রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ . ডিসেম্বর ২০১৬

পুরোনো সংখ্যা . বর্ষ: ১২ . সংখ্যা: ১১

পিতার কর্তব্য : সন্তানকে সময় ও সংগদান

জনৈকা মায়ের কাছে তার কিশোর পুত্রের অভিযোগ-আব্বাজী এখন আমাদের গলায় ধরেছে, ধরা তো দরকার ছিল সেই হাতে ধরার বয়সে

কিশোর মুখে উচ্চারিত প্রাজ্ঞজনোচিত কথা।

الحكمة ضالة المؤمن أين وجدها أخذها .

হিকমত ও জ্ঞান-তত্ত্বের কথা মুমিনের হারানো ধন। সে যেখানেই পাবে তা কুড়িয়ে নেবে।

ওই কিশোরের কাছ থেকে এটি নেওয়ার মতই কথা। হাঁ খোকন, তোমার প্রাণের এ উচ্চারণটি আমি সাদরে গ্রহণ করলাম। আমরা যারা বাবা, আকছার তাদের দ্বারা এ ব্যাপারে শৈথিল্য হয়ে যায়। আমরা হয়ত ধরিই না, নয়ত ধরতে দেরি করে ফেলি।

একটা ধরা আমরা ঠিকই ধরি। শিশু যখন বসতে চেষ্টা করে, তখন তাকে ধরি। ধরে ধরে বসাই। তাকে বসতে সাহায্য করি। তারপর যখন দাঁড়াতে চায় তাতেও সাহায্য করা হয়। যখন এক-পা দুপা হাঁটতে শুরু করে, তখন ধরে ধরে হাঁটাই। হাত ধরে রাখি, যাতে সহজে হাঁটতে পারে, পড়ে না যায়। এটাও তার হাতে ধরার বয়স। যখন শারীরিক চলা শুরু করে, তখন তার হাতে ধরতে হয়। আমরা ধরিও। কেউ বলে দেয় না, তাও ধরি। নিজ গরজে ধরি। আমার শিশু যাতে পড়ে না যায়, যাতে ভালোভাবে হাঁটা শিখে যায়, সেই তাগিদে তার হাত ধরি। এই ধরায় কোনও অবহেলা হয় না। এ ব্যাপারে কোনও বাবা সম্পর্কে তার সন্তান অভিযোগ করতে পারবে না। করেও না।

কিন্তু এই চলাটা এমন, যা হাত ধরা ছাড়াও শেখা হয়ে যায়। হয়ত একটু-আধটু ব্যথা পাবে। কখনও পড়েও যাবে। তা পড়ে গেলেও বিশেষ ক্ষতি নেই। অপূরণীয় কিছু ঘটার আশংকা নেই। তবু আমরা ধরি। এক্ষেত্রে সামান্য ক্ষতিও আমরা সহ্য করি না। করতে পারি না। তাই সতর্ক থাকি। তাকে হাতে ধরে ধরে চালাই। সতর্কতার সাথে হাঁটাই। তাই এ ব্যাপারে আমার বিরুদ্ধে শিশুদের অভিযোগের সুযোগ নেই।

ওই যে খোকন অভিযোগ করেছে তার অভিযোগ এ ব্যাপারে নয়ও। এ খোকন বড় বুদ্ধিমান। সে আসল চলাটি বোঝে। তা বুঝতে পারাটা তার প্রতিভার স্বাক্ষর বহন করে। তার ব্যাপারে এ আশা রাখাই যায় যে, আল্লাহ তাআলা আগামী দিনে তাকে সত্যিকারের সচল একজন মানুষ বানাবেন, যার নিজের চলাও সঠিক হবে এবং অন্যদেরও সঠিক চলায় সাহায্য করতে পারবে। আল্লাহ তাআলা কবুল করুন।

তো যে চলার ব্যাপারে হাত ধরার কথা ওই কিশোর বলেছে, মানুষের পক্ষে তো সেটাই আসল চলা। তার মানবিক চলা। মনুষ্যত্বের গঠন। প্রতিভা বিকাশের উদ্বোধন। বোধ-অনুভবের স্ফূরণ। রুচি-অভিরুচির উৎপাদন। তার ব্যক্তিগঠনের অভিযাত্রা।

