শাবান-রমযান ১৪৩৬ . জুন-জুলাই ২০১৫

পুরোনো সংখ্যা . বর্ষ: ১১ . সংখ্যা: ০৬

তুরস্কে, তুর্কিস্তানের সন্ধানে-১০

(পূর্বপ্রকাশিতের পর)

ইস্তাম্বুলে এটি আমাদের দ্বিতীয় রাত এবং যতদূর জানতাম, শেষ রাত। স্বভাবতই মনটা খুব বিষণ্নইস্তাম্বুলকে ভালোবেসেছি শৈশব থেকে। আমি তো সাধারণ মানুষ! আরবের আজমের সর্বমান্য ব্যক্তিগণও বলেছেন একই কথা। আলী তানতাবী লিখেছেন যখন থেকে দুহরফ পড়তে শিখেছি, ইস্তাম্বুলের নাম জানি, আর যখন দুহরফ লিখতে শিখেছি, তখন থেকে ইস্তাম্বুল আমার হৃদয়রাজ্যের রাজধানী। আল্লামা তক্বী উছমানী লিখেছেন, এ ভূখণ্ডের সঙ্গে শুরু থেকেই ছিলো হৃদয়ের সম্পর্ক।

দুদিন হলো এসেছি আমার স্বপ্নের ইস্তাম্বুল শহরে। মাত্র তো দুটি দিনের সান্নিধ্য, তাতেই কেমন একটা মায়া পড়ে গেছে এই শহরের প্রতি, গাছের পাতা ও ফুলের প্রতি; বসফরাসের নীল পানি ও তার ঢেউয়ের প্রতি। দূর থেকে ছিলো ভালোবাসা, কাছে এসে ভালোবাসার কলিটি হয়েছে মায়া-মমতার ফুল! ইস্তাম্বুল ছেড়ে যেতে হবে, ভাবতেই বুকের ভিতরে কোথায় যেন চিনচিনে একটা ব্যথা অনুভব করি।

এই যে যাবো, আর কি কখনো আসা হবে মিনারের শহর ইস্তাম্বুলে! ইস্তাম্বুলের আলো-বাতাসের সান্নিধ্যে! বসফরাসের দুই তীরে!!

দুদিনের খণ্ড খণ্ড অবসরে ইস্তাম্বুলের কতটুকু আর দেখা হলো! হযরত আবূ আইয়ূব আনছারী রা.-এর মসজিদে হয়ত আগামীকাল যাওয়া হবে। না হলে তো আফসোসের  সীমা থাকবে না।

ইস্তাম্বুলের এশীয় অঞ্চলে বোধহয় যাওয়া হলো না! বসফরাসের ঐ যে ওপারে এশীয়ার ইস্তাম্বুল, দিনে রাতে কত দেখেছি সতৃষ্ণ নয়নে। দূর থেকে মসজিদের মিনারগুলো যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে,  হে দূরদেশের মুসাফির, এসো, একবার এসে দুরাকাত নামায পড়ে যাও। আমাদেরও প্রাণের আকুতি, তোমাদের একটু কাছে পাই!

আল্লামা তক্বী উছমানী এবং অন্য অনেকে লিখেছেন, ইস্তাম্বুলের এশীয় অংশটিও খুব সুন্দর ও সুবিস্তৃত। পুরো শহরটি উঁচুনীচু পাহাড়ের উপর অবস্থিত। মসজিদগুলো দূর থেকে যত সুন্দর, কাছ থেকে এবং ভিতর থেকে আরো সুন্দর।

স্বপ্ন শেষ হওয়ার মুহূর্তে হৃদয়ের ভূমিতে নতুন করে একটি স্বপ্ন অঙ্কুরিত হলো; যদি সম্ভব হয় সালমানকে সঙ্গে করে আরেকটু সময় নিয়ে আবার আসবো আমার তুরস্কে, আমার প্রিয় ইস্তাম্বুলে।

রাত গভীর থেকে গভীরতর হলো, আমার চোখে ঘুম নেই। স্বপ্নাবিষ্টের মত তাকিয়ে আছি বসফরাসের পানির দিকে। জাহাজটি এখনো আছে একই স্থানে, যেন অতীতের রহস্যময় এক ছায়া! এখান থেকে কাসিমপাশা কত দূর কে জানে! মানচিত্র দেখে যদ্দুর মনে হয়, খুব বেশী দূরে হওয়ার কথা নয়। স্বর্ণশৃঙ্গের প্রবেশমুখটা মনে হয় দেখা যাচ্ছে; হতে পারে আমার মনের ভুল। তবু ভিতরটা বেশ রোমাঞ্চিত হলো।

ইংরেজ ঐতিহাসিক গীবন এবং অন্য অনেক অমুসলিম লেখক বিস্ময় প্রকাশ করে লিখেছেন, স্থলে সমতল ভূমিতেই তো জাহাজ চালিয়ে নিয়ে যাওয়া রীতিমত অচিন্তনীয়, তদুপরি কাসিমপাশা পর্যন্ত দশমাইল পথে রয়েছে বেশ কিছু পাহাড়ের চড়াই-উতরাই। কীভাবে তা সম্ভব ছিলো?! তার চেয়ে বড় কথা, মুহাম্মাদ আলফাতিহ কীভাবে সাহস করেছিলেন?! প্রযুক্তিসমৃদ্ধ আজকের যুগেও তো মানুষের পক্ষে তা কল্পনা করা সম্ভব নয়, তাও মাত্র একরাত্রে! এখানে এসে ঐতিহাসিক গীবন আর বিস্ময়ের মাত্রা সামলাতে পারেননি; মিরাক্ল শব্দটি নিজের অজান্তেই যেন লিখতে বাধ্য হয়েছেন।

বসফরাসের দুই তীরে ঠিক বরাবরে দুটি স্থাপনার উপর লাল বাতি জ্বলছে, নিভছে। মানচিত্র থেকে বোঝা যাচ্ছে, আর মনও বলছে ওপারের বাতিটি আনাতোলিয়া দুর্গের, যা সুলতান বায়যীদ ইয়লদরম নির্মাণ করেছিলেন। এপারের বাতিটি রোমেলি দুর্গের, যা নির্মাণ করেছিলেন সুলতান মুহাম্মাদ আলফাতিহ, এবং প্রিয় পাঠক, আশা করি তোমার মনে আছে, মাত্র চারমাস চারদিনে!

***

বসফরাসের ইউরোপীয় তীরে একটি অঞ্চলের নাম হচ্ছে বারবোসা। এ নামটিও অমার অন্তরে গেঁথে আছে যৌবনের শুরু থেকে। এখানেই জন্মগ্রহণ করেছেন মুসলিম উম্মাহর নৌজিহাদের ইতিহাসের বিস্ময় খায়রুদ্দীন বারবোসী রহ.। স্পেনের পতনযুগে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিতাড়িত হাজার হাজার মুসলিম শিশু-নারী-পুরুষকে তিনি স্পেন থেকে মরক্কো-আলজিরিয়ায় পৌঁছে দেয়ার দুঃসাহসী দায়িত্ব পালন করেছেন, বলা যায়, শুধু ঈমান ও জিহাদের জাযবায় উদ্বুদ্ধ হয়ে। তিনি এবং তাঁর ক্ষুদ্রনৌবহরটি যদি তখন এগিয়ে না যেতো জাবালে তারিকের তুফানি দরিয়ায় তাহলে আরো হাজার হাজার অসহায় মুসলিম, রক্তপিপাসু খৃস্টানদের তলোয়ারের খোরাক হতো। ইসলামের ইতিহাসে খায়রুদ্দীন এবং তাঁর জন্মভূমি বারবোসার নাম অমর হয়ে থাকবে। আল্লাহ তাঁর তুর্বতকে   ঠাণ্ডা রাখুন-

আসমান উসকে লহদ পর শবনম আফসানী ক্যরে/ স্যবযায়ে নওর‌্যস্তা উস ঘরকি নেগাহবানী ক্যরে।

(আকাশ যেন তাঁর সমাধিপরে শিশির ঝরায়/ সবুজ গালিচা যেন এ ঘর ঢেকে রাখে।)

আমার জানা ছিলো না এই মরদে মুজাহিদের কবর কোথায়? আল্লামা তক্বী উছমানীর সফরনামা পড়ে জেনেছি, এই বসফরাসের তীরে জন্মভূমি বারবোসাতেই তিনি মাদফন হয়েছেন এবং আল্লামা উছমানী তাঁর কবর যিয়ারাতের সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। তিনি লিখেছেন-

বসফরাসের তীরে অবস্থিত একটি হোটেলে দাওয়াত দেয়া হলো, আমরা গেলাম। হোটেলটির কাছেই বসফরাসের কিনারে একটি প্লাটফর্মের মত ছিলো, তার পাশে ছিলো একটি মাজার। পথপ্রদর্শক বললেন, এটি হচ্ছে সুপ্রসিদ্ধ তুর্কী নৌমুজাহিদ খায়রুদ্দীনের মাযার। তাঁর আমলে এই প্লাটফর্ম নৌবন্দররূপে ব্যবহৃত হতো। ...

