জুমাদাল উলা ১৪৩৭ . ফেব্রুয়ারি ২০১৬

পুরোনো সংখ্যা . বর্ষ: ১২ . সংখ্যা: ০২

কুরআন মাজীদের একটি বিখ্যাত দুআÑ

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ.

হে আমাদের পরওয়ারদেগার! আমাদের দুনিয়াতে হাসানাদান করুন এবং আখিরাতে হাসানাদান করুন। আর আমাদের জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করুন।এটি একটি কুরআনী দুআ, সূরা বাকারার ২০১ নং আয়াতে দুআটি আছে। যারা এই দুআ করে তাদের প্রশংসা করে এবং তাদেরকে উত্তম প্রতিশ্রুতি দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেনÑ

أُولَئِكَ لَهُمْ نَصِيبٌ مِمَّا كَسَبُوا وَاللَّهُ سَرِيعُ الْحِسَابِ.

সুতরাং এই দুআ এবং এই বিশ্বাস ও ভাষায় দুআ আল্লাহর কাছে প্রিয়। নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও এ দুআ বেশি বেশি করতেন।

  দুআ যে গভীর শিক্ষার ধারক তার প্রথমটি হচ্ছে আখিরাতের প্রতি ঈমান। দুআটি যে আয়াতে এসেছে সে পুরো আয়াত স্মরণ করলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। পুরো আয়াতটি এইÑ

 فَإِذَا قَضَيْتُمْ مَنَاسِكَكُمْ فَاذْكُرُوا اللَّهَ كَذِكْرِكُمْ آبَاءَكُمْ أَوْ أَشَدَّ ذِكْرًا، فَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَقُولُ رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا وَمَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنْ خَلَاقٍ، وَمِنْهُمْ مَنْ يَقُولُ رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ، أُولَئِكَ لَهُمْ نَصِيبٌ مِمَّا كَسَبُوا وَاللَّهُ سَرِيعُ الْحِسَابِ. 

যখন তোমরা তোমাদের হজ্বের কাজগুলো সম্পন্ন করবে, তখন আল্লাহকে স¥রণ কর যেমন তোমরা তোমাদের পূর্বপুরুষদের স্মরণ করতে, অথবা তার চেয়েও বেশি। কিছু মানুষ আছে যারা শুধু বলে, হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের দুনিয়াতে দিন। আখেরাতে তাদের জন্যে কোনো-ই অংশ নেই। আর কিছু মানুষ বলে, হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন এবং আখেরাতে কল্যাণ দান করুন। এবং আমাদেরকে রক্ষা করুন জাহান্নামের আযাব থেকে। এরাই ঐ সকল লোক যাদের জন্য রয়েছে হিস্যা, তাদের কর্মের কারণে। যারা তাদের কর্মের বিনিময় লাভ করবে। আর আল্লাহ তাআলা অতি শীঘ্রই হিসাব গ্রহণ করবেন।” Ñসূরা বাকারা (২) : ২০০-২০২

