আলোচনা হয়েছে।

চান্দ্রমাসের শেষের দিকে সূর্যের পরে চাঁদের অস্তমিত হওয়া অর্থাৎ সূর্যাস্তের কালে চাঁদের দিগন্তে বিরাজ করা- এটা কনজাঙ্কশানের আগেও হতে পারে এবং কনজাঙ্কশানের পর চাঁদ হিলাল’-এর অবস্থায় পৌঁছার আগেও হতে পারে। আবার দর্শনযোগ্য নতুন চাঁদের রূপ নেয়ার পরও হতে পারে। যদি কনজাঙ্কশানের আগে এমনটা হয় তাহলে জ্যোতির্শাস্ত্রের পরিভাষায় এটা হল পুরানো চাঁদের অংশ। আর কনজাঙ্কশানের পরে যদি হয় তাহলে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের পরিভাষায় যদিও তা নতুন চাঁদ, কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত দর্শনযোগ্য না হবে ততক্ষণ তা হিলালনয়, যা দেখে রোযা ও ঈদ পালন করার বিধান।

এখন, ইঞ্জিনিয়ার সাহেব যে চান্দ্রমাসের শেষে সূর্যাস্তের সময় চাঁদের দিগন্তে বিরাজ করাকে নবচন্দ্র বা চান্দ্রমাসের সূচনা সাব্যস্ত করছেন, এটা কি এ জন্য যে, তিনি একেই জ্যোতির্শাস্ত্রীয় নিউমুনমনে করছেন? আর তার কাছে তো কুরআনী হিলাল’-এর অর্থ (নাউযুবিল্লাহ) নিউমুন’-ই বটে। যদি তাই ভেবে থাকেন তাহলে তো এটা গলদ, কোনো সন্দেহ নেই। নাকি এজন্য যে, তিনি একে নিউমুন’-এর মোকাবেলায় মাস শুরুর স্বতন্ত্র কোনো মাপকাঠি বিবেচনা করছেন? সে ক্ষেত্রে তার দলীল কী? কুরআন, হাদীস, ইজমা এবং শরয়ী কিয়াসের অন্তর্ভুক্ত এমন কোন দলীল কি আছে এর পক্ষে, যার আলোকে ইসলামে একে চান্দ্রমাসের শুরু গণ্য করা যাবে? উত্তর পরিষ্কার। কোনো ধরনের দলীল-প্রমাণ নেই। বরং এমন চিন্তাপোষণ শরয়ী প্রমাণাদির পরিপন্থী এক কর্মপন্থারই অনুসরণ। দলীল দ্বারা যা প্রমাণিত তা হলো, ‘দেখাই হবে ভিত্তি; হিসাবসর্বস্ব নিউমুনও না, গণনানির্ভর উদয় ও অস্তও নয়। তাছাড়া ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের মত বিচারেও এটা কুরআন বিরোধী প্রতীয়মান হয়। কারণ তার মতে তো নাউযুবিল্লাহ কুরআন জ্যোতির্শাস্ত্রীয় নিউমুন’ (অমাবস্যা)-এর মাধ্যমে মাস আরম্ভ করতে বলেছে (মাসের শেষে সূর্যাস্তের পরে চন্দ্রাস্ত দিয়ে নয়)!!

৫. উত্তর আমেরিকা ফেকাহ কাউন্সিলের ক্যালেন্ডার

ইঞ্জিনিয়ার সাহেব তার গ্রন্থের ৪২-৪৩ পৃষ্ঠায়, ২২ পর্বে ৪-১২ নম্বর প্যারায় উত্তর আমেরিকা ফেকাহ কাউন্সিলের  তৈরি করা ক্যালেন্ডার মোতাবিক আমল করতে বলেছেন। এ সম্পর্কে অন্যান্য বক্তব্যের সাথে এ-ও লিখেছেন যে, ‘এই মর্মে রাসূল (সা:) এর হাদীস মোতাবেক চন্দ্রদর্শনকে নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক তারিখরেখা বরাবর সূর্যাস্তের পূর্বে জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাবে নবচন্দ্র শুরু হওয়ার পর হতেই পরবর্তী মাসের পহেলা তারিখ গুনতে হবে। কারণ পরবর্তী দিনে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে পৃথিবীর কোনো না কোনো দেশে বা স্থানে অবশ্যই নবচন্দ্র দেখা যাবে আর জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাবে আন্তর্জাতিক তারিখ রেখার পরে নবচন্দ্রের শুরু হলে সেই দিনকে ঐ চান্দ্রমাসের শেষ দিন ধরতে হবে এবং পরের দিন হতে নতুন মাসের প্রথম তারিখ আরম্ভ হবে। এক্ষেত্রেও নবচন্দ্র দর্শনের ব্যাপারে কোন সন্দেহের অবকাশ থাকবে না। আমার প্রস্তাবের ভিত্তিও এটাই

এই মতকে ভিত্তি ধরে উত্তর আমেরিকার ফেকাহ কাউন্সিল কর্তৃক বিশ্বব্যাপী অনুসরণযোগ্য বিশ্ব ইসলামী ক্যালেন্ডারযা একবিংশ পর্বের একাদশ ক্রমিকে উল্লেখ করা আছে, তাকে সার্বজনীনভাবে গ্রহণ করা হলে মুসলিম উম্মাহ সারা বিশ্বে একই বারে রোযা/ঈদ পালন করতে পারবে (চান্দ্রমাস, পৃষ্ঠা : ৪৩, পর্ব : ২২)

এই ফেকাহ কাউন্সিলের মূল্য বা গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চিন্তা-চেতনা ও ফিকহ-ফতোয়ার ক্ষেত্রে তাদের অবস্থানই বা কী- এসব নিয়ে আলোচনা এখন নয়। এবং ইঞ্জিনিয়ার সাহেব এই কাউন্সিলের তৈরি ক্যালেন্ডারের মান সম্পর্কে যা কিছু বলেছেন তা ঠিক কি ঠিক না, বা তার মান যাই হোক শরীয়তের দৃষ্টিতে তা গ্রহণীয় কি না- এ বিষয়েও এখন কিছু বলতে চাই না। এখন শুধু এটুকু বলা উদ্দেশ্য যে, তিনি যে চাঁদ দেখার পরিবর্তে গণনার উপর নির্ভরশীলতাকে কুরআনের হুকুম বলে উল্লেখ করেছেন, সেই গণনার একটি উপায় তিনি এ-ও বর্ণনা করেছেন যে, উপরিউক্ত কাউন্সিলের অনুসরণ করে নাও, তো ব্যস্ এতেই চলবে!

গণনার মাধ্যমে মাস আরম্ভ করা বিষয়ে এটা তাহলে ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের তৃতীয় পরামর্শ হল।

 

৬. উম্মুল কুরা ক্যালেন্ডার অনুসরণ

১৮ পর্বে লিখেছেন, ‘অতএব সারা বিশ্বে প্রথম চাঁদ দেখার সময় হতে একই বারে রোযা রাখা এবং একইবারে ঈদ পালন করার কোনো বিকল্প নেই। আন্তর্জাতিক চাঁদ দেখা কমিটিও এই ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে পারে

এতদসত্ত্বেও সারা বিশ্বের মুসলিম উম্মাহ যদি খানা-ই-কাবাকেই পৃথিবীর কেন্দ্রস্থল হিসেবে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিয়ে মক্কা শরীফে সূর্যাস্তের পর চন্দ্রাস্তকে নবচন্দ্রের শুরু ধরে পরের দিন হতে বিশ্বব্যাপী একত্রে চান্দ্রমাস আরম্ভ করতে চায় তাতে চান্দ্রমাসের হিসাব সঠিকতার আনেকটা কাছাকাছি চলে আসবে। কারণ আমার প্রস্তাবের সাথে উম্মুল কুরা প্রস্তাবের তফাৎ খুবই কম। কিন্তু এই হিসাবের সাথে কোরআন পাকে বর্ণিত হিসাবের কোন পার্থক্য আছে কি না তা দেখতে হবে। তাছাড়া এই হিসাব অনুসরণ করা হলে সাপ্তাহিক দিন ও তারিখ নির্ধারণ নিয়ে বড়  রকমের বিশৃঙ্খলাসহ একই বারে সারা বিশ্বে কেয়ামত হওয়ার বিষয়টাও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। তবে যারা সৌদী আরবকে অনুসরণ করেন তারা অবশ্যই ২/৩ দিন ধরে রোযা-ঈদ পালনকারীদের চেয়ে ভুল কম করেন এবং অধিকতর উত্তম কাজ করেন

এই প্রসঙ্গে বলা যায় যে, বিগত ৭০ বৎসর যাবতই বাংলাদেশের চাঁদপুর জেলার সাদরা দরবার শরীফ এবং পরবর্তীতে শতশত স্থানে এমনকি বিশ্বের অধিকাংশ স্থানে সৌদী আরবের সাথে রোযা ঈদ পালিত হচ্ছে।’ (চান্দ্রমাস, পৃষ্ঠা : ৩৬, প্যারা : ৯-১১)

সম্মানিত পাঠক! একটু লক্ষ্য করুন, এ লোক যখন নিজেই স্বীকার করছেন যে, প্রথম দেখাই হল ভিত্তি, তখন ক্যালেন্ডার অনুসারে আমল করাকে তিনি কীভাবে বৈধতা দেন? তদুপরি উম্মুল কুরা ক্যালেন্ডার সম্পর্কে যে কথা বইয়ের নবম সংস্করণে রয়েছে তা হুবহু আগের সংস্করণ (২০০৮-এর সংস্করণ)-এও ছিল। প্রশ্ন হল, যখন তিনি নিজেই বলছেন যে, এই ক্যালেন্ডারের হিসাবের সাথে কুরআন পাকে বর্ণিত হিসাবের কোনো পার্থক্য আছে কি না দেখতে হবে- তো এটা তিনি নিজেই দেখে নিতেন। এতগুলি বছর পার হয়ে গেলো, অথচ তিনি এখন পর্যন্ত এটা দেখেনইনি। পাঠকদেরকেই বলছেন দেখে নিতে। ওদিকে এ অনুযায়ী আমলেরও অনুমতি দিচ্ছেন। তবে কি শরীয়ত তার দৃষ্টিতে শিশুর খেলনা, তা নিয়ে যেমন ইচ্ছা তামাশা করা যাবে?!