ইসলামের ইতিহাসের গৌরব এই মুজাহিদের কবরে ফাতেহা পড়ার সৌভাগ্যও লাভ করলাম।

আমার মত গোনাহগারের কি আর সে সৌভাগ্য হবে! এই গভীর রাতে বসফরাসের তীরে হোটেলের নির্জন ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে প্রাণের সবটুকু আকুতি ঢেলে দিয়ে শুধু বললাম, হে আল্লাহ, তাঁকে তুমি তোমার শানমত জাযা দান করো, আর তোমার সৃষ্টি সাগর-মহাসাগরের এই বিশাল জলরাশিতে আবার আমাদের সেই আধিপত্য দান করো। খায়রুদ্দীনের উত্তরসূরী আমরা, অথচ এমনকি পারস্য উপসাগরেও আমাদের জাহাজ থামিয়ে তল্লাসী চালায় ওরা; দেখতে চায়, ইউরেনিয়াম পাচার হচ্ছে কি না, ইরানে, পাকিস্তানে! এ যিল্লতি ও লাঞ্ছনা থেকে আমাদের তুমি উদ্ধার করো হে আল্লাহ!

এ উম্মতের আজ যেমন প্রয়োজন খায়রুদ্দীন যিরিকলী-এর তেমনি প্রয়োজন খায়রুদ্দীন বারবোসী-এর। শত খায়রুদ্দীন তুমি আমাদের দান করো হে আল্লাহ!

বসফরাসের বুকে ভাসমান জাহাজটির দিকে তাকিয়ে কেন জানি মনে পড়ে গেলো কবি ফররূখের সেই অমর কবিতা-

পাল তুলে দাও ঝাণ্ডা ওড়াও সিন্দাবাদ!

***

ফজরের পর নাস্তার জন্য ডাইনিং হলে গিয়ে দেখি অন্যরকম অবস্থা। খাবারের ঘর না হলে সহজেই বলা যেতো, যেন এক ভাঙ্গা হাট! বোঝা গেলো রাতেই অনেক মেহমান বিদায় নিয়েছেন। যারা আছেন, তাদের মধ্যেও সেই সজীবতা যেন নেই, যা গতকালও দেখেছি। খেতে হবে, তাই যেন খাওয়া। আমাদের অবস্থাও একই রকম। এমনকি আজ আমি সেই মৌচাকের মত মিষ্টিটার কথাও ভুলে গেলাম। মনে পড়লো যখন কফির কাপে চুমুক দেয়া হয়ে গেছে। অথচ আফসোস হলো না! মনে হলো, যাক গে, তেতো মুখে মিষ্টিটা হয়ত আর তেমন মিষ্টি লাগবে না!

দুএকজন মেহমানের সঙ্গে কথা হলো। তারা আজ দুপুরের আগেই বিদায় নিচ্ছেন। তাদের সঙ্গে খুব আন্তরিকভাবে বিদায় মুছাফাহা করলাম। যত দূর দেশেই থাকি আমরা, যে বর্ণই ধারণ করি দেহে এবং যে ভাষাই উচ্চারিত হয় আমাদের মুখে, হৃদয়ের বন্ধন এবং দিলের রিশ্তা যে আমাদের অভিন্ন, ঈমানের সূত্রে যে আমরা ভাই ভাই, এধরনের সময়ে আমাদের মত মানুষের অনুভূতিতেও তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আশ্চর্য

 وداعا إلى لقاء বলার সময় সবারই চোখ ছলছল করে উঠলো! অথচ সম্মেলন-চলাকালেও দেখা হয়নি; এখনই দেখা, এখনই বিদায়, তারপরো হৃদয়ের তারে টান পড়ে! এটা কিসের টান? আর কিছু না, শুধু ঈমানের টান!

বাইরে এসে দেখি, সেই আধফোটা ফুলের কলিদুটি! হাতে কাগজের টুকরো। ইচ্ছে হলো, চুপি চুপি পিছনে গিয়ে শুনি কী বলে! কিন্তু তার আগেই আমাদের দিকে ফিরে গেলো এবং এগিয়ে এলো। সালাম দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলো। এবার নতুন যে জিনিসটা দেখলাম সেটা হলো ওদের ছলছল চোখ! আমাকে অবাক করে দিয়ে একসঙ্গে বলে উঠলো-

وداعا إلى لقاء

অবাক হলাম, কারণ একটু আগে আমি নিজেই নাইজেরিয়ার এক মেহমানকে একথা বলেই বিদায় জানিয়েছি! মাথায় হাত বুলিয়ে আদর জানাতে গিয়ে চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারলাম না। হাতের ইশারায় ওদের একটু অপেক্ষা করতে বলে খাবারঘরে গেলাম। দুটো শুকনো মিষ্টি কাগজে পেঁচিয়ে নিয়ে এলাম। ওদের হাতে দিলাম। বলা ভালো, দিতে চাইলাম। ওরা দ্বিধায় পড়ে গেলো। একজন আরেকজনকে কী বললো বুঝতে পারলাম না। ছেলেটি দৌড়ে চলে গেলো হোটেলের পাশে শামিয়ানাঘেরা অংশটার দিকে। অস্থায়ীভাবে টানানো হয়েছে, যাতে অতিথি মহিলারা কিছুটা সচ্ছন্দে বিচরণ করতে পারে। একটি পরে ফিরে এসে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো। অর্থাৎ মায়ের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে এসেছে।

এই শিশুরা একদিন বড় হবে, আজকের কথা হয়ত মনে থাকবে না। কিন্তু আমি তো মৃত্যু পর্যন্ত ভুলতে পারবো না ওদের কথা। এই সফরনামা যখন লিখছি, ওরা আরো চারবছর বড় হয়েছে। আশা করি, সুন্দর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথেই ওরা এগিয়ে চলেছে। সকল প্রতিকলতা থেকে, সকল দুর্যোগ থেকে আল্লাহ ওদের রক্ষা করুন। মুসলিম জাহানের যেখানে যত শিশু আছে সবাই যেন নিরাপদে থাকে। ইসলামের সম্পদরূপে সবাই যেন বড় হয়। ইসলামের ঝাণ্ডা হাতে সবাই যেন এগিয়ে যায়। মুসলিমজাহানে যা কিছু ঘটছে, বিশেষ করে মিশরের রাজপথে যেভাবে মুসলিম তরুণদের রক্ত ঝরছে তাতে বুকটা যদিও দুরু দুরু করে তবু কামনা করি, আজকের শিশুদের বুক যেন সামনের দিনগুলোতে আর ঝাঁঝরা না হয়; দুশমনের গুলিতে হয় যদি হোক, মুখে কালিমা আছে, এমন কারো বন্দুকের গুলিতে যেন না হয়!

***

আমীর ছাহেব আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন মুহিউদ্দীন আওয়ামার সঙ্গে দেখা করার। ঢাকা থেকে নয়া দিল্লী পর্যন্ত টিকেটের বিষয়টি তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিতে হবে। যদিও ইস্তাম্বুলে এসেই তাঁকে জানানো হয়েছে এবং তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, তবে আমীর ছাহেব ভাবছেন, শত ঝামেলার মধ্যে তাঁর মনে নাও থাকতে পারে।

বেশী খুঁজতে হলো না। হোটেলের লবিতেই পেয়ে গেলাম। কিছু বলার আগেই তিনি বললেন, তোমাদের বিষয়টি আমার মনে আছে। আমার ভাই তোমাদের কামরায় পৌঁছে দেবেন। বিব্রত হওয়ার মত অবস্থা, কিন্তু আল্লাহর মেহেরবানি, হঠাৎ আমার মুখ থেকে বের হয়ে গেলো; আমি আসলে এসেছি আরেকটি আরযি নিয়ে। যদি আপনার সম্মানিত পিতার সঙ্গে আমাকে একটু দেখা করিয়ে দিতেন, বড় কৃতজ্ঞ হতাম।

কথাটা আগে থেকে মাথায় ছিলো না, কিন্তু আল্লাহর শোকর, মাথায় এসে গেলো। নিয়ত করে নিলাম এবং বলে ফেললাম।

তিনি বললেন, অবশ্যই অবশ্যই। এসো আমার সঙ্গে।

নিয়ে গেলেন সম্ভবত হোটেলের তৃতীয় তলায়। কামরার দরজায় এসে, যেন কত বড় অন্যায় করছেন, এমন ভঙ্গিতে বললেন, দয়া করে তুমি একটু অপেক্ষা করো, আমি ওয়ালিদে মুহতারাম থেকে অনুমতি নিয়ে আসি।

