জুমাদাল আখিরাহ ১৪৩৬ . এপ্রিল ২০১৫

পুরোনো সংখ্যা . বর্ষ: ১১ . সংখ্যা: ০৪

তুরস্কে, তুর্কিস্তানের সন্ধানে-৮

(পূর্বপ্রকাশিতের পর)

দুপুর, কিন্তু রোদ নেই। সূর্যেরও দেখা নেই, তবে ঠাণ্ডার প্রকোপ  নেই। ইউরোপের ঠাণ্ডার এত হুঁশিয়ারি শুনলাম, এত প্রস্তুতি নিয়ে এলাম, কিন্তু দেখা পেলাম না! আফসোস করবো, না আনন্দ, বুঝতে পারছি না। আল্লামা তাক্বী উছমানীর অবস্থা ছিলো উল্টো; শীতের আগাম হুঁশিয়ারি পাননি, তাই জেদ্দা থেকে এথেন্সের পথে ইস্তাম্বুল চলে এসেছেন কোনরকম প্রস্তুতি ছাড়া, সাধারণ একটি শীতবস্ত্রও না। বিমান থেকে নেমেই নাকি বুঝতে পেরেছিলেন, ইস্তাম্বুলের এ অংশটা ইউরোপের মধ্যে পড়ে; আর ইউরোপীয় শীত কখনো কামড় দেয় জার্মানদের মত, কখনো ইংরেজদের মত। প্রথমটায় শীতের দাঁত গিয়ে বসে শরীরের গোশ্তের মধ্যে, দ্বিতীয়টায় গোশ্ত পার হয়ে শীতের দাঁত গিয়ে ঠেকে হাড় পর্যন্ত।

পুরো একদিন তো হোটেল থেকে বেরুতেই পারেননি। শুধু ফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন। দ্বিতীয় দিন পেয়েছিলেন ওভারকোট, ও অন্যান্য বস্ত্র, তাতেও নাকি রক্ষা পেয়েছেন শুধু শীতের হামলা থেকে; ঝাপটা থেকে নয়।

এখানে সময়ের পার্থক্যটা অবশ্য ধরা হয়নি। তিনি এসেছিলেন মার্চের শুরুতে, আমরা এসেছি অক্টোবরের শেষ দিকে, পাঁচ ছয়দিন বাকি থাকতে।

আবহাওয়া সম্পর্কে ভাবছি, এর মধ্যে একটু রোদ দেখা গেলো, সূর্যটা অবশ্য নযরে পড়লো না। মাঠের মাঝখানে যাওয়ার পর চোখে পড়লো। হালকা রোদে পরিবেশটা আরো আনন্দদায়ক হয়ে উঠলো। ইচ্ছে হলো, এখানেই ঘাসের উপর বসে থাকি; গ্রামবাংলার ভাষায় রোদ পোহাই

আমি তো শুধু ভাবলাম, কিছু কিছু মেহমান দেখি ভাবনাটা কার্যেও পরিণত করে ফেলেছেন। এমনই হয়, কেউ ভাবে না, কেউ ভাবে। যারা ভাবে তাদের মধ্যে কেউ শুধু ভাবে; আর ভাবে, বড় একটা কাজ হলো! যারা ভাবে, সেই সঙ্গে ভাবনাটাকে কাজে লাগায়, তারাই সফল মানুষ।

আমি প্রথম শ্রেণী থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে উঠতে পারলেও, চূড়ান্ত শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হলাম। কারণ মনের বিপরীতে হঠাৎ করে শরীর বেয়াড়া রকম তাগাদা দিলো, তাড়াতাড়ি কামরায় ফিরে যাও।

***

যথাসময়ে আযান হলো, আমরা কামরায় যোহরের জামাত করলাম। আবার নীচে নামতে হবে। না, মহৎ কোন উদ্দেশ্যে নয়, দুপুরের আহার গ্রহণ করার জন্য। যে কাজ প্রাণ রক্ষায় সাহায্য করে তা মহৎ যদি নাও হয়, জরুরি তো অবশ্যই। ক্ষুধাও যে লাগেনি তাও নয়, কিন্তু ইচ্ছে করছিলো না এখনই নামতে। যা ইচ্ছে করছিলো তা হলো কিছুক্ষণ একা থাকা, যদি হৃদয়ের ভাষায় বলি, তাহলে বলবো, নিঃসঙ্গ থাকা, আর যদি আত্মার ভাষায় বলি, তাহলে বলতে হয়, ইচ্ছে করছিলো, কিছুক্ষণ শুধু নিজের সঙ্গে থাকি। নিজেকে সঙ্গ দিই এবং নিজের সঙ্গে কথা বলি। আরবী সাহিত্যে আমার প্রিয় ব্যক্তি মরহূম আলী তানতাবীর ভাষায়, মানুষ কখনো একা থাকতে চায় না। কারো না কারো সঙ্গে থাকতে চায়, কারণ মানুষ আসলে নিজের কাছ থেকে চায় দূরে থাকতে, বরং নিজের কাছ থেকে পালিয়ে থাকতে। মানুষ নিজেকে বড় ভয় পায়। তার ভিতরে বসে আছে যে আসল মানুষটি, তার সঙ্গে তার পরিচয় নেই, অন্তরঙ্গতা নেই, নেই একাত্মতা। তাই বাইরের মানুষটি এবং ভিতরের মানুষটি চিরকাল আলাদাই থেকে যায়। ফল কী হয়! বাইরের মানুষটি অশান্তিতে থাকে, আর ভিতরের মানুষটিও প্রশান্তির স্পর্শ পায় না।

মাঝে মধ্যে আমার ইচ্ছে করে, অন্তত কিছুক্ষণ সবার সঙ্গ ত্যাগ করে নিজের সঙ্গ গ্রহণ করি, ভিতরে যে আমি বসে আছে তার সঙ্গে একাত্ম যদি হতে নাও পারি, একটু একান্ত হতে চেষ্টা করি। তখন বড় ভালো লাগে। বাইরের আমি শান্তি পাই; ভিতরের আমি প্রশান্তি লাভ করে; সে প্রশান্তির স্নিগ্ধতা একসময় বাইরের আমাকেও স্পর্শ করে। নিজেকে তখন বড় সুখী মনে হয়। কখনো কখনো মনে হয়, ভিতরের আমি যেন খুশী হয়ে বলে, আচ্ছা, এখন যাও। তোমার আবার অনেক কাজ পড়ে আছে।

আমীর ছাহেবকে বললাম, একটু একা থাকতে ইচ্ছে করছে। তিনি কিছু বললেন না, মৃদু হেসে মাওলানা আব্দুল মতীনকে নিয়ে নীচে নেমে গেলেন।

কামরায় এখন আমি একা, কিন্তু নিজেকে মনে হলো না একা; মনে হলো নিজের সঙ্গে আমি একান্ত! একাত্ম!! 

আমি আমার কত কাছে, অথচ জীবনের কোলাহল ও শোরগোলের কারণে পড়ে থাকে আমার কাছ থেকে কত দূরে!! এখন এই একান্ততায়, এই একাত্মতায় বড় আনন্দ হলো। আনন্দের আতিশয্যে চোখের পাতা ভিজে উঠলো এবং নিজের অজান্তে কান্নাই এসে গেলো! কান্নায়ও এত শান্তি! এবং আশ্চর্য! ভিতরের আমি যেন জানতে চাইলো, কাঁদছো কেন?! কষ্ট হচ্ছে বুঝি?!!

বললাম, এ কান্না কষ্টের নয়, তোমার সঙ্গলাভের আনন্দের কান্না।

ভিতরের আমি বললো, কাল গভীর রাতের নির্জনতায় বিভোর হয়ে তুমি যখন ইস্তাম্বুল দেখছিলে, আমি তোমাকে দেখছিলাম, বড় ভালো লাগছিলো!

জিজ্ঞাসা করলাম, ইস্তাম্বুলে এসে ভালো লাগছে তোমার?

- ভালো লাগছে; তোমার ভালো লাগা দেখে আরো ভালো লাগছে। তিনদিন পরে বুঝি মনে পড়লো আমাকে?

- না, মনে পড়েছে; শুধু একান্ত হওয়ার সুযোগ হয়নি।

- আমি জানি, তুমি আমাকে ভাবো, আমাকে সঙ্গ দিতে চাও, তোমার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।

- আচ্ছা, তোমার কাছে জানতে ইচ্ছে করে, তুর্কিস্তান আমাদের হাতছাড়া হলো কেন?

- তার আগে তুমি বলো, উন্দুলুস কেন হাতছাড়া হলো?

- আমি তো জানি না, তুমিই বলো।

- সত্যি শুনতে চাও! তাহলে শোনো। মুসলিম, সে শাসক হোক, বা শাসিত, যখন নিজের ভিতরের আমিকে ভুলে যায়, আর বাইরের আমিকে নিয়ে ভোগবিলাসে মেতে ওঠে তখন তলোয়ারে ধার কমে যায় এবং ...

- উছমানি খলীফারা কি তাই করেছিলো?

- করেনি! শত্রæরা যখন তলোয়ারে ধার দিচ্ছে, তারা তখন নিজেদের গলা কেটেছে। আর ভোগবিলাস! সে কথা যত কম বলো তত ভালো।

- গত রাতে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে প্রিয় ইস্তাম্বুলকে যখন দেখছিলাম,

কল্পনায় চলে গিয়েছিলাম অতীতের সেই ইস্তাম্বুলে যখন মুহাম্মাদ আলফাতিহ-এর তোপ অগ্নিবর্ষণ করছিলো!