কুরআন হিলালের মাধ্যমে মাস আরম্ভ করতে বলেছে, জ্যোতির্শাস্ত্রীয় হিসাবের মাধ্যমে নয়- এ কথা জানে না এমন কে আছে? কুরআনে যখন জ্যোতির্শাস্ত্রীয় হিসাবের মাধ্যমে মাস শুরুর প্রসঙ্গই নেই তখন ইবাদাতসমূহের তারিখ নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই হিসাবের উপর নির্ভরশীল ক্যালেন্ডারের গ্রহণযোগ্যতা যে প্রথম দফাতেই বাদ হয়ে যায়, তা বলে বোঝানোর দরকার নেই এবং এ নিয়ে কোনো দেন-দরবারেরও প্রয়োজন নেই। তার অবকাশও নেই।

আর যে ব্যক্তির জ্ঞানের স্তর হল, ১০ মুহাররম কেয়ামত কায়েম হওয়ার হাদীসটি যে জাল, এটুকুও তিনি জানেন না এবং যার আকল-বুদ্ধি এই পর্যায়ের যে, তিনি কেয়ামত কায়েম করাকে শরীয়তের হুকুম মনে করছেন, অথচ এটা সরাসরি তাকবীনীমুয়ামালা, যা একান্তই আল্লাহর কাজ। বেচারা এটা বুঝতে অক্ষম যে, শরীয়ত প্রদানকারী তো হলেন আল্লাহ। কিন্তু তার মুকাল্লাফ (পালনে আদিষ্ট) হচ্ছে মানুষ। মানুষের রব নন। এবং এটাও বুঝতে অপারগ যে, আল্লাহ তাআলার তারিখ জানার জন্য মাখলূকের ক্যালেন্ডারের সাহায্য নেয়ার প্রয়োজন নেই। তিনি এও বুঝতে অপারগ যে, ঊর্ধ্বজগৎ এবং অধঃজগতের সময়সূচী এক হওয়া আবশ্যক না- তো এই যার বুদ্ধির দৌড়, তার কী অধিকার আছে কোনো বিষয়ে কলম ধরার?!

বইয়ের এক জায়গায় তো তার যবান ও কলম থেকে একথাও বেরিয়ে এসেছে :

আমার প্রস্তাবিত বিশ্ব হিজরী ক্যালেন্ডারঅনুসরণ করা হলে কেয়ামতের দিন হবে মুহাররম মাসের ১০ (দশ) তারিখ শুক্রবার। আশুরার এই শুক্রবার দিন আন্তর্জাতিক তারিখ রেখায় সূর্য অস্ত যাওয়ার ঠিক পূর্বক্ষণে কেয়ামত সংঘটিত হবে। এভাবে একই বারে সারা পৃথিবীতে একসাথে কেয়ামত হলে শরীয়তের বিধান লংঘিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা থাকবে না (চান্দ্রমাস, পৃষ্ঠা : ১৯২)

সম্মানিত পাঠক! এ এমনই এক অর্বাচীনের উক্তি, যার বিষয়ে মন্তব্য করার মতো শব্দ আমার কাছে নেই। আমি শুধু এটুকু বলবো যে, জনাবের তো তাহলে উচিত কিয়ামত পর্যন্ত সময়ের জন্য ক্যালেন্ডার তৈরি করে দেয়া! কিন্তু সেই সময়টি তো কারোরই জানা নেই। নিজের কিয়ামত কখন ঘটে যায় সেই খবরই তো কারো জানা নেই। যে মানুষ ১৪৩৮ বর্তমান এই হিজরী বর্ষ পর্যন্ত ক্যালেন্ডারটিও এখনো তৈরি করতে পারেননি, তিনি কি না স্বপ্ন দেখছেন তার ক্যালেন্ডার মোতাবেক কিয়ামত সংঘটিত হবার! কিয়ামত ও শরীয়ত এ দুয়ের মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে কি নেই, এটাও মহোদয়ের অজানা। এরপর আমাদের আর কী বলার থাকে?! এবং সিঙ্গা ফোঁকার দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতা সিঙ্গায় ফুঁক দেবেন কি সরাসরি আল্লাহর হুকুমে, নাকি ক্যালেন্ডার দেখে এইটুকু এলেমও জনাব রাখেন না। ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের নিজের ব্যাপারে এ এক আশ্চর্য সুধারণা যে, ঐ ফেরেশতা তার চান্দ্র-ক্যালেন্ডার (এখন পর্যন্ত যার কোনো অস্তিত্বই নেই) দেখেই ফুঁক দেবেন সিঙ্গায়! ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন! ব্যস্ আল্লাহ আমাদেরকে কিয়ামতের জন্য প্রস্তুতি নেয়ার তাওফীক দান করুন।

بَلِ السَّاعَة مَوْعِدُهُمْ وَ السَّاعَةُ اَدْهٰی وَ اَمَرُّ

আর এটা কত না হাস্যকর এবং দুঃখজনক কথা যে, কিয়ামতের সূচনা নাকি হবে আইডিএল অনুসারে! এমন গালগল্প আর এমন কল্পনাবিলাস মানুষ কী করে দেখায়! তাও আবার কিয়ামতের মতো বিষয়ে, যা কিনা আল্লাহ তাআলার কুদরতের বিশাল এক নিদর্শন!!

যাই হোক, কথা হচ্ছিল উম্মুল কুরা ক্যালেন্ডার নিয়ে। তো এই ক্যালেন্ডার কেবল দাপ্তরিক কাজকর্মে ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। খোদ সৌদিতেই রোযা, হজ্ব, কুরবানী ও অন্যান্য দ্বীনী কর্মকাণ্ডে এই ক্যালেন্ডারের কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। এই ক্যালেন্ডারে প্রত্যেক চান্দ্রমাসের প্রথম তারিখের নিচে এই সতর্কবাণী লেখা আছে যে,

التقويم اصطلاحي مدني اعتمد في حسابه على إحداثيات المسجد الحرام، ويعتمد في حساب أوائل الأشهر على الرؤية الشرعية للهلال.

অর্থাৎ এ ক্যালেন্ডারটি আমাদের পারিভাষিক বিষয়। যা ব্যবস্থাপনাগত প্রয়োজন পূরণের জন্য। চান্দ্রমাসের প্রথম তারিখ নির্ধারণের বিষয়ে হিলালের শরীয়তসম্মত দেখা’-এর উপর নির্ভর করতে হবে।

যে কোনো বছরের উম্মুল কুরা ক্যালেন্ডার হাতে নিন, তাতে আপনি এই পরিষ্কার বিবরণ দেখতে পাবেন। যেহেতু এই ক্যালেন্ডার দাপ্তরিক কাজকর্মের জন্য তাই এর ফর্মুলাও তাদের এখানে পরিবর্তন হতে থাকে। ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের যদি তা জানা থাকতো তাহলে তিনি অবশ্যই বুঝতে পারতেন যে, ইবাদতের সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই ক্যালেন্ডার শরীয়তের নীতিমালার আলোকেও সঠিক নয় এবং তার আবিষ্কৃত নিয়ম অনুসারেও নয়।

উম্মুল কুরা ক্যালেন্ডারে চান্দ্রমাস সূচনার মাপকাঠিতে কী কী পরিবর্তন এসেছে- সংক্ষেপে তা এখানে উদ্ধৃত করা ভালো মনে হচ্ছে।

১৩৪৬ হিজরী থেকে ১৩৯২ হিজরী (১৯২৭ ঈ. -১৯৭৩ ঈ.) পর্যন্ত মাপকাঠি ছিল এই যে, সূর্যাস্তের সময় দিগন্ত থেকে চাঁদের উচ্চতা নয় ডিগ্রী বা তার চেয়ে বেশি হলে পরবর্তী দিন থেকে চান্দ্রমাস শুরু হবে।

১৩৯৩ হিজরী থেকে ১৪১৯ হিজরী (১৯৭৩ ঈ. -১৯৯৭ ঈ.) পর্যন্ত মানদ- ছিল, গ্রীনিচ মান সময় অনুসারে রাত বারোটা (সৌদির সময় অনুসারে রাত নয়টা)-এর আগে যদি চাঁদের জন্ম হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে পরবর্তী দিন হবে চান্দ্রমাসের প্রথম দিন।

১৪১৯ হিজরী থেকে ১৪২২ হিজরী (১৯৯৮ ঈ.-২০০২ ঈ.) পর্যন্ত মাপকাঠি ছিল, মক্কা মুকাররমায় সূর্যাস্তের পর যদি চন্দ্রাস্ত হয় (চাঁদের জন্ম হয়ে থাকুক আর নাই হোক) পরবর্তী দিন চান্দ্রমাসের প্রথম দিন।