কথার চেয়ে বলার ভঙ্গিটা আমাকে বেশী আপ্লুত করলো। এমন কথা হয়ত আমিও বলতে পারবো, কিন্তু এমন আদা ও আন্দায চেষ্টা করেও হয়ত পারবো না! এটা চেষ্টার বিষয় নয়, এটা স্বভাব ও সংস্কৃতির বিষয়, কিংবা এটা ...।

তিনি ফিরে এসে বললেন, এসো, ভিতরে এসো। ওয়ালিদে মুহতারাম তোমার সঙ্গে দেখা করে খুশী হবেন।

ভিতরে আমার জন্য অপেক্ষা করছিলো আরো বড় বিস্ময়! শায়খ আওয়ামাহ-এর সঙ্গে বসে আছেন শায়খ ছাবূনী। সম্ভবত ফুত থেকে ফারেগ হয়ে গাহওয়া পান করছেন। ছোট ছোট পেয়ালা দেখে সেটাই মনে হলো।

আরবীয় আতিথেয়তার প্রথম সম্ভাষণ হলো أهلا وسهلا ইসলামের পূর্বযুগ হতেই এটা আরবীয় সংস্কৃতির অংশ। ইসলামের পর থেকে আগে সালাম, তারপর أهلا وسهلا

অনেকবার পেয়েছি এটা, কিন্তু শায়খ আওয়ামার যবানে তার মাধুর্যই ছিলো অন্যরকম। কৃতজ্ঞতায়, কৃতার্থতায় আমি যেন বাকহারা হয়ে গেলাম। আল্লাহ তাআলা দয়া করে কথা যুগিয়ে দিলেন, বললাম, মুছান্নাফে ইবনে আবী শায়বার যে তাহকীক আপনি করেছেন, আহলে ইলমের উপর এটা সত্যি আপনার অনেক বড় ইহসান। বাংলাদেশের আহলে ইলমের জন্য অনেকগুলো নোসখা আপনি হাদিয়া পাঠিয়েছেন। শায়খ আব্দুল মালিকের মাধ্যমে আমিও একটি নোসখা পেয়েছি। ইচ্ছা ছিলো আপনার শোকর আদায় করার, আল্লাহর ইচ্ছায় আজ সুযোগ পেয়েছি। আল্লাহ আপনাকে উত্তম থেকে উত্তম বিনিময় দান করুন।

আমি বলছি, আর তিনি মৃদু মৃদু হাসছেন। শেষে শুধু বললেন-

ذلك فضل الله يؤتيه من يشاء

যতক্ষণ কথা বলছি, শায়খ ছাবূনী আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তাঁরও মুখে ছিলো মৃদু হাসি এবং আমি আমার মত করে ভাবলাম, সে হাসিতে ছিলো আনজান মুসাফিরের প্রতি স্নেহের স্নিগ্ধতা।

শায়খ আওয়ামাহ একটি ফল এগিয়ে দিলেন, আর গাহওয়া পছন্দ করবো কি না জিজ্ঞাসা করলেন।

আমি ولي فيها مآرب أخرى এর ইত্তেবা করে বলতে শুরু করলাম, গাহওয়া আমার কত প্রিয়, আর মরহূম শায়খ আব্দুল্লাহ বিনবাযের মজলিসে কীভবে গাহওয়ার স্বাদ গ্রহণ করেছিলাম।

তিনি নিজের হাতে গাহওয়া ঢেলে

এগিয়ে দিলেন। আমি বললাম। আপনার এখানে فضيلة الشيخ الصابوني এর যিয়ারাতও হয়ে যাবে, কল্পনায়ও ছিলো না। ওয়া লিল্লাহিল হামদ, সেটাও হয়ে গেলো। আপনার অনুমতি হলে তাঁর খেদমতে দুটি কথা আরয করতে চাই।

উভয়ে একসঙ্গে বলে উঠলেন, লা বাসা, লা বাসা।

আমি বললাম, বহু বছর থেকে আপনার রচিত صفوة التفاسير থেকে ইসতিফাদা করছি, বরং সঠিক অর্থে কোরআন ফাহমি - এর ক্ষেত্রে এটা আমার জন্য রাহনুমা-এর কাজ করছে। তখন থেকে আল্লাহর ওয়াস্তে আপনাকে মুহব্বত করি। দিলে বড় তামান্না ছিলো একবার যদি আপনার যিয়ারাতের সৌভাগ্য হতো! গতকাল সে তামান্না আল্লাহ তাআলা পূর্ণ করেছেন, আর এখন তো নূরুন আলা নূর হয়ে গেলো।

ধারণা তো ছিলো, সুযোগ যদি হয়ও এক দুমিনিটের বেশী হবে না, কিন্তু দশমিনিটের মত সময় পেলাম। উভয় শায়খ বিভিন্নভাবে শফকতের ইযহার ও প্রকাশ করলেন। দেশে কী কাজ করি, জিজ্ঞাসা করলেন। কাজের কামিয়াবি ও বরকতের জন্য অনেক দুআ দিলেন। অবশেষে আপ্লুত হৃদয়ে উভয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বের হয়ে এলাম। লিফ্টের দরজা পর্যন্ত এসে মুহিউদ্দীন আওয়ামা বিদায় দিলেন। তাঁকেও অনেক অনেক জাযাকাল্লাহ বললাম।

***

আমাদের জানানো হলো, আজ বিকেলে বিমানবন্দরে যেতে হবে। পাঁচটার আগেই যেন প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রাখি।

সময় ধীরে ধীরে কমে আসছে। এটাই সময়ের চিরন্তন নিয়ম। তুমি ঘড়ির কাঁটা ধরে রাখতে পারো, ঘড়ির কাঁটা থামিয়ে রাখতে পারো না। আমীর ছাহেব বললেন, সময় তো খুব কম। এখনই যদি আমরা বের হই তাহলে জামে আবু আইয়ূব আনছারী রা. যিয়ারত করে ফিরে আসতে পারি।

হোটেলের সামনে থেকে একটি ট্যাক্সি নেয়া হলো। চালক বেশ হাসিখুশী এবং উর্দূতে যাকে বলে মিলনসার। বাংলা শব্দটায় তেমন আবেদন নেই, মিশুক। যা কিছু কোমলতা ছিলো তাও গাড়ীর নাম রেখে মুছে দেয়া হয়েছে।

এখানে অবস্থা আরবদেশের মত নয়, গাড়ীর চালক সবাই তুর্কী। গাড়ীর মত তার চালকও যথেষ্ট পরিচ্ছন্ন। হয়ত অতিশয়তা মনে হবে, তবু বলতে ইচ্ছে করে, চালকের মত তার গাড়ীকেও মনে হলো আন্তরিক! হাঁ, মনে হলো নিজের দেশে নিজের গাড়ীতে উঠেছি। আসলে মনে হলো, আরো অনেক কিছু, তবে সেটা বলতে কলমে বাধে, এই যা।

আমাদের হোটেল বসফরাসের একেবারে নিকটে। সেখান থেকে জামে আবূ আইয়ূব যথেষ্ট দূরে, বলতে গেলে ইস্তাম্বুল শহরের একেবারে দক্ষিণ-পূর্ব কোণে।

তুর্কী চালকের সঙ্গে আমীর ছাহেবের ইংরেজিতে টুকটাক কথা হলো, যদিও উভয়ের ইংরেজি নাযুক অবস্থায় ছিলো, আর আমার ইংরেজি তো যাকে বলে সঙ্গীন! তাই আমি নীরবতা অবলম্বন করাই ভালো মনে করলাম। চালকের কাছ থেকে কয়েকটি তুর্কী শব্দ শেখা হয়েছিলো, একটা মনে আছে, আর্কাদশি, মানে ভ্রাতৃত্ব।

ইস্তাম্বুল শহরে কয়েকটি জিনিস নযর কাড়ে; একটি হলো পথের দুপাশে গাছের সারি, আরেকটি হলো ফুলের কেয়ারি। আমরা যখন ছিলাম তখন যথেষ্ট ফুল ছিলো। ফুল তো আমাদের দেশেও আছে, তবে তুর্কীরা ফুলগাছ লাগানোর মধ্যেও শিল্পসৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলেছে আশ্চর্যরকম কুশলতার সঙ্গে। প্রতিটি ফুলের কেয়ারি যেন একটি নতুন আল্পনা! ফুলগুলো সেভাবেই ফুটেছে। একস্থানে দেখলাম লাল-সাদা-হলুদ ফুলগুলো এমনভাবে ফুটেছে যেন পাশাপাশি দুটি হৃদয়! একটি বড়, একটি অপেক্ষাকৃত ছোট। অবাক না হয়ে পারা যায় না, কী সূ² ইঙ্গিত!

