রবিউল আউয়াল-রবিউস সানী ১৪৩৭ . জানুয়ারি ২০১৬

পুরোনো সংখ্যা . বর্ষ: ১২ . সংখ্যা: ০১

ব্যক্তি ও কর্মের ভালো-মন্দ

ইসলাম আমাদের দ্বীন। জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইসলামই আমাদের আদর্শ ও আলোকবর্তিকা। ইসলাম আমাদের কর্ম ও আচরণকে পরিশুদ্ধ করে এবং চিন্তা ও মস্তিষ্ককে আলোকিত করে। ইসলাম মানুষকে দান করে ঐ ফুরকান’ (পার্থক্য নিরূপণকারী) যার মাধ্যমে সত্য-মিথ্যা, সরলতা-বক্রতার পার্থক্য নিরুপিত হয় এবং সকল বস্তু ও বিষয়ের স্ব স্ব পরিচয় ও অবস্থান নির্ধারিত হয়। সম্প্রতি কোনো কোনো প্রচারমাধ্যমে ভালো-মন্দ ও ভালো-মন্দের মাপকাঠি নিয়ে একটি চতুরতাপূর্ণ আলোচনার অবতারণা ঘটানো হয়েছে। ভালো মেয়ে,... মেয়ে এবং কে তা নির্ধারণ করবে। এই শিরোনামে ইতিমধ্যে তারা একটি আলোচনা সম্পন্ন করেছে। একারণে বিষয়টি নিয়ে কিছু চিন্তা-ভাবনা পাঠকের সাথে ভাগাভাগি করার তাড়না বোধ করছি। শিরোনামের কথাটি ভালোভাবে বোঝার জন্য কয়েকটি বিষয়ের পার্থক্য ও বিধান স্পষ্টভাবে বোঝা প্রয়োজন :

এক. কটক্তি ও মূল্যায়ন এক কথা নয়।

ব্যক্তি বা কর্মের মূল্যায়ন এক বিষয় আর কারো প্রতি কটক্তি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। যদিও অনেক ক্ষেত্রে এ দুয়ের শব্দ-বাক্য এক হয়ে থাকে। একারণে খুব মনোযোগের সাথে লক্ষ্য না করলে কারো কাছে কটক্তিকে মূল্যায়ন কিংবা মূল্যায়নকে কটক্তি বলে মনে হতে পারে।

ভালো-খারাপশব্দ দুটি প্রয়োগের বিচারে সাধারণ দুটি শব্দ। এরা যেমন মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় তেমনি কটক্তির ক্ষেত্রেও হয়। সুতরাং কোনো ব্যক্তি বা বিষয় সম্পর্কে এই দুই শব্দের প্রয়োগ শুদ্ধ কি অশুদ্ধ, ন্যায় কি অন্যায় তা নিরূপণ করতে হলে প্রথমেই নিরূপণ করতে হবে শব্দ-দুটির প্রয়োগ কোন প্রকারের অন্তর্ভুক্ত- সিদ্ধান্ত ও মূল্যায়ন, না কটক্তি ও পীড়ন।

ইসলামে কটক্তি ও পীড়নের বিধান

এ বিষয়ে সূরায়ে হুজুরাতের ১১ ও ১২ নম্বর আয়াত খুবই প্রাসঙ্গিক। আমি শুধু এই দুই আয়াতের তরজমা তুলে দিচ্ছি :

হে মুমিনগণ! কোনো পুরুষ যেন অপর কোনো পুরুষকে উপহাস না করে; কেননা যাকে উপহাস করা হয় সে উপহাসকারী থেকে উত্তম হতে পারে। এবং কোনো নারী যেন অপর কোনো নারীকে উপহাস না করে। কেননা যাকে উপহাস করা হয় সে উপহাসকারিনী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে। তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করো না এবং একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না। ঈমানের পর ফিস্ক বিশেষণে ভুষিত হওয়া কত মন্দ। যারা তাওবা করে না তারাই যালেম।

হে মুমিনগণ! তোমরা অনেক ধারণা পরিহার কর। নিশ্চয়ই কিছু ধারণা পাপ। এবং তোমরা  (গোপন বিষয়) অনুসন্ধান করো না এবং একে অপরের পশ্চাতে নিন্দা করো না। তোমাদের কেউ কি আপন মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া পসন্দ করবে? তোমরা তো একে ঘৃণ্যই মনে কর। আল্লাহকে ভয় কর; আল্লাহ তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।

এখানে যে বিষয়গুলো খুব পরিষ্কারভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে তা নিম্নরূপ :

১. কাউকে উপহাস করা, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা।

২. কাউকে মন্দ উপাধী বা বিশেষণে ভষিত করা। কুরআন মাজীদে পরিষ্কার ভাষায় একে ফাসেকী কাজ বলা হয়েছে।

৩. ধারণার অনুসরণ করা। শুধু ধারণার ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া, কোনো কথা বলা বা কোনো আচরণ করা।

৪. কারো দোষ বা দুর্বলতা অন্বেষণ করা।

৫. কারো গীবত করা বা পশ্চাতে নিন্দা করা।

হাদীস শরীফের সুস্পষ্ট ভাষ্য অনুযায়ী গীবত হচ্ছে কারো বাস্তব দোষ চর্চা করা। যে দোষ কারো মধ্যে নেই তা কারো প্রতি আরোপ করা তুহমত বা মিথ্যা অপবাদ, যা গীবতের চেয়েও মারাত্মক।

