রবিউল আখির ১৪৩৫   ||   ফেব্রুয়ারি ২০১৪

কাদিয়ানী সম্প্রদায় কেন মুসলমান নয়-৭

মাওলানা মুহাম্মাদ মনযূর নুমানী রাহ.

ঈসা মাসীহ নিহত বা শূলীবিদ্ধ হননি

ইহুদীদের গোমরাহিসমূহের একটি হল, তারা বিশ্বাস করে, আমরা ঈসাকে শূলীতে চড়িয়ে হত্যা করে ফেলেছি। তাদের এই দাবিকে কুরআন মাজীদ রদ করে দিয়েছে, এই দাবিকে মিথ্যা এবং ইহুদীদের অভিশপ্ত হওয়ার অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করেছে। ইরশাদ হয়েছে, (তরজমা) অথচ (বাস্তবতা হল) তারা তাঁকে হত্যা করেনি এবং শূলেও চড়াতে পারেনি; বরং তাদের বিভ্রম ঘটেছিল। -সূরা নিসা ৪ : ১৫৭

এবং আল্লাহর পক্ষ হতে (ইয়াহুদাকে ঈসা মাসীহের আকৃতিতে রূপান্তরিত করার মধ্য দিয়ে) এক সংশয়পূর্ণ ঘটনা ঘটিয়ে দেয়া হল। ফলে তারা ঈসাকে হত্যা করেছে বলে ধারণা করতে থাকল। আল্লাহ তাআলা বলেন, (তরজমা) প্রকৃতপক্ষে যারা (ইহুদী-নাসারাগণ) এ বিষয়ে মতভেদ করছে, তারা বিষয়টি নিয়ে (ঘোর) সংশয়ে নিপতিত এবং (ইহুদীদের) হাতে নিহত হয়ে ঈসা মাসীহ কি মাটির সঙ্গে মিশে গেছেন নাকি পুনর্জীবিত হয়ে আকাশে উত্তোলিত হয়েছেন) এ ক্ষেত্রে আন্দাজ-অনুমানের পিছু নেওয়া ছাড়া তাদের নিকট প্রকৃত কোন জ্ঞান নেই। নিশ্চিত সত্য হচ্ছে, তারা তাকে হত্যা করেনি, (ঈসা মনে করে হত্যা করেছে ইয়াহুদাকে)। আল্লাহ বরং তাঁকে (ঈসাকে) নিজের কাছে তুলে নিয়েছেন। বস্ত্তত আল্লাহ মহা ক্ষমতার অধিকারী, অতি প্রজ্ঞাবান। (তিনি তাঁর হেকমত ও ক্ষমতায় এ-সকল ঘটনা ঘটিয়েছেন।) -সূরা নিসা ৪ : ১৫৭-১৫৮

আয়াতগুলির অর্থ-মর্ম একদম সুস্পষ্ট। এতে ঈসা আলাইহিস সালামকে শূলীবিদ্ধ করে হত্যা করার দাবিটিকে সম্পূর্ণরূপে নস্যাৎ করে দেওয়া হয়েছে। বরং সূরা মায়েদার একটি (১১০ নং) আয়াতের মর্মানুসারে দুশমন ইহুদীদের সামান্য স্পর্শও তাঁর গায়ে লাগেনি বলে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

তো আয়াতগুলোতে একদিকে ইহুদীদের রাসূল-হত্যার অভিশপ্ত বিশ্বাসকে বাতিল করা হয়েছে অন্য দিকে খ্রিস্টানদের আকিদায়ে কাফফারার ভিত্তিও সমূলে উৎপাটিত করে দেয়া হয়েছে। কেননা আকিদায়ে কাফফারার ভিত্তি হল ইহুদী কর্তৃক ঈসা মাসীহের শূলীবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়ার উপর। (খ্রিস্টানদের এই এক মারাত্মক আকিদাই দ্বীন-দুনিয়া উভয়টি বরবাদ করার জন্য যথেষ্ট)।

কুরআন মাজীদে ঈসা মাসীহের জন্য -رفع  (উঠিয়ে নেওয়া) শব্দ এসেছে।

وما قتلوه وما صلبوه

তারা তাঁকে হত্যা করতে পারেনি এর এবং

بل رفعه الله اليه

আল্লাহ তাকে উঠিয়ে নিয়েছেন-এর মাঝে بل  (বরং) শব্দ এনে বুঝানো হয়েছে যে, ঈসার উপর কতলের ঘটনা মোটেই ঘটেনি। (প্রথমে নিহত হয়েছেন, তারপর পুনর্জীবন লাভ করে আসমানে উত্তোলিত হয়েছেন -যেমনটা খ্রিস্টানরা বলে থাকে, ব্যাপারটা এমনও নয়) বরং আল্লাহ তাঁকে (কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই নিরাপদে) নিজের কাছে উঠিয়ে নিয়েছেন।