- আমি তো ঘোমাই না, আমি দেখেছি; ভালো লেগেছে। তবে আমার উপদেশ শোনো, কল্পনার চেয়ে কাজের মূল্য অনেক বেশী। উম্মাহর অতীতকে ফিরিয়ে আনার জন্য যদ্দুর পারো মেহনত করো।

- ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াবো? বসফরাসের পানি দেখা যায়।

- চলো।

- রোদ উঠেছে তো, পানি কেমন ঝিলমিল করছে! ঐ যে জাহাযটা, গতকাল থেকে দেখছি, একই জায়গায় স্থির হয়ে আছে। মনে হয়, সেই মুহাম্মাদ আলফাতিহ-এর সত্তর জাহাযের একটি, ইতিহাসের পথ ভুলে চলে এসেছে বসফরাসের বুকে।

- তোমার এই কল্পনাপ্রবণতা আমার কিন্তু ভালো লাগে না। আবার বলছি, কল্পনার চেয়ে কাজের মূল্য অনেক বেশী।

- ঐ যে বসফরাসের ওপারে ইস্তাম্বুলের এশীয় অংশ। পাহাড়ের উপর পুরো শহরটা যেন গুলদস্তার মত থরে থরে সাজানো। বেশ সুন্দর, না!

- হাঁ, সুন্দর। মসজিদের মিনারগুলো সত্যি সুন্দর। এত মসজিদ কম শহরেই আছে।

- কিন্তু আয়া ছুফিয়ার কষ্টটা ভুলতে পারি না।

- যার বুকে ঈমান আছে, তার বুকে আয়া ছুফিয়ার কষ্ট কাঁটা হয়ে বিঁধতেই থাকবে, যতদিন না তা যিঞ্জিরমুক্ত হবে।

- হয়ত সেদিন খুব দূরে নয়।

- তুমি কিন্তু আবু আইয়ূব আনছারী রা.-এর মসজিদে যাওনি!

- তোমার বুঝি খুব ইচ্ছে করে! আগামীকাল আমাদের যাওয়ার কথা।

- অবশ্যই যেয়ো, কত ভাগ্যবান ছাহাবী! হিজরতকালে আল্লাহর নবী মদিনায় তাঁরই মেহমান হয়েছিলেন। কাছওয়া তাঁর বাড়ীর আঙ্গিনায় থেমেছিলো।

- হাঁ, সীরাতের কিতাবে পড়েছি। তাঁর দিলে আল্লাহর নবীর আযমত-মুহব্বত এমন ছিলো যে, নবীজীর ইচ্ছায় নীচের তলায় তাঁর থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন, আর তিনি ছিলেন উপরের তলায়। একরাত্রে হঠাৎ পানি পড়ে গেলো, আর তিনি ও তাঁর স্ত্রী লেপ দিয়ে পানি ধরে রাখলেন, চুইয়ে যেন নীচে না পড়ে। শীতে কত কষ্ট হলো, তবু নবীজীর যেন কষ্ট না হয়!

- ইস্তাম্বুলের আসল বিজয়ী তো এই মহান ছাহাবী। তাঁরই জিহাদের কল্যাণে এই ভূমিতে প্রথম ইসলামের আওয়ায পৌঁছেছে এবং এ শহর এক ছাহাবীর  মাদফান হওয়ার গৌরব লাভ করেছে।

***

অনেক শান্তি লাগছিলো। নিজের সঙ্গে নিজের আরো অনেক কথা বলার ছিলো। হঠাৎ দরজা খোলার আওয়ায হলো। মাওলানা আব্দুল মতীন, বললেন, সময় বেশী নেই। এখনই কাফেলা রওয়ানা হবে।

তাই তো! ভুলেই গিয়েছিলাম, আজ তাকসীম স্কয়ারে খোলা জলসা। ইমাম কাসিম নানুতবী রহ. পুরস্কার প্রদান করা হবে তুরস্কের সর্বজনশ্রদ্ধেয় আলিম শায়খ মাহমূদ আফেন্দিকে। বিশাল জলসার আয়োজন করা হয়েছে। মহিলাদের জন্যও রয়েছে আলাদা ব্যবস্থা। আয়োজকদের আশা, তুরস্কের সর্বস্তরের ইসলামপ্রিয় জনতা জলসায় বিপুল সংখ্যায় শরীক হবে। দুদিনের অভিজ্ঞতা থেকে আমারও সেরকম ধারণা। তুরস্কের ইতিহাসে এটাই হবে প্রথম উন্মুক্ত সাধারণ সভা, যাতে এতগুলো দেশের এত বিপুল মেহমান শামিল হবেন।

***

ডাইনিং হলে গিয়ে তো অবাক, যেন ভাঙ্গা হাট! যেখানে খাবারের স্তুপ থাকে সেখানে আছে শূন্য পাত্র! বিভিন্ন টেবিলে উচ্ছিষ্ট কিছু খাবার পড়ে আছে। দুটুকরো রুটি, আধখাওয়া একটুকরো গোশ্ত কুড়িয়ে নিলাম এবং পরম তৃপ্তির সঙ্গে আহার করলাম। নিজের সঙ্গে একান্তে সময় যাপনের এটা ছিলো পুরস্কার। নিজেকে তখন খুব ভাগ্যবান মনে হলো।

কফিটা ছিলো অবশ্য গরম। বেশ সতেজ লাগলো নিজেকে ধূমায়িত কফির কাপে চুমুক দিয়ে।

ডাইনিং হল থেকে বাইরে এসে দেখি, প্রায় সব মেহমান একত্র হয়েছেন মাঠে। কেউ কেউ বসে আছেন হোটেলের লবিতে। এত দেশের এত মেহমান, জনের সঙ্গে আর পরিচয় করার সুযোগ হয়েছে! অন্তত সৌজন্য বিনিময় করার! এখনকার সুযোগটা কাজে লাগিয়ে যে কজনের সঙ্গে পারলাম, সালাম বিনিময় করলাম। আরবী ভাষা যেখানে সহায়ক হলো সেখানে সৌজন্য বিনিময় ছাড়াও কিছু কথা হলো।

তুরস্কের কয়েকজন বিশিষ্ট ইসলামী ব্যক্তিত্ব, যারা আমন্ত্রিত মেহমানরূপে এখানেই অবস্থান করছেন তাদের আন্তরিকতা ছিলো সত্যি অন্তরছোঁয়া যারা আরবী জানেন তাদের সঙ্গে তো কিছু কথা হলো, যারা ইংরেজি জানেন তাদের সঙ্গেও একটা দুটো কথা হলো।[1]  বাকিদের ক্ষেত্রে সেই পুরোনো প্রবাদই সত্য হলো, যবানে ইয়ারে মান তুর্কী, ওয়া মান তুর্কী নামী দানাম -আমার প্রাণের বন্ধু, ভাষা তার তুর্কী, অথচ হায়, আমি জানি না তুর্কী!

তবে চোখের ভাষা অন্তরের সব অনুভূতি যেন তুলে ধরলো পরস্পরের কাছে। মুছাফাহা ও আলিঙ্গনেও পাওয়া গেলো অন্তরের উষ্ণতা।

***

বাস প্রস্তুত; মেহমান তৈয়ার। এমন সময় দেখি, আয়োজকদের মধ্যে কিছুটা অস্থিরতা। বিষয়টা দুএকজন লক্ষ্য করলেও বাকিরা ব্যস্ত ছিলেন নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতায়

মুহীউদ্দীন আওয়ামা, যাকে যখনই দেখেছি, ব্যস্ততার মধ্যেও আশ্চর্য রকম শান্ত অবস্থার মধ্যেই দেখেছি; তাকেও মনে হলো কিছুটা অস্থির। মোবাইলে  কথা বলছেন, আর এদিক থেকে ওদিক চঞ্চল পদক্ষেপে হাঁটছেন। আমার ভিতরের ষষ্ঠেন্দ্রিয় বলছেহোক না হোক, গুরুতর কোন জটিলতা দেখা দিয়েছে। কিন্তু কী সেটা?!

এবং সেটা জানা গেলো একটু পরেই। তুরস্কে সরকারের উপর যার সরকারি সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত তার নাম হলো সেনাবাহিনী। তাদের কাজ হলো জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সরকারকে কামালবাদের ছিরাতে গায়রুল মুস্তাকীম-এর উপর চলমান রাখা। সরকার যাই বলুক, যাই করুক, শেষ কথা বলার অধিকারী হলো সামরিক কর্তৃপক্ষ। তো সেই সামরিক কর্তৃপক্ষ হঠাৎ করে তাকসীম স্কয়ারের সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বসেছে। মুহিউদ্দীন আওয়ামা ও তাঁর তুর্কী সহযোগিরা সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ করে জানতে চাইলেন, আমরা তো সবরকম সরকারী আনুষ্ঠানিকতা পূর্ণ করে অনুমতি চেয়েছি এবং পেয়েছি। এখন হঠাৎ এ নিষেধাজ্ঞার কী কারণ? এতগুলো দেশের মেহমানদের সামনে তুরস্কের ভাবমর্যাদাই বা কী দাঁড়াবে?

ওদিক থেকে শুধু অসহায়ত্ব এবং আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করা হলো, আর বলা হলো, প্লিজ, আমাদের অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করুন। দয়া করে এমন কিছু করবেন না, যাতে সরকার বাড়তি সমস্যায় পড়ে যায়।

মুহিউদ্দীন আওয়ামা পিছু হটতে রাজী নন; তার কথা, সামরিক কর্তৃপক্ষ তাদের নিষেধাজ্ঞা লিখিত আকারে না জানালে আমাদের কাফেলা সমাবেশ-স্থলের উদ্দেশ্যে অবশ্যই যাত্রা করবে। পথে যদি বাধা আসে তখন না হয় ফিরে আসবো। বিদেশী মেহমানদের গ্রেফতার তো আর করতে পারবে না!