তো সূরা হুজুরাতের ১১ ও ১২ নম্বর আয়াতে উপরের সবগুলো কাজ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আর তা নিষিদ্ধ করা হয়েছে সাধারণভাবে। নারী-পুরুষ সবার জন্য তা নিষেধ এবং সবার ক্ষেত্রে নিষেধ। এক্ষেত্রে নারী ও পুরুষে যেমন কোনো পার্থক্য নেই তেমনি নারীতে নারীতেও কোনো পার্থক্য নেই। কটক্তি ও পীড়ন সবার জন্য হারাম। সবার ক্ষেত্রে হারাম। একটি সভ্য-সুন্দর, শান্তিপূর্ণ সমাজের জন্য বিধানের এই সাম্য সবার আগে প্রয়োজন, যা কুরআনী বিধান চৌদ্দশ বছর আগেই নিশ্চিত করেছে। বর্তমান সমাজ যেহেতু কুরআনী শিক্ষা ও বিধান থেকে দূরে এজন্য এ সমাজে উপহাস, তাচ্ছিল্য, কটক্তি, মিথ্যা অপবাদ, পরনিন্দা ইত্যাদির ব্যাপক চর্চা ও বিস্তার রয়েছে। এসকল অন্যায় শুধু নারীর প্রতিই করা হয় না পুরুষের প্রতিও হয়ে থাকে। এবং শুধু একশ্রেণির নারীর প্রতিই হয় না সব শ্রেণির নারীর প্রতিই হয়ে থাকে। এখানে আমি দ্বীনদার ইসলামী বিধানের অনুসারী পুরুষের কথা বিশেষভাবে বলব, এই সমাজে তারা কত উপহাস, তাচ্ছিল্য, মিথ্যা অপবাদ ও পীড়নের শিকার! দ্বীনদার, পর্দানশীন নারীগণও নানা কটক্তি ও তাচ্ছিল্যের শিকার- জঙ্গি, গোঁড়া, মৌলবাদী, কট্টরপন্থী- আরও কত উপাধী তাদের শুনে যেতে হয় শুধু হিজাব-নিকাব ধারণের কারণে। সুতরাং শুধু ভার্সিটি বা হলে থাকলেই মেয়েদের সম্পর্কে কটক্তি করা হয় বিষয়টা এমন নয়। হিজাব-নিকাব ধারণ করলেও এবং সমাজের গলিত গড্ডালিকায় ভেসে না গেলেও কটক্তি করা হয়। সুতরাং সমাজকে সভ্য সুন্দর করতে হলে সমাজ-চিন্তকদের পক্ষপাতদুষ্ট বা একদেশদর্শী চিন্তা-ধারা পরিহার করতে হবে এবং সাধারণভাবে সবধরনের অন্যায়-পীড়নের মানসিকতা থেকেই সমাজ-সদস্যদের মুক্ত হতে হবে। এক্ষেত্রে নারী-পুরুষে বা নারীতে-নারীতে পার্থক্য বা বৈষম্যের কোনো অবকাশ নেই।

সূরায়ে হুজুরাতের উপরোক্ত আয়াতগুলোতে এবং কুরআন-সুন্নাহর আরো বহু জায়গায় এই শিক্ষা ও বিধান পরিষ্কারভাবে রয়েছে। এরই চর্চা ও প্রতিষ্ঠা এখন বড় প্রয়োজন।

দুই.

ভালো-খারাপ শব্দ দুটি মন্তব্য ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়। মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রধান শর্ত, মন্তব্যটি জ্ঞানভিত্তিক হওয়া এবং বাস্তবসম্মত ও ন্যায়ানুগ হওয়া। জ্ঞানভিত্তিক না হলে তা হয় মনগড়া বা ধারণাপ্রসূত মন্তব্য আর বাস্তবসম্মত ও ন্যায়ানুগ না হলে তা হয় অন্যায় ও অবাস্তব মন্তব্য। মূল্যায়নের শব্দে বা শিরোনামে হলেও এগুলো আসলে উপহাস, পীড়ন, অবিচার ও সত্যের অপলাপ যে সম্পর্কে ইতিপূর্বে কিছু আলোচনা করা হয়েছে।

মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও কিছু সাধারণ কথা মনে রাখা দরকার যার মধ্য থেকে দুটি কথা এখানে আলোচনা করছি।

প্রথম কথা : কর্মের মূল্যায়ন ও ব্যক্তির মূল্যায়ন এক নয়।

এক হচ্ছে কোনো একটি বিশেষ কর্ম বা অবস্থার মূল্যায়ন, আরেক হচ্ছে সমগ্র ব্যক্তিটির মূল্যায়ন।  ব্যক্তির কোনো একটি কাজ অগ্রহণযোগ্য হলেই ব্যক্তিটিকে অগ্রহণযোগ্য বলা বৈধ হয়ে যায় না। অর্থাৎ কাজটি ভালো নয়আর ব্যক্তিটি ভালো নয়- এই দুটি এক কথা নয়। এমন খুব হতে পারে যে, ‘কাজটি ভালো নয়বলা গেলেও ঐ কারণে ব্যক্তিটি ভালো নয়বলা যায় না।

এ প্রসঙ্গে অনেক উদ্ধৃতিই দেয়া যায়। এই মুহূর্তে আমি শুধু একজন মনীষীর উদ্ধৃতি এখানে তুলে ধরছি।

ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইদরীস আশ শাফেয়ী রাহ. বলেন, এমন কে আছে যার আনুগত্যের সাথে কিছু না কিছু অবাধ্যতা নেই- সুতরাং

إذا كان الأغلب الطاعة فهو المعدل وإذا كان الأغلب المعصية فهو المجرح.

সুতরাং যার (কর্ম ও জীবনে) আনুগত্যের প্রাধান্য তিনি বিশ্বস্তআর যার জীবন ও কর্মে নাফরমানীর প্রাধান্য সে অবিশ্বস্ত-আল কিফায়াহ ফী ইলমির রিওয়ায়াহ ৭৯ আসসুনানুল কুবরা বাইহাকী ১০

ইমাম শাফেয়ী রাহ. যদিও একথা একটি বিশেষ শাস্ত্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলেছেন কিন্তু এর অন্তনির্হিত বাণী ও যুক্তিটি সাধারণ। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে সাধারণ ও সামগ্রিক মূল্যায়ন হয় তার গোটা কর্ম ও জীবনের ভিত্তিতে। সেখানে ভালোর প্রাধান্য হলে ব্যক্তিটি ভালো যদিও তার কিছু দোষ-ত্রুটি রয়েছে। আর সেখানে মন্দের প্রাধান্য হলে ব্যক্তিটি মন্দ যদিও তার কিছু গুণ ও বিশিষ্টতা রয়েছে।

