রবিউল আউয়াল-রবিউস সানী ১৪৩৭ . জানুয়ারি ২০১৬

পুরোনো সংখ্যা . বর্ষ: ১২ . সংখ্যা: ০১

বিভিন্ন সম্প্রদায়ের উপাসনালয়ে হামলা প্রসঙ্গ

গত ২৫ ডিসেম্বর শুক্রবার দুপুরে রাজশাহীর বাগমারায় কাদিয়ানীদের উপাসনালয়ে আত্মঘাতী বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে, এ ঘটনায় বোমা হামলাকারী নিজে নিহত হয়েছে। আহত হয়েছেন কয়েকজন। এর আগে গত মুহাররম মাসে ঢাকার হোসনি দালান এবং বগুড়ার একটি গ্রামে শিয়াদের একটি ধর্মীয়স্থানে হামলার ঘটনায় কিছু লোক হতাহত হয়েছে। এজাতীয় হামলা এদেশে সম্ভবত এগুলোই প্রথম। ধরন, প্রেক্ষাপট ও পরবর্তী পরিস্থিতি-প্রতিক্রিয়ার কারণে এ হামলার প্রসঙ্গগুলো কিছু আলোচনার দাবি রাখে। সে হিসেবে এ আলোচনায় আমরা তিনটি প্রসঙ্গ নিয়ে কিছু আলোকপাতের চেষ্টা করব। প্রথম, মূল হামলার প্রসঙ্গ। দ্বিতীয়, যেসব সম্প্রদায়ের উপর হামলা করা হয়েছে তাদের পরিচিতি প্রসঙ্গ। তৃতীয়, এসব হামলার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও জনসাধারণের করণীয় প্রসঙ্গ।

হামলা প্রসঙ্গে কথা

প্রথমত হামলার মূল প্রসঙ্গটি নিয়ে আমাদের প্রধান কথা হচ্ছে, কোনো সংখ্যালঘু সম্প্রদায় কিংবা ইসলামের কোনো বিচ্যুত অথবা বের হয়ে যাওয়া উপদলের ধর্মীয় কেন্দ্র অথবা উপাসনালয়ে হামলা করা কোনোভাবেই শরীয়তসিদ্ধ কাজ নয়। কোনো মুসলমানের জন্যই এটা ইসলাম নির্দেশিত অথবা অনুমোদিত কোনো কাজ নয়। ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধরনের হামলা নিন্দনীয় ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

এ বিষয়ে দ্বিতীয় যে কথাটি প্রণিধানযোগ্য সেটি হচ্ছে, ইসলামের মূল জামাআত আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ। এই মূল জামাআতের বাইরে অতীতেও কোনো কোনো গ্রুপ ও উপদল সৃষ্টি হয়েছে। এটা নতুন কোনো বিষয় নয়। ইসলামী খিলাফাহ প্রতিষ্ঠিত থাকলে এজাতীয় ক্ষেত্রে করণীয় হলো, রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের বুঝানো এবং তাদেরকে সঠিক পথে আনতে সম্ভাব্য সব উপায় কাজে লাগানো। এরকমভাবে বর্তমানে হক্কানী আলেমদেরও দায়িত্ব, এদেরকে তাদের বিচ্যুতি থেকে হেদায়েতের চেষ্টা করা। বিশেষত সাধারণ মুসলমানদেরকে এ-জাতীয় বিভ্রান্ত ও বিচ্যুত উপদলের হাত থেকে আলেমগণ ওয়ায নসীহত, লেখালেখি এবং স্বীকৃত শান্তিপূর্ণ মাধ্যমগুলোর সাহায্যে বাঁচানোর চেষ্টা করবেন। এটা আলেমদের বিশেষ দায়িত্ব। কিন্তু কোনো ব্যক্তির জন্য এ ধরনের কোনো বিভ্রান্ত উপদলের ধর্মীয় স্থানে হামলা করার কোনো বিধান শরীয়তে নেই। সুতরাং ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এ-জাতীয় হামলার বিষয়টি খুবই স্পষ্ট।

