শাওয়াল ১৪৩৬ . আগস্ট ২০১৫

পুরোনো সংখ্যা . বর্ষ: ১১ . সংখ্যা: ০৭

তুরস্কে, তুর্কিস্তানের সন্ধানে-১১

 

(পূর্বপ্রকাশিতের পর)

আমরা কয়েকজন মিসকীন বসে আছি; তুর্কী বিমানের অন্য যাত্রীরা অনেক আগেই সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে ভিতরে চলে গিয়েছে এবং ঘড়ি বলছে, এখন তারা তুরস্কের মাটিতে নয়, আকাশে। বেশীর ভাগ যাত্রীই তো ভারতীয়; তার মধ্যে আবার পশ্চিমবঙ্গের দাদা-দিদিরা সংখ্যায় কম নয়। তারা আগেই বুঝতে পেরেছে, আমাদের নিয়ে কী যেন একটা গোলবেঁধেছে ।[1] যাওয়ার পথে একজন দুজন বেশ কৌতুকের সুরে জিজ্ঞাসা করলেন, কী দাদা, ঝামেলা হয়েছে বুঝি! উত্তরের জন্য অবশ্য অপেক্ষা করেনি, নইলে চরকার উপদেশটা  ঠোঁটের ফাঁকে এসেই পড়েছিলো।

এছাড়াও বিভিন্ন এয়ারলাইন্স-এর হাজার যাত্রী আমাদের সামনে দিয়ে যাচ্ছে, আর যাচ্ছে। পরিষ্কার বোঝা যায়, কত ব্যস্ত বিমানবন্দর! ঘণ্টায় ঘণ্টায় কত বিমান নামে, কত বিমান ওড়ে। আমাদেরই শুধু ডানা ভাঙ্গা, উড়তে চাই, উড়তে পারি না!

রাত তখন দশটা। আমাদের দায়িত্বে নিযুক্ত কর্মকর্তাগণ সবদিক থেকে নিরাশ হয়ে ফিরে এলেন, তবে আমাদেরকে নিরাশার কথা বললেন না, বললেন, নিশ্চয় কোন ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। রাত্রেই আমরা সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ করবো, ইনশাআল্লাহ আগামীকাল এই সময় তুর্কী এয়ার লাইন্স-এর ফ্লাইটে আপনাদের তুলে দিতে পারবো।

এর অর্থ হলো, এতক্ষণ যে আশঙ্কার কথাটা ভিতরে চাপা দিয়ে রেখেছি তা অমূলক নাও হতে পারে! গতকাল যারা তাকসীম স্কয়ারের সামবেশ বাতিল করেছে, এখানকার ঘটনার সঙ্গে তার কোন যোগসূত্র থাকতেও পারে। আর সেক্ষেত্রে সম্ভবত মূল সমস্যা হলেন আয়োজক সংস্থার চেয়ারম্যান মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ রাহমানী। হয়ত সেনাকর্তৃপক্ষ তাঁর সম্পর্কে আশ্বস্ত হতে চায়। এমনকি নয়াদিল্লীতে আমাদের ...! আল্লাহ জানেন কী হবে! কত সামান্য সামান্য অজুহাতে, এমনকি অজুহাত ছাড়াই দেশে দেশে জঙ্গিবাদের ছায়ার বিরুদ্ধে কী তুলকালাম কাণ্ডই না চলছে! কত নিরীহ আলেম ওলামা, মুসলিম বুদ্ধিজীবী নির্মম নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন! অন্তত চরম নাজেহাল তো হচ্ছেনই। তবে সর্বাবস্থায় আল্লাহ হাফেয।

তুর্কী তরুণ আলেম দুরসূন, মনে হলো পরিবেশটা হালকা করার উদ্দেশ্যে বললেন, চলো, ভালোই হলো; আমার একটা ইচ্ছা আল্লাহ পুরা করছেন।

সেটা আবার কী ভাই বুযুর্গ!

ইচ্ছে ছিলো, উস্তাদ! আপনাদের একবার গরীবখানায় নেবো, একটুকরো রুটি, একটুকরো গোশত পেশ করবো।

শুনতে ভালোই লাগলো। একবার মনে পড়লো গ্রামবাংলার ঘর পোড়া ও আলু পোড়ার সেই পুরোনো প্রবাদ, আবার মনে পড়লো, যাত্রা ভঙ্গ হলো, তবে দধির হাঁড়ি পাওয়া গেলো। এই সান্ত¡না-প্রবাদ। শেষে মনে হলো, দুটি প্রবাদই এখানে সত্য, তবে দুটোই আধখানা করে।

অবশ্য তাঁর কথা থেকে একটা জিনিস শেখা হলো, গরীবখানা বাংলাদেশে যেমন আছে, তুরস্কেও আছে। শুধু গরীব বাংলার দুটো ডাল-ভাত এখানে হয়ে গেছে একটুকরো রুটি, একটুকরো গোশত

ভাষার উপর জীবন ও সংস্কৃতির প্রভাব কতভাবে যে প্রকাশ পায়!

***

আমাদের তখন ফেরত রওয়ানা হওয়ার কথা হোটেলের উদ্দেশ্যে, কিন্তু মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ রাহমানী ও তাঁর পুত্র তখনো ফিরে আসেননি। কী করা? বিশেষ করে হযরত আরসাদ মাদানী বললেন, তাঁর আসা পর্যন্ত তো ইন্তিযার করতেই হবে।

ইন্তিযার অবশ্য বেশীক্ষণ করতে হলো না। দূর থেকেই দেখা গেলো, উপরের তলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামছেন। হাঁটার ছন্দ থেকে ধারণা হলো, যে পরিমাণ উদ্যম নিয়ে গিয়েছিলেন, সে পরিমাণ উদ্যম নিয়ে ফিরে আসছেন না।

কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই রাহমানী ছাহেব অসন্তোষ ও উৎকণ্ঠার মিশ্রকণ্ঠে বলে উঠলেন, ইয়ে লোগ তো খামোখাহ হামেঁ শ্যক ক্যরনে ল্যগে হ্যাঁয়!