সুতরাং আয়াতের এই অংশ

بل رفعه الله اليه

দ্বারা ঈসা মাসীহের উর্ধ্বে উত্তোলিত হওয়ার আকিদাটি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়।

-رفع শব্দের বক্র-ব্যাখ্যা

কাদিয়ানীদের তরফ থেকে বলা হয়,

رفعه الله اليه

 মানে হল, আল্লাহ নিজের নিকট তার মর্যাদা বুলন্দ করেছেন! অথবা উদ্দেশ্য রূহানি বা আধ্যাত্মিক উত্তরণ ঘটিয়েছেন। আরবী ভাষায় যার সামান্য অবগতি আছে, সে-ই বুঝতে পারবে, আয়াতে -رفع এর এমন অর্থ হওয়া চাই যা নিহত হওয়ার  বিপরীতে আসতে পারে, । আর জানা কথা, মর্যাদা বুলন্দি বা রূহানি উত্তরণের সাথে শত্রুর হাতে নিহত হওয়ার কোনো বৈপরীত্য নেই। (এগুলি নিহত-জীবিত সবার ক্ষেত্রেই হতে পারে) আল্লাহর রাস্তায় মজলুম অবস্থায় নিহত হলে বরং অনেক অনেক দরজা বুলন্দ হয়। কুরআন মাজীদে একাধিক নবীর অন্যায়ভাবে নিহত হবার ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। স্বাভাবিক যে, জালিমদের হাতে শাহাদাত বরণকারী আল্লাহ পাকের ঐসকল নবীগণের মর্যাদা আল্লাহ তাআলা অনেক উঁচু করেছেন। বোঝা গেল, রূহানি তরক্কি ও দরজা বুলন্দি নিহত হবার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিছু নয়। নিহত হবার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হল দেহ সহ সহী-সালামতে উঠিয়ে নেওয়া। (তাহলেই না ‘‘নিশ্চিত যে, তারা তাকে হত্যা করতে পারেনি’’-এর পর ‘‘বরং আল্লাহ তাঁকে নিজের কাছে উঠিয়ে নিয়েছেন’’ বলাটা যথার্থ হয়।)

আয়াতে নিজের কাছে উঠিয়ে নিয়েছেন অর্থ আসমানে উঠিয়ে নিয়েছেন। যদিও মাখলূকের ন্যায় আল্লাহ তাআলা বিশেষ কোনো স্থানের গন্ডিতে অবস্থানকারী নন। কিন্তু কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী আসমান এক বিশেষ স্থান, আল্লাহ পাকের সঙ্গে  যার  বিশেষ ধরনের সম্বন্ধ রয়েছে। এক আয়াতে এসেছে, (তরজমা) (তোমরা কি যিনি আসমানে বিদ্যমান, তাঁর থেকে নিশ্চিত হয়ে গেছ যে, তিনি তোমাদেরকে ভূমিতে ধ্বসিয়ে দেবেন না যখন তা হঠাৎ থরথর করে প্রকম্পিত হতে থাকবে। নাকি তোমরা আসমানওয়ালা হতে এ-ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে গেছ যে, তিনি তোমাদের উপর পাথর-বৃষ্টি বর্ষণ করবেন না? তাহলে অচিরেই তোমরা বুঝতে পারবে, কেমন ছিলো আমার সতর্কবাণী।-সূরা মূলক ৬৭/১৬-১৭)

কুরআন মাজীদের কয়েক স্থানে এসেছে, (তরজমা) ‘‘অতপর তিনি আরশে আসীন হয়েছেন।’’

তো আয়াতগুলি থেকে পরিষ্কার যে, আল্লাহ পাকের সত্ত্বার সঙ্গে আকাশের একটি বিশেষ স্থানিক সম্বন্ধ রয়েছে। (যার প্রকৃত অবস্থা আমাদের অজানা)। এ কারণে নবীজী ঐ মহিলাকে মুমিন বলেছেন, যাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আল্লাহ কোথায়? উত্তরে সে বলল, আকাশে!