শুধু যদি পথের দুপাশের পুষ্পসজ্জার কথাই বলতে থাকি, শব্দের ফুল ফুটতে থাকবে, ইস্তাম্বুলের ফুলের কথা বলা শেষ হবে না। এমন পরিকল্পিত পুষ্পায়ন সত্যি অতুলনীয়!

এ তো হলো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, যদিও তাতে মানুষের শিল্পীহৃদয়ের ছোঁয়া রয়েছে। সম্পূর্ণ মানবতৈরী যে সৌন্দর্যটি যে কোন পর্যটকের মুগ্ধ দৃষ্টি আকর্ষণ করে তা হলো অসংখ্য উড়ন্ত সেতু। এরদোগান যখন ইস্তাম্বুলের মেয়র, শুধু তখনই নাকি পঞ্চাশটির উপর উড়ালসেতু নির্মিত হয়েছে। তাই ইস্তাম্বুলে এখন যানজট নামের কোন যন্ত্রণা নেই। প্রতিটি উড়ালসেতুর নকশাসৌন্দর্য আলাদা। একটির চেয়ে আরেকটি সুন্দর। এরদোগান এমনই সফল মেয়র ছিলেন যে, ইস্তাম্বুলের লোকেরা নাকি আদর করে বলে, তুমি প্রধানমন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিয়ে আবার চলে এসো আমাদের কাছে।

এমন জনপ্রিয়তা এযুগে সত্যি বিরল! হবে নাই বা কেন! তিনি যখন মেয়রের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন তখন করপোরেশনের তহবিলে ছিলো দুশকোটি ডলারের ঋণ। তিনি সেই ঋণ শুধু পরিশোধই করেননি, আরো চারশ কোটি ডলারের বিনিয়োগের ব্যবস্থা করেছেন। দুর্নীতির কোন সুযোগই তিনি রাখেননি, প্রতিটি মুদ্রা ব্যয় করেছেন জনকল্যাণের কাজে। সাধে কি আর পশ্চিমারা এবং তুরস্কের এলিটসমাজ তাঁকে এতটা অপছন্দ করে!

আমাদের গাড়ী একটি উড়ালসেতু পার হলো, যা মনে হলো কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ এবং তিনস্তর বিশিষ্ট। অর্থাৎ কোন কোন স্থানে একটির উপর দিয়ে আরেকটি, এভাবে তিনটি সেতু তৈরী হয়েছে। ঘুরে ঘুরে আমাদের গাড়ী তৃতীয় স্তরটিতে উঠলো। সেখান থেকে পুরো ইস্তাম্বুল শহরকে বড় অপূর্ব লাগলো। যেন তরঙ্গায়িত সবুজের সাগর! আশ্চর্য এই যে, সেতুর উপরেও দুপাশে ফুলের গাছ এবং তাতে নানা রঙ্গের ফুল! সারা শহরের এই পুষ্পসজ্জার পরিচর্যাও তো আলাদা একটা কারবার! উছমানী যুগে শুনেছি, এ জন্য আলাদা মন্ত্রী ও মন্ত্রণালয় ছিলো। এখনো আলাদা কোন ব্যবস্থা আছে নিশ্চয়!

গাড়ী এবার বসফরাসের তীর ধরে ছুটে চলেছে। আমীর ছাহেবকে কথায় কথায় বললাম, বুরজে গাল্লাতাহ দেখার বড় ইচ্ছা ছিলো! আল্লামা উছমানী তাঁর সফরনামায় বুরজে গাল্লাতাহ দেখার কথা বড় সুন্দর করে লিখেছেন। আমীর ছাহেব বুরজে গাল্লাতাহ-এর পরিচয় জানতে চাইলেন।

বললাম, এটা বসফরাসের তীরে একটা প্রাচীনতম টাওয়ার। ৫০৭ খৃস্টাব্দে, অর্থাৎ প্রায় পনেরোশ বছর আগে বাইজান্টাইন সম্রাট বিশেষত রাত্রিকালে জাহাজ-চলাচলের সুবিধার জন্য লাইটহাউস বা বাতিঘররূপে নির্মাণ করেছিলেন। এটি প্রাচীন যুগের স্থাপনাবিস্ময়রূপে স্বীকৃতি লাভ করেছে। পরবর্তীকালে উছমানী খলীফাগণ বারবার এর মেরামত ও স¤প্রাসরণ করেছেন। আল্লামা উছমানী লিখেছেন, এটি দশতলা টাওয়ার, আগে সিঁড়ি বেয়েই চূড়ায় যেতে হতো। এখন সাততলা পর্যন্ত লিফটের ব্যবস্থা করা হয়েছে, বাকি তিনতলা সিঁড়ি বেয়েই যেতে হয়।

আমরা কথায় ব্যস্ত ছিলাম, এর মধ্যে চালক সামনের দিকে ইশারা করে বলে উঠলো, বুরজে গেলাটা। আমি তো অবাক! এটা কি এমনিতেই আমাদের যাওয়ার পথে পড়েছে, না চালক আমার মুখে বুরজে গাল্লাতাহ শুনে সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য গাড়ী ঘুরিয়ে এনেছে!

যাই হোক শুকরান, শুকরান বলে আমরা বুরজে গেলাটার দিকে তাকালাম। সত্যি অবাক হওয়ার মত বিষয়!

আল্লামা উছমানী সম্ভবত এর ভিতরে গিয়েছিলেন এবং লিফটে করে সাততলায় উঠেছিলেন। তিনি লিখেছেন-

এই বুরুজের চূড়া থেকে ইস্তাম্বুলের দৃশ্য বড়ই

মনোমুগ্ধকর। যেখানে লিফট শেষ হয়েছে সেখানে মাঝারি আকারের একটি কামরা রয়েছে। তাতে কিছু প্রত্নতাত্তি¡ক নির্দশন সংরক্ষিত আছে। সেগুলোর মধ্যে একটি হলো চামড়ার তৈরী দুটি ডানা যার সাহায্যে মুসলিম বিজ্ঞানী খ্যাদাফীন আহমদ সতেরশ শতাব্দীতে আকাশে ওড়ার সফল পরীক্ষা সম্পন্ন করেছিলেন। এমনকি একবার তিনি এই বুরজে গাল্লাতা থেকে বসফরাস পাড়ি দিয়ে ইস্তাম্বুলের এশীয় অংশের ইস্কোতারী পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন। তার মানে তিনি প্রায় আটমাইল দূরত্ব অতিক্রম করেছিলেন! জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চায় ইউরোপ নাকি খুবই সৎ! কিন্তু মুসলিম বিজ্ঞানীদের সাধনা ও অবদানের স্বীকৃতি প্রদানের ক্ষেত্রে! আমার শুধু মনে পড়ে, সৎ-এর আরেকটা অর্থ আছে! আশ্চর্য, আকাশ অভিযানের ইতিহাসে ইউরোপ ভুলেও এই এতীম মানুষটির কথা উচ্চারণ করতে চায় না।

আমাদের হাতে সময় ছিলো না, তাই দূর থেকে দেখার সুযোগটাকেই গনীমত মনে করে ফিরে চললাম।

কিছুক্ষণ পর আবার দেখতে পেলাম প্রাচীন কুসতুনতুনিয়ার সেই পাচিলের ধবংসাবশেষ, যাকে একসময় মনে করা হতো অপরাজেয়। অথচ এখন এই ধবংসাবশেষ থেকে যেন ইতিহাসের করুণ কান্নাই শুধু শোনা যায়!  

অনেক সময় লাগলো মহল্লা আবূ আইয়ূব পৌঁছতে। এলাকাটির যে এ নাম তা সেখানে যাওয়ার পর জানা গেলো। তারপর মনে হলো, আল্লামা উছমানীর সফরনামায়ও কথাটা পড়েছি, তবে ভুলে গিয়েছিলাম।

গাড়ীর চালক মসজিদের পিছনের অংশে আমাদের নামালেন এবং তার ভাষায় বুঝিয়ে দিলেন কীভাবে মসজিদ পর্যন্ত যেতে হবে।

চালক প্রথমে তো ভাড়া নিতেই চাইলেন না, তারপর জোর করে আংশিক ফেরত দিয়ে বাকিটা নিলেন। ইংরেজি তুর্কী মিলিয়ে যা বললেন, তার খোলাছা, প্রিয় পাঠক, তোমাকে বোঝাতে হলে উল্লেখ করতে হয় হিন্দুস্তানী টাঙ্গাওয়ালার কথা, বাবুজী, তোমরা এত ভালো মানুষ যে ভাড়া নিতে মন চায় না, কিন্তু কথা হলো, ঘোড়া যদি ঘাসের সঙ্গে দোস্তী করে তাহলে খাবে কী?