তাহলে বিশেষ কোনো কর্ম, আচরণ বা অবস্থাকে ভালোবা মন্দবলা এক কথা আর কোনো ব্যক্তিকে ভালোবা মন্দউপাধীতে আখ্যায়িত করা সম্পূর্ণ আলাদা কথা।

তবে হ্যাঁ, এখানে আরেকটি দিকও রয়েছে। আর তা হচ্ছে, ভাষার ব্যবহারে অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণশব্দ প্রয়োগ করে বিশেষঅর্থ গ্রহণ করা হয়। যেমন ভালো-মন্দ শব্দ দুটি সাধারণ হলেও কারো প্রয়োগে এর অর্থ হতে পারে সচ্চরিত্র’ ‘দুশ্চরিত্র। আগেই বলা হয়েছে নিশ্চিতভাবে কারো সচ্চরিত্র বা দুশ্চরিত্র হওয়া জানা না থাকলে এ শব্দের প্রয়োগ মিথ্যা। আর জানা থাকলেও তা প্রয়োগ করা যাবে কিনা, গেলে কোন ক্ষেত্রে করা যাবে, কী কী শর্তে করা যাবে সেটাও এক আলাদা প্রশ্ন।

তো ভালো-খারাপ শব্দ দুটি যে অর্থেই প্রয়োগ করা হোক প্রয়োগটি মূল্যায়নহওয়ার জন্য যথার্থ জ্ঞান ভিত্তিক হওয়া জরুরি। অন্যথায় তা কটক্তি ও অন্যায় বলেই সাব্যস্ত হবে।

দ্বিতীয় কথা : কর্ম ও বিশ্বাস ব্যক্তি থেকে আলাদাও নয়

তাহলে ব্যক্তির মূল্যায়ন ও কর্মের মূল্যায়ন এক কথা নয়। এবং বিশেষ কোনো একটি কর্ম ভালো না হওয়ার কারণেই সমগ্র ব্যক্তিটিকে ভালো নয়বলে দেওয়া ন্যায়সংগত নয়। তবে একই সাথে এ-ও তো অনস্বীকার্য যে, ব্যক্তির ভালো ও মন্দ অবশেষে কর্মের ভালো ও মন্দের দ্বারাই নির্ধারিত হয়। একটি বিশেষ কর্ম যদিও ব্যক্তির সবটা নয় কিন্তু তা ব্যক্তি থেকে আলাদাও নয়। সুতরাং এ তো একটিমাত্র কর্ম- একথা বলে অবহেলারও অবকাশ নেই।

অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, পোষাকের বিষয়ে বলা হয়, ‘পোষাক দ্বারা ব্যক্তির ভালো-মন্দ নির্ধারিত হয় না।খাঁটি কথা। কিন্তু পোষাককি ব্যক্তির কর্ম ও জীবনের অংশ নয়? ব্যক্তির চিন্তা ও কর্ম, বিশ্বাস ও মূল্যবোধের সাথে পোষাকের কি কোনোই সম্পর্ক নেই? তাহলে শুধু পোষাক দ্বারা ব্যক্তির ভালো-মন্দ নির্ধারিত হয় না- একথা যেমন সত্য তেমনি পোষাককে ভালো-মন্দ থেকে একেবারে আলাদাও করা যায় না- একথাও সত্য। বিশেষ পোষাকের প্রতি বিশেষ শ্রেণির মানুষের অনুরাগ-বিরাগও এক বাস্তব ব্যাপার। সুতরাং পোষাকে কী আসে যায়এমনটা বলার অবকাশ নেই। পোষাকে আসলে অনেক কিছুই আসে যায়। আর একারণেই পোষাক নিয়ে এত তর্ক-বিতর্ক এবং বিশেষ ধরনের পোষাকের প্রতিষ্ঠা বা প্রতিরোধ নিয়ে সকল পক্ষের এত মাথা ব্যাথা!

পরিবেশ ও প্রতিবেশ সম্পর্কেও কারো মনে হতে পারে, এতে কী আসে যায়। নিজে ভালো তো জগৎ ভালো। কিন্তু সত্যিই কি তাই? সঙ্গ ও পরিবেশ কি ব্যক্তির চিন্তা ও কর্ম-গঠনে কোনোই ভমিকা রাখে না? পরিবেশের অনুকলতা ও প্রতিকলতার কি কোনোই প্রভাব নেই মানবের কর্ম ও চিন্তার ক্ষেত্রে? ভালো-মন্দই শুধু নয়, ভালো-মন্দ বিচারের মানদণ্ডও তো গঠিত ও পরিবর্তিত হয় সঙ্গ ও পরিবেশের কারণে।

সুতরাং জীবনের খণ্ড ণ্ড নানা অনুষঙ্গ, আমরা হয়তো আলাদাভাবে প্রত্যেকটি সম্পর্কেই বলব, এটি ব্যক্তির ভালো-মন্দের নির্ধারক নয়, কিন্তু কথাটিকে ভুলভাবে বুঝলে বা ভুল ব্যাখ্যা করলে তো চলবে না। ভালো-মন্দের নির্ধারক নয় মানে একমাত্র নির্ধারক নয়। ভালো-মন্দ গঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে এর কোনোই ভমিকা নেই- তা নয়।

এই খণ্ডগুলোর কোনোটিরই যদি ভালো-মন্দ নির্ধারণে ভমিকা না থাকে তাহলে ভালো-মন্দ নির্ধারিত হয় আসলে কীসের দ্বারা? এই খণ্ডগুলোর সমষ্টিই যখন ভালো-মন্দের নির্ধারক তখন খণ্ডগুলোর কোনো ভূমিকাই নেই একথা কীভাবে যুক্তিসঙ্গত হয়?