১৪২৩ হিজরী (মার্চ ২০০২ ঈ.) থেকে এ নিয়ম চালু রয়েছে যে, যদি সূর্যাস্তের আগেই চাঁদের জন্ম হয়ে গিয়ে থাকে এবং মক্কা মুকারমায় সূর্যাস্তের পর চন্দ্রাস্ত হয় তাহলে পরবর্তী দিন হবে চান্দ্রমাসের প্রথম দিন [1]১।

সামনে এতে আরো কী পরিবর্তন আসে, সেটা তো আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। এখন বিভিন্ন এলাকা থেকে সৌদি সরকারের কাছে আবেদন করা হচ্ছে যে, নবচন্দ্র দেখা যাওয়ার সম্ভাব্য সময়কে মাপকাঠি বানিয়ে উম্মুল কুরা ক্যালেন্ডার তৈরি করা হোক।

যাইহোক, আমি বলতে চাচ্ছিলাম, যেই ক্যালেন্ডারের ভিত্তি কোনো শরয়ী মাপকাঠির উপর নয়, সময় যত গড়াবে তাতে পরিবর্তন আসতেই থাকবে। তো এমন ক্যালেন্ডারকে ইসলামী ইবাদতের মানদ- বানানো কি ঠিক হয়? স্বয়ং এই ক্যালেন্ডার প্রণেতাগণ স্পষ্ট বলেছেন, এই ক্যালেন্ডার দাপ্তরিক ও ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট। ইসলামী মাস শুরু হবে শরীয়তসম্মত দেখাঅনুসারে। সেজন্য সৌদির ওলামা মাশায়েখ এবং সকল উমারা ও আম-জনতা সেখানকার চাঁদ দেখা কমিটির ফায়সালা অনুযায়ী আমল করে থাকেন।

তো এই ক্যালেন্ডারটি শুধুই দাপ্তরিক কাজের জন্য। তা সত্ত্বেও ইঞ্জিনিয়ার সাহেব আমাদেরকে এই ক্যালেন্ডার মোতাবেক রোযা ও ঈদ করার দাওয়াত দিচ্ছেন। তবে কি ইবাদত কোনো দাপ্তরিক কিংবা ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট কাজ?

ইঞ্জিনিয়ার সাহেব একদিকে এই দাওয়াত দিচ্ছেন, অন্যদিকে নিজেই আবার লিখে বসে আছেন, ‘ক্রমিক ১১-এর চার্ট হতে দেখা যাচ্ছে যে, নবচন্দ্র দর্শনকে নিশ্চিত করার জন্য সৌদী আরবের উম্মুল কুরা’ (সৌদী সরকার অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান) পৃথিবীর অন্যান্য স্থানের তুলনায় প্রায় প্রতি চান্দ্রমাস আরম্ভ করে একদিন পরে। এটা সমর্থনযোগ্য কাজ হতে পারে না (চান্দ্রমাস, পৃষ্ঠা : ৪১, প্যারা : ১৬)

যে জিনিস সমর্থনযোগ্য হতে পারে না, সে অনুসারেই তিনি উম্মতকে আমল করতে বলছেন, এই হল তার সংস্কার! হিসাবের মাধ্যমে মাস শুরুর বিষয়ে এটা হলো ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের চতুর্থ পরামর্শ।

 

৭. বিশ্ব হিজরী ক্যালেন্ডার

সপ্তম পরামর্শ হল, তার প্রস্তাবিত বিশ্ব হিজরী ক্যালেন্ডারের অনুসরণ করা। তিনি লিখেছেন,

এই পর্বের একাদশ প্যারায় প্রদত্ত চার্ট বা ছক পর্যালোচনা করে আন্তর্জাতিক তারিখ রেখার পরে নবচন্দ্রের শুরুকে ভিত্তি ধরে আমি একটা সার্বজনীন বিশ্ব হিজরী ক্যালেন্ডারটেবিলের ডান পার্শ্বে নবম কলামে প্রস্তাব করেছি। এই প্রস্তাবে বিশ্বব্যাপী নবচন্দ্রের শুরু এবং নবচন্দ্রের দর্শন উভয়েরই মধ্যে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে কমপক্ষে ১২ ঘণ্টা ব্যবধানের কথা বিবেচনায় রাখা হয়েছে

এই ক্যালেন্ডার সকলের কাছেই গ্রহণযোগ্য হওয়ার কথা। তাতে বিশ্ব ইসলামী উম্মাহর মধ্যে একাত্মতা ও সাবির্ক সমন্বয় সাধিত হবে। একই সঙ্গে এই ব্যাপারে ইসলামী শরীয়াহ বিশ্বব্যাপী পরিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করবে

এই সমন্বিত ও প্রস্তাবিত ক্যালেন্ডারের মূল ভিত্তি কিন্তু কোরআন, হাদীস এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান, যা একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই বুঝা যাবে। তাছাড়া সার্বজনীন চিন্তা ও চেতনায় এর মধ্যে কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক পরিপূর্ণভাবে সারা বিশ্বে শরীয়াহ প্রতিষ্ঠা লাভের প্রকৃত আলামত অন্তর্নিহিত আছে

অতএব আমরা এই সমন্বিত প্রস্তাবকে বিশ্ব হিজরী ক্যালেন্ডারহিসেবে গ্রহণ করার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি। তাহলে বিভাজন ছেড়ে মুসলিম উম্মাহ ঐক্যের পথে এগিয়ে যেতে পারবে (চান্দ্রমাস, পৃষ্ঠা : ৪১-৪২, প্যারা : ১৮, ১৯, ২০, ২২)

উত্তর আমেরিকা ফিকাহ কাউন্সিলের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী আমলের অনুমতি দেওয়ার পর লিখেছেন, ‘তবে আমার প্রস্তাবিত বিশ্ব হিজরী ক্যালেন্ডারবিভিন্ন দিক থেকে বিচার বিশ্লেষণের কারণে আরও বেশি তথ্যনির্ভর ও যুক্তিসঙ্গত (চান্দ্রমাস, পৃষ্ঠা : ৪৩, প্যারা : ১৩)

এক জায়গায় এও লিখেছেন, ‘অতএব আমার দৃষ্টিতে উপায় একটাই। তা হল, আমার প্রস্তাবিত বিশ্ব হিজরী ক্যালেন্ডারকে মানবজাতির জন্য আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত স্বরূপ গ্রহণ করা এবং বিশ্বব্যাপী অনুসরণ করা (চান্দ্রমাস, পৃষ্ঠা : ৪৭, পর্ব ২৪, প্যারা : ৮)

তার এই বিশ্বহিজরী ক্যালেন্ডারের গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু সেটা তার যবানীতেই শুনুন। পর্ব ৩৩, যা নিয়ে তার খুবই গর্ব, সেখানে তিনি অমাবস্যাকে অস্বীকারও করেছেন, আবার অমাবস্যার মাঝে শুরু হওয়া প্রথম নবচন্দ্রকে মাসের সূচনাও সাব্যস্ত করেছেন। তারপর লিখেছেন, ‘এই বিবেচনায় লেখকের প্রস্তাবিত বিশ্ব হিজরী  ক্যালেন্ডারে কদাচিৎ ক্ষেত্রে মাসকে একদিন এগিয়ে আনতে হতে পারে। হিসাবের নিখুঁততার খাতিরে এমন হওয়াটা মোটেই অসম্ভব নয়

কারণ নতুন চাঁদের শুরু দিয়ে মাস আরম্ভ করা হলে ২/১ ক্ষেত্রে চান্দ্রমাস একদিন আগে শুরু হওয়া বিচিত্র নয়

মূলে সূরা বাকারার আয়াত ২ : ১৮৯-এর মাধ্যমে মহান আল্লাহ সুবহানাল্লাহু তাআলা এ কথাই ব্যক্ত করেছেন

আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক জ্ঞান ও সহীহ বুঝ দান করুন।’ (চান্দ্রমাস, পৃষ্ঠা : ৫৮, প্যারা : ১৪-১৭)

দেখুন, প্রথমে তো আয়াত বিকৃত করেছিলেনই, তারপর সেই বিকৃত অর্থের উপরও টিকে থাকতে পারলেন না। পুনরায় তাতে বিকৃতি সাধন করে সেটাকেও আল্লাহর কালাম বলে চালিয়ে দিলেন। কী আশ্চর্য দর্শন! হিসাব নিখুঁত হওয়ার জন্য নির্ধারিত সময়ের আগেই মাস শুরু করে দাও! সাথে আবার এ দাবিও জুড়ে দাও যে, কুরআন এরকমই বলেছে?!