***

দূর থেকে মসজিদের মিনার দেখেই মনে আশ্চর্য এক ভাবের উদয় হলো। আল্লাহ মাফ করুন, আমার তো মনে হলো মদীনায় পৌঁছে গেছি। মনে পড়ে, বিরাশি সালে মসজিদে নববীর খুব কাছে কেবলার দিকে পূর্বকোণে ছিলো হযরত আবূ আইয়ূব আনছারী রা.-এর বাড়ী। লোকে বলতো, বাড়ীটি নাকি সেই প্রাচীন অবস্থায় ছিলো। দেখেও তাই মনে হয়েছিলো। আমার প্রিয়তম উস্তাদ ও মুরুব্বি হযরত পাহাড়পুরী হুযূর ঐ বাড়িতে প্রবেশ করেছিলেন, সম্ভবত সাতাত্তর সনে। সেই বাড়ীর কোন চিহ্নই এখন নেই। তবু কেন জানি আজ এই মসজিদের মিনার দেখে তা মনে পড়ে গেলো এবং মনে পড়ে মনের ভিতরে কোথায় যেন কী একটা মোচড় দিয়ে উঠলো।

মসজিদের পিছনের অংশ দিয়ে আমরা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম। অন্তরজুড়ে তখন আশ্চর্যরকম এক পবিত্রতা! ভিতর থেকে সেই আমি যেন আমাকে সতর্ক করে বলছে, এই মাটিতে কোমল ও বিনম্রভাবে পা রাখো, এখানে শুয়ে আছেন আল্লাহর পেয়ারা হাবীবের মেযবান!

উর্দূওয়ালারা এরূপ ক্ষেত্রে বলে, পায়ের পাতা দিয়ে নয়, চোখের পাতা দিয়ে হাঁটো! যদি সম্ভব হতো তবে তাই তো করা সঙ্গত ছিলো।

মসজিদে প্রবেশ করে দুরাকাত তাহিয়্যাতুল মসজিদ পড়লাম। কিছুক্ষণ বসে তিলাওয়াত করলাম। আমীর ছাহেবকে আল্লাহ উত্তম বিনিময় দান করুন, তিনি তাঁর জাওয়াল এগিয়ে দিয়ে বললেন, বাড়ীতে কথা বলবেন?! বললাম, উচ্ছ্বাসের কারণে ভালো করে বলতে পারলাম না। উম্মে মুহম্মদ শুধু বললেন, আলহামদু লিল্লাহ! ছেলে বললো, আব্বু তোমাকে ঈর্ষা করতে ইচ্ছে করে, তবু করবো না, তুমি যে আমার আব্বু!

মাযারে দাখেল হতে হয় গলির মত একটি পথ দিয়ে। সেটাও আগাগোড়া গালিচা বিছানো। মূল কামরার প্রবেশমুখ থেকেই দেখা গেলো একটু উঁচু ছোট্ট একটি চত্বরে কবর। উদের সুগন্ধি ধোঁয়া আছে, তবে সেটা ছাপিয়ে অন্য একটি সুঘ্রাণ যেন সর্বসত্তাকে আচ্ছন্ন করলো। সেটা কেমন সুঘ্রাণ তা ভাষায় বর্ণনা করার সাধ্য আমার নেই। কেউ যদি বলে, এটা আসলে আমাদের মনের ভাবনার প্রতিফলন, অস্বীকার করবো না। হতেও পারে। তবে যা মনে হয়েছিলো তা বললাম, আর সেটাও সত্য হতে পারে।

কবরের সামনে আদবের সঙ্গে দাঁড়ালাম এবং মাসনূন দুআর পর ফাতেহা ও সূরা ইখলাছ পড়লাম। অন্তরে অভূতপূর্ব এক প্রশান্তি অনুভূত হলো।

এখান থেকেই দেখা যায়, কামরার বাইরে কিছুটা দূরত্বে উদ্যানের মত একটি স্থানে কিছু কবর, উছমানী খলীফাদের এবং তাঁদের নিকটজনদের। প্রতিটি কবরের গায়ে আরবী হরফে তুর্কী ভাষায় নামফলক রয়েছে। কোন কোনটাতে কবিতার পংক্তিও আছে।

আরবী বর্ণে তুর্কী ভাষার অস্তিত্ব এখনো বজায় রয়েছে অন্তত দুটি স্থানে, তোপকাপে-এর জাদুঘরে, আর কিছু প্রাচীন কবরের নামফলকে। এ সফরনামা যখন লিখছি তার কয়েকদিন আগে রজব তৈয়ব এরদোগান, যিনি এখন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট, তুর্কীভাষার বর্ণপরিবর্তনের ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আমি চাই, আমাদের নতুন প্রজন্ম ল্যাটিন বর্ণমালার পরিবর্তে আরবী হরফে তুর্কিভাষা লিখবে। যে কোন মূল্যে এ সিদ্ধান্ত আমি বাস্তবায়ন করবো ইনশাআল্লাহ! তুরস্কের জনগণ তো তার এ ঐতিহাসিক ঘোষণাকে মারহাবা জানিয়েছে, তবে সঙ্গত কারণেই অভিজাতশ্রেণীর গাত্রদাহ শুরু হয়েছে। সে যাক, আমি বলতে চাচ্ছিলাম, আরবী হরফের পক্ষে এরদোগান অদ্ভুত এক যুক্তি দেখিয়েছেন, আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের কবরের নামফলকটাও এখন পড়তে পারি না। এ লজ্জা থেকে আমাদের মুক্তি পেতে হবে। হয়ত এটা ছিলো অভিজাত শ্রেণীর প্রতি তাঁর তীব্র কটাক্ষ।

***

ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রথমে কেউ জানতো না, হযরত আবূ আইয়ূব আনছারী রা.-এর কবর ঠিক কোথায়! মুহাম্মাদ আলফাতিহ কুসতুনতুনিয়া জয় করার পর কবর চি‎হ্নিত করার জন্য ব্যাপক অনুসন্ধান চালান এবং জনৈক প্রাচীন ব্যক্তি, যিনি বংশপরম্পরায় মুসলিম ছিলেন এবং মুসলিম পরিচয় গোপন রেখেছিলেন সুলতানকে কবরের স্থান দেখিয়ে দেন। সুলতান মুহাম্মাদ আলফাতিহ-ই এখানে জামে আবূ আইয়ূব নামে মসজিদ নির্মাণ করেন। তখন থেকে এই পুরো এলাকা মহল্লা আবূ আইয়ূব আনছারী নামে পরিচিতি লাভ করে।

উছমানী খলীফাগণ জামে আবূ আইয়ূব আনছারী রা. কীরূপ ভক্তিশ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখতেন তার একটি প্রমাণ তো এই যে, অধিকাংশ খলীফা এখানেই কবর হওয়াকে পছন্দ করেছেন, তাছাড়া প্রত্যেক খলীফা খেলাফত গ্রহণের অনুষ্ঠান এখানেই সম্পন্ন করতেন এবং মাথায় তাজ ধারণ করার পরিবর্তে কোমরে তলোয়ার ধারণ করতেন।

মাযার থেকে বের হয়ে আসতে কিছুতেই মন চাইছিলো না, তবু আসতে হলো। মসজিদের সামনে একটি উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ রয়েছে। সেখানে যথেষ্ট গাছের ছায়া। একটু দূরে প্রাঙ্গণের এক প্রান্তে দুটি বিরাট বৃক্ষ। দেখেই বোঝা যায়, অনেক প্রাচীন বৃক্ষ। কথিত আছে, হযরত আবূ আইয়ূব আনছারী রা.-এর কবর যত

প্রাচীন, এ বৃক্ষদুটি তার চেয়ে প্রাচীন। গাছের বিস্তৃত ছায়ায় অনেকেই বসে আছে। ছায়া কথাটা ঠিক হলো না, কারণ আকাশে সূর্য ছিলো না। তবু গাছের সঙ্গে ছায়া কথাটা যেন এসেই যায়, মায়ের সঙ্গে মমতা যেমন গাছের সঙ্গে ছায়া তেমন। একটি তুর্কী পরিবার রীতিমত গালিচা বিছিয়ে বসেছে, তাদের ছেলেমেয়েরা ছোটাছুটি করছে। পরিবারটি মনে হলো দ্বীনদার। কারণ শুধু একটি, মাথায় হিজাব। স্বামী-স্ত্রী বয়সে প্রবীণ। মুখের হাসি এবং বসার ভঙ্গি থেকে মনে হলো সুখী পরিবার। বাচ্চাগুলোও অনাবিল আনন্দ উপভোগ করছে। দৌড়তে গিয়ে পড়ে যাচ্ছে, আর খিলখিল করে হেসে উঠছে। নিজের পড়ে যাওয়া যে নিজেকে হাসাতে পারে, ভুলেই গিয়েছিলাম। ইস্তাম্বুলের ঐ শিশুদের কাছ থেকে নিজের জীবনের হারিয়ে যাওয়া সেই আনন্দের স্মৃতিটি যেন পুনরুদ্ধার করলাম!