যাক, বাঁচা গেলো। কিছুটা তাহলে বুঝতে পেরেছেন ফ্যাকড়াটা কোথায়? অন্তত টিকেট কনফারমেশন-এর গাফিলতি এখানে নেই!

***

এত উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যেও যে দৃশ্যটি দেখার জন্য হৃদয় অস্থির ছিলো, চোখ দুটো তৃষ্ণার্ত ছিলো, আল্লাহ মেহেরবান এবার তা দেখিয়ে দিলেন! সমস্ত পেরেশানির উপর যেন সুকন ও প্রশান্তির একটা প্রলেপ পড়ে গেলো! এতক্ষণ শুধু ভাবছিলাম, ঢাকায় যা দেখে চোখ জুড়ালাম, নয়াদিল্লীতে যা অবলোকন করে প্রাণ শীতল করলাম, ইস্তাম্বুলে তা থেকে বঞ্চিত হবো এ কেমন করে হয়! আলহামদু লিল্লাহ প্রাণভরে সে নূরানী দৃশ্য উপভোগ করলাম।

আমাদের ঠিক সামনে দিয়ে নয়, তিনটা কাউন্টার পরে তুর্কী হাজীদের বড় একটা কাফেলা লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক ধ্বনি তুলে আশ্চর্য এক উদ্যম উদ্দীপনার সঙ্গে সামনের দিকে এগিয়ে গেলো এবং কালো কাঁচের পর্দার ওপাশে অদৃশ্য হয়ে গেলো। মক্কা-মদীনায় যেমন দেখেছি তেমনি সুশৃঙ্খল! কাফেলার আমীরের এমনই অনুগত যে, কারোই আগে পিছে হওয়ার উপায় নেই, না নারী, না পুরুষ। নারী-পুরুষ সবারই ইহরাম সাদা। নারীরা ধারণ করেছে সাদা বোরকা। কী বলা যায়! যেন একটা কাশবন চোখের সামনে দিয়ে উড়ে উড়ে চলে গেলো! একটু পর আরেকটি কাফেলা, আবার আরেকটি। এভাবে কয়েকটি। হয়ত এখনই তাদের বিমান আকাশে উড়াল দেয়ার সময়। আহা, কত ভাগ্যবান! কত খোশকিসমত!!

উপমাটা ঠিক হবে কি না  জানি না, লোকে বলে, খাবারের স্বাদটা যেন জিহŸায় লেগে আছে; আমার বলতে ইচ্ছে করছে, তুর্কী হাজীদের কাফেলার গমন-দৃশ্যের অবলোকন-স্বাদ যেন চোখের পাতায় লেগে আছে! এত উজ্জ্বল, এত প্রোজ্জ্বল যে, চারবছর পর আজ এ সফরনামা লেখার সময়ও চোখের সামনে স্পষ্ট যেন দেখতে পাই!

হজ্বের সফরনামা নয়, তুরস্কের মাত্র চারদিনের সফরনামা, তাতেও বারবার বাইতুল্লাহর আশেকীন, মুসাফিরীন হাজী ছাহেবানের প্রসঙ্গ আসছে। প্রিয় পাঠক, তুমি বিরক্ত হচ্ছো না তো! যাহ, আমিই বা কী! এমন নূর ও নূরানিয়াতের, এমন রূহ ও রূহানিয়াতের, এমন ইশকের, মুহব্বতের খুশি ও আনন্দের আলোচনায়, যত বার হোক এবং যত দীর্ঘ হোক, কারো বিরক্তি হতে পারে, ভাবছি কীভাবে?! শোনো পাঠক, আগেই বলে রাখি, আল্লাহর ইচ্ছায় আমার এ সফরনামায় আরো তিনবার আসবে এই নূর-কাফেলার অবলোকনের দৃশ্যবর্ণনা। যে আনন্দ আমি প্রাণভরে উপভোগ করেছি তাতে তোমাকে শরীক না করে কি পারি!

***

যেভাবে বিমানবন্দরে এসেছিলাম সেভাবেই আবার ফিরে চললাম হোটেলের উদ্দেশ্যে।

আমাদের গাড়ী একটু বিলম্বে পৌঁছলো, অন্যদুটি কয়েক মিনিট আগেই এসে গেছে। অভ্যর্থনাডেস্ক-এর সামনে এসে প্রথম হোঁচট খেলাম। এ তিনদিন পর্দানশীন নারী দেখেছি একদুজন, বেপর্দা নারীর তো প্রশ্নই আসে না, পুরো হোটেলটা ছিলো যেন মারকাযে নূর, সামান্য সময় ছিলাম না, এর মধ্যেই যেন তা হয়ে গেছে মারকাযে যুলুমাত।  ডেস্কের পিছনে দাঁড়িয়ে এখন যিনি অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন... থাক! সম্ভবত উর্দূভাষার প্রখ্যাত সাহিত্যিক মুমতায মুফতী কোন একভ্রমণকাহিনীতে হূরানে বেহেশত-এর বিপরীতে হূরানে দোযখ শব্দটি লিখেছেন, মনে পড়লেও তা ব্যবহার করা সঙ্গত মনে হয় না। কার আখেরাত কী হবে সে তো জানেন শুধু আল্লাহ! তবে এই সব হূরানে দুনিয়ার কারণে কত মানুষের যে আখেরাত বরবাদ হয় তা কী অস্বীকার করা যায়?!