কিন্তু তার তুর্কী বন্ধুরা, যারা তুরস্কের সরকার ও সেনাবাহিনীর নাযুক সম্পর্কের বিষয় সম্যক অবগত তারা তাকে এই বলে নিরস্ত করলেন, হয়ত মেহমানদের পথিমধ্য হতে সসম্মানেই ফিরিয়ে দেয়া হবে, কিন্তু জেনারেলরা ধরে নেবেন, এর পিছনে সরকারের প্ররোচনা ছিলো, তখন বিষয়টা সরকারের জন্য অনেক দূর গড়াতে পারে। সেনাবাহিনী শুরু থেকেই অজুহাত খুঁজে ফিরছে, কিন্তু সরকার খুব ঠাণ্ডা মাথায় পরিস্থিতি মুকাবেলা করে আসছে। তুরস্কের ইসলামপ্রিয় জনগণ জোশের মুখে অনেক কিছুই করে ফেলতে চায়, কিন্তু সরকার জানে, জেনারেলদের সাংবিধানিক হাত কত লম্বা। তাই আমাদেরও উচিত হবে না, ইসলামপছন্দ সরকারের পরামর্শের বাইরে কোন পদক্ষেপ নেয়া।

শেষ পর্যন্ত ঘোষণা করা হলো, অনিবার্য কারণবশত তাকসীম স্কয়ারের সমাবেশ বাতিল করা হচ্ছে। এখন তা মাগরিবের পর হোটেলের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত হবে।

মেহমানদের মধ্যে হঠাৎ যেন হতাশা ছেয়ে গেলো। সবার মধ্যে কী হলো, কী হলো জিজ্ঞাসা। কিন্তু কারো কাছে উত্তর নেই। যারা সচেতন তারা অবশ্য এমনিতেই উত্তর পেয়ে গেলেন। ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, যার সঙ্গে একবার কিছু কথা হয়েছিলো, তাঁকে খুঁজে বের করলাম। বললাম, এখন তো আমাদের দুজনের হাতেই কিছু সময় আছে। আমি কি আপনার সঙ্গে কিছুটা সময় যাপন করতে পারি! তুরস্ক সম্পর্কে আপনার কাছ থেকে আমি কিছু জানতে চাই।

তিনি সানন্দে রাজী হলেন; বললেন, এখানে খোলা মাঠে নয়, আমার কামরায় চলো, নিরিবিলি কথা বলা যাবে।

আমীর ছাহেবের অনুমতি নিয়ে তার সঙ্গে কামরায় গেলাম।

***

তুর্কীরা মেহমানপ্রিয় জাতি, এটা  জানতাম, কিন্তু অধ্যাপক মাকছুদ সেকুতীন[2]  যেন নতুন করে তা প্রমাণ করে ছাড়বেন, তাই আমার জোরালো আপত্তি সত্তে¡ও ফোন করে তিনচার প্রকার জুস আনালেন। কাঁচের টেবিলের উপর স্ফটিকের স্বচ্ছ গ্লাসে জুসগুলো যখন সাজিয়ে পরিবেশন করা হলো তখন নিজেরই মনে হলো, আমার আপত্তিটা বোধহয় তেমন জোরালো ছিলো না। কারণ নিজের অজান্তেই হাতটা চলে গেলো আমের জুসটার দিকে। আমের জুস আমার বরাবরের প্রিয়। আর এ জুসটা ছিলোই বেশ মজাদার। মদিনা শরীফে কাছরে শীরীন পার হয়ে মাকতাবাতুল কাউছার নামে উর্দূ বইপত্রের যে লাইব্রেরীটা আছে তার পাশেই একটা জুস-এর দোকান, ওখানে আমের জুস  খেয়েছিলাম একবার, এবং তারপর বারবার। ইস্তাম্বুলের এই জুস মদীনার সেই জুসের কথাই যেন মনে পড়িয়ে দিলো। প্রথম চুমুকটা দিয়েই অধ্যাপক সেকুতীনকে বললাম, শুকরান! তিনি উৎসুক ভঙ্গিতে আমার দিকে তাকালেন, অর্থাৎ আমরা আলোচনা শুরু করতে পারি। আমি প্রশ্ন করলাম, মুস্তফা কামাল পাশা সম্পর্কে তুরস্কের জনগণ কী ভাবে? আর তার সম্পর্কে আপনার মত কী?

তিনি মৃদু হেসে বললেন, তুমি রেকর্ড করছো না তো?

আমিও হাসিটা ফিরিয়ে দিয়ে বললাম, সে তো সাংবাদিকদের কাজ, আমি সাংবাদিক নই, নিছক একজন তালিবে ইলম। তুরস্ককে, আরো নির্দিষ্ট করে যদি বলি, তুর্কিস্তানকে ভালোবাসি, তাই উছমানী খেলাফত সম্পর্কে এবং যার হাতে এর মৃত্যু ঘটেছে, সেই কামাল পাশা সম্পর্কে প্রকৃত সত্য জানতে চাই।

তিনি বললেন, আসলে উছমানী খেলাফতের ভিতরে, বিশেষ করে শেষ দিকে অনেক বিচ্যুতি দেখা দিয়েছিলো। খলীফাদের কিছু অযোগ্যতা তো ছিলোই, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলো ইহুদিদের বহুমুখী চক্রান্ত।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উছমানী খেলাফাত যখন বিপর্যয়ের সম্মুুখীন হলো এবং একের পর এক বিভিন্ন ভূখণ্ড তাদের হাতছাড়া হতে লাগলো তখন তুরস্কে বিশেষ করে সেনাবাহিনীতে এমন কিছু তরুণ ছিলো যাদের ধর্মের সঙ্গে বিশেষ কোন সম্পর্ক ছিলো না, তবে তারা জাতীয়তাবাদে প্রবলভাবে উদ্দীপ্ত ছিলো। তাদের শীর্ষকাতারে ছিলেন মুস্তফা কামাল আতাতুর্ক। অসহায় খলীফার চোখের সামনে মিত্রশক্তি যখন মহাউল্লাসে তুরস্কের ভাগবাটোয়ারায় ব্যস্ত, এমনকি দারুলখেলাফাত ইস্তাম্বুল পর্যন্ত দখল করতে উদ্যত তখন জাতীয়তাবাদী কামালপাশা রুখে দাঁড়ান। কয়েকটি যুদ্ধে শত্রুবাহিনীকে পরাস্ত করে তিনি যখন বীরের মর্যাদা পেতে শুরু করেছেন তখনই ধূরন্ধর ইহুদীচক্র তাকে কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেয় এবং অত্যন্ত সূক্ষভাবে তার মগজধোলাইয়ের কাজ শুরু করে।[3]

- তার মানে আপনি বলতে চান, কামাল নিজের অজ্ঞাতে ইহুদিদের ক্রীড়নক হয়ে কাজ করেছেন?

উত্তরে তিনি মৃদু হাসলেন। তারপর বললেন, খালেদা এদিব খানম ছিলেন তার খুব কাছের মানুষ। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিদূষী নারী। খেলাফতের প্রতি তাঁর কিছুটা মমতা ছিলো। তিনি চেয়েছিলেন, কামাল খলীফাকে ক্ষমতাচ্যুত করুন, তবে খেলাফত বহাল রাখুন, কিন্তু তুরস্কের শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম তখন অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিলো, আর কামাল নিজেও নিজের হাতে ছিলেন না।

যে অদৃশ্য শক্তি দ্বারা তিনি নিয়ন্ত্রিত ছিলেন তারা তাকে ভাবতে বাধ্য করেছিলো যে, তুরস্কের ভাগ্যবিপর্যয়ের জন্য একমাত্র দায়ী খলীফা ও খেলাফত। এর পিছনে যে ইহুদিদের চক্রান্তই ছিলো মূলত দায়ী, কামাল তা মানতে রাজী ছিলেন না। এমনকি তিনি এতদূর চলে গেলেন যে, ইসলামই তুরস্কের পশ্চাদপদতার জন্য দায়ী। সুতরাং ধর্মনিরপেক্ষতা, হাঁ নির্মম ধর্মনিরপেক্ষতাই শুধু পারে তুরস্কের ভাগ্যবদল ঘটাতে এবং ইউরোপের রুগ্ণ পুরুষ, এই বদনাম ঘুচাতে।

- তুরস্কের সাধারণ জনমতও কি খেলাফতের বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিলো?

তিনি করুণ হেসে বললেন, জনমত যতক্ষণ গণবিপ্লবের রূপ না নেয় ততক্ষণ তার কোন মূল্য থাকে না। দেশের এলিট শ্রেণী যা ভাবে সেটাই জনমত বলে স্বীকৃতি লাভ করে।

-আজকের ঘটনা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

- সম্মেলনের প্রতি সরকারের পূর্ণ সমর্থন ছিলো, কিন্তু সেনাবাহিনী তুরস্কে এত বড় এক আন্তর্জান্তিক সম্মেলন অনুষ্ঠানের পক্ষে শুরু থেকেই ছিলো না, কারণ এটাকে, তারা যে ধর্মনিরপেক্ষতার রক্ষক, তার বিরুদ্ধে পরিকল্পিত আঘাত বলেই ধরে নিয়েছিলো। বিশেষ করে তুরস্কের জনগণের মধ্যে যে ব্যাপক সাড়া পড়েছে, জেনারেলদের মধ্যে, বোঝা যায়, তা রীতিমত অস্বস্তি সৃষ্টি করেছে। তাই প্রকাশ্য সমাবেশ কিছুতেই তারা বরদাশত করতে রাজী নয়, তবে আমি মনে করি, সরকার পিছু হটে এবং সম্মেলনকর্তৃপক্ষ তা মেনে নিয়ে বিজ্ঞতারই পরিচয় দিয়েছে। অন্যথায় মারমুখো জেনারেলরা এরদোগানের বিরুদ্ধে একটা ভালো ছুতো পেয়ে যেতো।

- কামালের তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে ইসলামের দিকে বর্তমান তুরস্কের এ অভূতপূর্ব প্রত্যাবর্তনের পিছনে কাদের অবদান রয়েছে বলে মনে করেন?

