শাওয়াল ১৪৩৭ . জুলাই ২০১৬

পুরোনো সংখ্যা . বর্ষ: ১২ . সংখ্যা: ০৬

বরাবরের মত এবারো জুনের শুরুতে জাতীয় বাজেট ঘোষিত হয়েছে। এ লেখা যখন প্রকাশিত হবে তখন ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেট পাশও হয়ে যাবে। বয়োজ্যেষ্ঠ অর্থমন্ত্রী ১০ম বারের মত বাজেট পেশ করার সুযোগ পেয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও তার সাবেক নেতা হোসেইন মোহাম্মাদ এরশাদেরও কৃতজ্ঞতা আদায় করেছেন।

এবারের বাজেটের আকার হচ্ছে ৩ লক্ষ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। আর আয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে ২ লক্ষ ৪২ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট বাজেটের প্রায় ২৯% তথা ৯৭ হাজার ৮ শত ৫৩ কোটি টাকা ঘাটতি থাকছে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে।

মাসিক আলকাউসারে বাজেটের উপর বিগত কয়েক বছরে কোনো লেখা প্রকাশিত হয়নি। এর আগে অবশ্য ধারাবাহিকভাবে কয়েকবার জুন/জুলাই মাসে বাজেট বিশ্লেষণমূলক নিবন্ধ ছাপা হয়েছিল আলকাউসারের পাতায়। পরে ইচ্ছে করেই আমরা তা বন্ধ করে দিয়েছি। কারণ প্রতি জুনে বাজেট পেশ করা যেমন একটি রেওয়াজ (অর্থ বছরের কারণে যা যৌক্তিকও বটে) তেমনি বাজেটের বেশিরভাগ বড় বড় বিষয়কে একঘেয়েমি পর্যায়ের গতানুগতিক করে ফেলা হয়েছে। যেমন আয়ের ব্যবস্থা হোক না হোক প্রতি বছরই বাজেটের আকার বাড়াতে হবেই। প্রতি বছরই জনগণের উপর নতুন নতুন করের বোঝা চাপানো হবে। আদায় সম্ভব হোক না হোক রাজস্ব লক্ষমাত্রা ধরতে হবে বিশাল করে। এডিপি বরাদ্দ কোনো বছরও ব্যয় করা সম্ভব না হলেও তার পরিমাণ বছর বছর বাড়াতেই হবে। জনসাধারণের অবস্থা যত করুণই হোক জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে দেখাতে হবে প্রতি বছরই। এজাতীয় আরো বহু গতানুগতিক বিশাল গদ্যের নাম হচ্ছে বাজেট। শর কাছাকাছি পৃষ্ঠা খরচ করে এ বাজেট লেখা হয়। কয়েকমাস খরচ করে বাঘা বাঘা আমলাগণ এটি তৈরি করেন। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ জনগণের স্বার্থ তাতে বরাবরই উপেক্ষিত থাকে। বাজেটের এ চিত্রটি আমরা দেখে আসছি অনেক বছর থেকেই।

২০১৬-১৭ অর্থ বছরের বাজেটও একই প্রকৃতির। এর বরাদ্দ পূর্বের বছরের তুলনায় ২৯% বেশি। কর আদায়ের লক্ষমাত্রা পূর্বের চেয়ে ৫০ হাজার কোটিরও বেশি, তারপরও প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকার বিশাল ঘাটতি।

বাজেটের আকার

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের মতে দেশের জনসংখ্যার তুলনায় বাজেটের আকার ছোট। ১৬ কোটি জনসংখ্যার দেশে ৩ লক্ষ ৪০ হাজার কোটি টাকার বাজেট অংকের হিসেবে কম। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই প্রায় সাড়ে তিনলাখ কোটি টাকার সুবিধা ১৬ কোটি মানুষের কতজন ভোগ করবে? সাধারণ মানুষের কল্যাণে এর শতকরা কতভাগ ব্যায় হবে? এর প্রায় ৪০%-ই তো চলে যাবে বেতন-ভাতা ও সুদ পরিশোধের খাতে। সুতরাং বাজেটের আকার বড় করার চেয়ে বেশি প্রয়োজন তা দ্বারা গণমানুষের কতটুকু উপকার হয় সেদিকে দৃষ্টি দেয়া।