এখানে প্রসঙ্গত বলতে হয়, ‘আল্লাহ সুবহানাল্লাহু তাআলা’-এর পরিবর্তে ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলালেখা উচিত ছিল। আর যদি সর্বনামের পরিবর্তে তিনি (পরের বারও) সরাসরি আল্লাহএই মহান নামটি রাখতে চান তাহলে সুবহানাল্লাহিলিখতে হবে। সুবহানাল্লাহুনয়।

যাই হোক, ইঞ্জিনিয়ার সাহেব দেখাকে বর্জন করে হিসাব’-এর পথ ধরেছিলেন। কিন্তু হিসাবের ব্যাপারে তিনি যে পরস্পর বিরোধী প্রস্তাবের অবতারণা করেছেন, তার ধারাবাহিকতা এখনো শেষ হয়নি। সামনে ষষ্ঠ প্রস্তাবটি দেখুন :

 

৮. প্রকৃত বিশ্ব হিজরী ক্যালেন্ডার

৫৫ পর্বের শেষ প্যারায় তিনি লিখেছেন, ‘উপরোক্ত প্রশ্নসমূহের জবাব দিতে না পারলে কোরআন, সুন্নাহ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভিত্তিতে তৈরী করা প্রকৃত বিশ্ব হিজরী ক্যালেন্ডারঅনুসরণ করুন এবং বিশৃঙ্খলা বাদ দিয়ে দুনিয়া ও আখেরাত ঠিক রাখুন (চান্দ্রমাস, পৃষ্ঠা : ৮৭)

প্রকৃত বিশ্ব হিজরী ক্যালেন্ডার বলে তিনি কী বোঝাতে চেয়েছেন পরিষ্কার নয়। যদি তার তৈরীকৃত ক্যালেন্ডার উদ্দেশ্য হয় তাহলে স্পষ্ট করে বললেই ভালো হত। আর যদি অন্য কোনো ক্যালেন্ডার উদ্দেশ্য হয়ে থাকে তাহলে এটা তার আরেকটি প্রস্তাব বলে গণ্য হবে।

 

৯. একক বিশ্ব হিজরী ক্যালেন্ডার

নবম প্রস্তাবটি এই যে, একক বিশ্ব হিজরী ক্যালেন্ডার তৈরি করে তার অনুসরণ করা হবে। তিনি লিখেছেন, ‘অতএব একক বিশ্ব হিজরী ক্যালেন্ডারগ্রহণ ও অনুসরণ করা মুসলিম উম্মাহর জন্য একান্তভাবেই জরুরী (চান্দ্রমাস, পৃষ্ঠা : ৩৪, পর্ব : ১৫ প্যারা : ৭)

আরো লিখেছেন, ‘একক বিশ্ব হিজরী ক্যালেন্ডার না পাওয়া পর্যন্ত এবং OIC -এর সিদ্ধান্তও যদি মানতে না চাই, তবে ভুলের মাত্রা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনার জন্য বাংলাদেশ আপাতত সৌদি আরবকে অনুসরণ করতে পারে। বাংলাদেশ তা করছে না কেন?’ (চান্দ্রমাস, পৃষ্ঠা : ৮৭, প্যারা : ২৮)

৫৭ পর্বে লিখেছেন,

চাঁদের হিসাব ও দেখাকে যুক্ত করে একটা সমন্বিত উপায় উদ্ভাবন করা যায়’ (শিরোনাম)

জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাব বলে, নতুন চাঁদের শুরুর (জন্মের) ১২ ঘণ্টা পরে ছাড়া তা দেখা কখনো সম্ভব নয়।

এই অসম্ভব সময়টাকে ৩ ঘণ্টা বাড়িয়ে ১৫ ঘণ্টা ধরলে একটা সমন্বিত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।

নতুন চাঁদ মক্কার আগে শুরু হলে (জন্ম নিলে) IDL পর্যন্ত এর বয়স হবে ১৫ ঘণ্টার বেশী। এমতাবস্থায় পরের দিন হতে নতুন চান্দ্রমাসের শুরু ধরতে হবে।

নতুন চাঁদ মক্কার পরে শুরু হলে (জন্ম নিলে) পরের দিনটাকে পুরাতন মাসের শেষ দিন ধরতে হবে। কারণ এই সময়ের মধ্যে নতুন চাঁদ IDL -এর আগে দেখা যাবে না

এভাবে হিসাবের মাধ্যমে নতুন চাঁদ দেখাকে সংযুক্ত করলে একটা সমন্বিত সিদ্ধান্ত পাওয়া যাবে

এর ভিত্তিতে হিসাবের সাহায্যে একটা একক (Unifieb) বিশ্ব হিজরী ক্যালেন্ডার তৈরী ও অনুসরণ করা যায়

২০১১ খৃষ্টাব্দে ঈদুল ফিতরের দিন/তারিখ থেকে এমন একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার যথেষ্ট যুক্তি আছে বলে আমার মনে হয়।

তবে আমি হিসাবকে কোরআনের নির্দেশ মনে করি

মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের খাতিরে এমন একটা সিদ্ধান্তকে আপাততঃ মেনে নেওয়া যেতে পারে বলে মনে হয়

OIC-এর ইসলামী ফিকহ একাডেমি ১৯৮৬ খৃষ্টাব্দে যেই সিদ্ধান্ত দিয়েছে তার সাথে এই সমন্বিত ব্যবস্থার মিল আছে (চান্দ্রমাস, পৃষ্ঠা : ৯৫-৯৬)

তবে আমি হিসাবকে কোরআনের নির্দেশ মনে করিতার এ কথার মতলব হল, এস্ট্রোনমিক্যাল নিউমুনের মাধ্যমে মাস শুরু করাকে তিনি কুরআনের নিদের্শ মনে করেন। যদি নিউমুন দর্শনযোগ্য হবার জন্য পনেরো ঘণ্টা অপেক্ষা করা হয় তাহলে এতে করে কুরআনের বিরুদ্ধাচরণ  অবধারিত হয়ে যায়। ইঞ্জিনিয়ার সাহেব বলছেন, উম্মতের মাঝে ঐক্য সৃষ্টির খাতিরে কুরআনের বিরুদ্ধাচরণ করে দেখার সম্ভাবনার উপর নির্ভরশীল একক বিশ্ব হিজরী ক্যালেন্ডার মানতে তিনি প্রস্তুত আছেন!!

আর তা সম্ভবত এ কারণে যে, এত শোরগোল এবং কথিত সংস্কারের আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে, একসাথে রোযা ও ঈদ পালনের বাসনাটা পূর্ণ করা, ব্যস। শরীয়তের বিধান পালন বা তার দাওয়াত দেয়া এখানে মূল ব্যাপার নয়। আর তাই যেটাকে কুরআনের নির্দেশ বলে জ্ঞান করছেন তার ব্যত্যয় করাও বৈধতা পেয়ে যাচ্ছে অনায়াসে!

আর না হয় এ কারণে যে, তার তো জানাই আছে, তিনি হিসাব এবং অমাবস্যার যে কথা কুরআনের সাথে সম্পর্কযুক্ত করেছেন, সেটা সম্পূর্ণ তার নিজের বানানো। না কুরআনে এমন নির্দেশ আছে, না শরীয়তের অন্য কোনো উৎসে। অতএব এর ব্যতিক্রম বা বরখেলাফ করা কী এমন ব্যাপার?!

যাই হোক, তিনিই বুঝুন তার হিসাব। আমাদের প্রশ্নটা হল, সেই একক বিশ্ব হিজরী ক্যালেন্ডার  কোথায়? উপরে উল্লেখ করা কথাবার্তা থেকে মনে হচ্ছে, ঐ ক্যালেন্ডার এখনো তৈরী হয়নি। সেটা তৈরী করে তার অনুসরণ করতে হবে। কিন্তু ৫৮ পর্বে তো বলেছেন, ‘এই আয়াত হতেই চন্দ্রের হিসাবে আমরা একক বিশ্ব হিজরী ক্যালেন্ডারপাব, যা আমি তৈরী করেছি (চান্দ্রমাস, পৃষ্ঠা: ৯৭, প্যারা : ১৪)

যদি এটা জনাবের কাছে তৈরী থাকেই তাহলে তো সেটা উম্মতের সামনে আসা চাই। কিন্তু কই সেটা? আপনি তো উম্মুল কুরা ক্যালেন্ডারই ছেপে যাচ্ছেন, ‘একক বিশ্ব হিজরী ক্যালেন্ডারগেলো কোথায়?

ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের কাছে প্রশ্ন- কিসের নাম নবচন্দ্রের শুরু?

নবম ও সর্বশেষ সংস্করণের ১৫০-১৫৫ পৃষ্ঠায় ইঞ্জিনিয়ার সাহেব শুধু তিন বছরের (১৪৩১-১৪৩৩ হিজরী) জন্য নিজের প্রস্তাবিত বিশ্ব হিজরী ক্যালেন্ডারের একটি ছক পেশ করেছেন। ১৪৮-১৪৯ পৃষ্ঠায় এই ছকের পর্যালোচনা পেশ করেছেন। সেখানে লিখেছেন, ‘তিন ঘণ্টা অন্তর সময়ের হিসাবের মাধ্যমে সূর্যাস্তের পর

চন্দ্রাস্তকে নিধার্রণ করার জন্য পৃথিবীর বিষুবরেখাকে তিন ঘণ্টা অন্তর ৮ (আট) ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে

এই আটভাগে বিষুবরেখা বরাবর প্রতি মাসের শুরুতে সূর্যাস্তের পরেই চন্দ্রাস্তের বিবরণ দেখে নবচন্দ্রের শুরুর তারিখ বের করা হয়েছে। ইংরেজী মাস অনুযায়ী এই বিবরণসমূহ ইন্টারনেট থেকে নেওয়া হয়েছে

১৫০-১৫৫ পৃষ্ঠায় প্রদত্ত ছকের ১ থেকে ৮ কলামসমূহে নবচন্দ্রের আরম্ভের তারিখ বিষুবরেখার আটটি নির্দিষ্ট স্থানে আরবী ও ইংরেজী মাসের ভিত্তিতে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে

বিজ্ঞানীদের মতে নবচন্দ্রের আরম্ভের পর নবচন্দ্র দশর্নের জন্য কমপক্ষে বার ঘণ্টা সময়ের প্রয়োজন হয়

তাই আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা (IDL) হতে পরবর্তী ৬ (ছয়) ঘণ্টা পর নবচন্দ্রের শুরুর তারিখ নিশ্চিত হওয়ার পরের দিনকে আরবী মাসের শুরু ধরা হয়েছে