এ যাত্রার পথ বড় পিচ্ছিল। অতি দুর্গম। হাত ধরার প্রয়োজন এখানেই বেশি। বরং সত্যিকারের ধরা এটাই। শিশুমন বড় অবুঝ। তার নিষ্পাপ চোখে সবকিছুই আকর্ষণীয়। তার সরল মন যে কেউ টানতে পারে। টেনে নেয়ও। টানে গরল ভরা সাপও। তাই দরকার সতর্ক পাহারা। তার সে পাহারাদারি কে করবে? বাবা ছাড়া আর কেউ কি?

জগৎ ভরা আকর্ষণ এড়াতে পারে কজনা। আকৃষ্ট হয়ে পড়ে অশীতিপর বৃদ্ধও। আকৃষ্ট হওয়াটা মানুষের মজ্জাগত। আল্লাহ তাআলা তো বলেই দিয়েছেন-

زُیِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوٰتِ مِنَ النِّسَآءِ وَ الْبَنِیْنَ وَ الْقَنَاطِیْرِ الْمُقَنْطَرَةِ مِنَ الذَّهَبِ وَ الْفِضَّةِ وَ الْخَیْلِ الْمُسَوَّمَةِ وَ الْاَنْعَامِ وَ الْحَرْثِ ذٰلِكَ مَتَاعُ الْحَیٰوةِ الدُّنْیَا  وَ اللهُ عِنْدَهٗ حُسْنُ الْمَاٰبِ.

মানুষের জন্য ওই সকল বস্তুর আসক্তিকে মনোরম করা হয়েছে, যা তার প্রবৃত্তির চাহিদা মোতাবেক হয় অর্থাৎ নারী, সন্তান, রাশিকৃত সোনা-রুপা, চিহ্নিত অশ্বরাজি, চতুষ্পদ জন্তু ও ক্ষেত-খামার। এসব ইহ-জীবনের ভোগ-সামগ্রী। (কিন্তু) স্থায়ী পরিণামের সৌন্দর্য কেবল আল্লাহরই কাছে। -সূরা আলে ইমরান (৩) : ১৪

এই আকর্ষণে মানুষ যাতে হাল ছেড়ে না দেয়, আত্মসংযম বজায় রাখতে পারে, সেজন্য আল্লাহ তাআলা দাওয়াই দিয়েছেন-

قُلْ اَؤُنَبِّئُكُمْ بِخَیْرٍ مِّنْ ذٰلِكُمْ  لِلَّذِیْنَ اتَّقَوْا عِنْدَ رَبِّهِمْ جَنّٰتٌ تَجْرِیْ مِنْ تَحْتِهَا الْاَنْهٰرُ خٰلِدِیْنَ فِیْهَا وَ اَزْوَاجٌ مُّطَهَّرَةٌ وَّ رِضْوَانٌ مِّنَ اللّٰهِ   وَ اللهُ بَصِیْرٌۢ بِالْعِبَادِ.

বল, আমি তোমাদেরকে এসব অপেক্ষা উৎকৃষ্ট জিনিসের সংবাদ দেব? যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের কাছে আছে এমন বাগ-বাগিচা, যার তলদেশে নহর প্রবাহিত, যেখানে তারা সর্বদা থাকবে এবং (তাদের জন্য আছে) পবিত্র স্ত্রী ও আল্লাহর পক্ষ হতে সন্তুষ্টি। আল্লাহ সকল বান্দাকে ভালোভাবে দেখছেন। -সূরা আলে ইমরান (৩) : ১৫

রাব্বুল আলামীন এভাবেই বান্দার তরবিয়াত করে থাকেন। সব ঝুঁকির জায়গায় তিনি পাহারাদার বসিয়ে দিয়েছেন। আকীদার পাহারা। শরীআতের পাহারা। ওয়াজ-নসীহতের পাহারা। বিবেকের পাহারা। সতর্ক পাহারার ব্যবস্থা তো তরবিয়াতদাতারই কাজ।