এটা একটা কৌশল যে, ইসলামের যে বিধান কেউ মানতে চায় না সে ঐ বিধানটি ইসলামের বিধান-সমগ্রের অংশবিশেষ হওয়ার সুবিধাগ্রহণে প্রয়াসী হয়। তাই বলতে শোনা যায়, ‘লেবাসেই কি ইসলাম?’ ‘দাড়িতেই কি ইসলাম?’ হক কথা। কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তরে প্রথম প্রশ্ন হল, কেউ কি বলেছে, দাড়ি-টুপিই সমগ্র ইসলাম? নিঃসন্দেহে দাড়ি-টুপি সমগ্র ইসলাম নয়। কিন্তু ইসলামের অংশও কি নয়? সমগ্র ইসলাম তো সমগ্রহয়েছে এই একটি একটি অংশ নিয়েই। তো এই সবগুলো অংশের বাইরে আলাদা করে সমগ্র ইসলামকোথায় পাওয়া যাবে শুনি!

একইভাবে ইসলামের যে বিধানের বিপরীত বিষয়টি কেউ সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় তাদেরও অপকৌশল, বিষয়টি কর্ম ও জীবনের অংশবিশেষ হওয়ার অন্যায় সুবিধা গ্রহণ। সুতরাং প্রশ্ন, ‘পর্দা না মানাটাই কি ভালো-মন্দের নির্ধারক?’ না, পর্দা না মানাটাই ভালো-মন্দের নির্ধারক নয়, তবে হ্যাঁ, পর্দা না-মানাটাও ভালো-মন্দের নির্ধারক। কারণ যে কর্মসমগ্র ব্যক্তির ভালো-মন্দ নির্ধারণ করে এটি তারই অংশবিশেষ।

তিন.

নারী-প্রসঙ্গে ইসলামের যে বিধানগুলো কটক্তি ও মিথ্যাচারের লক্ষ্য, পর্দা-বিধান ও পরিবার-ব্যবস্থা তার অন্যতম। পর্দার কুরআনী বিধানকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নারীর প্রতি বৈষম্য, অবরোধ ইত্যাদি নানা ভাষায় উপস্থিত করা হয়। এখানে শুধু এটুকু বলা প্রাসঙ্গিক যে, এটি পর্দা-বিধানের সঠিক মূল্যায়ন নয়; বরং মিথ্যাচার ও অপব্যাখ্যা। এই অপব্যাখ্যার এক কারণ, পর্দাহীনতার সংস্কৃতির প্রতি বিশেষ পক্ষপাত, আরেক কারণ পর্দা-বিধান সম্পর্কে সঠিক ও সম্পূর্ণ ধারণার অভাব। পর্দা-বিধান সম্পর্কে মৌলিক দুটি বিষয় লক্ষ্য করলে এই অপব্যাখ্যা বোঝা সহজ হতে পারে।

এক. ইসলামে পর্দার বিধান শুধু নারীর প্রতি নয়; নারী ও পুরুষ উভয়ের প্রতি। দুই. এই বিধানের উদ্দেশ্য, নারী ও পুরুষ উভয়ের হৃদয় ও চরিত্রের পবিত্রতা।

পর্দা-বিধানের বিভিন্ন অংশ কুরআন মাজীদের বিভিন্ন আয়াতে এসেছে। এ আয়াতগুলোতে শুধু নারীকে সম্বোধন করা হয়নি, নারী-পুরুষ উভয়কেই সম্বোধন করা হয়েছে।

সূরাতুন নূরে ইরশাদ হয়েছে-

(তরজমা) মুমিন (পুরুষ)দের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে; এটা তাদের জন্য উত্তম। আল্লাহ তাআলা তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে সম্যক অবগত।

মুমিন(নারী)দের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে। তারা যেন যা সাধারণত প্রকাশ থাকে তা ছাড়া তাদের আভরণ প্রদর্শন না করে। তাদের গ্রীবা ও বক্ষদেশ যেন মাথার কাপড় দ্বারা আবৃত করে...। সূরাতুন নূর (২৪) : ৩০-৩১

সূরাতুল আহযাবে ইরশাদ হয়েছে- তোমরা (পুরুষেরা) তাঁহার (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর) স্ত্রীদের কাছে কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাবে। এই বিধান তোমাদের ও তাদের হৃদয়ের জন্য অধিকতর পবিত্র। -সূরা আহযাব (৩৩) : ৫৩

এখানেও পর্দার বিষয়ে পুরুষকে সম্বোধন করা হয়েছে। আর পর্দার বিধানের উদ্দেশ্যও স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, এটি নারী-পুরুষ উভয়ের হৃদয়ের পবিত্রতার উপায়।

তো যারা পর্দা-বিধানের বিরুদ্ধে বলতে চান তারা পরিষ্কার ভাষায় একথা বলে দিলেই সততা রক্ষা হয় যে, হৃদয় ও চরিত্রের পবিত্রতা খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। এটা রক্ষা না হলেও তেমন কিছু যায় আসে না। ইচ্ছাপূরণ ও প্রবৃত্তিপরায়ণতাই জীবনে মুখ্য ব্যাপার। কিন্তু এ না বলে চরিত্র ও হৃদয়ের পবিত্রতার উদ্দেশ্যে যে বিধান দেওয়া হয়েছে এবং জীবন ও জগতের অসংখ্য ঘটনা ও ঘটনাধারা যার যথার্থতার জীবন্ত সাক্ষী সে সম্পর্কে একথা বলা যে, এই বিধান নারীকে অবরুদ্ধ ও অবদমিত করার জন্য- এ নিঃসন্দেহে কপটতা ও প্রতারণা। তো পর্দা বিধানের দুটি মৌলিক দিক, অর্থাৎ পর্দার বিধান শুধু নারীর জন্য নয়, নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য আর এই বিধানের উদ্দেশ্য নারী ও পুরুষ উভয়ের হৃদয় ও চরিত্রের পবিত্রতা বিধান, মনে রাখলে ঐ মিথ্যাচারের স্বরূপ উন্মোচিত হয়ে যাবে। তবে হ্যাঁ, নারী ও পুরুষের সৃষ্টিগত ও প্রকৃতিগত পার্থক্যের কারণেই পর্দা-বিধানের প্রায়োগিক কিছু ক্ষেত্রে পার্থক্য হয়েছে। সেখানেও উদ্দেশ্য নারীর সুরক্ষা ও পবিত্রতা।