আর হোটেলের লবীতে জোড়ায় জোড়ায় এরা কারা! আসমান ভেঙ্গে নেমেছে, না মাটি ভেদ করে উঠে এসেছে!!

ডেস্ক থেকে চাবি নিয়ে লিফ্টে উঠলাম। সেখানে খেলাম, দ্বিতীয় হোঁচট নয়, রীতিমত ধাক্কা! এমন নগ্ন ছবি লিফটের দেয়ালে! মানুষ লিফটে থাকে কতক্ষণ! এইটুকু সময়ও রক্ষা নেই! এ দুদিন তাহলে কোন্ ইস্তাম্বুলে থাকলাম? কোন্ ইস্তাম্বুল দেখলাম?? ইস্তাম্বুলের এই রূপটি দেখা বাকি ছিলো বলেই কি আমাদের আবার ফিরে আসা?! আল্লাহ তুমি রক্ষা করো, ইস্তাম্বুলকে, মুসলিম জাহানকে, মুসলিম উম্মাহকে।

তুর্কী তরুণ আলেম দুরসূন অবশ্য নিজে থেকেই কৈফিয়তের সুরে বললেন, এরা সব বিদেশী, বিদেশিনী। এদের কুফুরি ফাসেকি হোটেলের সীমানাতেই সীমাবদ্ধ। তুর্কী নারীরা পর্দা না করলেও নগ্নতাকে ঘৃণা করে। এরদোগান যখন ইস্তাম্বুলের মেয়র ছিলেন তখন থেকে এখানে প্রকাশ্যে মদবিক্রি নিষিদ্ধ, আর এখন তো এই নিষেধাজ্ঞা সারা তুরস্কে কার্যকর।

মনে মনে বললাম, ভাই, এমন সলজ্জ কৈফিয়তের কী প্রয়োজন! আমরা তো কোন প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করিনি! তাছাড়া আমরাও তো আর কোন পাকিস্তান থেকে আসিনি। মুসলিম জাহানের প্রায় সবজনপদেরই তো একই কাহানী। এরদোগান তো তবু কিছু করার চেষ্টা করছেন।

লিফ্ট থেকে নেমে কামরার দরজার সামনে গিয়ে খেলাম আরেকটা হোঁচট। এটা অবশ্য খুব হালকা হোঁচট, আগেরগুলোর সঙ্গে এর কোন সম্পর্ক নেই। ঘটনা হলো, তালার ফাঁকে চাবি, অর্থাৎ ইলেক্ট্রোনিক কার্ড ঢুকাচ্ছি কিন্তু দরজা তো চিচিং ফাঁক হচ্ছে না!

এটা হলো ভদ্রতার ইউরোপীয় স্টাইল। আমরা তো ইস্তাম্বুলের ইউরোপীয় অংশেই আছি। তুমি চাবি চেয়েছো, আমি দেবো না বলে অভদ্রতা করবো কেন? চাবি নাও, সানন্দে নাও। তালা যখন খোলবে না, নিজেই ফিরে আসবে। তখন বলা যাবে, স্যরি, তোমার সময় শেষ। যদি দয়া করে নতুন করে বুক করো, আমরা তোমার সেবায় প্রস্তুত।

ভদ্রতার স্টাইলটা প্রাচ্যের সৌজন্যবোধের সঙ্গে খাপ না খেলেও খুব একটা মন্দ কী! তাছাড়া পরে জানলাম, হোটেলের মালিকানা হচ্ছে এক ইহুদি ধনকুবেরের। তাহলে তো কমই হলো। ওরা তো শুনেছি পাওনা আদায়ের জন্য খাতকের শরীর থেকে গোশত পর্যন্ত কেটে নেয়!

আমাদের দুকামরা পর মাওলানা সাঈদ আযামী ছাহেবের কামরা, আগে জানা ছিলো না। এখন জানলাম। আশ্চর্য এ দুদিন আমরা তাহলে এত কাছে ছিলাম। আগে জানলে তো এ সুযোগটা কাজে লাগানো যেতো! বিশেষ করে তাঁর শিক্ষাজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে অনেক কিছু আহরণ করা যেতো!!

তাঁর কামরার দরজা খোলা। তবে বোঝা গেলো, তিনিও একই অবস্থার মুখোমুখি হয়েছিলেন। সবে উদ্ধার লাভ করেছেন। তিনি অভয় দিলেন, চিন্তা করবেন না; ব্যবস্থা হয়ে যাবে। আসুন, কিছুক্ষণ আমার কামরায় বসুন। আমীর ছাহেব আমাকে বসতে বলে নীচে গেলেন, মাওলানা আব্দুল মতীনও সঙ্গে গেলেন। মাওলানা সাঈদ আযামী ছাহেব আবার অনুরোধ করলেন। প্রয়োজন না থাকলেও তাঁর অনুরোধ রক্ষা করা কর্তব্য মনে হলো।

মুহিউদ্দীন আওয়ামাহ এবং তাঁর সঙ্গে আর যারা ছিলেন, কেউ এখন হোটেলে নেই। সঙ্গত কারণেই অন্যত্র অবস্থান করছেন। তবে অজ্ঞাত স্থান থেকেই সব ব্যবস্থা করছেন। তাঁর দক্ষব্যবস্থাপনার যে পরিচয় এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে পেয়েছি, সত্যি তার প্রশংসা করতেই হয়।

আমীর ছাহেব ফিরে এলেন এবং কামরার দরজা খুলে গেলো। ফেলো কড়ি, নাও মাল কথাটা তাহলে সবদেশেই সমান সত্য!