- তুরস্কের জনগণের উপর আলিমসমাজের প্রভাব সবসময়ই ব্যাপক ছিলো। মুস্তফা কামাল তাদের পক্ষ হতে সবচে কঠিন প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছিলেন। তাই নির্যাতনের স্টিমরোলারটা তাদের উপর দিয়েই চালানো হয়েছিলো সবার আগে এবং ভয়ঙ্কর মাত্রায়। একদিকে আলিমদের বিরুদ্ধে প্রচার প্রপ্যাগান্ডা ছিলো এমনই ভয়াবহ যে, হোজা শব্দটি গালিতে পরিণত হয়েছিলো। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছিলো নিষ্ঠুরতম নির্যাতন। রাতের অন্ধকারে গুম হয়ে যেতেন বড় বড় আলিম। আর কোনদিন জানা যেতো না, কার ভাগ্যে কী ঘটেছে। শুধু ধরে নেয়া হতো, রাতের অন্ধকারে যিনি হারিয়ে গেছেন দিনের আলোতে তিনি আর কখনো ফিরে আসবেন না। এমন প্রতিকূল অবস্থার ভিতর দিয়েও আলিমগণ তাদের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদেরই সীমাহীন ত্যাগ ও কোরবানির ফলে শিক্ষিত তরুণসমাজ ধীরে ধীরে আবার ইসলামের দিকে ফিরে এসেছে এবং আসছে। শায়খ মাহমূদ, যাকে আজ সম্বর্ধনা দেয়া হচ্ছে, তিনি এবং তাঁর মত আরো বহু ওলামা মাশায়েখ ইসলামের মশাল ধরে রেখেছেন, তরুণসমাজকে আলোর পথ দেখিয়ে চলেছেন।

আমার কথাই ধরো; আমার বাবা ছিলেন কামালবাদের অতিউৎসাহী সমর্থক। আমার শৈশবও কেটেছে সেই পরিবেশে। যদিও মা চাইতেন আমি নামায পড়ি, রোযা রাখি, কিন্তু বাবার ভয়ে কিছু বলতে পারতেন না। তরুণবয়সে কীভাবে যেন শায়খ মাহমূদের সংস্পর্শে এসে গেলাম, আর আমার মধ্যে পরিবর্তন শুরু হলো। আমি কোরআন পড়া শিখেছি যুবক হয়ে।

তো এটা অকাট্য সত্য যে, ওলামা-মাশায়েখের নীরব আন্দোলনেরই সুফল হচ্ছে তুরস্কের বর্তমান ইসলামী নবজাগরণ। এছাড়া রাজনৈতিক সফলতা অর্জন করা কিছুতেই সম্ভব হতো না। কামালবাদের উত্থানকাল যারা না দেখেছে তারা বুঝতে পারবে না, যতটুকু অর্জিত হয়েছে তা কত কঠিন ছিলো এবং সামনের পথ কত কঠিন হতে পারে, আর সে জন্য কী পরিমাণ রাজনৈতিক দূরদর্শিতার প্রয়োজন।

-একে পার্টির ভবিষ্যত কী বলে আপনার মনে হয়?

- কামালবাদীদের পক্ষ হতে পদে পদে চরম প্রতিকলতার মোকাবেলা করতে হচ্ছে। তবে আশার কথা, ধীরে ধীরে তাদের প্রতি জনসমর্থন বেড়েই চলেছে, ক্ষমতাসীন কোন দলের ক্ষেত্রে যা বিস্ময়কর। এর পিছনে মূলত রজব তৈয়ব এরদোগানের সাহসী নেতৃত্বই কাজ করছে। তবে ভিতর ও বাইর উভয় দিক থেকে নানামুখী চেষ্টা চলছে পার্টির অভ্যন্তরে বিভেদ সৃষ্টির। বিশেষ করে এরদোগানকে তার সহকর্মীদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার চক্রান্ত অনেক দূর এগিয়ে গেছে। এরদোগান যদি এ বিষয়ে আরো সতর্ক হোন তাহলে ভালো হয়।

অধ্যাপক সেকুতীনের সঙ্গে খোলামেলা অনেক আলোচনা হলো, যা বর্তমান তুরস্কের অবস্থা বোঝার ক্ষেত্রে আমার জন্য যথেষ্ট উপকারী ছিলো। ইচ্ছে ছিলো শেষ খলীফা সুলতান আব্দুল হামীদ সম্পর্কে তাকে কিছু প্রশ্ন করবো, কিন্তু এরই মধ্যে আযান হয়ে গেলো। আমি তাকে অনেক অনেক জাযাকাল্লাহ জানিয়ে কামরা থেকে বের হয়ে এলাম। তিনি আমাকে, আমার মত সামান্য এক তালিবে ইলমকে লিফটের দুয়ার পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। এটা ছিলো তাঁর অনেক বড় মনের পরিচয়।

***

মাগরিবের পর অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেলো। আয়োজকদের মধ্যে বেশ উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে সম্মেলনের সফল সমাপ্তি নিয়ে। সবকিছু ভালোয় ভালোয় সম্পন্ন হলেই হয়। মূল অনুষ্ঠানের আগে ছিলো একটি মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। কোরআন তেলাওয়াতের পর আরবীতে হামদ ও নাত পরিবেশন করলো দুটি তুর্কী বালক। কে বলবে এরা তুর্কী অনারব, হেজাযের আরব বালক নয়?! যেমন সুকণ্ঠ তেমনি বিশুদ্ধ আরব-উচ্চারণ! বোঝাই যায়, এর পিছনে রয়েছে তাদের এবং তাদের শিক্ষকদের কত দীর্ঘ সাধনা ও অধ্যবসায়!

পরে জেনেছি, এরা ইস্তাম্বুলের সুপ্রসিদ্ধ

 مدرسة تحفيظ القرآن الكريم

এর ছাত্র। ১৯৮৬ সালে এ মাদরাসাই পরিদর্শন করেছিলেন আল্লামা তক্বী উছমানী মু. তিনি তাঁর সফরনামায় লিখেছেন-

মাদরাসা দেখে দিল বাগবাগ হয়ে গেলো। আবাসিক ছাত্রের সংখ্যাই ছয়শ, যাদের বয়স দশ থেকে সতের। হিফযুল কোরআনের সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকে আরবী ভাষা এবং দ্বীনের প্রাথমিক বিষয় শিক্ষা দেয়া হয়। আমরা সম্পূর্ণ নিজের মত করে পরীক্ষা নিয়ে দেখলাম, শিক্ষার মান যথেষ্ট উন্নত। হেফযের ভুল তো দূরের কথা, এমনকি একটি ছেলেও তাজবীদের কোন ভুল করেনি। আর লাহজা ও তিলাওয়াত তো এমনই মর্মস্পর্শী যে, মন চাচ্ছিলো, সারা রাত শুনতে থাকি। .....

আমারও খুব ইচ্ছা ছিলো ইস্তাম্বুলের দ্বীনী মাদরাসাগুলো পরিদর্শন করার, যার সংখ্যা তাক্কী উছমানীর মতে তখনই দুশ ছাড়িয়ে গিয়েছিলো, আর সারা তুরস্কে এর সংখ্যা ছিলো পাঁচ হাজার। আল্লামা উছমানী লিখেছেন, এই দ্বীনী প্রতিষ্ঠানগুলো না দেখলে একজন পর্যটকের মনে হবে, পশ্চিমা সংস্কৃতিতে ঝলমল করা আধুনিক ইস্তাম্বুলই বুঝি সবকিছু, কিন্তু এখানে এসে বোঝা গেলো, এটাই তুরস্কের আসল চেহারা এবং তুর্কী জাতির মূল¯্রােতধারার রক্ষক। এটা শুধু তুর্কীদের অতীত নয়, বর্তমানও এবং ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতও। শত চেষ্টা করেও এটাকে নির্মূল করা সম্ভব হয়নি, বরং আজ তা পূর্ণ ঔজ্জ্বল্য নিয়ে সামনে এসেছে এবং এগিয়ে চলেছে। বস্তুত এই একটিমাত্র মাদরাসায় যে নূর ও নূরানিয়াত অনুভব করলাম তার তাজাল্লি দীর্ঘ সময় পর্যন্ত দিল ও দেমাগকে উদ্ভাসিত করে রেখেছিলো।

ইচ্ছে তো আছে, কিন্তু সুযোগ হবে বলে মনে হচ্ছে না, অন্তত এই সফরে। সবই আল্লাহর ইচ্ছা!

এরপর তুর্কীভাষায় পেশ করা হলো জোশ ও জযবায় উদ্বেলিত সমবেত কণ্ঠের জিহাদী সঙ্গীত। বোঝা গেলো না কিছুই, তবে জোশ ও জযবার উত্তাপ আমাদেরও হৃদয় ছুঁয়ে গেলো।

এরপর মঞ্চের পিছনের দেয়ালে স্থাপিত বিরাট পর্দায় দেখানো হলো সুলতান মুহম্মদ আলফাতিহ-এর ইস্তাম্বুল বিজয়ের ধারাবাহিক দৃশ্য, যা হলভর্তি মেহমান ও দর্শকদের মধ্যে বিপুল উদ্দীপনা সৃষ্টি করলো। সবকিছু ছাপিয়ে বারবার তাকবীরধ্বনি উচ্চারিত হতে লাগলো। প্রথমেই দেখানো হলো বসফরাস থেকে গোল্ডেন হর্ন-প্রবেশমুখের সেই ঐতিহাসিক লোহার শেকল এবং তার পেছনে বাইজান্টাইন নৌবাহিনীর বড় বড় জাহায। নেপথ্য থেকে ভেসে আসছিলো গুরুগম্ভীর আওয়ায, বুঝতে তো পারিনি, তবে মনে হলো, যিঞ্জির শব্দটা কয়েকবার শুনলাম। আমার ভিতরে তখন আশ্চর্য এক রোমাঞ্চ!