সূরা আহযাবেই নারীকে এই বিধান দেওয়া হয়েছে যে, ‘আর তোমরা (নারীরা) স্বগৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাচীন যুগের মতো নিজেদেরকে প্রদর্শন করে বেড়াবে না। তোমরা সালাত কায়েম করবে, যাকাত প্রদান করবে এবং আল্লাহ ও তার রাসূলের অনুগত থাকবে। হে নবী-পরিবার! আল্লাহ তো শুধু চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে। -সূরা আহযাব (৩৩) : ৩৩

এখানেও পর্দা-বিধানের উদ্দেশ্য পরিষ্কারভাবে উল্লেখিত হয়েছে। আসলে নারী-মুক্তি, নারীর মর্যাদা - এগুলো বাহানামাত্র। নারী পর্দার মাঝেও আপন কর্মে ও মর্যাদায় ভাস্বর থাকতে পারেন, এখনও যার উদাহরণ একেবারে কম নয়। অন্যদিকে পর্দাহীনতার মাঝেও এবং পর্দাহীনতার কারণেও নানাবিধ দমন-পীড়ন, লাঞ্ছনার শিকার হতে পারেন, যার প্রমাণ চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানোর প্রয়োজন নেই। এটি এখন সমাজ-জীবনের এক প্রাত্যহিকতা।

ইসলামী আদর্শে চারিত্রিক ও মানসিক পবিত্রতা এক অতি প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ। ব্যক্তি-জীবনে ও সমাজ-জীবনে এর অনুশীলন ও প্রতিষ্ঠা ইসলামের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। পক্ষান্তরে পশ্চিমা ভোগবাদী জীবন-দর্শনে স্বেচ্ছাচার ও প্রবৃত্তি-পরায়ণতাই মুখ্য। নৈতিকতা, পবিত্রতা, পরিণামের শুভ-অশুভ, কল্যাণ-অকল্যাণ সবই গৌণ। কে না জানে এখানে নৈতিকতা গৌণ বিত্ত ও প্রতিষ্ঠার কাছে। পবিত্রতা গৌণ ভোগ ও লালসাপূরণের কাছে আর পরিণামের ভালো-মন্দ গৌণ তাৎক্ষণিক ইচ্ছাপূরণের কাছে। সুতরাং আসল প্রশ্ন নারীর অবরুদ্ধতা ও মুক্তির নয়, নারী-পুরুষের চারিত্রিক সুস্থতার মুখ্যতা ও গৌণতার। আর এ তো একান্তই শঠতা ও কপটতা যে, স্বেচ্ছাচার ও প্রবৃত্তিপরায়ণতার শিরোনাম হয়ে দাঁড়িয়েছে, ‘ব্যক্তি-স্বাধীনতা

একই কথা পারিবারিক বন্ধনের ক্ষেত্রেও। ইসলামের পরিবার-ব্যবস্থায় নারী-পুরুষ পরস্পরের প্রতিপক্ষও নয়, শোষক ও শোষিতও নয়; বরং একে অন্যের সহযাত্রী ও পরিপূরক । পারিবারিক বন্ধনের উদ্দেশ্য, পরষ্পরের স্বাভাবিক কামনা-বাসনা পূরণের এবং আবেগ-অনুভতি প্রকাশের একটি মানবোচিত শৃঙ্খলা ও শালীনতাপূর্ণ ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যত বংশধরের পরিচয় ও সম্বন্ধ রক্ষা, যা মানুষকে স্বভাবগতভাবেই দায়িত্বশীল ও ¯œহশীল করে এবং যার প্রভাবে ভাবী সমাজের শৈশবের জন্য মমতা ও দায়িত্বশীলতার এবং আশ্রয় ও আপনত্বের এক সুশীতল বাতাবরণ তৈরি হয়, যার ছায়ায় ধীরে ধীরে অঙ্কুরিত ও বিকশিত হয় সততা ও সত্যবাদিতা, সাহস ও সংযম এবং শৃঙ্খলা ও কর্মমুখিতা। এই নির্মাণ ও কল্যাণের পথে নারী-পুরুষ একে অন্যের সহযাত্রী- তাই এদের মাঝে অতি প্রয়োজন বিশ্বাস ও বিশ্বস্ততার, আনুগত্য ও নির্ভরশীলতার এবং সুরক্ষা ও অভিভাবকত্বের এক স্থায়ী ও অটুট বন্ধন। পক্ষান্তরে পশ্চিমা পুঁজিবাদ ও ভোগবাদে অবাধ ইচ্ছাপূরণের কাছে এবং নারী-পুরুষের সকল কর্মশক্তিকে পণ্যে পরিণত করার অন্যায় ব্যবস্থার কাছে শৃঙ্খলা, সংযম, বংশ-পরিচয় কোনো কিছুই গুরুত্বপূর্ণ নয়, এমনকি সমাজ ও মানবতার চরম ক্ষয় ও অবক্ষয়ও গুরুত্বপূর্ণ নয়। সুতরাং পারিবারিক বন্ধন মমতা, দায়িত্বশীলতা এবং নীতি ও সংযমের বন্ধন নয়, অবাধ ইচ্ছাপূরণের পথে এবং নারী-পুরুষের সকল কর্মশক্তিকে ডলারেরূপান্তরিত করার পথে এক বিরক্তিকর বাধা। এ হচ্ছে একদিক। আরেক দিক হচ্ছে, ভোগবাদী পশ্চিম স্বভাব-প্রকৃতির সাথে মল্লযুদ্ধে আজ চরম পর্যুদস্ত। পক্ষান্তরে মুসলিম-সমাজ শত দুর্বলতা সত্তে¡ও পারিবারিক বন্ধনের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই নিরাপদ ও মহিমান্বিত। এই সমাজকে চড়ান্তভাবে বিপর্যস্ত ও অধীনস্ত করতে হলে পারিবারিক বন্ধনটি চুরমার করে দেওয়ার অতিপ্রয়োজন। সুতরাং পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানটির দুই প্রধান স্তম্ভ -স্বামী ও স্ত্রীকে একে অপরের প্রতিপক্ষ করে তোলার এবং অন্যায় অহমিকা, অবাস্তব ভাবাবেগ ও পরষ্পরের প্রতি তাচ্ছিল্য ও অশ্রদ্ধার বিস্তার ঘটানোর নানা প্রয়াস। ফলে একই ছাদের নীচে জীবন যাপন করেও দুজন পূর্ণাঙ্গ নারী ও পুরুষ পূর্ণ বিকশিত নারীত্ব ও পুরুষত্বের অধিকারী হয়েও একে অপরের প্রতি বিরক্ত ও বীতশ্রদ্ধ। অথচ এই নারীর নারীত্বই পরম উপভোগ্য অন্য পুরুষের কাছে এবং এই পুরুষটিই পরম প্রার্থনীয় অন্য নারীর কাছে!