***

তুর্কী তরুণ আলিম দুরসূন কাল আসবেন বলে বিদায় নিলেন এবং সময়মত এলেনও, কিন্তু তার একটুকরো রুটি, একটুকরো গোশত সময়ের অভাবে আর খাওয়া হয়ে উঠেনি। বেচারার সেজন্য কী যে আফসোস! রাতের খাবারের জন্য আর নীচে যেতে আমাদের কারোই প্রবৃত্তি হলো না। কামরায় হালকা যা কিছু ছিলো খেয়ে শুয়ে পড়লাম। জেগে থেকে যে ইস্তাম্বুলের শেষ রাতটি যাপন করবো, শারীরিক অবস্থা তেমন ছিলো না। ক্লান্তি, আর ক্লান্তি; সর্বাঙ্গ জুড়ে যেন এক অসীম ক্লান্তি। তাই যাকে বলে এককাতে শোয়া, অন্যকাতে ঘুমিয়ে পড়া; এমনই হলো আমাদের অবস্থা। কখন যে বিছানায় গেলাম, কখন যে চোখদুটো বুজে এলো, আর কখন যে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেলাম, কিছুই টের পেলাম না।

***

মরহূম ইবরাহীম খাঁ, তাঁর ইস্তাম্বুলের সফরে সরকারী ব্যবস্থাপনায় বসফরাসের বুকে নৌবিহার করেছেন। যতটা  উপভোগ করেছেন তার চেয়ে অনেক বেশী তার সরস বর্ণনা  দিয়েছেন। ইচ্ছে ছিলো কোনভাবে যদি নৌবিহারের একটা ব্যবস্থা হতো! অন্তত বারবাসা পর্যন্ত!! জানাই ছিলো মনের এ সুপ্ত ইচ্ছা পূর্ণ হবার নয়। তবে অনেকবার দেখেছি, জাগ্রত অবস্থায় যা পাই না, স্বপ্নে তা কাছে এসে ধরা দেয়। আল্লাহরই দয়া। আজকের রাত্রেও তাই হলো। দেখি, কত শত পালতোলা নাও! বসফরাসের বুকে আমরা সবাই আনন্দ-বিহারে। পালে বাতাস লেগে নৌকা তরতর করে ভেসে চলেছে, আর ঢেউয়ের দোলায় দুলছে। মনে আমার সে কী আনন্দ!

দূর থেকে দেখি বসফরাসের ঝুলন্ত সেতু। বাতাসের দুরন্ত বেগে নৌকা সেদিকেই ছুটে চলেছে। চারপাশে অনেক নৌকা, সবই পালতোলা। যেন প্রতিযোগিতা হচ্ছে, কার নৌকা আগে পৌঁছে ঝুলন্ত সেতুর কাছে। একজনের নৌকা অন্যজনকে ছাড়িয়ে যায়, আর আনন্দে উল্লাস করে ওঠে।

স্বপ্নেই ভাবছি। এই বসফরাসের বুকে মুহাম্মাদ আলফাতিহ খৃস্টানদের নৌশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, আর আমি তাতে নৌবিহার করছি, এটা কি ঠিক হলো! স্বপ্নেই নিজেকে ধিক্কার দিলাম, আর জেগে উঠলাম!

ছোট্ট একটি স্বপ্ন, কিন্তু এত আনন্দ হলো, যেন স্বপ্নে নয়, যা ঘটেছে বাস্তবেই ঘটেছে; যেন এই মাত্র নৌকা থেকে নামা হলো। স্বপ্নটা অনেক আনন্দের ছিলো বলেই এখন এই সফরনামা লেখার সময়ও মনে আছে সেই স্বপ্ন, সেই পালতোলা নাও এবং বসফরাস সেই ঢেউয়ের পর ঢেউ!

রাত শেষ হতে তখন বেশী দেরী নেই। উঠে অযু করে কয়েক রাকাত নামায পড়লাম। আজকের রাতই হয়ত শেষ রাত ইস্তাম্বুলে আমাদের। গতকাল তো তাই ভেবেছিলাম। যা ভাবিনি ঘটেছে কিন্তু সেটাই। মানুষ জানে না, তার জীবনে আগামীকাল আসবে কি আসবে না, কিংবা সেই আগামীকাল তার জন্য কী নিয়ে আসবে?

ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালাম। আজ কিন্তু বেশ শীত করছে। আগের দুরাতের চেয়ে যথেষ্ট বেশী! চাদরটা গায়ে জড়িয়ে নিলাম। তাতেও যেন শীত বশ মানতে চায় না।

ইলদিয প্রাসাদটি কোন দিকে?! দিনে মানচিত্র দেখেছিলাম, ইস্তাম্বুলের মধ্যএলাকায়। তক্বী উছমানী যে সম্মেলন উপলক্ষে এসেছিলেন তা ঐ ইলদিয প্রাসাদেই অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। একটি পাহাড়ের উপর নাকি তা অবস্থিত। তিনি লিখেছেন, সুলতান আব্দুল হামীদ প্রাসাদের পাশে একটি মসজিদ তৈরী করেছিলেন। সেখানেই তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে নামায আদায় করতেন।

ইতিহাসের সেই মর্মন্তুদ ঘটনাটি মনের পর্দায় ভেসে উঠলো। ইলদিয প্রাসাদ ছিলো সুলতান আব্দুল হামীদের বাসভবন। প্রাসাদ বলতে যা বোঝায় তা নয়, খুব সাদামাটা ইমারত। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সুলতান অনাড়ম্বর জীবনই যাপন করেছেন। চার দিকে ফেতনা গোলযোগ এমন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যে, তিনি কলকিনারা পাচ্ছেন না। তার উপর পর্দার আড়াল থেকে ইহুদিচক্র এমন জঘন্য  অপপ্রচার চালাচ্ছে যে, মানুষের কাছে সত্য হয়ে যাচ্ছে নির্জলা মিথ্যা, আর মিথ্যা হয়ে যাচ্ছে ধ্রুব সত্য।