তৃতীয় কথা হচ্ছে, সাম্প্রতিককালে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী কজন পাদ্রীকেও হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে। সেক্ষেত্রেও আমরা একই কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। কোনো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় কেন্দ্র, উপাসনালয় ও ব্যক্তির উপর হামলা করার অনুমতি ইসলামী শরীয়তে নেই। এ প্রসঙ্গে এ বিষয়টিও মনোযোগ দাবি করে যে দেশের বিভিন্ন এলাকা, গির্জা ও পাদ্রীদের পক্ষ থেকে দরিদ্র  মুসলিমদের মাঝে আর্থিক প্রলোভন দিয়ে খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত করার ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়টি খতিয়ে দেখা এবং এ সম্পর্কে আশু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে এ বিষয়টি অনাস্থা ও উত্তেজনার কারণ সব সময়ই জিইয়ে রাখতে পারে।

হামলা প্রসঙ্গে এবার চতুর্থ যে বিষয়টি উল্লেখ করা দরকার মনে হয়েছে সেটি হচ্ছে এ হামলার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি ও পেছনের কারণগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করা। হামলাগুলো আসলে কারা করছে- এ প্রশ্নটির উত্তর এবং এর পেছনে গভীর কোনো ষড়যন্ত্র আছে কি না- সেটিও তলিয়ে দেখা দরকার। কারণ, এদেশে এ-জাতীয় উপদলগত বিভ্রান্তি দূর করার ক্ষেত্রে আলেম ও দাঈ সমাজ শন্তিপূর্ণ উপায়ে দ্বীনী ওয়ায-নসীহত করার ধারা বহুদিন ধরে চালু রেখেছেন। এর জন্য কখনো কোনো উত্তেজনা ও সংঘাতের পরিবেশ তৈরি হয়নি। আলেম ও দাঈ সমাজও কখনো সেরকম কোনো কিছুর উস্কানি কিংবা প্রশ্রয়ও দেননি। শান্তিপূর্ণ উপায়ে সতর্কীকরণ ও হক বিষয়টি উপস্থাপনের কাজ তারা করে গেছেন ও করে যাচ্ছেন। এ-জাতীয় হামলা ও মারামারির ঘটনা এদেশে নজিরবিহীন। তাই এর পেছনে অন্য কোনো মহলের ষড়যন্ত্রমূলক কোনো অভিলাষ কাজ করছে কি না- সেটা গভীরভাবে যাচাই করে দেখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে কোনো কোনো মুসলিম দেশে পেছন থেকে এ-জাতীয় সংঘাত উস্কে দিয়ে পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর করার নজিরও আমাদের সামনে রয়েছে। তাই এ বিষয়টিতে রাষ্ট্রসহ সব মহলের পরিপূর্ণ সতর্কতা দরকার।