যাইহোক, আয়াত থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হল, ঈসা মাসীহের উত্তোলিত হওয়ার যে আকিদা সাধারণ খ্রিস্টানরা পোষণ করে তা সত্য। প্রচলিত ইঞ্জিলগুলোতে আজও এই আকিদার উল্লেখ আছে। কোথাও বেহেশতে বা আসমানে উঠিয়ে নেওয়ার কথা আছে, কোথাও শুধু উত্তোলিত হওয়ার কথা আছে। (দেখুন লুক ২৪ : ৫১, মার্ক ১৬ : ১৯, প্রেরিত ১ : ৯) ইঞ্জিলের আরবী ভার্সনগুলোতে সরাসরি -رفع শব্দটিই এসেছে। এখন যদি বলা হয়, ঈসা মাসীহ সম্পর্কে শূলীবিদ্ধ হওয়ার আকিদা যেমন ভুল, তেমনি  আসমানে  উঠিয়ে  নেওয়ার আকিদাটিও মিথ্যা শিরক তাহলে কুরআন মাজীদের উপরই প্রশ্ন উঠবে যে, শূলীবিদ্ধ করার আকিদার মতো আসমানে উঠিয়ে নেওয়ার একই সূত্রে গাঁথা আকিদাটিকে কুরআন রদ তো করলই না, বরং এক জায়গায়

بل رفعه الله اليه

(বরং আল্লাহ তাকে নিজের নিকট উঠিয়ে নিয়েছেন) এবং অন্য জায়গায়

ورافعك الى

(তোমাকে নিজের কাছে তুলে নেব) বলে খ্রিস্টানদের এই আকিদাটির সত্যায়নে যেন মোহর অংকন করে দিল। আরও লক্ষণীয় হল, খ্রিস্টানরা এই আকিদা যে শব্দে প্রকাশ করে থাকে এবং ইঞ্জিলগুলোতে এখনো যে শব্দ মজুদ আছে, কুরআনে সে শব্দই ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে মুসলমানরা কুরআনের এই শব্দগুলো থেকে উঠিয়ে নেওয়া অর্থ বুঝেছে এবং আকিদা হিসেবে নিজেরাও গ্রহণ করেছে। (বোঝা গেল, শূলীবিদ্ধ হওয়ার আকিদাটি শিরক হলেও আসমানে উঠিয়ে নেওয়ার আকিদা সঠিক।) অন্যথায় বলতে হবে, কুরআনই খ্রিস্টানদের একটি শিরকী আকিদা সমর্থন করে পুরো মুসলিম মিল্লাতকে (আল্লাহর পানাহ) মহা শিরকে নিমজ্জিত করে দিয়েছে!

মোটকথা, একজন স্বল্পবুদ্ধির মানুষও বুঝবে যে, আল্লাহ পাকের নিকট যদি শূলীবিদ্ধ হওয়ার আকিদার মতো আসমানে উঠিয়ে নেওয়ার আকিদাটিও গলত ও ভ্রান্ত হত, তাহলে যেমনিভাবে

وما قتلوه وما صلبوه

                  এবং

وما قتلوه يقينا

বলে শূলীবিদ্ধ হওয়ার আকিদাকে অত্যন্ত জোরালো ও পরিষ্কার ভাষায় নস্যাৎ করে দিয়েছেন, তেমনিভাবে আসমানে উঠিয়ে নেওয়ার আকিদাটিকেও এখানেই কঠিন ও সুস্পষ্টভাবে রদ করে দিতেন। কিন্তু আসমানে তুলে নেওয়ার আকিদাকে আল্লাহ পাক কোথাও রদ করেননি; বরং

بل رفعه الله اليه

এবং

ورافعك الى

বলে আকিদাটিকে আরও মজবুতি দান করেছেন ।

সুতরাং কোনো সন্দেহ নেই, কুরআন ঈসা আলাইহিস সালামের উর্ধ্বে উঠিয়ে নেওয়ার বিষয়টিকে রদ করেনি, বরং সত্যায়ন করেছে। কুমারী মাতার গর্ভে ঈসা মাসীহের জন্মগ্রহণ, তাঁর কালিমাতুল্লাহ হওয়া, মৃতকে জীবিত করাসহ অন্য কয়েকটি খ্রিস্টীয় আকিদা যেমন কুরআন সমর্থন করেছে, তেমনি উঠিয়ে নেওয়ার আকিদাকেও সমর্থন করেছে। প্রচলিত ইঞ্জিলগুলোতে এ বিষয় সকল আছে এবং খ্রিস্টানরা এসমস্ত আকিদা আজও পোষণ করে থাকে।

যদি কারো দিলে বক্রতা ও বিমারি না থাকে, আর থাকে কুরআনের প্রতি পূর্ণ ঈমান, তাহলে উপরোক্ত আলোচনার পর ঈসা মাসীহের সহি-সালামতে উর্ধ্বে উঠিয়ে নেওয়ার বিষয়ে তার মনে কোনো সংশয় বাকি থাকার কথা নয়। ষ

 

 

advertisement