এমনই এক ভোর রাতে সুলতান আব্দুল হামীদ ইলদিয প্রাসাদের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছেন, আর ভাবছেন, শেষ পর্যন্ত কী হবে?! কী হতে যাচ্ছে?! খেলাফতের মসনদ ত্যাগ করতে তিনি রাজী আছেন, কিন্তু মুসলিম উম্মাহর ভবিষ্যত কী হবে!? এমন সময়, কোন ইত্তেলা বা অনুমতি ছাড়া সেই ইহুদির বাচ্চাটা, যাকে তিনি ইস্তাম্বুল ত্যাগ করার আদেশ দিয়েছিলেন, আরো কয়েকজনকে সঙ্গে করে প্রহরীসহ এসে হাজির! মুখে তার ক্রুর হাসি। বিনয়ে বিগলিত ভাব নিয়ে বললো, বাবে আলী, এই কাগজে এখানে দস্তখত করতে মর্জি হয়। যত অসহায়ই হোন, রক্তে তো তাঁর বইছে তুর্কী উছমানী খুন। যত দুর্বলই হোন, মুহাম্মাদ আলফাতিহ, সোলায়মান, সেলিম, মুরাদ-এদেরই তো উত্তরাধিকারী তিনি!

মুহূর্তের জন্য হয়ত জ্বলে উঠলেন, কিন্তু না, মুহূর্তের মধ্যেই নিজেকে সম্বরণও করে নিলেন। তিনি জানেন, হত্যা করার কোন ছুতা ওরা হাতছাড়া করবে না। উম্মাহকে এবং নিজের ভাগ্যকে তিনি আল্লাহর হাওয়ালা করে দিলেন; কলম হাতে নিয়ে দস্তখত করে দিলেন। হয়ত তাঁর হাত তখন কেঁপেছিলো, শামাদানে যে সারি সারি মোম, সেগুলোর আলোকশিখাও হয়ত কাঁপছিলো শীতের বাতাসে। আর তাঁর বিরাট বুকে যে দরদী দিলটা ছিলো!!

সবাই বলে, সুলতান ভীরু ছিলেন, কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধায় ভুগতেন, কিন্তু তারা তো জানে, এই ইহুদির বাচ্চাটাই সেদিন এসেছিলো দিনের আলোতে সুলতানের কাছে প্রস্তাব নিয়ে, সুলতান যদি ফিলিস্তীনের কিছু ভূখণ্ড ইহুদীদের দান করেন সালতানাতের সমস্ত বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করে দেয়া হবে, ইত্যাদি, ইত্যাদি!

সুলতান কী বলেছিলেন? সঙ্গে সঙ্গে হুঙ্কার দিয়ে উঠেছিলেন, খামোশ! ভূখণ্ড তো দূরের কথা, আমি তো এসবের বিনিময়ে ফিলিস্তীনের একমুঠ বালুও দেবো না! শেষে ক্ষুব্ধ অসহায় কণ্ঠে এমনও বলেছিলেন, আমার মৃত্যু পর্যন্ত সবুর করো, তখন হয়ত এমনিতেই পেয়ে যাবে।

এমন মর্দে মুমিন একজন সুলতান! এমন অন্তর্দর্শী একজন খলীফা!! তার বিরুদ্ধে কিনা অপবাদ দেয়া হলো ইহুদীদের সঙ্গে যোগসাজশের! হায় রে নিয়তি!!

আজকের এই ভোররাতের মত সেই ভোর রাতটি ছিলো খলীফা হিসাবে সুলতান আব্দুল হামীদের জীবনের শেষ রাত। ভোরের তারাটা কোথায় এখন! সুলতান আব্দুল হামীদও হয়ত ভোরের তারাটি সেই রাতে দেখতে চেয়েছিলেন তাঁর প্রাসাদের ব্যালকনি থেকে। হে ভোরের তারা, তুমি সেই রাতে দেখতে পেয়েছিলে সুলতান আব্দুল হামীদকে?! তোমার কি একটু হলেও মমতা জেগেছিলো তাঁর প্রতি?!

***

দুপুরের আগে ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই প্রবীণ অধ্যাপকের সঙ্গে দেখা হলো। তিনি তখন হোটেল ত্যাগ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁকে অনুরোধ করলাম, খলীফা আব্দুল হামীদ সম্পর্কে আমার কিছু জানার ছিলো, যদি আপনার সময় হয়। তিনি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন, অস্ত যাওয়া সূর্যের কথা জেনে আর কী হবে, তবু বলছো যখন চলো। এখন তো শোনবার মানুষও কম!

প্রায় ত্রিশ মিনিট কথা হলো তাঁর সঙ্গে। যা জানতে চাইলাম, বললেন, কয়েকবার তাঁর চোখের পাতা ভিজে উঠলো। তিনি বললেন তাঁর মত করে, আমি বুঝলাম আমার মত করে। যা বলতে চেয়েছেন, কিন্তু বলতে পারেননি, তাও বোঝার চেষ্টা করলাম। পুরো আলোচনা এখানে থাক, শুধু তার শেষ বাক্যটি বলি, তোমাদের টিপু সুলতান খলীফা আব্দুল হামীদের চেয়ে ভাগ্যবান ছিলেন। অন্তত তলোয়ার হাতে লড়াই করার সুযোগ পেয়েছেন, শেষবারের মত গর্জে উঠতে পেরেছেন, আর লড়াইয়ের ময়দানে শাহাদাতের পেয়ালায় চুমুক দিতে পেরেছেন। কিন্তু খলীফা আব্দুল হামীদ! যুদ্ধের ময়দানে নতুন খেলোয়াড়দের হাতে উসমানি সালতানাত যখন বিধ্বস্ত, তখন তিনি গৃহবন্দী! যেন খাঁচায় বন্দী বাঘ! বদ্ধঘরে অস্থির চিত্তে পায়চারি করেন, আর জানতে চান যুদ্ধের খবর!