কাদিয়ানী পরিচিতি

এবার মূল আলোচনার দ্বিতীয় প্রসঙ্গটিতে আমরা যেতে পারি। যেসব সম্প্রদায়ের উপর হামলা হয়েছে তাদের কিছু পরিচিতি তুলে ধরছি। দেখা যাচ্ছে, কাদিয়ানী ও শিয়াদের উপাসনালয়ে হামলার পর অনেকে তাদের সম্পর্কে জানতেও চাচ্ছেন। তাদের পরিচিতিও এ দেশে অনেকের কাছে স্পষ্ট নেই। তাই তাদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি সাধারণ মুসলমানদের জন্য পেশ করা দরকার। অতি সম্প্রতি যাদের ওপর হামলা হেেছ তারা কাদিয়ানী সম্প্রদায়। পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে এদের মূল কেন্দ্র। এবং বিভিন্ন মুসলিম দেশ থেকে নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হওয়ার পর তাদের নেতারা ইংল্যান্ডে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে এবং সেখান থেকে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাহায্যে তাদের ধর্মীয় মতাদর্শের প্রচার করে থাকে। তারা নিজেদের আহমদীয়া মুসলিম জামাতবলে দাবি করে থাকে। কিন্তু সাধারণ মুসলমানদের কাছে এরা কাদিয়ানীনামেই পরিচিত। এ সম্প্রদায়টি কাদিয়ানের মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীকে তাদের নবী ও অনুসৃত ধর্মীয় নেতা মনে করে থাকে। এবং তার দেয়া বিধান মেনেই এরা জীবন যাপন করে। খতমে নবুওত সম্পর্কিত ইসলামের শাশ্বত ও অপরিহার্য বিধানকে এরা অস্বীকার করে। তাই সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, পাকিস্তানসহ বিশ্বের বহু রাষ্ট্রে আইন করে তাদেরকে অ-মুসলিম ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়াও দুনিয়াতে মুসলমানদের যত বড় বড় ইসলামী গবেষণাকেন্দ্র বা ফোরাম রয়েছে- যেমন ওআইসি ফিকাহ একাডেমী, রাবেতা ফিকাহ একাডেমী, দেওবন্দ, আলআযহার-এমন সব জায়গার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তারা ইসলাম থেকে খারিজ। অ-মুসলিম সম্প্রদায় বলে চিহ্নিত ও ঘোষিত হয়েছে। বহু দেশেই আইন করে তাদেরকে মুসলিম পরিচয় দেওয়া, তাদের ধর্মীয় স্থানকে মসজিদ হিসেবে প্রচার করা এবং কুরআন শরীফকে তাদের ধর্মীয় গ্রন্থ হিসেবে প্রচার করার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। অর্থাৎ এই পরিভাষাগুলো তারা ব্যবহার করতে পারবে না। যেন সাধারণ মুসলমানরা তাদের দ্বারা কোনো রকম ধোঁকার মধ্যে না পড়ে। মাসিক আলকাউসারের বিভিন্ন সংখ্যায় বিভিন্ন সময় কাদিয়ানীদের স্বরূপ তুল ধরে বিভিন্ন লেখা প্রকাশ করা হয়েছে। তাই আজ আমরা ওই বিষয়টিতে দীর্ঘ আলোচনায় যেতে চাই না। সতর্কতার জন্য আমরা বলব যেসব অঞ্চলে কাদিয়ানীরা তাদের ধর্মপ্রচার ও ধর্মান্তরের কাজ করছে সেসব অঞ্চলের দাঈ ও আলেম-উলামাদের কাজ হচ্ছে, কাদিয়ানী বিষয়ে উলামায়ে কেরামের বইপত্র সংগ্রহ করে পড়া ও সাধারণের মাঝে সেসব আলোচনা তুলে ধরা। কাদিয়ানীদের ধর্মীয় পরিচিতি সম্পর্কে মুসলমানদের অবহিত করতে থাকা।

শিয়া সম্প্রদায়েরর পরিচিতি

দ্বিতীয় যে সম্প্রদায়টি হামলার শিকার হয়েছে- তারা হচ্ছে শিয়া। কাদিয়ানীদের সম্পর্কে অনেকের কিছু ধারণা থাকলেও শিয়াদের ধর্মীয় বৈশিষ্ট্য ও পরিচিতি সম্পর্কে অনেক মুসলমানের ধারণা স্পষ্ট নয়। কেউ কেউ শিয়া-সুন্নী মতভেদকে একটি মাযহাবী মতভেদের মতো মনে করে থাকে। তাই শিয়াদের কিছু বৈশিষ্ট্যগত পরিচিতি এখানে তুলে ধরছি। প্রথমেই বলে রাখা ভালো যে শিয়ারা বহু দল-উপদলে বিভক্ত। তবে বর্তমানে শিয়া রাষ্ট্র-ইরান এবং বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অন্যান্য রাষ্ট্রের শিয়াদের প্রায় সকলেই ইমামিয়া ইছনা আশারিয়া শিয়া। ইরানের প্রয়াত ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনী এবং তার পরবর্তী ধর্মীয় নেতাগণ এই সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। নিচে তাদের আকীদা-বিশ্বাসের মোটা কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করছি।

১. ইমামতের বিশ্বাস : শিয়ারা ১২ জন ব্যক্তিত্বকে ইমাম হিসেবে বিশ্বাস করে থাকে। এবং তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, এই ইমামরাই ধর্মীয় বিশ্বাসের মূল ব্যক্তিত্ব। তারা বিশ্বাস করে : (ক) তাদের ইমামগণের মর্তবা ক্ষেত্র বিশেষে নবী ও ফেরেশতাদের চেয়ে বেশি। (খ) তাদের ইমামগণের শিক্ষা ছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নবুওতও পূর্ণ হয় না। (গ) তাদের ইমামগণের কথা রাসূলের কথার মতই বিশ্বাসযোগ্য ও অবশ্য-পালনীয়।