রাজস্ব

বাজেটে আয়ের প্রধান খাত হচ্ছে রাজস্ব। সরকার বিভিন্ন নামে জনগণ থেকে কর নিয়ে থাকে। মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), আয়কর, আমদানীশুল্ক, সম্পূরক শুল্ক এবং এজাতীয় আরো বিভিন্ন নামে জনগণ থেকে ট্যাক্স নিয়ে থাকে সরকার। এর মধ্যে ভ্যাট তথা মূল্যসংযোজন করকে ধরা হয়েছে আয়ের সবচেয়ে বড় খাত হিসেবে। এ খাত থেকে বাজেটের ২১.৩৫% অর্থাৎ ৭২ হাজার ৭ শ ১৯ কোটি টাকা আয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে। ভ্যাট এমন একটি কর ব্যবস্থা যা সাধারণ জনগণ থেকে সরাসরি আদায় করা হয়। ধনী, গরীব ও ফকীর নির্বিশেষে সকল ক্রেতা এই কর দিতে বাধ্য থাকে। বাংলাদেশে এ ব্যবস্থা চালু হয়েছে বেশি বছর হয়নি। বিএনপির অর্থমন্ত্রী মরহুম সাইফুর রহমান প্রথম ভ্যাট ব্যবস্থা চালু করেন। বর্তমান সরকারী দল তখন বিরোধী দল ছিল। তারা সংসদে ভ্যাটের বিরোধিতা করেছিল কঠোরভাবে। অনেকে ব্যাঙ্গ করে সাইফুর রহমানকে ভ্যাটমন্ত্রী ডাকাও শুরু করেছিলেন। সেই ভ্যাট এখন যেকোনো সরকারের নিকট অতি উপাদেয় বস্তু। কারণ একজন নাগরিক যে কোনো পণ্য বা সেবা কিনলেই সরকার তাতে নিজ অংশ যোগ করে ক্রেতার খরচ বাড়িয়ে দেয়। যদিও সে ক্রেতা হয় হত দরিদ্র। উদাহরণস্বরূপ, একজন ভিখারি ভিক্ষার টাকা দিয়ে ১ পাতা প্যারাসিটামল ট্যাবলেট কিনতে গেল অথবা প্রয়োজনে ফোনে এক টাকার কথা বললে সরকার তার সাথে আরো বিশ পয়সা (এতে ভ্যাট ১৫% বাকিগুলো বিভিন্ন নামে অন্যান্য কর) নিয়ে ক্রেতার খরচ ২০% বাড়িয়ে দিবে। একজন লোক যত দরিদ্র, সীমিত আয়ী বা ঋণগ্রস্তই হোক না কেন নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে গিয়েও তাকে এ ভ্যাট দিতেই হবে। ক্রেতার আর্থিক সঙ্গতি আয়-উপার্জন বা সামর্থ্যরে বিষয়টি এখানে কিছুতেই ধর্তব্য হয় না। আর ২০১৬-১৭ অর্থ বছরের বাজেটে এই ভ্যাটের উপরই অর্থমন্ত্রী মহোদয় সবচেয়ে বেশি আস্থা রেখেছেন। তাই এ খাত থেকে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব কর আদায়ের প্রাক্কলন করেছেন তিনি।

মূল্যসংযোজন কর বা ভ্যাট ছাড়াও সরকার আরো বিভিন্ন যেসব কর নিয়ে থাকে তার মধ্যে আয়কর অন্যতম। এবার এ খাত থেকে বাজেটের ২১.১১% আয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে। আয়কর প্রথম দৃষ্টিতে যদিও ধনীদের উপর আরোপিত ট্যাক্স বলে মনে হয় প্রকৃতপক্ষে তার ভার পরোক্ষভাবে ভোক্তাগণই বহন করে থাকে। কারণ একজন ব্যবসায়ী ও উৎপাদনকারী তার উপর আরোপিত করের হিসাব যোগ করেই পণ্যের দাম নির্ধারণ করে থাকেন।

মোটকথা বিভিন্ন প্রকারের কর বাবদ সরকার জনগণ থেকে এ বছর নিবে প্রায় ১ লক্ষ ৭৫ হাজার কোটি টাকা।