সুলতান তাঁর রোযনামচায় লিখেছেন, উছমানী সালতানাত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কোন পক্ষ নিক, এটা তিনি চাননি। তাঁর ভাষায়, এ দিনটিরই অপেক্ষায় ছিলাম আমি বহুবছর। ওরা যুদ্ধ করে করে শেষ হয়ে যাবে, আমরা সুবিধাটা ভোগ করবো। দিনটা শেষ পর্যন্ত এলো, কিন্তু তার আগেই বন্ধুরা আমার হাত কেটে দিলো এবং মূর্খের মত যুদ্ধের আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়লো।

যুদ্ধ যখন লেগেই গেলো তখন তাঁর শেষ মিনতি ছিলো, তোমাদের ক্ষমতা তোমাদের কাছে থাক, আমাকে একবার শুধু বসতে দাও যুদ্ধের মানচিত্রের সামনে। এখনো আমি তোমাদের সাহায্য করতে পারি। কিন্তু কেউ শুনলো না, ভাবলো, সুলতানের এটা কোন চাল। জামালপাশা অবশ্য উপায়ান্তর না পেয়ে শেষ পর্যন্ত সুলতানের কাছে ছুটে এসেছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। বসফরাসের পুরো জলভাগ তখন দুশমনের দখলে।

***

আয়োজকদের পক্ষ হতে যারা মেহমানদের টিকেট-পাসপোর্ট-এর দায়িত্বে ছিলেন তারা হোটেলেই অবস্থান করছিলেন। তাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ ছিলো। তারা পূর্ণ আশ্বাস দিলেন যে, সর্বোচ্চ পর্যায়ে কথা হয়েছে এবং নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে, বিমানবন্দরে কোন সমস্য হবে না, ইনশাআল্লাহ। তবে কিনা গত রাতে চুন খেয়েছি বলে দই দেখেও ভয়!

বিকেলে আবার আল্লাহ ভরসা বলে বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা। গাড়ীর চাকা যখন ঘুরতে শুরু করলো, গতকালের মতই হলো আমাদের অবস্থা। হৃদয় কাঁদছে, চোখ টলমল করছে; ফুলগুলো বাতাসে দুলছে, দেখা যায়, তবে ঝাপসা, চোখের ঝাপসা দৃষ্টির কারণে। কে জানে, ফুলেরা বুঝতে পারে কি না, কারা ওদের ভালোবাসে, আর কারা শুধু ওদের সৌন্দর্য ও সুবাস উপভোগ করে!

***

দায়িত্বপ্রাপ্তরা আবার আমাদের আগের জায়গায় বসিয়ে টিকেট-পাসপোর্ট নিয়ে কাউন্টারে গেলেন। আজও একই অবস্থা। চারদিকে ভীষণ ব্যস্ততা। একটু পরপর যাত্রীদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা হচ্ছে, আর দলে দলে ব্যস্তত্রস্ত যাত্রিদল ছুটছে। সবাই যেন মহাকালের স্রোতের অমোঘ আকর্ষণে ছুটে চলেছে অনন্তের পানে! থামতে চাইলেও যেন থামার উপায় নেই! ঠিক তখন দুকানে বর্ষিত হলো সেই মধু! লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক; লাব্বাইকা লা-শারীকা লাকা, লাব্বাইক!! ...

তুলনাটা এই প্রথম মনে উদিত হলো। এই যে শত শত মানুষ ছুটছে, এরা সব বিমানের যাত্রী, তাই এমন উর্ধ্বশ্বাস! এমন ব্যস্ততা ও ব্যতিব্যস্ততা!! আর ওঁরা বাইতুল্লাহর যাত্রী, তাই এমন শান্ত, প্রশান্ত! ব্যস্ততার মধ্যেও এমন ধীর স্থির!! পরিষ্কার বোঝা যায়, যারা ছুটছে এখন তাদের গন্তব্য শুধু বিমানের দরজা, তাদের বর্তমান উদ্দেশ্য শুধু বিমানে আরোহণ করা; আর ওই যে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে লাব্বাইক-এর আসমানী সঙ্গীতের তরঙ্গ-ধ্বনি, তাদের গন্তব্য বহু দূরে! বিমান তাদের পথের বাহন শুধু, মান্যিল তাদের সাগর- মরুভমি পার হয়ে দূর হিজাযের মক্কা এবং কালো গিলাফে ঢাকা বাইতুল্লাহ! এমন স্পষ্ট পার্থক্য এমন করে আর কখনো আমার চোখে পড়েনি। হে বাইতুল্লাহর মুসাফির, তোমাকে আমি দেখিনি, তবু ভালোবাসি হৃদয়ের টানে, আত্মার বন্ধনে এবং কলব ও রূহ-এর অটুট রিশতার কারণে, আমার একটা কথা শোনো, তোমার উঠা-বসায়, চলা-ফেরায়, পথে তোমার যাত্রার ব্যস্ততায়, সবকিছুতে এই পার্থক্যটা যেন দূর থেকে মানুষ বুঝতে পারে। এই যে কাঁচের পর্দার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেলো ইহরামের শুভ্রতা ধারণকারী মানুষগুলো, এই পবিত্র যাত্রাপথে তারা তাদের এক মুসলমান ভাইকে কত বড় শিক্ষা, কত বড় শান্তি দিয়ে গেলো, কখনো কি তারা জানতে পারবে! না পারুক, হে আল্লাহ, তুমি তাদের এ যাত্রাকে গ্রহণ করো মহাযাত্রার প্রস্তুতিরূপে, আমীন।