সন্তানের তরবিয়াত ও পরিচর্যা প্রধানত পিতারই কাজ। গঠন-নির্মাণের সূচনা যখন হয় সে বয়সে পিতার শৈথিল্য প্রদর্শনের কোনও সুযোগ নেই। সে বয়সে বহুমুখী আকর্ষণ তার গঠন ব্যাহত করতে পারে। ব্যাহত করেই থাকে। তা থেকে সুরক্ষা দিতে হবে পিতাকেই। তা দেওয়া না হলে আদরের সন্তান হাতছাড়া হয়ে যাবে। সুরক্ষার অভাবে কত পিতার বুকের ধন এক পর্যায়ে তার সুখ হরণের কারণ হয়ে গেছে। চোখ খুলে তাকালেই তা নজরে আসে। আশা ছিল তাদের মানিক-রতন একদিন অনেক বড় হবে। ছিল কত স্বপ্ন। আহা! সেই স্বপ্ন এভাবে মাটি হয়ে গেল! শেষ সান্ত্বনা কপালকে দুষে।

কপালের লিখন খণ্ডানো যায় না ঠিক। কিন্তু কর্মফল খণ্ডাবে কে? সাধ পূরণের চেষ্টা যদি যথাযথ না হয়, তবে অপূরণের দহন তো সইতেই হবে! যথাযথ চেষ্টার প্রধান শর্ত গোড়া থেকে চেষ্টা। যখন কাদামাটির দলা থাকে, সেই সময়কার প্রযত্নসেই বয়সের সুরক্ষা। তবেই মনের মতন পুতুল গড়ে উঠবে।

খোকন প্রীতিভাজনেরকথাই সুন্দর- হাত ধরার বয়সে ধরতে হবে, হাত ধরেই রাখতে হবে। কেবল বিদ্যাশিক্ষার জন্য নয়। হাত ধরতে হবে আরও অনেক শিক্ষার জন্য। আখলাক-চরিত্র শিক্ষার জন্য, আদব-কায়দা শিক্ষার জন্য ও মানবিকতা শিক্ষার জন্য। বিদ্যাশিক্ষার পাশাপাশি এসব শিক্ষাও শেখানো অতীব জরুরি। বালক বয়স থেকেই এর প্রতিটি বিষয় শেখানোর প্রতি মা-বাবাকেই যত্নবান হতে হবে।

কেবল শিক্ষক নিয়োগ বা শিক্ষকের হাতে অর্পণ দ্বারাই অভিভাবকের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। অনেক পিতামাতাই মনে করেন শিক্ষালয়ে ভর্তি করা বা শিক্ষকের হাতে অর্পণ করার দ্বারাই যথেষ্ট দায়িত্ব পালন হয়ে যায়। বই-খাতা কিনে দেওয়া হচ্ছে, কলম-কিতাবের কোনও অভাব রাখা হচ্ছে না, বেতনও ঠিক ঠিক পরিশোধ করা হচ্ছে, তো আর বাকি থাকল কী? বাকি তো থাকলই। আসল জিনিসই বাকি থাকল। আর তা হল অভিভাবকের প্রযত্নশিশু যাতে শিক্ষাকে দরকারী মনে করে, যাতে শিক্ষাকে আপন করে নিতে পারে, খেলার মতই ভালোবাসতে পারে, ক্রমান্বয়ে সামনে অগ্রসর হতে পারে এবং ক্ষতিকর কিছুতে লিপ্ত না হয়ে পড়ে তার প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া অভিভাবকেরই কাজ।

খুব লম্বা ফিরিস্তি শোনানো হল। আসলে লম্বা নয় কিছুই। সবটারই সারকথা সময় দেওয়া। সন্তানকে সময় দিতে হবে। এটা দেওয়া না হলেই ওই লম্বা তালিকা সামনে এসে যায়। তখন তা আসে নেতিবাচকভাবে। এই করা হয়নি, ওই করা হয়নি, এভাবে অনেক কিছু করা হয়নি’-এর অপ্রীতিকর এক তালিকা সামনে এসে দাঁড়ায়।