এতে করে হাদীসের কথামত নতুন চাঁদ দেখার বিষয়টা নিশ্চিত হয়ে যাবে

IDL -এর পর ৬ (ছয়) ঘণ্টার মধ্যে নবচন্দ্রের আরম্ভকে শরীয়াহর ভিত্তিতে নিশ্চিত বা দৃঢ়করণের খাতিরে আমলে নেওয়া হয়নি

সপ্তম সংস্করণে লিখেছিলেন এরকম :

বিজ্ঞানীদের মতে নবচন্দ্রের জন্মের পর নবচন্দ্র দর্শনের জন্য কমপক্ষে বার ঘণ্টার প্রয়োজন হয়

তাই দিবারম্ভের সূত্ররেখা (IDL) হতে পরবর্তী ৬ (ছয়) ঘণ্টার পর নবচন্দ্রের জন্ম তারিখ নিশ্চিত হওয়ার পরের দিনকে আরবী মাসের শুরু ধরা হয়েছে (চান্দ্রমাস, সপ্তম সংস্করণ, পৃষ্ঠা : ৪২)

প্রশ্ন হল, আগে যেটাকে নবচন্দ্রের জন্মলিখেছিলেন এখন সেটাকে নবচন্দ্রের শুরুবা আরম্ভকেন লিখছেন? আবার দুটো কথাই বিজ্ঞানীদের বরাতে? যদি জন্মশব্দ এ জন্য পরিবর্তন করে থাকেন যে, উল্লেখিত মানদ- (মাসের শেষে সূর্যাস্তের সময় দিগন্তে চাদের উপস্থিতি কিংবা সূর্যাস্তের পর চন্দ্রাস্ত) বিজ্ঞানীদের মতে নবচন্দ্রের জন্ম নয়, তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, নবচন্দ্রের জন্ম তবে কিসের নাম, তার মতে? ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের বই এ ব্যাপারে একদম খামোশ কেন?

দ্বিতীয় প্রশ্ন হল, যদি এটা (সূর্যের পরে চাঁদের অস্তমিত হওয়া) নবচন্দ্রের জন্মনয়; বরং নবচন্দ্রের শুরু’, তাহলে তো বিজ্ঞানীদের রেফারেন্সে জনাবের লেখা উচিত ছিল যে, অমুক অমুক বিজ্ঞানী একে নবচন্দ্রের শুরু আখ্যা দিয়েছেন? কিন্তু এমন কোনো রেফারেন্সের উল্লেখ তো আমরা বইতে পেলাম না!

তৃতীয় প্রশ্ন : সারা বইয়ে কয়েক বার করে লেখা হয়েছে যে, নবচন্দ্রের শুরু হয় অমাবস্যার মাঝখানে। প্রশ্ন হল, অমাবস্যার মাঝখানটা কি সবসময় সূর্যাস্তের কালেই হয়, যে কারণে ঐ মুহূর্তে দিগন্তে চাঁদের উপস্থিতিকে জনাব নবচন্দ্রের শুরু আখ্যায়িত করছেন?!

যদি বিষয়টা এরকম না হয় তাহলে দয়া করে আপনি বিজ্ঞানীদের রেফারেন্সে এই পাঁচটি জিনিসকে স্পষ্ট করুন যে, এর মধ্যে কোনটি বিজ্ঞানীদের মতে নবচন্দ্রের শুরু? এবং বিজ্ঞানীদের মতে যেটা শুরু, আপনার মতে শরীয়তে নবচন্দ্রের শুরু যদি সেটাই হয়ে থাকে তাহলে এর পক্ষে আপনি শরয়ী দলীলও পেশ করুন। যেমন :

১. চাঁদ সূর্যের পরে অস্তগমন

২. অমাবস্যার মাঝখান

৩. নবচন্দ্রের জন্ম

৪. অমাবস্যার পর নবচন্দ্রের উদয়

৫. নবচন্দ্রের প্রথম দর্শন

এই পাঁচ জিনিসকে আপনি আপনার বইয়ে নবচন্দ্রের শুরু আখ্যায়িত করেছেন। এখন আপনিই বলুন, এই পাঁচ জিনিসের মধ্যে একটার সাথে আরেকটার কোনো পার্থক্য আছে কি নেই? এও বলুন, সংযোগ/সম্মিলন  (কনজাঙ্কশান) এবং নবচন্দ্রের জন্ম দুটো একই বিষয়, নাকি জন্ম হলো কনজাঙ্কশানের অব্যবহিত পরের সময়ের নাম? জ্যোতির্শাস্ত্রীয় নিউমুন এবং হিলালকে তো আপনি বিকৃত করে এক বানিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু গোটা বইয়ে কোনো একজন বিজ্ঞানীর রেফারেন্সে নিউমুনের পারিভাষিক সংজ্ঞা তো উল্লেখ করলেন না!!

মেহেরবানী করে বলুন, উপরিউক্ত পাঁচ জিনিসের মধ্যে নিউমুনএবং নবচন্দ্রকোন জিনিসের নাম? যদি সবকটি বিষয়ই নবচন্দ্রের সংজ্ঞায় আসার মতো হয় তাহলে যেসব অঞ্চলে প্রথম রাতের চাঁদ দৃষ্টিগোচর হওয়া সম্ভবই না, তারা যখন দ্বিতীয় রাতে নতুন চাঁদের দেখা পায়; তো তাদের এই চাঁদকে নবচন্দ্র বলতে আপনার এত অসুবিধা হচ্ছে কেন?

চতুর্থ প্রশ্ন হল, যেহেতু আপনার মতে কুরআন অমাবস্যা থেকে মাস শুরু করতে বলেছে তাহলে আপনি নতুন চাঁদ দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনাকে নিশ্চিত করার জন্য মাস কেন বিলম্বে শুরু করছেন?

পঞ্চম প্রশ্ন হল, হাদীসে তো রোযা ও ঈদকে হিলাল দেখার সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে, দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনার সাথে নয়। তাহলে শুধু দেখার সম্ভাবনার বিষয়টি বিবেচনা করা হলে হাদীসের উপর আমল হবে কীভাবে?

ষষ্ঠ প্রশ্ন এই যে, আপনার মতে যেহেতু চাঁদ দেখার হাদীসসমূহ কুরআন বিরোধী, আর আপনি নিজেই লিখেছেন, কুরআনের বরখেলাফ হাদীস অনুসারে আমল করা মানে কুরআনেরই বিরুদ্ধাচারণ করা; তাহলে আপনি বিশ্ব হিজরী ক্যালেন্ডার’-এর নামে উম্মতের সামনে যে কাল্পনিক উপহার নিয়ে হাজির হয়েছেন (কাল্পনিক এজন্য যে, ঐ ক্যালেন্ডারের যেটুকু সামনে এসেছে তা কেবল ১৪২৮ হিজরী থেকে ১৪৩৪ হিজরী পর্যন্ত সময়কালের) যাকে আপনি শ্রেষ্ঠ নিআমত মনে করে গ্রহণ করে নেওয়াকে যাবতীয় সমস্যার একমাত্র সমাধান সাব্যস্ত করেছেন- তাকে চাঁদ দেখার সম্ভাবনার নীতির উপর কেন নির্ভরশীল করলেন?

ইঞ্জিনিয়ার সাহেব তার প্রস্তাবিত বিশ্ব হিজরী ক্যালেন্ডারের পর্যালোচনায় আরো যা লিখেছেন, ‘উপরোক্ত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে আমার প্রস্তাবিত বিশ্ব হিজরী ক্যালেন্ডারের ১৪৩১, ১৪৩২ ও ১৪৩৩ হিজরী মাস আরম্ভের তারিখসমূহ ছকসমূহের কলাম ৯-এ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে

উত্তর আমেরিকা ফেকাহ কাউন্সিলপ্রস্তাবিত বিশ্ব ইসলামী ক্যালেন্ডার’-এর তারিখসমূহ কলাম ১০-এ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে

সৌদী আরবের সরকার কর্তৃক অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান উম্মুল কুরাকর্তৃক তৈরি হিজরী ক্যালেন্ডারের তারিখসমূহ কলাম ১১-এ দেওয়া হয়েছে

বাংলাদেশে অনুসৃত অথবা সম্ভাব্য হিজরী ক্যালেন্ডারের তারিখসমূহ কলাম- ১২-তে দেওয়া হয়েছে

জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভিত্তিতে IDLGMT -তে চন্দ্রালোকের ভগ্নাংশের হিসাবঅনুযায়ী ১৪৩১, ১৪৩২, ১৪৩৩ হিজরী সনের তারিখসমূহ ১৩ ও ১৪ কলামে দেখানো হয়েছে

৯ থেকে ১৪ নং কলামে প্রদত্ত ৬ খানা ক্যালেন্ডারের মধ্যে ৩ বা তার বেশী তারিখের সমন্বয়ের একটা একক বিশ্ব হিজরী ক্যালেন্ডার১৫ নং কলামে দেওয়া হয়েছে। সবাই এটা অনুসরণ করলেও মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা হতে পারে (চান্দ্রমাস, পৃষ্ঠা : ১৪৮-১৪৯, প্যারা : ৯-১৪)

এখানে প্রশ্ন হল, বিভিন্ন ক্যালেন্ডারের মধ্য থেকে যদি তিনটার ফলাফল এক হয়ে যায় তাহলে একে স্বতন্ত্র ক্যালেন্ডার গণ্য করে একক বিশ্ব হিজরী ক্যালেন্ডারনাম দেওয়া- এটা শরীয়তের কোন নির্দেশের ভিত্তিতে কিংবা বিজ্ঞানীদের কোন নীতিমালার আলোকে করা হয়েছে?