শুনেছি হযরত আবূ আইয়ূব আনছারী রা.-এর মাযারপ্রাঙ্গণ হচ্ছে ইস্তাম্বুলের দ্বীনদার পরিবারগুলোর সময় যাপনের একটি প্রিয় স্থান। অনেকে দুপুরের খাবার সঙ্গে নিয়ে এসে এখানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সময় যাপন করে। হয়ত এখানে ওরা হৃদয় ও আত্মার প্রশান্তি সন্ধান করে, আর সন্তানদের নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য প্রার্থনা করে। হয়ত ধর্মহীনতার সয়লাবের মধ্যে এ মাযারপ্রাঙ্গণ ওদের জন্য আত্মার প্রশান্তির একটি সবুজ দ্বীপ!

***

উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ পার হয়ে কিছু দূরে একটি সুন্দর পরিচ্ছন্ন বাজার, যেখানে প্রধানত এমন সব সামগ্রীর সমাহার যা মানুষ স্মারক বা উপহাররূপে সংগ্রহ করে। আমরাও কিছু উপহার সংগ্রহ করলাম। যা দেখি তাই পছন্দ হয়। এর মধ্যে সেরা পছন্দের দ্রব্যটি তুলে আনা সত্যি কঠিন। আমীর ছাহেব এবং আমি নিলাম দুটি চতুষ্কোণ খনিজদ্রব্য যার একটিতে আরবীতে খুব সুন্দর করে লেখা

الله (جل جلاله)

এই মহান শব্দটি, অন্যটিতে লেখা পেয়ারা নবী ছাল্লালল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রিয় নাম (محمد (صلى الله عليه وسلم 

আমি যে দুটি নিলাম আকারে তা কিছুটা ছোট, যাতে বিমানে সঙ্গে রাখা যায়। আমীর ছাহেব নিলেন অনেক বড় আকারের যা আলাদা প্যাকেট করে সামানের সঙ্গে দিতে হবে। আকারে যেমন বড় অর্থমূল্যেও তেমনি বেশী। আমি অবশ্য পরামর্শ দিলাম আকারে ছোট দেখে নিতে, কিন্তু বড় মানুষের নযর বলে কথা! নিজের এবং আমার, দুটোরই অর্থমূল্য অবশ্য তিনিই পরিশোধ করলেন।

আরেকটি জিনিস নিলাম, সম্ভবত রৌপ্য দ্বারা তৈরী, একবৃন্তে দুটি আধফোটা গোলাব, যাতে আরবীতে খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে আল্লাহ ও মুহম্মদ এই শব্দদুটি। এখনো যখন দেখি, আশ্চর্য এক ভালো লাগা হৃদয়কে আচ্ছন্ন করে।

একখানে দেখি সুদৃশ্য পাত্রে যমযম! আমার মনে হলো, যমযম নিতে হলে নেয়া উচিত মক্কা শরীফ থেকে। তাই একবার ইচ্ছে হলেও নিজেকে বিরত রাখলাম। আমীর ছাহেবও আমাকে সমর্থন করলেন।

বাজার পার হয়ে দীর্ঘপথ হেঁটে বড় রাস্তায় এসে পৌঁছলাম এবং ট্যাক্সি পেয়ে গেলাম। এবার কিন্তু চালককে বেশ বিষয়ী মনে হলো। আগের চালক যেটুকু কম নিয়েছিলেন ইনি সেটা যেন পুষিয়ে দিলেন। তবে হোটেলে পৌঁছে দিলেন যথেষ্ট অল্প সময়ে।

***

হোটেলে মেহমানের সংখ্যা আরো কমেছে। কেমন যেন সুনসান! অথচ গত সন্ধ্যায়ও ছিলো কী হালচাল, কত চাহাল-পাহাল! আমরা কামরায় গিয়ে একটু বিশ্রাম নিলাম। তারপর সামানপত্র গুছিয়ে নীচে নেমে এলাম। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে শেষবারের মত ঝাপসা চোখে বসফরাসের রোদঝলমল পানি দেখলাম। দেখলাম ওপারে পাহাড়ের গায়ে থরে থরে সাজানো ইস্তাম্বুলের এশীয় অংশটি। ঝাপসা  চোখ এবার যেন মেঘ হয়ে বর্ষণ করলো। আকাশটাও তখন ছিলো মেঘাচ্ছন্ন। মনে মনে বললাম, বিদায় হে মুহাম্মাদ আলফাতিহ-এর স্মৃতিধন্য বসফরাস! তখনো জানতাম না, বসফরাস আমাদের বিদায় দেয়নি। আবার আসতে হবে এখানে এই বসফরাসের কাছে, আবার দেখবো বসফরাসের বুকে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা জাহাজটি।

***

তিনটি গাড়ী প্রস্তুত। যাত্রী শুধু আমরা তিনজন নই। হিন্দুস্তানের সম্মানিত মেহমানগণ আছেন। অর্থাৎ হযরত মাওলানা আরশাদ মাদানী, হযরত মাওলানা সালিম কাসিমী, হযরত মাওলান সাঈদুল আযামী, সম্মেলনের আয়োজক সংস্থার প্রধান মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ রাহমানী, তাঁর সুযোগ্য পুত্র, যার সঙ্গে আজই সকালে নাস্তার সময় পরিচয় হয়েছে। আছেন আরো কয়েকজন।

***

মানুষের দিল বড় আজব জিনিস। দুদিনের জন্যও যদি কোথাও একটু মাটি পায়, শিকড় গেড়ে বসে। বাসে যখন উঠলাম দিলের শিকড়ে যেন টান পড়লো! বাসটা যখন রওয়ানা হলো শিকড়গুলো যেন ছিঁড়ে গেলো; ব্যথায় উহ্ করে উঠলো। এমন তো হওয়ার কথা নয়, আমি তো আমার মায়ের কাছে ফিরে যাচ্ছি! স্ত্রী-পুত্র-কন্যার কাছে ফিরে যাচ্ছি! আমার জীবন এবং জীবনের কর্মক্ষেত্র তো এখানে নয়, ওখানে! আমার বাবার কবর তো এখানে নয় ওখানে! তবু কেন এমন হলো, কেন এমন হয়! তবু কেন চোখ দুটো ভিজে উঠলো! দুদিনের বন্ধনেও কেন চোখ ভিজে ওঠে! শহরের নাম ইস্তাম্বুল বলেই কি? এ শহর একদিন কুস্তুনতুনিয়া ছিলো এবং আল্লাহর পেয়ারা হাবীব কুস্তুনতুনিয়ার মুজাহিদীনের জন্য মাগফিরাতের খোশবর শুনিয়েছেন, এজন্যই কি? আমরা তুরস্কে এসেছিলাম তুর্কিস্তানের সন্ধানে এবং ফিরে যাচ্ছি হারিয়ে যাওয়া তুর্কিস্তানের কোন খোঁজ না পেয়ে, এজন্যই কি? হয়ত। কথাগুলো মনে হতেই মনটা হু হু করে উঠলো। ভিতরের কান্না চোখ ছাপিয়ে বাইরে এসে গেলো। গাড়ীর জানালা দিয়ে ঝাপসা চোখে আমার প্রিয় ইস্তাম্বুলের কিছুই আর দেখতে পেলাম না; না গাছ, না ফুল, না মাটি, আর না বসফরাসের পানি।

আমাদের বাসে আমরা তিনজন ছাড়াও রয়েছেন পাকিস্তানের মেহমানগণ, আর আছেন তুরস্কের তরুণ আলেম জনাব দুরসূন, যার কথা আগে একবার বলেছি। পাকিস্তানে দারুল উলূম করাচীতে গিয়েছিলেন দ্বীনের ইলম শিখতে, আর ফেরার পথে বিরাট ইমতিহান ও আযমাইশ-এর সম্মুখীন হয়েছিলেন। তিনি খবর পেয়েছেন বিলম্বে। আজ দুপুরেই এসেছেন হোটেলে মূলত পাকিস্তানের মেহমানদের সঙ্গে দেখা করতে এবং বিমানবন্দরে বিদায় জানাতে। আমাদের সঙ্গে পরিচয় হলো এবং অল্পসময়ের মধ্যে এমন অন্তরঙ্গতা হলো যে, কথা বলতে চান আর কণ্ঠ অশ্রুরুদ্ধ হয়ে পড়ে।