এবং একটি পরিবারের মহিমাপূর্ণ যাবতীয় অনুষঙ্গ- প্রেম, ভালবাসা, সেবা-সহমর্মিতা, আনুগত্য ও অভিভাবকত্ব এগুলোর আদান-প্রদান যখন স্বামী-স্ত্রীর মাঝে তখন তা স্বার্থবাদ ও পুরুষতান্ত্রিকতা, পক্ষান্তরে এসবেরই আদান-প্রদান যখন পরপুরুষ ও পরনারীর মাঝে তখনই তা ব্যক্তি-স্বাধীনতা ও নারীমুক্তি!!

সুতরাং উপাদানের পরিবর্তন নয়, মর্যাদা বা অবস্থানেরও পরিবর্তন নয়, শুধু পাত্র ও পদ্ধতির পরিবর্তনেই স্বার্থবাদ ও পুরুষতান্ত্রিকতা থেকে ব্যক্তি-স্বাধীনতা ও নারী-মুক্তিতে উত্তরণ!! তাহলে বাস্তব অর্থে পুরুষতান্ত্রিকতা বা নারী-মুক্তি মুখ্য বিষয় নয়। মুখ্য হচ্ছে ভোগ ও স্বেচ্ছাচারের অবাধ স্বাধীনতা। অতএব পরিবার একটি দায়িত্ব ও ভালবাসার বন্ধননয়, ইচ্ছাপূরণ ও প্রবৃত্তিপরায়ণতার পথে এক উৎকট বাধা। আর একারণেই পুরুষতান্ত্রিকতার জোর সমালোচনা এবং নারী-মুক্তির জোরালো আহ্বান।

চার.

স্বামীর সেবাকথাটি এখন এক দাহ্য পদার্থ। যা শ্রবণমাত্র হৃদয় ও মস্তিষ্কে দহন ও ক্ষরণের সূচনা ঘটে যায়। তবে এই আগুনে শব্দটি ব্যবহার করছি একথা বলার জন্য যে, ‘স্বামীর সেবার যে রূপ ও ধারণা আমাদের সমাজে প্রচলিত তার সবটাই ইসলামীনয়। এর অনেক কিছুই তুর্কিস্তানীহিন্দুস্তানী। এই যে স্বামীশব্দটি এর অর্থ খাঁটিবাঙ্গলা অভিধানে দেখছি, পতি, ভর্তা, প্রভু, মনিব; অধিপতি, মালিক (গৃহস্বামী, স্বামী); ... বি. স্বামিত্ব-মালিকানা (স্বত্ব-স্বামিত্ব) -সংসদ বাঙ্গলা অভিধান

এটি বাংলা ভাষার সুপ্রাচীন ও সুপ্রচলিত শব্দ। আরবী ভাষায় এবং কুরআন-সুন্নাহর ব্যবহারে স্বামী-স্ত্রী অর্থে যে শব্দটি সাধারণভাবে ব্যবহৃত তা হচ্ছে, زوج (যাওজ)। এর অর্থ এক জোড়া বস্তুর একটি বা যুগলের একজন। জোড়াবা যুগলের প্রত্যেকে একে অপরের যাওজ। তাহলে দেখা যাচ্ছে, কুরআন-সুন্নাহর শব্দে প্রভুত্ব ও মালিকানা নয়, সঙ্গী ও পরিপূরক হওয়ার অর্থই প্রকাশিত। পরিবার ও পরিবারের সদস্যদের পারস্পরিক সম্বন্ধের যে ইসলামী ধারণা তাতেও উপরোক্ত ভাবই প্রকাশিত।

ইসলামে পরিবার একটি প্রতিষ্ঠান। আর যে কোনো প্রতিষ্ঠানেই একজন আমীর বা কর্তা আবশ্যক, নতুবা ঐ প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা থাকে না। পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানটির আমীর বা কর্তা হচ্ছেন পুরুষ। যার কর্তব্য, পরিবারের সদস্যদের ভরণ-পোষণের ভার বহন করা এবং তাদের সুপথে পরিচালনার দায়িত্ব পালন করা। পক্ষান্তরে পরিবারের সদস্যদের কর্তব্য, আমীরের আনুগত্য করা এবং তার প্রতি বিশ্বস্ত ও ওফাদার থাকা। এই পারস্পরিক সম্বন্ধে অসম্মান-অমর্যাদার কিছু নেই, নতুবা জগতের কেউই মর্যাদাবান নয়। কারণ নারী-পুরুষ নির্বিশেষে জগতের সকল মানুষই একক্ষেত্রে আমীর বা কর্তা, অন্য ক্ষেত্রে মামুর বা অধীনস্ত। ইসলামে এই আমীর-মামুরের দর্শন, শুধু স্বামী-স্ত্রী বা নারী-পুরুষের ক্ষেত্রে নয়, জীবনের সকল ক্ষেত্রে। যেখানেই দুজন মানুষের সামষ্টিক কর্ম সেখানেই রয়েছে আমীর ও মামুরের শিক্ষা। ইসলামের শৃঙ্খলাপ্রিয়তার এ এক উদাহরণ।

