শাওয়াল ১৪৩০ . অক্টোবর ২০০৯

পুরোনো সংখ্যা . বর্ষ: ৫ . সংখ্যা: ১০

আমি যা খুঁজছিলাম

খাঁটি হিন্দু পরিবারের মেয়ে হিসেবে আমাদের সবসময় শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যে, আমাদের বিবাহ হবে, সন-ান হবে এবং স্বামী যেমনই হোক তার সেবা করতে হবে। এরপর আমি বাস-বে অনেক কিছু লক্ষ্য করলাম, যা মেয়েদের প্রতি জুলুম। যেমন কোনো মহিলা বিধবা হলে তাকে সবসময় সাদা শাড়ি (পোশাক) পরতে হবে, সবজি খেতে হবে, চুল ছোট রাখতে হবে আর সে কখনোই বিয়ে করতে পারবে না। স্ত্রীকে সবসময় তার স্বামীর বাড়ীতে যৌতুক দিতে হবে; স্বামী যা ইচ্ছা চাইতে পারে তা দেবার সামর্থ্য স্ত্রীর থাকুক বা না থাকুক। শুধু তাই নয়, যদি বিয়ের পর স্ত্রী সম্পূর্ণ যৌতুক পরিশোধ না করতে পারে, তাহলে তাকে মানসিক ও শারীরিক উভয়ভাবেই কষ্ট দেওয়া হয়। এমনকি সে ‘রান্না করতে গিয়ে মৃত্যুমুখে পতিত’ হতে পারে; অর্থাৎ, তার স্বামী কিংবা স্বামী ও শাশুড়ী দুজনে মিলেই রান্নাঘরে তার দেহে ইচ্ছাকৃত আগুন ধরিয়ে দিতে পারে, পরে দেখানো হবে যে, আকস্মিকভাবে আগুন লেগে বউ মারা গেছে। এই ধরনের বহু ঘটনা ঘটছে। গত বছর আমার বাবার এক বন্ধুর মেয়ে এই পরিণতিই বরণ করেছে! উপরন', হিন্দুধর্মে পুরুষদেরকে দেবতা বলে মনে করা হয়ে থাকে। একটি নির্দিষ্ট হিন্দু পূজা অনুষ্ঠানে অবিবাহিত মেয়েরা একটি দেবতার মূর্তি পূজা করে থাকে এবং তারা এই প্রার্থনা করে যে, তারা যেন সেই দেবতার মতন একজন স্বামী লাভ করে। আমার মা-ও আমাকে এমন প্রার্থনা করতে বলেছেন।

হিন্দু ধর্মের কুসংস্কারগুলি আমার নজরে আসল এবং আমি লক্ষ করলাম এসবের কোনো ভিত্তি নেই এবং এগুলো শুধু কিছু আচার অনুষ্ঠান, যা মেয়েদের উপর জুলুম বৈ কিছু নয়; এভাবে কখনোই মেয়েরা তাদের অধিকার পেতে পারে না। পরবর্তীতে আমি যখন ইংল্যান্ডে পড়তে আসি তখন আমি মনে করলাম যে, এখানে পুরুষ ও মহিলাকে সমান অধিকার দেওয়া হয় এবং মেয়েদেরকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করে না। আমি মনে করলাম, আমরা মহিলারা যা চাই এখানে তো তা-ই করতে পারব। যাহোক আমি যখন ইংল্যান্ডে মানুষের সাথে পরিচিত হতে থাকলাম, নতুন বন্ধু-বান্ধব হল, নতুন সমাজ দেখতে শুরু করলাম এবং সেসব জায়গায় যেতে লাগলাম, যেখানে গেলে ‘সামাজিকতা’ তৈরি হয়, অর্থাৎ নাচ-গানের ক্লাব এবং বার ইত্যাদিতে, তখন আমি হাড়ে হাড়ে টের পেলাম যে, ‘নারী ও পুরুষের সমান অধিকার’ বাস-ব অর্থে তেমন নয় যেমনটা তাত্ত্বিকভাবে বলা হয়ে থাকে।