শিশুকে যদি সময় দেওয়া হয় আরও তাৎপর্যপূর্ণভাবে বললে, যদি সংগদান করা হয়, তবে ওইসব দীর্ঘ ফিরিস্তি সামনে আনার দরকারই পড়ে না। ওসব আপনিই হয়ে যায়। কিন্তু দুই শব্দের এ কাজটি আমরা করতে পারছি না। আমরা আমাদের সন্তানদের সংগদানকরছি না। অনিবার্যভাবেই তা না করার কুফল আমাদের ভোগ করতে হচ্ছে। সন্তানদের লেখাপড়া আশানুরূপ হচ্ছে না। যদি হাত ধরার বয়স থেকে আমরা তাদের ঠিকভাবে সংগ দিতাম তবে লেখাপড়ার পথে চলা তাদের জন্য খুব সহজ হয়ে যেত। আমার সংগদান থেকে শক্তি-সাহস পেত, উদ্যম-উদ্দীপনা পেত, অগ্রগামিতার প্রেরণা পেত, বাধা-বিপত্তি ও ক্ষতিকর পরিপার্শ্ব অপসৃত হয়ে  যেত, পড়াশুনা আনন্দপূর্ণ হত এবং হত কাঙ্ক্ষিত সবকিছু।

যে সকল সন্তান সম্পর্কে তাদের অভিভাবকের আক্ষেপ তারা পড়াশুনা করল না বা করছে না, তাদের পর্যবেক্ষণ করলে আকছার সংগপ্রাপ্তির অভাবই নজরে আসে। তারা অভিভাবকের সংগপ্রাপ্তির বঞ্চনা থেকেই মূলত কাক্সিক্ষত বিদ্যার্জন থেকে বঞ্চিত হয়ে গেছে। সুতরাং সন্তানের প্রতি আক্ষেপ করে লাভ কি, খেদ হওয়া উচিত নিজের প্রতি- আহা, আমার আসল কর্তব্য- সংগদানের অভাবে আজ আমাকে আশাভংগের যাতনা ভোগ করতে হচ্ছে!

কথা এখানে শেষ করতে পারলে ভালো হত, কিন্তু কিভাবে তা শেষ করা যাবে, যখন এরচেঅনেক বেশি আক্ষেপের জায়গাটা উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে!

আক্ষেপ করা হয়, সন্তানের লেখাপড়া তেমন হল না বলে। লেখাপড়া দুনিয়ার অনেকেরই হয়নি। যাদের হয়নি সব বখে গেছে এমন নয়। মহামানবদের সকলেই বড়-বড় ডিগ্রিধারী ছিলেন কি? আবার সব ডিগ্রিধারীকে মহৎ লোক বলা যাবে?

লেখাপড়া ভালো জিনিস সন্দেহ নেই। বরং এটা অনেক মূল্যবান বিষয়। কিন্তু তারচেআরও বেশি মূল্যবান মানুষের আখলাক-চরিত্র, তার নৈতিকতা। নিশ্চয়ই একজন শিষ্টাচারবোধহীন বিদ্বান অপেক্ষা শিষ্ট-সুবোধ নিরক্ষর অনেক বেশি দামী।

কিন্তু দাম বলতে যখন টাকা-পয়সাই বোঝা ও বোঝানো হয় তখন নীতি-নৈতিকতা নিয়ে ভাবাভাবি হবে কেন। সেই ভাবনার অভাবে আজ আমরা জর্জরিত। তাই লেখাপড়া হল না বলে আক্ষেপ করি। কিন্তু বিদ্বান ছেলেটি কেন মুরুব্বীকে সম্মান করে না, সে নিয়ে খেদ নেই।

হাঁ, সন্তানের হাত ধরা উচিত। যতটা তার বিদ্যাচর্চার জন্য তারচেঅনেক বেশি তার ব্যক্তিগঠন- আখলাক-চরিত্র নির্মাণ ও মানবিকতা বিকাশের জন্য। এই জিনিসের আজ বড় আকাল অথচ এটাই মানুষের আসল সম্পদ। এ সম্পদে নিজ সন্তানকে বলিষ্ঠ করতে হলে বালক বয়সেই তার হাত ধরতে হবে।