পুরো বিষয়টি বোঝার জন্য একটু গোড়া থেকেই বলতে হয়।

ঐতিহাসিক দিক থেকে ইস্তাম্বুল শহর, যার পূর্বনাম ছিলো কনস্টান্টিনোপল, এর এত বিরাট গুরুত্ব ছিলো যে, রোম ও এথেন্সের পরই ছিলো এর অবস্থান। পৃথিবীর আর কোন প্রাচীন শহর এর সমকক্ষ ছিলো না। ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থান হওয়ার কারণে ভৌগোলিক দিক থেকেও এর গুরুত্ব ছিলো অপরিসীম। কথিত আছে, ফ্রান্সের বহু যুদ্ধজয়ী সেনাপতি সম্রাট নেপোলিয়ান বোনাপার্ট বলেছেন, সারা পৃথিবী যদি একটিমাত্র সাম্রাজ্য হয় তাহলে তার রাজধানী হিসাবে ইস্তাম্বুলই হবে সবচে উপযুক্ত শহর।

হাজার বছরেরও বেশী সময় ধরে এটি ছিলো বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী। উন্নতির চরমোৎকর্ষের সময় বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যই ছিলো সম্পদে সভ্যতায় পৃথিবীর সবচে বড় শক্তি। খৃস্টানজগতের পূর্বাঞ্চলীয় গীর্জারও প্রধান কেন্দ্র ছিলো এ শহর। সেন্ট ছুফিয়া গীর্জার কথা তো আগেই বলা হয়েছে।

তো রাজনৈতিক ও ধর্মীয় এ বিরাট গুরুত্বের কারণেই স্বয়ং নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ শহর অধিকার করার জন্য উম্মতকে উৎসাহ দান করেছেন। এমনকি তিনি মুসলমানদের হাতে এ শহর বিজিত হবে বলে ভবিষ্যদ্বাণীও করেছেন, আর যারা কুসতুনতুনিয়া বিজয়ের জিহাদে শরীক হবে তাদের জন্য মাগফেরাতের খোশখবর দিয়েছেন।

হযরত আনাস রা.-এর খালা হযরত উম্মে হারাম বিনতে মিলহান রা. ছিলেন নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রাযাঈ (দুধশরীক)  আত্মীয়া। একদুপুরে তিনি তাঁর ঘরে বিশ্রাম করছিলেন; হঠাৎ তিনি জাগ্রত হলেন, আর তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডলে মৃদুহাসির উদ্ভাস দেখা দিলো।

হযরত উম্মে হারাম কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, স্বপ্নে আমাকে উম্মতের ঐসব লোকদের দেখানো হলো যারা জিহাদের উদ্দেশ্যে সমুদ্রযাত্রা করবে। বড় বড় ঢেউয়ের উপর তাদের অবস্থা হবে এমন যেন সিংহাসনের উপর বসে আছেন বাদশাহ।

হযরত উম্মে হারাম আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, দুআ করুন, আমাকেও যেন আল্লাহ ঐ জিহাদে শামিল করেন।

তিনি দুআ করলেন, আবার ঘুমিয়ে পড়লেন। একটু পর আবার জেগে ওঠলেন এবং তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডল মৃদুহাসিতে উদ্ভাসিত হলো।

হযরত উম্মে হারাম আবার কারণ জিজ্ঞাসা করলেন, আর তিনি বললেন, আমার উম্মতের প্রথম লশকর যারা রোমের কায়ছার-এর শহর (কুসতুনতুনিয়া) জয় করার জন্য জিহাদ করবে তাদের মাগফেরাতের খোশখবর দেয়া হয়েছে।

হযরত উম্মে হারাম আবার আরয করলেন, হে আল্লাহর নবী, দুআ করুন, ঐ লশকরে আল্লাহ যেন আমাকেও শামিল করেন।

(সম্ভবত আল্লাহর নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, না, তুমি শুধু প্রথম লশকরে শামিল হবে।)

হযরত উছমান রা.-এর খেলাফত -কালে তাঁর আদেশে হযরত মুআবিয়া রা. সাইপ্রাসে অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। ইসলামের ইতিহাসে এটাই ছিলো প্রথম নৌঅভিযান। হযরত উম্মে হারাম তাঁর স্বামী হযরত উবাদাহ বিন ছামিত রা.-এর সঙ্গে ঐ জিহাদে শামিল হয়েছিলেন। এ অভিযানেই সন্ধির মাধ্যমে সাইপ্রাস মুসলমানদের অধিকারে আসে। সুতরাং এদিক থেকে মুসলিম উম্মাহর প্রথম নৌঅভিযান ছিলো সফল। ফেরার পথে হযরত উম্মে হারাম ঘোড়ার উপর থেকে পড়ে গিয়ে শাহাদাত লাভ করেন। এভাবে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রথম ভবিষ্যদ্বাণী ও সুসংবাদ পূর্ণতা লাভ করে।

পরবর্তীকালে হযরত মুআবিয়া রা.- যখন খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন তখন তিনি আপন পুত্র ইয়াযিদের নেতৃত্বে কুসতুনতুনিয়ায় অভিযান পরিচালনা করেন। উচ্চ মরতবার বহু ছাহাবী তাতে শামিল ছিলেন।    তাঁদেরই একজন ছিলেন নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মেযবান হযরত আবু আইয়ূব আনছারী রা.

এটা ছিলো ইসলামের ইতিহাসে কুসতুনতুনিয়ার প্রথম অবরোধ। দীর্ঘ দিনের কঠোর অবরোধের পরো শহরটি দখল করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে হযরত আবূ আইয়ূব আনছারী রা. অসুস্থ হয়ে পড়লেন, যা ছিলো তাঁর মারাযুল মউত সেনাপতি ইয়াযীদ তাঁকে দেখতে এসে জানতে চাইলেন, আপনার কোন ইচ্ছা, যা আমি পূর্ণ করতে পারি?!

আল্লাহর নবীর মেযবান এই বৃদ্ধ ছাহাবী মৃত্যুশয্যায় যে শেষ ইচ্ছার কথা জানালেন, এযুগের মুসলমানদের কল্পনায়ও হয়ত তা আসবে না। তিনি বললেন, ভাতিজা, মউতের পর আমার জানাযা নিয়ে যতদূর পারো এগিয়ে যেয়ো। যখন আর এগুতে পারবে না তখন সেখানেই আমাকে দাফন করো।

হযরত আবূ আইয়ূব আনছারী রা.-এর তামান্না পূর্ণ করা হলো। মৃত্যুর পর তাঁর জানাযাসহ মুজাহিদীন আগে বাড়লেন এবং কুসতুনতুনিয়ার নগরপ্রাচীরের গোড়ায় তাঁকে দাফন করলেন।

কথিত আছে, শহরের বিশিষ্ট লোকদের ডেকে ইয়াযীদ বলেছিলেন, দেখো, আমরা আমাদের সবচে বুযুর্গ ব্যক্তিকে তোমাদের যমীনে দাফন করে গেলাম। যদি এ কবরের সামান্য অবমাননাও করা হয় তাহলে আল্লাহর কসম, আমাদের ক্রোধ থেকে কেউ তোমাদের বাঁচাতে পারবে না। এ শহর ধূলোর সাথে মিশিয়ে দেয়া হবে।

মুসলমানদের কথা তখন শুধু শব্দ ছিলো না, ছিলো শক্তি; তলোয়ারের শক্তি, বারুদের শক্তি এবং কামানের শক্তি। যত দিন শব্দের পিছনে শক্তি ছিলো, কোন রাজা ও রাজ্যের সাধ্য ছিলো না তাকে অবজ্ঞা করার। যে বাহিনী শহর জয় করতে ব্যর্থ হয়ে ফিরে যাচ্ছে, তার সেনাপতির এ ধমককে অবজ্ঞা করার সাহস হয়নি কনস্টান্টিনোপলের নগরপতির, এমনকি স্বয়ং বাইজান্টাইন সম্রাটের।

এভাবে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দ্বিতীয় ভবিষ্যদ্বাণীও পূর্ণ হলো।

এরপর ছিলো তৃতীয় সুসংবাদ এবং সেটাই ছিলো চূড়ান্ত সুসংবাদ। মুসনাদে আহমদে হযরত বিশর বিন সোহায়ম রা. হতে বর্ণিত হয়েছে। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

لتفتحن القسطنطنـيـة, فلنعم الأمير أميرها, ولنعم الجيش ذلك الجيش

অবশ্যই তোমরা কুসতুনতুনিয়া জয় করবে। তো কত না উত্তম সেই আমীর এবং কত না উত্তম সেই বাহিনী!