এখানে দুশ্রেণীর মানুষের প্রার্থনা উল্লেখিত হয়েছে। এক শ্রেণী শুধু দুনিয়ার সুখ-স্বচ্ছলতা প্রার্থী, আরেক শ্রেণী দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জাহানের কল্যাণপ্রার্থী। এটি পরিষ্কারভাবে এ আয়াতে আছে। এ আয়াতের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বর্ণিত আছে, কোনো কোনো আরাবী (গ্রাম্য বেদুঈন) হজ্বের মৌসুমে এসে দুআ করত, হে আল্লাহ! এই বছর আমাদেরকে বৃষ্টি ঠিকমত দিয়েন। আমাদের কৃষি কাজগুলো যেন ঠিকমত হয়। আমাদের পশুপালন যেন ঠিকমত হয়। এভাবে দুনিয়ার কিছু বিষয় তারা প্রার্থনা করত। আখেরাতের বিষয়ে তারা কিছু বলত না। আখেরাতকে তো তারা বিশ্বাসই করত না। সেজন্যে হযরত রাসূলে কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আখেরাতের দাওয়াত দিতেন তখন তারা বলত, এ কেমন আশ্চর্য কথা! আমরা মরে যাওয়ার পর, আমাদের হাড়গোড় পচে গলে যাওয়ার পর কীভাবে আবার আমরা জীবিত হব! আল্লাহ তাআলা তাদের এই প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন যে, পুনরায় জীবন দান তো আল্লাহর কাছে খুব সহজ। যিনি তোমাদের প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন যখন তোমরা কিছুই ছিলে না। তিনিই তো তোমাদের দ্বিতীয়বার জীবিত করবেন। তো আখেরাতকে বিশ্বাস না করার কারণে ওরা শুধু এ দুআ করত যে, হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের দুনিয়াতে দাও। আল্লাহ তাআলা বলেন, وَمَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنْ خَلَاقٍ  আখেরাতে তাদের জন্য কোনো অংশ নেই।

এখানে একটি লক্ষণীয় বিষয় এই যে, এসকল লোক নাস্তিক ছিল না। আল্লাহ্য় বিশ্বাসী ছিল। আল্লাহকে রব ও পরওয়ারদেগার বলে বিশ্বাস করত এবং তাঁর কাছে প্রার্থনা করত। কিন্তু এই বিশ্বাস আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। আখিরাতের নাজাতের উপায় হয়নি। সুতরাং ভালোভাবে বুঝে নেওয়া কর্তব্য, কোন্ আল্লাহবিশ্বাসআল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য ও নাজাতের উপায় আর কোনটি গ্রহণযোগ্য নয় ও নাজাতের উপায় নয়।

আজকাল অনেক মুসলিমের মধ্যেও এই বিভ্রান্তি ঢুকে পড়েছে যে, যে কোনো  প্রকারের আল্লাহবিশ্বাসকেই তারা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য বিশ্বাস মনে করেন। অথচ কুরআন মাজীদের বহু জায়গায় এই ভ্রান্তির খ-ন রয়েছে। এ আয়াতে স্পষ্ট জানা যাচ্ছে যে, আখিরাতের বিশ্বাসবিহীন আল্লাহবিশ্বাসগ্রহণযোগ্য নয়। এরকম  আরেক আয়াতে জানানো হয়েছে যে, রিসালাতের বিশ্বাস বিহীন আল্লাহবিশ্বাসগ্রহণযোগ্য নয়। কুরআনের বিভিন্ন আয়াত ও শরীয়তের অন্যান্য দলীল থেকে যে বিষয়টি প্রমাণিত তা হচ্ছে, ‘জরুরিয়াতে দ্বীনবা দ্বীনের মৌলিক ও সর্বজনবিদিত বিষয়াদির সবগুলোর প্রতিই ঈমান ও বিশ্বাস অপরিহার্য। এটিই পূর্ণাঙ্গ ও ফলপ্রসূ আল্লাহবিশ্বাস। আল্লাহবিশ্বাসের ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচার ও প্রবৃত্তির অনুগামিতার কোনো সুযোগ নেই। তো এ হচ্ছে এক কথা। এবং এক শ্রেণীর মানুষের কথা। এরপর দ্বিতীয় শ্রেণী সম্পর্কে  আল্লাহ পাক বলেন, “আর কিছু মানুষ এমন আছে যারা বলে হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদেরকে দুনিয়াতেও হাসানাদান করুন। আখেরাতেও হাসানাদান করুন। আর আমাদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করুন।এই শ্রেণীর মানুষ আখেরাতকে বিশ্বাস করে এবং জাহান্নামের আযাবকে ভয় করে। আর তারা দুনিয়া-আখিরাত উভয় জগতের কল্যাণ প্রার্থনা করে।