বাহ্যিকদৃষ্টিতে দেখা যাচ্ছিল যে, মহিলাদেরকে শিক্ষা, কর্ম ইত্যাদি ক্ষেত্রে সমান অধিকার দেওয়া হয়, কিন' বাস-বে বিভিন্ন সূক্ষ্ম পদ্ধতিতে তাদেরকে বঞ্চিত করা হয়। আমি যখন আমার বন্ধুদের সাথে বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে যেতাম, আমি তখন দেখতাম, সবাই আমার সাথে কথা বলতে আগ্রহী আর আমিও এই বিষয়টি প্রথম প্রথম খুব স্বাভাবিকই মনে করেছিলাম। কিন' পরে যখন ঐসব মানুষের আসল উদ্দেশ্যটা ধরা পড়ল তখন আমি বুঝতে পারলাম যে, ব্যাপারটা আমি যেমন ধারণা করেছি তেমন নয়। আমি তখন অস্বসি- বোধ করতে লাগলাম। কারণ আমার সাথে পরিচিত হবার পেছনে তাদের অসৎ স্বার্থ ছিল। তখন আমার মনে হলো যে, আমি যেন নিজেকেই হারিয়ে ফেলছি। আমাকে এমনভাবে পোশাক পরতে হত যেন অন্যরা আমাকে দেখে পছন্দ করে; এমনভাবে কথা বলতে হত যেন অন্যরা খুশি হয়। আমি শীঘ্রই খুব বেশি অস্বসি-বোধ করতে শুরু করলাম। অথচ সবার কথা হল এভাবেই তারা খুব আনন্দ পেয়ে থাকে। আমি কিন' এই অন্যের মন জুগিয়ে চলাকে উপভোগ্য কোনো বিষয় বলে মনে করতে পারতাম না। আমি মনে করি, মহিলাদের এমন জীবনই হল পরাধীনতার জীবন। তাকে অন্য পুরুষের মন জোগানোর জন্য জামাকাপড় পরতে হবে, তাদের কাছে আকর্ষনীয় সাজতে হবে, আবার এমনভাবে কথা বলতে হবে যেমন তারা পছন্দ করে। এই সময় আমি ইসলামের কথা ভেবেছি, যদিও আমার সঙ্গীদের মধ্যে কিছু মুসলমানও ছিল। কিন' আমি কিছু একটা পরিবর্তনের কথা চিন-া করছিলাম এবং এমন কিছুর সন্ধান করছিলাম যা শানি- ও নিরাপত্তা দেয়। প্রত্যেকেরই একটা বিশ্বাস থাকে, যার উপর ভিত্তি করে সে জীবনযাপন করে। যদি কারো বিশ্বাস এমনই হয় যে, অন্য মানুষের সাথে মেলামেশাই আনন্দের বিষয় তাহলে সে তো তা-ই করবে। যদি কেউ মনে করে যে, মদ্যপান জীবনকে উপভোগের একটি উপায়, সে তাই অবলম্বন করবে। কিন' আমি অনুভব করেছি যে, এগুলো কোনো ভালো ফল বয়ে আনে না এবং এভাবে কেউ বাস-বে প্রশানি-ও পায় না। আর এসব কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের দ্বারা মহিলাদের সম্মান উল্টো আরো নষ্ট হয়।