এ সুসংবাদ তো সাধারণ কোন সুসংবাদ ছিলো না। পরবর্তী যুগের প্রত্যেক মুসলিম শাসকের অন্তরেই ছিলো এ মহান সুসংবাদের গৌরব অর্জনের আকাক্সক্ষা, এমনকি আদর্শ খলিফা হযরত ওমার বিন আব্দুল আযীয রহ.ও তাঁর সংক্ষিপ্ত খেলাফত-কালে একবার চেষ্টা করেছেন। উমাইয়া খলীফাদের মধ্যে ছিলেন হিশাম বিন আব্দুল মালিক। আরো পরে আব্বাসী খলীফাদের মধ্যে ছিলেন আলমাহদী ও হারুনুর-রশীদ, যার সম্পর্কে ইতিহাস বলে, একবছর তিনি হজ্বের সফর করতেন, আরেক বছর করতেন জিহাদের সফর।

একের পর এক অভিযান চলছিলো, কিন্তু প্রতিটি অভিযান এসে আছড়ে পড়তো কুসতুনতুনিয়ার নগরপ্রাচীরের গায়ে। কোন অভিযানই সফল হতে পারেনি।

আল্লামা তক্বী উছমানী তাঁর সফরনামায় এসম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনা করে লিখেছেন-

প্রথমত শহরটির অবস্থানই ছিলো এমন যে, তিনদিকেই ছিলো উপসাগরীয় বেষ্টনী, যা শহরটিকে অজেয় করে রেখেছিলো। দ্বিতীয়ত এটা ছিলো এমন পাহাড়ী এলাকা যেখানে শীতকালে শীতের প্রকোপ ছিলো ভয়াবহ। আরবের মরুবাসীদের জন্য ঐ শীতের মোকাবেলা করা ছিলো কঠিন, বরং অসম্ভব।

তৃতীয়ত শহরের চারপাশে পরপর তিনটি প্রাচীর ছিলো। প্রতি একশ সত্তর ফুট দূরত্বে ছিলো মযবূত বুরুজ, যেখানে রাতদিন ছিলো চৌকশ প্রহরীদলের সতর্ক প্রহরা। প্রতিটি প্রাচীর ছিলো অতি সুদৃঢ়। প্রথম দুই প্রাচীরের মাঝখানে ছিলো ষাট ফুট প্রশস্ত এবং একশ ফুট গভীর একটি পরিখা। এদিক থেকে এই নগর-দুর্গ ছিলো তদানীন্তন পৃথিবীতে সবচে সুরক্ষিত ও অপরাজেয়।

চতুর্থত ঈসায়ী দুনিয়ায় কুসতুনতুনিয়ার যে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মর্যাদা ছিলো তার প্রেক্ষিতে প্রতিটি হামলার সময় পুরো ঈসায়ী দুনিয়া একযোগে এগিয়ে আসতো এবং জানের বাজি লাগিয়ে দিতে একেবারে তৈয়ার হয়ে যেতো।

আমার মতে আরেকটি কারণ ছিলো যা আল্লাহর ইচ্ছায় সুলতান মুহাম্মাদ আলফাতিহ সর্বপ্রথম বুঝতে পেরেছিলেন। সে প্রসঙ্গ পরে আসছে।

***

সেলজুকী তুর্কীদের পতনের পর উছমানী সালতানাত গড়ে উঠলো। পঞ্চম উছমানী সুলতান বায়যীদ ইয়লদরম (১৩৮৯ - ১৪০২ খৃ.) তাঁর ক্ষমতার শেষ বছর পূর্ণ শক্তি নিয়ে কুসতুনতুনিয়া অবরোধ করেছিলেন। বীরত্ব ও যুদ্ধকুশলতায় তিনি ছিলেন তার যুগের সেরা শাসক। ইউরোপের জন্য মূর্তিমান ত্রাস, যেন আকাশের বজ্র। তাই তার উপাধি ছিলো ইয়লদরম (বজ্র)[4]

সমরকুশলতা ও সামরিক প্রস্তুতি উভয়দিক থেকেই যথেষ্ট সম্ভাবনাপূর্ণ ছিলো কুসতুনতুনিয়ার উপর ইয়লদরম-এর বজ্রাঘাত এবং ঐতিহাসিকদের মতে অবরোধের গতিপ্রকৃতি থেকে বোঝা যাচ্ছিলো শহরটির পতন ছিলো সময়ের ব্যাপার।

কিন্তু সুলতান বায়যীদ ইয়লদরম-এর দুর্ভাগ্য, তার চেয়ে বেশী পুরো মুসলিম উম্মাহর দুর্ভাগ্য যে, সুলতানকে অবরোধ তুলে আঙ্কারায় ফিরে আসতে হলো। কারণ ল্যাঙড়া তৈমূর সেটাকেই ভেবে বসলেন মোক্ষম সময় পিছন থেকে সুলতানের পিঠে ছুরি বসিয়ে দেয়ার। হাঁ, তৈমুরের হামলা ছিলো পিছন থেকে ছুরি বসিয়ে দেয়ারই মত, যা কোন মুসলিম শাসকের পক্ষে তো বটেই, কোন অভিজাত বীরের পক্ষেও ছিলো লজ্জার বিষয়। এমনকি ক্রুশেডযুদ্ধের বীর রাজা রিচার্ড, যাকে অন্যায়ভাবে ইংরেজ ঐতিহাসিকরা সিংহহৃদয় বলে থাকে, তিনিও বাইতুল মাকদিসবিজয়ী সুলতান ছালাহুদ্দীনের উপর এমন কাপুরুষোচিত হামলা কখনো করেননি।

রাজধানী আঙ্কারার কাছে ঘোরতর যুদ্ধ হলো তৈমুর লঙ ও সুলতানের বাহিনীর মধ্যে। সুলতানের বাহিনী তখন খৃস্টানদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ অবরোধ লড়াইয়ের কারণে ছিলো ক্লান্ত, শ্রান্ত ও বিপর্যস্ত। তৈমূরের মত একটি তাজাদম বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অবস্থায় কোনভাবেই ছিলো না। ফল যা হওয়ার তাই হলো। সুলতান বায়যীদ, ইউরোপ যাকে মনে করতো ইয়লদরম, মর্মান্তিকভাবে পরাজিত হলেন এবং বন্দী হলেন। বন্দী বীরের যে মর্যাদা প্রাপ্য ছিলো তাও দিতে রাজী হয়নি ল্যাঙড়া তৈমূর।

যাক, এটা ছিলো মুসলিম উম্মাহর এক ট্রাজেডি, যার কারণে কুসতুনতুনিয়ার বিজয় দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী পিছিয়ে গিয়েছিলো। শুধু এই একটি কারণে চেঙ্গিজ যদিও বা মুসলিম উম্মাহর ক্ষমা পেয়ে যায়, তৈমূর কখনো ক্ষমা পেতে পারে না।

যাই হোক, শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা উছমানী সালতানাতের অষ্টম সুলতান মুহাম্মাদ-এর হাতে কুসতুনতুনিয়ার বিজয় সম্পন্ন করলেন। মাত্র বাইশবছর বয়সে এই সাহসী যুবক সালতানাতের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। কুসতুনতুনিয়া জয় করার সুবাদেই তিনি আলফাতিহ-এর মর্যাদাপূর্ণ উপাধি লাভ করেছিলেন তাঁর সালতানাতের  আলিমদের পক্ষ হতে। সর্বোপরি তিনিই হলেন, যবানে নবুয়ত থেকে উচ্চারিত نعم الأمير  (কত না উত্তম আমীর!)

যুবক বয়সেই তিনি যেমন ছিলেন সৎ, ধার্মিক ও ন্যায়পরায়ণ তেমনি ছিলেন সাহসী, সমরকুশলী এবং অতুলনীয় প্রজ্ঞার অধিকারী।

প্রথমেই তিনি চিন্তা করে ঐসব কারণ চিহ্নিত করলেন যা এতদিন কনস্টান্টিনোপল জয়ের পথে বাঁধা হয়ে এসেছে।

ইউরোপ থেকে কনস্টান্টিনোপলের জন্য যে সামরিক সাহায্য আসতো তা সাধারণত কৃষ্ণসাগর থেকে বসফরাস উপসাগর হয়ে স্বর্ণশৃঙ্গের মাঝামাঝিতে অবস্থিত বন্দরে এসে ভিড়তো। সুতরাং শহরটিকে ইউরোপীয় সাহায্য থেকে বিচ্ছিন্ন করা ছিলো জরুরি। আর সে জন্য বসফরাসের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার কোন বিকল্প ছিলো না। হতভাগ্য সুলতান বায়যীদও সেটা বুঝতে পেরেছিলেন। সে জন্য তিনি বসফরাসের সবচে সঙ্কীর্ণ এলাকাটি চিহ্নিত করে তার এশীয় অংশে একটি মযবূত দুর্গ তৈরী করেছিলেন, যা আনাতোল দুর্গ নামে প্রসিদ্ধ। ইয়লদরমের জিহাদি প্রচেষ্টার স্মারক হিসাবে দুর্গটি এখনো বিদ্যমান রয়েছে।

এ পর্যন্ত ঠিক ছিলো, কিন্তু সুলতান মুহাম্মাদ দেখলেন, বসফরাসের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু একপাড়ের দুর্গ যথেষ্ট নয়। তাই তিনি ঐ দুর্গ বরাবর ইউরোপীয় অংশেও একই রকম মযবূত একটি দুর্গ তৈরী করলেন, রোমেল দুর্গ। দূর থেকে উপসাগরের মাঝখানে জাহাযে দাঁড়িয়ে দেখলে মনে হয়, দুই সহযোদ্ধা  বুঝি বসফরাসকে পাহারা দিচ্ছে। জনৈক ইউরোপীয় পর্যটক এভাবেই বর্ণনা করেছেন, আমি হলে সহযোদ্ধার পরিবর্তে লিখতাম, দুই মুজাহিদ সহোদর

ফল এই দাঁড়ালো যে, আনাতোল দুর্গের তোপের নাগাল এড়িয়ে ইউরোপীয় তীর ঘেঁষে যেসব জাহায নিরাপদে পার হয়ে যেতো তারা আর নিরাপদ থাকলো না। প্রতিটি জাহায উছমানীদের দোতরফা তোপের নাগালে এসে গেলো। ইউরোপের ঐতিহাসিকগণপর্যন্ত সুলতান মুহাম্মাদ-এর এ বিচক্ষণতার প্রশংসা করতে বাধ্য হয়েছেন। তবে বিদ্বেষটুকু লুকিয়ে রাখতে না পেরে লিখেছেন, যথেষ্ট দুষ্টু বুদ্ধি ছিলো তাঁর মাথায়!

জ্বি হাঁ, বাড়া ভাতে ছাই পড়েছিলো যে!