তো পারিবারিক জীবনের ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে সেবার চেয়ে বড় কথা বিশ্বস্ততা ও আনুগত্য। আর সেবা তো মানব-জীবনের এক সাধারণ ও মহিমান্বিত বিষয়। এখানে ছোট-বড়, নারী-পুরুষের কোনো স্তরভেদ নেই। ছোট যেমন বড়র সেবা করতে পারে তেমনি বড়ও পারেন ছোটর সেবা করতে। এতে কারোরই মর্যাদাহানী ঘটে না। ছোটর সেবা ছোটকে করে প্রিয়পাত্র ও নিকটতর আর বড়র সেবা বড়কে করে মহিমান্বিত ও সমুন্নত।

মা সন্তানকে তার প্রিয় খাবারটি রেধে খাওয়ান। এর কোনো তুলনা কি পৃথিবীতে আছে? আদরের ছোট বোনের হাতের রান্না যে অন্তত একবার খায়নি তার ইহ-জীবনের কমসে কম চার আনাই মিছে। আর দাদী-নানীর হাতে বানানো গরম গরম ভাপা পিঠের স্মৃতি তো মনে থাকে নিজে দাদু-নানু হওয়া পর্যন্ত! তো এই নশ্বর পৃথিবীতে অর্থপূর্ণ ও মহিমাপূর্ণ যে কয়টি জিনিস রয়েছে তার একটি হচ্ছে  সেবা। এই অপার্থিব সমুজ্জল জিনিসটি চরম পার্থিবতায় পর্যবসিত হয়ে পড়ে যেসকল কারণে তার দুটো এখানে উল্লেখ করছি : এক. যখন তা জোরপূর্বক আদায়ের চেষ্টা করা হয়। আর দুই. যখন এই খাঁটি বেহেশতী জিনিসটির অপব্যাখ্যা করা হয়।

এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আমাদের মাঝে এমন পুরুষের কোনো অভাব নেই যারা স্ত্রীর কাছ থেকে স্বামীর সেবাজোর করে আদায় করতে চায়। হায়, ঐ মূর্খের জানা নেই, তখন এই  সেবাআর ভালোবাসার লাল গোলাবটি থাকে না নিতান্তই জীবিকার তাগিদে গাঁথা গাঁদা ফুলের মালা হয়ে যায়। একইভাবে এমন হীন প্রবৃত্তির পুরুষ ও হীনম্মন্যতাগ্রস্ত নারীর সংখ্যাও কম নয় যারা ঐ খাঁটি বেহেশতী গোলাবটিকেও শাহবাগী গাঁদা ফুলমনে করে নিজের হীনতা ও রিক্ততার পরিচয়টি নিজের অজান্তেই প্রকাশ করে ফেলে।

পাঁচ.

মূল প্রসঙ্গ থেকে কিছুটা দূরে সরে এসেছি। কথা হচ্ছিল, বিশেষ কোনো কর্ম দ্বারাই সমগ্র ব্যক্তির মূল্যায়ন যদিও সঠিক নয় কিন্তু অবশেষে কর্ম ও বিশ্বাস দ্বারাই ব্যক্তির ভালো-মন্দ নির্ধারিত হয়। এখন এ প্রশ্ন আসে যে, কর্মের ভালো-মন্দ তাহলে নির্ধারিত হয় কীসের দ্বারা? অর্থাৎ কোন কাজ ভালো বা করণীয় আর কোন কাজ মন্দ বা বর্জনীয় তা নির্ধারণের মানদণ্ড কী? এটাই আসলে মূল প্রশ্ন। এরই জন্য আসলে এত কিছু। এই প্রশ্নের উত্তরে যদি বলা হয়, মানবই নির্ধারণ করবে তার করণীয় ও বর্জনীয় তাহলে তা শুনতে যতই মধুর শোনাক একে তো সেটা বাস্তবসম্মত হবে না দ্বিতীয়ত এতে কোনো বিবাদের মিমাংসা হবে না। মানব-বুদ্ধি খুব সীমাবদ্ধ ক্ষেত্রে করণীয়-বর্জনীয় নির্ধারণ করতে পারে। তবে এর জন্যও প্রয়োজন হয় অনেক কিছুর সহযোগিতা। তবে মানব-বুদ্ধি খুব পরিষ্কারভাবে এই সিদ্ধান্ত দেয় যে, সকল করণীয়-বর্জনীয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ মানবকে খুব অল্পই জ্ঞান দেওয়া হয়েছে। এই বিশ্ব জগতের খুবই ক্ষুদ্র এক সৃষ্টি মানব। কে তার স্রষ্টা, কী তাঁর পরিচয় আর কীভাবে ও কী উদ্দেশ্যে মানবের ও বিশ্বজগতের সৃজন-বর্ধন আর সে হিসেবে তার করণীয় কী আর কীভাবেই বা তা সম্পন্ন হবে- এ সকল বিষয়ে মানব-বুদ্ধি সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত দানে অক্ষম। তদ্রূপ কী তার পরিণাম, কোথায় তার গন্তব্য এবং সে হিসেবে কী তার করণীয় তা-ও মানবীয় জ্ঞানের ঊর্ধ্বে। জ্ঞানের স্বল্পতা, দৃষ্টির সীমাবদ্ধতা ও নানাবিধ মানবীয় দুর্বলতা সত্তে¡ও যদি করণীয়-বর্জনীয় নির্ধারণের ভার এককভাবে মানবের ইচ্ছার উপরই অর্পণ করা হয় তাহলে চিন্তা ও কর্মের যে অরাজকতা সৃষ্টি হবে তার যথার্থ-প্রতিনিধিত্ব হচ্ছে এই বাক্যের মধ্য দিয়ে যে, ‘ভালো ও মন্দ একান্তই আপেক্ষিক ব্যাপার। অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে ভালো ও মন্দ বলতে আসলে কিছু নেই! মানবের চিন্তা ও বুদ্ধির অক্ষমতার এর চেয়ে বড় স্বীকারোক্তি আর কী হতে পারে?