হাসানামানে কী? ‘হাসানাহল একটা বিশেষণ। এর অর্থ উত্তম। কী উত্তম? ‘আল হালাতুল হাসানাহউত্তম অবস্থা বা কল্যাণ। এটা অনেক ব্যাপক শব্দ। উত্তম অবস্থার মধ্যে হালাল রিযিক, শান্তিপূর্ণ বাসস্থান, মুত্তাকী সঙ্গী, সুস্থ ও নিরাপদ জীবন, ভালো কাজ করার তাওফীক, আল্লাহ তাআলার আনুগত্য, রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নতের অনুসরণÑ এই সবকিছুই শামিল।

অনেকে মনে করে এখানে দুনিয়াচাওয়া হয়েছে। আর দুনিয়া চাওয়ার অর্থ তাদের কাছে যে কোনো উপায়ে ও যে কোনো মাত্রার দুনিয়াপ্রত্যাশা। অথচ এখানে رَبَّنَا آتِنَا الدُّنْيَاহে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে দুনিয়া দান করুন”Ñ এমন বলা হয়নি। বলা হয়েছে رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে দুনিয়াতে দান করুন। কী দান করবেন? হাসানা উত্তম অবস্থা। দুনিয়ার জীবনে আমাকে উত্তম অবস্থা দান করুন। আল্লাহর কাছে উত্তম অবস্থার অর্থ কী? আল্লাহর মর্জি মুতাবেবক চলা সুস্থতা, নিরাপত্তা, হালাল রিযিক, হালাল বাসস্থান ইত্যাদি। এসব হচ্ছে দুনিয়ার উত্তম অবস্থা। সুতরাং এই ধারণা ঠিক নয় যে, এখানে বস্তুবাদীদের মতো দুনিয়া চাওয়া হয়েছে। অনেকে বিভিন্ন প্রসঙ্গে খুব জোর গলায় বলতে থাকেন, মুসলমানদের আর্থিক উন্নতি দরকার এই বাক্যটি অসত্য নয়। কিন্তু দেখার বিষয় হচ্ছে এই সত্য কথাটি কোন ক্ষেত্রে  বলা হচ্ছে এবং আর্থিক উন্নতির কোন্ উপায়কে সামনে রেখে বলা হচ্ছে। কখনো দেখা যায়, সুদী কারবারের প্রসঙ্গে এই কথাটা বলা হয়, কখনো দ্বীনী ইলম থেকে বিমুখ করার জন্যে বলা হয়, কখনো তথাকথিত ইহজাগতিকতার সমর্থনে বলা হয়। কখনো মাত্রাতিরিক্ত দুনিয়া লিপ্ততার মহিমা বর্ণনা করে বলা হয়। এরকম আরো অনেক ক্ষেত্রে বলা হয়। তো প্রয়োগক্ষেত্রের কারণে এই বাক্যটির অর্থ কখনো হয়, ‘মুসলমানদের সুদী কারবারে উন্নতি করা দরকার’, কখনো হয় মুসলমানদের সকলকে দ্বীনী ইলম ত্যাগ করে শুধু জাগতিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া দরকার’, কখনো হয়, ‘মুসলমানদের ইহজাগতিক তথা খাঁটি বস্তুবাদী হওয়া দরকারআর কখনো এর অর্থ হয়, ‘মুসলমানদের দিনরাত শুধু অর্থোপার্জনে লিপ্ত থাকা দরকার।বলুন এই কথাগুলোর কোনটা একজন সাধারণ বিচারবুদ্ধির মুসলিমও স্বীকার করতে পারেন? একজন মুসলিম যেটা বিশ্বাস করতে পারেন, তা হচ্ছে, মুসলমানদের আর্থিক উন্নতি দরকার। কিন্তু সেই আর্থিক উন্নতি হতে হবে হালাল পন্থায়। হালাল পন্থায় যে পরিমাণ আর্থিক উন্নতি হতে পারে ঐ পরিমাণ উন্নতিই কাম্য। উন্নতির জন্য হারাম পথে যাওয়ার কোনো অবকাশ নেই। এটা কোনো অবস্থাতেই কাম্য নয়। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দুআ শিখিয়েছেন এভাবে যে, হে আল্লাহ!  আমাদেরকে দুনিয়াতে উত্তম অবস্থা দান করুন। আখেরাতেও উত্তম অবস্থা দান করুন। আখেরাতের উত্তম অবস্থা হল, আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি লাভ করা। তাঁর অসন্তুষ্টি থেকে মুক্তি পাওয়া। রাসূলে কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শাফাআত লাভ করা। সর্বোপরি জান্নাত লাভ করা এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়া জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়া যেহেতু বেশী গুরুত্বপূর্ণ তাই আবার বিশেষভাবে এটাকে উল্লেখ করা হয়েছে।  وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ এবং আমাদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে মুক্তি দান করুন। এটি একটি দুআ। একটি দর্শন, একটি বিশ্বাস। আমি দুনিয়ার জীবনেও বিশ্বাস করি, পরকালের জীবনেও বিশ্বাস করি। কেউ যদি পরকালের জীবনকে বিশ্বাস নাও করে তবু সেটা আসবে এবং এই বিশ্বাস না করা তার জন্যে দুর্ভোগ ও দুর্ভাগ্যের ব্যাপার হবে। আমরা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জীবনে বিশ্বাস করি। তাই উভয় জীবনের কল্যাণ ও কামিয়াবী আল্লাহ তাআলার কাছে প্রার্থনা করি। আল্লাহর রাসূলের বিখ্যাত সাহাবী হযরত আনাস ইবনে মালেক রা. থেকে বর্ণিত, তিনি যদি কখনো শুধু একটি দুআ করতেন তাহলে এই দুআ করতেন। আর যদি লম্বা দুআ করার ইচ্ছা থাকত তাহলে অন্য দুআর সাথে এই দুআও করতেন। কারণ এটি এমন এক দুআ যা দুনিয়া-আখেরাত উভয় জাহানের সকল কল্যাণকে শামিল করে। কাবা শরীফ তাওয়াফ করার সময় এ দুআর শিক্ষা সহীহ হাদীসে আছে।