এদিকে বিভিন্ন মাধ্যমে শুনতে পেয়েছি যে, ইঞ্জিনিয়ার সাহেব এখন বলছেন, ‘এভাবে কোনো ক্যালেন্ডার হয় না। আমি যদিও লিখেছি, তবে তা ঠিক হয়নি। বইয়ের আরো কোনো সংস্করণ বের হলে সেখানে হয়ত আর থাকবে না এটা

অথচ তিনি নিজেই লিখেছেন, ‘আমার প্রস্তাবের সাথে অন্যান্য সংগঠনের প্রস্তাবের পরিপূর্ণ সামঞ্জস্য পরিলক্ষিত না হলেও পার্থক্য খুবই কম। যৌক্তিক কারণে আমার প্রস্তাব বেশী গ্রহণযোগ্য বলে আমি মনে করি

পৃথিবীকে ১ ঘণ্টা অন্তর মোট ২৪ ভাগে ভাগ করে প্রতি জায়গায় নবচন্দ্রের শুরুর তথ্য ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করেও এ কাজ করা যেতে পারে

জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভিত্তিতে নেওয়া হিসাব অনুযায়ী আমার প্রস্তাবিত বিশ্ব হিজরী ক্যালেন্ডারঅত্যন্ত নির্ভরযোগ্য এবং অন্যদের তুলনায় বেশী নির্ভুল বলে আমি মনে করি। তবে একক বিশ্ব হিজরী ক্যালেন্ডারঅনুসরণ করাকে আমি আরও বেশী সমর্থন করবো (চান্দ্রমাস, পৃষ্ঠা : ১৪৯, প্যারা : ১৫-১৭)

সেই যৌক্তিক কারণটি কী, যার জন্য আপনার ক্যালেন্ডার আপনার দৃষ্টিতে বেশি গ্রহণযোগ্য এবং অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য, সেই সাথে অন্যদের তুলনায় বেশি নির্ভুল? তার উল্লেখ করাও তো খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল!

তাছাড়া আপনার প্রস্তাবিত বিশ্ব হিজরী ক্যালেন্ডার এত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও আপনি একক বিশ্ব হিজরী ক্যালেন্ডার’-এর অনুসরণকে কেন আরও বেশি সমর্থন করবেন, অথচ তার তো কোনো যৌক্তিক ভিত্তিই নেই? তবে কি এই তামাশারই নাম শরীয়ত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের সমন্বয়?

এরপর লিখেছেন :

অতএব সার্বিক বিবেচনায় আমার প্রস্তাবিত বিশ্ব হিজরী ক্যালেন্ডারবিশ্বব্যাপী অনুসরণ করে মুসলিম উম্মাহ একই বারে ও তারিখে রোযা-ঈদ পালন করতে পারে। ইসলামী শরীয়াহকে বিশ্বব্যাপী সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য এটাই হলো সর্বোত্তম প্রস্তাব (চান্দ্রমাস, পৃষ্ঠা : ১৪৯, প্যারা : ১৮)

খোদার বান্দা! একই পৃষ্ঠায় কি কেউ এতগুলো বিপরীতমূখী কথা বলে? আর একটি কল্পনাসর্বস্ব জিনিসের উপর এত বড় ও দীর্ঘ স্বপ্নের ইমারত দাঁড় করায়?

কোথায় আপনার বিশ্ব হিজরী ক্যালেন্ডার? ১৪৩৮-১৪৪০ হিজরীও লাগবে না, শুধু ১৪৩৬-১৪৩৮ হিজরীর ক্যালেন্ডারই আমাদের দেখান!

বিশ্ব হিজরী ক্যালেন্ডার পর্যালোচনা পরিচ্ছেদের সর্বশেষ প্যারা দুটি পড়ন:

OIC -এর অঙ্গসংগঠন ইসলামিক ফিকাহ একাডেমি১৯৮৬ সালেই সিদ্ধান্ত দিয়েছে যে,

(ক) বিশ্বের কোন দেশে নবচন্দ্র দেখা গেলে সকল মুসলমানকে অবশ্যই তা মেনে চলতে হবে। কারণ চাঁদ দেখার জন্য দেশের সীমানা কোন শর্ত নয়। তাছাড়া রোযা শুরু ও শেষের আদেশ বিশ্বজনীন।

(খ) চাঁদ দেখা জরুরী। তবে হাদীসের সাথে মিল রেখে জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাবের সহায়তা নেওয়া যাবে

অতএব চান্দ্রমাসের ক্যালেন্ডারকে একটা সম্ভাব্য প্রস্তাব হিসেবে নেওয়াই উত্তম (চান্দ্রমাস, পৃষ্ঠা : ১৪৯, প্যারা : ১৯-২০)

যখন দেখাটাই আবশ্যক তখন অগ্রীম ক্যালেন্ডারের আর কী প্রয়োজন? আর যখন কি না আপনি হিসাবের মাধ্যমে নবচন্দ্র সম্পর্কে অবগত হওয়াকে কুরআনের নির্দেশ বলে মনে করেন, তখন শুধু ফেকাহ একাডেমীর সিদ্ধান্তের কারণে তাকে সম্ভাব্যবানিয়ে দেয়ার কী অর্থ?

একটা জিনিসকে আপনি কুরআনের হুকুম মনে করেন, আবার কোন একাডেমীর কথায় আপনি সেটাকে শুধু সম্ভাব্যপ্রস্তাব বানিয়ে দিবেন- এটা কি কোনো ঈমান হলো?

আপনি অমাবস্যা থেকে চান্দ্রমাস শুরু করাকে কুরআনের হুকুম মনে করতেন। সেটাকে ছেড়ে হিসাবের মাধ্যমে দেখার সম্ভাবনার উপর নির্ভরশীল ক্যালেন্ডারে এলেন, এখন হিসাবের উপর নির্ভরশীল ক্যালেন্ডারকেও আপনি কেবল সম্ভাব্য প্রস্তাব বলছেন। তাহলে কি শেষ পর্যন্ত আপনার কাছে কুরআনের হুকুম এবং শরীয়তের মাসায়েলের মূল্য এ-ই?

হায়! যদি আপনি আপনার সংস্কার দক্ষতাকে নিজস্ব বিশেষজ্ঞতার গ-ীতে ব্যবহার করতেন। আর কুরআন, হাদীস ও শরীয়তের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ লোকদের অনুসরণেই ক্ষান্ত থাকতেন! এতে করে নিয়ম-নীতির লঙ্ঘনও হতো না, আর এই পরিমাণ স্ববিরোধী ও বিপরীতধর্মী কথাবার্তাও বলার দরকার হতো না।

 

সবচেগুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন :

জনাবের পুস্তিকার প্রধানতম লক্ষ্য হল, রোযা শুরু ও ঈদ পালনে যা কিছু আগু-পিছু হয় সেটার অবসান ঘটিয়ে তাতে ঐক্য সৃষ্টি করা। কিন্তু ঐক্য সৃষ্টির জন্য আপনি একাই উল্লেখ করেছেন আটটি মানদ- বলুন, যদি ঐক্য সৃষ্টির মানদ-ই এতগুলো হয় তাহলে ঐক্যের স্বপ্ন দেখা হবে কেমন শরমের কথা?

দ্বিতীয় বড় লক্ষ্য, সংস্কারকর্ম সম্পাদন করা। প্রশ্ন হল, ধারণা ও অনুমানের ভিত্তিতে স্ববিরোধী কথাবার্তা লিখে যাওয়ার নামই কি সংস্কার?

আপনি লিখেছেন, আপনার প্রস্তাবিত ক্যালেন্ডার ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ক্যালেন্ডারের মধ্যে পার্থক্য খুবই কম। অথচ শুধু ১৪৩৩ হিজরীর ক্যালেন্ডারেই আপনার প্রস্তাবিত প্রথম তারিখের সঙ্গে উম্মুল কুরা ক্যালেন্ডার ও উত্তর আমেরিকা ফেকাহ কাউন্সিলের ক্যালেন্ডারের মিল নেই- এরকম ছয়টি মাস রয়েছে। বারো মাসের মধ্যে ছয় মাসেই যদি আপনার সূচনা অন্যদের সূচনা থেকে ভিন্ন হয় তাহলে এ তফাত কি একেবারে কম হলো?

আবার এই ছয় মাসে আপনার প্রস্তাবিত ক্যালেন্ডারের প্রথম তারিখ আপনার একক বিশ্ব হিজরী ক্যালেন্ডারথেকে ব্যতিক্রম।

১৪৩০ হিজরীর ক্যালেন্ডারে ছয়টি মাসে ভিন্নতা রয়েছে। ১৪২৯ হিজরীতে পাঁচ মাসে এবং ১৪২৮ হিজরীতেও পাঁচ মাসে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই তিন বছরের ক্যালেন্ডার চান্দ্রমাসসপ্তম সংস্করণে দেয়া আছে। অন্যান্য বছরের ক্যালেন্ডারগুলোতেও তারতম্য আছে। তো ক্যালেন্ডার তৈরিই করেছেন ১৪২৮ হিজরী থেকে ১৪৩৪ হিজরী এই মোট সাত বছরের। আর তার মধ্যেই এত ফারাক!!