একারণে মানবের প্রতি মানব-স্রষ্টার সবচেয়ে বড় দান হচ্ছে, ঈমান। ঈমান বলে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানবের প্রভু। তিনিই স্রষ্টা এবং তাঁরই কাছে মানুষের জবাবদিহিতা। সুতরাং তিনিই নির্ধারণকারী মানবের করণীয় ও বর্জনীয়। ঈমানদারের কাছে তাই দ্বীন ও শরীয়তই হচ্ছে করণীয়-বর্জনীয় এবং ভালো ও মন্দের মাপকাঠি। এ আমাদের ঈমানের দুর্বলতা যে, বস্তুবাদী, ইন্দ্রিয়পূজারী  গেষ্ঠী মুমিনের সমাজে ভালো-মন্দের মাপকাঠি নিয়েও প্রশ্ন তোলার ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর প্রয়াস পায়। বলাবাহুল্য, আমাদের ঈমান ও বিশ্বাস যত দুর্বল হবে এ জাতীয় ফিৎনা ততই শক্তি সঞ্চয় করবে। একারণে আমাদের অতি গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য, নিজ নিজ ঈমানের বিষয়ে সতর্ক হওয়া এবং ঈমানকে শক্তিশালী করার সযত্ন প্রয়াস গ্রহণ করা।

ছয়.

ভালো ও মন্দ নিয়ে বা ভালো-মন্দের মাপকাঠি নিয়ে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রপাগাণ্ড, আলোচনা ও প্রচার আসলে কেন? এটা এই জন্য যে, সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক আগ্রাসনের জন্য এর কোনো বিকল্প নেই। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষকে মন্দ চিহ্নিত করার এবং তা থেকে বেঁচে থাকার যে সকল উপায় দান করেছেন তার একটি হচ্ছে, বিবেকের বিচার। ব্যক্তির বিবেক ও সমাজের বিবেক। এ দুটো জিনিস মানুষকে মন্দ থেকে বিরত থাকতে সহায়তা করে। একটি হাদীসে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কত সুন্দরভাবে বলেছেন-

الْإِثْمُ مَا حَاكَ فِي صَدْرِكَ، وَكَرِهْتَ أَنْ يَطَّلِعَ عَلَيْهِ النَّاسُ

পাপ ঐ জিনিস যা তোমার অন্তরে বেধে আর মানুষ তা জানুক তা তুমি অপছন্দ কর।-সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৫৫৩

তাহলে বিবেকের দংশন ও সমাজের শাসন হচ্ছে এমন এক প্রয়োজনীয় বিষয় যা পাপের পথে এক বড় প্রতিবন্ধক। সুতরাং পাপের বিস্তার যদি ঘটাতে হয় তাহলে এক জরুরি কাজ, বিবেকের দংশন বিদায় করা ও সমাজের শাসন প্রতিহত করা। পক্ষান্তরে পাপের বিস্তার রোধের জন্য প্রয়োজন বিবেককে জাগ্রত করা, এবং তাকওয়া ও খোদাভীতি শক্তিশালী করা আর সমাজে আমর বিল মারূফ ও নাহী আনিল মুনকারের বিস্তার ঘটানো।

একারণে ইসলামের শত্রæপক্ষের এক সুচিন্তিত কর্ম-প্রয়াস এই যে, নানা সংবেদনশীল বিষয়কে অনুষঙ্গ বানিয়ে ব্যক্তির চিন্তা ও বিবেককে ভোগবাদী সমাজ-ব্যবস্থার অনুকল করা এবং সমাজের ঈমানী শাসনকে দুর্বল করা। এর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ভালো ও মন্দের মাপকাঠি বদল। মস্তিষ্ক যখন মন্দকেই ভালো মনে করবে তখন এই মন্দের কারণে তার মনে ধিক্কার ও অনুশোচনা জাগবে না। তেমনি সমাজের চোখেও যখন তা মন্দনয় তখন লোকলজ্জার পর্দাও থাকবে না। একারণে মুসলিমসমাজে আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ক্ষেত্রে মারূফ ও মুনকার তথা ভালো ও মন্দের ইসলামী ধারণা পরিবর্তনের প্রয়াস শত্রু-পক্ষের কর্ম ও তৎপরতার এক বড় ক্ষেত্র।

এই অপতৎপরতার সঠিক ও স্থায়ী জবাব হবে, সর্বস্তরে ঈমানী চেতনা, দ্বীনের প্রতি সমর্পন এবং ইসলামের মারূফ ও মুনকার সম্পর্কে সচেতনতার বিস্তার ঘটানো, সঠিক পন্থায় আমর বিল মারূফ ও নাহি আনিল মুনকারে তৎপর হওয়া এবং ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে দাওয়াতী মেহনত জোরদার করা।

ব্যক্তি ও সমাজে ইসলামের মারূফমুনকারসম্পর্কে সচেতনতা ও সমর্পণ সৃষ্টির জোরদার প্রয়াস এখন সময়ের বড় প্রয়োজন।

কৃতজ্ঞতা : এ লেখাটির প্রেরণা আমাদের প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ ভাই। মাসিক আলকাউসারের নির্বাহী সম্পাদক। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁকে সিহহত ও আফিয়াতের সাথে দাওয়াতের অঙ্গনে অনেক ভূমিকা রাখার তাওফীক দান করুন। আমীন ইয়া রাব্বাল আলামীন। 

আরও পড়ুন:   ইসলামের সৌন্দর্য-মাধুর্য | দ্বীনিয়াত

সম্মানিত পাঠক!
মাসিক আলকাউসারের ওয়েব পেজটির উন্নয়ন কাজ চলছে। তাই বর্তমান সংখ্যাটি হালনাগাদ করতে বিলম্ব হচ্ছে। আপনাদের সাময়িক অসুবিধার জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত।

হজ্ব এবং কুরবানী বিষয়ক প্রবন্ধসমূহ