এই শ্রেণীর মানুষের জন্যে আল্লাহ তাআলার ইরশাদÑ  أُولَئِكَ لَهُمْ نَصِيبٌ مِمَّا كَسَبُوا তাদের জন্যে আছে তাদের কর্মের উত্তম বিনিময়।যারা ঈমান আনেনি তাদের ভালো কাজগুলোর বিনিময় তাদেরকে দুনিয়াতেই দিয়ে দেওয়া হয়।  আখিরাতে তাদের জন্য কোনো বিনিময় থাকে না। আখেরাতের বিনিময় কেবলই ঈমানদারদের জন্যে।

 আল্লাহ পাক এরপর বলছেন, وَاللَّهُ سَرِيعُ الْحِسَابِ আল্লাহ তাআলা খুব দ্রুত হিসাব গ্রহণ করবেন। এর আরেক অর্থ হল, হিসাবের খুব বেশি দেরি নেই। কেউ মনে করবে যে, জীবন তো এখনো অনেক বাকি। একদিন মারা যাব। এরপর কবরে আরো কতদিন থাকব। তারপর কিয়ামত হবে। হিসাব নিকাশ হবে। বিষয়টা এমন নয়। হিসাবের দিন, কিয়ামতের দিন খুব বেশি দূরে নয়। খুব শীঘ্রই আল্লাহ তাআলা হিসাব নিবেন।

 

 

আরও পড়ুন:   আদব-শিষ্টাচার | ইসলামের সৌন্দর্য-মাধুর্য | দ্বীনিয়াত

কুরআন মজীদ ও সহীহ হাদীসের আলোকে মাহে রমযান