আজকের ‘সমঅধিকার’-এর যুগে আশা করা হয় যে, একজন মহিলার একজন ‘বয়ফ্রেন্ড’ থাকবে এবং সেই মহিলা কুমারীও থাকবে না; এমন না হওয়াই নাকি আশ্চর্যের! বলাবাহুল্য, এটা স্পষ্টত: নারীর প্রতি অন্যায় ও অবমাননা, যদিও কিছু মহিলা এটা বুঝতে চান না। শেষ পর্যন- যখন আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম তখনই আমি স'ায়ী নিরাপত্তা পেয়েছি। ইসলাম ধর্ম হিসেবে পূর্ণাঙ্গ এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তার নির্দেশনা সুস্পষ্ট। অনেক মানুষের ভুল ধারণা রয়েছে যে, ইসলাম নিপীড়নের ধর্ম - ইসলাম জুলুমের ধর্ম, কারণ, ইসলামে মহিলাদের পা থেকে মাথা পর্যন- ঢাকা থাকে; মনে করা হয় যে, ইসলাম এভাবে মহিলাদের স্বাধীনতা খর্ব করেছে। বাস-বে ইসলামে মহিলাদের অধিকার অনেক অনেক বেশী, আর তাও ১৪০০ বছর আগে তাদেরকে দেওয়া আছে। এখন তুলনা করুন যে, পশ্চিমা বা অন্যান্য সমাজে অমুসলিম মহিলাদের যে অধিকার দেওয়া হয়-তা তো ইদানীং (তাও কতটুকু?)। কিন' এখনো ছাড়? এমন বহু সমাজ আছে, যেখানে মহিলারা নিপীড়িত, নির্যাতিত, যেমন আমি উল্লেখ করেছি। মুসলমান মহিলাদের উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পত্তি লাভের অধিকার রয়েছে। নিজের ব্যবসা পরিচালনার অধিকার আছে। মালিকানা, সম্পত্তি, নিজ সম্পত্তির ব্যয় ইত্যাদির উপর তাদের পূর্ণ স্বাধীন অধিকার রয়েছে এবং স্ত্রীর এই সম্পদে স্বামীর অধিকার নেই। প্রয়োজনীয় শিক্ষা অর্জনের অধিকার একজন মুসলমান মহিলার রয়েছে এবং সে যুক্তিসংগত কারণে বিবাহের প্রস-াব নাকচ করতে পারে। পবিত্র কুরআনের বহু স'ানে মহিলাদের অধিকারের কথা আছে এবং স্বামীর প্রতি হুকুম রয়েছে স্ত্রীর সাথে ভালো ব্যবহারের। ইসলামের মধ্যে সঠিক নির্দেশনা থাকার কারণ এই যে, তা মানবসৃষ্ট নয়, স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত বিধান; আর তাই ইসলাম সঠিক ধর্ম।

প্রায়ই এই প্রশ্ন উত্থাপন করা হয় যে, কেন মুসলিম মহিলাগণ পা থেকে মাথা পর্যন- ঢেকে রাখেন। এটাও বলা হয়, যে এ হচ্ছে জুলুম। এ হচ্ছে আবদ্ধতা। এভাবে নারীকে বন্দী করে রাখতে চায় ইসলাম। কিন' এই কথা ঠিক নয়। ইসলামের দৃষ্টিতে বিবাহ মানবজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা সমাজকে গড়ে তুলে। সুতরাং মহিলাগণ নিজের স্বামী ছাড়া অন্যের সামনে নিজেকে উন্মুক্ত করবে না। এটাতো পুরুষের উপরও হুকুম যে, সে তার সতর স্ত্রী ছাড়া কারো সামনে খুলতে পারবে না। মহিলাদের সম্ভ্রমের ও সম্মানের কারণেই আল্লাহ্ তায়ালা মহিলাদেরকে আবৃত থাকার অর্থাৎ পর্দার হুকুম দিয়েছেন: আল কুরআন ৩৩: ৫৯।