প্রসঙ্গ : করমুক্ত আয়সীমা

ব্যক্তিগত খাতে করমুক্ত আয়সীমা রাখা হয়েছে আড়াই লক্ষ টাকা। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তির বার্ষিক আয় দুই লক্ষ পঞ্চাশ হাজারের বেশি হলেই সে আয় করের আওতায় আসবে। বাংলাদেশে জীবনযাত্রার যে ব্যায় সে হিসেবে একটি পরিবারের কর্তার জন্য আড়াই লক্ষ টাকার (মাসিক ২০৮৩৩/-) উপার্জন কি খুব বেশি। বাসা ভাড়া দিয়ে থাকা একজন শহুরে বাসিন্দা ২১ হাজার টাকা রোজগার করলে কি তা খুব বেশি কামাই হয়ে যায় যে, এর উপর আবার তাকে প্রতি জুলাই-এ আয়কর দিতে হবে। জাতিসংঘ বিশ্বব্যাপী যে দারিদ্র্যসীমা নির্ধারণ করেছে তাতে একটি পরিবারের মাথাপিছু গড়ে দৈনিক দুই ডলারের কম আয় হলে তাকে হতদরিদ্র বা দারিদ্র্যসীমার নীচে অবস্থানকারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। সে হিসেবে একজন লোকের দৈনিক গড় আয় যদি হয় ১৬০ টাকার নীচে সে হবে হতদরিদ্র। এখন ধরা যাক ৬ সদস্যের একটি পরিবার, তার মাথা পিছু গড় আয় দুই ডলার বা ১৬০/- করে দৈনিক ৯৬০/- টাকা, যা মাসে ২৮৮০০/- টাকা হয়। অথচ এদেশে মাসে ২১০০০/- কামাই করা ব্যক্তিই আয় করের আওতায় আসে। তাহলে জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী কি বলতে হবে যে হতদরিদ্রের উপরও আয়করের বোঝা চেপেছে।

বিষয়টিকে আরেকভাবেও ব্যাখ্যা করা যায়। তা হল সরকারী হিসাবে আমাদের দেশের মাথাপিছু গড় আয় হচ্ছে ১৪৬৬ মার্কিন ডলার, যা ৮০/- টাকা করে হিসাব করলে ১১৭২৮০/- টাকা হয়। এখন একটি পরিবারে যদি ৬ জন সদস্য থাকে, তবে গড় আয়ের হিসাবে সে পরিবারের আয় হওয়া উচিত ৭,০৩,৬৮০/- টাকা। অথচ সরকার তার চেয়ে অনেক কম (২,৫০,০০০/-) রোজগারকারী ব্যক্তিকেও আয়করের আওতায় এনেছে।

ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে আয়

বাজেটের এক লক্ষ কোটি টাকার ঘাটতি মেটাতে বরাবরের মত এবারো অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ঋণের উপর আস্থা রেখেছেন অর্থমন্ত্রী। বাজেটের ১৮.১% অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ৬২ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নিবে সরকার। বলাবাহুল্য যে, ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থগুলো জনগণেরই। তাদের থেকে ঋণ নিয়ে তাদের দেয়া কর দিয়েই আবার তার সুদ পরিশোধ হবে।

বৈদেশিক ঋণ

বাজেট বাস্তবায়ন ও এর ঘাটতি মেটাবার জন্য এর ৯% বিদেশ থেকে ঋণ নিবেন অর্থমন্ত্রী। বিদেশীদের কঠিন কঠিন ও লজ্জাষ্কর শর্তাবলীর বেড়াজালে আবদ্ধ এ ঋণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পুরোপুরি কখনো কাজে লাগানো যায়নি। তারপরও নিজেদের মাথায় চাপিয়ে নেয়া বিশাল খরচের জন্য বৈদেশিক ঋণ নিতেই হবে। অথচ খরচের পরিমাণ মাত্র ৯% কমিয়ে নিলেই এ ঋণের কোনো প্রয়োজনই হত না। বিদেশীরাও রাষ্ট্রের অর্থব্যবস্থা নিয়ে নাক গলাতে পারত না।

বৈদেশিক অনুদান

বাজেট ঘাটতি মেটাতে ১.৬% বৈদেশিক অনুদান পাবার আশাও করা হয়েছে। অংকের হিসাবে যা সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকারও কম। এত বিশাল বাজেটের এ কয় টাকা নেওয়ার জন্য আবার মাথা পাততে হবে বিদেশীদের করুণার কাছে। কবে যে আমরা আত্মনির্ভরশীল জাতি হতে পারব আল্লাহই ভালো জানেন।