চান্দ্রমাস সপ্তম সংস্করণের আগের এক সংস্করণ, যা ৩০/৪/২০০৭ খ্রিস্টাব্দে তার দস্তখতসহ মারকাযুদ দাওয়াহতে এসেছিলো, তাতে ১৪২৮ হিজরী-এর ক্যালেন্ডারের প্রথম তারিখসমূহ অনেক মাসের বেলায় সপ্তম সংস্করণ থেকে ভিন্ন। পহেলা সফর সেখানে ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ খ্রি.-এ আর সপ্তম সংস্করণে হল ১৮ তারিখে। পহেলা রমযান ওখানে ১৩/৯/২০০৭ খ্রি.-এ আর এখানে ১২/৯/০৭ তারিখে। পহেলা যিলহজ্ব ওখানে ১১/১২/২০০৭ খ্রি.-এ আর এখানে ১০/১২/০৭ তারিখে, এমনিভাবে পহেলা রবিউল আউয়াল ১৪২৯ হিজরী ওখানে ৯/৩/২০০৮ খ্রি.-এ আর এখানে ৮/৩/০৮ তারিখে। পহেলা যিলহজ্ব ১৪২৯ হিজরী ওখানে ২৯/১১/২০০৮-এ আর এখানে ২৮/১১/০৮ তারিখে।

তাহলে এখানে তো ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের হিসাবেই গরমিল হয়ে গেল!! তবে কি এরকম শৃঙ্খলাহীন ক্যালেন্ডারের ভিত্তিতেই আপনি সারা বিশ্বে একসঙ্গে রোযা ও ঈদ পালনের ব্যবস্থা করবেন? আর এভাবেই কি আপনি আপনার সংস্কার-স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেবেন?

 

ঐক্য সৃষ্টির অন্যান্য মানদণ্ডের কী হবে?

এই কয়েকটি ক্যালেন্ডার তো যাইহোক আপনার প্রস্তাবিত। কিন্তু জ্যোতির্শাস্ত্রীয় হিসাবের মাধ্যমে মাসের শুরু ও শেষ নির্ধারণের জন্য ফর্মুলা এবং ক্যালেন্ডার তো শুধু এ কয়টিই নয়, আরো আছে। স্পষ্ট যে, আপনি যদি প্রমাণ ব্যতিরেকে হিসাবের উপরিউক্ত সুরতগুলোর কোনো একটিকে অবলম্বন করতে পারেন কিংবা হিসাবের উপর নির্ভরশীল কোনো ক্যালেন্ডারও গ্রহণ করতে পারেন, শুধু উত্তম-অনুত্তমের ফারাক, তাহলে অন্যান্য ফর্মুলা ও ক্যালেন্ডারকে আপনি কিসের ভিত্তিতে রদ করবেন?

চিন্তা করুন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেয়া মাপকাঠি- হিলাল দেখার মাধ্যমে হিলাল শুরু করা/চান্দ্রমাস আরম্ভ করা যদি আপনার পছন্দ না হয়ে থাকে তাহলে আপনি নবচন্দ্রের শুরু বলবেন কোন্ জিনিসকে?

১.  Tropical Month -এর শুরুকে?

২. Sidereal Month -এর শুরুকে?

৩. Anomalistie Month -এর শুরুকে?

৪. Nodical Month -এর শুরুকে?

নাকি

৫. Synodie Month -এর শুরুকে?

যদি এর শুরুকে ভিত্তি ধরা হয় তাহলে সেটা কি-

৫/ক. কেন্দ্রীয় সম্মিলন (Geocentric New Moon)-এর বিচারে করবেন? নাকি

৫/খ. উপরিস্থিত সম্মিলন (Topocentic New Moon)-এর বিচারে করবেন?

যদি উপরিস্থিত সম্মিলন-এর বিচারে করেন তাহলে মক্কাকে ভিত্তি ধরবেন নাকি মদীনা অথবা কুদস (যেখানে মসজিদে আকসা অবস্থিত) অথবা চট্রগ্রাম অথবা ঢাকা- কোন জায়গাকে ভিত্তি ধরবেন? নাকি আই. ডি. এল রেখাকে? আর এটাও বলুন, চাঁদের ব্যাপারে আই. ডি. এল রেখাকে কেন ভিত্তি বানাবেন। এ ক্ষেত্রে ড. ইলইয়াসের প্রস্তাবিত আই. এল. ডি. এল (ইন্টারন্যাশনাল লুনার ডেট লাইন)-কে ভিত্তি বানাতে আপনার কী সমস্যা? এগুলো সব বাদ দিয়ে যদি এ বিষয়টাকে ভিত্তি ধরেন যে, মাসের শেষে সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের সময় যদি দিগন্তে চাঁদের উপস্থিতি থাকে তাহলে এটাই নতুন চাঁদের সূচনাকাল; যদি এটাকে ভিত্তি ধরেন তাহলে বলুন, নবচন্দ্রের এই ব্যাখ্যা কে দিয়েছে? আরো বলুন, যদি এটাই ভিত্তি হয় তাহলে ভূ-পৃষ্ঠের কোন্ জায়গার বিচারে সূর্যের পর চাঁদের অস্তমিত হওয়াকে ভিত্তি বানাবেন? মক্কা মুকারমা নাকি অন্য কোন জায়গার, নাকি কোনো রেখার?

এগুলোর মধ্য থেকে যেটাকেই ভিত্তি বানান, চাঁদকে তো হয়ত ভিত্তি ধরা হয়ে যাবে। কিন্তু হিলালকে তো ভিত্তি ধরা হল না, কুরআন যাকে মীকাত ঘোষণা করেছে। এখন হিলাল (হিলাল দেখা), যা কিনা কুরআনের মানদ- এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা, তাকে যদি কেউ উপেক্ষা করে, যেমন ইঞ্জিনিয়ার সাহেব করছেন তাহলে তিনি বাদবাকি সুরতের মধ্য থেকে কোনো একটিকে কোন্ দলীলের ভিত্তিতে গ্রহণ করবেন? এবং কোনো ব্যক্তি যদি অন্য আরেকটি সুরতকে অবলম্বন করতে চায় তাহলে তাকেই বা ফেরাবেন কোন্ দলীলের ভিত্তিতে? নববী নির্দেশনা থেকে বিমুখ হবার ফল দিশেহারা হয়ে ঘুরে মরা ছাড়া আর কিছু না!

দ্বিতীয় কথা হল, জনাবের উল্লেখ করা সবগুলো ক্যালেন্ডারই হিসাবের উপর নির্ভরশীল, আর আপনার দাবি- কুরআন (নাউযুবিল্লাহ) হিসাবের মাধ্যমে চান্দ্রমাসের শুরু ও শেষ নির্ধারণ করতে বলেছে।

ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের বক্তব্য, কুরআনের হুকুম- হিসাবনির্ভর ক্যালেন্ডার যদি অবলম্বন করা হয় তাহলে উম্মতের মাঝে ঐক্য সৃষ্টি হয়ে যাবে। প্রশ্ন হল, এই সবগুলো ক্যালেন্ডারই কি কুরআনী হিসাব মোতাবিক ক্যালেন্ডার, নাকি এর মধ্য থেকে একটি কুরআনী হিসাব মোতাবিক আর বাকিগুলো তা নয়? যদি এই সবগুলো কুরআনী হিসাব মোতাবিক হয় তাহলে শুধু এগুলো কেন, ম্যাকন্যাটন (Macnaughton), জামালুদ্দীন আব্দুর রাযযাক, কাসসুম, ড. ইলিয়াস ও শওকত অওদা এই পাঁচ জ্যোর্তিশাস্ত্র বিশেষজ্ঞের ক্যালেন্ডারও নিশ্চয়ই কুরআনিক হবে? কেননা এগুলোও জ্যোতির্শাস্ত্রীয় হিসাবের উপর নির্ভরশীল। তাহলে আপনার প্রস্তাবিত ক্যালেন্ডারগুলো এবং এঁদের ক্যালেন্ডারগুলোর কোনো একটি অনুযায়ী যদি আমল করা হয় তাহলে আপনার মতে কুরআনী হিসাবের ক্যালেন্ডার (?) অনুযায়ী আমল হয়ে যাওয়ার কথা। এখন যেহেতু এসকল ক্যালেন্ডারে চান্দ্রমাসের শুরু নির্ধারণে বহু মতপার্থক্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। সেহেতু যতক্ষণ অনুসরণের জন্য সারা পৃথিবীতে বরং সমগ্র বিশ্বে একটি মাত্র ক্যালেন্ডারকে গ্রহণ করা না হবে ততক্ষণ ঐক্য সৃষ্টি হবে কীভাবে? সুতরাং ইঞ্জিনিয়ার সাহেব কি এই সকল কুরআনিক ক্যালেন্ডার  (?) থেকে কোনো একটি নির্বাচন করে নিদির্ষ্ট করে দিবেন, যাতে করে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারে? সবই যদি কুরআনী হিসাবের ক্যালেন্ডার হয়, আর তা থেকে কোনো একটিকে তিনি নির্বাচন করতে চান, তো সেজন্য কিছু শরয়ী প্রমাণাদিও উল্লেখ করে দেবেন, মেহেরবানী করে। যেন শরীয়ত রচনার বদনাম থেকে বাঁচা যায়!

আর যদি এগুলোর মধ্য থেকে শুধু একটি কুরআনী হিসাব মোতাবিক হয়, আর বাকীগুলো এমন কোন হিসাব-ফর্মুলার উপর নির্ভরশীল, যা কিনা কুরআনী হিসাব মোতবিক নয়; তাহলে সেটা ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের বলে দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তিনি তা বলেননি। বরং প্রত্যেকটি অনুযায়ী আমলের অবকাশ আছে উল্লেখ করায় জানা গেল, তার মতে এই সবগুলোই কুরআনী হিসাব মোতাবিক ক্যালেন্ডার। যদি তাই হয় তাহলে ঐক্যের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে কীভাবে? আর যখন ঐক্য হলই না তখন উম্মতের সদস্যদের মধ্যে কারো শুরুতে  ফরয রোযা ছুটে যাওয়া এবং কারো কারো শেষে ফরয ছুটে যাওয়া, আর কারো রোযার দিনে ঈদ করা এবং কারো ঈদের দিন পার করে ঈদ করা- এই সমস্ত সমস্যা আপন জায়গায় রয়ে গেল, যেগুলোর সমাধান করার জন্য ইঞ্জিনিয়ার সাহেব সংস্কার-এর ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছিলেন, তাহলে?!