সুলতান আরেকটি বিচক্ষণতার পরিচয় দিলেন। তিনি দেখলেন, বর্তমান তোপগুলো নগরপ্রাচীরে কার্যকর আঘাত হানার জন্য তেমন উপযোগী নয়। তাই তিনি লোহার পরিবর্তে পিতল ব্যবহার করে এমন বিশাল এক কামান তৈরী করলেন যার সমকক্ষ কামান সারা দুনিয়ায় তখন ছিলো না। ঐ তোপ থেকে যখন পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম গোলাটি নিক্ষেপ করা হলো তখন কনস্টান্টিনোপল শহর পর্যন্ত কেঁপে উঠেছিলো। বলা হয়, সুলতান ইচ্ছাকৃতভাবেই শহরের কাছাকাছি এলাকায় পরীক্ষাটি চালিয়েছিলেন। শত্রুর মনে ভয় ঢুকিয়ে দেয়ার জন্যই ছিলো তাঁর এ কুশলী পদক্ষেপ। তাতে এক ঢিলে দুই পাখী শিকার হলো। পরীক্ষাও হলো, শত্রুর বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেয়াও হলো। সাধে কি আর ইউরোপের ঐতিহাসিক দুষ্ট বুদ্ধি কথাটা ব্যবহার করেছেন!

ঐ তোপ থেকে আটমন ওজনের গোলা একমাইলেরও বেশী দূরত্বে নিক্ষেপ করা যেতো। বারুদবোঝাই করতে সময় লাগতো দুঘণ্টা; তবে অবরোধের একপর্যায়ে আরো কম সময়ে বারুদবোঝাই হতো বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।

সুলতান মুহাম্মাদ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনায় আনলেন। কনস্টান্টিনোপল যেহেতু তিনদিক থেকে বসফরাস, মারমারা প্রণালী এবং গোল্ডেন হর্ন দ্বারা বেষ্টিত ছিলো, শুধু পূর্বদিকে ছিলো স্থল। সুতরাং কার্যকর হামলার জন্য তিনদিকের জলভাগকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়া ছিলো জরুরি। তাই তিনি একশ চল্লিশটি জঙ্গীজাহাযের এক বিশাল বহর গড়ে তুললেন সম্ভাব্য কম সময়ের মধ্যে।

এভাবে যুবক সুলতান তাঁর সাধ্যের ভিতরে সমস্ত আয়োজন সম্পূর্ণ করে কনস্টান্টিনোপল আবরোধ করলেন। ইউরোপীয় ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, বাইজান্টাইন সম্রাট জানতেন, সুলতান শহর অবরোধ করবেন, তবে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির জন্য সুলতানের যতটা সময় প্রয়োজন বলে তিনি ভেবেছিলেন তার চেয়ে অনেক কমসময়ে সুলতান তাঁর আয়োজন সম্পন্ন করেছিলেন। সম্রাটের ধারণা থেকে সুলতান প্রায় একবছর এগিয়ে ছিলেন।

অর্থাৎ তারা বলতে চেয়েছেন, সময়কেও সুলতান একটি কার্যকর অস্ত্ররূপে ব্যবহার করেছেন, যদি এযুগের ভাষায় বলি, সময়-বোমা, খুব একটা বেমানান হবে না আশা করি।

বিষয়টি বোঝার জন্য এ তথ্যটি খুবই উপযোগী হবে যে, আনতোল দুর্গের বরাবর ইউরোপীয় অংশে সুলতান যে দুর্গটি তৈরী করেছেন তাতে সময় লেগেছে মাত্র এবং মাত্র চারমাস চারদিন; আবার পড়ুন, চারমাস চারদিন! ১৪৫২ সালের ২৪শে এপ্রিলে শুরু হয়ে ২৮শে আগস্ট সমাপ্ত হয়েছে।

দুর্গের নকশা তৈরী করেছিলেন সুলতানের প্রধান প্রকৌশলী মুছলেহুদ্দীন আগা, যিনি কোরআনের হাফেয ছিলেন এবং আলেম ছিলেন।[5] দুর্গটি গড়ে উঠেছে তিনহাজার বর্গমিটার এলাকাজুড়ে, যার বুরুজ সংখ্যা হলো ১৭টি। কয়েকটি বুরুজের উচ্চতা নব্বই ফুটের মত। কোন কোন স্থানে পাচিলের উচ্চতা হচ্ছে পনের মিটার।

আবার ভাবুন, এমন একটি দুর্গ তৈরী হয়েছে মাত্র চারমাস চারদিন সময়ের মধ্যে। সন্দেহ হতেই পারে, সোলায়মানের দৈত্য হয়ত এখানে কাজ করেছে।

আল্লামা উছমানী মু. ঠিকই লিখেছেন-

আজ স্থাপত্যবিদ্যা কত উন্নতি করেছে তা তো জানাই আছে। কিন্তু এমন একটি দুর্গের শুধু নকশাই হয়ত এখন চারমাসে প্রস্তুত করা সম্ভব হবে না।

মঞ্চের পিছনের পর্দায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দেখানো হলো কীভাবে রোমেল দুর্গ তৈরী হচ্ছে। শ্রমিকরা কাজ করছে আর তাকবীর ধ্বনি দিচ্ছে। অপূর্ব! সত্যি অপূর্ব!!

যাই হোক, সুলতান তুফানের গতিতে প্রস্তুতি নিয়ে ঝড়ের বেগে কনস্টান্টিনোপল অবরোধ করলেন, আর তখনই তাঁর সামনে দেখা দিলো এমন একটি সমস্যা যা মুহাম্মাদ আলফাতিহ-এর মত দূরদর্শী সুলতানেরও চিন্তায় আসেনি।

স্থলপথে ফৌজ শহরের পূর্বপ্রাচীর ও তার দরজা অবরোধ করলো, অন্যদিকে নৌবহর বসফরাসের বুকে দাপিয়ে বেড়াতে লাগলো। কিন্তু আসল প্রয়োজন ছিলো গোল্ডেন হর্ন-এ অবস্থিত বন্দরটি অবরোধ করা এবং আরো এগিয়ে দক্ষিণদিকের প্রাচীরকে তোপের নাগালে নিয়ে আসা। কিন্তু ...

এই কিন্তুটার জন্য বাইজান্টাইন সম্রাটকেও সাধুবাদ দিতে হয়। আসলে তিনি সাহসী ও কুশলী দুটোই ছিলেন; তবে কিনা পাল্লাটা পড়ে গিয়েছিলো মুহাম্মাদ আলফাতিহ-এর সঙ্গে!

কনস্টান্টিনোপলের অবস্থান ছিলো এমন যে, বসফরাস থেকে একটি চিকন শাখা শিঙ-এর মত বের হয়ে পূর্বদিকে চলে গিয়েছে, যাকে ইংরেজিতে বলে গোল্ডেন হর্ন।[6] 

এই স্বর্ণশৃঙ্গের মাঝামাঝি অংশেই কনস্টান্টিনোপলের প্রাণভোমরা-রূপে গণ্য বন্দর অবস্থিত ছিলো।

এখানে পৌঁছতে হলে বসফরাস থেকে স্বর্ণশৃঙ্গে প্রবেশ করতে হবে। আর স্বর্ণশৃঙের ঠিক প্রবেশমুখে বাইজান্টাইন সম্রাট একটি কিন্তু তৈরী করে রেখেছিলেন। সেটা হলো এপার থেকে ওপার পর্যন্ত পানির উপর টানিয়ে রাখা লোহার মস্ত বড় যিঞ্জির। এমনিতে উপর থেকে দেখা যায় না, কিন্তু জাহায যেতে নিলেই বাধাগ্রস্ত হয়, এমনকি ডুবেও যায়। ভাবুন, কত বড় কিন্তু যা সুলতানের ভাবনায় আগে আসেনি।

গোল্ডেন হর্ন-এর ভেতরের দিকে বড় বড় বাইজাইন্টীয় জাহায যিঞ্জিরের নিরাপত্তার জন্য প্রস্তুত ছিলো, আবার উভয় তীরে পর্যাপ্ত সংখ্যক তোপ স্থাপন করা হয়েছিলো। মোটকথা, সুলতানের কোন জাহাজের জন্য স্বর্ণশৃঙ্গে প্রবেশ করার চেষ্টা করার অর্থই ছিলো মৃত্যুফাঁদে পা দেয়া।

আমার মনে একটি প্রশ্ন ছিলো, বাইজান্টাইন জাহায এবং ইউরোপ থেকে সাহায্য নিয়ে আসা জাহায তাহলে বন্দরে যেতো কীভাবে?

মঞ্চের পিছনের পর্দায় ছায়াছবি দেখানোর সময় নেপথ্যে কণ্ঠদানকারী এর জবাব দিয়েছেন যে, নিজেদের প্রয়োজনের সময় শেকলে ঢিল দেয়ার ব্যবস্থা ছিলো। প্রয়োজনে ঢিল দেয়া হতো, আবার টান করে আগের অবস্থায় নিয়ে আসা হতো। পর্দায় সেটা করেও দেখানো হলো। বলতেই হয়, বুদ্ধিতে অতি বড় পাকা সে!

***

মুহাম্মাদ আলফাতিহকে আল্লাহ তাআলা তেমন সাহস ও প্রজ্ঞাই দান করেছিলেন। খুব দ্রæত চিন্তা করে তিনি এক অবিশ্বাস্য উপায় বের করলেন। তাঁর নৌবহরে একশ চল্লিশটি জাহায তো ছিলোই। কিন্তু সেগুলো ছিলো বড় ও ভারী জাহায। তিনি গুণে গুণে ছোট আকারের হালকা সত্তরটি জাহাজ তৈরী করার আদেশ দিলেন, আর বললেন, সময় কম, ঠিক বিশদিনের মাথায় সত্তরটি জাহায প্রস্তুত চাই। জাহাজের নকশা তৈরী করার দায়িত্ব যাকে দিলেন তাকে শুধু উদ্দেশ্যটির আংশিক জানালেন, আর বললেন, যদি তৃতীয় কেউ জানতে পারে, বিশ্বাস করো বন্ধু, তোমার কল্লাটা এককোপে আলাদা করে ফেলবো।

যিনি বলেছেন সত্য বলেছেন, শাসককে শুধু কোমলহৃদয় হলে চলে না, পাষাণহৃদয়ও হতে হয়।

সুলতানের চারপাশে তেমন মানুষই আল্লাহ জড়ো করেছিলেন, পালাক্রমে দিনরাত কাজ করে আঠারো দিনের মাথায় সুলতানকে তারা জানালো, জাহায তৈয়ার!