সমাজে আমরা দেখি যে, বেশিরভাগ মহিলার উপর যে আক্রমণ চলে ও উত্যক্ত করা হয় এটা তাদের উগ্র পোশাকের কারণেই। আরেকটা পয়েন্ট আমি তুলে ধরতে চাই। তা এই যে, ইসলামে আল্লাহ্ তায়ালা যে নিয়মকানুন দিয়েছেন তা শুধু মহিলাদের জন্য নয়; ববং পুরুষদের জন্যও। পুরুষ ও মহিলাদের অবাধ মেলামেশাকে ইসলাম উভয়ের ভালোর জন্যই নিষেধ করেছে। যা-ই আল্লাহ্ তায়ালার নির্দেশ তা-ই মানবতার জন্য সঠিক, পূর্ণাঙ্গ এবং উপকারী। এতে কোনো সন্দেহ নেই। পবিত্র কুরআনের একটি আয়াত তা সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরে: সুরা নূর ২৪:৩১।

যখন আমি পর্দা করতে লাগলাম আমি তখন খুবই আনন্দিত হলাম। আমি আসলে এটাই চাচ্ছিলাম। আমি অত্যন- তৃপ্তি ও প্রশানি- অনুভব করলাম। কারণ আমি তো আল্লাহ্ তাআলার নির্দেশ পালন করেছি। পর্দার দ্বারা যে রহমত আমার অর্জিত হয়েছে তা আমাকে উৎফুল্ল করেছে। আমি নিজেকে নিরাপদ অনুভব করেছি। নিজেকে শংকামুক্ত বোধ করেছি। এই পর্দার কারণে মানুষ আমাকে বেশী সম্মানও করে থাকে। আমি পর্দার কারণে মানুষের আচরণের মধ্যে পার্থক্য উপলব্ধি করেছি। পরিশেষে আমি বলব যে, আমি তো অন্ধভাবে বা কোনো চাপে পড়ে ইসলাম গ্রহণ করিনি। কুরআন নিজেই ঘোষণা দিয়েছে, ধর্মের ব্যাপারে কোনো জোরাজুরি নেই। আমি সুদৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছি। আমি জীবনের এপিঠ-ওপিঠ সবই দেখেছি; অন্য রকম চলার অভিজ্ঞতাও অর্জন করে দেখেছি। অতএব আমি পূর্ণ আত্মাবিশ্বাসের সঙ্গেই বলতে পারি যে, আমি সঠিক কাজটিই করেছি। আমার এ কাজে আমার কোনো দ্বিধা নেই, কোনো সংকোচ নেই। ইসলাম মহিলাদের উপর জুলুম করে না, জুলুমের কোনো পরিবেশ ও উপলক্ষ তৈরি হতে দেয় না; বরং তাদের স্বাধীনতা দেয় এবং তাদেরকে সেই অধিকার দেয়, যা তাদের প্রাপ্য। যারা ইসলামী জীবন গ্রহণ করে তারা বাস-বিকই স্বাধীন ও মানবদাসত্বের শেকল থেকে মুক্ত; কারণ মানবপ্রণিত নিয়মকানুন ও আইন কিছুই না, শুধু এক দল দ্বারা আরেক দলের উপর জুলুম-অত্যাচার, নিপীড়ন ও সুযোগ গ্রহণের মাধ্যম, এক গোষ্ঠীর দ্বারা আরেক গোষ্ঠীকে শোষণ ও নির্যাতনের উপকরণ। ইসলামে এ ধরনের অনাচারের কোনো সুযোগ নেই, প্রশ্নও আসে না। কারণ ইসলাম এসেছেই অনাচার, উৎপীড়ণ ও দাসত্বের মূল উৎপাটন করতে। ইসলাম মহিলাদের যে স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে তা অন্য কোনো ব্যবস'া দেয়নি।

সম্মানিত পাঠক!
মাসিক আলকাউসারের ওয়েব পেজটির উন্নয়ন কাজ চলছে। তাই বর্তমান সংখ্যাটি হালনাগাদ করতে বিলম্ব হচ্ছে। আপনাদের সাময়িক অসুবিধার জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত।

এ সংখ্যার প্রচ্ছদ

হজ্ব এবং কুরবানী বিষয়ক প্রবন্ধসমূহ