সামান্য তো পথ, দশমিনিটেই বিমানবন্দর এসে গেলো। আমাদের গাড়ী যেখানে এসে থামলো, এখনকার পরিভাষায় সেটা সম্ভবত ভি, আই, পি এলাকা। সামান-পত্র কিছুই আমাদের ধরতে হলো না, যারা বিদায় জানাতে এসেছেন তারাই সবব্যবস্থা করলেন। আমরা শুধু একটু হেটে লিফ্টে উঠলাম এবং চারতলায় গিয়ে নামলাম। আসার সময় বিমানবন্দরটির দেখেছিলাম একরূপ, এখন দেখলাম অন্যরূপ। তখন মনে হয়েছে, বিরাট, এখন মনে হলো, বিশাল! অনেক দূর পথ হাঁটতে হলো টিকেট-পাসপোর্ট পরীক্ষার কাউন্টারের স্থানে পৌঁছতে। লোকে লোকারণ্য! আমাদের দেশে যেমন একজন যাত্রীর সঙ্গে বিদায় জানাতে আসে প্রায় পুরো পরিবার, এখানে তেমন নয়। এমনকি অনেক মহিলা যাত্রীর সঙ্গেও কোন পুরুষ নেই।

ইস্তাম্বুল আসলেই যেন ইউরোপ! তবে এখন একটু যেন ফিরে আসতে চায় শিকড়ের দিকে। কিছু কিছু হিজাবঢাকা শালীন চেহারা সে ইঙ্গিতই যেন দিয়ে যায়।

একটি সুন্দর স্থানে আমাদের বসানো হলো। তারপর দুজন দায়িত্বশীল সবার টিকেট পাসপোর্ট নিয়ে সংশ্লিষ্ট কাউন্টারে গেলেন এবং ফিরে এলেন। খুব স্বাভাবিকভাবে বললেন, একটু বিলম্ব হচ্ছে, আপনারা ইতমিনানের সঙ্গে বসুন।

মনে খটকা লাগলো। বসে আছি, বেশ তো আছি! ইতমিনান শব্দটি যুক্ত করতে হচ্ছে কেন? চেহারার অভিব্যক্তি এবং মুখের হাসি তারা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করেছেন, তাতে কোন ত্রুটি হয়নি। কিন্তু খুব হালকা হলেও দুশ্চিন্তার একটা ছায়া যেন বোঝা যায়। আসলে কী হয়েছে, কিংবা কী হতে যাচ্ছে?

আমীর ছাহেবও মনে হলো পরিস্থিতির অস্বাভাবিকতা কিছুটা আঁচ করতে পেরেছেন, তবে আমাদের বুঝতে দিতে চান না।

নিজেই নিজেকে এই বলে প্রবোধ দিলাম। হিন্দুস্তানে যখন আল্লাহ হিফাযত করেছেন, এ তো মুসলিম দেশ, আমাদের প্রিয় ইস্তাম্বুল, এখানে অবশ্যই আল্লাহ হিফাযত করবেন। ইনশাআল্লাহ আমরা কাদিরে মুতলাক  -এর হিফয ও আমানের মধ্যেই থাকবো।

আমার কবরবাসী এবং ইনশাআল্লাহ জান্নাতবাসী আব্বার নছীহত মনে পড়লো, বিপদে মুছীবতে এবং যে কোন প্রয়োজনে সবার আগে ছালাতুল হাজাত পড়বা। শুধু কথা দিয়ে নয়, নিজের আমল দিয়ে এ নছীহত তিনি আমাদের সামনে রেখে গেছেন।

হোটেল থেকে বের হয়েছি আছর পড়ে, তখন অবশ্য আলাদা করে দুরাকাত পড়ে নিয়েছিলাম। মাগরিবের সময় হলো। ইস্তাম্বুল- বিমানবন্দরে এখন এরদোগানের আমলেও মসজিদ হয়নি, আছে শুধু ছোট্ট একটি নামাযঘর, তবে ঢাকা বিমানবন্দরের চেয়ে ভালো। সুন্দর নরম গালিচা বিছানো। আগে নাকি এটাও ছিলো না। নামায পড়ারই মানুষ ছিলো না।

ওখানে মাগরিব পড়া হলো। মুছল্লীদের সমাগম এত যে, কয়েক দফায় নামায হলো। দেখে খুব ভালো লাগলো। আমরা বেশ পরে এসেছি, তবু স্থান পেতে যথেষ্ট সময় অপেক্ষা করতে হলো। মেয়েদের জন্য আলাদা নামযঘর, সেখানেও মনে হলো একই রকম সমাগম।

মাগরিব আদায় করে খুব দিল দিয়ে দুরাকাত ছালাতুল হাজাত পড়লাম। বিপদ তো চাওয়ার জিনিস নয়। কিন্তু এ বিশ্বাস থাকতে হবে যে, মুমিনের যিন্দেগীতে বিপদ-মুছীবত আসে তার খায়র ও কল্যাণেরই জন্য। বিপদে মুছীবতে দিল যত নরম হয়, আর কিছুতে হয় না। এখন তো বিপদ আসেনি, সামান্য আভাসমাত্র এসেছে, তাতেই দিলের যে হালাত হলো! মুনাজাতে কান্নার ভান করতে হলো না, কান্নাই এলো। দিলটা যেন নিজেকে উজাড় করে দিয়ে কাঁদলো। চোখের পানি যেন দিলের সব উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ধুয়ে মুছে বাইরে নিয়ে এলো। একটু আগে বলা হয়েছিলো ইতমিনানের সঙ্গে বসতে, তাতে ইতমিনান গায়েব হয়ে গিয়েছিলো। সেই ইতিমান এখন দিলের মধ্যে পূর্ণরূপে অনুভূত হলো। ইতমিনানের সঙ্গেই বসে থাকলাম। নামাজঘরেই মসজিদের সুকন ও প্রশান্তি বোধ করলাম। কিছুক্ষণ তিলাওয়াত করলাম, তাতে সুকন ও প্রশান্তি যেন আরো নিবিড় ও গভীর হলো।

ক্লান্তি ছিলো; ইচ্ছে হলো, কিছুক্ষণ শুয়ে থাকি, না, তা সম্ভব নয়। দেয়ালের গায়ে ফলক লাগানো; তাতে লেখা, ইংরেজীতে, তুর্কীতে, আরবীতে, ফারসিতে, এমনকি উরদূটাও বাদ যায়নি, এটা শুধু নামাযের স্থান, ঘুমের আরামের জন্য নয়। আচ্ছা, শুধু ঘুমের জন্য নয় লিখলে কি চলতো না? আরাম শব্দটাকে আলাদা করে টেনে আনার কী উদ্দেশ্য? মনে পড়লো, মসজিদে নববীতে কিছু রেহেল রাখা আছে, কোনটার গায়ে শুধু লেখা, ওয়াক্ফ, আর কোনটার গায়ে লেখা, শুধু  মুছহাফ রেখে তেলাওয়াত করার জন্য, মাথা রেখে ঘুমানোর জন্য নয়। আচ্ছা বাবা, আল্লাহর কোন বান্দা যদি একটু মাথা রেখে ঘোমায়, অসুবিধাটা কী! একজন বৃদ্ধ একটু বোধহয় কাত হয়েছিলেন। পুলিশ ধরনের একজন এসে উঠিয়ে দিলো কিছুটা কঠোর ভাষায়। বুঝলাম ঘুম এবং আরামের কথা লেখা থাকলেও কাত হওয়া পর্যন্ত নিষিদ্ধ।

সবাই যেখানে বসে আছেন সেখানে ফিরে এলাম। আমীর ছাহেব বললেন, টিকেট-পাসপোর্ট নিয়ে ওনারা এখনো আসেননি। কিছু একটা ঝামেলা বোধহয় হয়েছে, আল্লাহ ভরসা।

জ্বি, মুমিন যেখানে থাক, ঘরে বাইরে, সফরে, হযরে, দেশে, প্রবাসে, আল্লাহই তো তার একমাত্র ভরসাস্থল। আল্লাহ ছাড়া মুমিনের আর কে আছে! আল্লাহ ছাড়া মুমিনের আর কী আছে!!