এরপর সুলতান কী করবেন? ঠিক এ প্রশ্নটাই করেছিলেন সুলতানের উযীর। সুলতান শীতল দৃষ্টিতে উযীরের দিকে তাকালেন, আর নিজের দাড়ীর একটি চুল ধরে বললেন, আমার এই দাড়িটি যদি তা জেনে ফেলতো, একটানে উপড়ে ফেলতাম।

বলাবাহুল্য, উযীর এরপর সভয়ে সুলতানের সামনে থেকে সরে গিয়েছিলেন।

এমন কঠোর গোপনীয়তারও প্রয়োজন পড়ে। গোপনীয়তার অর্থ তোমাকে অবিশ্বাস করা নয়; গোপনীয়তার অর্থ সতর্কতা। যার যেটা জানার প্রয়োজন নেই তার সেটা জানতে চাওয়া বোকামি, আর তাকে সেটা জানানো নির্বুদ্ধিতা। উযীর বোকামি করেছেন, সুলতান নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দেননি। কারণ আল্লাহ তাঁকে কুসতুনতুনিয়া জয় করার জন্য নির্বাচন করেছিলেন, আর আল্লাহর নবী ঐ বিজয়ীকে উত্তম আমীর বলে সুসংবাদ দিয়ে গিয়েছিলেন।

সুলতান আগেই আদেশ দিয়েছিলেন প্রচুর পরিমাণে লম্বা ও গোলাকার গাছের গুঁড়ি কেটে প্রস্তুত করার জন্য। তাই সেগুলো যথাসময়ে তৈয়ার ছিলো। সুলতান আলকাতরা ও চর্বি দিয়ে সেগুলো পিচ্ছিল করার আদেশ দিলেন। এবার রাতের অন্ধকারে মশালের আলোতে শুরু হলো আসল কাজ।

ছায়াছবিতে সে দৃশ্যই দেখানো হচ্ছিলো, আর আমরা রুদ্ধশ্বাসে দেখছিলাম। যেন দূর অতীতের কোন ইতিহাস নয়, আমাদেরই চোখের সামনে জীবন্ত অবস্থায় ঘটছে সবকিছু! একটি করে জাহায বসফরাসের পানি থেকে উপরে উঠছে, আর গাছের পিচ্ছিল গুঁড়িগুলোর উপর দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে অগ্রসর হচ্ছে। আমাদের যুগ তো হলো বিজ্ঞানকল্পকাহিনীর যুগ, অবিশ্বাস্য থেকে অবিশ্বাস্য ঘটনাকেও মনে হয় সত্য ও বাস্তব। কিন্তু এ যেন এ যুগের সাইন্স ফিকশনকেও হার মানায়!

চোখের সামনে দেখতে পেলাম লাইন ধরে সত্তরটি জাহাজ বসফরাসের পানি থেকে গায়েব হয়ে গেলো। মশালের আলোতে অস্পষ্ট দেখা যায় জাহাজের লাইন মাটির উপর যেন ভেসে চলেছে। ঘরঘর আওয়ায ছাড়া আর কিছু শোনা যায় না। ইতিহাসে আছে, বাইজান্টাইন ফৌজ নগরপ্রাচীরের উপর থেকে শুধু মশালের আলোর ছোটাছুটি দেখতে পাচ্ছিলো, আর ঘরঘর আওয়ায শুনতে পাচ্ছিলো, কিন্তু মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলো না। কথিত আছে, খবর পেয়ে সম্রাট নিজেও নগরপ্রাচীরের উপরে উঠে বুঝতে চেষ্টা করলেন, কি করছেন ওখানে রাতের আঁধারে আমার অর্ধেক বয়সের সুলতান মোহামেড?! কিন্তু বুঝতে পারেননি। বেচারার আর দোষ কী, কল্পনায় আসার মত ঘটনা হতে হবে তো! 

বসফরাসের পশ্চিম তীর থেকে জাহায স্থলে উঠেছে, আর আঁকা-বাঁকা পথ হয়ে স্বর্ণশৃঙ্গের উপরের দিকে দক্ষিণকিনারে গিয়ে নেমেছে। সে দৃশ্যও ছিলো বড় রোমাঞ্চকর। এখন যে লিখছি, দেহমনে এমন রোমাঞ্চ সৃষ্টি হচ্ছে যে, বারবার লেখা থামিয়ে আচ্ছন্ন বসে থাকি, আর ভাবি, কেমন হিম্মত দিয়েছিলেন এই মরদে মুমিনের দিলে আল্লাহ! শোকরে কৃতজ্ঞতায় একবার তো হৃদয় এমনই আপ্লুত হলো যে, কলমটা রেখে উঠে গিয়ে দুরাকাত নামায পড়ে সুলতান আলফাতিহ-এর মাগফিরাতের জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করলাম।  

দীর্ঘ দশমাইল পথ পাড়ি দিয়ে সত্তরটি জাহাজ লাইন ধরে একটু পরপর স্বর্ণশৃঙ্গের পানিতে গিয়ে নামলো। পুরো দৃশ্যটা পর্দায় এমন জীবন্ত ছিলো যেন আমি সেই যুগের মানুষ, আমারই চোখের সামনে ঘটছে পুরো ঘটনা!

পানিতে একটি করে জাহাজ নামে, আর বহু কণ্ঠের তাকবীর- ধ্বনি শোনা যায়। সম্মেলনকক্ষে উপস্থিত মেহমান ও হাজার হাজার দর্শক এমন জোশে এসে যায় যে, তারাও তাকবীর ধ্বনি করে ওঠে। আসলে ইতিহাসের পাতায় যা পড়েছি তা যেমন বুঝতে পারিনি, সেদিন ইস্তাম্বুলে ঐ সম্মেলনকক্ষে পর্দায় ছবির আকারে যা দেখেছি তাও এখন কলমের ভাষায় ফুটিয়ে তুলতে পারছি না।  শুধু বলতে চাই, হে মুহাম্মাদ আলফাতিহ, আল্লাহ তোমাকে উত্তম বিনিময় দান করুন। এ যুগের তুর্কী মায়েরা যেন তোমার মত শিশুকে স্তন্য দান করতে পারে। তুর্কিস্তান আবার যেন ফিরে আসে আমাদের হাতে নতুন কোন আলফাতিহ-এর হাত ধরে, আমীন। 

(চলবে ইনশাআল্লাহ)

 



[1]কারণ আমার ইংরেজি হলো পুওরমানে গরীব,তাও রীতিমত বাংলাদেশের গরীব!

[2] যদ্দুর মনে পড়ছে, এটাই ছিলো তার নাম।

[3] আসলে ইহুদীদের রহস্যময় আন্তর্জাতিক সংস্থা ফ্রিম্যাশনের সঙ্গে মুস্তফা পাশা অনেক আগেই জড়িয়ে পড়েছিলেন। ফ্রিম্যাশনই তার মগজে জাতীয়তাবাদের বীজ বপন করেছিলো। অনেক অন্তর্জ্ঞানীর মতে, তুরস্কের মর্যাদা পুনরুদ্ধারের নামে যেসব যুদ্ধ হয়েছিলো সেটাও ছিলো সাজানো বিষয়, উদ্দেশ্য ছিলো পাশাকে জাতীয় বীরের মর্যাদায় সামনে আনা। প্রফেসর সেকুতীন অবশ্য এটা মানতে রাজী নন। কামাল পাশাকে তিনি জাতীয়তাবাদী বীরই মনে করেন, তবে বীরত্বের সঙ্গে  প্রজ্ঞা ও ধার্মিকতা না থাকলে যা হয় তাই হয়েছিলো। শত্রæদের পাতা ফাঁদে সহজেই পা দিয়েছিলেন। মাথা ব্যথার অজুহাতে কল্লাটাই কেটে ফেলেছিলেন এবং সেজন্য নিষ্ঠুরতা ও হিং¯্রতার শেষ সীমা পর্যন্ত গিয়ে তবে ক্ষান্ত হয়েছিলেন।

[4] ৪পর্দায় যখন সুলতান বায়যিদের কুসতুনতুনিয়া অবরোধের দৃশ্য দেখানো হচ্ছিলো, তখন পুরো হলঘর কাঁপিয়ে নেপথ্যের গুরুগম্ভীর কণ্ঠ থেকে ইয়লদরম শব্দটি বারবার এমনভাবে উচ্চারিত হচ্ছিলো যেন সত্যি সত্যি বজ্রের গর্জন!

[5] আমার তালিবে ইলম ভাইদের কাছে অনুরোধ, এ তথ্যটি পড়ার সময় এখানে তারা যেন একটু থামে, আর অন্তর দিয়ে আল্লাহর কাছে কিছু যেন চায়।

[6] আরবীতে বলে القرن الذهبي বাংলায় তরজমা হবে, সোনালী শিঙ। শাখাটি দেখতে যেহেতু শিঙ-এর মত লম্বা ও কিছুটা বাঁকানো, আর বিশেষ করে সকালের সোনালী রোদে ঝিকমিক করে, তাই এর নাম হয়ে গেছে গোল্ডেন হর্ন।

আরও পড়ুন:   সফরনামা

কুরআন মজীদ ও সহীহ হাদীসের আলোকে মাহে রমযান