মুহাররম ১৪৩৫   ||   নভেম্বর ২০১৩

আমাদের রাজ্যশাসন-১২

মাওলানা আবদুস সালাম কিদওয়ায়ী

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

পরাজয়ের সংবাদ শুনে গোটা ইরানজুড়ে শুরু হল শোকের মাতম। সম্রাজ্ঞী আযরী দখত অপসারিত হল। তার পরিবর্তে অল্প বয়সী ইয়াযদ গিরদকে ক্ষমতায় বসানো হল। আর রুস্তম নিজে হাজার হাজার সৈন্য নিয়ে যুদ্ধের জন্য বের হল। অন্যদিকে ওমর রা. বিষয়টি জানতে পেরে বিশাল এক বাহিনী প্রস্ত্তত করলেন এবং নিজেও তাদের সাথে রওনা হলেন। কিন্তু এটি মাসলাহাত পরিপন্থী হওয়ায় সাহাবায়ে কেরাম তাঁকে নিষেধ করলেন। অবশেষে হযরত সাদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রা.কে সেনাপতি নিযুক্ত করা হল।

 কাদিসিয়ার যুদ্ধ

কাদিসিয়া নামক স্থানে পৌঁছে মুসলমানগণ তাঁবু স্থাপন করলেন। ওমর রা.-এর নির্দেশ ছিল যেন প্রথমে ইরানের বাদশাহর সঙ্গে সাক্ষাত করা হয়। যেন আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি করা যায়। তবে আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি সম্ভব না হলে বাধ্য হয়েই যুদ্ধের পথ বেছে নিতে হবে। তাই কিছু লোককে এ উদ্দেশে বাদশাহ ইয়াযদ গিরদের দরবারে পাঠানো হল। কিন্তু আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সুরাহা হল না। যুদ্ধই চূড়ান্ত হয়ে গেল।

এবারও যথারীতি হস্তীবাহিনীর মোকাবিলা করতে হল। আরবের ঘোড়া আগে এসব কালো হাতি দেখেনি। তাই ভয়ে দিগ্বিদিক ছুটতে লাগল। তা এমন এক বিপদ হয়ে দেখা দিল যে, কিছুতেই ময়দানে থাকা সম্ভব হচ্ছিল না। অবশেষে কোনো রকমে ওই দিনটি পার

করা হল।

দ্বিতীয় দিন মুসলমানগণ উটের গায়ে ঝালর, বোরকা ইত্যাদি পরিয়ে হাতির সামনে এমন  ভীতিকর দৃশ্য সৃষ্টি করলেন যে, হাতিগুলো পালাতে লাগল। এতে ময়দানের অবস্থা পুরো পাল্টে গেল। ইরানীদের জীবন সংকটাপন্ন হয়ে দাঁড়াল।

তৃতীয় দিন মুসলমানগণ হাতিগুলোকে পিটিয়ে তাড়িয়ে দিলেন এবং তলোয়ার নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। সারা দিন পার করে রাতভর এ সংঘর্ষ অব্যাহত থাকল। পরবর্তী দিন যোহরের সময় ইরানীরা পলায়ন করতে বাধ্য হল। আর মুসলমানগণ অগ্রসর হয়ে ইরানীদের পতাকা ছিনিয়ে নিলেন।

রুস্তম মারাত্মক আহত হয়ে পলায়ন করল এবং এক পর্যায়ে নদীতে ঝাঁপ দিল। উদ্দেশ্য ছিল সাঁতরে প্রাণে বেঁচে যাওয়া, কিন্তু হেলাল ইবনে আরাফা তাকে ধরে হত্যা করলেন। এই যুদ্ধে ৩০ হাজার ইরানী সৈন্য মারা যায়। এ যুদ্ধের ব্যাপারে ওমর রা. বেশ উদ্বিগ্ন ছিলেন। বিজয়ের সংবাদ শুনে তিনি অত্যন্ত খুশি হলেন।

কাদিসিয়ায় মুসলমানদের বিজয় ইরানীদের কোমর ভেঙ্গে দিল। দু একটি ছোট ছোট যুদ্ধের পর হযরত সাদ রা. (মুসলিম সেনাপতি) আরো সামনে অগ্রসর হয়ে ইরানের রাজধানী মাদায়েন দখল করে নিলেন। ইয়াযদ গিরদ আগেই পালিয়ে গিয়েছিল। অবশিষ্টরাও আনুগত্য স্বীকার করে নিল।

নওশিরওয়ার প্রাসাদে প্রবেশ করে প্রথমে মুসলমানগণ শোকরানা নামায আদায় করলেন। এরপর সেখানে জুমআর নামাযও আদায় করেন।

রাজধানী মাদায়েনে সম্পদের কোনো সীমা ছিল না। যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক পঞ্চমাংশ যখন মদীনায় পৌঁছল তখন সেখানে দিনার-দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা ও স্বর্ণমুদ্রা) ছাড়াও হীরা-জহরত ও মণি-মুক্তার স্ত্তপ হয়ে গেল।

মাদায়েনের পর জালুলা, আহওয়ায ইত্যাদি অঞ্চলেও কয়েকটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ইরানীদের সাথে শেষ যুদ্ধ হয় নিহাওন্দ নামক স্থানে। এ যুদ্ধে দেড় লক্ষ ইরানী সৈন্য অংশ নেয়। পক্ষান্তরে মুসলমানদের সৈন্যসংখ্যা ছিল মাত্র ৩০ হাজার। নুমান ইবনে মুকরিন রা. ছিলেন মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি।