লক্ষ রাখতে হবে আল্লাহ তাআলা যেই বিশুদ্ধ স্বভাব দিয়ে তাকে সৃষ্টি করেছেন তার যাতে অক্ষুণ্ন বিকাশ ঘটতে পারে। নিজ আচরণ তো বটেই, সেইসংগে পরিবেশ-পরিস্থিতি ও অন্যকিছুর প্রভাবে তা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে না পারে। সব শিশুই জন্মায় নিষ্কলুষ চরিত্র নিয়ে। হাদীসের ভাষ্যমতে সর্বপ্রথম নষ্ট তাকে বাবাই করে। বেশির ভাগ তো নিজ চরিত্র দোষেই সন্তানকে দুষ্ট করে। আর অনেকেই তাকে নষ্ট হতে সাহায্য করে তার হাল ছেড়ে দিয়ে। অর্থাৎ তাকে সময় ও সংগ দেয় না। ফলে সে অসৎ সংগ বা বদ পরিবেশের শিকার হয়ে যায়।

তাছাড়া কিছু জিনিস আছে, যা হাতে ধরেই শিক্ষা দিতে হয়। যেমন আদব-কায়দার বিষয়টা। বড়কে সম্মান ও ছোটকে স্নেহ করা ছাড়াও জীবনাচারের প্রতিটি বিষয়েই আদব আছে। আদবেই জীবনের সৌন্দর্য। সে সৌন্দর্যের শ্রেষ্ঠতম মানদ- নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত। সুন্নতসম্মত জীবনাচারের চেয়ে সুন্দর আর কিছুই নেই। আপন সন্তানের সেই সৌন্দর্যের রূপকার তো পিতামাতাকেই হতে হবে। অন্য কেউ এসে এখানে তুলি চালাবে না। যথাযথ চালাতে পারবেও না। পিতামাতার পক্ষেই সম্ভব নিজ সন্তানের হাঁটা, বসা, হাসি, কান্না, শয়ন, জাগরণ, সম্পর্কের স্তর অনুযায়ী মানুষের সাথে আচরণ, মজলিসে অবস্থান, নৈঃসংগ যাপন, পানাহার সামগ্রী গ্রহণ, প্রাকৃতিক ভার নিঃসারণ, হাদিয়া প্রদান, হাদিয়া গ্রহণ, পোশাক-পরিচ্ছদ পরিধান, পরিবর্তন প্রভৃতি যত আচার ও অনুষংগ আছে সব কিছুর আদব ও সুন্নতসম্মত পদ্ধতি শিক্ষাদান করা। শিশুকে সংগদান ছাড়া এটা কি করে সম্ভব। এটা বিদ্যাচর্চার বিষয় নয় যে, একদিনে সবক পড়িয়ে দেওয়া হল আর ছাত্র তা মুখস্থ করে নিল। এর জন্য দরকার নিয়মিত অনুশীলন। যার জন্য সন্তানকে সময় ও সংগদানের কোনও বিকল্প নেই।

মোটকথা মানবিক উৎকর্ষ ও বিকাশের লক্ষ্যে সন্তানের পথ চলায় পিতাকে তার হাত ধরে রাখতে হবে শক্ত করে। এবং ধরতে হবে চলার সূচনাতেই।

ওহে হাকীম কিশোর- আল্লাহ তাআলা হিকমতের ভরপুর ঐশ্বর্য তোমাকে দান করুন। তুমি বাবাদের চোখ খুলে দিলে। তোমার মূল্যবান বার্তাটি বাবাদের হৃদয়-কানে পৌঁছানোর লক্ষ্যেই আমার এ কলম ধরা।

তবে তুমি আশ্বস্ত হতে পার যে, তোমার মহান পিতা হাতে না হোক গলাতে হলেও তোমাকে ধরেছেন। আকছার সন্তানই তো পিতাদের এমন ধরা হতে বঞ্চিত থাকে, যার ভেতর থাকে কোনও আশ্বাসবাণী।

তদুপরি আশার কথা হল,  তুমি যাকে গলায় ধরা বলেছ, প্রকৃত বিচারে তা প্রায় হাতে ধরাই। কারণ শারীরিক চলার যে বয়স তদপেক্ষা মানসিক ও মানবিক চলার সূচনা একটু পরেই হয়। বলা যায় সেই সময়টাই তোমার যাচ্ছে। কাজেই ধরার আসল সময় এখনই। সেটা যে তুমি পেয়ে গেছ তোমার অভিযোগেই তা প্রকাশ। আল্লাহ তাআলা একে তোমার জন্য বরকতময় করুন এবং তোমার পথ সুগম করে দিন।