***

হঠাৎ মনে হলো, ব্যস্ততাটা একটু যেন  কমে এসেছে! ছোটাছুটিটা যেন একটু ঝিমিয়ে এসেছে!! আমরা একই রকম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে বসে আছি, আর মনে দুআ ইউনুস পড়ছি। আসলে বিপদের দু, তার যে স্বাদ তা বিপদের মধ্যে পড়লেই বোঝা যায়! তবে আজ যে স্বাদ পেলাম তা সত্যি একেবারে অন্যরকম! সাগরের আঁধারে, মাছের পেটের অন্ধকারে দৃশ্যটা যেন কেমন জীবন্ত হয়ে ভেসে উঠলো, আর একটা আশ্চর্য প্রশান্তি সর্বসত্তাকে বিধৌত করে দিলো। ভিতর থেকে যেন একটা আশ্বাসবার্তা এলো, ইনশাআল্লাহ সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। সব মুসকিল আসান হয়ে যাবে এবং তাই হলো! আমার আল্লাহর হুকুমে মুসকিল বিলকুল আসান হয়ে গেলো!! দূর থেকে ভদ্রলোকদের চেহারা দেখেই তা বোঝা গেলো। মানুষের চেহারা আসলেই স্বচ্ছ একটা আয়না!

ত্রিশ মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে সব সমাধান হয়ে গেলো। আলহামদু লিল্লাহ! সুখের সময় এবং বিপদের মুহূর্তে তোমাকে যেন মনে রাখতে পারি হে আল্লাহ!

***

দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকেরা টিকেট পাসপোর্ট বুঝিয়ে দিয়ে এবার বিদায় নিতে পারতেন, আমরা বললামও, কিন্তু তারা কিছুতেই রাজী হলেন না। মানুষগুলো আমাদের জন্য দুটো দিন শারীরিক মানসিক অনেক ধকল সয়েছেন। আমরা তাদের কী প্রতিদান দিতে পারি! বারবার শুধু جزاك الله   বললাম। এর চেয়ে উত্তম প্রতিদান কী হতে পারে!

আমাদের খুশী করার জন্য তারা অনেক রকম কথা বললেন। তোমাদের পেয়ে কটা দিন আমরা অপার আনন্দের মধ্যে ছিলাম, তোমাদের কথা আমাদের মনে থাকবে, আমাদের বিশ্বাস, আবার তোমাদের দেখতে পাবো ইস্তাম্বুলের ভূমিতে ইত্যাদি।

মেযবান মেহমানকে সৌজন্যের খাতিরে এমন করে বলে, বিশেষ করে এধরনের ক্ষেত্রে। তবে কোন্টা শুধু আনুষ্ঠানিক সৌজন্য, আর কোন্টা হৃদয়ের টান, বোঝা খুব কঠিন নয়। সৌজন্য সৌজন্য পর্যন্তই থাকে, কিন্তু হৃদয়ের কথা হৃদয়কে স্পর্শ করে।

শুধু সৌজন্য হলে দুটো ভালো কথা বলে তারা এখনই বিদায় নিতে পারতেন। কিসের টানে এখনো রয়ে গেলেন শুধু আমাদের একটু সঙ্গ দিতে, একটু আনন্দ দিতে?! এই যে একটু কিছু খাওয়ানোর জন্য তাদের ছোটাছুটি, কিসের জন্য?! আর শেষ সময়ের আলিঙ্গনের যে উষ্ণতা, তা তো এই এত দিন পরো আমরা ভুলতে পারিনি! দুনিয়ার সমস্ত বন্ধনের উপর এখানেই ঈমানী বন্ধনের অনন্যতা।

যতক্ষণ আমাদের দেখা গেলো তারা একটুও নড়লেন না। তাকিয়ে থাকলেন, আর হাত নাড়তে থাকলেন। তাদের ছলছল চোখের দৃষ্টি আমাদের হৃদয়ের পর্দায় চিরকালের জন্য আঁকা হয়ে গেলো। আর দুরসূন! নামটা বারবার ভুলে যাই, মাওলানা আব্দুল মালিক মনে করিয়ে দেন। মনে হলো, তিনি ওখানে দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু তার হৃদয় এখনো আমাদের হৃদয়কে আলিঙ্গন করে আছে! বিদায় বন্ধু বিদায়, ইনশাআল্লাহ দেখা হবে, জান্নাতে!

***

দীর্ঘ পথ হাঁটতে হলো, তবে এখানেও চলন্ত পথ ছিলো। তাই পথের দীর্ঘতা তেমন অনুভূত হলো না। যাত্রীরা যেখানে অপেক্ষা করবে সেখানে পৌঁছার পর মাগরিবের সময় হলো। আমরা নামাযের আয়োজন করছি; বিমানবন্দরের এক কর্মকর্তা, উচ্চপদেরই মনে হলো; বুঝতে পেরে নিজেই এসে কেবলা বুঝিয়ে দিলেন, আর খুব শাবাশি দিলেন। নিজে নামায হয়ত পড়েন, হয়ত পড়েন না, কিন্তু নামাযী মানুষ দেখে তার অন্তর যে পুলকিত হয়েছে সেটা বুঝিয়ে দিলেন। এ যুগে এটুকুরও অনেক মূল্য। প্রীতিপূর্ণ দৃষ্টিতে তার গমনপথের দিকে তাকিয়ে থাকলাম, আর তার কল্যাণের জন্য দুআ করলাম।

নামায শেষ করে রওয়ানা হলাম যেখানে শেষ চেকিং-এর পর বিমানে ওঠা হবে সেখানের উদ্দেশ্যে। টিকেট-পাসপোর্ট আমারটা আমার কাছেই ছিলো। সেগুলো যে নামায পড়ার স্থানে বসার বেঞ্চির উপর ফেলে যাচ্ছি আমার সে খবর নেই। মাওলানা আব্দুল মতীন, আল্লাহ তাকে উত্তম বিনিময় দান করুন, দেখে তুলে নিলেন। নইলে কপালে যথেষ্ট ভোগান্তি ছিলো। আল্লাহর মেহেরবানি, পাসপোর্ট হারানোর সমৃদ্ধ রেকর্ড আছে আমার, তবে ভোগান্তি থেকে আল্লাহ সবসময় হেফাযত করেছেন কোন না কোন বান্দার ওছিলায়।