হতে হতে এশার সময় হয়ে গেলো। অপেক্ষার দীর্ঘতা তখন রীতিমত কষ্টকর হয়ে উঠেছে, আর ইতমিনানমিশ্রিত পেরেশানি চরমে পৌঁছে গেছে। কিন্তু করার তো কিছু নেই আল্লাহকে ডাকা ছাড়া! তাই ডাকছি; ডেকেই চলেছি। একসময় দেখি, টিকেট-পাসপোর্ট নিয়ে ওরা ফিরে আসছেন। দূর থেকেই তাদের সত্যি সত্যি পেরেশান দেখালো। তবু কিছুটা রেখে কিছুটা ঢেকে বললেন, মনে হচ্ছে, ওদের কাছে কোন ভুল তথ্য এসেছে। তবে এখনো সময় আছে, আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি, আশা করছি, সমস্যা দূর হয়ে যাবে।

সম্মেলনের মূল আয়োজক সংস্থার চেয়ারম্যান হলেন মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ রহমানী। বলতে গেলে তিনি সবার মেযবান। বোধহয় কিছুক্ষণের জন্য কথাটা তাঁর স্মৃতি থেকে সরে গিয়েছিলো। তিনি কিছুটা উত্তপ্ত হয়ে দায়িত্বশীলদের বললেন, টিকেট কনফার্ম না করে আমাদের বিমানবন্দরে আনা হলো কেন? মুহীউদ্দীন আওয়ামা কোথায়? বেচারারা এমনিতেই হয়রান পেরেশান, বরং কিছুটা বিপর্যস্ত, এর মধ্যে এরূপ অসহিষ্ণুতা! খুব ভালো লাগলো হযরত মাওলানা আরশাদ মাদানীর কথা। তিনি বললেন, বেচারা তো চেষ্টা করছে। রাহনে দীজিয়ে না, মুকাদ্দারে যা আছে তাই হবে।

রাহমানী ও তাঁর সুযোগ্য পুত্র সম্ভবত নিজেরা চেষ্টা করে দেখতে চাইলেন, মুকাদ্দারে কী আছে! পুত্রটি নিজের এবং পিতাজীর টিকেট-পাসপোর্ট আলাদা নিয়ে নিলেন, ইন্ডিয়াতে নাকি জরুরী কাজ আছে, যে কোন মূল্যে আজকের ফ্লাইটে তাদের যেতে হবে। আমরা কিছু মনে করলাম না। ছাহেবযাদা আলাদা চেষ্টা শুরু করলেন। ইন্ডিয়াতে তার ট্রাভেলব্যবসা আছে, আজ হোটেলের ডাইনিং হলে নাস্তার সময় বেশ আয়োজন করে খবরটা জানিয়েছিলেন, আর আমাদের অভয় দিয়ে বলেছিলেন, কুছ ভী ফিক্র না কীজিয়ে। জেট এয়ারের টিকেট এখান থেকেই আমি কনফার্ম করে দেবো। সময়ের অভাবে সেটা আর পারেননি, আমরাও অবশ্য তেমন কিছু অনুরোধ করিনি। তিনি বললেন, আমরা  শুনলাম, আর বললাম, শুকরিয়া।

পিতাজীকে তিনি বললেন, কথাটা আমার কানে গেলো; প্রয়োজন হলে অন্য এয়ারের টিকেট কেটে নেবো।

সে ব্যবস্থা অবশ্য আছে দেখলাম। বিভিন্ন এয়ার লাইন্স-এর কাউন্টারের সামনে স্ক্রিনে একটু পর পর লেখা উঠছে, এই এই নাম্বরের আসন এখনো খালি আছে। প্রয়োজনে অতিসত্বর যোগাযোগ করুন। এ যেন দূরপাল্লার বাসের টিকেট! আগে কখনো দেখিনি, ইস্তাম্বুলেই দেখলাম। আমার দেখার পরিধিটাও অবশ্য খুব সামান্য।

হযরত মাওলানা সাঈদুল আযামী কোণায় একটি চেয়ারে আলাদা বসে আছেন। মনে হলো এ সুযোগটা গ্রহণ করি। একটু পরিচিত হই, অন্তত সালাম-মুছাফাহা।

কাছে গেলাম, সালাম দিলাম। নিজেই পরিচয় জিজ্ঞাসা করলেন। বললাম, বাংলাদেশ থেকে এসেছি। আমি সুলতান যাওক ছাহেবের ছাত্র।

তিনি পরম উৎসাহে উঠে দাঁড়ালেন। মুছাফাহার সঙ্গে মুআনাকাও করলেন, আর বললেন, আচ্ছা, তো আপ হ্যাঁয় মাওলানা আবু তাহের মেছবাহ ছাহাব!

বললেন, আপনার দেখা পেয়ে সত্যি খুব খুশী হয়েছি। আমার জন্য তো এটা নেয়মাতে গায়রে মুতারাক্কাবা থেকে কম নয়।    

যাওক ছাহেবের আসার কথা ছিলো, আসেননি যে!

এক সঙ্গে অনেক কথা বললেন। আমার জন্য সবচে সৌভাগ্যের বিষয় এই যে, তিনি বললেন, হযরত মাওলানা মরহূম আপনার তাযকেরা করতেন। বড়ী মুহব্বত সে ইয়াদ ফ্যরমায়া করতে থে।

আজকাল কী করছি জানতে চাইলেন। সংক্ষেপে বললাম, বিশেষ করে

الطريق إلى القرآن الكريم

সম্পর্কে ধারণা দিলাম। খুব পছন্দ করলেন, বললেন, একদু নোসখা নদওয়ায় জরুর পাঠাবেন। ماذا خسر العالم-এর তরজমা করছি, বললাম। তিনি জানতে চাইলেন, এর বাংলা তরজমা তো ইতিমধ্যে হয়েছে বলে জানি! সংক্ষেপে নতুন তরজমার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরলাম।

প্রত্যাশার বাইরে দীর্ঘ সময় অনেক কথা হলো। কিছু বললেন, কিছু শুনলেন। দু'টোই অত্যন্ত অন্তরঙ্গতার সঙ্গে, যা আমাকে অভিভূত করলো। কথার সূত্র ধরে বললাম, আমার ছাত্র এবং বড় দামাদ হাবীবুর রাহমান নাদাবী, চারবছর নদওয়ায় ছিলো, আপনার কাছে পড়েছে। আপনার প্রতি খুব আকীদাত পোষণ করে।

চিনলেন এবং খুশী হলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, এখন কী করে?

ইচ্ছে হচ্ছে, ইস্তাম্বুলের বিমানবন্দরে সেদিন ঐ প্রিয় মানুষটির সঙ্গে যত কথা হয়েছে সব এখানে বলি। বলতে আনন্দ হচ্ছে। কী যেন একটা কথা আছে ফারসীতে, লাযীয বুয়াদ...। আসলে বন্ধুর সঙ্গে বন্ধুর কথাই শুধু লাযীয হয় না, অসামান্য মানুষের সঙ্গে সামান্য মানুষের কথাও লাযীয হয়। তবে এ আলোচনা এপর্যন্তই থাক। এমনিতেই তো তিনদিনের সফরনামা ত্রিশদিন ছুঁই ছুঁই করছে!

সাঈদুল আযামী সেদিন সত্যি আমাকে অভিভত করেছিলেন! এঁরা আসলে পারেন মানুষকে খুশী করতে, সাধারণ থেকে সাধারণ মানুষেরও দিলজূঈ৫ করতে। নিজের মাকাম ও অবস্থান তাঁদের কাছে তখন গৌণ হয়ে যায়।

হযরত মাওলানা আরশাদ মাদানী ছাহেবের সঙ্গেও কথা বললাম আমার প্রিয় বন্ধু ইমাম ছাহেব এবং আমার অতিপ্রিয় ছাত্র মাওলানা আবুল বাশার-এর পরিচয়ে।৬  আর বললাম, আপনি মদীনা থেকে ফিরছিলেন, আমরা মদীনা শরীফ যাচ্ছিলাম। পথে এক বিশ্রামস্থলে দেখা হলো। আপনি আমাদের সবাইকে শরবত হাদিয়া করলেন। আমরা নিজেদের জন্য সেটাকে বড় নেক ফাল মনে করলাম যে, মদীনার পথে আওলাদে রাসূলের মেযবানি দ্বারা ধন্য হলাম!

খুশী হলেন এবং বড় শফকত ও অন্তরঙ্গতা প্রকাশ করলেন। কেন জানি মন বারবার বলছিলো, হয়ত হযরত মাদানী রাহ, দেখতে এমনই ছিলেন এবং এমনই ছিলো তাঁর আখলাক। তুমি আসলে এঁর ছায়ায় তাঁরই সান্নিধ্যসৌভাগ্য অর্জন করছো। আলহামদু লিল্লাহ। হযরত মাওলান আসআদ মাদানী রাহ.কে দেখেছি, প্রথমে দেশের মাটিতে, তারপর বাইতুল্লাহর ছায়ায়, কথা বলার সৌভাগ্যও হয়েছে, কিন্তু বড়ত্বের আড়ালটুকু ছিলো, এখানে মনে হলো, কত দিনের যেন পরিচয়, কত যেন আপনার!

(চলবে ইনশাআল্লাহ)

আরও পড়ুন:   সফরনামা

এ সংখ্যার প্রচ্ছদ

হজ্ব এবং কুরবানী বিষয়ক প্রবন্ধসমূহ