২. খেলাফত সংক্রান্ত বিশ্বাস :  শিয়ারা মনে করে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পর খলীফা হওয়ার হক্বদার ছিলেন হযরত আলী রা.। কিন্তু আবু বকর রা. ও হযরত উমর রা. জুলুম করে খেলাফতকে আত্মসাৎ করেছেন। (নাউযুবিল্লাহ) এবং বহু শিয়া-আলেমের বিশ্বাস হলো, হযরত আবু বকর রা. ও হযরত উমর রা. ইসলাম থেকেও খারিজ হয়ে গিয়েছিলেন।

৩. কুরআন শরীফ সংক্রান্ত বিশ্বাস : শিয়ারা মনে করে বর্তমানে আমাদের হাতে যে কুরআন শরীফ রয়েছে তা অসম্পূর্ণ ও বিকৃত। কুরআনের কিছু সূরা ও আয়াত প্রথম দুই খলীফা কর্তৃক সরিয়ে ফেলা হয়েছে ও বিকৃত করা হয়েছে। এবং তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী ওই আয়াতগুলোতে হযরত আলী রা. ও শিয়াদের পরবর্তী ইমামদের সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে।

৪. হযরত আলী রা. সম্পর্কে বিশ্বাস : শিয়াদের বিশ্বাস, হযরত আলী রা.-এর মর্তবা সকল নবী ও রাসূল থেকেও অধিক।

৫. হযরত হোসাইন রা. সম্পর্কে বিশ্বাস : শিয়াদের বিশ্বাস অনুযায়ী, হযরত হোসাইন রা.-এর কবর যিয়ারত করলে ওই ব্যক্তির পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল গোনাহ মাফ হয়ে যাবে। হযরত হোসাইন রা.-এর কবর যিয়ারত করা হজ্বের সময় ওকুফে আরাফার চেয়েও ফযীলতপূর্ণ। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী কারবালা মক্কা থেকেও উত্তম স্থান।

৬. হযরত আয়েশা রা. ও উম্মুল মুমিনীনগণ প্রসঙ্গ : শিয়ারা বিশ্বাস করে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীগণ বিশেষত হযরত আয়েশা রা. ও হাফসা রা. ইসলাম ও আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন। তাদের ইমাম মাহদী এসে হযরত আয়েশা রা-এর বিরুদ্ধে হদ কায়েম করবেন।

৭. সাহাবায়ে কেরাম প্রসঙ্গ : শিয়া আলেমগণের মতে, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পর তাঁর সাহাবীদের অল্প কয়েকজন ছাড়া বাকি সকলেই মুরতাদ হয়ে গিয়েছিলেন। হযরত আলী রা.-কে প্রথমেই সরাসরি খলীফা না বানিয়ে হযরত আবু বকর রা. ও হযরত উমর রা.-কে খলীফা বানানো ও তাঁদের মান্য করায় বেশির ভাগ সাহাবী ইসলামের গণ্ডি থেকে বের হয়ে গেছেন।

৮. মাহদী প্রসঙ্গ : শিয়ারা একজন ইমাম মাহদীকে বিশ্বাস করে। তার নাম মুহাম্মাদ ইবনুল হোসাইন আসকারী। শিয়াদের ১২তম ইমাম। তারা তাকে আল হুজ্জাহআল কায়েমবলেও ডাকে। তাদের বিশ্বাস হচ্ছে মুহাম্মাদ ইবনুল হোসাইন আল আসকারীর জন্ম ২৫৬ হিজরীতে। এরপর তিনি ২৬৫ হিজরীতে একটি গুহায় আত্মগোপন করেন। শেষ যামানায় তিনি সেই গুহা থেকে বের হয়ে এসে শিয়াদের সহযোগিতা করবেন। শিয়াদের বিরুদ্ধে যত দল ও গোষ্ঠী আছে সবার ওপর প্রতিশোধ নেবেন। উল্লেখ্য যে শিয়াদের কথিত ইমাম মাহদীর সাথে মুসলমানরা যে অনাগত মাহদীর প্রতি বিশ্বাস রাখেন- তার কোনো মিল নেই।