বাজেটের আয়ের উৎসগুলোর উপর সংক্ষিপ্ত আলোকপাতের পর এবার নজর দেয়া যাক ব্যয়ের খাতগুলোতে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যয়ের বড় বড় বরাদ্দগুলো হচ্ছে শিক্ষা ও প্রযুক্তি ১৫.৬% জনপ্রশাসন (বেতন-ভাতা) ১৩.৯% সুদ ১১.৭% এবং পরিবহন ও যোগাযোগ ১১% ইত্যাদি।

সুদ

ইসলামে সুদ কঠোরভাবে হারাম হলেও ৯০% মুসলমানের দেশে তা সরকারের অন্যতম প্রধান খরচের খাত। প্রতিবারেই বিশাল বাজেটের ঘাটতি মেটাবার জন্য সরকার দেশী-বিদেশী ব্যাংক ও বিভিন্ন সংস্থা থেকে মোটা অংকের ঋণ করে থাকে। যেমন এবারো প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকা ঋণ করবে বলে মনস্থ করেছে। এই বিশাল ঋণের জন্য সুদও আদায় করতে হয় বড় আকারে। তাই সরকারের বড় খরচের খাত হয়ে দাঁড়ায় ঋণের বিপরীতে সুদ পরিশোধ। কোনো বছর সে বাবদ সর্বোচ্চ বরাদ্দ থাকে। শিক্ষা ও প্রযুক্তিকে ভিন্নভাবে গুনলে এবারও সম্ভবতঃ তা হবে বেতন-ভাতার পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খরচের ক্ষেত্র। যে সুদের গ্রহণকারী ও প্রদানকারীর উপর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভিসম্পাত করেছেন, তাঁর উম্মতের দেশের রাষ্ট্রীয় বাজেটে সে সুদই হল অন্যতম প্রধান খরচের খাত।

বেতন-ভাতা

এবারের বাজেটের প্রধান খরচের খাত হচ্ছে জনপ্রশাসন তথা সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা। এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৩.৯% অর্থাৎ ৪৭ হাজার ৩ শ কোটি টাকারও বেশি অংক। রাষ্ট্রীয় কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের অবশ্যই যুক্তিসঙ্গত পারিশ্রমিক দিতে হবে। কিন্তু দেশের সার্বিক অর্থনীতির কথা এবং গণমানুষের আয়ের কথা বিবেচনায় না নিয়ে গত বছর শুধু একশ্রেণীর লোকদের যে হারে বেতন-ভাতা বাড়ানো হয়েছে সঙ্গত কারণেই তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিজ্ঞ মহল। এই হারে বেতনবৃদ্ধি শুধু তৎক্ষণাৎ মূল্যস্ফীতিই ঘটায়নি বরং তা পরিশোধের জন্য জনগণের উপর বিশাল করের বোঝাও চেপেছে, যা দেখা গেল নতুন বাজেট ঘোষণায়।

এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় চিন্তা করা প্রয়োজন। তা হল সরকারী চাকুরে অর্থাৎ জনগণের খাদেমদের বেতন-ভাতা ও সুযোগ সুবিধা প্রায় দ্বিগুণ করা হল কিন্তু তাদের সেবার গুণগত মান বৃদ্ধির কি কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। মানুষ কি এখন সরকারী অফিসগুলোতে হয়রানিমুক্ত সেবা পাচ্ছে। অবশ্যই সরকারী চাকুরেদের মধ্যে সৎ ও নেককার লোক অনেক রয়েছেন, কিন্তু সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি বিশাল অংশ যে ঘুষ, খেয়ানত ও অবৈধ উপার্জনকে তাদের নিয়মিত আমল বানিয়ে নিয়েছে বেতন বৃদ্ধির পর তা কি সামান্যও হ্রাস পেয়েছে? ভুক্তভোগীরা এ ক্ষেত্রে নেতিবাচক উত্তরই দিবেন। যে পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় কর্তাব্যক্তিদের অন্তরে আল্লাহভীতি তৈরি করার ব্যবস্থা না হবে, যতক্ষণ না তাদেরকে দায়িত্বশীল-জবাবদিহিতায় অভ্যস্ত না করা যাবে, তাদের বেতন যতই বাড়ানো হোক ঐ শ্রেণীর আমলারা মানুষের ভোগান্তির কারণ হয়েই থাকবেন। একতরফাভাবে ক্ষুদ্র একটি শ্রেণীর আয় বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের বাজারকে করবে অস্থিতিশীল। আবার তাদেরকে প্রদানের জন্য ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক, আয়কর ইত্যাদি বিভিন্ন নামে বিশাল করের বোঝাও সইতে হবে গণমানুষকেই।

কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে তাল মিলিয়ে রাষ্ট্রের পরিচালকগণ তথা মন্ত্রী-এমপিদের বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধাও বেড়েছে সম বা অধিকহারে। শুধু তাই নয় বরং সম্প্রতি গণপূর্ত মন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন যে, সংসদ সদস্যদের প্লট এবং ফ্ল্যাট দুটিই দেয়া হবে। যুগ যুগ থেকে জনগণ দেখে আসছে যে, একটি বিষয়ে অন্ততঃ সংসদে ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠিত থাকে, এখানে কেউ বিরোধী থাকে না; তা হচ্ছে সংসদ সদস্যদের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধাদী বৃদ্ধি। অর্থাৎ তারা রাষ্ট্র তথা জনগণ থেকে নিজের জন্য সুবিধাদী আদায়ের ব্যাপারে সকলেই একমত থাকেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, মন্ত্রী-এমপিদের কতজন লোক এমন আছেন যারা অসচ্ছল, যাদের নিজেদের কোটি কোটি টাকার ব্যবসা নেই? এমন কতজন পাওয়া যাবে যাদের শহর এলাকায় জমি ও বাড়ি নেই। তারা তো নির্বাচনই করে থাকেন বহু কোটি টাকা খরচ করে। তবে কেন তেলে মাথায় নিজেদের কর্তৃক তেল দেয়ার এ প্রবণতা?

মনে পড়ে গেল স্বর্ণযুগের কথা। মানবতার মুক্তির দূত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাত হয়ে গেছে। প্রথম খলীফা আবু বকর রা. দায়িত্ব নিয়েছেন বেশি দিন হয়নি। একদিন তিনি মাথায় পুটলি নিয়ে বাজারমুখি চলেছেন। পথে দেখা উমর রা.-এর সাথে। খলীফা! কোথায় চলেছেন? উমরের জিজ্ঞাসা। বাজারে কাপড় বেচতে। সংসার তো চালাতে হবে; পুরো উম্মতের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব খলীফা আবু বকরের উত্তর। তাহলে রাষ্ট্র দেখবে কে? একথা বলে উমর রা. খলীফাকে নিয়ে গেলেন জ্যেষ্ঠ সাহাবী আবদুর রহমান ইবনে আউফের কাছে। সব শুনে তিনি মাসিক সামান্য কিছু দেরহাম রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে খলীফাকে নিতে বললেন এবং জানিয়ে দিলেন এর চেয়ে বেশি অর্থ আমি আপনাকে নিতে বলতে পারব না। খলীফ আবু বকর রা. তা নিয়েই খুশি থাকলেন। এখানে খলীফা তার সম্মানী নিজে ঠিক করেননি। আবার যিনি ঠিক করে দিয়েছেন তিনিও মাত্রাতিরিক্ত দেননি। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুআজ রা.-কে গভর্নর হিসেবে ইয়েমেনে প্রেরণের সময় বলেছেন إياكَ والتنعُّمَ فإن عِبَادَ اللهِ ليسُوا بالمتنعِّمينَ খবরদার তুমি উন্নত জীবন যাপন করো না, কেননা আল্লাহর বান্দাগণ (সাধারণ জনগণ) বিলাস জীবনের সামর্থ্য রাখে না। Ñমুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২২১০৫; শুআবুল ঈমান, হাদীস ৫৭৬৬

মুসলিম উম্মাহর শাসকগণের মধ্যে কবে তৈরি হবে এমন মানসিকতা।

মোটকথা যত বড় কর্মকর্তা তত বেশি বেতন-ভাতা, গাড়ি-বাড়ি ও অন্যান্য সুবিধা। একজন ইউএনও-র জন্যও ল্যান্ডক্রুজার গাড়ি- এমন চিন্তার সাথে ইসলামের রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচিত নয়।