প্রিয় পাঠক! যে কথা বলা হল, তা হাতে ধরার তাফরীত বা শিথিলতার দিক। এর বিপরীত একটা দিকও আছে। সন্তানকে ধরে ধরে যারা চালাতে চায় তাদের অনেকে ইফরাত ও বাড়াবাড়িও করে থাকে। সেটাও কম ক্ষতিকর নয়।

অনেক পিতা সন্তানের পক্ষে সাক্ষাৎ আতঙ্ক। তারা নিজের অভিজ্ঞতা থেকে নয়; বরং নিজের বর্তমান অবস্থান থেকে সন্তানকে দেখে। সন্তানের বয়স ও রুচি-প্রকৃতি এবং তার সম্ভাবনা ও সামর্থ্য চিন্তায় রাখে না। শাসন করে সব কিছুতেই। বয়সের স্বাভাবিক প্রবণতাকেও চোখ-রাঙানি দেয়। এরূপ মানসিকতা পরিত্যাজ্য। সময় ও সংগদান হতে হবে সৌহার্দপূর্ণ। হতে হবে স্বস্তিকর ও ভরসাব্যঞ্জক। অন্যথায় সন্তানের পক্ষে পিতার সাহচর্যের সময়টাই হবে সর্বাপেক্ষা দুর্বিসহ। সেক্ষেত্রে সন্তান পিতার থেকে দূরে থাকতে চাইবে। সে পালাবে। পালানোর সুযোগ না পেলেও মনের দিক থেকে পিতার সংগে দূরত্ব সৃষ্টি হবে। আর সেই দূরত্বই সন্তানকে বিপথে নেবে। অভিজ্ঞতা বলে, পিতার সংগে যেই সন্তানের দূরত্ব সৃষ্টি হয়ে যায় সেই সন্তানের ভবিষ্যত অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। সুতরাং ইতিদাল বা ভারসাম্য রক্ষা জরুরি। সন্তানকে সময় ও সংগও দিতে হবে আবার তার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকেও মর্যাদা দিতে হবে। তার স্বাধীন সত্তার বিলোপ ঘটালে ব্যক্তিগঠনের প্রয়াস বৃথা যাবে। সন্তান তো আমি স্বয়ং নয়। সে এক পৃথক অস্তিত্বের ধারক। সেই অস্তিত্ব নিয়েই তাকে চলতে দিতে হবে। হাত ধরা ও সতর্ক দৃষ্টি রাখা কেবল এই লক্ষ্যে, যাতে সে আপন সামর্থ্য অনুযায়ী স্বকীয়তার সাথে চলতে পারে। চলার ভরসা পেতে পারে, যাতে সে পারিপার্শ্বিকতার গ্রাস না হয়ে পড়ে। পথের কাঁটা দেখে ক্ষান্ত না হয়ে যায় এবং যাতে পথের মোড়-বাঁকে নির্দেশনা পায়। শত্রুর হাতছানিতে প্রলুব্ধ না হয়। এবং এমনিভাবে অনাকাক্সিক্ষত আপতনে বিপন্নবোধ না করে; বরং পিতৃসাহায্যে তা থেকে উদ্ধারের উপায় খুঁজে পায়। এভাবে না শিথিলতা এবং না কঠোরতা; বরং উভয় প্রান্তিকতার ঠিক মাঝখানে থেকে সন্তানের হাত ধরলে আশা করা যায় সম্ভাবনা ও সামর্থ্যরে উচ্চতায় একদিন সে পৌঁছেই যাবে- ইনশাআল্লাহ।

وصلى الله تعالى على سيدنا ونبينا ومولانا محمد، و على آله وسلم تسليما.

 

 

আরও পড়ুন:   আদব-শিষ্টাচার | ইসলামের সৌন্দর্য-মাধুর্য | দ্বীনিয়াত

হজ্ব এবং কুরবানী বিষয়ক প্রবন্ধসমূহ