অবশেষে ব্রিজ পার হয়ে বিমানে ওঠা হলো। সমস্যা হলো এই যে, তিনজনের আসন হলো আলাদা। আমীর ছাহেব একেবারে পিছনে, আমি মাঝামাঝি অংশে এবং আসনও পেলাম পাশের দিকে নয়, মাঝখানের সারিতে। পরে জানলাম, উপরের খোপে সামান রাখতে আমীর ছাহেবের খুব কষ্ট হয়েছে। তবে নামানোর সময় এক আজনবী যাত্রী, বুঝতে পেরে সাহায্য করেছেন। শুনে আফসোস হলো, লজ্জাও হলো যে, সফরসঙ্গী, তদুপরি আমাদের আমীর, অথচ আমরা দুজন বিষয়টা খেয়াল রাখিনি!

আটটার দিকে বিমান নড়ে উঠলো। সেই পরিচিত ধীর গতিতে রানওয়ের দিকে এগিয়ে যাওয়া, তারপর একটু থামা, তারপর সেই দৌড়, সেই দুলুনি এবং ভূমি ছেড়ে আকাশে উঠে যাওয়া।

যে কথাগুলো বললাম, শুনতে সাদামাটা মনে হলেও প্রতিটি ভাবনা আমার অনুভবের সঙ্গে গভীর ভাবে জড়িয়ে থাকে। বিমান যখন নড়ে ওঠে, আমার ভিতরটা যেন কেমন করে ওঠে, যখন দৌড় শুরুর আগে থামে, থমথমে একটা ভাব আমাকে ঘিরে থাকে, বেশ উৎকণ্ঠা বোধ হয়। যখন দৌড় শুরু করে, আমার বুকটা রীতিমত দুরু দুরু করতে থাকে। যখন চাকাগুলো মাটির স্পর্শ ত্যাগ করে আকাশে উঠে যায়, মনে হয়, এখনই তো ঘটে যেতে পারে চরম কিছু। আসলে মানুষের চেয়ে অসহায় কোন মাখলূক বিশ্বজগতে নেই। বেঁচে থাকার জন্য প্রতিমুহূর্তে তার প্রয়োজন আল্লাহর সাহায্য ও নিরাপত্তা। তবে বিমানের এই উড্ডয়নপর্বগুলোতে নিজেকে আরো বেশী অসহায় মনে হয়। তখন অন্তরে আল্লাহর প্রতি বড় কোমল একটা সমর্পিতি জাগ্রত হয়।

যে কোন দুর্ঘটনায় কিছু না কিছু জীবন রক্ষা পায়। সড়ক দুর্ঘটনা বলি, আর নৌদুর্ঘটনা। কিন্তু বিমান দুর্ঘটনায় কোন জীবন রক্ষা পাওয়া প্রায় অসম্ভব, তবু বিমানভ্রমণ মানুষের কাছে মনে হয় সবচে আনন্দের ভ্রমণ! কানে এয়ারফোন লাগিয়ে গান শোনে, আর পর্দায় ছবি দেখে; অথচ দুর্ঘটনাও ঘটছে অহরহ। সফরনামা যখন লিখছি, এই তো সেদিন মালয়েশিয়ার একটি যাত্রিবাহী বিমান এমন নিখোঁজই হলো যে, পৃথিবীর বহু দেশ মিলে দিনের পর দিন বিশাল সাগরের বুকে ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়েও তার কোন চিহ্নই উদ্ধার করতে পারলো না। কোথায় গেলো আস্ত একটা বিমান এবং তার এতগুলো যাত্রী!

বিমান চলতে শুরু করার পর থেকে আকাশে স্থির হওয়া পর্যন্ত দুরু দুরু বুকে আমি শুধু দুআ পড়তে থাকলাম।

(চলবে ইনশাআল্লাহ)

 

 

 



[1]   শব্দটা আমার নয়, ওরাই একজন অন্যজনকে বলছিলো, আমার শুধু কানে এসেছে, আর কানটা গরম হয়ে উঠেছে, তাদের কণ্ঠস্বরের উল্লাসটার কারণে। আশ্চর্য, কারো ঝামেলায়, বিপদে নিস্পৃহতা দেখেছি, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিমানবন্দরে বিভিন্ন জাতির যাত্রীদের মধ্যে, কিন্তু উল্লসিত হওয়া! এটা এই প্রথম দেখলাম, বাঙ্গালী হিন্দু বাবুদের মধ্যে। ভাবি, কী মাটি দিয়ে ভগবান  ওদের সৃষ্টি করেছেন?! ওদের দেবীমূর্তি গড়তে তো আবার বিশেষ মাটি লাগে!

আরেকটা কথা। পশ্চিমবঙ্গ বলছি আসলে আগের টানে টানে; ওরা কিন্তু এখন নাম পরিবর্তন করে পশ্চিমবঙ্গকে বলে স্রেফ বাংলা, যেমনটা ছিলো বিভাগপূর্ব ভারতে যুক্তভাবে পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গের নাম। বাবুরা অবশ্য আমাদের আশ্বস্ত করেছেন, এর পিছনে তাদের অন্তরের ডালের মধ্যে কোন কালা নেই; না থাকলেই বাঁচি।

 

আরও পড়ুন:   সফরনামা

এ সংখ্যার প্রচ্ছদ

হজ্ব এবং কুরবানী বিষয়ক প্রবন্ধসমূহ