আরো শুনুন, ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের চান্দ্রমাসের ইংরেজী অনুবাদও ছেপে প্রকাশিত হয়েছে। তাতে লাস্ট ওয়ার্ডসশিরোনামে একটি ছক দেয়া আছে, যা এখন পর্যন্ত প্রকাশিত বাংলা কোনো সংস্করণে নেই। সেটা নিম্নরূপ :

 

 

এর বংলা তরজমা দাঁড়ায় এরকম :

১. ক্যালেন্ডার : স্থানীয় চাঁদ দেখা ভিত্তিক ক্যালেন্ডার।

ভিত্তি : প্রতি মাসের প্রথম দিন স্থানীয় চাঁদ দেখার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।

মন্তব্য : গ্রহণযোগ্য নয়। (এটা মুসলিম উম্মাহর মাঝে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে)

২. ক্যালেন্ডার : ক. আন্তর্জাতিকভাবে নতুন চাঁদ দেখার ভিত্তিতে তৈরিকৃত ক্যালেন্ডার।

খ. OIC কর্তৃক প্রস্তাবিত ক্যালেন্ডার।

গ. উম্মুল কুরা ক্যালেন্ডার।

ভিত্তি : জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাব অনুযায়ী আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নবচন্দ্র দর্শনের ভিত্তিতে প্রস্তুতকৃত।

মন্তব্য : ভালো (Good) অনুসৃত হওয়ার মত। এটা মুসলিম উম্মাহর মাঝে ঐক্য সৃষ্টি করবে।

৩. ক্যালেন্ডার : লুনার মান্থ বইতে প্রদত্ত আমার তৈরিকৃত ক্যালেন্ডার

ভিত্তি : IDL থেকে ৯ ঘণ্টার ব্যবধানে সূর্যাস্তের পর নবচন্দ্র দর্শনের (সম্ভাবনার) ভিত্তিতে।

মন্তব্য : তুলনামূলক ভাল (Better)

৪ ক্যালেন্ডার : কুরআনে কারীম নির্দেশিত হিসাবনির্ভর ক্যালেন্ডার, যা এখনো প্রস্তুত হয়নি।

ভিত্তি : পবিত্র কুরআনের নির্দেশনা মোতাবেক জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাব অনুযায়ী।

মন্তব্য : সবচেভাল (Best)

(লুনার মান্থ’, ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মাদ এনামুল হক, অনুবাদ : যাকির হুসাইন, পৃষ্ঠা : ১৪৮)

এর উপর যতই আশ্চর্য প্রকাশ করা হোক সেটা সামান্য। তার মতে যেটা কুরআনিক ক্যালেন্ডার, তার বিপরীত পদ্ধতিগুলোকে তিনি গুডএবং বেটারবলছেন। আর কুরআনিক ক্যালেন্ডারের বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করা হচ্ছে তো তিনি উত্তর দিচ্ছেন সেটা এখন পর্যন্ত কেউ তৈরি করেনি’? আপনিও না? ‘জ্বী না আপনি চান্দ্রমাসবাংলা ও ইংরেজীতে বিশ্ব হিজরী ক্যালেন্ডারএবং একক বিশ্ব হিজরী ক্যালেন্ডার’-এর নমুনা পেশ করেছেন। এটাও কি কুরআনিক ক্যালেন্ডার নয়? ‘জ্বী, না ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

আপনি তো এ বইয়ে প্রশ্ন ৫৪ করেছেন এভাবে :

আপনার কথা থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, মুসলমানদের চাঁদের হিসাব ভুল হচ্ছে, আর অমুসলমানদের হচ্ছে না। কারণটা একটু খুলে বলবেন কি?’ এরপর দীর্ঘ উত্তরের শেষ দিকে লিখেছেন :

কোরআন-হাদীসের সঠিক মর্মবাণী অনুধাবন করতে পারলে আমরাও নির্ভুল চান্দ্রপঞ্জিকা বা একক বিশ্ব হিজরী ক্যালেন্ডার অনুসরণ করতে পারতাম। এ ব্যাপারে হাদীসের মর্মার্থকে খণ্ডিতভাবে দেখার কারণে কোরআনের নির্দেশ উপেক্ষিত হয়ে আছে। তা না হলে আমাদের চান্দ্রপঞ্জিকা আর অন্য ধর্মাবলম্বীদের চান্দ্রপঞ্জিকায় কোনো তফাৎ হত না। আমার পুস্তকে দেওয়া বিশ্ব হিজরী ক্যালেন্ডারই এর একমাত্র সমাধান দিতে পারে। তাই আমাদের তা অনুসরণ করা উচিত

 (চান্দ্রমাস, পৃষ্ঠা : ১৯৮)

আপনার এ কথায় কি পাঠকরা এটাই বুঝবেন না যে, আপনার প্রস্তাবিত বিশ্ব হিজরী ক্যালেন্ডার আপনার দৃষ্টিতে কুরআন ও হাদীসসম্মত ক্যালেন্ডার? অথচ আপনার মনের কথাটা হল, এটা কুরআনিক ক্যালেন্ডার নয়। কুরআনিক ক্যালেন্ডার এখনো তৈরি হয়নি। ইংরেজী পুস্তিকায় আপনি সেদিকে ইঙ্গিত করছেন এবং সাক্ষাতে বা ফোনেও মানুষকে বলছেন!! সম্মানিত পাঠক, আপনারাই  ফায়সালা করুন। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের উপর কী পর্যালোচনা পেশ করা যায়?!

দাবি তো ছিল সংস্কারের। কিন্তু যেটাকে বেচারা হক ও হাকীকতের  (সত্য ও বাস্তবতার) বিকৃতি করে কুরআনের হুকুম সাব্যস্ত করলো, তার উপর না নিজে আমল করল, না অন্যদেরকে আমলের সুযোগ করে দিল। বরং তার বিপরীত বহু জিনিসকে নিজের সংস্কারধর্মী বই চান্দ্রমাসেউল্লেখ করে গেছেন। এবং রীতিমত সেটাকে গুডবেটারবলেও স্বীকৃতি দিয়েছেন।

যদি এগুলো গুডআর বেটারই হয়  তাহলে কুরআন পরিপন্থী হয় কী করে? আর যদি কুরআন পরিপন্থী হয় তাহলে গুডএবং বেটারহয় কীভাবে?

শত্রুতা হল শুধু নিজ নিজ এলাকার দেখা অনুযায়ী রোযা ও ঈদ করার সাথে! এটা ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের কাছে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যেন তা একদম হারাম!! খোদার বান্দা, যাকে আপনি গুডএবং বেটারবলছেন সেটা আপনার দৃষ্টিতে কুরআন পরিপন্থী হওয়া সত্ত্বেও তাকে এই স্বীকৃতি দিচ্ছেন। তাহলে প্রথম সুরতকে অন্তত মুবাহ বলুন। সেটা আপনার দৃষ্টিতে কুরআন পরিপন্থী হওয়ার চেয়ে কি বেশি কিছু যে, তাকে কোনোভাবেই বৈধ বলে স্বীকার করতে পারছেন না!! 

যাই হোক, আমি তো তার ইংরেজী বই থেকে ছক উদ্ধৃত করে দেখাতে চাচ্ছিলাম যে, তার সংস্কারের স্বরূপ কী? সার কথা হল, তিনি কুরআনের আয়াতকে বিকৃত করে এক ফরয হুকুম উদ্ভাবন করেছেন, কিন্তু ঐ হুকুম অনুযায়ী আমলের কোনো রাস্তা তিনি দেখাননি। তদুপরি ঐ হুকুমের পরিপন্থী পদ্ধতিগুলোকে গুডএবং বেটারবলে স্বীকৃতি দিয়েছেন!!

এখন জনাবকে বিনয়ের সাথে কে জিজ্ঞেস করবে যে, আমরা তো আপনার বইটি আগ্রহ সহকারে পড়েছিলাম। আপনার দাবি অনুসারে মনে করেছিলাম, আপনি হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা ভুলের সংশোধন করে একটা আসল জিনিস আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। কিন্তু এখন বুঝতে পারলাম, আপনি আমাদেরকে কুরআন পরিপন্থী পথে পরিচালিত করতে চান!!

ইঞ্জিনিয়ার সাহেব! হাদীস, সুন্নাহ ও আইম্মায়ে দ্বীনের ইজমা এবং উম্মতে মুসলিমার সর্বস্বীকৃত পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে কুরআন বোঝার দাবি করা আগাগোড়া মিথ্যা। যার সর্বনি¤œ খেসারত এই যে, বৈপরিত্য ও স্ববিরোধিতার ময়দানে পেরেশান হয়ে ঘুরতে থাকা!!

বৈপরিত্য ও স্ববিরোধিতা এই বইয়ের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য! এই সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনায় তারই কিছু নমুনা শুধু তুলে ধরা হল। 

 



[1] আল-আহিল্লাহআদনান আব্দুল মুনয়িম কাযী, পৃষ্ঠা : ২০২, মাকতাবা কুনুযিল মারিফা জেদ্দা, ‘তাকবীমু উম্মিল কুরাযাকি ও ইয়াসির।