৯. তাক্বিয়্যা প্রসঙ্গ : শিয়াদের মৌলিক বিশ্বাসগুলোর একটি হচ্ছে তাক্বিয়্যা। এই তাক্বিয়্যা দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য থাকে, ধর্মীয় স্বার্থে কোনো কিছুকে অন্যদের থেকে গোপন করা এবং মিথ্যা কথা বলা। মিথ্যা পরিচয় দেওয়া। এ ভিত্তিতেই তারা তাদের অনেক কিছু অন্যদের থেকে, মুসলমানদের থেকে এবং তাদেরও সাধারণ স্তরের অনুসারীদের থেকে আড়াল করে রাখে।

উপরে খুবই সংক্ষিপ্ত আকারে শিয়াদের আকীদা-বিশ্বাসের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো উল্লেখ করা হলো। শিয়াদের ধর্মীয় মৌলিক কিতাব উসূলুল কাফী ও তাদের বড় বড় আলেমদের লিখিত গ্রন্থাবলিতে এ সমস্ত আকীদা-বিশ্বাসের কথা বিস্তারিতভাবে উল্লেখ রয়েছে। উপরোক্ত বিষয়গুলো দেখলেই যে কোনো মুসলমানের পক্ষে শিয়াদের বিশ্বাসগত ও ধর্মীয় অবস্থান সম্পর্কে বুঝতে তেমন কিছু বাকি থাকবে না। এাখানে প্রসঙ্গত: আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার তা হচ্ছে, আমাদের গণমাধ্যমগুলো শিয়াদের ধর্মীয়স্থানকে মসজিদবলে আখ্যা দিয়ে থাকে। অথচ শিয়ারা নিজেরাই এ নাম ব্যবহার না করে তাদের ইবাদতের জায়গাকে ইমাম বারেগাহ’(এ দেশে বলে ইমাম বাড়া) বলে থাকে।

আমাদের করণীয়

মূল আলোচনার তৃতীয় প্রসঙ্গটি হলো এ জাতীয় হামলার ব্যাপারে করণীয় বিষয় সাব্যস্ত করা। এ ব্যাপারে প্রথমেই জনসাধারণ পর্যায়ের মুসলমানদের করণীয় নিয়ে কথা বলা যায়। সাধারণ মুসলমানদের জন্য কয়েকটি করণীয় হতে পারে। (ক) নিজেদের ঈমান-আকীদা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা অর্জন করা এবং সচেতন হওয়া। (খ) আলেম-উলামাদের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলা। এবং দ্বীনী বিষয়ে আলেমদের পথনির্দেশনা অনুসরণ করা। (গ) ইসলামের নামে কেউ নতুন কোনো বিশ্বাস, ধারণা কিংবা কর্মপন্থার দাওয়াত নিয়ে আসলেই তাতে বিভ্রান্ত না হওয়া। এর ভালোমন্দ যাচাইয়ে হক্কানী আলেম সমাজের সাহায্য গ্রহণ করা। (ঘ) কোনো বিভ্রান্ত ও পথচ্যুত গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে কোনো রকম উস্কানিমূলক আচরণ না করা। এবং কেউ কোনো উস্কানি দিলেও কোনোভাবেই আইন হাতে তুলে নেওয়ার মতো আচরণ না করা।

