যিলকদ ১৪২৯   ||   নভেম্বর ২০০৮

বিদআতের অন্ধকার এবং আশার আলো

ড. মাওলানা মুশতাক আহমদ

বিদআতের অন্ধকার এবং আশার আলো

যে কোনো মানুষের ভিতর স্বভাবগত দুটি শক্তি আছে। একটিকে বলা হয় কুওয়াতে হায়ওয়ানী আর অপরটিকে বলা হয় কুওয়াতে মালাকী। উভয় শক্তিই মানব মনে অবস্থানপূর্বক বাইরের কোনো সৌন্দর্যকে স্বাগত জানায়। তন্মধ্যে কুওয়াতে হায়ওয়ানী স্বাগত জানায় মন্দ জিনিসের সৌন্দর্যকে। আর কুওয়াতে মালাকী স্বাগত জানায় ভালো জিনিসের সৌন্দর্যকে। বিদআতের বাহ্যিক সৌন্দর্যকে মানব  মনের কুওয়াতে হায়ওয়ানী স্বাগত জানায় যা পরিণামে মানুষের জন্য আদৌ হিতকর নয়। কিন্তু মূর্খ লোকেরা বিষয়টি গভীরভাবে বুঝে না বলেই মনে আকর্ষণ পেয়ে ভালো মনে করে মন্দ কাজে পতিত হয়।

হাদীসে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, শীঘ্রই আমার উম্মতের মধ্যে এমন লোকজনের উদ্রেক হবে যাদের শরীরের গিরায় গিরায় বিদআত প্রবণতা এমনভাবে ছড়িয়ে পড়বে যেভাবে পাগলা কুকুর কামড় দেওয়ার বিষ দংশনকৃত ব্যক্তির শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। তার শরীরের কোনো গিরা বা জোড়া অবশিষ্ট থাকে না যেখানে এ বিষ না ঢুকে। (ইমাম আহমদ, ইমাম আবু দাউদ সূত্র : মিশকাত ৩০)

উপরোক্ত হাদীস থেকে বুঝা যায় বিদআত হল পাগলা কুকুরের বিষের মতো জঘন্য। তাছাড়া এই বিদআত যদি কারো জীবনে প্রবেশ করে তাহলে কুকুরের বিষের মতো তার জীবনের সকল অংশকে বিষাক্ত করে ফেলে। কুকুর দংশনকৃত ব্যক্তি সাধারণত পানি দেখলে ভয় পায়। পানি থেকে খুব দূরে অবস্থান করে অবশেষে পিপাসার্ত হয়ে মারা যায়। তদ্রূপ বিদআতকারীর উপর নাফসানী খাহিশ প্রবল হয়। সে সহীহ ইলমকে ভয় পায়। সহীহ ইলম থেকে দূরে থাকে। অবশেষে সহীহ ইলমের অভাবে বিভ্রান্ত অবস্থায় মারা যায়।

এভাবে বিদআত রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়লে মানুষের ঈমান আকীদা ও চিন্তাধারার মধ্যেও প্রবেশ করবে বিকৃতি। লোকেরা এই বিদআতগুলোর উপরই শৈশব কৈশোর যৌবন কাটিয়ে দিবে। জীবন খতম হয়ে যাবে অথচ সুন্নতের সন্ধান পাবে না। অধিকন্তু বিদআতকেই মনে করবে শরীয়ত ও সুন্নত।

এমনও হবে যে, সেই বিদআত পালন যদি কখনও কারো ছুটে যায় তখন অন্যরা তাকে লজ্জা দিবে। তাকে ধিক্কার দিয়ে বলবে, হায়! তুমি তো সুন্নাহ ছেড়ে দিয়েছো, ইসলাম ছেড়ে দিয়েছো।

হযরত আলকামা থেকে বর্ণিত যে, একবার সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা বললেন, সেই সময়ে তোমাদের অবস্থা কী দাঁড়াবে যখন এমন দীর্ঘস্থায়ী বিপর্যয় তোমাদের গ্রাস করবে যে, যুবক লোকটি এ বিপর্যয়ের মধ্যে বৃদ্ধে পরিণত হচ্ছে, ছোটরা বয়স্কে পরিণত হচ্ছে। যখন কোনো বিদআত ছুটে গেলে বলাবলি শুরু হবে যে, তুমি সুন্নাহ ছেড়ে দিয়েছ। শাগরিদরা বলল, কখন অবতরণ করবে এই বিপর্যয়? তিনি বললেন-যখন তোমাদের সামনে হক্কানী আলেমগণ বিদায় নিয়ে যাবেন। তাদের জায়গায় মূর্খদের প্রতিষ্ঠা বৃদ্ধি পাবে, তোমাদের মাঝে কারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে অথচ প্রাজ্ঞ ফকীহের সংখ্যা হ্রাস পাবে। নেতার সংখ্যা বেড়ে যাবে অথচ আমানতদার লোকের সংখ্যা কমে যাবে। যখন দুনিয়ার রুটি রোজগার তালাশ করা হবে আখিরাতের আমল দিয়ে এবং দ্বীনী ইলম শিক্ষা করা হবে দুনিয়া কামাইয়ের উদ্দেশ্যে। (ইমাম দারেমী, আস সুনান ১/৬৪)

বিদআত প্রতিরোধ ও সুন্নাহ প্রতিষ্ঠার মেহনতেও থাকবে একদল ভাগ্যবান

বিদআত ইয়াহূদ নাসারার ধর্মে অনুপ্রবেশ করে যেভাবে তাদের ধর্মকে বিকৃত করেছে সেভাবে মুসলমানদের মধ্যেও তা অনুপ্রবেশ করবে। তবে পার্থক্য এই যে, ইয়াহূদ নাসারার মধ্যে এমন কোনো দল ছিল না যারা পাশাপাশি বিদআতের প্রতিরোধ বরং সুন্নাহ প্রতিষ্ঠার জন্য মেহনত করে যাবে। পক্ষান্তরে ইসলাম ও মুসলমানদের অবস্থা তা থেকে ভিন্ন। মহান আল্লাহ তাআলা কিয়ামত পর্যন্ত এমন একটি দলকে অবশিষ্ট রাখবেন যারা সকল ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে বিদআতের প্রতিরোধ ও সুন্নাহ প্রতিষ্ঠার মেহনত চালিয়ে যাবেন।

হযরত সাওবান রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আমার উম্মতের একটি দল সুপ্রতিষ্ঠিত থাকবে হকের উপর। শত্রুরা যাদের ক্ষতিগ্রস্ত করতে সক্ষম হবে না। এ দলটি এভাবে হকের উপর থাকবে আল্লাহর নির্দেশ (কিয়ামতের প্রত্যক্ষ আদেশ) আসা পর্যন্ত। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৪৯৫০ #

 

 

advertisement