ইরানীরা জীবন বাজি রেখে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হল। উভয় পক্ষে তুমুল সংঘর্ষ হল। এত রক্ত ঝরল যে, ময়দানে ঘোড়ার পা পিছলে যাওয়ার উপক্রম হল। মুসলিম সেনাপতি নুমান রা. মারাত্মক আহত হয়ে ঘোড়া থেকে লুটিয়ে পড়লেন। কিন্তু তখনও আদেশ দিলেন, আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ো না। সামনে অগ্রসর হও। শত্রুর মোকাবিলা কর। নুমান ইবনে মুকরিন রা.-এর পর হযরত হুযাইফা রা. পতাকা ধারণ করলেন। সন্ধ্যার দিকেই ইরানীরা পরাজিত হয়ে পলায়ন করতে শুরু করল। মুসলমানগণ হামদান পর্যন্ত তাদের ধাওয়া করল এবং তা দখল করে নিল। জয়লাভের পর জনৈক মুসলিম সেনা নুমান রা.-এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। এটা ছিল তার অন্তিম মুহূর্ত। তাকে দেখে তিনি মাথা তুলে তাকালেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, যুদ্ধের ফলাফল কী? তিনি উত্তর দিলেন, বিজয়। এ কথা শুনে তিনি আল্লাহর শোকর আদায় করলেন এবং বললেন, আমীরুল মুমিনীন উমর রা.কে দ্রুত এই সংবাদ জানিয়ে দিন। একথা বলে তিনি চিরদিনের জন্য চোখ বন্ধ করলেন। ওমর রা. বিজয়ের সংবাদ শুনে অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। কিন্তু হযরত নুমান রা.-এর শোকে অনেক কাঁদলেন।

এই যুদ্ধে প্রায় ৩০ হাজার ইরানী সৈন্য মারা যায় এবং পরাজয়ের ফলে তাদের  শক্তি ও দাপট চুরমার হয়ে যায়। এরপর আর বড় ধরনের কোনো আক্রমণের সাহস তাদের হয়নি।

সম্রাট ইয়াযদ গিরদ বিভিন্ন হামলার শিকার হয়ে এদিক সেদিক পালিয়ে বেড়াচ্ছিল। আর মুসলিম বাহিনীও তার পিছু পিছু ধাওয়া করছিল। অবশেষে উসমান রা.-এর শাসনামলে সে মারা যায়।

শাম

আগেই বলা হয়েছে, ইয়ারমূকের যুদ্ধে রোমকদের মূল শক্তি ভেঙ্গে দিয়েছিল। অবশিষ্ট শক্তিটুকুও হযরত ওমর রা.-এর শাসনামলে শেষ হয়ে যায়। আর গোটা শাম অঞ্চল মুসলমানদের দখলে

চলে আসে।

দেমাশক জয়ে অনেক দিন লাগল। অবশেষে একদিন সুযোগ এসে গেল। সেখানকার বড় পাদ্রীর পুত্রসন্তান জন্মলাভ করেছিল। এই খুশিতে গোটা শহর তা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল এবং সেখানে সমবেত হল। হযরত খালিদ রা. এটাকেই মোক্ষম সুযোগ মনে করলেন। কিছু সঙ্গী নিয়ে দ্রুত শহরে চলে এলেন এবং আক্রমণ করে বসলেন। রোমকরা এ অবস্থা দেখে দ্রুত হযরত আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রা.-এর নিকট এসে সন্ধি করল। ইতিমধ্যে মুসলিম বাহিনী শহরের অর্ধেক জয় করে ফেলেছিল। কিন্তু যেহেতু আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রা. তাদের সাথে সন্ধি করে নিয়েছিলেন তাই এ অংশকেও সন্ধির অন্তর্ভুক্ত করে দেওয়া হল।

দেমাশকের পর হিমছ, কুনসিরীন ও কায়সারিয়াহ প্রভৃতি অঞ্চল জয় করে মুসলিম সেনারা বাইতুল মাকদিসের সামনে তাঁবু স্থাপন করল। সে অঞ্চলের অধিবাসীরা সন্ধির প্রস্তাব দিল তবে তাদের আশা যেন ওমর রা. নিজে এই বিষয়টির সিদ্ধান্ত দেন। হযরত আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রা. পুরো অবস্থা সম্পর্কে হযরত উমর রা.কে অবহিত করলেন। হযরত উমর রা. হযরত আলী রা.কে মদীনায় তাঁর স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করে বাইতুল মাকদিসের উদ্দেশে রওনা করলেন। পথিমধ্যে জাবিয়া নামক স্থানে সৈন্যদলের প্রধানদের সাথে সাক্ষাত হয় এবং সেখানেই সন্ধিপত্র প্রস্ত্তত করা হয়। এরপর তিনি বাইতুল মাকদিসে রওনা হন। সে সময় তাঁর পরনে ছিল পুরনো ও মলিন পোশাক। লোকেরা তা পরিবর্তন করে উন্নত পোশাক পরার কথা বললে তিনি তাতে অস্বীকৃতি জানালেন এবং বললেন, আমাদের জন্য ইসলামের সম্মানই অধিক।

বাইতুল মাকদিসের পর আর বড় কোনো  লড়াই হয়নি। মুসলমানগণ রোমের রাজধানী ইনতাকিয়ায় গিয়ে পতাকা উড্ডীন করলেন। রোম সম্রাট কায়সার এ অবস্থা দেখে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ল এবং তৎক্ষণাৎ একটি জাহাজে করে কুসতুনতুনিয়ার পথে রওনা হয়ে গেল। ফলে গোটা শাম

রাজ্য সহজেই মুসলমানদের দখলে

চলে আসে। ষ

(চলবে ইনশাআল্লাহ) 

অনুবাদ : আবদুল্লাহ ফাহাদ

 

 

advertisement