এ ব্যাপারে আলেমদের কাজ মূলত আলেমসমাজ করে যাচ্ছেন। সেটি হচ্ছে, শান্তিপূর্ণ উপায়ে দালিলিকভাবে আলোচনা-লেখা ওয়াজ-নসীহতের মাধ্যমে বিভ্রান্ত গোষ্ঠীগুলো সম্পর্কে বোঝানোর মধ্য দিয়ে মুসলমান জনসাধরণকে তাদের ঈমান-আকীদা হেফাযতে সাহায্য করা। নতুন প্রেক্ষাপটে অবশ্যই এ কাজগুলো করে যেতে হবে। সঙ্গে আরো সতর্কতা ও মনোযোগ রাখতে হবে। মূলত এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্বটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে হক্বের বিকাশ যেন বাধাগ্রস্ত না হয় এবং কারো জানমালেরও যেন ক্ষতি না হয়- রাষ্ট্রকে সেসব দিকেও লক্ষ রাখতে হবে। সে জন্যই রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে যে কয়টি বিষয় উল্লেখ করা যায় তা হচ্ছে, (ক) সকলের জানমালের হেফাযতের সুব্যবস্থা করা। (খ) এ-সমস্ত হামলার সাথে জড়িতদের শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি এর পেছনে অন্য ষড়যন্ত্র থাকলে তাও খতিয়ে দেখা। বিশেষত কোনো বিভ্রান্ত উপদল ও গোষ্ঠী তাদের বিভিন্ন প্রলোভন ও প্রচারণার মাধ্যমে মুসলমানদের মৌলিক ও সঠিক একমাত্র জামাত-আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআত-এর সাধারণ মুসলমানদেরকে বিভ্রান্ত করছে কি না- সেটাও সতর্ক পর্যবেক্ষণে রাখা এবং সচেতন থাকা। তাদের কার্যক্রমকে তাদের সম্প্রদায় পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখতে বাধ্য করা। (গ) কাদিয়ানী ও শিয়াদের উপাসনালয়ে এসব জীবনঘাতী হামলার পেছনে গভীর কোনো ষড়যন্ত্র আছে কি না সেটা দ্রæত বের করার চেষ্টা করা। এসব ঘটনায় ঢালাওভাবে মুসলমানদের কোনো গোষ্ঠীকে কেবল আকীদাগত ও ধর্মীয় বিরোধের কারণে অভিযুক্ত না করা উচিত। অস্পষ্ট ধারণা ও অনুমানের ভিত্তিতে দ্বীনদার ধর্মপ্রাণ শ্রেণিকে অকারণ পেরেশান ও হয়রানি না করা। কারণ এই হয়রানির ঘটনায় উত্তেজনা-অস্থিরতা নতুন মাত্রা লাভ করে। এতে সমস্যার কোনো সমাধান তো হয়ই না, উল্টো অপরাধী ও ষড়যন্ত্রকারীরা নির্বিঘেœ তাদের কাজ করে যেতে পারে।

সবশেষে আমরা আবারো বলব, শিয়া-কাদিয়ানীদের সাথে আক্বীদা-বিশ্বাসের জায়গায় সাধারণ মুসলমানের কোনো সম্পর্ক নেই। ধর্মীয়ভাবে একাত্ম হয়ে তাদের প্রতি মমত্ব পোষণ ও প্রকাশের সুযোগ নেই। কিন্তু তাদের ধর্মীয় স্থানসহ কোনো কিছুর ওপর হামলা ও আঘাতের বিষয়টি কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। তাদেরকে মারা, আঘাত করা সব বিবেচনাতেই অপরাধ ও শাস্তিযোগ্য। আবার তাদেরকে সত্যের ওপর আছে মনে করাও ঈমানের জন্য ক্ষতিকর। দাওয়াতী ও ইসলাহী পদ্ধতিতে তাদের বিচ্যুতির বিষয়ে সতর্কীকরণের কাজ চালিয়ে যেতে হবে। কোনোভাবেই এসব বিভ্রান্তির সঙ্গে নিজেদের একাত্ম করার অবকাশ কোনো মুসলমানের নেই। 

আরও পড়ুন:   অনৈতিকতা | দ্বীনিয়াত | নীতি-নৈতিকতা | পর্যালোচনা | বিবিধ

সম্মানিত পাঠক!
মাসিক আলকাউসারের ওয়েব পেজটির উন্নয়ন কাজ চলছে। তাই বর্তমান সংখ্যাটি হালনাগাদ করতে বিলম্ব হচ্ছে। আপনাদের সাময়িক অসুবিধার জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত।

হজ্ব এবং কুরবানী বিষয়ক প্রবন্ধসমূহ