কৃষি

বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬.৭%। কৃষি প্রধান এ দেশে অংকটি যে নেহায়েত কম তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কৃষি পণ্যের মূল্য ভোক্তা পর্যায়ে যতই বেশি হোক কৃষক কিন্তু তার চেয়ে অনেক কম পেয়ে থাকে। ফলে লাভবান হতে পারে খুব কম কৃষকই। মাঝে লাভ নিয়ে যায় আধুনিক যুগের মহাজন-ফড়িয়া মধ্যস্বত্বভোগীরা। যে পর্যন্ত এ শ্রেণীর লোকদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা না যাবে এবং সরকার কৃষকদের (দুর্নীতিমুক্ত পন্থায়) অর্থায়ন না করবে সে পর্যন্ত কৃষি খাতে যতই বরাদ্দ রাখা হোক তা কাজে আসবে না। এ ক্ষেত্রে ইসলামের আয্যারাআহ তথা কৃষিনীতি হতে পারে আদর্শ পন্থা।

সামাজিক নিরাপত্তা

এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে বাজেটের ৫.৮% তথা ১৯ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি। নির্ধারিত সংখ্যক বয়স্ক, বিধবা ও অসহায়দেরকে এ খাত থেকে সামান্য পরিমাণে ভাতা প্রদান করা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে দলীয়করণ ও অনেক জায়গায় প্রকৃত অসহায়দের পরিবর্তে স্থানীয় ক্ষমতাসীনদের আপনজন কর্তৃক উক্ত সুবিধা পাওয়ার ব্যাপারে ব্যাপক অভিযোগও রয়েছে। সে কথায় না গিয়েও বলা যায় যে, বিশাল দরিদ্র শ্রেণী সমৃদ্ধ এ দেশে উক্ত বরাদ্দ খুবই সামান্য।

ইসলামী অর্থনীতিতে খরচের এ খাতটি আবশ্যিক। এবং এর আওতাভুক্ত থাকবে সকল সামর্থ্যহীন ও অসহায় নাগরিক। ৩০০, ৫০০ টাকা নয় বরং তাদের ন্যূনতম ভরণ-পোষণের পুরো দায়িত্ব নিতে হয় ইসলামী সরকারকে।

বাজেটে উপেক্ষিত

বরাবরের মত ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটেও ধর্ম ও নৈতিকতাকে উপেক্ষা করা হয়েছে। আধা (০.৫%) পার্সেন্টও বরাদ্দ রাখা হয়নি এ খাতে। অথচ সরকারের মন্ত্রী-এমপিগণ থেকে শুরু করে ইউনিয়নের চেয়ারম্যান-মেম্বর পর্যন্ত এবং সকল স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সকল শ্রেণীর নাগরিকদের মধ্যে যে পর্যন্ত নৈতিকতা তথা আল্লাহ-ভীতি সৃষ্টি করা না যাবে ততদিন কিছুতেই জাতির প্রকৃত উন্নতি ঘটবে না। দুর্নীতি, ঘুষ, ভেজাল, মিথ্যা, প্রতারণা, হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ নিয়ে ফেরত না দেয়া এবং জেনে-শুনে এমন লোকদেরকে ঋণ প্রদান করা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ জালিয়াতির মত ঘটনা, গ্রেপ্তার বাণিজ্যসহ কোনো অনৈতিক কাজই বন্ধ হবে না। ফলে অধরাই থেকে যাবে আর্থ সামাজিক সাম্য ও ন্যায় বিচার। একটি কল্যাণ রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজন একটি আদর্শ জাতি। আর সে আদর্শ জাতি তৈরির একমাত্র পন্থায়ই হল তাদের মধ্যে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতার গুণকে জাগ্রত করা। অথচ সেদিকে কোনো দৃষ্টিই নেই বাজেট প্রণেতাগণ ও দেশের নীতি নির্ধারকদের।

