জুমাদাল উলা ১৪২৯   ||   মে ২০০৮

এস সত্য গল্প পড়ি

হুসাইন মুহাম্মদ নূরুল্লাহ

প্রিয় শিশু কিশোর বন্ধুরা! 

তোমরা এতদিন বানর আর শৃগালের চালাকির গল্প, গাধা আর কুমিরের নির্বুদ্ধিতার গল্প, আরো কতসব মিছে মিছে গল্প পড়ে একেবারে ক্লান্ত হয়ে পড়েছ।

সেই সব মিথ্যে গল্পের জাল ছিঁড়তে তোমাদের   জন্য  একজন  কিশোর  সাহাবীর জীবনকাহিনী লেখার আশা করছি। আশা করি তাঁর জীবনের সেই আলোকময় পথে হেঁটে হেঁটে একদিন তোমরাও হয়ে উঠবে অনেক বড়।

আজ আমি  তোমাদেরকে  যে  মহান সাহাবীর কথা শুনাব তিনি হলেন উম্মতে মুহাম্মাদীর মহাজ্ঞানী, কুরআনের ভাষ্যকার হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস রাযিয়াল্লাহু আনহু।

তার বাবা আবুল ফযল আববাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব ইসলামের প্রথম যুগেই ইসলাম গ্রহণ করেন।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস রা.-এর মাতা হচ্ছেন উম্মুল ফযল লুবাবা বিনতে হারেস রাযিয়াল্লাহু আনহা।

তিনি হযরত খাদিজা রাযি.-এর পরেই ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেন।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আববাসের জন্ম হয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হিজরতের তিন বছর পূর্বে। রাসূলের ইন্তিকালের সময় তার বয়স হয়েছিল ১৩ বছর। জন্মের পর পরেই তাঁকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটে নিয়ে আসা হলে তিনি শিশু আব্দুল্লাহর মুখে পবিত্র থুথু দিয়ে তাহনীক করেন এবং এই দুআ করেন, যার মর্ম হল হে আল্লাহ আপনি তাকে ফিকহ ও তাফসীরের অগাধ জ্ঞান দান করুন।

শিক্ষার প্রতি অনুরাগ

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত ইবনে আববাসকে ইসলামের শুরুর বিষয়গুলো শিখিয়েছিলেন, শিখিয়ে ছিলেন ইসলামের মৌলিক কথাগুলো। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আববাসের প্রতিভার পরিচয় মিলে তার ছোটবেলাতেই। সেই বালকের মাঝে প্রতিভার জন্ম নিবে না কেন যে পেয়েছে শ্রেষ্ঠ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদরমাখা বিরল মর্যাদা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জ্ঞান আর প্রজ্ঞার গভীর ঝর্ণাধারা থেকে কুড়িয়ে নিয়েছে যে অসংখ্য মণি-মুক্তা। যার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হৃদয় উজাড় করে দুআ করেছেন আল্লাহ তাআলা যেন তাঁকে দ্বীনের গভীর ইলম দান করেন। কেন তার মাঝে প্রতিভার জন্ম নিবে না যার মুখে সর্বপ্রথম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মুখের লালা প্রবেশ করেছে।

শিক্ষার প্রতি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস রা.-এর অনুরাগ ছিল অসাধারণ। ইলমের অন্বেষায় কোনোরূপ অহংকার করতেন না, দেমাগ দেখাতেন না। ছোট-বড়-আযাদ-গোলাম যার কাছেই ইলমের একটি ফোঁটা, জ্ঞানের একটি কণার সন্ধান পেতেন, তার কাছ থেকেই চেয়ে নিতেন ভিখারীর মত। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আববাসের ইলম আহরণের তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও প্রবল প্রয়াস লক্ষ করে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন যে, আমরা যে সুযোগ পেয়েছি (দীর্ঘ দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহচর্য) এই বালক যদি তা পেত তাহলে কোনো বিষয়েই আমরা তার সমান হতে পারতাম না।

যুহুদ ও ইবাদত

ইবাদত হচ্ছে আল্লাহর দাসত্ব আর যুহুদ হচ্ছে দুনিয়ার যাবতীয় সুখশান্তি প্রাচুর্যের মোহ ত্যাগ করা।

রাসূলের গৃহকোণই ছিল হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস রা.-এর প্রথম মাদরাসা। যেখানে তিনি ইবাদত ও ত্যাগের যথার্থ শিক্ষাগ্রহণ করেছিলেন। তাই কালে যুহুদ ও ইবাদতের মূর্ত প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন।

যুহুদ ও ইবাদতের দোলনায় যিনি লালিত-পালিত হয়েছেন তিনি এমন হবেন এটাই স্বাভাবিক।

ইবাদতের প্রশ্নে আর খোদার আনুগত্যের প্রশ্নে তিনি কখনোও আপোষ করতেন না। এ ব্যাপারে যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করতে তিনি প্রস্ত্তত ছিলেন। এমনকি নিজের চোখ দুটি হলেও। হাঁ এমনই ঘটেছিল হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আববাসের জীবনে। তিনি যখন বার্ধক্যে পা রাখলেন তখন তার নেত্রনালী শুকিয়ে গেল। খোদার ভয়ে তিনি যে রাত দিন কাঁদতেন, চোখের তপ্ত অশ্রু ঝরাতেন, এ জন্যই তাঁর এই অবস্থা হয়েছিল।

চোখের পানির বইতে বইতে তার গালের উপর দুটি কালো দাগ পড়ে গিয়েছিল।

যেন জলপ্রপাতের ধারা।

ইন্তিকাল

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস রা. জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলো নীরবে-নিভৃতে কাটিয়ে দেয়ার জন্য তায়েফ নগরীকে বেছে নিলেন। কারণ তায়েফ হল নির্মল আবহাওয়াযুক্ত এক উঁচু ভূমি।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস রা. তায়েফে যাওয়ার পর ইলম পিয়াসী ছাত্ররা আশপাশ ও দূর দূরান্ত থেকে দলে দলে তাঁর কাছে আসতে থাকে।

হযরত ইবনে আববাসও অকাতরে বিলিয়ে দিতে থাকেন ইলমে ইলাহী ও ইলমে নববীর অমিয় সুধা। ইলমের আঙ্গিনায় ইলমের বুলবুলিদের মাঝে মধু বিলাতে বিলাতে কবে যে ফুরিয়ে গেল তাঁর জীবনের সত্তুরটি বসন্তু কে জানে? এমনি একদিন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আববাসের ইন্তিকাল হল। ইলমের এক মহাসাগরের মৃত্যু হল। 

 

 

advertisement