খরচের লাগাম টেনে ধরা

আগেই বলা হয়েছে বাজেটে আয় ও ব্যায়ের মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য নেই। আয় যা হবে তার চেয়ে প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকা বেশি খরচ করার চিন্তা করা হয়েছে। আবার যে আয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে তা-ও খোদ অর্থমন্ত্রীর ভাষাতেই উচ্চাভিলাষী। পিছনের অভিজ্ঞতা বলছে যে তা অর্জন করা অসম্ভব। সুতরাং এক্ষেত্রে খরচের লাগাম টেনে ধরাই ছিল যথোপযুক্ত পন্থা। ইচ্ছে করলেই পুরো সিস্টেম পরিবর্তন না করেও সরকারী অনেক খরচই কমিয়ে আনা সম্ভব। উদাহরণ স্বরূপ সরকারী উন্নয়নমূলক কাজ কর্মের (বিদ্যুৎ, ওয়াসা, টেলিফোন) সমন্বয়হীনতায় বারবার রাস্তা খোঁড়াখুঁড়িতে জনগণের ভোগান্তি ছাড়াও রাষ্ট্রের কত কোটি টাকা অপচয় হয় তা কি কেউ খতিয়ে দেখেছে। আর প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির কারণে যে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ বেড়ে যায় বা বাড়াবার পরিবেশ তৈরি করা হয় তার জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে তো ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চার লেন প্রকল্প ও পদ্মা সেতু রয়েছেই। এছাড়া সরকারের ক্রয়ের ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অদক্ষতার কারণে যে রাষ্ট্রের কত হাজার কোটি টাকা গচ্ছা যায় তার হিসাব কে রাখে। রেলওয়ের বড় বড় প্রকল্পসহ বিভিন্ন খাতে আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যে ক্রয় করার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বিভিন্ন সময়ে জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিতও হয়েছে। এছাড়া মন্ত্রী, এমপি, সংসদীয় কমিটি ও সরকারী চাকুরেদের কারণে-অকারণে অহরহ বিদেশ ভ্রমণের পিছনে রাষ্ট্রের কত টাকা ব্যয় হয় তার হিসাব কি করদাতাগণ কখনো পায়? অভিজ্ঞতা অর্জন ও গুরুত্বহীন সভা সমিতিতে যোগদানে দলে দলে সরকারী লোকদের বিদেশ সফর তো এখন খুবই নিয়মিত ঘটনা। কদিন আগে খবর এল লুইকান কর্তৃক জাতীয় সংসদের প্রণীত নকশা আনতে আমেরিকা সফরে গেছেন সম্ভবতঃ অর্ধডর্জন কর্মকর্তা। প্রযুক্তির চরম উন্নতির এ যুগে ডিজিটাল বাংলাদেশের এতজন লোক যদি সাতসমুদ্র-তেরনদী পাড়ি দিয়ে গিয়ে পুরাতন একটি নকশার কপি আনতে হয় এবং এর পিছনে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা পানিতে ফেলতে হয় তাহলে সে রাষ্ট্রে লাগামহীন খরচের স্রোত বন্ধ হবে কীভাবে?

মাথাপিছু গড় আয় ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি

বছরখানেক আগেই খবর বেরিয়েছে বাংলাদেশ নি¤œ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে এবং প্রতি বছরই জিডিপি প্রবৃদ্ধি দেখানো হয় বাজেটে। এ দুটি বিষয় যে সাধারণ জনগণের সাথে কত বড় মশকরা সে বিষয়ে কিছু আরজ করার ইচ্ছা ছিল কিন্তু সময় সঙ্গ দিচ্ছে না, পত্রিকা প্রেসের পথে।

শেষ কথা

প্রিয় মাতৃভূমির একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে বাজেট নিয়ে কিছু বিক্ষিপ্ত চিন্তা পেশ করা হল। কিন্তু এখানে ইসলামের দৃষ্টিতে বাজেটকে মূল্যায়ন করা হয়নি। ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রের আয়-ব্যয়ের নীতিমালার সাথে প্রচলিত ব্যবস্থার বড় কোনো মিল নেই বললেই চলে। ইসলাম মনগড়াভাবে রাষ্ট্রীয় খরচ করা এবং ধনী-গরীব নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর নাগরিকের উপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের বোঝা চাপিয়ে দেয়ার নীতিকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু ৯০% মুসলমান তাদের নিজেদের দেশে ইসলামী অর্থনীতির বাস্তবায়ন কি দেখতে পারবে? 

 

আরও পড়ুন:   অর্থনীতি | দ্বীনিয়াত | পর্যবেক্ষণ | পর্যালোচনা

হজ্ব এবং কুরবানী বিষয়ক প্রবন্ধসমূহ